শুভ আলোচনা বাসর।
#বিষয় - *গ্রন্থালোচনা।*
#নাম -
*কবিগান ও কবিওয়ালা।*
✍️ – মৃদুল কুমার দাস।
বাংলা ও বাঙালির লোকসংস্কৃতির সে সুবর্ণযুগ বলতে গেলে কবিগানের সাম্রাজ্য আর তার গায়েনদের বলা হয় কবিওয়ালা। এই কবিগানের উদ্ভব কিন্তু হঠাৎ করে হয়নি। কবিগানের সূচনা কাল আঠারো শতকের মধ্যভাগে,আর বিকাশ উনিশ শতকজুড়ে। প্রায় দু'শ' বছর আবির্ভাব ও বিকাশ নিয়ে কবিগান বাংলার শহর থেকে মফঃসল পর্যন্ত আকাশ বাতাস মুখরিত করেছিল, ইতিহাস তাই বলে।
এই দু'শ বছরের আবির্ভাব ও বিকাশের মধ্যে কবিগান কিন্তু আটকে নেই। অনেক আগে থেকেই এর প্রস্তুতি ছিল।
ধর্মীয় বাতাবরণ ও পুরাণ শাস্ত্রালোচনার আড়ালেই ছিল তার এই প্রস্তুতি। সে চর্যাগীতির সময় থেকে। কেননা আদিরসেও চর্যাপদ সমান পুষ্ট। বৌদ্ধধর্মের বিষয় নিয়ে বাঙালির ধর্মপথগামীর আচরণগত শিক্ষায় জোর তদবিরের মাঝে সাধারণ মানুষ কামনা বাসনা,অবৈধ সম্পর্কের আবেদন তলে তলে বেশ ভালই পোষন করত। যেমন দিনের বেলা কাক দেখে, যে ঘরের বউ ভয় পেত সেই কিন্তু অন্ধকার নামলে পা টিপে টিপে পরপুরুষের বাড়ি যেত('... রাতি ভইলে কামরু জাঅ')। চুরি ছিনতাই থেকে সকল প্রকার কৌম জীবনের কথা পাই চর্যার সমাজ ও বাস্তব জীবনে।
এর পরে আসি শ্রীকৃষ্ণকীর্তন নাটগীতির কথায়। নাট্যকাব্যটি কবি একেবারে লোকায়ত করে পরিবেশন করেছেন। মূলে আদিরস। এই নাটগীতির শ্রোতা,দর্শক একেবারে সাধারণ শ্রেণীর মানুষ। কবি বড়ুর শাস্ত্রে অগাধ পান্ডিত্য থাকা সত্ত্বেও কাব্যের ক্ষেত্রে আদিরস যত আলগা করেছেন সাধারণ মানুষ তত এই নাটগীতি উপভোগ করেছেন। কবির এই নাট্যকাব্যটির পরীক্ষা ছিল সাধারণ মানুষের কাছে। ভালোই সাফল্য কবি পেয়েছিলেন। এই নাট্যকাব্যে আবার ভক্তিরসও কেউ পেতে চাইলে বঞ্চিত হতেন না।
তবে পদাবলী সাহিত্য প্রেম-ভক্তি-দিব্যভাব, রামায়ণের বাঙালিয়ানায় করুন ও ভক্তিগীতি বা মহাভারতের যুদ্ধ যুদ্ধ কাহিনীর মধ্যে বীরত্বের বাঙালিয়ানায় আকর্ষণ থাকলেও সাধারণ মানুষ খুঁজেছে তার দৈনন্দিতার সহজ সুরের গান। আর তারই রসদ লাভে মঙ্গলকাব্যগুলির দিকে ভালই ঝোঁক থাকত। ওখানে আদিরসের সরবরাহ করার সুযোগ সুবিধা কবিগণ সহজেই নিতেন।
পৌরাণিক দেবদেবীর পাশে লৌকিক দেবদেবী নিয়ে মঙ্গলকাব্যের জনপ্রিয়তা সে বলার অপেক্ষা রাখে না। কেন চন্ডীমঙ্গল কাব্যের নায়ক ব্যাধ পুত্র কালকেতু ও নায়িকা ব্যাধ কন্যা ফুল্লরাকে করার মূলে লোকায়ত জীবনের কাছে কবি তাঁর কাব্যের জনপ্রিয়তা খুঁজেছিলেন। ব্যাধ কালকেতুকে অধিপতিও করলেন। আসলে লোকায়ত জীবন,লোকমুখের ভাষা সবসময় সাহিত্যের নতুন নতুন পথ রচনা করে এসেছে।
আর রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র মঙ্গলকাব্যের লৌকিক ধারার ও আদিরসের শেষ কবি। তিনিও ছিলেন দ্ব্যর্থবোধক ভাব সৃষ্টির অসাধারণ প্রতিভাবান কবি। তাঁর এই ভাবধারা কবিগানে পরিপূর্ণ প্রভাব পড়ল।
