সোমবার, ২৪ জানুয়ারি, ২০২২

# বিষয় - অনুগল্প সঙ্কলন। ✍️ - মৃদুল কুমার দাস।


 #বিষয় - অনুগল্প।
   #নাম - ফেরিঘাট।
              ( ১)

      ভুতুনাথ বর। ঘাটের মাঝি। তার নৌকোয় উঠে একদিন জানতে চেয়েছিলাম এই ফেরিঘাটের মাঝিগিরি তাদের কত বছরের। আমি এক অচেনা যাত্রী বলে কিছুতেই বলতে চায়নি। আমি একজন লেখক জেনে এই ব্যাপারে কিছু তথ্য জানতে চাই বলায় সে যা বলল অবিশ্বাস্য।
 এই নৌকা নিয়ে পেশা কত পুরুষ সেই প্রশ্নের জবাবে ভুতুনাথ বলতে পারবে না,কারণ তার বাবা বলতে পারেনি, বলে যাননি,তার বাবাকে তার বাবা বলে যায়নি। জিজ্ঞেস করার উত্তরে ভুতুনাথ বলে- "একবার বন্যায় সব ভাসিয়ে নিয়ে যায় ঘর সংসার পরিবার। সে এক অন্য মুলুকে। তাদের এক পুরুষ ভাসতে ভাসতে এই নদীর পাড়ে এসে ঠেকছিলেন। ঘাটের এই বটতলায় এক কাপালিকের শুশ্রুষায় ত়াঁর জ্ঞাণ ফেরে। কাপালিকের সে কি ভয়ঙ্কর রূপ!  মায়ের নামে নরবলী দিতেন একসময়। বয়সকালে সেই স্বভাব ছেড়ে সাধন ভজনে বশ হন। ধীরে ধীরে কাপালিক রূপ ছেড়ে সাধু হয়ে ওঠেন। মৃত্যুকালে তিনি বর দান করে যান বেটা এই ফেরি ঘাটে তোরাই বংশ পরম্পরায় নৌকা ফেরি করে মানুষ এপার ওপার করবি। কেউ তোদের পেশায় হস্তক্ষেপ করলে বা তোদের হটিয়ে ফেরিঘাট দখল করতে এলে তারা নদীর স্রোতের ঘোলে পড়ে সমূলে ধ্বংস হবে। আর এই স্থানে দু'পারের যোগাযোগের জন্য সেতু গড়তে চাইলে তা কোনোদিন হবে না। বহু প্রাণ যাবে। হয়েছেও তাই। এখনো সেই সাধুবাবা ঐ স্রোতেই লুকিয়ে আছেন। বাইরের কোনো নৌকো অজান্তে স্রোতের ঘোলে পড়লে বদর বদর আর সাধুবাবার নাম নিয়ে উদ্ধার পায়। উদ্ধার পেয়ে মায়ের নামে ও বাবার নামে পূজো দিয়ে যায়। বিপদে না পড়লেও সকলে নদীপথে যাওয়ার সময় বাবার ও মায়ের নামে পূজো দিয়ে যাবে। অনেকের তাড়া থাকলে আমাকে পয়সা গোত্র একটা কাগজে লিখে দিয়ে যায়। পুরুত ঠাকুরকে দিয়ে দিই। তিনি পূজো দিয়ে দেন। তবে হ্যাঁ মন্দিরের পুরোহিত, আর ফেরিঘাটের মাঝি হিসেবে কেউ আমাদের হটাতে পারেনি। একবার হটাতে গিয়ে হাড়ে হাড়ে টেরও পেয়েছে। প্রমাণ এই নদীর উপর দিয়ে সেতু তৈরী করতে গিয়ে সফল না হওয়ার ধ্বংস স্তূপ দেখছেন! যারা করার দায়িত্ব নিয়েছিল তাদের বেশ ক'টা শ্রমিক অকালে মরেছে। আবার কারো কারো ঘর পর্যন্ত বিপদ ধাওয়া করে গেছে। তবে যা অনাচার হচ্ছে ভক্তির নামে বাবা সব দেখছেন। এর ফল একদিন ভুগতে হবে।"
    কথা শেষ হতে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠি। মন্দিরে পূজো দিয়ে স্থান ছাড়ি। 
            ******
 
# বিষয় - অনুগল্প।
 #নাম - হৃদয়বতী
                 (২)

    "ও রঞ্জনা তুই দেখনা এই ম্যাঁও বাচ্চা চারটা নিয়ে কি মুশকিলে পড়লাম। মা'এর কোলে শিশু সুন্দর,ছিল এরা বেশ দিব্যি,মা গেল চলে। এদের কষ্ট সামলাই কি করে। একটু হাতে হাত লাগা না।" বাচ্চাগুলো তখন পায়ে পায়ে জড়াচ্ছে।
  "ও রাধু দিদা কি করে এমন হল?" তুলতুলে বাচ্চাদের রঞ্জনার নরম হাতে আদর করতে করতে জিজ্ঞেস করে। বাচ্চারা তখন রঞ্জনার আদরে বিরক্ত হয়ে রাধু বুড়িকে জড়াতে চায়।। রাধিকা বোষ্টমীর কাছে যেতে চায়।
"কি করে বড় রাস্তা পেরতে গিয়ে টোটোর তলায় যাওয়ার পর প্রাণ ধুকপুকানি নিয়ে মা'টা এ পোড়া ভাগ্য বুড়ির কোলে এসে পড়ল। সে কি আকূতিটাই না নিয়ে চোখ চোখ রেখে ইঙ্গিতে বলেছিল বাচ্চারা রইল। ওদের দেখো।" চোখ ছলছল অবস্থা আঁচলের খুঁট তুলে চোখের কোনা শুকনো করেন রাধিকাসুন্দরী ভূঁই। লম্বা চন্দনের তিলক নাকের ডগা থেকে সিঁথি পর্যন্ত। রোগা পাতলা মধ্য চেহারা। ধবধবে ফর্সা। 
  "কৃষ্ণের জীব। হরেকৃষ্ণ। জীব যে ভগবানের অংশ রে রনু। কোলে শেষ জলটুকু এই বুড়ির হাতে নিয়ে গেল। সান্ত্বনাটুকু পেলাম বটে। চোখে জল এসেছিল এই ভেবে এই তো দুপুরে মাছ-ভাত মেখে খাওয়ালাম। বাচ্চাদের দুধ দিচ্ছে দুপুরের রোদ পিঠে মেখে। বাচ্চাদের এ ওর ওপর চাপাচাপি দেখে কি আনন্দ হচ্ছিল। তারই মাঝে ফট করে বাচ্চাদের ছেড়ে গলি পেরিয়ে বড় রাস্তা ডিঙোতে গিয়ে..! যাওয়ার সময় দায়িত্ব সামলানোর মায়ায় জড়িয়ে পড়লাম রে। দেখ রুনু ওদের মায়ের আত্মার স্পর্শ পেলুম বলে আরো কষ্ট হচ্ছে।" চোখে জল চেপে আরো কিছু আপন মনে আনমনা হয়ে সেই বড়   রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকলেন বুড়ি। সেই অবসরে রঞ্জনা ছুট্টে গিয়ে ঘর থেকে লক্ষ্মীভাঁড়টা এনে রাধু বোষ্টমীর হাতে দিয়ে বলল- "এই নাও। কটা দিন কাটাও। আমাদের বন্ধুদের টিফিনের পয়সা বাঁচিয়ে তোমাকে সাহায্য করার যতটা পারি করব।" বলে বুড়ির কোমর উঁচু রনো তার রাধু দিদুর চোখের দিকে অম্লান বদনে উপরের দিকে চোখ তুলে তাকিয়ে থাকে। বাচ্চাগুলো কি মায়ায় কাঁই কুঁই শব্দে পাক খাচ্ছে। ওদের মা ছেড়ে চলে গেছে, সেই নীরব মায়া রাধু বুড়ির চারধারে ঘুরে। আর রঞ্জনা শুধু আঁকড়ে থাকে রাধু দিদা হৃদয়বতীকে। আর পায়ের নীচে চারটা বাচ্চা পা জড়িয়ে। মায়ায় বশে হৃদয়বতী রাধিকা গুঁই বোষ্টমী এখন সেবায়েত। মায়ার হৃদয়বতী।
        ******

