রবিবার, ৮ আগস্ট, ২০২১

বেয়াড়া কেশ (কলমে পিয়ালী চক্রবর্তী)



ন্যাড়া মাথাটাতে হাত বুলোতে বুলোতে, নিজের পরিবর্তিত রূপ দেখে রূপাঞ্জনা ভাবছে সেই পুরোনো দিনের কথাগুলো। হাওয়ায় যখন কানের পাশের চুলগুলো উড়ে এসে সময়ে অসময়ে ওর নাকে মুখে পড়ে সুড়সুড়ি দিতো, আর ও রেগে উঠে বলতো, "একদিন মাথা মুড়িয়ে ন্যাড়া হয়ে যাবো এই জ্বালাতন চুলগুলোর উপদ্রবে।"


তখন ও ভাবতেও পারেনি ওর বলা কথাগুলো এভাবে সত্যি হয়ে যাবে! গতবছর ব্রেস্ট ক্যানসার ধরা পড়ে রূপাঞ্জনার। তারপর মাসটেক্টমি এবং অবশেষে কেমোথেরাপি। সুন্দর ঢেউখেলানো বাদামী চুলগুলো যখন গুচ্ছে গুচ্ছে ঝরে পড়ছিল, তখন মস্তক মুন্ডন ছাড়া আর কোনো উপায় ছিলনা ওর এবং ওর পরিবারের সকলের।


মুন্ডিত মস্তকে হাত বুলিয়ে এখন অন্তহীন অপেক্ষায় রূপাঞ্জনা। কোনোদিন কি সে আবার ফিরে পাবে তার উৎপাতী বেয়াড়া কেশগুলো!

Copyright © All Rights Reserved to Piyali Chakravorty

#নাম- আত্মা-প্রসঙ্গ।✍ - মৃদুল কুমার দাস ।

শুভ আধ্যাত্মিক আলোচনা-বাসর।
# বিষয় - *আধ্যাত্মিক।*
 # নাম- *আত্মা-প্রসঙ্গ।*
  ✍ - মৃদুল কুমার দাস। 

         আত্মা ও পরমাত্মা - আত্মা জীবের ভেতরকার এক অদৃশ্য শক্তি ( আধ্যাত্মিক ভাষ্যে যার পরিচয়- সাইকিক বিয়িং- Psychic Being),আর পরমাত্মা হলেন পরমব্রহ্ম শক্তি। পরমাত্মাই আত্মার মধ্য দিয়ে প্রকাশ,যার পরিচয় দিতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ বলেই ফেললেন- *"ত্রিভুবনেশ্বর আমায় নইলে তোমার প্রেম যে হত মিছে।"*
  পরমাত্মা থেকেই আত্মার সৃষ্টি। পরমাত্মার অংশ বলে আত্মাও পরমাত্মার মত অবিনশ্বর। আত্মা পরমাত্মার অংশ বলে পরমাত্মার মত আত্মাও পবিত্র। আত্মার সেবা হলেই পরমাত্মার সেবা হয় - *"জীবে প্রেম করে যেই জন,সেই জন সেবিছে  ঈশ্বর।"* জীব সেবা মানেই আত্মার সেবা। সেবা দান ও গ্রহণের মধ্য দিয়ে আত্মা পবিত্র হয়ে ওঠার মধ্যে একটি অন্যতম উপায়। এই স্বরূপ বা কী? স্বরূপ জানতে যেতে হবে যাজ্ঞবল্ক্যের উপনিষদের কাছে। তাহলে যাওয়া যাক সেই উপনিষকার,হিন্দুধর্মের এক বিশিষ্ট প্রবক্তা যাজ্ঞবল্ক্যের কাছে।
   তর্ক যুদ্ধে গার্গীর কাছে যাজ্ঞবল্ক্য এই হারেন আর কি একের পর পর এক প্রশ্নে জেরবার হয়ে। শেষে আত্মার  স্বরূপ জানতে গিয়ে যাজ্ঞবল্ক্য বলেছিলেন মেয়েদের এ নিয়ে জানার অধিকার নেই। সেই একই ভাবে স্ত্রী মৈত্রেয়ী যখন জীবনের অমৃতত্ত্ব কি জানতে চাইলেন,গার্গীকে এড়িয়ে গেলেও মৈত্রেয়ীকে পারেননি এড়াতে। জীবনের অমৃতত্ত্ব বোঝাতে গিয়ে আত্মার স্বরূপ বুঝিয়ে ছিলেন।
   আত্মার স্বরূপ মৈত্রেয়ীকে বোঝাতে গিয়ে
যাজ্ঞবল্ক্য বলছেন____
  ১. প্রাণ দ্বারা প্রাণিত যে হচ্ছে তাই তার আত্মা। সব কিছুরই সে অভ্যন্তরীন। তাকে চোখে দেখা যায় না।
   ২. পৃথিবীতে থেকেও পৃথিবীর অন্তরালে,
         পৃথিবী যার শরীর, যে পৃথিবীর অভ্যন্তরে থেকে পৃথিবীকে নিয়ন্ত্রন করছে সেই তোমার আত্মা। সেই অন্তর্যামী ও অমৃতত্ত্ব।
   এই আত্মাই হল ব্রহ্ম। ব্রহ্ম মানে বৃহৎ। আত্মা সম্পর্কিত জানবার জ্ঞানই হল ব্রহ্ম
জ্ঞান।
  আত্মা এক ও অবিনশ্বর।আত্মা এক বলে
তা হতে জীবের সৃষ্টি একটাই নিয়মে। একটি কোষ হয় বহুকোষীয়। একটি মানুষ ছড়িয়ে পড়ে বহু মানুষে।
    যাজ্ঞবল্ক্য বলছেন মানুষের দুটি সত্ত্বা। ব্যষ্টি ও সমষ্টি। মানুষ ব্যষ্টি হয়ে যখন বাঁচে,তখন সে নিজের জন্য বাঁচে। যখন সমষ্টি সত্ত্বা নিয়ে বাঁচে তখন তার বাঁচাটা হয় 
দেশের জন্য। সমাজের জন্য। ব্যক্তি সত্ত্বা  তখন সমষ্টি সত্ত্বার মধ্যে নিজেকে বিলিয়ে দেবে। এই সমষ্টি সত্ত্বাই হল বিশ্ব সত্ত্বা। বিশ্ব সত্ত্বা অক্ষয়,অমর। যে বিশ্ব সত্ত্বার স্বরূপ সম্পর্কে না জেনে পৃথিবী থেকে বিদায় নেয় সে হয় কৃপার পাত্র। আর যে বিশ্ব সত্ত্বা 
তথা ব্রহ্ম সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করে পৃথিবীতে আর ফিরে আসে না, তাকে আর জন্ম নিতে হয় না। মুক্তি পায় সে।
ইহ জগত তাকে অমরত্ব দিয়ে ধারন করে।
    এই আত্মার বাইরে যা কিছু তাই আর্ত। এই আর্ত অর্থাৎ বাইরের শক্তি আনে 
বিচ্ছিন্ন এককের বোধ। আর তখন সেই হয়
খন্ডিত। কেবল ব্যক্তি সত্ত্বার অধিকারী।
       তাহতে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক এই একক সত্ত্বা কি তাহলে বৃথা ?
         আদৌ নয়। বলা হয় এ ধরনের সত্ত্বা অসম্পূর্ণ। এরা মৃত্যুতেও শান্তি পায় না।
      তাই বলা হয় আত্মা একা নয়। আত্মার সঙ্গে আত্মার মিলন চলে অহরহ। থাকে অনন্ত তৃপ্তি। সেই প্রবনতা থেকে নারী পুরুষের মিলন অনন্ত ব্রহ্ম জ্ঞানের সমান।
     আত্মার মৃত্যু নেই, মৃত্যু আছে কেবল নশ্বর দেহে। নশ্বর দেহের যখন আত্মা বিশ্ব সত্ত্বার সঙ্গে মিলনের পথ পেয়ে যায়,তখন নশ্বর দেহের মৃত্যু ভয় দূর হয়। আর মৃত্যু ভয় তারই দূর হয় না যে নিজের ব্যক্তি 
সত্ত্বার বিলোপ ঘটাতে পারে না। তাকেই এক প্রকার পরাজয়ের গ্লানি ভর করে। বিশ্ব সত্ত্বার সঙ্গে মিলিত হতে যে পারে সেই তো বলতে পারে মৃত্যুতে সব শেষ নয়। ব্রহ্ম জ্ঞানী হলে মৃত্যুভয় দূর হয়। ব্যক্তি মানুষের মৃত্যু আছে,মনুষ্যশ্রেনীর নেই। কোনো ব্যক্তি মানুষ না থাকতে পারে, কিন্তু মনুষ্য সমাজ থাকবেই।
    এই উপনিষদিক ভাবনায় তাই রবীন্দ্রনাথ
বলেছেন_____
             " বিশ্বভরা প্রাণ/ তাহারি মাঝখানে
আমি পেয়েছি মোর স্থান..." 
    আত্মার স্বরূপ মোটামুটি একটা ধারণা হল। যে ব্রহ্মের অংশ সেই তো পবিত্র। কিন্তু আত্মার দোষ আছে, আত্মাতে সেই দোষ আসে মোহ থেকে,অহং থেকে। ব্যবহারিক জীবনের চাওয়া পাওয়ার ভোগাকাঙ্খা থেকে লোভ লালসা,মিথ্যাচার,ঈর্ষা,হিংসা,ক্রোধ তথা সকল জীবনের নেতিবাচক দিকগুলি আত্মাকে অপবিত্র করে। মূল্যবোধ - দান দয়া সংযম,সততা,ভাব,ভক্তি, ভালবাসা দিয়ে পরমাত্মার কাছাকাছি হতে হয়। ভগবানের কৃপালাভ পেতে হলে আত্মার পবিত্রতা রক্ষা করে চলতে হয়। ভগবানের সেবার পথে আত্মার শুদ্ধতা আসে। ত্যাগ, তিতিক্ষা,দয়া,করুণা,বিশ্বাস,নিবেদন,ধ্যান সব আত্মাকে পবিত্র রাখার এক একটি বলিষ্ঠ উপাদান। জগৎ মায়াময়,মায়া আনে অহংকার। অহংকার মুক্ত না হলে জীবন মিথ্যা মনে হয়। মিথ্যাচার নিয়ে বাঁচার মধ্যে জীবনকে বড়ই লঘু মনে হয়।  আত্মার পবিত্রতা মানেই দরদী,সহানুভূতিশীল,উদারতা,নির্লোভ - এক অমৃতময় জীবনের অংশীদার হওয়া যায়। শত দুঃখের মধ্যেও সেই তো হাসতে পারে যার আত্মা পবিত্র।
              *****
 # কপিরাইট রিজার্ভ ফর মৃদুল কুমার দাস।

শনিবার, ৭ আগস্ট, ২০২১

আত্মার পবিত্রতা! (কলমে পিয়ালী চক্রবর্তী)



নির্গুণ, নিরাকার পরম ব্রহ্মের অংশ আত্মা। এর সৃষ্টি, ধ্বংস বা কোনরূপ পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। আত্মা সদা সর্বদা শুদ্ধ। কোনো কলুষতা, কোনো কালিমা একে স্পর্শ করতে পারেনা। তাই আত্মা চির পবিত্র, চির শাশ্বত, অমর, অজেয়, অবিনশ্বর, অমলিন, চিরন্তন ও নির্গুণ।


পবিত্র বা অপবিত্রতা শুধু মানুষের অন্তরে বা সহজ কথায় বলা যেতে পারে, আমাদের মনেই যত পবিত্র, অপবিত্র লুক্কায়িত। আত্মাকে যদি *আত্ম* জ্ঞান করি, তা ভুল। আত্মা কখনোই আত্ম নয়। মানুষ নিজেদের মনের গুণে ধনলাভ করেন। এক্ষেত্রে ধনের অর্থ কখনোই বিষয় সম্পত্তি নয়, মানসিক ও চারিত্রিক মান্নোয়নন এই ধনলাভের মানদণ্ড। মনকে নিয়ন্ত্রণ করে আত্মশুদ্ধি বা আত্মপবিত্রতা রক্ষা করা যায়। যেহেতু আত্মা নির্গুণ পরমব্রহ্মের কণাসম, তাই পবিত্রতা রক্ষা করার প্রশ্নই আসে না। কর্ম কখনোই আত্মার হয়না। তাই কর্মের ফলও আত্মার নয়। কর্ম হয় মানুষের নিজের। আপন কর্ম উত্তম হলে আত্মশুদ্ধি সম্ভব। 


অনেকেই এক্ষেত্রে বলতে পারেন, "বদ আত্মাও তো থাকে, যারা আমাদের ক্ষতি করার চেষ্টা করে"। তাদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই, বদ আত্মাও সেই পরম শক্তির কণা মাত্র। মৃত্যুর পরে শরীর থেকে নির্গত আত্মা জীবদ্দশার কর্মফল অনুযায়ী দশা প্রাপ্ত করে। কর্ম যদি মন্দ হয় তবে, প্রেতযোনীতে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বিচরণ করে তবেই তার পুনর্জন্ম লাভ করা সম্ভব। কিন্তু, এই দুটিকে গুলিয়ে ফেললে কখনই চলবে না। আত্মা অবিচল, প্রকোপ যা, তা শুধু কর্মের ফল।

Copyright © All Rights Reserved to Piyali Chakravorty

শুক্রবার, ৬ আগস্ট, ২০২১

মেয়েদের সব সময় নজরদারিত রাখতে হয়। ( কলমে - পারমিতা মন্ডল ।)

আজ প্রাতঃকালীন আলোচনার বিষয় -
    *মেয়েদের সবসময় নজরদারির মধ্যে থাকতে হয় ।*
        কথাটার গুরুত্ব বিচার করো।

সকাল থেকে বিষয়ের উপর অনেক ভারী ভারী লেখা পড়ে আমার মনটাও ভীষণ ভারী হয়ে গেল । মেপে দেখলাম দশ মন ওজন হয়ে গেছে। আর টেনে তুলতে পারছি না । তাই আর লিখতেও পারলাম না। এখন একটু হালকা বোধ হচ্ছে । চল সবাই হেসে আরো একটু হালকা হই-----

মেয়েদের সব সময় নজরদারির মধ্যে থাকতে হয় উদাহরণ ---

1) সকাল থেকে ময়না বৌদি চেষ্টা করে  যাচ্ছে বরের পকেট কাটার। অনলাইনে একটা ভালো শাড়ি দেখেছে । উর্মি কিনে ফেলেছে। এখন ময়না বৌদি যদি না কেনে তবে মান- সন্মান তো থাকবে না। বরের কাছে টাকা চেয়েছিল ,দেয়নি। অগত্যা পকেট কাটা ছাড়া আর উপায় নেই। কিন্তু দেখো কিপটে বুড়োর নজরদারি। একেবারে শকুনের চোখ।  দেখ কেমন কুতকুত করে চেয়ে আছে। যেন পুলিশের চোখ ? এতো নজরদারি কেন বাপু ? আমি কি তোমার প্রেমিকা নিয়ে পালাচ্ছি ?

অথচ সুন্দরী মেয়ে দেখলেই এই চোখ আবার ড‍্যাব ড‍্যাব হয়ে যায়।  কিন্তু বৌ যদি ভুলেও কারো দিকে তাকায় , তাহলে আর রক্ষা নেই।পারলে পুলিশি পাহারা বসিয়ে দেয়। বৌ যেন কেনা সম্পত্তি।



2) প্রেমিকাকে নিয়ে প্রেমিক ঘুরতে বেরিয়েছে । একজনের সাথে ঘুরছে ,তাকাচ্ছে হাজার জনের দিকে । দেখো টেরিয়ে টেরিয়ে দেখতে দেখতে চোখ ট‍্যারা হয়ে গেল ! অথচ মেয়েটা শুধু একবার বলেছিল, সামনের টেবিলে বসা ঐ ছেলেটাকে দেখতে খুব সুন্দর। একেবারে হ‍্যান্ডসাম । ব‍্যাস  ওর পিছনে CID এর মতো নজরদারি করতে লেগে গেল।  পারলে গান্ধারীর মত চোখে পট্টি বেঁধে দেয় আর কি ? কেন রে বাবা ! তোর বেলায় তো দোষ নেই । আমি দেখলে দোষ ?

3) সপিং এ এসেছে  জয়িতা কর্তাকে ফাঁকি  দিয়ে। অনেক দিনের ইচ্ছা বরের চোখে ফাঁকি দিয়ে দামি নেকলেসটা কিনবে। সেই জন্য ATM টা হাতিয়েছিল । নেকলেসটা পছন্দও হয়েছে । প‍্যাকেট করে যেই বিল পেমেন্ট করতে ATM টা দিল। দেখে একটাও টাকা নেই !  কিভাবে হলো ? আসলে ওনার কর্তা সব সময় গিন্নির উপর নজর রাখছিল। সেদিন কার্ডটা রাখার সময় দেখছিল গিন্নি জুল জুল করে তাকাচ্ছে। ভাগ‍্যিস নজরদারি করেছিল। তাই টাকা গুলো বেঁচে গেল।

4) মেয়েটিকে নজরদারি করতে করতে কালু মস্তান পৌঁছে গেছে কলেজের গেটে।  সুযোগ পেলেই ধরবে । ওর  পিছু পিছু আরো কয়েকটি এসেছে ।  অনেক দিন হয়েছে ও আমাদের হাত থেকে বেঁচে গেছে । আজ আর রক্ষা নেই। গলির মধ্যেই কেড়ে নিতে হবে সব।  হঠাৎ মেয়েটি পিছন ঘুরে বলল "-- কালুদা , কেক এনেছি । খাবে ? " "আরে এতোক্ষন তো ওটাই নজরদারি করছিলাম । কাকিমা তো বলল -- "নাহলে তুই সব একা সাটিয়ে দিবি। আমার তো বোন নেই রে।"এই জন্য তো তোকে চোখে চোখে রাখি।


সব নজরদারি খারাপ নয় । 

একটু হাসানোর সামান্য চেষ্টা।

all rights are reserved by paramita mandal.





