#বিষয় – কবিতা আলোচনা।
#নাম- 'আফ্রিকা'- রবীন্দ্রনাথ।
✍️ ― মৃদুল কুমার দাস।
আজ রবীন্দ্রনাথের 'পত্রপুট' কাব্যের ১৬ সংখ্যক 'আফ্রিকা' কবিতাটির অন্দরমহলের খবর দেওয়ার চেষ্টা করব। কবিতাটির রচনার মূলে প্রেক্ষাপট কি ছিল, প্রসঙ্গক্রমে আফ্রিকা মহাদেশটির স্বরূপ নিয়ে আলোচনার সুযোগ নেব। সর্বোপরি সাম্রাজ্যবাদী শক্তির হিংস্র উত্থান, উপনিবেশ দখল, মানবিকতার যথেচ্ছ অবমাননা এই কবিতাটির মধ্যে বিশ্বকবি কি সুনিপুণ বিন্যাস ঘটিয়েছেন। কবিতাটিতে কবির দীর্ঘ তিন দশকের অভিজ্ঞতা নিহিত আছে। কবি বিশ্বের নানা দেশ মহাদেশ পরিক্রমা করলেও আফ্রিকা কোনদিন যাননি। কিন্তু সেই আফ্রিকা সাম্রাজ্যবাদী নিষ্ঠুর শক্তির কাছ ছিনিবিনি খেলার পাত্র হয়েছিল যখন তাই নিয়ে এক মানবতার পূজারী কবির মথিত হৃদয়ের কান্না নিয়ে কবিতাটি রচিত হয়েছিল। কবিতাটির রচনাকাল - ১৯৩৭ এর ৮ ফেব্রুয়ারি। ১৯৩৫ এ ইতালির মুসোলিনি জোর করে আফ্রিকার আবিসিনিয়া দখল করেন। রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকে এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ আসে। তখন কবি শান্তিনিকেতনে। তরুণ কবি অমিয় চক্রবর্তীর অনুরোধে কবিতাটি লিখেছিলেন বিশ্বকবি। কবিতাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৩৯ এ 'প্রবাসী' পত্রিকায়। এই কবিতা রচনার আগে কবির মানসিক যন্ত্রনার কথা 'শেষ সপ্তক' এ প্রকাশিত হয়েছিল। সেই সঙ্গে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আভাস বা আসন্ন বলে ভবিষ্যৎ বাণী করতে দ্বিধা করেননি।
এই আফ্রিকা নিয়ে জানার কৌতূহল একটু নিরসন হলে মন্দ হয় না।
আফ্রিকা ও প্রাচ্যভূমি ভারতবর্ষ একটা সময় এক ছিল। সেই সময়কার কথা বলছি যখন পৃথিবীর সমগ্র স্থলভাগ ছিল একটাই ভূখণ্ড। জার্মান অধ্যাপক আলফ্রেড ওয়েগনারের 'মহীসঞ্চরণ' মতবাদের মূল কথাই ছিল - চৌত্রিশ কোটি বছর আগে কার্বনিফেরাস যুগে পৃথিবীতে ছিল একটিই স্থলভূমি। তার নাম প্যানজিয়া। আর সমগ্র জলভাগের নাম ছিল 'প্যান্থালাসা'।
পৃথিবী ঘুরছে বলে পৃথিবী তার উপরিভাগকে কেন্দ্রাতিগ বল প্রয়োগ করছে। তারই প্রভাবে বাইশ কোটি বছর আগে মেসোজয়িক যুগের শুরুতে প্যানজিয়া অর্থাৎ একটাই ভূখণ্ড প্রবল আলোড়নের ফলে একাধিক ভূখণ্ড তৈরি হয়। গড়ে ওঠে এক একটা মহাদেশ।
এই কেন্দ্রাতিগ বলের জন্যই পৃথিবী পৃষ্ঠের উপরিতলের জলভাগ ও স্থলভাগ নিয়ে বৈচিত্র্য একটা নিরন্তর প্রক্রিয়ার অন্তর্গত হয়। তদনুসারে অনেকের মতের প্রমাণিত সত্যতা হলো কেন্দ্রাতিগ বলের জন্যই হিমালয় পর্বতের উচ্চতা বাড়ছে। প্রশান্ত মহাসাগর শুকিয়ে যাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা। অবশ্য তা কোটি বছর লাগলেও লাগতে পারে।