 # বিষয় - অনুগল্প।
  # নাম - অঙ্গীকার।
                 (৩)

       "অঙ্গীরা তুই চোখ মেলে দেখ দুনিয়ার সঙ্। সঙের জোয়াচ্চুরিতে তোরা এক এক ভাবে শিকার। পরুষ একভাবে।" কথাগুলো বলে ওঠে অমর খুব দৃঢ়তার সঙ্গে। অঙ্গীরা হর ফ্যালফেলিয়ে তাকিয়ে থাকে। অম্বরীশ সংক্ষেপে অমর পালই বলে - "অঙ্গী বুঝলি না তো? তাহলে বলি।" 
 অঙ্গীরা বলে - "একটু সহজ করে বললে বুঝতে পারব।" 
 অমর অভিমান করে বলে - "তাহলে বলব না।"
  "না,না বল। এত রেগে যাচ্ছিস কেন? এমনি এমনি বললাম। তবে তোর ঐ অঙ্গীকার সম্পর্কিত রিসেন্ট যে কথাগুলো বলেছিস কিছু কিছু মাথার উপর দিয়ে বেরিয়ে গেছে।" হেসে হেসে বলে। অঙ্গীরা হাসে যেমন তেমনি অমর হাসে। ছদ্ম অভিমান ছেড়ে সাথে সাথে বলে -" বন্ধুত্বের সম্পর্ক এও একধ‍রনর অঙ্গীকার। সেই কবে থেকে মেনে আসছি দু'জনে বলত। সময়ের স্রোতে আরো নিবিড় হয়েছি। এর মূলে অঙ্গীকার ভিত্তি। এই অঙ্গীকারের আর কি বাকি আছে,বাকী থাকবেই তো,নাহলে চলমান জীবনের নিয়ম পরিবর্তনশীল গতিশীলতায় অপেক্ষা করছে নতুন কোনো অঙ্গীকার, নাহলে সম্পর্কের মূল্যবোধ টিকবে না তো!"
   "বল,বল। আমার ধৈর্য্য ধরছে না।" অঙ্গীরা আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে থাকে শোনার জন্য। 
 অমর বলে - "আর এক কাপ চা বল ভোলাদা'কে"
 "ভোলাদা দু'কাপ কফি।" 
 অমর শুরু করে - "কুসংস্কার থেকে বাঁচতে বিজ্ঞান হাত ধরার অঙ্গীকার করতে হয়। তেমনি তোদের জীবনে অঙ্গীকার নিয়ে পদে পদে বাঁচতে হয় - সব যুক্তিতে যেন পুরুষের অধিকার। বিপরীতে তোদের ভাবালুতা নিয়ে চলাটাকে পুরুষের পৌরুষত্ব ভাব জাগায়। এটা একটা সিস্টেমের অঙ্গ। একে ভাঙতে অঙ্গীকার করতে পারলে তবেই ব্যক্তত্বময়ী লাগে তোদের।" এই বলে কফিতে চুমুক দেয় অমর। কাপটা নামিয়ে বড়ই তৃপ্তির ঢঙে বলতে যাবে এমন সময় সৃজনী ও সৌর্য এসে হাজির। সৌর্য বলে - " ভোলাদা আর দুটো কফি। তা তোদের কি নিয়ে এতো গম্ভীর আলোচনা হচ্ছে?" 
অঙ্গীরা বলে - "এই অঙ্গীকার নিয়ে।" 
 সঙ্গে সঙ্গে সৃজনী বলে - "ও তো সুকান্তের অঙ্গীকার! পৃথিবীকে শিশুদের বাসযোগ্য করার দৃঢ় অঙ্গীকারের চেয়ে অত বড় অঙ্গীকার কেউ করতে পারেনি।" 
  অঙ্গীরা বলে - "আমাদের অমর ও সব অঙ্গীকারের ধার ধারে না। নারীবাদী অঙ্গীকার নিয়ে পড়েছে।  নারীর ব্যক্তিত্ব,অধিকার অর্জনের কি তাত্ত্বিক অঙ্গীকারের ঝাঁপি খুলেছে তোরা এলি,এবার শোন।" এই শুনে সকলে হো হো করে হাসতে লাগল।
  অমরকে সাপোর্ট করে সৌর্য বলে - "ঠিকই তো অমর যা বলেছে। আচ্ছা ইন্দিরা গ়াধী অঙ্গীকারে না আবদ্ধ হলে বাংলাদেশকে স্বাধীন করতে পারতেন। অঙ্গীকার সকল বিষয়ের সর্বঘটের কাঠালি কলার মত। রাজনীতিতে মেনিফেস্টো অঙ্গীকার কি নয়। বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক অঙ্গীকার নয়? অঙ্গীকার সকল আশা আকাঙ্ক্ষার আতুড়ঘর। অঙ্গীকার  আমাদের সকলের আইডেন্টিটি।" 
                 *****
 # বিষয় - অনুগল্প।
 #নাম - বিস্ময়াপন্ন।
               (৪)

