বৃহস্পতিবার, ১১ আগস্ট, ২০২২

হাসির আড়ালে শিরোনাম_ জীবন সংগ্রাম. ✍️ ডা: অরুণিমা দাস


হাসির আড়ালে
শিরোনাম_ জীবন সংগ্রাম
✍️ডা: অরুণিমা দাস

সার্জারীতে ইন্টার্নশিপ চলছে তখন। প্রথম দিনই নাইট ডিউটি পড়েছে। সিনিয়র দের কাছে শুনেছি রাতে বেশির ভাগ খারাপ পেশেন্ট আসে। মাতাল থেকে শুরু করে সব রকমের পেশেন্ট, কারোর মাথা ফাটা তো কারোর হাতে পায়ে স্টিচ লাগবে। আর বেশির ভাগ লোকের হুশ থাকে না, অভব্য ব্যবহার ও করে অনেক লোক। প্রথম দিন, বলা ভালো প্রথম রাতে ডিউটি তে গেছি বেশ ভয় নিয়েই, কো ইন্টার্ন বললো শোন আমার রাতে তিন ঘণ্টা অফ লাগবে। কি রাজকার্য করবি শুনি? বললো আমার নামাজ পড়তে যেতে হবে। মনে মনে বললাম হতচ্ছাড়া। মুখে বললাম যাস,কিন্তু খারাপ পেশেন্ট এলে কী করবো? বললো স্বপন দাকে ডেকে নিস এসে হাসি মুখে সব সামলে দেবে। স্বপন দা কে রে? গ্রুপ ডি দাদা আমাদের ওয়ার্ডের, ভালো মানুষ খুব। কথা বলতে বলতেই ডিউটি রুমের দরজায় কড়া নাড়ল কেউ। খুলে দেখি একজন রোগা মত লোক দাঁড়িয়ে আছে এক মুখ হাসি নিয়ে। বুঝলাম ইনি স্বপনদা। ঢুকে বললো ম্যাডাম স্যার নতুন পেশেন্ট এসেছে। গেলাম ওয়ার্ডে, একটা ছেলে হাত কেটে ফেলেছে কাজ করতে গিয়ে,তাই স্টিচ করাতে এসেছে। স্টিচ করে ড্রেসিং করে ছেড়ে দিলাম ওকে। তারপর ওয়ার্ডে পেন্ডিং কাজ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। সিস্টার দিদিরা নিজেদের মধ্যে গল্প হাসি ঠাট্টা করছিল। কথায় কথায় স্বপনদার প্রসঙ্গ আসাতে একজন সিস্টার বলে উঠলো মানুষটা এত হাসি খুশি থাকে,সবাইকে ভালো রাখতে চেষ্টা করে, রোগীদেরকে ভালোবাসে কিন্তু একবুক কষ্ট ওনার জমে আছে যা কমার নয় কোনোদিন। জিজ্ঞেস করলাম কি হয়েছিল দিদি? বললেন স্বপনদার ছেলে দুটো যখন বেশ ছোটো, তখন ওনার স্ত্রীর ক্যান্সার ধরা পড়ে। অ্যাডভান্সড স্টেজ ছিল, মাস ছয়েক উনি বেঁচে ছিলেন। তারপর ছেলে দুটোকে নিয়ে একার লড়াই শুরু হয় ওনার। শতকষ্টের মধ্যে দিয়ে গেলেও কোনোদিন দ্বিতীয় বিয়ের কথা ভাবেননি যদি নতুন কেউ এসে সংসারে ভাঙন ধরিয়ে দেয়। হাসি মুখে ঘরে বাইরে লড়ে গেছেন। এখন ছেলে গুলো বেশ বড়ো হয়েছে, একজনকে ওষুধের দোকান করে দিয়েছেন আর একজন কলেজে পড়ে। শুনে বেশ খারাপ লাগছিলো, জীবন যে কখন কাকে কোথায় নিয়ে যাবে কেউ জানেনা। এসব গল্প গুজব করতে করতে নেক্সট পেশেন্ট এসে হাজির। সাথে সাথে স্বপনদাও হাজির হাসি মুখে। পেশেন্ট ছিলো মাতাল, বাইক থেকে পড়ে গিয়ে হাত পা কেটেছে, ভুলভাল বকছেও। উঠে গিয়ে আগে পেশেন্টের মাথায় চোট আছে কিনা দেখলাম। সাথে আসা লোক দুটো বলে উঠলো আগে হাত পা দেখ, পরে মাথা দেখিস। আমি কিছু বলার আগেই স্বপন দা বলে উঠলো আগে ঠিক করে কথা বলুন নয়তো আপনার রোগী কে দেখা হবে না। তখন চুপ করলো তারা। একটা সি টি স্ক্যান এডভাইস দিয়ে আর ড্রেসিং করে ডিউটি রুমে এলাম। কো ইন্টার্ন তখন নামাজ পড়ে ফিরে এসেছে। বললাম স্বপন দা মানুষটা বেশ ভালো। মিষ্টি করে হাসে আর সেই হাসির আড়ালে জমে থাকে অনেক না বলা কথা। শুনে ঘাড় নাড়লো কো ইন্টার্ন। দুমাস সার্জারি পোস্টিং বেশ ভালোই কেটেছিল। ভালো খারাপ যেমন পেশেন্টই আসুক না কেনো হাসি মুখে স্বপনদা হাজির হতো। অনেকদিন হয়ে গেছে আর পুরনো কলেজে যাওয়া হয় না, আশা করি ভালোই আছেন স্বপনদা। এসব মানুষের জন্য হেকটিক ইন্টার্নশিপ অনেকটা হালকা হয়ে যেতো। 

সত্য ঘটনা অবলম্বনে

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

শিরোনাম - দুরত্ব✍️ ডা: অরুণিমা দাস

 শিরোনাম - দুরত্ব ✍️ ডা: অরুণিমা দাস আধুনিকতা মানেই অন্যরকম একটা ব্যাপার, উন্নতির পথে এগিয়ে যাবার সিড়ি তৈরি করে দেয় আধুনিকতা। আজকাল কেউ আ...