বৃহস্পতিবার, ২০ জানুয়ারি, ২০২২

#নাম- 'শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃত'। ✍️- মৃদুল কুমার দাস।

#বিষয় - *গ্রন্থ আলোচনা।*
  # নাম- 
         *শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃত।*
           ✍️  - মৃদুল দাস।

     বুদ্ধ, যিশু,হজরত,চৈতন্য সকল সন্তসাধকের জীবনী শিষ্যসম্প্রদায়ের রচিত। সেই সঙ্গে স্মরণীয় আধুনিক যুগের আধ্যাত্মিক প্রাণপূরুষ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণের জীবনী নিয়ে রচিত আস্ত পাঁচ খন্ডে রচিত 'শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃত'। গ্রন্থটি একটি সামাজিক ও আধ্যাত্মিক আকরগ্রন্থ। যেখানে ঠাকুর মূল চরিত্র আর ত়াঁর অগনিত ভক্ত সম্প্রদায় ঠাকুরের সূত্রধর। 
  কথামৃত গ্রন্থটি ঠাকুরের আজ কেন ভূত ভবিষ্যৎ জন্ম জন্মান্তর ঠাকুরের চলমানতার স্মারক। গ্রন্থটির লেখক মহেন্দ্র গুপ্ত ওরফে শ্রীম। তিনি ঠাকুরের চোদ্দ সদস্যের গুরুভ্রাতা মিশনের অন্যতম একজন ছিলেন।     শ্রীম উনিশ শতকের শেষার্ধে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র। কৃতি শিক্ষক। ব্রাহসমাজের অনুরাগী। অন্তর্মুখী। সংসারে নিত্য অনটনে একসময় হতাশায় নিজেকে বড়ই দুর্বহ মনে করেছিলেন। হঠাৎ ১৮৮২,২৬ ফেব্রুয়ারীতে দক্ষিণেশ্বর ঠাকুরের পায়ে প্রণত হলেন। প্রথম সাক্ষাতের দিন শ্রীমকে দিব্যদৃষ্টিতে দেখলেন উত্তম আধার। ঠাকুরের সাক্ষাতে মাষ্টার শ্রী মহেন্দ্র গুপ্তের বদলে গেল জীবনের সব তুচ্ছতা,গেলেন আমূল বদলে। তিনি বিবাহিত ও সন্তানাদির জনক ঠাকুর জেনে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছিলেন - "যাঃ,ছেলে হয়ে গেছে! .. তোমার পরিবার কেমন? বিদ্যাশক্তি না অবিদ্যাশক্তি?" সেদিন মাষ্টারের কাছে ঠাকুরের এইসব কথায় নত মস্তকে বুক ঢিপ ঢিপ করছিল। ঠাকুর আরো জিজ্ঞাসা করেছিলেন - "সাকারে বিশ্বাস না নিরাকারে?" শ্রীম বললেন - "সাকারে বিশ্বাস থাকলে কি নিরাকারে বিশ্বাস হয়?" তারপর থেকে শ্রীম এর মধ্যে সে এক ঘোর লাগা অবস্থা। সময় হলেই ছোটেন ঠাকুরের কাছে। প্রতি সাক্ষাতের অভিজ্ঞতার চলল ব্যক্তিগত ডায়রী লেখা। তাই হল কথামৃতের ভিত্তি - ১৮৮২ থেকে ১৮৮৬ এই চার বছর। অর্থাৎ ঠাকুরের সাক্ষাতে সে সব বিচিত্র অভিজ্ঞতা বৃথা যাতে না হয় শ্রীম গোপন ডায়রীতে লিখে রাখতেন। ক্রমে ডায়রীর পাতা ভরে উঠল। সে শতাধিক সাক্ষাতের বিবরণ। সে বিবরণ যেন অমৃতপাত্রে একান্ত ব্যক্তিগত ভক্তবিনম্র ধ্যানের বিষয় নিবেদন। কেউ দেখতে চাইলে বলতেন - "ও আমি নিজের জন্য লিখেছি। অন্যের জন্য নয়।"(কথামৃত,পৃ. - ১০৬১)