    "ও বিভূতি যা না বাবা হালদার বাড়ির পূজোটা সেরে আয়।" পুন্নিবালা ভট্টাচার্য্য ছেলেকে কাকুতি মিনতি করে বলেন। "পূজো আমার দ্বারা হবে না।" এতদিন বাবার সঙ্গে যে গেলি কি শিখলি। রামকানাই ওরফে রামু চুপ করে থাকে। "কী রে উত্তর দে।" রামু এড়িয়ে গিয়ে বলে- "বললাম তো আমার দ্বারা হবে না।"  রামকানাই যাবে না বলে মায়ের মুখের উপর বলে দেয়।
  পুন্নিবালা দেবীর স্বামী বিরজা শঙ্কর ভট্টাচার্য রাতে খেয়ে শুয়েছিলেন। আর সকালে লাশ হয়ে ঘর থেকে যখন বেরলেন পুন্নিবালা দেবীর নয়নের জলে ভাসতে ভাসতে বিদায় দিয়ে,শূন্য ঘরে হাহাকার ভর্তি নিয়ে শুরু কপাল চাপড়ায়। রামুকে নিয়ে ভেবে অস্থির হয়। ঐটুকু ছেলে। জীবিকার কি বোঝে। বংশের পেশার কি হবে! আটবছরের ছোট্ট রামুকে নিয়ে কি করে বাঁচবে কূলকিনারা না পেয়ে শুধু হতাশ হয়ে কাঁদে আর কাঁদে। ঘরে দুটো দুধেল গরু। ঝাঁপড়ি আর পাঁপড়ি। মুক পশুও শোকে যেন নিথর। দুটো প্রাণীর পাশে দাঁড়িয়ে দুধটুকু সম্বল দিয়ে সংসার না হয় দেখা গেল। কিন্তু যজমান বাড়ি এতোগুলো কে সামলাবে। 
  "রামু যা বাবা। তোর বাবা যে বই পড়ে পড়ে মন্ত্র শিখিয়ে ছিলেন সেই বই নিয়ে দেখে দেখে মন্ত্র পড়ে পূজোটা সেরে আয়।" 
  "কিন্তু আমার পৈতে হয়নি। রামেশ্বর হালদার জ্যাঠু কি এ পূজো মানবেন মা?" রামু রাজি হয় না।
 "ওরে মানবে মানবে। যা না। গিয়ে দেখ। হালদার দা নিজে এসেছিলেন। বলে গেছেন তোকে যেতে।"
  "না,আমি যাব না। রামু সেই এক গোঁ ধরে বসে। আর পেটে খিদে ডন মারছে। না খেলে এখনি প্রাণ যায় অবস্থার কথা বলে রামু। উঠোনের দাওয়ায় হরিমন্দিরের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। আর ভাবে স্কুলে যাওয়ার কী হবে? স্কুল না যজমানী কোনটা সত্য!
 "ঠিক আছে  ঝা়পড়ি দেওয়া এক গ্লাস দুধ খেয়ে নিয়ে যা।" রামু দেখল এতেও হল না এড়ানো গেল না। চুপ করে বসে। এমন সময় হালদার বাবু পাঁচ বছরের মেয়ে শ্রীপর্ণাকে নিয়ে ভটচায্যি বাড়িতে এসে তাগাদা দিলেন। মা মরা মেয়ে। বড্ড মায়াভরা দুটো চোখ। বাপের সঙ্গে রামু কতবার হালদার বাড়িতে গেছে পূজো রীতিরেওয়াজ শিখতে। শ্রীপর্ণা রামু খেলা নিয়ে মেতে। পূজো চলছে,রামু আর নেই। শ্রীপর্ণার সঙ্গে খেলছে। মা মরা মেয়ে। রামুও বেশ মজা পায়।
  "রামু! ও রামু এদিকে আয়।" বলে তারস্বরে ডাকেন পূজারী শঙ্কর ভটচায্যি। হালদার বাবু বলেন - "ও দু'টো খেলছে খেলুক না। কি করতে হবে বলুন।" 
 ভটচায্যি বলেন - "সে কি আর পারবেন। মা ঠাকরুণ কি সুন্দর হাতের কাছে সব সাজিয়ে দিতেন।" বলে চোখ মোছেন। 
  "না, না আমি পারব। কি করতে হবে বলুন।" সহযোগিতার হাত বাড়ায়। পূজো শেষ হলে দু'জনে দেখেন রামু ও শ্রীপর্ণা তখনো খেলে যাচ্ছে আপন মনে। ভটচায্যি ম'শায়ের যাওয়ার সময় হল। রামুকে সঙ্গে নিয়ে যাবেন। কিন্তু শ্রীপর্ণা বাবাকে বলে - "ও আরেকটু থাকুক না। কাকু বরং চলে যাক। বাবা তুমি ওকে দিয়ে আসবে।" বাবার হাত ধরে অনুরোধ করে শ্রীপর্ণা। 
 হালদার বাবু ও ভটচায্যি ম'শায় অগত্যা রাজী হন,নিরুপায় ভাব করে।
 এই অকালে ভটচায্যি ম'শায় চলে যাওয়ায় দুটি পরিবার আজ কোন দিশা দেখতে চাইছে। শ্রীপর্ণা ও রামু কি শাস্ত্র-সংস্কার না জীবনের দাবি - কি মীমাংসার পথ ধরে যাবে! শ্রীপর্ণাই বা কেন বাপের হাত ধরে রামুর কাছে এলো! রামু কি করবে এবার! হালদার বাবুও তো এতো দুর্বল মন নিয়ে পুন্নিবালা দেবীকে কি বোঝাতে এলেন!  মহম্মদ পর্বতের কাছে এলে পর্বত কি করবে!
                ****
# বিষয় - অনুগল্প।
  #নাম - বিবর্ণ।
               (৫)