ওয়েগনার আরো প্রমাণ দিয়েছেন সকল খন্ডিত ভূখন্ডের অসম বা খাঁজ কাটা প্রান্তসীমা তথা তটরেখাকে যদি একটার সঙ্গে আরেকটার জোড়া লাগানো যায়,তবে সকল দেশ ও মহাদেশ একে অপরের সাথে সুন্দর ভাবে খাপ খেয়ে যায়। পৃথিবীকে তখন একটা ভূখণ্ড মনে হবে।
শুধু তাই নয় একের তটরেখা সংলগ্ন মানুষের জীবন জীবিকার সঙ্গে অপর ভূখন্ডের তটরেখার জীবন জীবিকার বৈশিষ্ট্যগত সাদৃশ্য লক্ষ্যে পড়বে। সেই সঙ্গে ভাষাগত সাদৃশ্য, ভৌগলিক পরিবেশগত সাদৃশ্য অবশ্যই লক্ষ্যে পড়বে। যেমন ভারতবর্ষ থেকে বঙ্গোপসাগর অস্ট্রেলিয়াকে ছিনিয়ে নিয়ে গেছে। প্রমাণ অস্ট্রেলিয়ার তটরেখাকে টেনে এনে যদি ভারতের তটরেখার সঙ্গে মিলাতে চাই আমরা অবশ্যই দেখতে পাব আমাদের সে মনের সাধ পূরণে বৃথা হবে না। আবার আফ্রিকা মহাদেশের পশ্চিম তটরেখাকে আমেরিকার পূর্ব তটরেখাকে টেনে এনে যোগ করলে মিলে যাবে। আমেরিকার পূর্বতটের জীবনের সঙ্গে আফ্রিকার পশ্চিমতটের জীবনাচরণের মিল অবশ্যই লক্ষণীয়। আমেরিকার আদিম অধিবাসী ও আফ্রিকার আদিম অধিবাসীর সাদৃশ্যের স্বপক্ষে যুক্তি হলো উভয় দেশের আদিম মানব - 'এপ'। 'এপ'-এর নৃতাত্ত্বিক পরিচয় তাই প্রমাণ দেয়।
১৮৭৫ খ্রীষ্টাব্দে লুথিয়ান গ্রীন তাঁর 'চতুস্তলক' মতবাদে বলেছেন পৃথিবীর চারটি তল। যথা আর্টিক, আটলান্টিক,পেসিফিক ও ইন্ডিয়ান ওসিয়ান। আর তিনটি উন্নত কোণের একটি হচ্ছে আফ্রিকা মহাদেশ। এবং প্যানজিয়ার দক্ষিনাংশ হতে বিচ্ছিন্ন ভূখণ্ডই হলো আফ্রিকা মহাদেশ। ভারতের পশ্চিম উপকূলের মানুষের জীবন জীবিকার সঙ্গে আফ্রিকার মানুষের জীবন জীবিকায় বহুলাংশে মিল দেখা যায়। জাতিগত ঐক্যের সূত্রে গুজরাট, মহারাষ্ট্র,মাদ্রাজের উপকূলবর্তী এলাকার মানুষেরা দলে দলে আফ্রিকায় শ্রমিক হিসেবে যাতায়াত করতো অনবরত। বিশেষ করে গুজরাটিরা, তার মধ্যে আবার প্যাটেল সম্প্রদায় আরব সাগর ডিঙিয়ে কাঠের ব্যবসায় খুব দক্ষ হয়ে উঠেছিল।
আবার নৃতাত্ত্বিক পরিচয় বিশ্লেষণ করলে ভারত ও অস্ট্রেলিয়ার আন্তঃযোগাযোগও সঠিক ভাবে প্রমাণিত হয়। দুই দেশের আদিম প্রজাতি প্রোটো অস্ট্রলয়েডের ভাষা ও জীবনযাপনের সাদৃশ্য থেকেও এই সত্যে পৌঁছতে পারি।
এইভাবে প্যানজিয়া বা একটিমাত্র ভূখন্ডকে পৌরাণিক ভাবলোক দিয়ে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর 'আফ্রিকা' কবিতায় বললেন -
"তাঁর সেই অধৈর্যে ঘন ঘন মাথা
নাড়ার দিনে
রুদ্র সমুদ্রের বাহু
প্রাচী ধরিত্রীর বুকের থেকে
ছিনিয়ে নিয়ে গেল তোমাকে আফ্রিকা"
সেই আফ্রিকা কোটি কোটি বছর ধরে এক দুর্গমের রহস্য দিয়ে আবৃত হতে শুরু করে। পরিচয় অন্ধকারময় দেশ―
"হায় ছায়াবৃতা/ কালো ঘোমটার নীচে অপরিচিত ছিল তোমার মানবরূপ/ উপেক্ষার আবিল দৃষ্টিতে।"
