মধ্যরাতের ট্রেন-এক রূঢ় বাস্তবের মুখোমুখি
✍️ ডা: অরুণিমা দাস
স্টেশনে বসে অনেকক্ষণ ধরে ট্রেনের অপেক্ষা করছে বিকাশ আর ওর তিনজন বন্ধু পায়েল, শিল্পী ও তরুণ। আসানসোলে এক বন্ধুর বিয়ে ছিলো, সেখান থেকেই ফিরছে ওরা সবাই। গিয়ে আবার কাল দুপুরে কলেজে ক্লাসে যোগ দিতে হবে। রাত প্রায় দেড়টা। ট্রেন আসার কথা ছিলো ১:১৫ টা নাগাদ কিন্তু এখনো অবদি এসে পৌঁছয়নি। একটু চিন্তায় আছে ওরা চারজন। শিল্পী বললো সকালে ট্রেন ধরলেই হতো। কি দরকার ছিল এত রাতের ট্রেন বুক করার? ভয় পাচ্ছিস নাকি? বিকাশ আড়চোখে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো। ভয় ঠিক নয় কিন্তু মশার কামড় আর চোরদের চক্করে পড়লে কি হবে সেটাই ভাবছি। দেখনা মোবাইলে টাওয়ার আসছেনা ভালো,ট্রেন কতদূর এলো বোঝা যাচ্ছেনা, বললো তরুণ। আসবে ট্রেন আসবে, বিকাশ সবাইকে সাহস জোগাতে লাগলো। আরও মিনিট পনেরো অপেক্ষার পর ট্রেন ঢুকলো স্টেশনে। ওরা চারজন ট্রেনে উঠলো। উঠে যে যার মতো সিট নিয়ে বসে পড়লো। বেশি লোকজন নেই রাতের ট্রেন বলে কথা। ট্রেন স্টার্ট করলো সবাই ওরা একে অপরকে আশ্বাস দিলো যে এবার পৌঁছে ক্লাস করতে পারবে। বিকাশ উঠলো টয়লেট যাবে বলে। যাওয়ার সময় পাশের কুপে হাসাহাসি শুনতে পেলো। ভাবলো ওর মতন কেউ হয়তো গ্রুপে এসেছে তাই হাসিমজা চলছে। সোজা চলে গেলো টয়লেটের দিকে মাথা না ঘামিয়ে। ফিরে এসে দেখলো ওদের কুপে একজন অচেনা লোক সাথে আবার সেলফি স্টিক নিয়ে বসে আছে। বিকাশকে ঢুকতে দেখে তরুণ আলাপ করিয়ে দিলো দেখে বিকাশ ইনি হলেন প্রকাশ যিনি বিভিন্ন অফবিট জায়গা এক্সপ্লোর করেন আর সেগুলোকে প্রমোট করেন,যেমন পরিত্যক্ত ট্রেনের কামরায় কীভাবে নিজেকে মানিয়ে নেওয়া যায়! জল খাবার ছাড়া কিভাবে আছি এসব দেখিয়ে পাবলিকের মন জয় করা যায়। বেশ ভালো প্রমোট হয়। দার্জিলিং সাইডে গেছি।
ওহ আচ্ছা।
এখন একটু ঘুমিয়ে পড়ি আমরা? প্রকাশ আপনিও যান ঘুমিয়ে পড়ুন। প্রকাশ বিড়বিড় করলো এরপর যা হবে ঘুম উড়ে যাবে আপনাদের। কিছু বললেন? বিকাশ জিজ্ঞেস করলো। না না! কিছুনা। প্রকাশ উঠে চলে গেলো নিজের সিটে। বিকাশ বাকি তিনজনকে ধমক দিল অচেনা লোককে কেনো এতো কথা বলছিস? পায়েল বললো উনি তো নিজেই এসে হাজির হলেন। আচ্ছা ছাড় এসব চল ঘুমিয়ে পড়ি। সবাই কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়লো। বেশ কিছুক্ষণ ঘুমিয়েছে,কেমন একটা ভ্যাপসা গন্ধ নাকে আসছে আর ট্রেন মনে হলো দাঁড়িয়ে গেছে,আর এগোচ্ছেনা। তরুণ উঠে বসলো বাকিরাও জেগে গেছে। হঠাৎ করেই প্রকাশ ঢুকলো ওদের কুপে। বললো ট্রেন আর এগোবেনা। দেখুন বাইরে কি ভীষণ ঝড় আর বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। গাছের ডাল ভেঙে পরে ট্রেন আটকে গেছে। তরুণ রা সকলে জানলা দিয়ে উঁকি মারলো দেখলো বিশাল ঝড় উঠেছে। কি হবে এবার? পায়েল এর শিল্পী ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলো? বিকাশ কিছু বলার আগেই প্রকাশ বললো আমার সাথে আসুন আমি অনেক জায়গা ঘুরি তো,একটা ভালো আস্তানাতে নিয়ে যাবো আপনাদের। বিকাশদের মনে হলো ওরা যেনো নিজেরা কিছু ভাবতে পারছেনা। প্রকাশকে ফলো করতে লাগলো। ট্রেন থেকে নেমে ঝড়ের সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে এগিয়ে যেতে লাগলো। প্রকাশের খুব একটা অসুবিধে হচ্ছিলো না ঝড়ে। খানিক দূর যাওয়ার পর প্রকাশ ওদের এনে তুললো একটা ভাঙ্গা পরিত্যক্ত ট্রেনের কামরায়, আগাছাতে ভর্তি। ওরা চারজন একে অপরের হাত ধরে দাঁড়িয়ে রইলো। নড়ার শক্তি টুকু নেই যেনো। আজ তোমরা আমার অতিথি। শুনবে আমার গল্প? এবার একটু বেশী ভয় পেতে লাগলো ওদের চারজনের। প্রকাশ বললো এই পরিত্যক্ত জায়গাগুলোতে আমি ঘুরে ঘুরে নিজেকে প্রমোট করি আর জায়গাগুলোকেও। আমরাও চারজনের একটা গ্রুপ ছিলাম। একদিন এরম কাজ করতে করতে সেলফি নিতে যাই আর ঠিক সেই সময়ে একটা ট্রেন এসে পড়ে। বাকি তিনজন সরে গেলেও আমি ট্রেনের তলায় চলে যাই আর ওরা কেউ আমার রক্ষা করতেও আসেনি। যে যার মতো পালিয়ে যায়। এই নাকি বন্ধুত্ব!
তারপর? আপনি কি তাহলে? কাঁপা কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করেন শিল্পী।
হ্যা আমি সেদিন কাটা পড়ি। তারপর থেকে ঘুরে বেড়াই আর চারজনের কোনো গ্রুপ দেখলে খুব রাগ হয় জানো! আপনি কি আমাদেরকেও তাহলে? না না ভয় পেয়োনা। তোমাদের কিছু করবোনা। একটাই অনুরোধ তোমাদের,খালি একটু আমার বাড়ীতে জানিয়ে দিয়ো। সেই বন্ধুরা তো কিছু জানায়নি। এখনো বেওয়ারিশ হয়ে পড়ে আছি। আজও আমার জন্য পথ চেয়ে বসে আছে বোন,মা,বাবা। ওদের একটু বলে দিও আর আমায় ক্ষমা করতে বলো। হয়তো এসব প্রমোট করার খেয়াল মাথায় না চাপলে পড়াশোনা করে বড় হতে পারতাম। গলাটা ধরে এলো প্রকাশের।
আপনার ঠিকানা দিন আমরা চেষ্টা করবো আপনার খবর পৌঁছে দেওয়ার।
এই নাও আমার ঠিকানা। অনেক ধন্যবাদ গো তোমাদের। ওই দিকে তাকিয়ে দেখো তোমাদের ট্রেন ঠিক হয়ে গেছে,ঝড় থেমে গেছে। তোমরা সাবধানে যাও। আর হ্যা বন্ধুত্ব ঠিক একরকম অটুট থাক তোমাদের। ওরা চারজন এগিয়ে গেলো, পেছনে তাকিয়ে দেখলো প্রকাশ ওদের হাত নাড়ছে আর একটু একটু করে মিলিয়ে যাচ্ছে। ওরা চারজন কথা রেখেছিল,প্রকাশের বাড়ীতে সব জানিয়েছিল। প্রকাশের বাড়ীর সবাই ভেঙে পড়লেও সময়ের সাথে মানিয়ে নিয়েছিলো। তারপর থেকে প্রকাশের বাড়ীতে মাঝে মাঝেই যাতায়াত চলে ওদের। প্রকাশের কৃতজ্ঞতা আর উপস্থিতি ওরা মাঝে মাঝেই বুঝতে পারে কিন্তু তাতে ওদের আর ভয় করেনা কারণ জানে ওদের কোনো ক্ষতি প্রকাশ হতে দেবেনা। এখন প্রকাশের বাবা মা বোনের জন্য ওরা চারজন এক নিশ্চিন্ত আশ্রয়। বিকাশ আজও বন্ধুদের বলে যতই ট্রেনে যেখানে যাই ওই রাতের জার্নি আজও এক রূঢ় বাস্তবের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন