বুধবার, ১৯ জানুয়ারি, ২০২২

সুর-অসুর(রম্য রচনা) সুদেষ্ণা দত্ত


      সুর-অসুর(কৌতুক রচনা)

      সুদেষ্ণা দত্ত

   কল্যানবাবুর দীর্ঘদিনের শখ মেয়ে আহিরকে গান শেখাবেন।তাঁর অবসর গ্রহণের সময় হয়ে আসছে।প্রথম রবিকিরণ যখন পাদস্পর্শ করবে বা সূর্যাস্তের মৃদু লালিমা যখন ললাট চুম্বন করে বিদায় নেবে তখন হাতে গরম পানীয় নিয়ে তিনি সঙ্গীত সুধা পান করবেন-এমনটাই তাঁর দীর্ঘদিনের শখ।স্ত্রী গান্ধর্বীকে গান ধরতে বললেই বগলে খুন্তি বাগিয়ে রাইফেল শ্যুটিং এ নামার প্রস্তুতি নিচ্ছেন এমন ভাব করে তেড়ে আসেন।

           কিন্তু সমস্যা দাঁড়িয়েছে অন্যত্র।আহিরের গলায় সুর নেই এমন নয়।তবে এই মহামারীকালে কেই বা তাকে গান শেখাবেন আর কল্যাণ বাবুই বা  বুকের হৃৎস্পন্দনকে হারমোনিয়ামের রিড ভেবে চোখের মণি মেয়েকে কার বাড়ীতে বাজতে রেখে আসবেন!অগত্যা কল্যাণ বাবু সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি নিজেই স্নানঘরে গানের বিদ্যাকে ভরসা করে মেয়েকে গান শেখাবেন।স্ত্রী রীতিমত চমকে উঠলে তিনি বলেন,আরে সুরবিশিষ্ট শব্দই তো সঙ্গীত।গিন্নী বলে উঠলেন তাই বুঝি।

           সেদিন বিকেলেই বন্ধ দোকানের ঝাঁপ আর দোকানীর কানের লম্বা চুলের ঝাপটা সরিয়ে মেয়ের জন্য একটি হারমোনিয়াম কিনে আনলেন।পরের দিন থেকেই শুরু হল সুর সাধনা।কিন্তু হারমোনিয়াম প্যাঁ পোঁ ধ্বনি তুলতেই গিন্নী গলা তুলে হঠাৎ গান গাওয়ার চেষ্টা করছেন বলেই মনে হল কল্যাণ বাবুর।মনে মনে খুশি হলেন,একদিনে না হলেও ধীরে ধীরে বাড়ীটা বুঝি সঙ্গীতালয় হয়ে উঠবে।কান করে শোনার চেষ্টা করলেন গিন্নী কোন গান গাইছেন—          রাঁধব আমি সুক্ত সুখে

                  সব্জী আন বাজার হতে

       ভুল হলে  জ্বালব নুরো তোমার মুখে

                 হরিমটর দেব পাতে।

কল্যাণ বাবু হকচকিয়ে গেলেন গানের শব্দে।কিন্তু সবাই তো আর দুর্গার সিংহ নয়।অগত্যা সঙ্গীত সাধনা স্থগিত রেখে বাজারের দিকে পা বাড়ালেন।বাজার সেরে রান্নাঘরে থলি নামিয়ে বাথরুমের দিকে যেতে যেতে থমকে গেলেন তিনি।আবার কানে ভেসে এল সুরবিশিষ্ট শব্দ—

           আনতে বললাম ফুলকপি নিয়ে এলে বাঁধা

         কালো বেগুনের জায়গায় নিয়ে এলে সাদা,

              আটান্ন তো পেরিয়ে গেল--

                    কবে হবে জ্ঞান

               ভাল করে সংসারেতে 

                          কবে দেবে ধ্যান

        বাজার যদি শিখতে হয় যেও বাবার কাছে

    পাঁঠার মাংস কেমন কেনে-কেমন চোখ মাছে।

এই ঝাঁঝালো বাক্যবান শুনেও চুপ করে থাকলেন একটাই কথা ভেবে যে তিনিও সুরে সুরে কথা বললে আহিরের সঙ্গীত সাধনায় ব্যাঘাত ঘটবে।তিনি আবার সুরুৎ করে বাথরুমে ঢুকে গেলেন।বাথরুম থেকে বেরিয়ে দেখেন ছেলে ইমন দুটো সাউন্ড বক্স কিনে এনেছে।গিন্নীর ছিটানো নুন-মরিচের উপর এক পরত পুদিনার চাটনীর মত আরাম লাগল।

          শীতের মিঠে রোদ গায়ে মেখে বারান্দায় আহিরকে নিয়ে সবে বসেছেন।হঠাৎ ঢিক ঢিক ঢক্কা নিনাদে ভাবলেন ছাদের ট্যাঙ্কের কলটা খারাপ হওয়ায় লাল্টু মিস্ত্রীকে আসতে বলেছিলেন,সেই বুঝি এসেছে।কিন্তু কিঞ্চিৎ পরেই ভুল ভাঙল।উপলব্ধি করলেন শব্দের উৎস ইমনের কক্ষ।ইমন গান শুনছে তার নতুন কেনা বক্সে।কল্যাণ বাবু ভাবলেন ছেলে বুঝি সুর শুনে প্ল্যানচেটে অকালবোধনে দুর্গা থুড়ি অসুরকে ডাকছে।সে সুরের মূর্ছনা শুনে কল্যাণ বাবুর মূর্ছা যাওয়ার উপক্রম হল।আহির গান গাইতে গাইতে জল খাবে বলে কাচের গ্লাসটা হারমোনিয়ামের উপরে রেখেছিল।সেটা ব্রহ্মান্ড ফাটানো সঙ্গীতের সুরের ধ্বনিতে ভেঙে চৌচির।আহিরের হাত থেকে সুরের ঝর্ণা ধারার মত লহু ধারা নেমে আসছে।দিশাহারা,স্নেহশীল পিতা একদিকে ছেলের ঘরের দিকে ছোটেন গান বন্ধ করার তাড়নায়,অন্যদিকে বারবার মেয়ের কাছে এসে রক্ত বন্ধ করার চেষ্টা করেন।সঙ্গীতালয় ক্রমে নৃত্যালয়ে পর্যবসিত হয় এবং তিনি সিদ্ধান্ত নেন মহামারী উত্তরপর্বে কোন অভিজ্ঞ সঙ্গীতজ্ঞর কাছেই মেয়েকে পাঠাবেন।কারণ স্বল্প সময়েই তিনি উপলব্ধি করলেন সব সুরবিশিষ্ট শব্দই সঙ্গীত নয়!

 

©কপিরাইট রিজার্ভড ফর সুদেষ্ণা দত্ত

ছবি সৌজন্য:গুগুল

ঋণ স্বীকার:আবোল তাবোল।

           

             

 

 

1 টি মন্তব্য:

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল✍️ ডা: অরুণিমা দাস

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল ✍️ ডা: অরুণিমা দাস বর্তমানে অতিরিক্ত কর্মব্যস্ততার কারণে একটু বেশি সময় কাজে দেওয়ার জন্য হয়তো একের প্রতি অন্য...