শুক্রবার, ২১ জানুয়ারি, ২০২২

#নাম - শাঁওলি মিত্র। ✍️ - মৃদুল কুমার দাস।

# বিষয় - *প্রয়াতা স্মরণে।*
  #নাম - *'শাঁওলি মিত্র'।*
   ✍️ মৃদুল দাস।

      বিখ্যাত বাবা ও মায়ের সন্তান বিখ্যাত হন,ব্যতিক্রম দু'একটি ছাড়া। বাবা শম্ভু মিত্র, মা তৃপ্তি মিত্রের একমাত্র সন্তান শা়ঁওলি মিত্র (১৯৪৮ - ২০২২)-এর মাত্র চুয়াত্তর বছরে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে শবদেহ হলেন তখন সিরিটি মহাশ্মশান যখন ত়াঁকে ধারণ করল তখন ত়াঁর পাশে ছিলেন একমাত্র মানসপুত্র সায়ক চক্রবর্তী ও মানসকন্যা অর্পিতা ঘোষ। তাঁর তাই নির্দেশ ছিল ইচ্ছাপত্রে - "তাঁর শবদেহকে যেন অযথা ফুলের মালার বোঝা বইতে না হয়। দাহ হওয়ার পর যেন সবাই জানতে পারে।" এমন ইচ্ছা পিতা শম্ভু মিত্রের মত,এও যেন পিতার কাছ থেকে  নির্দেশ পাওয়। বাপের বেটি তো! এই নীরবে চলে যাওয়াটা আমাদের কাছে অনুভূত হল তিনি বড্ড অকালে চলে গেলেন। বারে বারে নিজস্ব পরিসরে বিশ্বাস নিয়ে গড়া সম্পর্কের ভাঙন শাঁওলি মিত্রকে একা করে দিত। শাঁওলি মিত্র আমাদের রিক্ত করে কোন পরপারে চলে গেলেন তাঁর স্পষ্টতম ও মিষ্টতম বাংলা বলাটিকে নিয়ে।
 শুরু ঋত্বিক ঘটকের 'যুক্তি তক্ক আর গপ্প' চলচ্চিত্রে বঙ্গবালা চরিত্র দিয়ে। মঞ্চে প্রথম পদার্পণ রবীন্দ্রনাথের 'ডাকঘর' নাটকের অমল চরিত্র রূপায়ণ দিয়ে। আর দেখতে দেখতে বাংলা নাট্যমোদি দর্শকের কাছে তিনি শাঁওলির চেয়ে 'নাথবতী অনাথবৎ' নামে বেশী আদরনীয় হয়ে গেলেন। জীবনের শ্রেষ্ঠ অভিনয় - 'নাথবতী অনাথবৎ' এর শুরু তবলাতরঙ্গ বেজে উঠছে। বাজছে মন্দিরা, মৃদঙ্গ। মঞ্চে সার বেঁধে বসা জুড়ির দলের দিকে মুখটি ফিরে তিনি। একটা কালো কাঠের জলচৌকির ওপরে দুলছে একটা লম্বা বেণী। একটি আলতারাঙা পায়ের নূপুর তাল রাখছে ছন্দে। জুড়ির দল গান ধরেছে, গানের শেষে কথক ঠাকরুণ পেন্নাম করে বলে উঠলেন ‘‘এক অভাগিনী মেয়ের কথা! রানি, কিন্তু রানি নয়!
‘নাথবতী অনাথবৎ’। এমন কুশলী অভিনয় দেখে নাট্য রসবেত্তা মাত্রেরই মনে বিস্ময়ের সেই ঢেউ আছড়ে পড়ে এই নাট্যবাংলার ইতিহাসে পেশাদার রঙ্গালয়ের বাইরে একমাত্র ‘নীলদর্পণ’ ছাড়া এত সাড়া-জাগানো অভিনয় আর হয়েছে কি! একবার এক ঘটনা ঘটেছিল - মা তৃপ্তি মিত্র হঠাৎ অসুস্থ। তখন তিনি কলকাতার বাইরে নাথবতীর এক নাট্যশো শেষে সেই অবস্থায় মেকাপ না তুলে মাকে দেখতে ছুটে এলেন। মেক আপ তোলার সময়টুকু পর্যন্ত দিতে চাননা,কারণ পরের শো আছে বলে। 
