রক্তের টান
✍️ডা: অরুণিমা দাস
সন্ধ্যে ছটা বাজে প্রায়। গাইনি ওটির বাইরে অস্থির ভাবে পায়চারী করছে অনিল আর ওর মা বাবা। ওটির মধ্যে অনিলের স্ত্রী রিক্তার সিজার চলছে। সবার মুখে চিন্তার ছাপ। প্রায় আধঘন্টা পরে সিস্টার তোয়ালে মোড়া জ্যান্ত পুতুল এনে তুলে দিল অনিলের হাতে। ওর মা বাবা ছুটে এলেন, বললেন কী হয়েছে সিস্টার! ছেলে না মেয়ে? সিস্টার কিছুক্ষন চুপ করে রইলো, তারপর বললো স্যার এসে আপনাদের জানাবেন সবটা। অনিলের মা বললো ছেলে না মেয়ে সেটা স্যার জানাবেন? কেনো আপনি বলতে পারছেন না? সিস্টার চুপ করে বাচ্চাটাকে অনিলের হাত থেকে নিয়ে চলে গেলো। কিছুসময় পরে ডা: ঘোষ ওটি থেকে বেরিয়ে এসে বললেন আপনারা আমার চেম্বারে আসুন,কিছু কথা আছে। অনিল আর ওর মা বাবা গেলো ডা ঘোষের চেম্বারে। ডা: ঘোষ জানালেন যে বাচ্চা জন্মেছে, অ্যাম্বিগুয়াস জেনিটালিয়া নিয়ে মানে ছেলের মত দেখতে হলেও ভেতরকার অঙ্গ গুলো মেয়ের মতো। একটা সেক্স চেঞ্জ অপারেশন করে হয়তো জিনিসটা ঠিক করা যাবে। অনিলের মা হঠাৎ করে বলে উঠলেন আচ্ছা বুঝেছি, তৃতীয় লিঙ্গের জন্ম দিয়েছে রিক্তা। আমি মেনে নেবো না এই সন্তানকে, সাফ জানিয়ে দিলাম তোমাদের। অনিল কিছু বলতে যাচ্ছিলো! ওর মা বললো নয় ওই বাড়িতে আমি থাকবো নাহলে ওই পাপ থাকবে। এবার তুই ঠিক কর কি করবি খোকা? অনিল বুকের ওপর পাথর চাপা দিয়ে মায়ের আদেশ মেনে নিল। নিজের মাকেই আজ তার কেমন যেন অচেনা লাগছে। কি করে এরকম করতে পারে ওর মা? নিজের ছেলের অংশকে এভাবে অস্বীকার করতে পারছে মা? যেটা কোনোদিন মায়ের কাছে আশা করেনি কোনোদিন সে। কিন্তু মায়ের কাছে তখন মনুষ্যত্বের চেয়ে বংশ মর্যাদা বেশী বড়ো হয়ে উঠেছিল। রিক্তাকে জ্ঞান ফেরার পর জানানো হলো সব। শ্বাশুড়ী মায়ের পায়ে ধরেও নিজের সন্তানকে নিজের কাছে রাখতে পারেনি সে।
এরপর মাঝে বছর পনেরো কেটে গেছে। অনিল আর রিক্তার কোল আলো করে ছেলে এসেছে। অনিলের মায়েরও বেশ বয়স হয়েছে। একদিন রাস্তা পার হবার সময় পাথরে হোচট খেয়ে পড়ে যান উনি। একটা গাড়ী এসে আচমকা ধাক্কা মারে। মাথা ফেটে বেশ রক্ত ক্ষরণ হয়। রাস্তার লোকেরা জড়ো হয় কিন্তু কেউ ওনাকে হাসপাতালে নিয়ে যায় না পুলিশ কেস হবে এই ভয়ে। ভিড় ঠেলে এগিয়ে আসে এক মহানুভব, বলে আপনারা সরুন এখান থেকে আমি ওনাকে হাসপাতালে নিয়ে যাবো। হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে জানতে পারে বেশ গুরুতর চোট ওনার মাথায়, স্টিচ দিতে হবে আর এক ইউনিট রক্তও দিতে লাগবে। অনিল বাবু রিক্তা তখন এসে হাজির কিন্তু রক্তের গ্রুপ মেলে না। সেই মহানুভব এগিয়ে এসে বলে আমার গ্রুপের সাথে মিলে গেলে আমি রক্ত দিয়ে দেবো। অনিল বাবু বললেন আপনার নাম? বললো নীলাভ, আমি কিন্তু স্বাভাবিক মানুষ নই, তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ। অনিল বাবু এক মুহূর্ত না ভেবেই নীলাভ র রক্ত মাকে দেওয়ার জন্য রাজী হলো। পরে যখন জ্ঞান ফিরলো অনিল বাবুর মায়ের,তখন জানতে পারলেন এক তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তি তাকে রক্ত দিয়েছে! শুনে দু চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল আর হয়তো বছর পনেরোর আগের দিনটি মনে পড়ছিল যেদিন তিনি অস্বীকার করেছিলেন তার বংশপ্রদীপকে। আর ঈশ্বর ছাড়া কেউ জানলো না যে এই নীলাভই সেই সন্তান। কিছু কিছু সম্পর্কের সমীকরণ ওলট পালট হয়ে গিয়েও শেষ অব্দি সিড়িভাঙা অঙ্কের মত মিলে যায়,হয়তো আমাদের অজান্তেই।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন