বৃহস্পতিবার, ১১ মার্চ, ২০২১

# বিষয় - ছোটগল্প। #নাম- মায়ানমার। ✍ - মৃদুল কুমার দাস।


# বিষয় - ছোটগল্প।
 # নাম- 'স্বপ্নে  মায়নামার'
     ✍ - মৃদুল কুমার দাস।

ঋত্বিক খাসকিল। বয়স আর কত! ঐ বছর বারো। ক্লাস সেভেনে পড়ে। কৈশোর পেরিয়ে যৌবনের সন্ধিক্ষণে। তাই ভালো মন্দের জোর লড়াই লাগে মনে। এই বয়সের নিয়মটা তাই। মুখে মুখে তর্ক, স্যারদের পেছনে স্পাইগিরি করা...। ঋত্বিক অবশ্য একটু বেশ নিরীহ প্রকৃতির।
স্কুলের পড়াশোনা- পাঠ্যপুস্তক, সিলেবাস, ক্লাসে পজিশন নেওয়ার প্রতিযোগিতা এসব তার একদম ভালো লাগে না। ক্লাসে ফার্স্ট যারা হয় তাদের দেখলে খুব রাগ হয়। ওরা কেমন স্বার্থপর। বিদ্যাকে নিজের মধ্যে যেন কুঁদে কুঁদে রেখে দেয়। কেউ টেনে বের করতে না পারে,হাতিয়ে নিতে না পারে,একদম সিল করে রাখে। আর সদা পাহারায় থাকে। যথা সময়ে ভুর ভুর করে বের করবে। সে এক একটা স্বার্থের যত্ত ধাড়ি, সব এক একটা স্বার্থের ডিপো! আর কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে সে বলবে কি বলবে না, দ্বিধায় থাকে। যদি সর্বনাশ হয়। এদের এই কঞ্জুসি ভাব দেখলে ঋত্বিকের এমন রাগ তিরতিরিয়ে ওঠে, পারলে একটা কষিয়ে গাট্টা লাগায়।
আর এদের নিয়েই শিক্ষক ক্লাসে যত আদিখ্যেতায় মেতে থাকেন। শিক্ষকের প্রকৃত ভোজ্য এরা। শিক্ষকের যত জ্ঞানের খোরাক যেন। সে খোরাক গোপাল,সুবল,রাখাল মেটায়। আর এই ঋতমের মতো অধমদের নিয়ে গুরুকুল ভাবেন কিস্যু হবে না। 
শিবাস সিকদার বলে একজন অঙ্কের স্যার,সনাতন বিশ্বাস ভূগোলের,সন্দীপ শাসমল ইংরেজির... প্রত্যেকে ক্লাসে আসেন ওদের কাছ থেকে রেসপন্স পেয়ে ধন্য হয়ে চলে যান। বাকিরা যে পিছিয়ে পড়ল,মিডিওকার যারা তারা যে আধো আধো নিল,তাতে কোনো যায় আসে না।
তবে হ্যাঁ বলতে হবে বাংলার স্যার দিকমণি পাল বাবু! স্যার তো স্যার! ওনাকেই একটু স্যার স্যার মনে হয়। সবার জন্য কি দরদ! তবে ভাষার একটু 'র'~'ড়'~ 'শ'- এর দোষ আছে। ভেঁড়িকে ভেঁরি বলেন। রজনীকে যখন ড়জনী বলেন, নারীকে নাড়ী বলেন সত্যি পড়া উদোর পিণ্ডে বুধোর ঘাড়ে চেপে যায়। সবাই হাসে। কিন্তু আমার ভালো লাগে। ওনার মতো সবাইকে দরদ দিয়ে এপর্যন্ত কাউকে পড়াতে দেখিনি। 
  সবাইয ক্লাসে যেন চেয়ার, টেবিল,চক, ডাসটারের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে আসেন। কি যেন জ্ঞানের পাহাড়! আর দিকমণি স্যার কার কতটা দুর্বলতা ঠিক জানেন। সবার পড়ায় রেসপন্স পেলে তবে এগোন। আর তোদের হবে না এজাতীয় মন্তব্য করতে কোনোদিন শুনিনি। দিকমণি স্যারকে সকলের খুব পছন্দ। নামটাও বেশ! ঋত্বিকের তো সবার চেয়ে...
  দিকমণি স্যার বিভিন্ন টপিক্স নিয়ে রচনা লিখতে দেন। একদিন স্বপ্ন নিয়ে রচনা লিখতে দিয়েছেন। মায়নামার নিয়ে 'সন্দেশ' পত্রিকায় একটা গল্প পড়েছিল। সেই গল্প কি আর হুবহু স্বপ্নে আসবে। স্বপ্নে মায়নামার লেগেছিল এই যা। স্বপ্নে যা এসেছিল তাই রচনায় হুবহু তুলে দিল ঋত্বিক। 
    স্বপ্নে ঋত্বিক দেখছে ঋত্বিকের মায়নামারে এক কাকু থাকেন। পূজোর ছুটিতে বেড়াতে গেছে ঋত্বিক। কাকুর কাছে গল্পটা শোনা।
ময়মনসিংহ থেকে এক ব্রাহ্মণ যুবা গেছে চাকরির খোঁজে। শিক্ষিত মোটামুটি। কি করে কাকুর ঠিকানা জোগাড় করেছে। সটান হাজির কাকুর কাছে। বলে কয়ে একটা চাকরি যদি করে দেন এই ব্রাহ্মণ সন্তানের উপকারের জন্য। পুণ্য হবে আপনার। কাকু এমনিতেই একটু ধর্ম-ভীরু মানুষ। শালকাঠের কারবারীদের সঙ্গে বেশ আলাপ আছে। এদেশীয় হিন্দু রমেশ তালুকদারের কাঠগোলায় একটা চাকরি জুটিয়ে দেন। হিসাব রক্ষকের। বেতন প্রথম প্রথম হাজার খানেক। খাওয়া দাওয়া ফ্রি। তাতেই সই। মাথাতো গোঁজা যাক।
চাকরির সাথে সাথে দু'চারটা ছেলে বাড়ি বাড়ি পড়ানো ধরে। উপরি রোজগার। বছর খানেক পরে কাকুর সঙ্গে ব্রাহ্মণ যুবার দেখা। তাকে দেখেই চেনাই যাচ্ছে না, যদি না চেনায়। মাথায় লম্বা টিকি। পরণে সাদা কাপড়, গায়ে নামাবলী,খালি পা। কাকুকে পেছন থেকে কে যেন ডাকতে,পেছন ঘুরে দেখে ত কাকু থ।

