বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই, ২০২৬

শিরোনাম - বন্ধ দরজার আড়ালে✍️ ডা: অরুণিমা দাস

শিরোনাম - বন্ধ দরজার আড়ালে
✍️ ডা: অরুণিমা দাস

বন্ধুদের নিয়ে ছুটিতে গ্রামে ঘুরে আসার প্রস্তাব দিলো তন্ময়। শুনে তো বাকি তিন বন্ধু রাকেশ,শুভ আর সিদ্ধার্থ একপায়ে খাড়া। চারজন ই কলেজে পড়ছে ইতিহাস নিয়ে। ওদের ইচ্ছে ভবিষ্যতে আরও পড়াশোনা করার, গবেষণা নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার। তো পুরোনো বাড়ী শুনে তিন বন্ধুর মনে একরাশ খুশির ছোঁয়া,যদি কিছু ইতিহাস বেরিয়ে আসে। তন্ময় বললো আমি ছোটবেলায় গরমের ছুটিতে যেতাম তখন খুব একটা কিছু বুঝতামনা। তবে জমিদার বাড়ী আমাদের, সব সময় চাকর বাকর ভর্তি থাকতো। আমি যেখানে যেতাম কেউ না কেউ সঙ্গে থাকতো। তারপর আসতে আসতে দিন বদলালো,জমিদারির সেই মেজাজ আর রইলোনা।পড়াশোনা করে চাকরি পেয়ে কাকু জেঠু সব গ্রাম ছাড়লো। এখন থাকে বলতে আমার দাদুর দূরসম্পর্কের এক ভাইপো আর রামদীন কাকা। এ চিঠি লিখে সব জানিয়ে দিয়েছি। ওরা স্টেশনে থাকবে। যথাসময়ে রওনা দিয়ে দিলো চারজন। পইপই করে তন্ময়ের বাবা বলে দিলেন ঘুরতে যাচ্ছ যাও কিন্তু বাড়ীর যেখানে সেখানে যেওনা। কাকা দের কথা শুনবে। সবাই ঘাড় নেড়ে সায় দিলো। মায়েদের ও আশ্বস্ত করলো কিছু দুঃসাহসিক করবে না ওরা। গোকুলগড় স্টেশনে গাড়ি থামলো। নেমে দেখলো কাকারা দাঁড়িয়ে আছে ওদের নিয়ে যাবে বলে। ওরা সবাই চললো গ্রামের বাড়ির পথে।  বাড়িতে পৌঁছে রামদীন কাকা ওদের সবাইকে দোতলার ঘরে নিয়ে গেলো। দুটো ঘরে ওদের থাকার ব্যবস্থা হয়েছে। দরজা খুলে ঢুকলো সবাই। আরেক কাকা বেশী কথা বললো না ওদের সাথে।
রামদীন বললো সাধন বাবু কেমন যেনো হয়ে যাচ্ছেন দিন দিন। যাইহোক খোকা বাবুরা তোমরা এত দূর থেকে এসেছো, হাত মুখ ধুয়ে নাও। আমি দেখি তোমাদের খাবার ব্যবস্থা করি। তন্ময় বললো খাবো পরে আগে বাড়িটা ঘুরে দেখি সবাই। আচ্ছা দেখো। ওরা চারজন একটু ফ্রেশ হয়ে বাড়ী দেখতে বেরোলো। বেশ ভালো লাগছিলো ওদের। আগে তিনতলার ঘরগুলো দেখলো, ছাদ থেকে ঘুরে এলো। শুভ বললো পুরোনো বাড়ী, গুপ্তধন কিছু পাবো নাকি রে তন্ময়? সিদ্ধার্থ বললো না মনে হয় জমিদারি তো ওদের চুকে বুকে গেছে। তন্ময় বললো চল এবার নিচের ঘরগুলো দেখবো। দোতলায় নেমে বারান্দা ধরে ঘুরতে লাগলো ওরা। একদম কোণার দিকে একটা ঘর দেখলো যার দরজা দুটো তালা দিয়ে বন্ধ। ঘরের দিকে তাকালে এক অমোঘ আকর্ষণে ওদের মনে হলো দরজা খুলে যেনো কিছু পাওয়া যাবে। রামদীন কাকার ডাকে ওদের চিন্তায় ছেদ পড়লো। কাকা বললো চলো খাবার ঘরে চলো। তন্ময় বললো আচ্ছা কাকা এই দরজাটা বন্ধ কেনো? কি আছে দরজার আড়ালে? 
- দেখো খোকা বাবু তোমরা ঘুরতে এসেছো, ঘোরো খাওয়া দাওয়া করো মজা করো চলে যাও। এসব দরজা নিয়ে আলোচনা ঠিক নয়। এই ঘরে কেউ ঢোকা বারণ। পূজা করে এই দরজায় তালা দেওয়া হয়েছিলো। তখন আমি তোমাদের মতন। এর বেশি কিছু জানি না। 
- আচ্ছা কাকা আমরা কেউ যাবো না। চিন্তা কোরো না তুমি। 
মুখে বললেও ওদের মনে একটা কৌতূহল তৈরি হচ্ছিলো। প্রথম কয়েকদিন ঠিক ছিলো সব,ওরা বাড়িতেও জানালো যে ভালো লাগছে ওদের। ঘুরছে, খাওয়া দাওয়া সব ভালো। 
কিন্তু দিন কয়েক পরে সিদ্ধার্থ বললো একদিন চল রাতে আমরা দরজা খুলে দেখবো কি আছে! বাকিরা খুব একটা সায় দিলোনা তাতে। একটু দমে গেলো সিদ্ধার্থ। 
একদিন রাতে যখন সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে, সিদ্ধার্থর মনে হলো কেউ যেনো ওকে ইশারা করে ডাকছে। 
বিছানা থেকে উঠে এগিয়ে যেতে লাগলো ও। মনে হলো ওকে কেউ নিয়ন্ত্রণ করছে যেনো। সোজা এগিয়ে যেতে লাগলো সেই বন্ধ দরজার দিকে। দরজার সামনে গিয়ে দেখলো দরজাটা খোলা। কে খুললো তবে? দরজা দিয়ে ঢুকে ও দেখলো ঘরের ভেতর একটা কেমন গন্ধ, দেওয়াকে অনেক পশু পাখির মাথা ঝোলানো। গা টা কেমন গুলিয়ে উঠলো। হাত ধরে এক ঝটকায় কে যেনো ওকে ভেতরের দিকে নিয়ে যেতে লাগলো। সেখানে গিয়ে ওর চোখের সামনে ভেসে উঠতে লাগলো এক অত্যাচারের দৃশ্য। কিছু মানুষ কারোর পায়ে পড়ে বলছে এবারের মতন মাপ করে দিন বাবু,পরের বার ঠিক সময়ে সব পাওনা মিটিয়ে দেবো। তারপরও অত্যাচার কমলো না, আরও বেড়ে গেলো। লুটিয়ে পড়লো এক সময় মানুষগুলো। আর সহ্য করতে না পেরে সিদ্ধার্থ বসে পড়লো। একি দেখলো ও?  কারা যেনো ওর কানের কাছে ফিসফিস করে বলছে দরজা খুলে গেছে এবার আমরা আর বন্দি থাকবো না। জমিদারকে শেষ করবো। ভয়ে সিদ্ধার্থ কেঁদে ফেললো। বার বার বোঝাতে লাগলো সে জমিদার নয়। একসময় জ্ঞান হারিয়ে ফেললো সিদ্ধার্থ। যখন জ্ঞান ফিরলো দেখলো বিছানায় শুয়ে আছে। বাকি তিন বন্ধু উদ্বিগ্ন মুখে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। রামদীন কাকা দুধ নিয়ে এসে বললো খেয়ে নাও। বারণ করলেম ওই দিকে যেও না,সেই গেলে। কথা শুনলে না আমার। আজ পুরোহিত মশাইকে ডেকেছি। ওই ঘর আবার বন্ধ করতে হবে। কিন্তু কী আছে ওই ঘরে কাকা? দেখো বেশী কিছু জানিনা আমি তবে যেটুকু শুনেছি আমাদের তন্ময় বাবুর পূর্বপুরুষরা খুব অত্যাচারী ছিলেন,প্রজারা পাওনা দিতে না পারলে এই ঘরে এনে বন্দি রাখতেন আর অমানুষিক অত্যাচার করতেন। কেউ ফিরে যায়নি এই ঘর থেকে। তবে ওনার দাদু জমিদারি পাওয়ার পর থেকে প্রজারা শান্তিতে থাকতো। খুব ভালো মানুষ ছিলেন উনি। উনিই এই ঘরে তালা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। কিন্তু হয়তো ভুলে গেছিলেন দরজার পেছনে যারা রয়ে গেলো তারা মুক্তির অপেক্ষায় রয়েছে। তারপর থেকে এই দরজা খোলা হয়নি কোনোদিন। কাল এই দাদাবাবু না গেলে হয়তো দরজা খোলা হতনা কোনোদিন। তোমরা তৈরি হয়ে নাও। পুরোহিত মশাই চলে আসবেন। ওরা চারজন তৈরি হয়ে নীচে গেলো। পুজো শুরু হয়ে গিয়েছে। পুরোহিত মশাই পুজোর শেষে দোতলার দরজায় তালা দিতে এসে কি মনে হলো,বললেন আর তালা দিতে লাগবেনা। যারা ছিলো তারা বেরিয়ে গিয়েছে। সিদ্ধার্থ হঠাৎ দেখলো কিছু ছায়ামূর্তি ওকে নমস্কার করে যেনো বাতাসে মিলিয়ে যাচ্ছে। যেনো বলছে ধন্যবাদ জানাই আমাদের মুক্ত করে দেওয়ার জন্য। হাসিমুখে ওদের দিকে তাকিয়ে রইলো সিদ্ধার্থ। কাকে যে কোন কাজে লাগাবেন ঈশ্বর তিনিই জানেন। এরপর আর কয়েকদিন থেকে ওরা ফিরে এসেছিল শহরে। কলেজ জয়েন করে সিদ্ধার্থ জানতে পারে ওর লেখা এক ঐতিহাসিক প্রবন্ধ সিলেক্ট হয়েছে ভবিষ্যতে এই নিয়ে গবেষণাও করতে পারবে। ওর কেরিয়ারয়ের আরেক দরজা যেনো খুলে গেলো। ঠিক করলো ওই গ্রামে যাবে ও আরেকবার। ওখানকার জমিদারি প্রথার ইতিহাস নিয়েও কিছু লিখবে ও। ওর মনে হতে লাগলো ওখানে গিয়ে একটা দরজা খুলেছিল বলে মহাবিশ্ব ওর জন্য আরও অনেকগুলো দরজা খুলে দিতে শুরু করেছে। তন্ময়রা সবাই ওর সাফল্যে খুব গর্বিত। সিদ্ধার্থও মন দিয়ে কাজ চালিয়ে যায় ওকেও যে বড় হতে হবে। ও যে কোনো এক গ্রামের গরীব প্রজার উত্তরপুরুষ সেটা কেউ না জানলেও ও তো জানে।

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

শিরোনাম - বন্ধ দরজার আড়ালে✍️ ডা: অরুণিমা দাস

শিরোনাম - বন্ধ দরজার আড়ালে ✍️ ডা: অরুণিমা দাস বন্ধুদের নিয়ে ছুটিতে গ্রামে ঘুরে আসার প্রস্তাব দিলো তন্ময়। শুনে তো বাকি তিন বন্ধু রাকেশ,শুভ...