#নাম- নজরদারী ও মেয়েরা। ✍ - মৃদুল কুমার দাস।

শুভ প্রাতঃকালীন আলোচনা-বাসর। 
 # বিষয় -
    *মেয়েদের সবসময় নজরদারির মধ্যে থাকতে হয় ।*
     # নাম- 
   *নজরদারী ও মেয়েরা।* 
✍ - মৃদুল কুমার দাস। 

       পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ক্ষমতালোভী ও ক্ষমতা ভোগী। জৈবিক প্রবৃত্তিতে এক ধরণের কাঠিন্য কোমলতার বিপরীত মেরুতে অবস্থান থেকে পুরুষ পুরুষই,জৈবিক প্রবৃত্তিতে কোমলতার স্বরূপে নারী নারী। পরস্পরের প্রতি আকর্ষণ জিনগত চাহিদা। সেখানে সৃষ্টির একটা বীপরীতধর্মিতায় তূল্যমূল্য বিচারে পুরুষ দৃঢ়,নারী কোমল। 
  মাতৃতান্ত্রিক সমাজে এ প্রমাণিত সত্য যে নারী কিন্তু দুর্বল ছিল না। পুরুষ বানাল দুর্বল। আর তা থেকে এলো পুরুষতান্ত্রিক সমাজ। নারীকে সেক্স উইকার হিসেবে(ভারী কাজে) দেখাটা থেকে পুরুষ ক্ষমতা দখলের সুযোগ পেল। 
  এই যে সেক্স উপকার বললাম এর মাত্রা ক্ষেত্রবিশেষে নানারকম তার গতি। ঘরে বাইরে তাকে দুর্বল করে দেখাটা একটা অভ্যেসে পরিণত করল। নারীকে আদি থেকে শিক্ষাদানে পিছিয়ে রাখার জন্য নারীও চিন্তায় ও ভাবনায় নিজেকে এগিয়ে যেতে দিল না। বৈদিক যুগের আদিতে গার্গী,মৈত্রেয়ী,অপালাদের পুরুষের সমকক্ষ ভাবা হতো না। গার্গীর আত্মা কী,জীবনের অমৃতত্ত্ব কী  জানার অধিকার ছিল না,যাজ্ঞবল্ক্য গার্গীকে তাই বলেছেন। মেয়েরা পুরুষের বেশ ধারণ করে,মুন্ডিত মস্তক শিখা ধারণ করলে পুরুষের সঙ্গে তর্ক যুদ্ধে অগ্রসর অধিকার পেত। অষ্টাদশ শতাব্দীর হটিলঙ্কারের কথা তাই প্রমাণিত সত্য। বৌদ্ধযুগে বিদুষী আম্রপালী হয়ে গেলেন নগরের নটী। নগরের সকল জ্ঞানী গুণীর ভোগ্যা হলেন। পুরুষতান্ত্রিক ব্যবস্থার কাছে আম্রপালি পন্য। আম্রপালির কোনো প্রতিবাদের অধিকার ছিল না। পুরুষের ক্ষমতার দাসত্ব করতে নারীকে হতে হল সতী,বিষকন্যা ও দেবদাসী। তারপর তো বিধবা থেকে কত কি - মেয়ে হয়ে জন্মানো দুর্ভাগ্য,ভাগ্যের মন্দে তো পুরুষতান্ত্রিকতা কারিগর। তাহলে মেয়েদের নিয়ে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের বিধানের হরেক ফিরিস্তি আজও ভাবনার জায়গায় স্বস্তি নেই। সেক্স উইকার হিসেবে দেখার প্রবণতা না ঘুঁচলে নারীর দুর্ভাগ্য কোনোদিন ঘোচার নয়। দুর্বলতাকে বিধাতার বিধানের হাতে ছেড়ে দেওয়া - 'আপনার ভাগ্য জয় করিবার নাহি দিবে অধিকার।'
  এই যে মেয়েদের ঘরে বাইরে নানা বিপদের ঝুঁকি ভাবনার আরেক দুর্বলতা। তাই নিয়েই তো সবসময় নজরদারি নারীর উপর। নারীকে পুরুষ তার সেক্সচুয়াল ক্রাইসিস থেকেও মেয়েদের উপর প্রতিশোধমুখী হয়। তার হাত থেকে সমাজকে স্বস্তি দিতে মেয়েদের মাতৃজ্ঞানে সম্মানের  কথা বলা হয়েছে। 
   সমাজে নারী ও পুরুষের মধ্যে উইকার ও স্ট্রঙ্গারের বৈষম্য যতদিন সমস্যা ততদি। উইকার নারী বলে নজরদারির মূলেও থাকে সেক্সচুয়াল প্রবণতা। শৈশব থেকে নজরদারি এটা কোরোনা,ওটা কোরোনা। কেমন করে চলতে হবে চলে আদবকায়দা শেখানোর নজরদারি। এতে মেয়েদের নিজেদেরই আর্থ-সামাজিক অবস্থার উপর দাঁড়িয়ে নজরদারি একটা কালচারে পরিণত হয়। তাদের থেকে সমাজে ও পুরুষ আমি নারীর বিভাজন আসে। আর বিভাজন থেকে আসে লক্ষ্মণরেখা। সোনার হরিণ শিকারে রাম গেলেন তো গেলেন, সীতাকে নজরদারিতে লক্ষ্ণণকে রাখার সেই একই কথা। লক্ষ্মণ সীতাকে একা রেখে যাচ্ছে গন্ডী কেটে। গন্ডীই লক্ষ্মণের অনুপস্থিতে নজরদারি রাখবে। নারীকে  নজরদারির মধ্যে থাকতে হবে -  এটাই অলিখিত সিস্টেম।
    বর্তমান নারীকে রক্ষার জন্য আইনের ধারার কি শেষ আছে! নারীকে নজরদারি করে এই সব আইন। নারীকে সাবলম্বী করার পুরুষতান্ত্রিক ব্যবস্থা কণামাত্র স্পেস দেয়নি,এ নাকি এক পবিত্র কর্তব্য। কর্তব্যের নামে নারীর দুর্বলতাকে পরোক্ষে বার্তা দেওয়া হচ্ছে,বোঝেও বুঝবে কে? নজরদারি,খবরদারি যে চলে যাবে না! 
    নজরদারির আরেক সিস্টেম খুব সুন্দরভাবে প্রকাশ্যে দেখি। মেয়েদের হাতে মোবাইল দিতে মানা। দিলে পুরুষ ফুসলে নিয়ে যাবে। ছেলেরা মেয়েদের শিকার করে মোবাইল দিয়ে। মোবাইল থেকে মেয়েদের ধর্ষিতা,অবৈধ সম্পর্ক,ছেলের  জন্য বাবার অর্থ,গহনাগাটি সর্বস্ব যাওয়া এখন তো আকছার। তাই গ্রামে মোবাইল ব্যবহারের মেয়েদের বিধিবিধানের বেড়া থাকে। তথ্য বলছে গ্রামে মোবাইল ব্যবহারকারী মেয়েদের সংখ্যা বারো শতাংশ,পুরুষ অষ্টাশি শতাংশ। নজরদারির এও এক হিস্যা। 
  আসলে মেয়েদের দুর্বল ভাবা পুরুষের একটা ম্যানিয়া। নারীর প্রতি সন্দেহ থেকে নজরদারি নাকি বাস্তব পন্থা। এই নজরদারিতে সমাজে এখনও মেয়েদের দুর্বল বানিয়ে রাখা হয়েছে। একটা দেশের দুর্বলতা মেয়েদের প্রতি নজরদারিকে ঘিরে গড়ে ওঠে। আজ মেয়েরা কোন অংশে কম। প্রমাণ সর্বত্রে। তবুও নজরদারির সিস্টেম সমাজকে দুর্বল যে কতটা করছে,মানাটা একেবারেই আপেক্ষিক। এই নজরদারি থেকে মেয়েদের হতাশাময় জীবনকে অভিশপ্ত করছে।
           ******
# কপিরাইট রিজার্ভ ফর মৃদুল কুমার দাস।

বৃহস্পতিবার, ৫ আগস্ট, ২০২১

আমের আঁটি( কলমে-- পারমিতা মন্ডল)

বিষয়----সান্ধ্যকালীন আলোচনার বিষয়:
*আমের মাঝখানটাতে থাকে আঁটি, সেটা মিষ্টিও নয়,নরম নয়,খাদ্যও নয়। কিন্তু ঐ শক্তটাই সমস্ত আমের আশ্রয়, ঐটাতেই সে আকার পায়।*😊
ধন্যবাদ ও শুভ বিকেল।

কলমে--- পারমিতা মন্ডল।

১মঃ।  জীবনটা একেবারে আমের আঁটির মতো হয়ে গেল গো।  চুষতে চুষতে একেবারে শেষ করে দিল । সকাল নেই সন্ধ্যা নেই চরকির মতো ঘুরছি । দুটো পয়সার জন্য । আর ঐ মহাজনটারে দেখ ? দুটো পয়সা কম নেবে না । একেবারে চুষে খাবে । 

২য়ঃ। ও দিদি , বলি হলোটা কি ?  আজ আবার ক্ষেপলে কেন ?

১মঃ। ক্ষেপেছি কি আর সাধে ? ঐ মালিকের কারখানায় এতোদিন কাজ করে কারখানাটাকে দাঁড় করিয়ে দিলাম। আর এখন দেখ ,যেই সুন্দরী মেয়েরা আসতে শুরু করেছে, আমাদের আমের আঁটির মতো ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে। কত করে বললাম দশটা টাকা কম নাও । তা শুনলোই না।

২য়ঃ আসলে কি জানো দিদি । মালিক রসালো আম দেখে আঁটির কথা ভুলে গেছে । কিন্তু রসালো আম যে এক সময় ফুরিয়ে যাবে। আঁটিটাকেই তো যত্ন করে রাখতে হবে । আঁটিই তো পরবর্তীতে বংশবিস্তার করবে। 

১মঃ আরে হ‍্যাঁ , সেটাই তো বোঝাতে পারলাম না ।  সুন্দরী দেখে একেবারে গলে গেল । ওরা তো রসালো আমের মত। ওদের রূপের মোহে পড়েছে তো জীবন শেষ । এই তো সেদিন দেখলাম -- "সুন্দরী সুবেশী নয়না কে কত বেশী টাকা দিয়ে আপয়েন্ট করলো । দু'দিন  পরে তো ফুঁড়ুত। বুড়োর এখন মাথায় হাত। অনেক টাকা নিয়ে পালিয়েছে তো ? রূপের মোহে ভুলেছিল যে ।

২য়ঃ তাই নাকি গো ? অথচ দেখ । তোমরা কিন্তু এখনো যাওনি । তোমাদের চেষ্টা সব সময় কোম্পানিটাকে আরো বড়  জাযগায় নিয়ে যাওয়া। তোমরা হলে পুরনো লোক। একটু কড়া কথা বলো ঠিকই কিন্তু প্রকৃত কাজ তোমরাই কর।

১মঃ    আমাদের মালিকটা সেটা বোঝে না । আমরা হলাম আমের আঁটির মত। উপরটা বড় কঠিন । কারণ আমরা শ্রমিক । আমাদের উপর দাঁড়িয়ে আছে কোম্পানির ভবিষ্যৎ। যেমন আমের আঁটির উপর নির্ভর করে তার বংশ বিস্তার।  তেমনি কোম্পানির বিস্তার ও নির্ভর করে তাদের শ্রমিকদের উপর। শ্রমিকরাই কোম্পানির একমাত্র আশ্রয়স্থল । কিন্তু মালিকরা সেটা ভুলে যায়।

২য়ঃ আমের আঁটিকে যদি জল মাটি সার দিয়ে উপযুক্ত পরিবেশ দেওয়া হয়, তাহলে  সে  একদিন বৃক্ষ হয়ে ফুলে ফলে ভরে দেয়।  তেমনি একজন শ্রমিক ও যদি উপযুক্ত পরিবেশ পায় তাহলে সে অট্টালিকা বা তাজমহল গড়তে পারে। কিন্তু তাদের কপালে শুধু জোটে অবহেলা। কাজ ফুরিয়ে গেলে ছুঁড়ে ফেলে দেয়।

১মঃ এসব ওদের মোটা মাথায় ঢুকবে না রে । ঐ তাজমহলে ওরা বাসর সাজিয়ে বসে পড়বে । এদের বোঝানো বৃথা। 

All rights are reserved by paramita mandal.

#নাম- আমের আঁটি। ✍ মৃদুল কুমার দাস।

শুভ সান্ধ্য আলোচনা-বাসর।
 # বিষয় - 
*আমের মাঝখানটাতে থাকে আঁটি, সেটা মিষ্টিও নয়,নরম নয়,খাদ্যও নয়। কিন্তু ঐ শক্তটাই সমস্ত আমের আশ্রয়, ঐটাতেই সে আকার পায়।*
 # নাম- *জীবন যেরকম।*
   ✍ - মৃদুল কুমার দাস।

      প্রকৃতির দানের লীলাময় গতিতে পাই তার অবর্ণনীয় সৌন্দর্য। জড়ের গতিশীলতার মধ্যেও প্রাণ পায় অনাবিল আনন্দ। আর প্রানের সেই আনন্দ বিচিত্রগামী। সুখ সীমাবদ্ধ,আনন্দ অনন্ত। সেই আনন্দ অনন্ত হয়ে গাছ, ফুল,পাখী হয়ে প্রকৃতি প্রাণবন্ত। প্রকৃতির এক এক স্বরূপ।
   কাঠিন্যের মধ্যে অনুভূতির স্ফূরণ এক ধরনের অভিসার, আবার কোমলের মধ্যে আরেক ভিন্ন অনুভূতি। সবেতেই আছে সৌন্দর্যের অভিসার। সৌন্দর্য এক গতিশীল প্রক্রিয়া। বটবৃক্ষের ফলের কথা ভাবলে মনের গতি থেকে জীবন-দর্শন লাভ যেভাবে হয় তার কূলকিনারা  পাইনা। আর আমের আঁটি আরেক ধরনের জীবন-দর্শন। আঁটি আমের রসাল অংশের ধারক। ওর ওতেই গুণ সঞ্জীবিত। কঠিনের মধ্যেই তো রসের অমৃতধারা যা জীবনকে দেয় অফুরন্ত শিক্ষা। যে জীবন যত কঠিন সে তত কোমল। কেননা কোমলে কঠোরে মিশ্রিত জীবনকে ধারণ জীবনের সৌন্দর্য। তাই ব্যক্তিত্বের প্রকাশ। আমের আঁটি যে বৃক্ষের জন্মসূত্র। পুরুষ প্রকৃতি। ভেতরে থাকে দৃঢ় শক্তি হয়ে,থাকে সৃষ্টির শক্তি নিয়ে। আর বহিরাংশ নারীপ্রকৃতির মত। একই অঙ্গে দুই প্রকৃতির ধারণ করে আম হয়েছ অমৃতফল। জীবনকে দেয় অমৃতাস্বাদন। কেন আমের ভেঁপু শিশুর হাতে সুরের যাদু দেয় না! আঁটি ভোগ্য নয়,নিজের সৃষ্টির জন্য সে মহান। আর তার বহিরাংশ মহান উদারতায় দান করছে তার মহতি কর্ম। আমরা আমের আঁটির কাঠিন্যটাই দেখি,ব্যবহারিক দৃষ্টিতে। কিন্তু আঁটির কাঠিন্য যে তার সকল সৃষ্টির রহস্য। তাই আঁটির কাছে জীবনের শিক্ষার অনেক মূল্য। প্রয়োজনের বিচারে আমরা যেন দৃষ্টিভঙ্গিকে সঙ্কীর্ণ না করি। তাই করে নিজেদের ভাবনার দুর্বলতা না প্রকাশ করি। কঠিন যে পুরুষপ্রকৃতি। কোমলতা নারীপ্রকৃতি। এই দুইয়ের একই অঙ্গে ধারণের ক্ষমতা দিয়ে আমকে অমৃত ফলের উপাধি সত্যিই এক মহতী তাৎপর্য। জীবনকে দেয় অমৃতত্ত্বের অনন্ত সুধা।
          *****
# কপিরাইট রিজার্ভ ফর মৃদুল কুমার দাস।

আঁটির আম(কলমে পিয়ালী চক্রবর্তী)

আমের মাঝখানটাতে থাকে আঁটি, সেটা মিষ্টিও নয়, নরম নয়, খাদ্যও নয়। কিন্তু ঐ শক্তটাই সমস্ত আমের আশ্রয়, ঐটাতেই সে আকার পায়।
আঁটির আম
-------------------
পুষ্টি বৃদ্ধি পরিস্ফুরণ যার মাঝে,
মধ্যমণি হয়ে বসে বুকে বাজে,
ধুকপুক, ধুকপুক প্রাণের স্পন্দন,
চিরাচরিত আমৃত্যু এ প্রগাঢ় বন্ধন।

স্বত্তা তার লুকিয়ে আছে মাতৃবক্ষ পরে,
সত্য নিত্য সুন্দর জীবন গহীন আধারে,
আধারে আঁধার কেটে আলোর পায় দিশা,
ফুটে ওঠে চরিত্র তার, অন্তরের অনিশা।

সকল মিষ্টর অন্তরালে আছে অন্য স্বাদ,
সকল নরম মাঝে কঠোর প্রবাদ,
চিনতে যদি পারো তবে তারে চিনে নাও,
মনের মণিকোঠায় স্থানটি তারে দাও।
Copyright © All Rights Reserved to Piyali Chakravorty

# নাম- দেবদাসী। ✍ - মৃদুল কুমার দাস।

শুভ সান্ধ্য আলোচনা-বাসর 
 # বিষয় - *দেবদাসী প্রথা--একটি মেয়ে ও সমাজ জীবন কিভাবে প্রভাবিত করে?*
   # নাম- *দেবদাসী।*
✍ - মৃদুল কুমার দাস। 

       *দেবদাসী* সমাজের একটি মুখ। এই দেবদাসী প্রথার অন্তর্ভুক্ত মাগধী প্রাকৃত সাহিত্যে সুতনুকা নামে দেবদাসীর কথা পাই-
*"সুতনুকা নাম দেবদাসিক্যী তং কাময়িথ বালানশোয়ে।/ দেবদিন্নে নাম লুপদখে।।"* - সুতনুকা নামে দেবদাসী বারানসীর রূপদক্ষ শিল্পী দেবদত্তকে কামনা করেছিলেন। 
    সেই সঙ্গে দ্বিতীয় দেবদাসী র নাম পাই কমলা। যে কিনা উত্তরবঙ্গের কার্তিকেয় মন্দিরের অপূর্ব সুন্দরী নৃত্যপটিয়সী দেবদাসী ছিলেন। যাকে লোকশিল্পী নির্মলেন্দু চৌধুরী তাঁর গানে বিখ্যাত করে রেখেছেন- 
      *"ভাল কইরয়্যা বাজাওরে দোতারা/ সুন্দরী কমলা নাচে।"*
 কমলার সঙ্গে মনে পড়ে বৌদ্ধযুগে নগর নদী আম্রপালির কথা। মহানাম বৈশালীর প্রমোদ উদ্যানে এক মালী কুড়িয়ে পান দিব্য কন্যা আম্রপালিকে। নিঃসন্তান মহানাম সন্তান স্নেহে পালন করলেন। তাঁকে বিদুষিনী নারী হিসেবে গড়ে তোলেন। দিনে দিনে অপরূপা সুন্দরী হয়ে উঠলেন। কামকলা বিলাসে পটিয়সী। কিন্তু যেহেতু কুড়িয়ে পাওয়া কোনো দেবকন্যার মতো বলে নগরের সব জ্ঞানী গুণীদের ভোগ্যা হলেন। নগরের নটী তথা সর্বভোগ্যা রূপে গৃহীত হলেন। পুরুষতান্ত্রিক বিধানের কাছে মহানাম সন্তান হিসেবে পেয়ে সমাজের বিধানের কাছে বড়ই অসহায়। নগরের নটী করে সমর্পণ করতে হয় আম্রপালিকে।
   সমাজে তিনধরণের নারী - সতী,দেবদাসী ও বিষকন্যা। এই দেবদাসীদের অবস্থা সমাজের বুকে সবচেয়ে করুণ ছিল। কারণ দেবদাসী বিক্রির মেলা বসত। দেবদাসীরা পরে বিক্রির চক্কর পড়ে বেশ্যায় পরিণত হয়। তাদের নিয়ে প্রধান পুরোহিতের ছিল কমিশনের ব্যবসা।
   কর্নাটকের এক পার্বত্য নির্জন স্থানে এক মন্দির চত্বরে দেবদাসী বিক্রির মেলা বসত। তাই শুনে এক ইংরেজ পর্যটক ও সংবাদ পত্রের এডিটর সেই মেলায় যেতে চান। তখন তাঁর দোভাষী বললেন- "সর্বনাশ! এই কাজ করবেন না; খুন হয়ে যাবেন।" কারণ তা ছিল খুব গোপন ব্যাপার। পর্যটক ছিলেন সংবাদ পত্রের যেহেতু এডিটর,তাই বাইরে তথ্য পাচারের খবর পেলে ওরা খবর সংগ্রাহককে হত্যা করে ছাড়বে।
  দক্ষিণ ভারতে এই দেবদাসী প্রথার রমরমা ব্যবসা ছিল। কর্ণাটক ছিল ঘাঁটি। তাকে ঘিরে তামিলনাড়ুর ভেল্লোর,রামনাথপুরম,তিরুনেলভেলু,অন্ধ্রপ্রদেশের চেকসোনামা,রাজামুন্ডুরী প্রভৃতি স্থান উল্লেখযোগ্য।যৌন আবেদনময়ী আদিবাসী মেয়েদের সস্তায় পাওয়া যেত। দেবদাসীদের গণিকাবৃত্তির কাজে লাগানোর কথা প্রথম প্রকাশ্যে আসে ১৯০৬ -৭ সালে। সে বছর আন্তর্জাতিক সনদে ভারতকে পতিতা মেয়েদের সম্পর্কে সই করতে হয়। 
  দেবদাসীরা দেবতার স্ত্রী। দেবমন্দিরে নিবেদিতা। দেবতার মৃত্যু নেই বলে দেবদাসীরা চির আয়ুস্মতী।
     দক্ষিণভারতে প্রথা আছে যে মেয়ের বিয়েতে দেবদাসীরা হিজড়াদের মত নেচে নেচে তালি দেয় সেই মেয়ে নাকি চির আয়ুস্মতী হয়।
 ভরতমুনী তাঁর নাট্যশাস্ত্র রচনার প্রেরণা লাভ করেছিলেন দেবদাসীদের নাচ দেখে। *ভারতনাট্যম* শৈলী দেবদাসীদের অবদান। 
  এই দেবদাসীদ প্রথা থেকে সমাজে গণিকাবৃত্তি এসেছিল। কলকাতার সোনাগাছি,বাগবাজারের হাড়কাটা গলি,কালীতীর্থ কালীঘাট ক্রমে যৌনপল্লী হয়ে ওঠে কর্ণাটক থেকে দেবদাসী সরবরাহ থেকে। কলকাতার সোনাগাছিতে প্রথম যে মেয়েটি আসে কর্নাটকের দুর্গম গ্রাম হুবলি থেকে আসে।এর আগে সে দুবার বিক্রি হয়েছিল। প্রথমবার ৮০০টাকায়। সে টাকা তার মা কেড়ে নিয়েছিল।যেতে হয়ে বোম্বাই। একবছরে হাজার পুরুষের দ্বারা ধর্ষিতা হয়। দিন রাত মিলিয়ে চার পাঁচবার।
 পরের বছর এই ৬০০ টাকায়। এবারে টাকা গচ্ছিত রাখে পুরোহিতের কাছে। ফিরে গেলে পাঁচশ পাবে। আর পুরোহিত পাবে একশ'।
  দেবদাসীদের নানা নাম। উৎস বিচারে। যাঁরা স্বেচ্ছায় দেবদাসী হয় তারা *দত্তা*। যে মেয়েদের মন্দিরের কর্তাদের  কাছে বিক্রি করা হত তার নাম *বিক্রিতা*। যাঁরা পরিবারের স্বার্থে বিক্রি হত তারা *ভৃত্যা*। যাঁরা সত্যিকারের উৎসর্গ করত তারা হল *ভক্তা*। *গীতগোবিন্দ* এর  রচয়িতা  জয়দেবের স্ত্রী পদ্মাবতী ছিলেন পুরীর মন্দিরের দেবদাসী। তিনি দৈববানী শুনে অজয় নদের তীরে কেন্দুবিল্ব গ্রামে চলে এসে জয়দেবের সাধনসঙ্গিনী হন।
      মন্দিরের সুনাম নির্ভর করত দেবদাসীদের সংখ্যার উপর। ১৯৩৪ এ মাদ্রাজ হাইকোর্ট বলল দেবদাসীদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে দিতে হবে। দেবদাসী প্রথা সম্পূর্ণ বে আইনী। নতুবা দেবদাসীদের বেশ্যা বলে গন্য করা হবে। গাঁধীর এই দেবদাসী প্রথা রঙের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। 
  দেবদাসী বেশ্যায় পরিণত হল।  আর বাংলার বিধবাকুলও কাশিবাসী হওয়ার চেয়ে বেশ্যাবৃত্তি অনেক নিরাপদ ভাবত। দেবদাসী ও বেশ্যা,বিধবা ও বেশ্যা সমাজের এক সমস্যার  চিরন্তন সাক্ষী হয়েছিল। বাংলা দেবদাসী ও বিধবার গতি বেশ্যাগিরিতে সমাজের এক করুন পরিণতির কথায় আজও আমাদের ধিক্কার দিয়েও বেদনার উপশম হয় না।
      ********
# কপিরাইট রিজার্ভ ফর মৃদুল কুমার দাস।

বুধবার, ৪ আগস্ট, ২০২১

বাক্য আলোচনা (কলমে পিয়ালী চক্রবর্তী)

যোগাযোগ মাধ্যমগুলির গতিবিধি আজ গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে পরিব্যাপ্ত।এগুলি স্নায়ুতন্ত্রেরই এক ব্যাপক রূপ



ফোনে ফোনে যোগাযোগ হোক বা মনে মনে কথা, যোগাযোগের মাধ্যম আজ গ্রহ থেকে গ্রহন্তরে। মস্তিষ্ক, অ্যাফারেন্ট, ইফারেন্ট নার্ভের সমন্বয়ে গড়ে ওঠে আমাদের স্নায়ুতন্ত্র, যা আমাদের শরীরের যোগাযোগ মাধ্যম এবং এই স্নায়ুতন্ত্রের নার্ভগুচ্ছের দ্বারাই আমাদের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে তড়িৎ-রাসায়নিক সংকেত আদান-প্রদান হয়। আমরা যেখানে যে অবস্থাতেই থাকি না কেন, আমাদের স্নায়ুতন্ত্র সবল থাকলে, ঠিকমতো কাজ করলে আমাদের সকল অনুভূতিগুলোও ঠিক থাকে।  


ঠিক তেমনই, যোগাযোগ মাধ্যম অর্থাৎ, স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক, ইন্টারনেট, কলিং সিস্টেম, ম্যেসেজিং সবই এক অদৃশ্য সমন্বয়কারী তরঙ্গের মাধ্যমে বাহিত হয়ে পৌঁছে যায় দেশ থেকে বিদেশ। আমরা যে টিভি দেখি, রেডিও শুনি সবই সেই বিশাল কর্মকান্ডের অংশ। এই যোগাযোগ মাধ্যমে আবহাওয়ার পূর্বাভাস থেকে শুরু করে চন্দ্র, মঙ্গল ও মহাকাশের বিভিন্ন তথ্য জানতে পারি আমরা। মহাবিশ্বকে যদি আমরা মস্তিষ্ক  হিসেবে কল্পনা করি, তবে বিভিন্ন গ্রহ-উপগ্রহ-গ্রহানুপুঞ্জ নিয়ে গঠিত সেই মস্তিষ্কপ্রসূত তরঙ্গের মাধ্যমে গ্রহ থেকে গ্রহন্তরে ছড়িয়ে পড়ে যোগসূত্র।


তবে, যোগাযোগের জন্য কোনো মাধ্যম যেখানে থাকেনা, সেখানে কি যোগাযোগ হয়না! অবশ্যই হয়, মনের সাথে মনের যে এক অদৃশ্য বন্ধন থাকে, সেই বন্ধন দেখা যায় না, ছোঁয়া যায়না, শুধু অনুভব করে নিতে হয়। তার কথা ভেবে চোখে জল আসলে সেই তো যোগাযোগ, আত্মার সাথে আত্মিক মিলন। 


এত যে যোগাযোগ! 

এত বোঝাপড়া!

পরমাত্মার সাথে মিলবার নেই, 

কারো মনে কোনো সাড়া!


সেখানেতে যোগের অঙ্ক,

বিয়োগ হয়ে যায়!

কিভাবে মিলিব সখা!

নেই কি উপায়!


আছে সে যোগ এক,

নাম তার ভক্তি,

সে পথে গেলে যোগেই,

মেলে চিরমুক্তি।

Copyright © All Rights Reserved to Piyali Chakravorty

মঙ্গলবার, ৩ আগস্ট, ২০২১

#নাম- অপলক দৃষ্টি ✍️-মধুবন্তী দাশগুপ্ত


 #বিষয় -চিত্রালোচনা

#নাম- অপলক দৃষ্টি 

✍️-মধুবন্তী দাশগুপ্ত 


"স্বপনে তাহারে কুড়ায়ে পেয়েছি, রেখেছি স্বপনে ঢাকিয়া"

      আপামর মানবসন্তান জন্মের পর থেকেই দু চোখ ভরে স্বপ্ন দেখে। বিভিন্ন পারিপার্শ্বিক অবস্থার ভিত্তিতে এক একজনের ভাবনায় থাকে ভিন্ন ভিন্ন আশা। 

      ছবিতে শিশুটি একমনে তাকিয়ে আছে তার কিছু অধরা স্বপ্নের পানে। সে যেন অনতিদূরে দেখছে তারই সমবয়সী কিছু অবস্থাপন্ন ঘরের ছেলেপুলেরা হৈ হৈ করে ক্রিকেট খেলছে, দামী ব্যাট-বলের সাথে পরণে কতকিছু খেলার সুন্দর পোশাক ও উপকরণ! সে যদি একটা সুযোগ পেতো, তাহলে একেবারে সৌরভ, ধোনি--এদের মতো ধাই ধাই করে ছক্কা মারতে পারতো! ওই চকচকে ডিউজ বলটা হাতে পেলে কপিল দেব বা কুম্বলের মতো কতোজনকে বোল্ড আউট করে দিতে পারত! 

        কিন্তু হায়! তাকে যে কেউ খেলতে ডাকেনা! পিচের কাছাকাছি গেলেই দূর দূর করে তাড়িয়ে দেয়। তবে এই দুটো উচ্চাভিলাষী নয়ন মেলে প্রতিদিনের ম্যাচগুলো দেখে দেখে সে সব খেলার নিয়মকানুন শিখে গেছে। তাহলে কেন তাকে একবারও খেলতে দেওয়া হবে না! সে যে কোনোদিনই এই আকাঙ্খাকে পূর্ণ করতে পারবেনা, একথা বিশ্বাস করতে বড্ড কষ্ট হয়। তাই সে একরাশ ভাবনার জাল বোনে এই শূন্য দৃষ্টি নিয়ে!

         এমন একটি করুণ দৃশ্যের মধ্যে দিয়ে দেখতে পাই শত শত অভাবী পরিবারের ত্রাহি ত্রাহি রব, একটু গ্রাসাচ্ছদনের জন্য দীর্ঘদিন ধরে হাহাকার! একজন পরিণত মানুষ যেমনই অবস্থায় থাকুক, সে তবু প্রতিকূলতায় নিজেকে মানিয়ে নিতে সক্ষম হয়। কিন্তু একটি অবলা শিশু কি করে তার অর্থনৈতিক গণ্ডীর সীমাবদ্ধতাকে উপলব্ধি করবে! সে তো আর পাঁচটা খুদের মতোই ইচ্ছাপূরণের সুদূরপ্রসারী দিগন্তকে ছুঁতে চাইবে। সত্যিই বোধহয় এই অসাম্যকে আমরা কোনোদিন দূর করতে পারবনা, যতোই একসাথে কণ্ঠ মিলাই, 

"এক সূত্রে বাঁধিয়াছি সহস্রটি মন, এক কার্যে সঁপিয়াছি সহস্র জীবন--" 


**********************

#কপিরাইট রিজার্ভ ফর মধুবন্তী দাশগুপ্ত।

#বিষয়_অপুষ্টি #কলমে_অনিশা

 


#বিষয়_অপুষ্টি

#কলমে_অনিশা


"তুমি এখন যাও তো দিদিমণি",  মুখ ঝামটা দিয়ে বলে উঠেন সুনিতা দেবী। "এই হয়েছে যত জ্বালা! কোথাও যাবে না আমার বউ, আর আমার নাতনি ও যাবে না। তুমি এলেই আমার বউটা ও যেন কেমন হয়ে যায়।" আশেপাশে বাড়ির লোকরা ও দাঁড়িয়ে যায়। একটু বুঝতে চেষ্টা করে কি হয়েছে। সুনীতা দেবী ও এই সুযোগের অপেক্ষা করে থাকেন। একটু ভিড় জমতেই শুরু করেন, "দেখো দেখি বাচা, আমার নাতনির অসুখ-বিসুখ নেই, দিব্যি ভালো মেয়ে। এমন চুপ করে শুয়ে থাকে, বসে থাকে তাতেই ওনার অশান্তি। পিছনে পড়ে আছে। রোজ আসচে আর তোমার নাতনির ওজন কম, ওজন কম। আরে বাব্বা, আমার নাতনিকে আমি রোজ চিপসের প্যাকেট কিনে দিই। ওই নিয়ে সারাদিন বসে থাকে। একটা একটা করে সারাদিন খায়। আমার ঘরে কি খাওয়ার অভাব? অপুষ্টি, অপুষ্টি করে মাতা খাচ্চে। আর এই বউটাও হয়েছে তেমনি। ওনার কথায় নাচতে শুরু করে দেবে। কোতায় না কোতায় পাঠাবে বলচে। রোজ 100 টা করে ট্যাকা দেবে আর বাচ্চাকে খাওয়ানো শেখাবে। আর ওর মাকে ও বাচ্চার রান্না করা শেখাবে। ঝোজো দিকিনি। বাড়ির সব রান্না তো ওই করে‌, ওকে আবার শেকাবেটা কি?" 

দিদিমনি অর্থাৎ অনিন্দিতা, স্বেচ্ছায় সমাজসেবা করে। নিজেকে সমাজসেবীর তকমাটা লাগাতে চায় না। কিন্তু গরীব বস্তির বাচ্চা গুলো কে, কি করে ওখানে থেকে ও সুন্দর জীবন দেওয়া যায় অনবরত সেই চেষ্টা করে। সুনীতা দেবীর বাক্যবাণে একটু বিহ্বল হয়ে পড়ে সে। আবার বোঝাতে চেষ্টা করে, "মাসীমা শুনুন।  ওর বয়স অনুযায়ী ওর যা ওজন হওয়ার কথা তার চেয়ে অনেক কম ওজন ওর। ওর মাথাটা শরীরের তুলনায় বড়। শরীরের চামড়াগুলো খসখসে হয়ে গেছে। এটাকে বলে ম্যারাসমাস।" ঝঙ্কার দিয়ে উঠলেন সুনীতা দেবী, "এবার তুমি যাও তো বাপু। আমাকে মরা মাস শেকাতে এয়েচেন। ওরম শরীলে হয়। নেয়ে আজ ওর মা ভালো করে তেল মাকায় নি। কাল থেকে আমি তেল নে বসবো। ডলে ডলে সারা শরীলে মাকাবো। তকন দেকো। আমার মেয়েটাও অমনি রোগা ছেল। একন তার চেহারা তোমার চেয়ে ও বেশী। বয়স কালে সব ঠিক হয়ে যাবে।"  "তা মাসীমা, আপনার মেয়ের বাচ্ছা কত বড় হলো?" অনিন্দিতা জিজ্ঞেস করলো।

সুনীতাদেবীর গলার স্বর পাল্টে গেল। "আর বোলো না বাছা। জামাইটা আমার ভালোই রোজগার করে ভালো। বাড়িতে খাওয়া-দাওয়া ভালো। তাও আমার মেয়ের একটা বাচ্চা নষ্ট হয়ে গেল। আবার একটা  হয়েছে পুরো প্যাঁকাটির মতো সরু সরু হাত-পা। ক'দিন বাঁচবে তা বলতে পারি না।" সুনীতা দেবীর চোখের জলে গলার স্বর রুদ্ধ হয়ে এলো।

অনিন্দিতা ধীরে ধীরে বললো, 'এটাই তো আপনাদের ভুল। এই যেমন আপনার নাতনি অপুষ্টিতে ভুগছে। ওর চিপসের প্যাকেটের দরকার নেই, দরকার উপযুক্ত পুষ্টিকর খাবার। যেটা আপনি না জানার ফলে ওকে দিতেই পারছেন না। এরজন্য অনেক সরকারী, বেসরকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে। আমি যেখানে আপনার নাতনিকে নিয়ে আপনার বৌমাকে যেতে বলছি ওখানে পনেরো দিন রাখবে। পুষ্টিকর খাবার দেবে, ও আপনার বৌমাকে শিখিয়ে দেবে কিভাবে ওগুলো তৈরী করবে, কোন সময় ওগুলো ওকে খাওয়াতে হবে সবকিছু। দরকার হলে আরো পনের দিন রাখবে।"

"কিন্তু আমার ঘরের কাজগুলো কে করবে? আমার বয়স হয়েচে। আমি আর কিছু পারিনা করতে।" 

"কটা দিন মা-ছেলেতে চালিয়ে নিন। আর একটা কথা। আপনার নাতনি ভবিষ্যতে মা হবে। সেইজন্য এখন থেকেই তার শরীরের গঠন ঠিক মতো হওয়ার প্রয়োজন। একজন সুস্থ মা-ই পারে একটি সুস্থ শিশুর জন্ম দিতে। দেখবেন বৌমাকে অতি শাসনে রাখতে গিয়ে নাতনিকে আপনার মেয়ের মতো দুর্ভোগ না পোহাতে হয়।" কথাগুলো একভাবে বলে আর অনিন্দিতা আর সেখানে দাঁড়ায় না।  কয়েক দিন ধরে অপমান সহ্য করতে করতে মানসিক ভাবে ভেঙ্গে পড়েছিল সে। এরা কিছুতেই নিজেদের ভালো বোঝে না!  হঠাৎ একটা ক্ষীণ গলার স্বরে পিছনের দিকে তাকায়। দেখে, সুনীতা দেবীর বৌমা ওকে ডাকছে। কাছে এসে বলে, "আমি যাব দিদিমণি। আমার শাশুড়ি খুব কাঁদছে। বলছে দিদিমণি আমার চোখ খুলে দিয়েছে। তোর মেয়ের জন্য যা করতে হয় কর। ওর যাতে ভালো হয় তাই কর।"

অনিন্দিতার মনেও শান্তির ঢেউ খেলে গেল। "আমি পেরেছি। একজনকে হলেও শেষ পর্যন্ত আমি বোঝাতে পেরেছি।"


এমনি করে এক-একটি মেয়ে যদি একটি করে অপুষ্টিতে ভুগতে থাকা শিশুর পরিচর্যায় সহায়তা করে তবে অচিরেই আমাদের দেশ অপুষ্টি-নামক এই লজ্জাজনক অবস্থা থেকে চিরতরে মুক্তি পাবে।



@কপিরাইট রিজার্ভ ফর অনিশা কুমার।

সোমবার, ২ আগস্ট, ২০২১

# নাম- অভাবী মনের কাছে। ✍ - মৃদুল কুমার দাস।

শুভ অনুগল্প বাসর। 
  # বিষয় - অনুগল্প।
  # নাম- *অভাবী মনের কাছে।
  ✍ - মৃদুল কুমার দাস। 

       "ও বিনিতা,বিনু, বিন আর পারছি না তোকে নিয়ে। তোর মা যাওয়ার সময় সংসারটা সব এলোমেলো করে দিয়ে গেল রে। এমন ভাসিয়ে দিয়ে গেল! আজ যে গঞ্জের হাট। তোর মা-ই মনে রাখত। সব হাতের কাছে যুগিয়ে দিত। সব কুল রক্ষা করে সংসার মাথায় রাখত। আর আজ!" বলে গণেশ বাগলি দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। পরনে হাঁটুর উপর কাপড়। কাঁধে গামছা। বাতাসা মুড়ি ক'গাল পুরে দাওয়ার পূব দিক ঘেঁষা ক্ষেতের ক'টা বেগুন গাছের দিকে তাকিয়ে থাকে। আর দাওয়া থেকে নামতে নামতে বিনুকে বলে "গাছে বেগুন আছে কটা তুলে বাজারে যাব। ঝুড়ি দে। যে কটা টাকা পাই। বাজার থেকে কি কি আনতে হবে বলবি,লিস্টি করে রাখ।" 
 বিনু বাবার ডাকে দুয়ারে বেরিয়ে আসে পিতা গণেশ বাগলি যা চাইছে তাই নিয়ে। হাতে ধরায়। গণেশ বলে- "বড় ঝুড়িটা নিয়ে এলি কেন! ছোটটা তো দিবি। ক'টা বা বেগুন আছে। সব গাছ হাড়গিলে হয়ে গেছে। সব গাছ যেন ডালপালা হয়ে গেছে। বেগুন গাছগুলোও যেন তোর মায়ের শোকে শুকনো হয়ে গেছে!"
    বিনুর মায়ের কথা মনে পড়ে। বাবাকে বলতে শুনেছিল- "কি আর বলি,সংসারের যা হাল! নুন আনতে পান্তা ফুরনোর অবস্থা! বাজার থেকে আজ একটা ছোটো সাইজের ব্যাগ এনোতো।" মনে করে বিনা চোখের জল লুকায়। মা বিনুকে বলত - "বিরাট ব্যাগ,বাজার ব্যাগের এক কোনে,রাস্তায় আসতে লজ্জা করেনা। আর কম বাজার হলে ঘরে রান্নার ঝামেলা কমে। তেল-নুন-লঙ্কা খরচ কমে,জ্বালানি বাঁচে,পেট ভরা নিয়ে কথা,ভাতে ভাত খেলে নুন লঙ্কার অভাব হয় না। অভাব মনে করলে অভাব। না মনে করলে দিব্যি চলে।"
  সাধন ড্রপসিনের আড়ালে মন ঢাকতে চায়। ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। মনের মধ্যে অসহায়ের বোঝা চাপে। গঙ্গামনিকে বিয়ে করে আনার সময় শাশুড়ি বলেছিল - " গঙ্গামনি আমার ঘরের লক্ষ্মী ছিল। তোমার ঘরে গেল। যত্ন নিও।" বলে খুব কেঁদেছিল। আজ গণেশ সেইসব কথা ভাবলে ভেতরে ভেতরে গুমরে মরে। সামান্য ভাত,কাপড়,তেল,নুন,লঙ্কার খিদে নিয়ে যে মেয়েটা এসেছিল, সেই সাধটুকু অপূর্ণ রেখে চলে গেল। আবার দীর্ঘশ্বাস! বিনু ভেতরে নিজেকে সরিয়ে নেয়। বাপ বেটির দুরত্বে সেই নুন আনতে পান্তা ফুরনোর ছাঁচে গঙ্গামণি বারে বারে আসে।
         *********
# কপিরাইট রিজার্ভ ফর মৃদুল কুমার দাস।

# নাম- দাসেয়ীর বাণপ্রস্হ। ✍ শুভশুভব্রত ভট্টাচার্য।

 রাত্রের শেষ প্রহরের ঘন্টা পরেছে প্রাসাদ দেউড়িতে।ক্রমশঃ জাগরণ হবে এক ব্যাস্ত প্রাসাদের। ভিস্তিরা জল নিয়ে বেরোবে শহরের রাজপথে। রাজপ্রাসাদে একই সময় নালা থেকে জল তুলে ধোয়া শুরু হবে সমস্ত প্রাঙ্গণ। তারপরে একে একে কক্ষে কক্ষে আসবে জল।অন্যদিকে পাচনাগারে পাচকের সহকারী জ্বালাবে একে একে পঞ্চান্নটি মাটির উনুন। শুরু হবে দিনের খাদ্য প্রস্তুতের কাজ। প্রাসাদ সংলগ্ন দেব মন্দিরের পুরোহিত এতক্ষণে প্রস্তুত হচ্ছেন কিছুক্ষণ পরেই ঊষাগমে শুরু করবেন বেদ পাঠ। নিজের কক্ষের লাগোয়া অলিন্দে দাঁড়িয়ে ঊষার আগমন দেখছেন সত্যবতী। চোখে তার রাত্রি জাগরন ক্লান্তি। আজ কয়েকদিন হল নিদ্রা দূর হয়েছে তার চোখ থেকে। 

প্রাসাদ অলিন্দে দাঁড়িয়ে সত্যবতী দেখছিলেন ঋজু সৌম্য প্রবীণ বৃষস্কন্ধ পুরুষটি প্রাসাদের সিংহদুয়ার দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছেন ধীর গতিতে। ঊষাকালে শরীরচর্চা করে নদীতে অবগাহন করার দীর্ঘ দিনের অভ্যাস এই সিংহ-কটি পুরুষটির। আচ্ছা যদি ওই বৃদ্ধ শান্তনুর বদলে এই পুরুষটি তাঁর স্বামী হতেন? সত্যবতীর চেয়ে বয়স দেবব্রতর বেশী অবশ্যই। তাহলে? তাহলে আজ কি এত কিছু ঘটতো? তাঁকে কি আজ এইভাবে যেতে হত এই হস্তিনাপুর প্রাসাদ ছেড়ে? সুপুরুষ,ধীর বাচন,ভয়ঙ্কর যোদ্ধা এই পুরুষটিকে কামনা না করে থাকা কঠিন। সেই কঠিন কাজ সত্যবতী করেছেন এতকাল। অবশ্য এই পুরুষ ভীষ্ম বলেই একাজ সহজ ছিল।আসক্তির লেশমাত্র দেখেননি কখনো এর চোখে সত্যবতী। সামনে এলে সর্বদা মাটির দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে মাতৃসম্বোধনে কথা বলেছেন ভীষ্ম। কখনও বা দাসেয়ী বলেও সম্বোধন করেছেন তাঁকে। দাস রাজার কন্যা তাই দাসেয়ী। তিনি দেবব্রতের চোখে দেখেছেন এক সুদূর দৃষ্টি,এক অমোঘ শূন্যতা। তার উৎস কি?ব্যাকুল হবার মতন মানুষ সত্যবতী না। তা তিনি হনও নি।কিন্তু বুকের কাছে কখনো কখনো একটা তীব্র মোচড় অনুভব করেছেন। আচ্ছা,সত্যবতীর রূপ জানেন গঙ্গাপুত্র? দেখেছেন কখনো, দূর থেকে হলেও? জানা নেই তাঁর। একবার,শুধু একবার অত্যন্ত কৌতুহলে তাঁকে পরীক্ষা করেছিলেন সত্যবতী। ভ্রাতার পত্নীদ্বয়ের গর্ভ উৎপাদনের প্রস্তাব নিয়ে। ভেঙে দেখতে চেয়েছিলেন এই নির্বাক পুরুষকে। সেই প্রথম স্বর উচ্চগ্রামে গিয়েছিল কিঞ্চিত। যখন ভীষ্ম তাঁকে স্মরণ করিয়েছিলেন তাঁর কাছে করা প্রতিজ্ঞার কথা।


-ইন্দ্র যদিচ স্বর্গচ্যুত হয়,ধর্ম যদিচ স্বর্গচ্যুত হয়…ভীষ্ম তবুও তাঁর প্রতিজ্ঞাচ্যুত হবেন না। 


সত্যবতী প্রতিটি কথাকে পরম আস্বাদে গ্রহণ করেছিলেন। কোথাও যেন শান্তিও হচ্ছিল তাঁর। তাঁর পুত্রবধুদের ক্ষেত্রোৎপাদনে আগ্রহ যদি দেখাতেন গঙ্গাপুত্র তাহলে হয় তো অন্তরে ক্ষুণ্ণই হতেন সত্যবতী।কেন হলেন না ভীষ্ম রাজি? শুধু কি তাঁরই প্রতিজ্ঞার জন্য?

আজ সব মনে পড়ছে একে একে তাঁর। এত দিন তিনিও বন্দী ছিলেন এই প্রাসাদের মায়াবী বন্ধনে। কর্তব্যের কারাগারে মূর্খ বন্দী এই প্রবীণের মতই।আজ সব একে একে ফিরে আসছে স্মৃতিতে। থাক্‌! আজ আর না।সামনের দিনগুলোতে সঙ্গে শুধুই সকল স্মৃতি। একে তিনি একটু একটু করে উলটে পালটে দেখবেন সঙ্গোপনে। লোক সমাজ জানবেনা,তাই বলতেও পারবেনা কিছু। দূরের থেকে হলেও এই একটি সঙ্গ ছিল তাঁর, যাঁর সন্নিধানে তাঁরও ইচ্ছা হত কিশোরীর মত রাঙা হয়ে উঠতে লাজে।

নাঃ তার হাতে আর বেশি সময় নেই। দাসী অলকাকে দিয়ে গঙ্গাপুত্র কে ডেকে পাঠালেন সত্যবতী। রাজ্যসভায় যাওয়ার আগে গঙ্গাপুত্র যেন একবার তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে যান। 

সকাল বেলায় শস্ত্রাভ্যাস সেরে বসে আছেন যমুনার তীরে। মৃদু মৃদু শীতল হাওয়া আসছে যমুনার তীর থেকে।শীতের সময় আগতপ্রায়। এখনই সকালে বেশ ঠান্ডা জমে আসে। তেল মাখা গায়ে কিছক্ষণ বসে থাকার পরে তাঁরও মনে হয় একটু শীত করছে বোধ হয়। নিজের মনেই হাসেন দেবব্রত। কম বয়সে যখন শ্রেষ্ঠ যোদ্ধা হবার লোভ মনকে আচ্ছন্ন করে রাখতো তখন নিয়ম করে বছরে অন্তত চারমাস চলে যেতেন কনখলে। প্রতিদিন সূর্য বন্দনা করে স্নান করতেন ওই তীব্র স্রোতস্বিনী বরফ গলা জলের ধারায়। শরীরকে বশ না করতে পারলে কিছুতেই শ্রেষ্ঠ হওয়া যায় না। লোকে বলে জিতেন্দ্রিয় তিনি। লোকে বলে পিতার জন্য বিপুল স্বার্থত্যাগ করে যে দৃষ্টান্ত তিনি রেখেছেন তাতে তাঁর খ্যাতি থাকবে প্রলয়ের শেষ দিন অবধি। তাঁর আসন নাকি বাঁধা থাকবে স্বর্গে।কিন্তু তাঁর অন্তর কি বলে? কেউ জানে না। কর্তব্য আর কর্ম-এই দুই বাঁধনে নিজেকে এমন করে বেঁধেছেন যে লোক তো দূরস্থান নিজেরও শোনার যো নেই নিজের কথা। সারাদিন রাজ্যের নানান কাজে ব্যাস্ত থাকেন।ব্রাহ্মমুহুর্তে শয্যা ত্যাগ করেন। তারপরে পূজা-শরীরচর্চা সেরে দরবারের কাজে যাওয়া। সারা জীবন তিনি নারীসঙ্গ কে দূরে রেখেছেন। মনে পড়ে সত্যবতী একদিন এসেছিলেন তার কক্ষে। সেদিন মাতৃ সম্বোধনে সত্যবতী বিরক্ত হয়ে চলে গেছিলেন। সবই বোঝেন তিনি।  আর একদিন, যেদিন হৃদয়ের দ্বার বন্ধ করে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন অম্বাকে। অম্বার অভিশাপ আজও বয়ে বেড়াতে হচ্ছে। 

ছেদ পড়লো তাঁর ভাবনায়।তাঁর অঙ্গসংবাহক নিষাদ এসেছে।

-মহারাণী সত্যবতীর দূত এসেছে। মহারাণী আপনাকে একবার স্মরণ করেছেন। রাজ্যসভায় যাবার আগে একবার তাঁর সঙ্গে দেখা করে যেতে অনুরোধ করেছেন। 


পুত্র দ্বৈপায়ন তাঁকে বলছে এই রাজপ্রাসাদ এখন বন্দীশালা। এ বন্দি শালা ত্যাগ করে বানপ্রস্থে যেতে। আশ্চর্য্য, এতদিন তাঁর মনেও হয়নি তিনি বন্দীশালায় আছেন? শান্তনুর মৃত্যুর পরেও তিনি আঁকড়ে থেকেছেন এই বন্দীত্ব! মহারাজ শান্তনুর মৃত্যুর পরে দ্ব্যার্থহীন ভাষায় জানিয়ে দিয়েছিলেন তিনি সহমৃতা হতে প্রস্তুত নন।তাঁর পুত্রদের প্রতিপালন অনেক বড় ধর্ম তাঁর কাছে।নিঃশব্দে তাঁকে সমর্থন করে গিয়েছিলেন ভীষ্ম।

 ভীষ্মের ভয়ে কেউ টুঁ-শব্দটি করেননি। আজ সেই রাজ্য, রাজসভা আর ক্ষমতাকে ছেড়ে অরণ্যবাসীনি হতে হবে। কেন?কেন সত্যবতী? আহ্‌,কি যন্ত্রণা তাঁর ভিতরে,কি অসহ্য যন্ত্রণা! তিনি ধীর গতিতে গবাক্ষের কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। 

বাইরে এখন নরম লাল আলো একটু একটু করে ভেসে উঠছে। রাত্রির অন্ধকার কেমন পা পা হেঁটে চলে যাচ্ছে পর্দার আড়ালে। ওই,স্তবগান শুরু হচ্ছে মন্দিরে! 


