বৃহস্পতিবার, ৪ মার্চ, ২০২১

মা-মেয়ে (কথপোকথন) ✍️নন্দিনী তিথি

 


তাং ১৭ - ২ - ২১

সময়ঃ ৯:১০ pm

--- good evening রে তিথি।তোর কি খবর বলতো! সেই ১০

তারিখ তোর সাথে কথা হলো। আর তোর কোনো খবরই নেই।

একটা গুড মর্নিংও পাঠাস না।

--- সরি! পি.মণি। দেখলাম তোমরা ভ্রমণে বেরিয়েছো।ভ্রমনটা

উপভোগ করে এসো আনন্দ করে তারপর নাহয় তোমার 

ভ্রমণকাহিনী শুনবো, এইভেবে তাই তোমাকে আর বার্তা 

পাঠাইনি পি.মণি।

--- ও বাবা! আমার পাগলি মেয়েটা কত বোঝে,কত বড় হয়ে 

গেছে।

--- হুম।পি.মণি এখন রাখছি আমার একটা ক্লাস আছে।

তোমার সাথে পরে কথা বলি।

---ঠিক আছে। যা ক্লাস কর।

তাং ১৯ - ২ - ২১

সময়ঃ ১০:৪৪ am

--- তোমার মাথার অবস্থা কি?এখন কেমন আছো?

--- নারে ! আর বলিস না Backpain এর মতো এই আঘাতটাও

মাথায় চেপে বসে আছে।এ আঘাত আর ঠিক হবেনা বোধহয়!

--- ধুর! কি বল।একটু চোট বেশি লেগেছে তো তাই সারাতে

তো কয়দিন সময় নিবে।তুমি একদম ওসব বাজে ভাবনা নিয়ে

বসে থেকো না তো।

--- হ্যাঁ রে তুই ঠিকই বলেছিস রে তিথি।

--- এখন বলো খাবার খেয়ে ঔষধ খেয়েছো?

--- খেয়েছি।তুই খেয়েছিস?

তোর শরীর ঠিক আছে  তো,ভালো আসিস তো তুই?

--- হ্যাঁ খেয়েছি।

আর আজ অনেকটা সুস্থ পি.মণি।

--- দেখেছিস দু'দিন কথা হয়নি বলে নিজে অসুস্থ হয়ে বসে আছিস।আরও তোর পি.মণি কে জানানোর চিন্তাও করলি না

একবার। তিথি তোর কি হয়েছে? আমাকে তুই জানালি না 

কেন?

---সরি পি.মণি। ১৪ তারিখ ডাক্তার দেখাতে যেতে হবে বলে 

 ভোরেই উঠে গেলাম।ফ্রেশ হয়ে পরিবারে সবাইকে বসন্তের 

 শুভেচ্ছা  জানালাম।ব্যস্ততার কারণে সবাইকে আলাদাভাবে 

 শুভেচ্ছা জানানোর সময় পাইনি।তো রেডি হয়ে বাসা 

থেকে বের হয়ে মেডিক্যাল এ পৌঁছালাম।

--- আচ্ছা ভালোভাবে পৌঁছাতে পারছিলি তো। না, রিকশায় 

বসে ঘুমিয়ে পড়েছিলি আবার?

যে ভোরে উঠেছিস তোর কি ঘুম ভেঙেছিল বল তো আমায়!

--- হা হা হা হা,  না পি.মণি রিকশায় ঘুমোয়নি।কিন্তু টিকিটের

জন্য সিরিয়ালে দাঁড়াতে দাঁড়াতে পুরো পা অবশ হয়ে 

যাচ্ছিলো।বহু অপেক্ষার পর টিকিট হাতে পেলুম।এরপর 

আবার সেই ডাক্তারের কাছে গিয়ে পুরো সিরিয়াল। 

সারাদিনটাই দাঁড়াতে দাঁড়াতে চলে গেল।

--- আহারে,তোর খুব কষ্ট হয়েছে না তিথি।

--- হ্যাঁ হয়েছে।কিন্তু  কষ্টটাকেও বেশ ক্লান্তিমখা হাসির সাথে

উপভোগ করেছি।ক্লান্তির শরীর নিয়ে বাসায় পৌঁছে দিলাম

এক ঘুম।

--- কেন! কিছু না খেয়েই ক্লান্ত শরীরে ঘুম দিলি?