সাধারণ মানুষ কাব্যের পালাগান শুনতে শুনতে কেউ কেউ পালা রচনায় পারদর্শিতা অর্জন করলেন। যত লঘু বিনোদন ততই তার দর,কারণ সাধারণ মানুষের কাব্য চর্চায় তারাও কম নন বলে স্বতঃপ্রমাণিত হলো। পান্ডিত্য অপেক্ষা লোকায়ত কথা তাদের মধ্যে প্রিয় আস্বাদন হয়ে উঠল। সর্বোপরি সংস্কৃত, আরবি,ফারসি ভাষার প্রভাবকে পেছনে ফেলতে ইংরেজি ভাষা উঠে পড়ে লেগেছে। পাশ্চাত্য শিক্ষার ঢেউ লেগে গেছে। মাতৃভাষায় গদ্যচালও পুরোদমে হাজির, কিন্তু সাহেবি ইংরেজি তার উপর চড়াও - কলকাত্তাই ককনির বেশ ভালই দর। এই আবহের মাঝে এই পাঁচালী ও কবিগান চটুল আদিরসাত্মক হয়ে সাধারণ মানুষের মনের খোরাক জোগানোয় একদম সিদ্ধহস্ত হয়ে উঠল। কবিগানে দ্ব্যর্থবোধক ভাষায় ভক্তির কথা জানতে চাইলে পাওয়া যেত,আবার আদি রস উপভোগ করতে চাইলে বিমুখ হতে হত না। আর লোকসাধারণ মানুষের মধ্য থেকে যখন এক একজন কবিওয়ালা উঠে আসছেন, তাই নিয়ে সাধারণ মানুষের উত্তেজনার ঢেউ ছিল প্রবল। আগ্রহ তুঙ্গে। সেই ঢেউয়ের রেস এতো তীব্র ছিল যে দেড়শ' পেরিয়ে প্রায় দু'শ ছুঁয়ে গিয়েছিল,ঐ আরকি যেমন দৌড়বীর প্রান্ত ছুঁয়েও আরো কিছুটা দৌড়ে নিজেকে ঠিক করে নেন,এও ঠিক সেই রকম।
সুতরাং পাঁচালি,কবিগান - পাঁচালিকার ও কবিওয়ালা এক বিশেষ যুগচেতনার চাহিদা পূরণের জন্য অবতীর্ণ হয়েছিল।
ঊনবিংশ শতাব্দীর মাটি লোকোসাধারণের জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ হওয়ার পাঁচালি ও কবিগানে ছিল এক অনন্য প্রস্তুতি। সেই হিসেবে এই লোকসংস্কৃতি আজ যতই লুপ্তপ্রায় বলি না কেন, এই ধারায় আমরা আমাদের ঐতিহ্যের স্বাদ বহন করে আত্মবিমোহিত হই।
কবিগানকে আদৌ বিশুদ্ধ সাহিত্য ও সংস্কৃতির ধারক ও বাহকের পর্যায়ে ফেলা যায় না। তবে এর যেটুকু ঠাটবাট ও মর্যাদা শেষপর্যন্ত পুরাণ,উপপুরাণ রক্ষা করেছে। একটু জাতে তুলে ধরেছে। হরু ঠাকুর,রাম বসু,নিতাই বৈরাগী, ভোলা ময়রা,অ্যান্টনী ফিরিঙ্গি প্রমুখগণ সে অর্থে তথাকথিত শিক্ষিত ছিলেন না। কবিগান চর্চার বলে বলীয়ান হয়ে এঁরা তথাকথিত খ্যাতির শীর্ষে প্রতিষ্ঠিত হন। পুরাণ,উপপুরাণ জ্ঞান দিয়ে লোকায়ত স্থূল জীবনকে অসাধারণ জীবনরসরসিকতায় বলিষ্ঠ প্রত্যয় এনে দিয়েছিলেন। রীতিমত রাগরাগিনীতে কন্ঠের রেওয়াজ, সেই সঙ্গে কুড়ি-বাইশ রকম বাদ্যযন্ত্রের সাহায্যে আসর জমজমাট করে তুলতেন। নিধুবাবু দুটো শখের আখড়া গড়ে তোলেন – একটি বাগবাজারে,আরেকটি শোভাবাজারে। সঙ্গে কিছু ধনাঢ্য ব্যক্তির দল গঠনে সঙ্গত দিয়েছিলেন নিধুবাবুকে। উভয় দলের মধ্যে আবার গানের লড়াই হত। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বাগবাজার জয়ী হত।
কবিগানের প্রচার ঘিরে বাঙালি মননে অ্যান্টনী ফিরিঙ্গি(পুরো নাম হেন্সমান অ্যান্টনি) ও বাগবাজারের ভোলাময়রার তরজা বা কবিলড়াই এক স্বর্ণোজ্জ্বল ঘটনা চিরচিহ্নিত। অ্যান্টনি অর্থাভাবে বাজনদার না পেয়ে নিজেই গান বাঁধতে শুরু করে ছিলেন। একটি তথাকথিত কবিগানের আসরে অ্যান্টনি ভোলা ময়রাকে ভগবতীরূপে কল্পনা করে গেয়ে ওঠেন –