       জীবনের পাতা বেশ গাঢ় নীল-লাল-কালো-হলুদে এক বর্ণময় ইতিবৃত্ত নীলেন্দু সরকার ওরফে নীলুদা লিখে যান। যত সময় এগোয়, তত সে সব পাতাও একদিন ধূসর বিবর্ণ লাগে। স্ত্রী শিউলীদেবী নীলুকে তখন বললেন - "বয়স বাড়লে দৃষ্টি ধূসর হয়। বিবর্ণ লাগে। জীবনের পাতাকে বিবর্ণ মনে হয়। তখন ইতিহাস তার পাতা একে একে উল্টে সকল বিরহের বিবর্ণতাকে মুছে দিয়ে সোনা ঝকঝকে লিমার স্বপ্ন তুলে আনে। তাই জীবনের বিবর্ণতার গল্পে বর্ণময়তা আছে,নাহলে এ জীবন তোমার আমার বৃথা।" শিউলীর কথাতেই নীলু যেন ছোট্টবেলার সেই ব্ল্যাকবোর্ডে সাদা চকে কষা অংকে প্রমাণ খোঁজে এক্স ইজ ইকুয়াল টু শূন্য- উত্তরমালায় সেই উত্তরটা অপেক্ষায় থাকে। 
               ****
   #বিষয় - অনুগল্প।
  #নাম - *ফিরে দেখা।*
               (৬)

        বিদেশ বসু নামে যেমন কাজেও তেমন। বাবা মায়ের গর্বের ধন। আমেরিকায় বহুজাতিক কোম্পানীর মোটা মাইনের বেতনে কর্মরত। সে দেড় কোটি টাকা পার অ্যানাম। হাতের কাছে টাকার জোরে কোনো সুখের অভাব নেই। থুড়ি অভাব নেই বললে ভুল বলা হবে। ভগবান কোনো না কোনো একটা অভাব রাখবেন। কেননা জীবন মানেই চরৈবেতি। ছোট্টবেলা পেরিয়ে গেলে আর পাওয়া যায় না। ছোট্টবেলার অভাব পূরণ করতে ফিরে দেখতে হয়। বিদেশ বসু বিয়ে করেছেন এদেশীয় মেয়েকে। নাম বিউটি সান্যাল। ওদের ছেলে বিভান আমেরিকার জল হাওয়ায় মানুষ।
  বিদেশ প্রায়ই বলে - "বাবা আর ভাল লাগে না। এই আমেরিকার সম্পদ দিয়েছে যত কেড়ে নিয়েছে অনেক।" বিদেশ বসুর বাবা বলেন - "আয় এদেশে ফিরে। ফিরে আয় ফিরে পাবি তোর সেই মানুষ হওয়ার দিনগুলোকে। টাকার পেছনে ছুটতে ওখানে গেছিস। এবার পাঠ চুকিয়ে চলে আয়। তোদের নিয়ে আবার সে অতীতের দিনগুলোতে ফিরে যেতে চাই।" খুব আন্তরিক হয়ে মায়াময় মন দিয়ে ছেলেকে টানতে চান বাবা রঞ্জন বসু। আরো বলেন - "বিভানের মধ্যে তোর এখানের সেই ছোট্টবেলার মানুষ হওয়ার দিনগুলো দিতে ফিরে আয়।"
    ছেলে বিদেশ তখন বলে - "আমি সেই দিনগুলো,তোমার শাসন,মায়ের স্নেহ,মায়ের পরিপাটি রান্না,সেই খেলার মাঠ,বন্ধুকৃত্য ...সব হারিয়ে গেছে।  এখন আমি ফিরে দেখি আমার মত করে।এখানের মেটিরিয়াস্টিক ইমেজ বিভানের জীবন সম্পূর্ণ ওর। ও যখন নিজেকে ফিরে দেখবে তা হবে ওর নিজের, যা আজ ওর বাবা ফিরে দেখছে তার নিজের জগতকে। শুধু দেশ,কাল, পাত্র সব বদলে দিয়েছে। ফিরে যাওয়ার উপায় নেই, জীবন যে বড্ড অর্থনৈতিক নির্ভর। শুধু ফিরে দেখার মধ্যে সে তুমি আমি আছি। বিভানের মধ্যে তুমি নেই। আমি তোমাকে দিয়ে কিছুই দিতে পারিনি। যা দিয়েছি এখানের জীবন। ও যখন নিজেকে ফিরে দেখবে তখন ও আর ওর বাবা,তোমাকে পাবে না।"
                   ******

 # বিষয়।- অনুগল্প।
  #নাম - খেলা।
             (৭)

      ঘটনায় কলিজা হিম শীতল হয়ে যাচ্ছে যেন। বিতংসী বুঝতে পারে না কি করে নীলিমা এটা করল! কেন ও কিভাবে?  - দুটো কথাই বিতংসির মধ্যে নাভিশ্বাস তুলে দিয়েছে। রমাপ্রসাদ বলেছিল - "দ্যাখ বিতংসি এভাবে ভেঙে পড়িস না। বরং ভোলার চা দোকানে চল। চা নিলে দেখবি মনের অশান্তি পড়বে।" যেতে যেতে দেবাংসি বলে - "আমি তো কারো ক্ষতি করিনে। তাহলে আমার ক্ষতি করতে সুযোগ গ্রহণ করে কেন?" বলেই থমকে দাঁড়ায়। রমাপ্রসাদ বলে - "কি রে থামলি কেন?" রমাপ্রসাদ দেখে বিতংসি তার ব্যাগের চেন টেনে কি যেন খুঁজছে। আতিপাতি করে খুঁজেই চলেছে। হঠাৎ বিতংসি বলে - " আমি চললাম। তুই যা। আমি আসছি।" বলে হন্তদন্ত হয়ে চলে যায়। রমাপ্রসাদ ভ্যাবাচ্যাকা হয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবে - যাহ্! বাবা এই হল মেয়ে মানুষ! এদের মনের গতি পাওয়া মুশকিল। এই আছে তো এই নেই! খুঁজলই বা কি! পেলই বা কি! বাড়ীমুখো ছুটল আপন মনে! হাতের নাগালে অবশ্য একটা কি দুর্লভ বস্তু পেয়ে শুধু এক ঝলক আত্মতৃপ্তির ভাব দেখিয়েছিল। বাড়ির চাবি পেলে এমন হয়। বাবা মা এখনো ফেরার সময় হয়নি। বলল বাড়ী যাবে। ভাল লাগছে না। হন হন করে চলেও গেল। তার কাছে ভোলার চা ফালতু হয়ে গেল!
 বিতংসি অল্পেই টেনশন করে। কেউ ঠকালে তাকে চিরতরে প্রত্যাখ্যান করে। কলেজ ইলেকশনে নীলিমা তাকে জোর করে দাঁড় করিয়েছিল,নীলিমাকে খুব বিশ্বাস করত। অনেক পয়সা খরচ করিয়ে, ইলেকশনের সময় বিতংসির পয়সায় খেয়ে দেয়ে প্রতিপক্ষের হয়ে ভোট দিয়েছে। এ খবর বিশ্বস্ত সূত্রে আসে - ও প্রতিপক্ষের হাতে হাত মিলিয়েছিল গোপনে।
   বিতংসির শেষ কথাগুলো চায়ে চুমুক দিতে দিতে মনে করে রমাপ্রসাদ -  "নীলিমার দাঁড়ানোর ইচ্ছে ছিল। বিতংসির গ্রহণযোগ্যতার কাছে হার সে মেনে নিতে না পেরে তলে তলে রাজনীতির এই খেলা  খেলে গেল!ও বলতে পারত। ওই দাঁড়াত। তাবলে এক ভোটে হার! ওই ভোটটাই দেয়নি। রেজাল্ট বেরনোর সময় রমা ওর ভেতরের কুচক্রীর হাসি আমি দেখেছিলাম। তলে তলে এতো...!"  
                ******

    #বিষয় - অনুগল্প।
  #নায - রকবাজ।
                (৮)

       সময়টা কে কীভাবে ব্যবহার করবে তার উপর দেখে মানুষ চেনা যায়। রকবাজের সময় ব্যবহার এক তো শিক্ষাদীক্ষায় সময় থেকে জীবন আরেক। দীনেন্দ্র বাউরি ওরফে দিনু মধ্যবয়সে মধ্যবর্তী অবস্থানে ঝুলে - 'ন যযৌ ন তস্তৌ' কথাটা তাকে খুব ভাবায়, আর তার বাবা নলিনী কান্ত বাউরির কথা ভেবে ভেবে সারাটা জীবন কাটায়। তার বাবা বলতেন - "হয় তুই মুর্খ থাক,তাহলে দিন মজুর হয়ে দিন আনা দিন খাওয়া করে দিনযাপনে নিজের কাছে দায়বদ্ধ থাকবি,কাউকে দোষ দিয়ে গায়ের জ্বালা মেটাতে হবে না,নিজের দোষ কবুল করে মানিয়ে চলবি। আর মোটামুটি পড়াশোনা করবি তো মজুর হতে পারবিনা, আবার বড়সড় চাকুরে বাবুও হতে পারবি না। জীবনকে হয় এসপার না হয় ওসপার করে ছাড়।" দীনুকে তার বাবার চেয়ে বেশী কেউ জানত না। তাই কথাগুলো কানে গরম তেলের মত করে ঢালতে চাইলে কি হবে সব বৃথা হত। দীনুর মনে হত এ সব জ্ঞান। জ্ঞানকে গ্রাহ্য করা অনেকের স্বভাবের মত দীনুও সেই স্বভাব পেয়েছিল। মন তখন অন্য জগতের হাতছানিতে মজা পেয়ে গেছে,সে রকবাজির মধ্যে বেশ মজা আছে - অনেক বয়স্য জোটে। তাসের আড্ডা থেকে নেশা সব চলে। পাড়ার পূজোর জন্য চাঁদা তুলে পূজো করে। ভাড়াটিয়া আসা,কারো টিউশনি জোগাড় করে দেওয়া এ থেকে বখরা নিয়ে নিজেদের রকবাজ ক্লাবের খরচপাতি চালায়। আবার কারো মেয়েকে ঠকিয়েছে শুনলে তাকে হাড়ে হাড়ে টের পাইয়ে বশে আনা, তারাই আবার মেয়েদের গালি ও নিজের মুখের গালিকে বেশ আমেজে ভরপুর পায়। রকবাজি মানে জগাখিচুড়ি - হরেক রকম থাকবে। মানুষ ভয় ও সমীহ দুই করবে তবে।
    রাম শ্যাম ভোলা প্যালা নিয়ে দশ জনের দল দেখতে দেখতে বিশ পঁচিশ সংখ্যা হয়,আবার কখনো কখনো আপডাউন করে,নীতির প্রশ্নে তাদের সঙ্গ কেউ ছাড়ে তো কেউ এসে যোগ দেয়। দীনু জ্ঞান দাতা হয়ে সবাইকে বলে - "শুধু রকবাজি করলে হবে না,ভাল কাজ কিছু করে সবার সাপোর্ট নিতে হবে। রাজনীতির দাদারা পাশে ভিড়লে লাভ যেমন আছে,ক্ষতির দিকটায় ভেবে পা ফেলতে হবে। রক্তদান, মুমূর্ষু রোগীর পাশে দাঁড়ানো এসব করতে হবে। এর থেকে আমাদের ক্লাবের জন্য সরকারি ডোনেশন নিয়ে আসতে হবে। এই সব বলে দীনু দিনে দিনে পালের গোদা হয়ে ওঠে।
   এদিকে দীনুর বাবা হঠাৎ স্বর্গত হলেন। রকবাজি ক্লাবেও অনেকে তার প্রতিদ্বন্দ্বী। অর্থ যত অনর্থের মূল। দীনুর সেই সোনালী দিন নেই। তার কথা না মানার অনেক আমদানি হয়ে গেছে।
  বাবার অকাল বিয়োগ মায়ের হাপুস নয়ন দেখে দীনুর আর সহ্য হয় না। মন্দের মধ্যে ভাল যা বাবা বেঁচে থাকতে থাকতে কিছু জমি বেচে বোনের বিয়ে দিয়ে গেছেন। বাবার অবর্তমানে মা বীণাপানির করুণ ডাকে দীনুর কাঁধে এল সংসারের জোয়াল। রকবাজ থেকে বিমুখ হয় দীনু,নানা ঘটনার ঘাত প্রতিঘাতে। সংসারের কিই বা জানে সে। অথৈ সাগর লাগে। হঠাৎ বাবা চলে যাবেন, কে ভেবেছে! দীনু দেখে চোখে সরষে ফুল। সময়ের ব্যবহার নিয়ে বাপের কথা শুধু সম্বল মনে হয়। দীনু ভেবে পায় না কোন পথে যাবে। এতদিন যা করেছে তা তো ঘরের খেয়ে পরের মোষ তাড়ানো হয়েছে। এবার! সেই ভাগ্যের দোহাই। তোষমোদী,দালালী বড্ড অসম্মানের! রকবাজি করে ভবিষ্যৎ গড়া যায় না। সময়ের ব্যবহার না জানলে কেউ হয় প্রান্তিক কেউ বা ভাগ্যের অট্টালিকার চূড়ায়। দীনু জীবনের মধ্যবর্তী অবস্থায় মানসিকতায় মধ্যবিত্ত, দীনু অকুল পাথারে।
                  ******
    # বিষয় - অনুগল্প।
  # নাম - সময়।
             (৯)