অর্থাৎ কবি কাব্যিক ভাষায় বুঝিয়েছেন বাসুকি নাগ তার মাথায় ধরিত্রীকে যেন ধারণ করে ছিল। স্রষ্টার যেন ইচ্ছে হলো বাসুকির মাথা নাড়িয়ে দিয়ে অখন্ড ধরিত্রী থেকে আফ্রিকাকে ছিনিয়ে নিয়ে যাওয়া যাক। স্রষ্টার হঠাৎ এই সখ থেকে নাকি ভারতবর্ষ থেকে বেরিয়ে গেল আফ্রিকা। অর্থাৎ আরবসাগর ও লোহিত সাগরের বাহুই যেন প্রাচী অর্থাৎ প্রাচ্য ভারতবর্ষ থেকে আফ্রিকাকে ছিনিয়ে নিয়ে গেল। একেবারে চিরতরে বিচ্ছিন্ন হলো।
সে কোটি কোটি বছর আগে। আফ্রিকা সৃষ্টির সময় ছিল এক অন্ধকারময় দেশ। পাহাড় পর্বত,আর ঘণ জঙ্গলের দেশ। কোটি কোটি বছর অন্ধকারে ডুবেছিল। তারপর এল হিংস্র জীবজন্তু, তারপর আদিম মানব এপ। আফ্রিকার উপাধি হিসেবে গণ্য আজও বিশ্বের অন্ধকারময় মহাদেশ। বর্তমানে যতই আধুনিক সভ্যতার দেশ বলে গণ্য করা হোক না কেন, আফ্রিকাকে প্রকৃতপক্ষে খুঁজে পেতে হলে ঐ অন্ধকার যুগের সময়ে গেলে আফ্রিকাকে চেনা সবচেয়ে সহজ। যখন সভ্যতার আলো ধীরে ধীরে পৌঁছনোর সময় হলো এই আফ্রিকাকে কেমন করে পেলাম সেই কথায় আসি এবার।
শুরু করি ভাস্কোডাগামার সময় থেকে। সে ১৪৯৭ থেকে ১৪৯৯ খ্রীষ্টাব্দ। তার পাঁচবছর আগে ইতালির নাবিক কলম্বাস আটলান্টিক পেরিয়ে ভারতবর্ষ আবিস্কার করবেন কি, আবিস্কার করে ফেলেছেন আমেরিকা। আনুমানিক ১৪৯৪ খ্রীষ্টাব্দে। আর পর্তুগাল নাবিক ভাস্কোডাগামা ভারতের কালিকট বন্দরে পৌঁছন ১৪৯৯।
আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ছিল পর্তুগীজদের উপনিবেশ। আর ভাস্কোডাগামা একেবারে দক্ষিণে কেপটাউন হয়ে কিনিয়াতে পৌঁছান ১৪৯৭ খ্রীষ্টাব্দে। আর সেখানে আহমেদ ইবন মাজিদ নামে এক ব্যবসায়ীর সাহায্য নিয়ে ভাস্কোদাগামা ভারতে পদার্পণ করেন। এর পেছনে কত জাহাজ ডুবি,লোকক্ষয়ের গল্প আছে যা শুনলে লোম খাড়া হয়ে ওঠে।
তাহলে দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউনে এসে পর্তুগীজরা প্রথম ঘাঁটি গাড়েন। তাঁরাই প্রথম বৈদেশিক শক্তি হয়ে আদিবাসিন্দাদের উপর আধিপত্য বিস্তার করে আধুনিক আফ্রিকা গঠনের কাজে হাত লাগান।
কেপটাউনের আদিবাসিন্দা হলেন 'খোসা' উপজাতি। তাদের কাছে পর্তুগীজরা ছিলেন বিদেশি হানাদার। তাঁদের প্রতিহত করতে খোসাদের সঙ্গে বাধল প্রবল লড়াই। কিন্তু পর্তুগীজ তথা ডাচেদের বন্দুকের সামনে খোসারা তীর ধনুক নিয়ে লড়াইয়ে এঁটে উঠতে পারেননি। ফলে পর্তুগীজ তথা ডাচেরা খোসাদের সহজেই দাস বানিয়ে ফেললেন। গরু ভেড়ার চেয়েও অধম ভাবতো তাঁরা খোসাদের। এমনকি এই ডাচ শ্বেতাঙ্গদের কাছে বাঘ সিংহ শিকারের বিলাসিতার নামান্তর হতো খোসারা। প্রবল বর্ণবৈষম্যের শিকার হতেন খোসারা। এদের শিকার করতে বন্দুকের লাইসেন্স প্রথার প্রচলন ছিল। নেলসন ম্যান্ডেলা এই খোসা সম্প্রদায়ের লোক ছিলেন।
ডাচদের মতো ক্রমে ফরাসি, জার্মানরা উপনিবেশ স্থাপনে উদ্যোগী হলেন। উপনিবেশ দখলের লড়াই শুরু হয়। সেই সঙ্গে ইংরেজরাও উপনিবেশিক শক্তি হয়ে আবির্ভূত হন। ইউরোপে ১৮১৫ খ্রীষ্টাব্দে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের মধ্যে বাধল যুদ্ধ। সেই যুদ্ধে ডাচরা ফ্রান্সের নেপোলিয়ন বোনাপার্টকে আপরাজেয় শক্তি মনে করতেন। ফলে নেপোলিয়নকে ডাচরা সমর্থন করেন। নেপোলিয়নের শেষে ওয়াটার লুর প্রান্তে ঘোরোতর পরাজয় ঘটে। ফ্রান্সকে এভাবে ডাচদের সমর্থন ইংরেজরা ভালো চোখে নিলেন না। সেই আক্রোশ গিয়ে পড়ল কেপটাউনে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে। বাঁধল লড়াই। ১৮৩৩ খ্রীষ্টাব্দে ইংরেজরা ডাচদের সব কলোনি থেকে বিতাড়িত করে কলোনিগুলি থেকে দাসপ্রথার বিনাশ ঘটালেন।
তখন ডাচরা বাধ্য হয়ে লটবহর ও খোসা দাসদের নিয়ে নতুন বাসস্থানের খোঁজে আফ্রিকার উত্তরদিকে পাহাড় জঙ্গল অধ্যুসিত এলাকায় সরে যেতে বাধ্য হলেন। ইতিহাসে এর নাম হল 'গ্রেট ট্রেক'। অর্থাৎ 'ট্যু ট্রাভেল' বলা হয় যাকে। তাই ট্রাভেল একটি ডাচ শব্দ।
এই উত্তরদিকটি ছিল জলু উপজাতি অধ্যুসিত এলাকা। ডাচদের আক্রমণের মুখে পড়ে জুলু উপজাতিও ডাচেদের দাসত্ব স্বীকার করলেন। এইভাবে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত হলো ব্রিটিশদের,আর উত্তরপ্রান্ত ডাচদের। তবে এই ভাগ বাটোয়ারা মৌখিক ছিল।
কিন্তু ব্রিটিশরা ক্রমে সাম্রাজ্য বিস্তারের লোভে উত্তরদিকে এগোতে থাকলেন। হীরা, সোনার লোভ তাঁকে পেয়ে বসেছে। ইজিপ্ট পর্যন্ত পৌঁছনো তাঁর চাই। ইজিপ্ট পর্যন্ত রেললাইন পেতে, কেপটাউন থেকে ইজিপ্ট পর্যন্ত একাধিপত্য বিস্তারে উঠে পড়ে লাগলেন। ফলে ডাচদের সঙ্গে আবার লড়াই বাধল। প্রথমবার ডাচরা যুদ্ধে জিতলেও দ্বিতীয় বারের যুদ্ধে ডাচরা পুরোপুরি পর্যুদস্ত হলেন। এবং ডাচরা অবশেষে ১৯০২ খ্রীষ্টাব্দে বাধ্য হলেন ব্রিটিশদের সঙ্গে সন্ধির প্রস্তাব এনে শান্তি স্থাপন করতে। সন্ধির শর্তাবলী অনুসারে উভয়েই মিলেমিশে একসঙ্গে রাজত্ব চালাবে ঠিক হয়। দুই শ্বেতাঙ্গ শ্রেণীর শাসনে কৃষ্ণাঙ্গদের অবস্থা যে তিমিরে ছিল সেই তিমিরেই রইল। বরং আরো শোচনীয় হয়ে উঠেছিল যে তা বলতে দ্বিধা নেই।
সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বার বার আফ্রিকার বুকে হানাদার হয়ে কিভাবে নৈরাজ্য ও অরাজকতা সৃষ্টি করেছিল, সে ইতিহাস সুখের যে নয়, সুখের হতে পারে না- কেমন সে শোষিত আফ্রিকার কাহিনি? আফ্রিকার বুকে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি তার লোহার কাঁটা লাগানো বুটের তলা দিয়ে ভয়ঙ্কর শোষনের চির চিহ্ন এঁকে দিচ্ছিল। এই দুর্দিনের কথাকে কবিতার প্রতি স্তবকে মর্মস্পর্শী ভাষায় কবি তুলে ধরেছেন।
