ব্রিচ ডেলিভারি
✍️ডা: অরুণিমা দাস
আজ থেকে বছর তিনেক আগেকার ঘটনা, তখন গাইনি তে হাউস স্টাফ শিপ করছি। লেবার রুম সরগরম থাকে সবসময়,তারপর টার্শিয়ারি সেন্টার বলে মেদিনীপুর মেডিক্যাল কলেজে নরমাল ডেলিভারির কেস অবদি রেফার হয়ে আসতো। একদিন ডিউটি করছি, হঠাৎ এক আশা কর্মী রুদ্ধশ্বাসে দৌড়তে দৌড়তে হাজির আমার কাছে। এসে কোনো রকমে একটু স্থির হয়ে বললো ম্যাডাম একজন প্রসূতি মাকে নিয়ে এসেছি, বাচ্চা উল্টো হয়ে আছে। হেলথ সেন্টারের লোকেরা বুঝতে পারেনি, তাই রেফার ও করেনি। আজ সকালে ইউ এস জি করার পর বোঝা গেলো বাচ্চা উল্টো আছে আর সকাল থেকে বাচ্চা নড়ছেনা বেশি। খুব ভয়ে আছে বাড়ীর লোকেরা। শুনে বুঝলাম ব্রিচ বেবী আছে। একটুও দেরী না করে বললাম নিয়ে এসো প্রসূতি কে।
নিয়ে এসে ভর্তি করা হলো প্রসূতি মা কে। তারপর পরীক্ষা করে দেখা গেলো সত্যই বাচ্চার পা নিচের দিকে আছে। জন্মদ্বার খুলে গেছে, আর বাচ্চা কিছুটা নেমেও এসেছে। সেই মুহূর্তে সিজার করা অসম্ভব ব্যাপার। সিনিয়র কে ফোন করায় বললো ফাইনাল ইয়ারে ব্রিচ ডেলিভারি পড়েছিলে তো? আমি বললাম হ্যাঁ, কিন্তু সেটা তো থিওরী, আর আজ তো প্রাকটিক্যাল। সিনিয়র বললো আমার আসতে এক দেড় ঘণ্টা লাগবে। তুই ব্রিচ ডেলিভারি কর। আমার তো ভয় লাগছে ভালোই, প্রকাশ তো করা যাবে না পেশেন্ট পার্টির কাছে।
প্রসূতি কে স্যালাইন আর প্রয়োজনীয় ওষুধ দিয়ে ফিল্ডে নেমে পড়লাম। সাথে সহকারী হিসেবে সিস্টার দিদিকে রাখলাম। একে একটা নতুন কাজ তার ওপর মাথার ওপরে কেউ নেই। প্রসূতি মা কে বললাম যখন বলবো নিচের দিকে চাপ দিতে,দেবে তখন। সে তো তখন যন্ত্রণায় কাহিল আর প্রচন্ড ঘামছে। আমিও ঘামছি,কিন্তু সেটা ভয়ে। যাইহোক পরের একঘন্টার চেষ্টায় সফল হয়ে ব্রিচ ডেলিভারি করলাম আর মেয়ে হয়েছিল,যায় ওজন ২.১ কেজি ছিল। আর মেয়ের মা আমার হাত ধরে বলেছিল আমাকে যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দিলেন, অনেক ধন্যবাদ আপনাকে দিদিমণি। আগে যেখানে ছিলাম,সেখানে কেউ দেখছিল না আমায়। আমি যন্ত্রণায় ছটফট করছিলাম। একটা সময় মনে হয়েছিল আর বোধহয় পারবোনা জীবিত বাচ্চা জন্ম দিতে। কিন্তু ভগবান আছেন দিদিমনি। উনার ইচ্ছায় আর আপনাদের চেষ্টায় আমার মেয়ে পৃথিবীর আলো দেখতে পেলো। আপনাদের সবার ভালো হোক। আমি তখন কপাল বেয়ে নেমে আসা ঘাম মুছতে মুছতে বললাম তোমাকেও অনেক শুভেচ্ছা, তোমার জন্য আমি আনকোরা একটা প্রসিডিওর করে ফেললাম তাও সিনিয়র ছাড়া।
ভালো থেকো, মেয়েকে ভালো করে মানুষ করো। আর গম্ভীর গলায় বললাম মেয়েকে পড়াশোনা করিয়ো অনেকদূর, তোমার মত কম বয়সে বিয়ে দিয়ে দিও না। সলজ্জ হেসে মেয়ের মা বললো হ্যাঁ দিদিমণি, মেয়েকে মানুষের মতো মানুষ করার চেষ্টা করবো। পরে ওর বাড়ির লোক আমাদের সবাই কে মিষ্টি আর সিঙ্গারা খাইয়েছিল। বেশ ভালো লেগেছিলো আমাদের সকলের, আর সিনিয়র ও সেই খাবারে ভাগ বসিয়েছিল যদিও সে সশরীরে উপস্থিত ছিলো না ডেলিভারির সময়ে,কিন্তু মানসিক কাঠিন্য বজায় রাখতে যথাযথ সাহায্য করেছিল।
সত্য ঘটনা অবলম্বনে😊
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন