শনিবার, ২৯ জানুয়ারি, ২০২২

বিষয় - চিত্রালোচনা


 নাম -আনন্দাশ্রু
✍️ডা: অরুণিমা দাস

 
হোয়াট ইস দিজ?রিমো কে বললো মা!! এই রেজাল্টের ছিরি তোমার?? কোনো সাবজেক্টে সিক্সটি পার্সেন্ট অবদি পাওনি। ক্লাস ফোরে এরকম রেজাল্ট নিয়ে কোন স্কুল তোমায় ক্লাস ফাইভে চান্স দেবে শুনি?? কিছু হবে না তোমার দ্বারা। না ম্যাথস ভালো পারো, না তো হিস্ট্রি, জিওগ্রাফি। তোমার ফিউচার যে কতটা নড়বড়ে সেটা এখন থেকেই বুঝতে পারছি আমি। মাথা নীচু করে কথা গুলো শুনছিল রিমো। পড়াশুনো পারুক না পারুক, একটাই ভালোগুন ওর, কোনোদিন বড়োদের মুখের ওপর কথা বলেনি।।
      এত বকাবকি শুনে পাশের ঘর থেকে ঠাকুমা এসে বললো আহ বৌমা,এটা তো ওর হাসি খেলার বয়েস, সব সময় পড়াশুনো, রেজাল্ট নিয়ে ওকে বকাবকি করো না। বাধ্য মেয়ে ও,একদিন নিশ্চই ভালো রেজাল্ট করবে। রিমোর মা বলেন আপনার আদর পেয়েই মাথায় উঠছে ও। ঠাকুমা বললেন সে যাই বলো তুমি, ছোটবেলার এই রেজাল্ট নিয়ে ওর ভবিষ্যত নিয়ে তুমি মন্তব্য করতে পারো না এভাবে। 
রিমো নিজের ঘরে গিয়ে বই খাতা গুলো খুলে বসে। 
রেজাল্ট খুবই খারাপ হয়েছে, মন টা তারও বেশ খারাপ। যাইহোক এই রেজাল্ট নিয়েই যে স্কুলের প্রাইমারী তে পড়েছে, ওই স্কুলের ই হায়ার সেকেন্ডারি তে ভর্তি হলো কোনো রকমে। 
     হেড মিস্ট্রেস ডেকে বললেন এরকম পুওর পারফরম্যান্স হলে কিন্তু তোমায় প্রত্যেক ক্লাসে এক বছর করে থাকতে হবে। রিমো তখনও চুপ, বড়োদের মুখের ওপর কথা বলতে নেই, ঠাকুমা এই শিক্ষাই দিয়েছেন তাকে। বাড়িতে বাবা মা ব্যস্ততার জন্য বেশি সময় দিতে পারেন না। পড়াশোনার বাইরে ঠাকুমা আর ভাইয়ের সাথেই সময় কাটে ওর।  ক্লাস ফাইভের অ্যানুয়াল পরীক্ষায় মোটামুটি পাস করলো, ফোরের চেয়ে একটু ভালো রেজাল্ট হলো। ক্লাস সিক্সের হাফ ইয়ারলি এক্সামে আবার শেষের দিকে রাঙ্ক। বাড়ীতে যথারীতি আবার একপ্রস্থ বকুনি। বাবা মা হাল ছেড়েই দিয়েছিলেন। শুধু ঠাকুমা আর রিমো হাল টা ছাড়েনি বোধহয়।
ক্লাস সেভেনে যখন উঠলো, একটু একটু বুঝতে শিখল রিমো। বুঝে পড়তে হবে, শুধু মুখস্থ করলে হবে না। একটু একটু করে পড়া গুলো আয়ত্ত করতে শুরু করলো। নিজেই পড়ে, কোন টিচার নেই। স্কুলের পড়াগুলো মন দিয়ে শুনতে লাগলো, বোঝার চেষ্টা করতে লাগলো। বুঝতে না পারলে ক্লাসের শেষে টিচারকে জিজ্ঞাসা করতো। এভাবে চলতে চলতে ক্লাস সেভেন থেকে এইট, এইট থেকে নাইনে উঠলো রিমো। একটু বেটার রেজাল্ট হলো অ্যানুয়াল পরীক্ষায়।
             ক্লাস নাইন, বাড়িতে বললো সবাই যে নাইনের রেজাল্ট ভালো না হলে ক্লাস টেনের টেস্ট এক্সামে বসতে দেবে না। নাইন দুজন শিক্ষক রাখা হলো। চারপাশের বন্ধুদের দেখে রিমো বুঝতে পেরেছে ততদিনে যে পড়াশোনা টা আয়ত্তে আনা খুব কঠিন নয়। স্কুলে ও বাড়িতে শিক্ষকদের সাহায্যে বেশ ভালো উন্নতি হতে লাগলো পড়াশোনায়। হাল কিন্তু ছেড়ে দেয়নি কখনো সে। ক্লাস টেন পাস হয়ে গেলো ৮৭ শতাংশ মার্কস নিয়ে।
               ক্লাস ইলেভেনে উঠলো, সায়েন্স নিয়ে ভর্তি হলো। মা তো কোনোদিন ভাবেননি যে তার মেয়ে সায়েন্স নিয়ে পড়তে পারবে। যাইহোক পড়াশোনা চলতে লাগলো। সাথে আবার জয়েন্ট এন্ট্রান্স এক্সামের প্রস্তুতি। ক্লাস টুয়েলভ এও উঠে গেলো রিমো। না এবারে আর টেনে টুনে নয়, সেকেন্ড র‍্যাঙ্ক করে। মায়ের চোখের কোনায় জল দেখেছিল সেদিন,আনন্দের না অনুতাপের সেটা বোঝেনি রিমো। তারপর এলো সেই দিন যেদিন বহুদিনের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফসল হিসেবে আর বহু প্রতীক্ষিত জয়েন্ট এন্ট্রান্স এক্সামের ফল ঘোষণা হলো। রেজাল্ট দেখতে মা নিজে গেছে ক্যাফে তে। রোল নম্বরটা পুট করলো ক্যাফের লোকটি। র‍্যাঙ্ক শো করলো মেডিক্যাল -৩৪৫ ইঞ্জিনিয়ারিং - ৬৪৮।সেদিন আর মায়ের চোখের জল বাঁধ মানেনি, শুষ্ক মরুভূমিতে বৃষ্টির ধারার মত বেয়ে পড়েছিল। ঠাকুমা সেদিন খুব খুশি ছিলেন, মা কে বলেছিলেন তোমাদের মত পড়াশুনো জানিনা বাবা, কিন্তু এটুকু বুঝি যে বাচ্চাকে নিজের মতো করে বড়ো হতে দেওয়া উচিত, সময়ের সাথে সাথে সব ঠিক গুছিয়ে নেবে সে। মা সেদিন চুপ করে শুনেছিল। তারপর থেকে মা কোনোদিন পড়াশুনো নিয়ে রিমোকে বকাবকি আর করেননি, হয়তো আর বকার প্রয়োজন পড়েনি। সেদিনের ঘটনা মনে পড়লে আজও রিমোর চোখ ভিজে ওঠে। সম্ভবত সেটা আনন্দেরই অশ্রু।

সত্য ঘটনা অবলম্বনে।
--- ©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল✍️ ডা: অরুণিমা দাস

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল ✍️ ডা: অরুণিমা দাস বর্তমানে অতিরিক্ত কর্মব্যস্ততার কারণে একটু বেশি সময় কাজে দেওয়ার জন্য হয়তো একের প্রতি অন্য...