ইতালির মুসোলিনি এক সাম্রাজ্যলোভী শাসক। জার্মানির হয় টলার তাঁর দোসর। এক স্বাধীন দেশকে বলপূর্বক দখলের বিরুদ্ধে বিশ্বের সমাজসচেতন মানুষ সেদিন নীরব দর্শক ছিলেন। প্রতিবাদ দিকে দিকে ধ্বনিত হলেও সে কেবল প্রতিবাদেই ছিল। এই নির্মম অত্যাচার ও উপনিবেশ দখলের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের কোনো সুরাহা হয়নি। রবীন্দ্রনাথ গ়াঁধীজীকে বলে ছিলেন কিছু একটা করতে। গাঁধীজী বলেছিলেন এর বিরুদ্ধে আবিসিনিয়ার মানুষকে সঙ্গে নিয়ে আন্দোলনে সামিল হতে হবে। আর রবীন্দ্রনাথ সেদিন নিরুপায় হয়ে বলেছিলেন আমিও তো উপনিবেশিক দেশের বাসিন্দা। কতটাই বা ক্ষমতা। তবে ক্ষমতা বলতে লেখনী। সেই তীক্ষ ধারালো লেখনীতে প্রতিবাদ ধ্বণিত হল -
"এল ওরা লোহার হাতকড়ি নিয়ে/ নখ যাদের তীক্ষ্ণ তোমার নেকড়ের চেয়ে/ এল ওরা মানুষ ধরার দল।... দস্যু-পায়ের কাঁটা-মারা জুতোর তলায় / বীভৎস কাদার পিন্ড..." ― আফ্রিকাকে পদদলিত করে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির উত্থান কবির কাছে ছিল বেদনাদায়ক। সকলে যখন ধর্মীয় সাধনায় ব্যাপৃত ―
"সমূদ্রপারে সেই মুহুর্তেই তাদের পাড়ায় পাড়ায়/ মন্দিরে বাজছিল পূজার ঘন্টা/ সকালে সন্ধ্যায় দয়াময় দেবতার নামে;/ শিশুরা খেলছিল মায়ের কোলে।"― এমন আবেগঘন মুহূর্তের মধ্যে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির ক়াটামারা জুতোর তলায় অসহায় মানুষের পদদলিত পিষ্ট হওয়া অবস্থা দেখে
নিরুপায় কবির ভাষায় সেদিন নিষ্ঠুর সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে কবিতাটি ছিল চিরকালের মত তাৎপর্যপূর্ণ। বিশ্বকবির কালজয়ী সৃষ্টি। কবিতার শেষে এক নিরুপায় কবির করুণ বেদনায় কবির কন্ঠ রুদ্ধ। কবি সেই রুদ্ধশ্বাসে কবিতাটির মর্মস্পর্শী সমাপ্তি ―
"এসো যুগান্তের কবি,/আসন্ন সন্ধ্যার শেষ রশ্মিপাতে/ দাঁড়াও ওই মানহারা মানবীর দ্বারে;/ বলো 'ক্ষমা করো' ― / হিংস্র প্রলাপের মধ্যে/ সেই হোক তোমার সভ্যতার শেষ পুণ্যবাণী।।"
আদিম আফ্রিকার স্বরূপকে সেদিন সাম্রাজ্যবাদী শক্তির নিষ্ঠুরতা ছাড়িয়ে গিয়েছিল তাই কবিতার মনের কাছে মর্মস্পর্শী আবেদন এক চিরন্তন সত্যের সাক্ষী হয়ে রয়েছে।
******
#কপিরাইট রিজার্ভ ফর মৃদুল কুমার দাস।
অসাধারণ👏✊👍👏✊👍
উত্তরমুছুনঅসাধারণ 👌👌👌👌🙏💗💗
উত্তরমুছুনএতো সুন্দর রূপায়ণ।
উত্তরমুছুনএক কথায় অসাধারণ💐💝
আমার অন্যতম ভীষণ প্রিয় কবিতার এমন বিশ্লেষণে আমি মুগ্ধ।আমি সাহিত্যের ছাত্রী নই,এভাবে এর আগে কেউ বুঝিয়ে দেননি।আমি অভিভূত।
উত্তরমুছুনঅসাধারণ।🙏🙏
উত্তরমুছুন