   "হ্যাঁ আমি শঙ্কর হালদার। চিনতে পারছেন।" চোখে মুখে বড়ই উচ্ছ্বাস!

"চিনলাম তো বটে। হঠাৎ এই পোশাকে?" অবাক হয়ে কাকু জিজ্ঞেস করলেন।

"আর বলবেন না। ঐ হাজার টাকায় পোষায় বলুন। এখানে কয়েক ঘর যজমান পেয়েছি। পূজো আচ্চা করে নেহাৎ মন্দ আসছে না।" বেশ সপ্রতিভ লাগে।

কাকু কাজের তাড়ায় হনহনিয়ে চলে যান সেদিনের মত। বছর তিনেক পরে কাকু মায়নামার থেকে আরো উত্তরে শ'খানেক কিলোমিটার দূরে এক কাঠ ব্যাবসায়ী সুরেশ খাস্তগীরের মেয়ের বিয়েতে আমন্ত্রিত হয়ে গেছেন দিন দু'য়েকের জন্য। 
হঠাৎ রাস্তায় পেছন থেকে কে যেন ডাকছে আকুল হয়ে-

"ও বিশ্বেশ্বর বাবু,ও বিশ্বেশ্বর বাবু।"

পেছন ফিরে তাকিয়ে পুরু চশমা হাত দিয়ে নাকের ডগা থেকে একটু তুলে ভালো করে দেখেও চিনতে পারছেন না। আর এই এতো দূরে এমনভাবে ডাকছে প্রাণের আবেগে, এতো গভীর সম্পর্কের কেউ তো থাকার কথা নয়। কাকুতো বেশ ধন্দে পড়ে গেলেন। অবাক চোখে তাকিয়ে। তার উপর মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ, এ তো কস্মিনকালেও চেনা জানা হতেই পারে না। 

"চিনতে পারছেন না। আমি সেই শঙ্কর হালদার।" হাসি ধরে না।

"সে কি! এ আবার কি দেখছি! এখানে,এই বেশে!" 

"অবাক হয়ে গেছেন তো। ওখানে রোজগারপাতি ঠিক পোষাচ্ছিল না। একদিন এক রহিম চাচার হাত ধরে এখানে চলে আসি। তিনি ইব্রাহিম হোসেনের মাংসের দোকানের কাজে লাগিয়ে দেন। দোকান দেখাশোনা করা,হিসেব পত্র দেখার জন্য মালিক বেশ ভালই বেতন দিচ্ছিল। একদিন ইব্রাহিম পেটের ব্যামোতে পড়ল। পেটে আলসার নিয়ে শয্যাশায়ী থেকে কবরে চিরনিদ্রায় চলে গেল। শেষে তার বিধবা স্ত্রীকে বিয়ে করে এখন ব্যবসা চালাচ্ছি। ধর্মান্তরিত আমি। ভালোই পয়সার মালিক এখন। ছাগল,ভেড়া,শূয়োর সব নিজের হাতে কাটি। কেবল গরু কাটতে এখনো সড়গড় নই। সাহায্য নিতে হয়।" কি গড়গড়িয়ে নিজের কথা পরম আহ্লাদের সঙ্গে বলে গেল সেক মইনুদ্দিন ওরফে শঙ্কর।

"বামুনের ছেলে হয়ে কসাই হলাম কী করে ভাবছেন তো? প্রথম প্রথম অসুবিধা হচ্ছিল। পয়সা সব একাকার করে দিল। দড়ি ও দাঁড়ির কি তফাৎ আজো বুঝতে পারিনি। মানুষ যে আমি এটুকু মানি। ধর্ম দিয়ে অত্যাচার মনে হয়- ধর্মের জন্য মানুষ, না মানুষের জন্য ধর্ম - দুটোই পরখ করে দেখলাম। জানেন দারুন লাগল।"

"তা বেশ বলেছ। মানুষের জন্মানোর পরে সংস্কার নিয়ে চলার মধ্যে কত কান্ড করে দেশ জাতি উদ্ধার করে শেষে মাটিতেই মিশে যায়। সবাই একা এসেছে নাঙ্গা হয়ে, যাবে একা নাঙ্গা হয়ে। মাঝখানে শুধু বাছবিচার মানুষে মানুষে কেবল তফাৎ!" কাকু তার মঙ্গল কামনা করে বিদায় নেন।
এই পর্যন্ত এসেই স্বপ্নে ভেগে যায়। 
  এই রচনা পড়ে দিকমণি স্যার তিড়িং করে লাফিয়ে উঠলেন। গোটা স্টাফ রুমে সকল স্যারেদের পড়ে শোনান। রীতিমত ঋত্বিকের দর বেড়ে গেল। দিকমণি স্যারের প্রশংসা শুনে ঋত্বিক বলেছিল - 

"মায়নামার নিয়ে আরেকটা স্বপ্ন আছে স্যার।" খুব উচ্ছ্বাসের সঙ্গে বলে।

দিকমণি স্যার বলেন - 

" তুমি কি শুধু মায়নামার নিয়ে স্বপ্ন দেখ? তা আরেক দিন লিখে দিও। নাম দিও -
           ' স্বপ্ন মায়নামার - ২' 

             ***********
@ কপিরাইট রিজার্ভ ফর মৃদুল কুমার দাস। 
  

১৮টি মন্তব্য:

  1. খুব ভালো লাগলো 👌👌👌💐💐💐

    উত্তরমুছুন
  2. খুব ভালো লাগলো 👌👌👌💐💐💐

    উত্তরমুছুন
  3. খুব ভালো লাগলো 👌👌👌💐💐💐

    উত্তরমুছুন
  4. অসাধারণ ভাবনা।স্বপ্ন সত্যি হোক।পৃথিবীর বুকে ভেদাভেদ ভুলে মানুষ থাকুক সুখে।

    উত্তরমুছুন
  5. অসাধারণ ভাবনা।স্বপ্ন সত্যি হোক।পৃথিবীর বুকে ভেদাভেদ ভুলে মানুষ থাকুক সুখে।

    উত্তরমুছুন

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল✍️ ডা: অরুণিমা দাস

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল ✍️ ডা: অরুণিমা দাস বর্তমানে অতিরিক্ত কর্মব্যস্ততার কারণে একটু বেশি সময় কাজে দেওয়ার জন্য হয়তো একের প্রতি অন্য...