--- না রে, না খেয়ে ঘুমালে ঘুমটা ভালো হয় আমার।

--- ওরে আমার পাগলি মেয়েটার কথা শোনো দেখি।

--- হ্যাঁ রে পি.মণি।আমি দুপুরের খাবার ঘুম থেকে উঠার

পরই খাই।

--- দেখিস তিথি এমন করলে আবার যেন শরীর খারাপ করে

না বসে তোর।

---না ওসব কিছু হবে না।

তো ঘুম থেকে উঠে খেলাম।খেয়ে এসে ফোনটা অন করলাম।

নেট অন করে "আজ বসন্ত পরিবারে কত মজা করবো" এই

ভাবতে ভাবতে পরিবারে ঢুকলাম।ঢুকেই দেখি কাকাই এর 

মেসেজ- "পলো আর আমাদের মাঝে নেই মোবাইল ওর

জীবন কেড়ে নিয়েছে।" প্রথমে ভাবলাম ফোন বোধহয় hung

হচ্ছে বারবার তাই পি.মণি বার্তা করছে না।এরজন্য বুঝি

কাকাই এসব লিখছে।

আবার পড়লাম কাকাইয়ের মেসেজ।পড়ে মনকে আর ভাবতে

না দিয়ে চোখ অঝোর ধারায় অশ্রু দিতে লাগলো রে পি.মণি।

দিদি এসে ডাক দিয়ে বললো এই তোর কি হয়েছে?

"আমাদের পরিবারে" এইটুকু শুধু বলতে পারছিলাম আর 

কিছু বলতে পারিনি।দিদি হাত থেকে ফোনটা নিয়ে দেখলো।

--- আর তুই বোকার মতো কাঁদছিলি! 

--- না পি.মণি আমি একদম কাঁদতে চাইনি। কিন্তু চোখ সে

অশ্রু ঢেলেছিল অঝোর ধারায়। 

এমন অবস্থা দেখে দিদি বাইরে নিয়ে গিয়েছিল মনটা একটু

ফ্রেশ হবে এই বলে।কিন্তু আমি চোখকে কিছুতেই আটকাতে

পারছিলাম না।

অবশেষে দিদি আবার বাসায় নিয়ে এলো।

নে কিছু খেয়ে শান্ত হয়ে ঘুম দিবি।সামনে খাবারটা দিল।কিন্তু

আমার গলা থেকে কিছুই নামতেছিল না। প্লেটে জল ঢেলে

উঠে যাই।দিদি এসে মশারীটা টানিয়ে দিয়ে বলে একটু শান্ত

কর না মনটকে, একটু ঘুমানোর চেষ্টা কর না তিথি।

কোনো কথা বেরোলো না মুখ থেকে।মোবাইলের নেট অন

করে পরিবারে ঢুকে বসে থাকলাম।সবার মেসেজ পড়তে 

পড়তে সারা শরীর পাথর হয়ে যাচ্ছিলো।তবুও চোখের জল

পাথর হয়নি পি.মণি।

২টা প্রায় বাজতে চললো তখনও চোখের পাতা বন্ধ হলো না।

অশ্রুকে বাধ দিতে পারলো না।পনেরো বিশ মিনিট যেতেই

সারা শরীর কাঁপা শুরু করলো।উঠে কোনমতে বাথরুমে যাই

গিয়ে সব ঢেলে দেই বমি করো।কোনমতে বাথরুম থেকে 

বিছানায় এসে শুলাম।ভাবলাম এবার ক্লান্ত শরীরে চোখের

পাতা দুটি বুজে আসবে।নাহ্ পি.মণি আবার উঠে বাথরুমে

গেলাম বমি করে ঢেলে দিলাম।বুঝেছিলাম আর বোধহয়

বাথরুম থেকে বেরোতে পারবো না।কিভাবে যে বিছানায় এসেছিলাম তা শুধু আমিই জানি।

--- হ্যাঁ রে মাথা ঘুরিয়ে পড়ে যাসনি এই রক্ষে।

--- ঠিক বলেছো পি.মণি  ঈশ্বরই বোধহয় আমাকে বিছানা 

 পর্যন্ত আসতে সাহায্য করেছিলো।শুধু শ্বাস টুকই নিতে 

পারছিলাম পুরো হাত-পা অবশ  হয়ে গিয়েছিল।

--- কেউ টের পায়নি তোর এমন অবস্থা?

---নাহ্, কেউ টের পায়নি।আর আমারও কাউকে ডাক দেয়ার

কোনো শক্তি ছিল না পি.মণি।

এরপরে ভোররাত্রে আসলো ধুমছে জ্বর।সারাদিন আর 

বিছানা থেকে উঠার জোর ছিল না।সারা শরীর ব্যাথায় 

ধরেছিল।

--- ওরে তিথি তুই এমন অসুস্থ আমাকে একবার জানালিও না।

--- কিভাবে জানাবো পি.মণি।সবার মেসেজ পড়ে পড়ে আমি

বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম।তোমার তিথির মন একবারের

জন্যও ভাবেনি যে তোমার কিছু হতে পারেনা।তুমি ঠিক আছো

তোমার মাথায় একটু বেশি চোট লেগেছে। 

--- তোর পি.মণি তোদের ছেড়ে কোথাও যেতে পারেনা তা 

তুই জানিস না।কিছু না ভেবেই বোকার মতো কেঁদে চললি

সারাদিন রাত!কেঁদে কেঁদে জ্বরটাও বাধিয়ে নিলি।পাগল 

একটা।

তো এখন বলুন তো আপনি কিভাবে একটু শান্ত হয়েছিলেন?