পুত্র ব্যাস যা ব্যাখ্যা করতে চাইছে তা তিনি জানেন।বশিষ্ঠ্য-বিশ্বামিত্র বা ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয় বিরোধ আজ আর বিষয় নয়! আজ নতুন যুগের সঙ্গে নতুন সংকট এসেছে।বেদধর্ম নয়, ধনের ধর্মই প্রবল এখন। গঙ্গা যমুনার দুই তীর ধরে যে অসংখ্য নগর গড়ে উঠেছে তাদের কেউ কেউ রাজশাসিত,কেউ কেউ গণের অধীন। সর্বত্রই এখন সামাজিক আইনের বিরোধ চলছে। যেখানে যে আইন আছে,সেখানে সেই আইনই মানুষের অসহ্য ঠেকছে! ধর্মের শাসন আর কোথায়ও অবশিষ্ট নেই। অধর্ম আর প্রজা শোষণ আর্যাবর্তের রাজাদের রাজ্যশাসনের মূলভিত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। যাগকে একসময় তো ছেড়ে যেতেই হবে, করুক উত্তরপুরুষ যা ভালো বোঝে।  আর দেবব্রত তো থাকলেনই। এই প্রাসাদের বাইরের যে জীবন তাঁকে অমৃতের আস্বাদ একবার দিয়েছিল তারই কাছে ফেরাই উচিত। 

রথ প্রস্তুত।  রথে আরোহন করার সময় একবার ঘুরে তাকিয়েছিলেন উপর দিকে। প্রাসাদের অলিন্দে দেবব্রত দাঁড়িয়ে আছেন। বরাবরের মতই শান্ত নির্লিপ্ত, চোখে অপার শূন্যতা।  শেষবারের মতো একবার দেখে নিলেন তাঁর প্রিয় হস্তিনাপুর কে। কিন্তু না, আটকাননি তাকে দেবব্রত।  হয়তো দেবব্রত জানেন তার প্রয়োজন ফুরিয়েছে হস্তিনাপুরে।  নগর সীমা পেরিয়ে রথ একসময় দিকচক্রপালে মিলিয়ে যায়। একা দেবব্রত বসে থাকেন যমুনার তীরে। অম্বার ঋণ যে তার এখনও শোধ হয়নি, মুক্তি তাই এখনো বহুদূর। 



রবিবার, ১ আগস্ট, ২০২১

#বিষয়_বেদব্যাসের জন্মকথা #কলমে_অনিশা

 #বিষয়_বেদব্যাসের জন্মকথা

#কলমে_অনিশা


চেদিরাজ - আমাকে এমন ভালোবাসার শৃঙ্খলে বেঁধো না রাণী। আমি দুর্বল হয়ে পড়ি। দুর্বলতা কাপুরুষতার নামান্তর। আমায় রাজধর্ম পালন করতে দাও। পিতার আজ্ঞায় আমাকে মৃগয়ায় যেতে হবে। 


গিরিকা - যাও তবে রাজা। নারী যদি এত ক্ষুদ্র তোমাদের বীরত্বের কাছে, তবে যাও। আর বাধা দেব না। মনে রেখো আমার ভালোবাসা তোমার বীরত্বের পথে শক্তি যোগাবে। 


চেদিরাজ - তাই তো, এত জেদ করে বেরিয়ে এলাম, এখন আমার মন মানছে না। মনে হচ্ছে গিরিকার কাছে ফিরে যাই। এই অশোকবৃক্ষের মনোরম পরিবেশে আমি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি না। ঐ একটি বাজপাখি দেখতে পাচ্ছি। একটি বটপাতায় করে আমার শুক্র রাখি। "বাজপাখি, তুমি এই বটপাতা আমার রাণীর কাছে পৌঁছে দাও।" 


বাজপাখি - হ্যাঁ হ্যাঁ, নিশ্চয়ই মহারাজ। 

ঐ আমার আর এক বন্ধু এদিকে আসছে। 

আরে! আরে! আমার বটপাতায় টান দিয়ো না। 

যাঃ, সব পড়ে গেল যমুনার জলে।


অদ্রিকা - আমি স্বর্গের অপ্সরী। শুধু ব্রাহ্মণের অভিশাপে আজ মৎসরূপে যমুনার জলে বাস করছি। সারা সকাল কোন খাবার পাইনি। এই ঋতুমতী অবস্থায় ক্লান্ত শরীরে আর তো পারি না। ঐ কি পড়ল জলে! খেয়ে নিই। 


(দশমাস পর) জেলেদের 😎জালে এই অবস্থায় বন্দী হলাম? হে ঈশ্বর, আমার সন্তানদের রক্ষা করো।


দাশরাজ - ওরে বাপস্, তোরা কত বড় মাছ এনেছিস? একে তো অনেক কষ্টে কাটতে হবে। মাছের পেটে বোধহয় অনেক ডিম আছে। সাবধানে সাবধানে।  একি! একি দেখছি আমি! দুটি দেবদূতের মতো শিশু! হে ঈশ্বর, আমি নিঃসন্তান বলে কি আমায় এত সুন্দর করে সাজিয়ে একটি পুত্র ও একটি কন্যা দিয়েছ আমায়? আমার সব চাওয়া আজ পূর্ণ হলো। 


(এগারো বছর পর)

মৎসগন্ধা - আমায় সবাই সুন্দরী বলে, কিন্তু আমার গায়ের তীব্র গন্ধের জন্য আমার পিতা আমার বিবাহ নিয়ে চিন্তিত। আমাকে তিনি মুনি ঋষিদের নৌকায় করে পার করে দিতে বলেছেন। কিন্তু আমি বুঝতে পারি, উনি চান যদি কেউ কৃপা করে আমার এই মাছের গন্ধ দূর করে দেন। কিন্তু কৃপা তো আর কেউ এমনি করে না। কয়েক জন মুনির দৃষ্টিতে আমি তা ভালো করেই বুঝতে পারি। পরাশর মুনি বেশ কয়েক দিন ধরেই আমার জন্ম বৃত্তান্ত বর্ণনা করার জন্য উৎসুক হয়ে আছেন। আমি ও জানতে আগ্রহী। কিন্তু তার বিনিময়ে উনি কি চান তাও আমি বেশ বুঝতে পারছি। শেষ পর্যন্ত হয়তো ওনার ইচ্ছার কাছেই নিজেকে সমর্পণ করতে হবে।


(কয়েক দিন পর)

পরাশর মুনি - আমরা মাঝনদীতে এসে গেছি। আর তোমার জন্ম বৃত্তান্ত শোনা শেষ। এবার তুমি আমার কাছে এস। 

মৎসগন্ধা - কিন্তু আমার গায়ে তীব্র মাছের গন্ধ।

মুনি - সে তো তোমার মা অপ্সরা অদ্রিকা তখন মৎসরূপে ছিল, তাই। আমার আশীর্বাদে তোমার গায়ে পদ্মের সুরভি হবে।

মৎসগন্ধা - কিন্তু নদীতীরে এত লোকজন....

মুনি - আমি এখানে কৃত্রিম উপায়ে একটি কুয়াশাচ্ছন্ন দ্বীপের সৃষ্টি করছি।

মৎসগন্ধা - কিন্তু....

মুনি - বুঝতে পারছি। শোনো, আমার আশীর্বাদে আমাদের মিলনের পরেই তোমার সন্তান জন্মাবে। আর তারপরে তুমি আবার কুমারী হয়ে যাবে।

আজ থেকে মৎসগন্ধা হবে পদ্মগন্ধা ও অনন্তযৌবনা। তোমার যৌবনে যেমন ভাঁটা পড়বে না তেমনি পদ্মগন্ধা হবে না লুপ্ত। তুমি হবে সবচেয়ে বেশী সৌভাগ্যবতী। তোমার নাম হবে সত্যবতী।


(সন্তানের জন্মের পর)

ব্যাস -  আমি দেখতে এত বিভৎস, শ্যামবর্ণ। কুয়াশা ঘেরা নির্জন দ্বীপে আমার জন্ম। তাই আমি কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন। আমার মা আমাকে জন্মলগ্নেই বিদায় জানাতে বাধ্য হবেন, তাই আমাকেই চলে যেতে হবে আপনার সঙ্গে তপস্যায়। বলুন পিতা, এ জীবন তবে কি বৃথা আমার?


পরাশর মুনি - না পুত্র। তুমি আমার সন্তান। তপস্যাবলে মহর্ষিত্ব প্রাপ্ত হয়ে বেদকে চার ভাগে ভাগ করবে। এইজন্য তুমি হবে বেদব্যাস। তোমার তপস্যার স্থান হবে বদরিকাশ্রম। এই কারণে তুমি বাদরায়ণ নামেও পরিচিত হবে। এরপর তুমি রচনা করবে মহাভারত। তুমি শুধু শ্লোক বলবে আর লিখবেন স্বয়ং গণেশ। 

ব্যাস - আমি কি এত পারব পিতা।

পরাশর মুনি - নিশ্চয়ই পারবে। অসম্ভব কে সম্ভব তো তোমাকেই করতে হবে। তোমার মাতাকে বিদায় জানিয়ে তুমি আমাকে অনুসরণ করো।

ব্যাস - বিদায় মাতা।

সত্যবতী - একদিকে লোকলজ্জা অন্যদিকে সন্তান স্নেহ। আমি কি করবো! কথা দাও বৎস, আমি তোমাকে স্মরণ করলেই তুমি আমার কাছে আসবে।

ব্যাস - তাই হবে মাতা। বিদায়।



@কপিরাইট রিজার্ভ ফর অনিশা কুমার।

শনিবার, ৩১ জুলাই, ২০২১

#নাম- মাতৃভাষা ও বিতর্ক। ✍ - মৃদুল কুমার দাস।

শুভ বিতর্ক সভা। 
  # বিষয় - *বিতর্ক।*
 #নাম - *মাতৃভাষা।*
   ✍ - মৃদুল কুমার দাস। 

     ভাষা ভাবের বাহক। ভাব বিনিময়ের ভাষার একটা কথ্যভাষা। আরেকটি লেখ্যভাষা। সকল ভাষার এই দুটি রূপ লক্ষনীয়। আবার ভাষার লিখিত ও কথ্যের মধ্যে আবার কথ্যভাষাই ভাষার গতি নির্ণয় হয়েছে। যেমন বৈদিক লিখিত ভাষা থেকে কিন্তু পালি ও প্রাকৃত ভাষা আসেনি। এসেছে কথ্য সংস্কৃত থেকে। মাগধী প্রাকৃত থেকে বাংলা।
  আমরা বাঙালি বাংলা ভাষা  বলি। ভাষাগত জাতির পরিচয়ে আমরা বাঙালি জাতি। তাই মাতৃভাষা বাংলা। এই মাতৃভাষা নিয়ে যত গন্ডগোল। কারণ আন্তর্জাতিক হতে হলে কমিউনিকেশন ভাষা ইংরেজি। মাতৃভাষার উপর তখন কোপ। সব দেশে এ এক কঠিন বিধিলিপি। আর ভারতবর্ষের মত বহুভাষী দেশের কপালে তো বেশী দুর্ভোগ। ইংরেজির গুরুত্ব কমাতে একসময় বিশ্বে ভোলাপুক,এসপারেন্ত নামক কৃত্রিম ভাষা এল। কিন্তু ইংরেজির কাছে ধোপে টিকল না। ব্যাকরণগত কাঠামোর দুর্বলতার জন্য। ইংরেজি বিশ্বের বলিষ্ঠ ভাষা আজও মর্য্যাদায় আসীন। কারণ বিশ্বব্যাপী ইংরেজি ভাষার সাম্রাজ্যবাদী দিগ্বিজয়ে ইংরেজির গঠনটাই বলিষ্ঠ রূপ পেয়েছে। সাম্রাজ্যবাদী শাসন গেছে কিন্তু ইংরেজি ভাষার সাম্রাজ্যবাদ বিন্দুমাত্র ম্লান হয়নি,বরং আরো বলিষ্ঠ হয়েছে। ভারতবর্ষ ব্রিটিশ উপনিবেশের জন্য কি ইংরেজি পদে পদে গতিবিনা গুরুত্ব। তা কিন্তু নয়। যেমন জাপানে বা চীনে তো ব্রিটিশরা উপনিবেশ করতে যায়নি। তাহলে তারা ইংরেজির মহিমা স্বীকার করে ইংরেজি ভাষাকে ধ্যান জ্ঞান করেছিল কেন? জাপানে ইংরেজি শেখানো এখন বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা। শুধু কি চিন,জাপান এখন কোরিয়া,মালয়েশিয়া, তাইওয়ান,ফিলিপাইন- পূর্ব এশিয়ার তাবৎ দেশগুলো সরকারিভাবে স্থির করে ফেলেছে ইংরেজি বিনা গতি নেই। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর তো এমনই মনোভাব- 'ইংলিশ ইজ দ্য ল্যাঙ্গোয়েজ অব টুডে'জ ওয়ার্ল্ড,হোয়াই উই লাইক ইট অর নট।' এ সম্পূর্ণ এক ব্যবহারিক বুদ্ধির কাছে আত্মসমর্পণ।
   বৈদেশিক শাসন যখন যেমন এসেছে সেই শাসক তার ভাষাকে সরকারী কাজের ভাষা করেছে। যেমন- একসময় দমভোর আরবী ফার্সী ভাষা শিখতে হয়েছিল,সরকারী চাকরীর জন্য। আবার ইংরেজরা আসতে ইংরেজি ভাষা। আর তার হাত থেকে বাঁচার জন্য মাতৃভাষা মাতৃদুগ্ধের মত জোর প্রচার করেও হালে পানি না পাওয়ার ওষ্ঠাগত প্রাণ অবস্থা হয়েছিল। এই মাতৃভাষার ব্রাত্য হওয়ার জন্য একটি মধ্যপন্থা ব্যাখ্যা - শিশুর চারমাস বয়স পরে যদি মাতৃদুগ্ধের পাশে সেরেলাক শিশুর পুষ্টির সহায়ক হয়,তাহলে মাতৃভাষার পাশে ইংরেজি ভাষার একটা পুষ্টিকর অবস্থার আপত্তি কোথায়? সত্যিই করে বলতে কেনো ভাষা যদি ইংরেজি হয়,সিস্টেমের সেভাবেই চল হয়,তাহলে ইংরেজি না শিখে উপায়ন্তর আছে কি? নেই তো। 
  বাংলা অধূনা বাংলাদেশের মাতৃভাষা। বিশ্ব তাই জানে। ভারতের হিন্দী। সেখানে একটা প্রদেশের মাতৃভাষা বাংলা দিয়ে তো আর দেশের ভাষা হতে পারে না। যেখানে বহুভাষী দেশের নানা ভাষা,দেশের কমন কোনো ভাষা তো একটা চাই। ইংরেজি তার সহায় হল। 
  বিজ্ঞান চর্চার সমস্তটাই ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি,বায়োলজি,ম্যাথেমেটিক্সের কোনো টার্মের বাংলা পরিভাষা আছে কি? অক্সিজেন,হাইড্রোজেন, পটাসিয়াম,নাইট্রোজেন,পার অক্সাইড থেকে শুরু করে জীববিজ্ঞান,পদার্থবিজ্ঞান সব তো ইংরেজির পরিভাষার ছড়াছড়ি। রেল দফতরের সব ইংরেজি শব্দ। ব্যাঙ্ক, বীমাকোম্পানীর সব ইংরেজি শব্দের কেবল ব্যবহার। ডাক্তারের প্রেসক্রিপশনে সব ওষুধের নাম ইংরেজি,ওষুধ কোম্পানি সহ ওষুধের নাম ইংরেজি। ইংরেজিতে গড়গড়িয়ে বললে  কেউকেটা। রবীন্দ্রনাথ 'গীতাঞ্জলি'র জন্য নোবেল পেলেন ইংরেজি অনুবাদ থেকে। শুতে,উঠতে, বসতে,খেতে ইংরেজি ভারতের বহুভাষী দেশের কমন কমিউনিকেশন ভাষা। সাংসদ অধিবেশন হবে,ভাষা হয় হিন্দী নয় ইংরেজি। বাংলাভাষা সংসদে বললে কেউ বুঝতে পারবে না। কেজো ইংরেজি ভাষা না শিখলে চাকরি জুটবে না। সবাই যতই বাংলা ও বাঙালি বলে গলার শিরা ফুলিয়ে গলা ফাটাক না কেন,বাংলা শিখলে চাকরীর বাংলার বাইরে কোনো গুরুত্ব নেই। এই যে বাংলাভাষায় ইঞ্জিনিয়ার বিভাগে পড়াশোনার চল আসতে চলেছে,সেই চাকুরী বলতে তো বিদেশে। বাংলার বাইরে। তখন ইংরেজি সম্বল। তাহলে মাতৃভাষার গুরুত্ব কোথায় রইল? 
    শাসক সম্প্রদায় বা যে দেশনেতা মাতৃভাষার জন্য খুব গলা ফাটান,তিনিই আবার নিজের সন্তানকে বিদেশে পড়াতে পাঠান ইংরেজিতে ভরসা করে।
  তবে হ্যাঁ,ইংরেজিকে মাতৃভাষা বলে গ্রহণ করতে খুব খুব মনোঃকষ্ট আছে,আবার এও ছাড়া এক পাও চলার উপায় নেই। তারচেয়ে বললে কেমন হয় ইংরেজি পিতৃভাষা। সে যাই হোক কি মাতৃ,কি পিতৃ কি যায় আসে,মাতৃভাষার আছে মাতৃভাষায়। আর কেনো ইংরেজি যতদিন কাজের হয়ে ঘাঁটি গেড়ে বসে থাকবে,সে মাতৃভাষার জন্য গলাফাটানো,আর ইংরেজির আদ্যশ্রাদ্ধ যতই করা হোক,ইংরেজি মাতৃভাষা বলতে যতই বিবেকের দংশন হোক,ইংরেজিকে মাতৃভাষার মতো রপ্ত না করলে পেটে ভাত জুটবে না।
 এখন যা আর্থ সামাজিক অবস্থা মাতৃভাষা ও বিদেশী ভাষা হাত ধরাধরি করে চলে,আর মাতৃভাষার চেয়ে ইংরেজি ভাষায় রপ্ত যত বেশী হবে,তত সমাজের একজন কেউকেটা বলে প্রমাণ করতে পারবে। তাই ইংরেজি ভাষা ধনীর অট্টালিকা থেকে গরীবের পর্ণকুটির ইংরেজির তরঙ্গ অহরহ ধেয়ে চলে।
            ******
# কপিরাইট রিজার্ভ ফর মৃদুল কুমার।

