মঙ্গলবার, ৯ আগস্ট, ২০২২

জীবন শুধুই গতিময় ✍️ ডা: অরুণিমা দাস

জীবন শুধুই গতিময় 
✍️ ডা: অরুণিমা দাস

এই জগৎ স্থিতিশীল নয়। অনন্তকাল ধরে এটি চলবে মহাকালের গতি যেদিন থেমে যাবে সেদিন ঘটবে মহাপ্রলয়। এই যাত্রা পথে আমাদের জীবনও তাই এবং ভবিষ্যতেও গতিশীল। গতিশীলতার মধ্যেই ফুটে ওঠে জীবনের লক্ষণ। সংগ্রাম পূর্ণ আমাদের জীবন। জীবনে বেঁচে থাকতে হলে কাজের প্রয়োজন। কর্মই মানুষকে গতিশীল রাখে। অলস মানুষেরা সমাজে জীবন্মৃত অবস্থায় পড়ে থাকে। স্রোতস্বিনী নদীর জলের বয়ে চলার জন্য সেখানে শেওলা জমাতে পারে না। কিন্তু স্রোতহীন নদী শেওলায় ভরে যায় এবং এতে জল নষ্ট হয়ে ব্যহারের অযোগ্য হয়। তেমনি কর্মময় জীবনই হচ্ছে জীবন। কর্মহীন জীবন মৃত্যুর নামান্তর। এ পৃথিবী হচ্ছে এক বিরাট রণক্ষেত্র। সংগ্রাম করে,যুদ্ধ করে এখানে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হয়। ডারউইন বলেছেন, "প্রকৃতির জগতে যে অধিকতর যোগ্য সেই টিকে থাকবে।" অথাৎ পৃথিবীতে বাঁচতে হলে, টিকে থাকতে হলে সংগ্রাম করেই টিকে থাকতে হবে। দৃষ্টি রাখতে হবে সামনের দিকে, পেছনের দিকে নয়। চিন্তা,চেতনায় যারা অগ্রসর তারাই এগিয়ে যায় প্রগতির পথে আর তারাই আনে বিবর্তন, সৃষ্টি করে নতুন সভ্যতা। মানুষের কল্যাণের জন্য তারাই আবিষ্কার করে নতুন নতুন উপাদন। আর যারা কর্মহীন তারা জড় পদার্থের মত অচল। এরা কোন উপকারেই তো আসেই না বরং অপরের চলার গতিকে ব্যাহত করে। তাই এরা যেমন উপেক্ষিত তেমনি অবাঞ্চিত।
কর্মহীন জীবন কোন মানুষেরই কাম্য হতে পারে না। এতে করে মানুষ অচল ও অসাড় হয়ে পড়ে। কাজই মানুষের জীবনে আনবে গতি। যে গতিতে মানুষ জীবনের অর্থ খুঁজে পাবে। এগিয়ে চলাই জীবন, থেমে যাওয়া যে মরণ। 
ছোট্ট একটা গল্প দিয়ে শেষ করবো। এক মেয়ের গল্প যে ফার্স্ট ইয়ার এমবিবিএস এ এনাটমি বায়োকেমিস্ট্রি আর ফিজিওলজি দেখে ঘাবড়ে গেছিলো, ভেবেছিল মেডিক্যাল পড়া ছেড়েই দেবে। ভয়ে কোনো ক্লাসে যেত না। ফল স্বরূপ ফাইনাল এক্সাম এনাটমি, বায়োকেমিস্ট্রিতে সাপ্লি পেলো। বন্ধুরা দূরে সরে গেলো। ম্যাডাম দেখা হলে বলতো এই যে দুটো সাবজেক্টে ফেল করলি পোস্ট গ্রাজুয়েট এন্ট্রান্স এক্সাম দিতে অসুবিধে হবে। ফাইনাল ইয়ারে চারটে সাবজেক্ট। কি করে পাস করবি? মুখে ক্রুর হাসি। চুপ করে সব কথা হজম করেছিল মেয়েটি সেদিন। বন্ধুরা সব সেকেন্ড ইয়ারে উঠে গেছে। প্যাথলজি, মাইক্রোবায়োলজি, ফার্মাকোলজি পড়া শুরু করেছে আর সে! তখনি এনাটমি আর বায়োকেমিস্ট্রির মাঝে স্যান্ডউইচ হচ্ছে প্রতিদিন। তিনমাস পর সাপ্লি এক্সামের ডেট এলো। পরীক্ষা দিয়ে এলো কোনো রকমে। দুটো সাবজেক্টের ম্যাডাম গম্ভীর ভাবে পরীক্ষা নিলো। পাস না ফেল কিছু বোঝা গেলো না। যাইহোক কোনো রকমে পাস হলো সে সাপ্লি এক্সামে। এদিকে সেকেন্ড ইয়ারে তিনমাসে তখন ক্লাস অনেক এগিয়ে গেছে। কেউ কেউ কোলকাতা গিয়ে কোচিং নিচ্ছে। মেয়েটি কলেজেরই এক স্যারের কাছে প্যাথলজি কোচিং নিতে ভর্তি হলো। বাকি সাবজেক্ট নিজেই পড়তো। হাল ছেড়ে দেয়নি কোনোদিন সে। মোটামুটি যখন প্যাথলজিটা আয়ত্ত করেছে স্যার বললেন এক্সট্রা নোটস দেবো, পড়তে পারবি? কোনোকিছু না ভেবেই হ্যা বলে দিলো মেয়েটি। প্যাথলজি প্রাকটিক্যাল খাতায় যে স্লাইড গুলো  আঁকতো মেয়েটি স্যাররা ভেরি গুড বলতেন। সাইন করে গুড লিখেও দিতেন। দিন এমন এলো যে একটা সাপ্লি পাওয়া মেয়ের কাছে বেশি মার্কস নিয়ে পাস করা বন্ধুরা আসতো স্লাইডের ছবি কারেক্ট করাতে। সেকেন্ড ইয়ারে ওই ল্যাগ যাওয়া তিনমাসের পড়া পড়ে পাস করতে কোনো কষ্ট হয়নি সেরকম। কারণ মেয়েটি কোনোদিন থেমে থাকেনি। বায়োকেমিস্ট্রি ম্যাম আবার খোজ নিয়েছিলেন মেয়েটি ফার্মাকোলজিতে পাস করেছে কিনা! কারণ ওনার ধারণা ছিল বায়োকেমিস্ট্রি তে ফেল করলে ফার্মাকোলজি তে ফেল অবধারিত। এরকম সব টিচার হলে কী আর বলা যায়!
যাইহোক এরপর আর কোনো সাপ্লি জোটেনি মেয়েটির ভাগ্যে। প্রতি ইয়ারে ফাইনাল এক্সামে স্যার ম্যাম সবাই জিজ্ঞেস করতেন মেয়েটিকে, "তোকে সাপ্লি কে দিয়েছিলো রে?" মেয়েটি হাসি মুখে এড়িয়ে যেতো সেই প্রশ্ন। ফাইনাল ইয়ার পাস করে ইন্টার্নশিপ শেষে যখন গাইনি তে হাউসস্টাফশিপ করতে ঢুকলো মেয়েটি,গাইনির স্যার বলেছিলেন একি কাজ পারবে? মনে হয় না খুব ভালো কাজ পারবে! এরপর একবছর হাউস স্টাফ শিপ শেষে সেই স্যারই বলেছিলেন আরো তিনটে মাস রিনিউ করে এই ইউনিটে থেকে যা না! মেয়েটি নাকচ করেছিল পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন এক্সামের প্রিপারেশন নেবে বলে! তারপর লড়াই করে পোস্ট গ্রাজুয়েশন এন্ট্রান্স এক্সাম ক্লিয়ার করার পর একদিন কলেজে আন্ডার গ্রাজুয়েট ডিগ্রী সার্টিফিকেট আনতে গিয়ে সেই বায়োকেমিস্ট্রি ম্যামের সাথে দেখা। ম্যাম রেজাল্ট জেনেছিলেন কোথাও থেকে। চলে যাচ্ছিলেন মুখ লুকিয়ে। মেয়েটি গিয়ে প্রণাম করে বলেছিল "ভালো আছেন ম্যাম?" ম্যাম বললো হ্যা রে! তোর এমডি ক্লাস কবে থেকে শুরু হবে? কোন কলেজ হলো জানাস। সেদিন আর ক্রুর হাসি নেই ম্যামের মুখে। অনুতাপের ছোঁয়া লেগেছিল মুখে। সেদিন ম্যামকে ক্যান্টিনে নিয়ে গিয়ে মিষ্টি খাইয়েছিল মেয়েটি। আজও ম্যাম ফোন করলে হাসি মুখে কথা বলে মেয়েটি,এটাই যে ভদ্রতা। যে ম্যাম একদিন সাপ্লি নিয়ে হেসেছিল সে আজ বলেন বাবু এরপর সুপার স্পেশালিটিটা করতে হবে! তুই পারবি। লড়াই চালিয়ে যাবি, হাল ছেড়ে দিবি না কিন্তু। মেয়েটি বলে চেষ্টা করবো ম্যাম,জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত লড়াই করে যাবো,বিশ্রাম নেবার জন্য স্থির সময় তো ভগবান ঠিক করে রেখেছেনই! ম্যাম চুপ করে শোনেন সে কথা। 
"চলুক লড়াই জীবনে প্রতিপদে এগিয়ে যাওয়ার
বিশ্রামের জন্য মাটির নিচে জায়গা করা আছে সবার।"

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল✍️ ডা: অরুণিমা দাস

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল ✍️ ডা: অরুণিমা দাস বর্তমানে অতিরিক্ত কর্মব্যস্ততার কারণে একটু বেশি সময় কাজে দেওয়ার জন্য হয়তো একের প্রতি অন্য...