      শ্রীম এর এই মহতি সিদ্ধি সময় যত গড়াতে থাকে তার একটা রূপ পেতে আস্পৃহা জন্মায়,তা থেকে প্রথম প্রকাশিত রূপ ১৮৯৭ -তে ইংরাজী ভাষায় প্রথম রচিত একটি ছোট পুস্তিকা 'গসপেল অফ শ্রীরামকৃষ্ণ' আর বাংলা ভাষায় রচিত গ্রন্থের নাম - 'শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃত'। গ্রন্থটি প্রকাশের জন্য শ্রীশ্রীসারদা মায়ের কাছে অনুমতি নিতে গেলে শ্রীমা আশীর্বাণী স্বরূপ বলেছিলেন - "বাবাজীবন,তাঁহার নিকট যাহা শুনিয়াছিলে সেই কথাই সত্য। ইহাতে তোমার কোনো ভয় নাই। এক সময় তিনিই তোমার কাছে এ সকল কথা রাখিয়াছিলেন। এক্ষণে আবশ্যকমত তিনিই প্রকাশ করাইতেছেন। ঐ সকল তথ্য ব্যক্ত না করিলে লোকের চৈতন্য হইবে না জানিবে। তোমার নিকট যে সমস্ত তাঁহার কথা আছে তাহা সবই সত্য। একদিন তোমার মুখে শুনিয়া আমার বোধ হইল,তিনিই ঐ সমস্ত কথা বলাইতেছেন।" ( জয়রামবাটী,২১ শে আষাঢ়,১৩০৪)।
  গ্রন্থটির পাঁচটি ভাগ । 
    **প্রথম ভাগে ঠাকুরের বংশ তালিকা দিয়ে শুরু। শেষ অষ্টাদশ পরিচ্ছেদ- বরাহনগর মঠ দিয়ে।
   ** দ্বিতীয় ভাগ - নরেন্দ্রনাথের সঙ্গে সাক্ষাৎ দিয়ে শুরু। শেষ সপ্তবিংশতি পরিচ্ছেদ বারোজন গুরুভ্রাতা দিয়ে।
   ** তৃতীয় ভাগ - বিদ্যাসাগরের সঙ্গে ঠাকুরের সাক্ষাৎকার দিয়ে শুরু। শেষ ষড়বিংশ পরিচ্ছেদ দিয়ে।
   ** চতুর্থ ভাগ - শুরু দক্ষিণেশ্বর ও ঠাকুর দিয়ে। শেষ ত্রয়োত্রিংশ পরিচ্ছেদে কাশীপুর উদ্যান,লাটু নরেন্দ্র প্রমুখ ভক্তগণকে নিয়ে।
   ** পঞ্চম ভাগ - শুরু বলরাম মন্দিরে রাখাল, নিত্যগোপাল, বলরাম প্রমুখগণকে নিয়ে। শেষ অষ্টাদশ পরিচ্ছেদ - মৌনাবলম্বী ঠাকুর দিয়ে।
  শ্রীমের 'শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃত' গ্রন্থটি উনবিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগে বাঙালি কি তাই চেনার দায়িত্ব যেন। পাঠকের কাছে গ্রন্থটি অদ্যাবধি কেন বলব যুগ থেকে যুগান্তরে হবে প্রাণের আরাম,মনের আনন্দ আর আত্মার পরম শান্তি। আবার অনেকের কাছে নিত্য সাধনার পথিকৃৎ। বিশ্বে শ্রেষ্ঠ ধর্ম