# নাম- সুদেষ্ণা ।✍ - শুভব্রত ভট্টাচার্য।

শুভ জন্মদিন সুদেষ্ণাদি। আপনি ভাল থাকুন সুস্থ থাকুন করুণাময় আপনার মঙ্গল করুন। 

আপনার জন্মদিনে আমি পুরাণ এবং ইতিহাসের তিন বিখ্যাত সুদেষ্ণার আখ্যান লিখলাম। 

মহাভারতের প্রথম সুদেষ্ণা-

 আমাদের বঙ্গ দেশের উৎপত্তির সঙ্গে সুদেষ্ণা নামটি জড়িয়ে আছে ওতপ্রোতভাবে । আরণ্যক ব্রাহ্মনে বঙ্গ নামের জনপদের উল্লেখ পাওয়া যায় ।
মহাভারত থেকে জানা যায় যে, দৈত্য রাজ প্রহ্লাদ পুত্র বলি রাজের স্ত্রী সুদেষ্ণা হতে অঙ্গ,বঙ্গ, কলিঙ্গ, সুক্ষ ও পুণ্ড্র নামে পাঁচ পুত্রের জন্ম হয় । এরা সকলেই নিজের নামানুসারে নামীয় প্রদেশের রাজা হন । বঙ্গের নামানুসারে এর শাসিত রাজ্য বঙ্গ নামে অভিহিত হয় ।

মহাভারতের দ্বিতীয় সুদেষ্ণা-

মহাভারতের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করা মৎসদেশের রাজা বিরাটের পত্নী তথা অভিমন্যুর পত্নী উত্তরার মাতা সুদেষ্ণার কথা তো আমরা সবাই জানি৷ রাজকুমার উত্তর, শ্বেত, এবং শঙ্খ নামে তিন পুত্র ও রাজকুমারী উত্তরা ছিল তাঁর চার সন্তান। কেকয়ের রাজা কেকয়া ও রাণী মালভীর কন্যা ছিলেন তিনি। 

ভাষাশহীদ সুদেষ্ণা-

পৃথিবীর ইতিহাসে কেবল দু’টি ভাষার জন্যই জনগণকে লড়াই করতে হয়েছে, বুকের রক্ত ঝরাতে হয়েছে – ভাষা দু‘টি হলো বাংলা এবং বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি । বাংলা ও বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি ভাষার আন্দোলন পুরোপুরিভাবে জাতিগত অস্তিত্বের সাথে সম্পর্কিত ছিল। বাংলার মতোই বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরিদেরকে তাদের মাতৃভাষার স্বীকৃতির জন্য কঠিন সংগ্রাম করতে হয়েছে। সেই সংগ্রামে অনেক রক্ত ও প্রাণ ঝরেছে এবং সে সংগ্রাম ছিল বাংলা ভাষা আন্দোলনের চেয়েও দীর্ঘতর। মাতৃভাষার সাংবিধানিক স্বীকৃতি ও মাতৃভাষায় শিক্ষার দাবীতে ভারতের আসাম ও ত্রিপুরা রাজ্যে গত শতকের পঞ্চাশের দশক থেকে প্রায় অর্ধশত বছর ধরে সংঘটিত হয়েছে এক রক্তক্ষয়ী আন্দোলন। সেই আন্দোলনের চরম পর্যায়ে পুলিশের গুলিতে আত্মাহুতি দিয়েছিল সুদেষ্ণা সিংহ নামের এই বিদ্রোহী তরুণী।পৃথিবীর ইতিহাসে এ যাবত দু’জন নারী ভাষার লড়াইয়ে প্রাণ দিয়েছেন। কমলা ভট্টাচার্য আসামের বাংলাভাষা আন্দোলনে শহীদ হন এবং সুদেষ্ণা সিংহ শহীদ হয়েছেন বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি ভাষা আন্দোলনের জন্য। এক দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেন সুদেষ্ণা; পরিবারের সহায়-সম্বলহীন সামর্থ্যকেই চিরসঙ্গী করে নিয়ে তাঁর ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠা। ১৯৯৬ সাল। একদিন আসামের ‘বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী’ অধ্যুষিত এলাকায় ডাক আসে ‘ইমার ঠার' আন্দোলনের। বিষ্ণুপ্রিয়া ভাষায় ইমার ঠারের অর্থ 'মায়ের ভাষা'। দলে দলে বিষ্ণুপ্রিয়াভাষী মানুষ জড়িয়ে পড়ে এ আন্দোলনে। নিজ ভাষার অস্তিত্ব রক্ষায় রেল অবরোধ কর্মসূচীতে অংশ নিতে অন্য সবার মতো সুদেষ্ণাও মার্চের (বাংলা চৈত্র মাস) এক কাঠফাটা দিনে বিদায় নেন মায়ের কাছ থেকে। সেই বিদায়ের দিনটিই হলো সুদেষ্ণার চিরবিদায়ের দিন! ১৬ মার্চ ১৯৯৬ সাল দিনটি ছিল শনিবার, বাংলা ১৪০২ সনের ২রা চৈত্র। লোঙাই ঘাটের দক্ষিণ পাড়ে কচুবাড়ি গ্রাম। দলে দলে জয়োধ্বনি করতে করতে কচুবাড়িবাসীরা ‘ইমার ঠার’-এর আন্দোলনে যোগ দিতে লাগল। সুদেষ্ণাও ছিল কচুবাড়ি গ্রামের। সে ঘর থেকে বের হবার সময় মায়ের কাছে কিছু টাকার আবদার করেছিলো। কিন্তু দুঃখিনী মায়ের কাছে ছিল না কানাকড়িও।

সুদেষ্ণার সাথে ছিল তাঁর বান্ধবী প্রমোদিনী, বিলবাড়ি গ্রামের এক তরুণী। সুদেষ্ণা অবশেষে প্রমোদিনীর কাছেই দুটি টাকা ভিক্ষা চেয়ে নেয়। সকৌতুকে প্রমোদিনী তার বান্ধবীকে জিজ্ঞেস করে, “কিসের জন্য এ দুটো টাকা? কলকলি ঘাটের এ পথে তো কোনো দোকানপাটও নেই!” সুদেষ্ণা নীরব। প্রমোদিনী দুটো টাকা বেঁধে দেয় সুদেষ্ণার আঁচলে। মিষ্টি হাসিতে সুদেষ্ণা তখন বলেছিল, “এ দুটো টাকা খেয়াপারের জন্য” (মৃত্যুর পর খেয়া পারাপারের মাধ্যমে অন্য জগতে পদার্পণ করতে হয় বলে বৈষ্ণব ধর্মাবলম্বী মণিপুরীদের বিশ্বাস)।

প্রাণপ্রিয় বান্ধবী প্রমোদিনীর কাছে সুদেষ্ণার দ্বিধাহীন শেষ কণ্ঠবাণী,

"মোর রকতলো অইলেউ মি আজি ইমার ঠারহান আনতৌগাগো চেইস" (দেখিস, আমার রক্ত দিয়ে হলেও আজকে আমি আমার মাতৃভাষাকে কেড়ে আনবো)।

সেদিন পুলিশের গুলিতে আহত হন শতাধিক বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী। ঘটনাস্থলেই মারা যান বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী বিপ্লবী নারী সুদেষ্ণা সিংহ। 

বিষ্ণুপ্রিয়ারা শহীদ সুদেষ্ণাকে সম্মান জানিয়ে বলে ‘ইমা সুদেষ্ণা’; ‘ইমা’ শব্দের অর্থ মা। নিজেদের ভাষাকেও তারা ‘ইমার ঠার’ অর্থাৎ 'মায়ের ভাষা' বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে।  সুদেষ্ণাকেই আদিবাসীদের মধ্যে সর্বপ্রথম ভাষাশহীদ গণ্য করা হয়। 
এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আসাম ও ত্রিপুরাজুড়ে গণআন্দোলন তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে ওঠে। এসবের জেরে পরবর্তীতে সকল দাবি মেনে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয় আসাম সরকার। ২০০১ সালের পয়লা ফেব্রুয়ারি আসামে বরাক উপত্যকার প্রায় সকল প্রাথমিক বিদ্যালয়ে (১৫২টি) বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষায় পাঠপঠনের ব্যবস্থা চালু করা হয়। এর ছয় বছর পর সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃক স্বতন্ত্র মণিপুরী ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পায় বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষা।
সুদেষ্ণা সিংহ নিজের মৃত্যুর মাধ্যমে একটি ভাষাকে তার মৃত্যুদশা থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছেন। 

“ইমার ঠার পুঞ্চি পালক” (মাতৃভাষা অমর হোক)
রাষ্ট্রের বন্দুকের গুলির সামনে দাঁড়িয়ে সুদেষ্ণা সিংহ প্রতিষ্ঠা করে গিয়েছেন তাঁর মাতৃভাষার সম্মান।

বিষয় : *বিতর্ক সভা* ( মাতৃভাষা বাংলা বললে যদি রাগ হয়,হোক না মাতৃভাষা ইংরেজি) *©*শর্মিষ্ঠা ভট্ট*

 বিষয় : *বিতর্ক সভা*

( মাতৃভাষা বাংলা বললে যদি রাগ হয়,হোক না মাতৃভাষা ইংরেজি) 

*©*শর্মিষ্ঠা ভট্ট*


মনে রাখতে হবে শিশুর সর্বোপরি বিকাশ ৫ বছর বয়স পর্যন্ত সব চেয়ে বেশি। সেই মুকুলিত অবস্থায় মাতৃভাষার সাথে যদি  দ্বিতীয় ভাষাকে চালু করে দেওয়া যায়। এবং তার রেশ রেখে প্রাথমিকেও ইংরেজি চালু থাকে তাহলে প্যারালাল দুই ভাষা নিতে কখনও শিশুর অসুবিধা হয় না (অভিজ্ঞতা থেকে) ।

এখন প্রশ্ন বাঙলায় পড়াই কি যুক্তিযুক্ত? পশ্চিমবঙ্গই  আমাদের দেশ নয়। এই কথাটি শিশু বা শিক্ষার্থীদের নয়, অভিভাবক ও শিক্ষানীতির সাথে জড়িত সকল মানুষের জানা ও বোঝা জরুরী।  শিক্ষাব্যবস্থা কন্ট্রোলারদের এটি মনে রাখতে হবে রাজ্য নয়, দেশের উপযোগী করতে হবে ভবিষ্যৎ নাগরিকদের। ভারতীয় বিভিন্নতা ও কলোনীয়াল সংস্কৃতি অভ্যাস বশত ইংরেজি পুরো ভারতের এক কমন ভাষা। তাছাড়া বিজ্ঞানে এখনও অনেক শব্দ ইংরেজি অভিমুখীতা বহন করে। উচ্চশিক্ষার সহজ পথ ধাপে ধাপে দ্বিতীয় ভাষাকে আগে থেকেই গ্ৰহণ করে রাখলে প্রতিযোগীতামূলক   বিত্ত ও শিক্ষাবর্ষের লড়াইয়ে পিছিয়ে থাকতে হবে না। বিশ্বায়নের যুগে কুঠরিতে বসে নিজ ভাষার তারিফের মুগ্ধতা নিয়ে বসে থাকলে কুয়োর ব্যাঙ হয়ে থাকতেই হবে। তাই বাইরের দুনিয়ার বিকশিত হতে এই দ্বিতীয় ভাষা শিক্ষা চালিয়ে যেতে হবে। এত গেল বাঙলার আপামর বাঙলা মিডিয়ামের শিক্ষার্থীদের কথা। হয়ত এটা  রাজনৈতিক সিংহাসন বুঝে নিয়েছে, শিক্ষা কম জোর জনগণেরা হিসেব চাইতে আসবে না। 


অন্যদিকে একটা ক্লাসিফিকেশন। একটা ইংরেজি মিডিয়ামের অর্থনৈতিক রাজনীতির বিশাল বাজার। দুনিয়া দেশ সব দিকে ভাষাগত উপযুক্ত একটা গষ্ঠি তৈরী হয়েছে। হয়ত সুদূর ভবিষ্যতে একটা নতুন ক্লাস তৈরী হচ্ছে। এখানে কত চেষ্টা চরিত্র করে বাচ্চাদের ঢোকানো হচ্ছে। কারণ অভিভাবক জেনে গেছে মাতৃভাষা নামক আঁচলটি ধরে এই বিশাল কর্মজীবনের বৈতরণী পার হতে পারা যাবে না। ভার্সাটাইল যুগে যা একান্ত দরকার। ঠিক পথ নিয়েছে অভিভাবক, ক্ষমতা যাদের আছে। 


"তাই ইংরেজি মাতৃভাষা " এই খোঁচা হয়ত যারা দেন, তাদের ঘরের ছেলে মেয়েরাই ইংরেজি মিডিয়ামের। কারন বাস্তব একদিকে। সত্য মেনে নেওয়া আধুনিক ও উন্নয়নের পথে চলা। মা দিয়ে কি কেবল সমাজ চলে? মাসি পিসি কাকি কত "মা"ই তো জীবনের রসায়নে প্রান আনে। স্বাদ আনে পথ চলার। মা না হোক ইংরেজি অবশ্যই মাসি হবার যোগ্য। কারন মনে রাখতে হবে আমাদের দেশের ভাষার ভিন্নতা। আর কথা বলা যোগাযোগের মাধ্যমে একক হলে। মানসিক বিকাশ ও ঐক্য সম্ভব। 


অনেক বড়ো হয়ে গেলো। বিষয়টি এমন রসালো। আলোচনার আবেদন রাখে। ধন্যবাদ দাদারা সুন্দর বিষয়ে বক্তব্য রাখতে পারলাম 🙏

শুক্রবার, ৩০ জুলাই, ২০২১

তৃষ্ণা (কলমে শুভ্রজিৎ চক্রবর্তী)



সৌরেন নিজের লাম্বর্গিনি তে বসে ড্রাইভারকে অফিসের উদ্যেশ্যে গাড়ি চালাতে বললো। লেটেস্ট মডেলের আইফোন থেকে নিজের এইচ আর ম্যানেজারকে ফোন করলো। নতুন দশ জন আই আই টি পাস আউট এবং পি এইচ ডি হোল্ডার কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার কে নিযুক্ত করতে হবে। ও এখন ভারতের সর্ববৃহৎ ঠাণ্ডা পানীয় "তৃষ্ণা" র মালিক। ফোনে কথা বলতে বলতে গাড়ি গিয়ে দাঁড়ালো একটা ট্রাফিক সিগনালে। মুম্বাই শহরের গরমে, একটা ৮-৯ বছরের বাচ্চা ছেলে ৫ টাকার ঠাণ্ডা জলের প্যাকেট বিক্রি করছে। সৌরেনের নজর সেদিকে যেতেই ওর চোখের সামনে ভেসে উঠলো ওর বাল্যকাল। আজ ও হাজার মাইল অতিক্রম করে পেছনে ফেলে চলে এসেছে সেই দিনগুলো। কিন্তু সেদিনকার সেই প্রথম পদক্ষেপ ওর মনে আজও তাজা হয়ে আছে।


অনেকদিন ধরে বাবা অসুস্থ থাকায় কাজে বেরোতে পারেননি। সদ্য জন্মানো ছোটো বোনকে নিয়ে অসুস্থ দুর্বল মাও বিছানা ছেড়ে উঠতে পারছেন না। ঘরে খাবারের কোনো জোগাড় ছিলো না। সেদিন সৌরেন ফেলেছিলো ওর প্রথম পদক্ষেপ, হাজার মাইল অতিক্রম করার উদ্যেশ্যে। 

চায়ের দোকান থেকে ঠাণ্ডা জলের বোতল কিনে বাস স্টপে দাড়ানো বাসে বসে থাকা যাত্রীদের কাছে বিক্রি করার উদ্যেশ্যে।


সেই শুরু, সেখান থেকে আস্তে আস্তে নিজের তৈরি লেবু জল, আম পোড়া সরবত, আমের রস। এভাবে চলতে চলতে অনেক মাইল এগিয়ে বতোলিকৃত নিজের ঠাণ্ডা পানীয় বাজারে আনলো। নাম রাখলো তৃষ্ণা। আজ ও নিজের কোম্পানিতে পি এইচ ডি হোল্ডার নিযুক্ত করতে চলেছে। 

রাস্তার সেই ছেলেটাকে দেখছে আর মনে করছে ওর নিজের সেই ছোটো প্রথম পদক্ষেপ, হাজার মাইল অতিক্রম করার উদ্যেশ্যে।

ধন্যবাদ, সবাই ভালো থাকবেন।

©All rights are reserved for Subhrajit Chakravorty

পালঙ্ক (কলমে পিয়ালী চক্রবর্তী)


নতুন ঝাঁ চকচকে ফ্ল্যাটটা সাজাতে অভয় ঠিক করেছে অ্যান্টিক আসবাবপত্রের ব্যবহার করবে বলে । প্ল্যানমতো ও কলকাতার বিভিন্ন অকশান হাউজগুলোর সাথে যোগাযোগ করে, অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে পেয়ে গেল একটা দুর্দান্ত মেহগনি কাঠের বিশালাকায় অ্যান্টিক পালঙ্ক । পালঙ্কটা ঠিক অভয়ের মনের মতো । বিশাল ষোলো বাই ষোলো বেডরুমের ঠিক মধ্যিখানে পালঙ্কটা রেখেছে ও । ঘরটায় ও একটা সেগুন কাঠের আয়নাবসানো আলমারী ও একটা হরিণের সিংয়ের ওপরে শালকাঠের তৈরী বেডসাইড টেবিল দিয়ে সাজিয়েছে মনের মতো করে । 


অভয়ের কুড়ি বছরের বিবাহিত জীবনে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের অভাব ছিলনা । স্ত্রী শ্রীপর্ণা আর ষোলো বছরের পুত্র প্রয়াগকে নিয়ে দিনগুলো কেটে যাচ্ছিল বেশ । কঠোর পরিশ্রমে ধীরে ধীরে হাতে কিছু টাকা জমিয়ে, ভাড়া বাড়ি ছেড়ে এই নতুন ফ্ল্যাট কিনে, শহরের উপকণ্ঠে বেশ মনোরম নিরিবিলি জায়গায় একটা ঝাঁ চকচকে কমপ্লেক্সের মধ্যে ওরা শিফ্ট করে আসে । 