   "নাঃ! সময়টা কি কোনোদিন ভাল যাবে না! যাতেই হাত লাগাই লোহা হয়ে যায়।" সুতনু কথাগুলোকে নিজের সময়ের কাছে বাসি ফুলের মত ছুড়ে দেয়। বিরক্তি জন্মে। কপালের দোষ ভাবে। এমনকি সময় ফেরাতে আংটি তাগা তাবিজ ধারন করেও নিস্তার হয় না। সব মিথ্যা, বুজরুকি মনে হয়। তোমার জন্য যৌবনের প্রেমও হয়ে গেল অধরা। একটু আগে চাকরি হলে হয়তো নীলিমাকে পেতাম। যখন দুঃখ আসে আকাশের কালো মেঘের মত অন্ধকার ছেয়ে যায়। বড্ড দুর্বল লাগে। এতো দুঃখ ভগবান কি তার ভাগেই রেখেছে!" এর উত্তর জানতে নিলীমার কাছে বলেও ছিল। নীলিমা চিনে নিল অতনুর সঙ্গে ঘর বাঁধা মানে চিরকাল দুঃখের সময়ের সাথে ঘর করা। বরং একটা যুতসই জবাব দিয়ে এড়িয়ে গেল এই বলে - "প্রেম করো যেথা সেথা বিয়ে করো বাপের কথায়।" সুতনু ভাবে হায়রে কপাল। সময়ের সৌজন্যে নীলিমাকে ভুলেও গেল। রমা ভুলিয়ে দিল। সময় এল বৃহস্পতি সাজে। একদিন হঠাৎ নীলিমার সঙ্গে রেজিস্ট্রি অফিসে দেখা। চোখাচোখি ভালমন্দ খবরাখবর তারপর নীলিমা স্বপ্নের মত চলে গেল। কিন্তু আসল কথাই জানা হল না। সুতনু নিজেকে সেই বোকা ভাবে,নীলিমা কাছে এলেই যেন বোকা বোকা ভাব সেই যেই কে সেই। কটা বছরেও সে দিব্বি তাই হয়ে আছে। চেপে বসে। ধিক্কার জানায়। এতদিন পর দেখা শ্বশুর স্বামী সন্তান কিছুই জানা হল না। সময় কেমন ঝপাস করে নীলিমাকে ভাসিয়ে নিয়ে চলে গেল! নীলিমাও কেমন এড়ানোর ভাব করছিল। নীলিমার জন্য নিজের জীবনের সময় যেন সেই আগের মত একটা অদৃশ্য দুর্ভাগ্য।  পিয়ন রমেশ বলল - "ঐ মহিলাকে চেনেন নাকি!" সুতনু ধরা পড়ার ভয়ে গম্ভীর ভাব করে। রমেশ বলে যায় - " ওর নাম নীলিমা সমাদ্দার। বাপের টাইটেল সামন্ত। ও ফিরে এসেছে বাপের কাছেই। পন নিয়ে ঝামেলা। বধূ নির্যাতনের মামলা চলছে।" বলে রমেশ চলে যায় ফাইল নিয়ে বড় বাবুর ঘরে। সুতনু জানালার ওপারে কালো মেঘ ঘনাতে দেখে,এই বৃষ্টি এলো বলে।  আর ভাবের অন্ধকারে হাতড়ায় সময়ের জন্য মানুষ, না মানুষের জন্য মানুষ! সময় তুমি কার? এই সতনু কি ও কে? নীলিমাই বা কে? রমা কে? সবই ও সবাই কি তোমার সৌজন্যে সবাই আলাদা?
         ********

৩টি মন্তব্য:

  1. পড়া শুরু করেছি। খুবই ভালো লাগছে 🙏শেষ হলে আবার মন্তব্য 💐

    উত্তরমুছুন
  2. আপনার গদ্য চয়ন সত্যি মুগ্ধ করার মতো।
    আর এ তো অনুগল্পের সমাহার।
    অসাধারণ দাদা💐💝

    উত্তরমুছুন
  3. মূল্যবান মণি মুক্ত গেঁথে এক মূল্যবান অলঙ্কার পাঠকের কাছে পৌঁছে দিলেন দাদা।

    উত্তরমুছুন

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল✍️ ডা: অরুণিমা দাস

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল ✍️ ডা: অরুণিমা দাস বর্তমানে অতিরিক্ত কর্মব্যস্ততার কারণে একটু বেশি সময় কাজে দেওয়ার জন্য হয়তো একের প্রতি অন্য...