--- জ্বর টা একটু কমার পরে পিশে কে কল করি। পিশে

সবকিছু বুঝিয়ে বলে।তুমি ঠিক আছো।মাথায় একটু চোট

লেগেছে বেশি তাই দু-তিন দিন পর ছাড়া হাসপাতাল থেকে 

বাসায় ফিরতে পারবে না।

তারপর তো তুমি মেসেজ করলে good evening বলে।

---আচ্ছা আপনাকে আর টেনশন করতে হবে না আমার জন্য

আমি ঠিক আছি।কাল বাসায় ফিরবো।আর আপনার সাথে

প্রতিদিন কথা হবে।না হলে আবার কেঁদে কেঁদে কিছু একটা

বাধিয়ে বসবেন।

আর হ্যাঁ শোন তিথি তুই ঢাকায় আসলেই কিন্তু আমার জন্য

খেজুরের রস নিয়ে আসবি।

---হ্যাঁ তা আর তোমাকে বলতে হবে না।মা'কে বলে তোমার 

জন্য মিঠা তৈরি করে রেখেছি।

তুমি ভাপা পিঠে খাবে খেজুরের রস দিয়ে।আর তোমার তিথি

তোমার জন্য সেই রস নিয়ে আসবে না সেটা কি হয় বল!!

আমি কিছুদিন পরেই ঢাকায় আসবো। আর তোমার সাথে

দেখা হবে কি যে আনন্দ হচ্ছে কি বলি।

--- এখন বলতো তোর পুরোপুরি জ্বর সেরেছে তো তিথি।

--- হ্যাঁ তুমি চিন্তা করো না একদম।আমি পুরো সুস্থ হয়ে যাবো

পি.মণি। আচ্ছা পি.মণি একটা কথা বলবো?

--- হ্যাঁ, বল।

--- তুমি তো বলেছিলে পূজোর সময় ইন্ডিয়াতে যাবে।

চলো না আমরা সামনে ঈদের ছুটিতেই যাই।

--- হ্যাঁ তিথি তুই ঠিকই বলেছিস।

--- আচ্ছা  পি.মণি আমরা কত মন ইলিশ মাছ নিবো।

--- হা হা হা কত মণ!! যা নিবো তোর মাথায় সব চাপিয়ে দিবো।

--- হ্যাঁ, আমি, তুমি,ঈশিতা দি,ক্যালভিন আঙ্কেল এই চারজনে

মিলে তো এক মণ নিতেই পারবো তাইনা বল।আর 

ভাইয়োটাকে সারাপথ চকলেট ধরিয়ে হাঁটাবো।

--- কেন রে তোর চকলেট লাগবে না?পরিবারে তো কেউ

চকলেট না দিলেই  তোর অভিমান হয়।

--- নাহ্ এবারে একবারে ইন্ডিয়াতে পৌঁছে সবার কাছ থেকে

চকলেট খাবো।

--- আচ্ছা তাই হবে।

এখনও ঈদ আসতে অনেক দেরী আছে রে তিথি।আগে তুই

ঢাকা আয় আমার জন্য রস নিয়ে।শীত চলে গেলে ভাপা 

পিঠা খেতে ভালো লাগেনা।

--- ঠিকই বলেছো।কিন্তু এখন তো বসন্ত।তবুও তুমি চিন্তা 

করো না।শীত এখনও বিদ্যমান।

--- আচ্ছা তাড়াতাড়ি চলে আয় তিথি।তোকে দেখিনা কতদিন 

হয়ে গেছে।

--- হুম এইতো ক'দিন পরেই তোমার কাছে চলে আসবো।

--- হ্যাঁ রে আয়।তোকে এবারে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে নিয়ে

আসবো তিথি।

--- ঠিক আছে তাই হবে।

ও পি.মণি এখন আসি আমার একটু পড়তে বসতে হবে

--- আচ্ছা পড়তে বস।আর স্নান করিস না বেশি পুরো সুস্থ

হয়ে নে তারপর করবি।

--- ওকে। গুড ডে পি.মণি।

 Copyright ©All Rights Reserved Nandini Tithi.

৫টি মন্তব্য:

  1. তোর লেখা পড়ে আমার চোখে জল এসে গেল। অসাধারণ! 👌👌👍👍❤❤❤

    উত্তরমুছুন
  2. অনেক কষ্টে একটা শক্ত বাঁধ দেওয়ার চেষ্টা করছিলাম রে তিথি।তুই প্রবল আবেগে সব বাঁধ ভেঙে আমার চোখের দুকূল প্লাবিত করলি।

    উত্তরমুছুন

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল✍️ ডা: অরুণিমা দাস

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল ✍️ ডা: অরুণিমা দাস বর্তমানে অতিরিক্ত কর্মব্যস্ততার কারণে একটু বেশি সময় কাজে দেওয়ার জন্য হয়তো একের প্রতি অন্য...