  আর 'ডাকঘর' মঞ্চাভিনয় করার সময়ও ঘটনা যা ভোলার নয় - ছোটবেলা খুব অসুখে ভুগতেন। একবার তিনি জ্বরে শয্যাশায়ী। মা তৃপ্তি মিত্র 'ডাকঘর' নাটক বিছানায় দিয়ে বললেন- "তোকে অমলের অভিনয় করতে হবে।" সেদিন সেই নাটকটি পড়ে ছোট্ট শাঁওলি খুব কেঁদেছিলেন। অমলের অভিনয়ে খুব সাফল্য পেয়েছিলেন। নাটকে ডেডিকেটরাই এমন ইতিহাস গড়ার সুযোগের সদ্ব্যবহার করে থাকেন। মেয়ে শয্যাশায়ী,ওই পারবে অমলের ভেতরটা দেখতে, এটাই তো মোক্ষম সময়।
  তাঁর মঞ্চসফল অভিনয় যেমন - 'পুতুল খেলা', 'একটি রাজনৈতিক হত্যা', 'হযবরল', 'কথা অমৃতসমান', 'লঙ্কাদহন', 'পাগলা ঘোড়া', 'পাখি', 'গ্যালিলিওর জীবন', 'যদি আর একবার'।
   সংগীত নাটকের জন্য অ্যাকাদেমিক পুরস্কার পান ২০০৩ এ,২০০৯ এ পদ্মশ্রী,২০১২ তে পান বঙ্গবিভূষণ। রাজনীতি থেকে শত যোজন দূরে থাকতেন। কিন্তু সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রাম আন্দোলনের আন্যতম মুখ হয়ে উঠেছিলেন। মহাশ্বেতা দেবী চলে যাওয়ার পর বাংলা অ্যাকাদেমির তিনি দায়িত্ব নিয়েছিলেন। আবার একসময় স্বেচ্ছায় দায়িত্ব ছেড়েও দেন। তাঁর সম্পর্কে সফল মঞ্চাভিনেত্রী ও জাতীয় পুরস্কারে ভূষিতা সুদীপ্তা চক্রবর্তী এই অকাল প্রয়াণকে ঘিরে স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে বলেছেন - "অনেক আদর পেয়েছি। অনেক ভালবাসা। আদর করে কত কি খাইয়েছিলেন। আমি তাঁর বন্ধু বিপ্লবকেতন চক্রবর্তীর মেয়ে! অনেক কিছু শিখেছি। মঞ্চাভিনয়ের খুঁটিনাটি। অবাক চোখে তাকিয়ে দেখেছি ত়াঁর অভিনয় সেই ছোট্টবেলা থেকে। আমার নাটক দেখে ফোন করে খুব প্রশংসা করেছিলেন। আনন্দে কেঁদেই ফেলেছিলাম। বড় হয়ে একসঙ্গে সিনেমায় একটা কাজ করার আর্জি নিয়ে গিয়েছিলাম। রাজি হননি। তাই আর একসঙ্গে কাজ করার বা একদম সামনে থেকে অভিনয় দেখার সৌভাগ্য হল না।" আর সেই সাথে বাংলা নাট্যমোদি দর্শকও বাঁচবে শুধু 'নাথবতী আনাথবৎ'-এর স্মৃতি নিয়ে।
          ******
#কপিরাইট রিজার্ভ ফর মৃদুল দাস

৫টি মন্তব্য:

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল✍️ ডা: অরুণিমা দাস

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল ✍️ ডা: অরুণিমা দাস বর্তমানে অতিরিক্ত কর্মব্যস্ততার কারণে একটু বেশি সময় কাজে দেওয়ার জন্য হয়তো একের প্রতি অন্য...