'ভজন পূজন জানি না মা
জেতেতে ফিরিঙ্গি।
যদি দয়া কর কৃপা কর
হে শিবে মাতঙ্গী।'
তখন ভোলা ময়রা এর জবাবে গেয়ে উঠলেন -
'তুই জাত ফিরিঙ্গি জবড়জঙ্গী
আমি পারব নাক তরাতে।
তোকে পারব নাক তরাতে।
শোনরে ভ্রষ্ট বলি স্পষ্ট
তুই রে নষ্ট, মহাদুষ্ট
তোর কি ইষ্ট কালী কেষ্ট
ভজগে যা তুই যিশুখৃষ্ট
শ্রীরামপুরের গির্জাতে।।'
– এ মুখে মুখে তাৎক্ষণিক ছন্দবদ্ধ অনুপ্রাসে নির্ভুল প্রয়োগ এক কালজয়ী সৃষ্টি। এর উত্তরে অ্যান্টনি তত্ত্বের মোড়কে যা বলছিলেন সে এক অসামান্য রুচিশীলতার পরিচয় কবিগানকে স্বারস্বত সমাজে ঠাঁই করে দেওয়ার মত ছিল –
"সত্য বটে আমি জাতিতে ফিরিঙ্গী
ঐহিক লোক ভিন্ন ভিন্ন
অন্তিমে সব একাঙ্গী।'
লৌকিক দেবদেবী ও লৌকিক জীবন একাকার হয়ে গিয়েছিল কবিগানে – কবিওয়ালাগণ তাই করেছিলেন। শুধু 'ওয়ালা' প্রত্যয় যোগ হওয়ায় সারস্বত কবিসমাজে ঠাঁই হয়নি সত্য কিন্তু সারস্বত সমাজ থেকে তাঁরা কোনো অংশে কম ছিলেন না।
সেযুগের লোকসাহিত্যে কবিগান স্থান করে নিয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ এর পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। কেননা তিনি লোকসংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক ছিলেন বলে। তাই কবিগানের প্রতি অকৃত্রিম টান অনুভব করতেন। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরও অন্যতম অনুরাগী ছিলেন। তিনি তাঁর 'জোড়াসাঁকোর ধারে' গ্রন্থে বলেছিলেন ভুবনবাঈ বলে একটি বুড়ি আসতেন তাঁদের বাড়িতে। মা তাঁকে বউদের গান শোনাতে বলতেন। বুড়ী তখন কবিগানের সখীসংবাদ থেকে গান গেয়ে শোনাতেন।
এই কবিগান আঠারো শতকের মধ্যভাগ থেকে গোটা উনিশ শতক জুড়ে নাগরিক কলকাত্তাই জীবনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছিল স্বচ্ছন্দ বিচরণ। এর পৃষ্ঠপোষকতায় যেমন কিছু ধনাঢ্য ব্যক্তির চরম আগ্রহে জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পেয়েছিল তেমনি তাদের উন্নাসিকতায় নগর কলকাতায় আবার কবিগান পেছন সারিতে চলে যায়। কারণ উঠতি বাবুসমাজের কাছে গালমন্দ সহ্য হচ্ছিল না। পাশ্চাত্য শিক্ষা তাদের নতুন পথে চলতে বলছিল বলে।
উনবিংশ শতাব্দীর থিয়েটার শিল্পের জনপ্রিয়তায় কবিগান কলকাতা ছেড়ে বিশ শতক থেকে থেকে পূর্ববঙ্গে আশ্রয় লাভ করেছিল। পশ্চিমবঙ্গ কবিগানের জন্ম হলেও পূর্ববঙ্গে এখন দর বেশী।
****
অসাধারণ লেখা, অনবদ্য। 🌹🌹🌹🌹🌹
উত্তরমুছুনবিষয়ভিত্তিক এমন সুন্দর বিষয়ের আলোচনার জন্য অনেক অনেক জানতে হয়।
উত্তরমুছুনঅসংখ্য ধন্যবাদ দাদা এমন সুন্দর লেখা উপহার দেওয়ার জন্য।
সুন্দর তথ্যবহুল আলোচনা।
উত্তরমুছুনকিছু চেনার সাথে অনেক অজানাকে জানলাম।
💐
অনবদ্য লেখনী।চোখের সামনে ছবির মত পরিষ্কার হয়ে গেল।
উত্তরমুছুন