সাহিত্যগুলির মধ্যে অসামান্য স্থানাধিকারী হয়ে ওঠে। গ্রন্থটি শুধু ঠাকুর ও শ্রীমের কথোপকথন বললে ভুল হবে বিচিত্র সব জীবনের কাছে পারমার্থিক দিশা হয়ে উঠল। মহাভারতের কথা অমৃতসমান বলে যে শোনে সেই পুণ্যবান হয়,ঠিক তেমনি আপামর বাঙালির পুণ্যার্জনের সহায় এই কথামৃত। শাক্ত, বৈষ্ণব,খ্রিস্টান, ইসলাম সব একাকার করে সর্বধর্মের সমণ্বয়ের তাঁর কথা ছিল অমৃতসমান  - 'যত মত তত পথ'। 
 ঠাকুর স্বয়ং কেশব সেন,নীলকন্ঠ, বৈষ্ণবচররণ, রামলাল, নরেন্দ্রনাথ,গিরিশ ঘোষ থেকে গৃহী ভক্ত, সাধু ও অসাধু,মাতাল,দীনহীন, দরিদ্র,ধনী, নির্ধন, সাধ্বী,বেশ্যা,শূদ্র সবাইকে যেন উদ্ধার করতে এসেছিলেন। কলির শুরুতে তিনি মানুষের অধঃপতন কীভাবে রক্ষা পাবে তার পথ বলতে এসেছিলেন। ঠাকুর বলতেন - "অদ্বৈত জ্ঞাণ আঁচলে বেঁধে যেখানে ইচ্ছা যাও।"(পৃ. - ১০৭৪) অর্থাৎ পরম সত্যকে উপলব্ধির পর ঠাকুরের কথায় বিজ্ঞানীর অবস্থায় থাকতে হবে। এই অবস্থায় পৌঁছালে সংসার আর 'ধোঁকার টাটি' থাকে না। হয়ে ওঠে 'মজার কুটি'। সেখানে শান্ত, দাস্য, সখ্য, বাৎসল্য , মধুরে ঈশ্বরের লীলা উপলব্ধি করে জীবন আনন্দময় হয়ে ওঠে। গিরিশচন্দ্র ঘোষের সার্থক রূপান্তরে তিনিই স্বয়ং। যুক্তিবাদী ডাক্তার মহেন্দ্রলাল সরকার রূপান্তরিত ঠাকুরের অমৃতকথায়। মহেন্দ্রলাল বলছেন - "যাঁর কথা হচ্ছে তিনিও (ঈশ্বর) যেমন অনন্ত,আপনিও তেমনি অনন্ত! আপনার অন্ত পাওয়া যায় না।"(পৃ.- ৭৭) আরো শ্রী সরকার বলেছিলেন - "আপনাকে যে যত বুঝবে ,সে তত উন্নত হবে।"(পৃ.-২৬১) 
 গ্রন্থটি ভাব থেকে মহাভাব সমাধির পরিচয় পাই। গ্রন্থে তিনি ভাবের কল্পতরু। তিনি অনুপম ভাবসমাধি দিয়ে আপামর জনসাধারণকে এক মহান তীর্থলোকে নিয়ে গেছেন। যে লোকের নাম রামকৃষ্ণলোক। গ্রন্থটি কথাসর্বস্ব - ঠাকুর কি বলছেন তাই কেন্দ্রবিন্দু, আর সেই কথার সূত্রধর হলেন শ্রীম। এ এমন কথামৃত যা 'মিছরির রুটি'র মত যা "সিধে করে খাও,আর আড় করে খাও মিষ্টি লাগবেই।" (পৃ.- ৫৭৭)
        *****
#কপিরাইট রিজার্ভ ফর মৃদুল দাস।

৫টি মন্তব্য:

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল✍️ ডা: অরুণিমা দাস

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল ✍️ ডা: অরুণিমা দাস বর্তমানে অতিরিক্ত কর্মব্যস্ততার কারণে একটু বেশি সময় কাজে দেওয়ার জন্য হয়তো একের প্রতি অন্য...