প্রথম প্রথম দিনগুলো কেটে যাচ্ছিল বেশ । গোল বাঁধলো অ্যান্টিক আসবাবে ঘর সাজানোর পর থেকে । সেদিন রাতে অভয়, শ্রীপর্ণা আর প্রয়াগ পালঙ্কে শুয়ে গভীর ঘুমে অচেতন । প্রয়াগ মা আর বাবার মধ্যিখানে শুয়েছে । ঘড়িতে তখন ঠিক রাত দুটো বেজে ঊনিশ মিনিট । ছটফট করে প্রয়াগের ঘুম ভেঙে গেল । যেন ওর মুখের ওপর কিছু একটা ভারী জিনিস চেপে বসেছে । দরদর করে ঘামছে ও । বিছানায় উঠে বসলো বুকে হাত চেপে ধরে । জল খেতে হবে একটু, বাথরুম যেতে হবে । বাবাকে ডিঙিয়ে ও নামলো নীচে । বেডসাইড টেবিল থেকে নিজের জলের বোতলটা তুলে মুখ লাগিয়ে ঢকঢক করে খেলো কিছুটা জল । তারপরে বোতলটা নামিয়ে রেখে পেছন ঘুরতেই ওর চোখ পড়ল সামনে রাখা সেগুন কাঠের আলমারীর আয়নাটার ওপরে । ও দেখলো ওর বাবা আর মায়ের মাঝে বসে আছে একটা ওরই বয়সী ছেলে । চোখটা একবার রগড়ে নিলো ও । হয়তো ভুল দেখছে সেই ভেবে । না, চোখের ভুল নয়, ছেলেটা তো এখনো বসে আছে ওর বাবা আর মায়ের মাঝে । এবারে ছেলেটা ওর দিকে চোখ তুলে তাকালো । ছেলেটার চোখে মণি নেই । কালো গর্ত হয়ে আছে সেই জায়গায় । দাঁত বের করে ওর দিকে চেয়ে হাসছে ছেলেটা । প্রয়াগ ভয়ে চিৎকার করে উঠলো প্রাণপণে ।


চিৎকারে ওর মা-বাবার ঘুম ভেঙে দেখে প্রয়াগ অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে মাটিতে । মাঝরাতে শোরগোল পড়ে গেল । সিকিউরিটির কাছে ফোন করে সেই কমপ্লেক্সের এক ডাক্তারের সন্ধান পেলো অভয় । ডাক্তারকে ফোন করতে উনি এসে প্রয়াগকে ভালো করে চেক করে বললেন, "মনে হয় মাঝরাতে কোনো কিছুতে ভয় পেয়েছে । হার্টরেট খুব ফাস্ট চলছে ।" 


সামান্য প্রাথমিক চিকিৎসার পরে প্রয়াগ চোখ মেলে তাকালো । ডাক্তারের নির্দেশমতো ওকে কেউ তখন কিছু জিজ্ঞাসা করলো না । ডাক্তার ওকে হালকা ডোজের ঘুমের ওষুধ দিয়ে চলে গেলেন । 


পরেরদিন অনেক বেলা করে ঘুম ভাঙল প্রয়াগের । খুব দুর্বল লাগছে । মাথাটা ভার হয়ে আছে আর ঘাড়ের দিকে প্রচন্ড চাপ ধরে আছে ওর । শরীরটা খুব ভার লাগছে । উঠে বাথরুম গিয়ে চোখে মুখে জল দিয়ে ফ্রেশ হলো ও । ওর বাবা ততক্ষণে অফিস চলে গেছে । ঘরে ওর মা আর ও । ছেলে ঘুম থেকে উঠেছে দেখে ওর মা এসে জিজ্ঞাসা করলেন, "কাল মাঝরাতে অমন চিৎকার করে অজ্ঞান হয়ে গেছিলিস কেন রে বাবু? কি হয়েছিল?"


প্রয়াগ অনেক চেষ্টা করেও কিছুতেই মনে করতে পারছেনা যে কাল রাতে কি হয়েছিল! শুধু নিজের তারস্বরে চিৎকারটাই ওর কানে ভাসছে । 


মনে করতে পারছেনা দেখে ওর মা খানিক নিশ্চিন্ত হলেন । কি না কি ব্যাপারে ভয় পেয়েছিল, ওসব মনে না পড়াই ভালো । ছেলেকে ব্রেকফাস্টে টোস্ট, অমলেট আর একগ্লাস দুধ দিয়ে রান্নার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন শ্রীপর্ণা । 


প্রয়াগের কিচ্ছু খেতে ভালো লাগছে না । শরীরটা এত ভারী কেন লাগছে! ঘাড়ে মাথায় এতো চাপ কেন ধরছে! ওহঃ, অসহ্য যন্ত্রণা । খাবার ফেলে রেখে ও উঠে আবার গিয়ে শুয়ে পড়লো পালঙ্কে । এই জায়গাতেই যেন পরম শান্তি । কি আরাম! আরামে আবার দুচোখ বুজে এলো প্রয়াগের । 


ছেলে ব্রেকফাস্ট করেনি । অনেক ডেকে ডেকে লাঞ্চের জন্যেও উঠলো না । সন্ধ্যেবেলা ঘুম থেকে একবার উঠে মা বলে ডাকলো । শ্রীপর্ণা ছেলের মাথার কাছেই বসেছিল । ততক্ষণে অভয়ও বাড়ি এসে গেছে । বড় ডাক্তারকে কল করা হয়েছে প্রয়াগকে দেখানোর জন্য । ডাক্তার এসে অনেক রকমের পরীক্ষা দিয়ে, ওষুধ আর ভিটামিন লিখে দিয়ে চলে গেলেন । 


সেদিন মাঝরাত । ঘড়িতে ঠিক দুটো বেজে ঊনিশ মিনিট । বাথরুম যাবার জন্য অস্বস্তিতে ঘুম ভেঙে গেল প্রয়াগের । ঘুম থেকে উঠে প্রয়াগ যেন আর দাঁড়াতেই পারছে না । কাঁধে, ঘাড়ে, মাথায় অসহ্য চাপধরা যন্ত্রণা ওর । কোনোমতে শরীরটা টেনে টেনে নিয়ে গেল বাথরুমে । প্রস্রাবের পরে মুখে জল দেবার জন্য বেসিনের সামনে দাঁড়ালো ও । বেসিনের সামনে লাগানো বড় আয়না । তাতে নিজেকে দেখে ভয়ে আত্মা যেন শুকিয়ে এলো ওর । ওর দুটো কাঁধের থেকে ঝুলে আছে সাদা শুকনো দুটো পা । আর ওর মাথার পেছন থেকে উঁকি দিচ্ছে সেই চোখবিহীন ছেলেটার মুখ, যাকে দেখে প্রয়াগ ভয় পেয়েছিল গত রাতে । বিশ্রীভাবে ওর কাঁধের ওপর দিয়ে ওর ঘাড়ে চেপে আছে সেই ছেলে । হাসছে দাঁত বের করে ওর দিকে তাকিয়ে । একেই দুর্বল শরীর, তার ওপরে আয়নায় এই দৃশ্য দেখে ঠকঠক করে কাঁপতে কাঁপতে আবার জ্ঞান হারালো প্রয়াগ । 


হুড়মুড় শব্দে ঘুম ভেঙে অভয় আর শ্রীপর্ণা দেখে ছেলে পাশে নেই । তাড়াতাড়ি বাথরুমের সামনে গিয়ে দরজা ধাক্কা দিতে দিতেও খুলছেনা প্রয়াগ । সিকিউরিটি ডেকে দরজা ভেঙে বের করা হল ওর অচৈতন্য দেহটা । অ্যামবুলেন্সে করে সেই রাতেই হসপিটালে নিয়ে যাওয়া হল ওকে । হসপিটালে সেই রাতেই এমার্জেন্সিতে সমস্ত ধরণের পরীক্ষা নিরীক্ষার পরেও ডাক্তার বুঝে উঠতে পারলোনা কেন এমন হচ্ছে ওর । সব রিপোর্টই নর্মাল । 


শ্রীপর্ণার মনে সন্দেহ দেখা দিলো । ও অভয়কে বললো, সবই তো ঠিক চলছিল । যেদিন থেকে পুরোনো জিনিসে ঘর সাজালে সেদিন থেকেই ছেলের এমন হলো । কার না কার চোখের জলের জিনিস হয়তো । হয়তো কত বিপদে পড়ে বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছে । তুমি খোঁজ নিয়ে দেখো কোথা থেকে এই জিনিসগুলো এসেছে । 


যদিও অভয় এসব কুসংস্কারে বিশ্বাস করেনা, তবুও সন্তানের ব্যাপারে পৃথিবীর সব বাবা-মা'ই দুর্বল । অভয় ঠিক করলো আজকেই খোঁজ লাগাবে আসবাবপত্রগুলোর সোর্স কি!


অনেক ফোন করে করে, অনেক চেষ্টা চরিত্রের পরে যে ভয়ানক সত্যের সন্ধান পেলো অভয়, তাতে ওর অন্তরাত্মা কেঁপে উঠলো । ও জানতে পারলো, যে পালঙ্কটা ও কিনেছে, সেটা বহু বছর পুরোনো এক জমিদার রায়বাহাদুর অমরীন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর সম্পত্তি । তাঁর মৃত্যুর পরে, সম্পত্তির লোভে তাঁর উত্তরাধিকারী একমাত্র পুত্র জগদীন্দ্রনাথকে হত্যা করে জমিদারের দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী, অর্থাৎ, ছেলেটির সৎ মা । মাঝরাতে, বাড়ির চাকরের সাহায্যে ওই পালঙ্কের ওপরে ঘুমন্ত ষোলো বছরের জগদীন্দ্রনাথকে মুখের ওপর বালিশ চাপা দিয়ে হত্যা করা হয় । অনেক ধস্তাধস্তির পরে, নিরীহ ছেলেটার যখন প্রাণবায়ু বেরিয়ে যায়, ঘড়িতে ঠিক তখন রাত দুটো বেজে ঊনিশ মিনিট । 


সমস্ত কিছু জানতে পেরে অভয় আর শ্রীপর্ণা বুঝতে পারলো যে, খুন হবার পরে ওই পালঙ্কের মধ্যেই রয়ে গেছে সেই ছেলের অতৃপ্ত আত্মা । সেই আত্মার মুক্তিই একমাত্র পথ প্রয়াগকে সুস্থ করে তোলার । 


কালবিলম্ব না করে অভয় সেই রাতেই ট্রেনে করে চলে গেল গয়ায় পিণ্ডদানের উদ্দেশ্যে । একবার প্রেতশিলায় পিণ্ডদানের পরে আত্মার মুক্তিলাভ অবশ্যম্ভাবী । ভোররাতে পূজারী ব্রাহ্মণকে সাথে নিয়ে প্রেতশিলায় পিণ্ডদানের সময় অভয় যেন টের পেলো কোনো দুটো অস্থির হাত এসে ওর হাত থেকে পিন্ড ছিনিয়ে নিয়ে চলে গেল । অভয় বুঝতে পারলো যে জগদীন্দ্রনাথের আত্মার এখন মুক্তিলাভ ঘটলো । নিরীহ ছেলেটির দুঃখে চোখ জলে ভিজে এল আরেক পিতার ।


আশ্চর্যজনকভাবে ঠিক তার পরেই সুস্থ হয়ে চোখ মেলে তাকালো প্রয়াগ । কাঁধে, ঘাড়ে আর কোনো চাপ নেই । অভয় গয়া থেকে ফিরে ছেলেকে সুস্থ দেখে আনন্দে আত্মহারা । পরেরদিন সকালেই প্রয়াগকে হসপিটাল থেকে ডিসচার্জ করে দিলো ডাক্তার । 


পালঙ্কটা থেকে চিরকালের জন্য বিদায় নিয়েছে বিদেহী আত্মা । অভয়ের ফ্ল্যাটে সেটা এখনো শোভা বাড়ায় ওদের বিশাল বেডরুমের ঠিক মধ্যিখানে ।

Copyright © All Rights Reserved to Piyali Chakravorty

হাজার মাইল যাত্রা শুর হয় একটি মাত্র পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে। ( কলমে--- পারমিতা মন্ডল।)

বিষয়---হাজার মাইল যাত্রা শুরু হয় একটি মাত্র পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে।
কলমে--- পারমিতা মন্ডল।

প্রিয়তম, 

         জানি তুমি ভুলে গেছো আমায় । কম দিন তো হলোনা। ভুলে যাওয়ারই কথা ।  ভাবছো আমি কেন ভুলিনি তোমাকে ? আমি যে তোমাকে ভালোবেসে ছিলাম। এক রঙিন স্বপ্ন দেখেছিলাম তোমাকে নিয়ে। যেমন ষোড়শী বয়সে দেখে । রঙিন কাঁচের আড়াল দিয়ে পৃথিবী দেখেছিলাম। সেই পৃথিবীতে তুমি ছিল আমার দেবদাস। আমি তোমার পার্বতী না হলেও তুমি ছিলে আমার কাছে সেই প্রেমিক পুরুষ।জীবনের প্রথম ভালোবাসা নাকি ভোলা যায় না কখনোই। আমিও তোমাকে ভুলতে পারিনি। হয়তো পারবো না কোনদিন। 

 কিন্তু তোমার আমার হাজার বছর একসাথে পথ চলা হলোনা। আমি যে  তোমার কাছে "নাটোরের বনলতা সেন "হয়ে উঠতে পারলাম না কোনদিন। প্রেমিকা  যখন ঘরনী হয় , তখন সে আর স্বপ্নের নায়িকা "বনলতা সেন" থাকে না। নিত্য কাজের মাঝে হয়তো বড় একঘেয়ে হয়ে যায়। তাই আমার ভালোবাসাকে বাঁচিয়ে রাখতে আমি এই পদক্ষেপ নিলাম। তোমার থেকে দূরে চলে গেলাম।  তোমাকে ভালোবাসি বলে । কোন তিক্ততা বা ভুল বোঝাবুঝিতে ভালোবাসা শেষ হওয়ার আগেই আমি সরে গেলাম।  জানি হয়তো ভুল হলো । কিন্তু আমাদের ভালোবাসাকে বাঁচিয়ে রাখবে এই দূরত্ব। এভাবেই সমান্তরাল রেখার মত আমরা হাজার বছর এগিয়ে যাবো। পৃথিবীর সব বিখ্যাত প্রেমিক- প্রেমিকার জীবন তো এই সমান্তরাল রেখার মত। তাই তো তারা আজও হাজার বছরপরেও বেঁচে আছে মানুষের মনে।

তুমি হয়তো ভাবছো আমি আমাদের ভালোবাসার অমরত্ব চাই।  নাম চাই, খ‍্যাতি চাই । তা নয় গো । আমি শুধু আমাদের ভালোবাসাকে  বাঁচিয়ে রাখতে চাই । চার দেওয়ালের মধ্যে দম বন্ধ হয়ে মরে যেতে দিতে চাই না। তুমি রাগ করোনা। দেখো এই ছোট্ট একটি পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে হাজার বছর বেঁচে থাকবে আমাদের ভালোবাসা। যা শেষ হয়ে যেত চার দেওয়ালের মধ্যে বন্ধী জীবনে। আজ দূরে থেকে নিত্যদিনের বিরহ সুখে নতুন করে  ভালোবাসবো তোমায়। 

আমি হাজার আলোকবর্ষ দূরে থেকেও শুধু তোমার থাকবো। আর জানি তুমিও হাজার বছর পথ হেঁটে আসবে নাটোরে। জীবনন্দের বনলতা সেনকে নয় আমাকেই খুঁজতে। সেদিনের এই ছোট্ট পদক্ষেপ তোমায় ,আমায়  হাজার মাইল হাঁটতে শিখিয়ে ।দূরে সরে গিয়ে ভালোবাসা হয়েছে আরো নীবিড়। এভাবে  দূরত্ব বজায় রেখে হাঁটতে চাই হাজার বছর। বীলিন হতে চাই তোমার ভালোবাসায়।  দেখো  আজ আমাদের  হাজার মাইল পথ হাঁটতেও কোন ক্লান্তি নেই। দুজন দুজনকে খুঁজে ফিরছি হাজার মাইল পেরিয়ে। যেমন খুঁজেছিল নাটোরের বনলতা সেনকে।

       অপেক্ষায় থাকবো-----
                                        
                                     ্্ইতি
                                     তোমার প্রিয়তমা ।
                                     
                                         

                                

#নাম- পথের সাধক। ✍ - শুভব্রত ভট্টাচার্য।

আজকের বিষয়, *“হাজার মাইলের যাত্রা শুরু হয় একটি মাত্র পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে”*।
✍️ শুভব্রত ভট্টাচার্য

আজ আপনাদের শোনাবো এক অনন্ত মহাজীবনের কথা। এক সামান্য মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান হয়ে তিনি কিভাবে হয়ে উঠলেন ভারতের এক প্রভাবশালী ধর্মগুরু এবং সারা বিশ্বের হরেকৃষ্ণ আন্দোলনের প্রধান মুখ। সারাবিশ্বে তিনি গৌড়ীয় বৈষ্ণব তত্ত্ব কে ছড়িয়ে দিয়ে গেছেন। তাঁর তৈরি সংগঠন আজ সারা পৃথিবীতে হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্রের মাধুর্য ছড়িয়ে দিচ্ছে। বলছি ইসকনের প্রতিষ্ঠাতা অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী মহারাজের কথা। 
১৯৩৭ সালের ১ জানুয়ারি গৌড়ীয় মঠ ও মিশনের প্রতিষ্ঠাতা ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর অনন্তলোকের যাত্রী হয়ে গেলে গৌড়ীয় বৈষ্ণব সম্প্রদায় অভিভাবক হীন হয়ে যায়। যদিও সরস্বতী ঠাকুরের কয়েকজন মুখ্য শিষ্য ছিলেন যাঁরা অত্যন্ত জ্ঞানী ও পন্ডিত। তাঁরা প্রত্যেকেই সংগঠনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য অত্যন্ত যোগ্য ছিলেন। তখন গৌড়ীয় মঠের ৬৪টি শাখা ও ১ টি প্রচার কেন্দ্র ছিল সমগ্র ভারতে। ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুরের মৃত্যুর পর এক বিতর্ক শুরু হয় এবং মূল গৌড়ীয় মঠ মিশনটি দুটি প্রশাসনিক সংস্থাতে বিভক্ত হয়।যারা আজকের দিন পর্যন্ত নিজেদের প্রচার করে চলেছে। এক বন্দোবস্তে তারা ৬৪ টি গৌড়ীয় মঠ কেন্দ্রকে দুটি ভাগে ভাগ করে। শ্রী চৈতন্য মঠ শাখা শ্রীল ভক্তি বিলাস তীর্থ মহারাজের নেতৃত্বে ছিল। গৌড়ীয় মিশন ছিল অনন্ত বাসুদেব প্রভুর নেতৃত্বে ।যিনি সন্ন্যাস গ্রহণ করার পর শ্রী ভক্তি প্রসাদ পুরি মহারাজ হিসাবে পরিচিত হন ।

ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুরের অন্যান্য যোগ্য শিষ্যরা এই বিভাজনের সাথে একমত হন নি। তাঁরা কেবল তাদের গুরুর মিশন সম্প্রসারিত করার জন্য অনুপ্রাণিত ছিলেন। তাই তাঁরা নিজেদের পৃথক মিশন শুরু করেছিলেন। এই স্বায়ত্তশাসিত মিশনের অনেকগুলি এখনও বিভিন্ন গৌড়ীয় মঠ নামে পরিচিত। এইসব অত্যন্ত জ্ঞানী ও বিচক্ষণ শিষ্যদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন ভক্তিবেদান্ত স্বামী মহারাজ। ১৯২০ সালের স্কটিশ চার্চ কলেজের স্নাতক অভয়চরণ দে ১৯২২ সালে ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুরের সংস্পর্শে আসেন। ১৯৩৩ সালে তিনি বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে আনুষ্ঠানিক ভাবে মঠে যোগদান করেন ও সরস্বতী ঠাকুরের শিষ্যত্ব গ্রহন করেন। সরস্বতী ঠাকুর অপ্রকট হবার কিছু দিন আগে স্বামী মহারাজকে বিদেশে হরিনাম সংকীর্তন প্রচারের আদেশ দিয়েছিলেন। তাই যখন সরস্বতী ঠাকুরের শিষ্যরা মঠ ভাগাভাগি করে নিলেন বা নিজেদের আলাদা আলাদা করে সংগঠন তৈরি করলেন, স্বামী মহারাজ তখন এসবের মধ্যে গেলেন না। বিভিন্ন বৈষ্ণব গ্রন্হ প্রচারে নিজেকে নিয়োজিত করলেন তিনি। আর নিজেকে প্রস্তুত করতে লাগলেন বিদেশে ধর্ম প্রচারের জন্য। ১৯৪৭ সালে গৌড়ীয় বৈষ্ণব সমাজ তাঁর পান্ডিত্যের জন্য  তাঁকে ভক্তিবেদান্ত উপাধি দিয়ে সম্মানিত করলেন। এরপর তিনি বৃন্দাবনে থাকতে শুরু করেন, বিখ্যাত রাধা দামোদর মন্দিরে। এখানেই বসে তিনি রচনা করেন ভাগবত পুরাণের টীকা। তিন খন্ডে ভাগবত পুরাণের টীকা বৈষ্ণব সাহিত্যের এক অদ্ভুত গ্রন্হ। ১৯৫৯ সালে এলাহাবাদ গৌড়ীয় মঠের জ্যেষ্ঠ প্রতিম গুরুভাই কেশব মহারাজের সন্ন্যাসব্রত গ্রহন করলেন। 
এরপর তাঁর মধ্যে বিদেশে কৃষ্ণনাম প্রচার করতে যাবার ইচ্ছে আরো প্রবল হল। কোন রকমে এক ভক্তের সহায়তায় জলদূত নামে এক জাহাজে একটি জায়গা পেলেন। একটি ছাতা, সামান্য কিছু শুকনো খাবার, কয়েকখানি বই ও আট টাকা সম্বল করে আমেরিকা যাত্রা করলেন। পরিব্রাজক সন্ন্যাসী হিসাবে আমেরিকায় তিনি তার আধ্যাত্মিক মতাদর্শ প্রচার করতে থাকেন। ১৯৬৬ সালের ৮ ই সেপ্টেম্বর জন্মাষ্টমীর পরের দিন তিনি পাশ্চাত্যে প্রথম দীক্ষা অনুষ্ঠান আয়োজন করেন ও ১১ জনকে দীক্ষা দেন। প্রতিষ্ঠা করলেন ইসকন  (ISKCON) আন্তর্জাতিক কৃষ্ণ ভাবনামৃত সংঘের। এর মাধ্যমে বৈষ্ণব ভাবধারাকে পাশ্চাত্য দুনিয়ার কাছে উন্মুক্ত করে দিলেন তিনি। শুরু হলো আন্তর্জাতিক হরেকৃষ্ণ আন্দোলন। 
১৯৬৭ সালের ৯ জুলাই সানফ্রান্সিসকো শহরের রাজপথে তিনিই পাশ্চাত্যে প্রথম রথযাত্রা পরিচালনা করেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, ভারত ও অন্যান্য জায়গায় ভ্রমণ করে তিনি অসংখ্য শিষ্যসংগ্রহে সফল হন। সংকীর্তন বই বিতরণ ও জনসভার মাধ্যমে হরেকৃষ্ণ আন্দোলনকে পাশ্চাত্যে তুমুল জনপ্রিয় করে তুলতে থাকেন। যত সময় এগোতে থাকে দিকে দিকে ইসকনের শ্রীবৃদ্ধি হতে থাকে। হরেকৃষ্ণ আন্দোলন প্রচারের জন্য চোদ্দবার তিনি বিশ্ব ভ্রমণ করেছেন এবং ছটি মহাদেশে পদার্পণ হয়েছিল তাঁর। বিদেশের মাটিতে বৈষ্ণববাদ এবং চৈতন্য মহাপ্রভুর ভাবধারাকে প্রচার করে ১৯৭১ সালে দেশে ফিরে আসেন। মায়াপুর ইসকন মন্দির তৈরি হলো।  মায়াপুর ছাড়াও বৃন্দাবন, দিল্লি সহ ভারতবর্ষের অন্যান্য সমস্ত বড় বড় শহর এবং তীর্থক্ষেত্রে ইসকনের মন্দির প্রতিষ্ঠা করা হলো। ধীরে ধীরে বিদেশের মাটি ছাড়াও দেশের মাটিতে ইসকনের প্রচারিত গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মের ভাবধারা ছড়িয়ে পড়লো তাঁর হাত ধরে। অসীম সাংগঠনিক শক্তি এবং নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা ছিল তাঁর।  তাঁর ছিল অগাধ জ্ঞান‌। জীবনে বহু গ্রন্থ রচনা করেছেন গীতা, চৈতন্য চরিতামৃত, শ্রীমদ্ ভাগবত গ্রন্থ গুলি সহ ষাটটিরও বেশি গ্রন্থের ইংরেজি অনুবাদ করেছেন তিনি। এছাড়াও তার অসংখ্য লেখা গ্রন্থ আছে বৈষ্ণব ধর্মের ওপর যেগুলি বর্তমানে আশিটি ভাষায় অনুবাদ হয়েছে। 
এক বিশাল সংস্থা তৈরি করে গেছেন তাঁর জীবদ্দশায়। ইসকনের বিশাল কর্মকাণ্ড, হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ লোককে প্রতিদিন দুইবেলা করে খাওয়ানো হয়।  যেখানে বন্যা খরা প্রাকৃতিক বিপর্যয় সেখানেই ইসকনের উপস্থিতি। দেশ-বিদেশ মিলিয়ে অসংখ্য মন্দির অতিথিশালা এবং নরনারায়ন সেবার ব্যবস্থা এক অলৌকিক কাজকারবার। 
প্রভুপাদের অন্য শিষ্যদের মতো তিনি নিজের ভাগে একেকটা মঠ নিয়ে সন্তুষ্ট হয়ে যাননি।  প্রভুপাদের আদেশ বিদেশে গিয়ে হরিনাম প্রচার করো, এ কথা সারা জীবন তাঁকে তাড়িয়ে নিয়ে বেরিয়েছে। তাই সাহস করে তিনি আমেরিকা যাবার পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন একরকম কপর্দকহীন অবস্থায়।  যার জন্য আজ এত বড় অরগানাইজেশন উনি তৈরি করে যেতে পেরেছেন।১৯৭৭ সালের ১৪ ই নভেম্বর তিনি অমৃতলোকে যাত্রা করেন। তাঁর নির্দেশিত পথেই ইসকন আজ মহীরুহে পরিণত হয়েছে। আধ্যাত্বিক চেতনায় পথ দেখাচ্ছে বিশ্বের লক্ষ লক্ষ নরনারী কে।

বৃহস্পতিবার, ২৯ জুলাই, ২০২১

একটা সিদ্ধান্ত (চন্দনা লাহা নাগ)


*একটা সিদ্ধান্ত*:


  অনিমেষ জীবনে বহু বছর অবিবাহিত থাকার পর আত্মীয় স্বজন বন্ধু বান্ধব দের হাজার কথায় এবার বিয়েটা করেই ফেলল। বিশেষ করে শেষ বয়সের বিধবা মায়ের কথা রাখার জন্য। নিজে দেখতে একজন সুপুরুষ হওয়া সত্ত্বেও জীবনে একটাই ভয় ছিল নিজের পায়ে ঠিকঠাক মতো দাঁড়াতে পারেনি তাই সংসার কে ঠেলে নিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা বোধহয় তার নেই। সামান্য একটা পানের দোকান থেকে যা ইনকাম হয় তাতে কোন মেয়েকে সচ্ছল রাখা বোধহয় তার পক্ষে সম্ভব নয়। এরকম হাজার ভাবনার ভিড় তাকে গ্রাস করে বসতো । তাই বলে কি মানুষ সংসার পাতে না? হাজার দরিদ্রতার মধ্যেও তো মানুষ সুখ খুঁজে বেড়ায়। তবে ওর দোষ কোথায় সংসার বাঁধতে? আর ও যা ইনকাম করে মোটামুটিভাবে একটা সংসার চলে যেতেই পারে।  মেঘে মেঘে বেলা বেশ ভালই ঘনিয়ে এসেছিল অর্থাৎ দেখতে দেখতে অনিমেষের বয়স প্রায় 38 বছরে যখন ঠেকেছে তখন এক দরিদ্র পরিবারের মেয়ের সাথে তার বিয়ে ঠিক হয়। অনিমেষের বয়স অত খানি হলেও চেহারার জন্য বয়স বোঝা দায়। মেয়েটিও অবশ্য জানতে পেরেছিল বিয়ের পর যে তাদের মধ্যে বয়সের ব্যবধান প্রায় কুড়ি বছর। স্ত্রীর ওই কম বয়সী মনের আবেগ গুলোকে ভালোলাগাকে আর শখ পূরণ করতে গিয়ে অনিমেশ আজ সর্বস্বান্ত হতে বসেছে। মাঝে মাঝে স্ত্রীর দামি গয়নাদামি দামি আসবাব পত্রের অভাব মেটাতে না পেরে নিজে এক প্রকার হীনমন্যতায় ভোগে। এরইমধ্যে দুইটি সন্তান ও জন্মগ্রহণ করেছে। তাদের ওষুধপাতি চিকিৎসা, পড়াশুনো, ভালো মন্দ খাওয়ানো, শ্বশুরবাড়ির সাথে পাল্লা দিয়ে চলা এই সবকিছু করতে করতে অনিমেষ যেন আজ ক্লান্ত। এই নিয়ে ঘরের মধ্যে নিত্য অশান্তি আজ তাকে পেয়ে বসেছে। তাই কারনে অকারনে দাম্পত্য টা যেন একেবারে বিষময় হয়ে উঠছে। ওদিকে স্ত্রীরও

যেন কেমন আনরোমান্টিক মনে হয় তার স্বামীকে। মনে হয় এটা যেন তার জীবনের একটা ভুল সিদ্ধান্ত। স্ত্রী দাম্পত্য সম্পর্কে সুখি নয় বলে নিজেকে অনেক বেশি সোশ্যাল মিডিয়ার মধ্যে বিলিয়ে দিয়েছে। নিজেকে একপ্রকার সহজলভ্য পণ্য মনে করেছে।উঠতি বয়সে কত ছেলেদের কাছ থেকে লাইক কমেন্ট এ আজ তার জীবন যেন এক রঙ্গিন মোড়কে মোড়া। এরই মধ্যে কয়েকজন হোয়াটসঅ্যাপে বেশ ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। সংসার তার কাছে বিতৃষ্ণা। অনিমেষের মায়ের দীর্ঘদিনের চিকিৎসার ঔষধ জোগাড় করতে করতে আজ সে দিশেহারা।

অনিমেষের মনে হল একমাত্র নেশায় তাকে পারে সব দুঃখ থেকে মুক্তি দিতে যা কিনা তার কখনো ভাবনার মধ্যেই ছিল না। তাই একটু একটু করতে করতে আজ সে প্রায় মাতালের পর্যায়। ফেসবুকে সেও অনেকটা সময় কাটায়। বিষাদ ময় জীবনের যত উক্তি ফুটিয়ে তুলে ফেসবুকে রঙিন পাতাগুলোতে। এমন এই উক্তির মোহে পড়ে আসক্ত হয় তনুশ্রী নামের এক বিবাহিত নারী। তনুশ্রী ও যেন নিজের না পাওয়া জিনিসগুলো অনিমেষের লেখার মধ্যে খুঁজে পায়। তাই প্রতিটা পোস্ট লাইক কমেন্ট থেকে কখনো বিরত হয়না। এভাবে কখন যে সম্পর্কের মধ্যে জড়িয়ে গেল অনিমেষ তা সে নিজেও বুঝতে পারেনি। অথচ এই অনিমেষকে ই যৌবন বয়সে যখন কোন মেয়ে কাছে পেতে চাই তো তখন নিজেকে গুটিয়ে নিত।

             অনিমেষএর মা নিজেকে আজ যেন কিছুতেই ক্ষমা করতে পারছেন না। কেবলই মনে হচ্ছে খোকার জীবনে ওই একটা সিদ্ধান্ত যদি আমি নিতে বাধ্য না করতাম তাহলে বোধহয় এমনটা হতো না। আমার ওই জীবনের একটা সিদ্ধান্ত ই যে আজ তাকে হাজার মাইল পথ হাঁটতে শিখিয়ে দেবে তা আমি বুঝতে পারিনি। মানুষের জীবনের এই হাজার পথ চলার মধ্যে সুখ-দুঃখ সবকিছুই মিলেমিশে থাকে তবুও জীবনের একটা অন্য মানে খোঁজে পাওয়া যায়। কিন্তু আমার অনিমেষ যে একেবারে শেষ হয়ে যাচ্ছে। এখন আমি কি করি?  হে ঈশ্বর আমি তো এমনটা চাইনি। আমি কেন পৃথিবীর কোন মায়েই তো এমনটা চায় না। তুমি আমার অনিমেষের চলার পথ মসৃণ করে দাও আবার সবকিছু ঠিকঠাক করে দাও প্রভু। মা হয়ে ছেলের সংসার  এই ভাবে ভেসে যেতে যে দেখতে পারিনা বড় কষ্ট হয়।

বাক্য আলোচনা।। (বাস্তব ঘটনা অনুধাবনের পরেই আমাদের শারীরিক কিছু পরিবর্তন হয়। তাই আমাদের *ব্যক্তিগত অনুভব*) ©শর্মিষ্ঠা ভট্ট

 বাক্য আলোচনা।। 

(বাস্তব ঘটনা অনুধাবনের পরেই আমাদের শারীরিক কিছু পরিবর্তন হয়।

 তাই আমাদের *ব্যক্তিগত অনুভব*) 



©শর্মিষ্ঠা ভট্ট


রমলাদিকে জামাইবাবু তুলোয়  মুড়ে রাখতেন। আমরা বলতাম। রমলাদি ব্যাঙ্ক কি জানে না। কার্ড আছে, কয়েকটি নম্বর মুখস্থ করিয়ে দিয়েছে,  শপিং করে। সিনেমা মল যায়। তাও জামাইবাবু ছাড়া খুব একটা নয়। কিন্তু রমলাদি মডেল হাঁদাভোঁদা নন। আমাদের যত জ্ঞান তার কাছে থেকে নেওয়া। মস্ত মলা তিনি। জগৎকে চিনেছে ছায়ায় বসে। ছেলেরা বড়ো হয়ে বিদেশে। কম বয়সে বিয়ে সহজে সব নিপটে  গেছে। এখন ঝাড়া হাত পা কেবল পার্টি থ্রো করেন আর ডাকাডাকি করেন। আমোদ উল্লাসে কাটে দিন। আমরা বলি রমলাদি ছেলেরা এমন কিছু বড়ো নয়। সবে পড়ছে। একটু বুঝে চলো। মুখ গোমড়া করে বলবে কেন রে বেশ তো আছি। 


দুনিয়া কি অনুভূতি হল সেদিন, যেদিন হঠাৎ নোটিশ না দিয়ে জামাইবাবু চলে গেলেন। এত বড়ো সম্পত্তির কোথায় কি কিছু জানে না রমলাদি। ছেলেরাও নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত। এক তো ছাতা উড়ে যাবার খালিপন, অন্যদিকে আর্থিক চিন্তা। রমলা ছয় মাসে যেন বেশ কিছু বুড়ি হয়ে গেল। অনেক বেশি প্রিজার্ভ। মানুষের সাথে মেপে মেলামেশা লিখে গেছেন ব্যক্তিগত অনুভব থেকে। সহজ বিশ্বাসের পথে একটা ছোট চেক পোস্ট বসিয়েছেন। ছেলেদের বিষয়ে সতর্ক ও অনেক কড়া। 

প্রথম  মাস চুপ হয়ে গিয়েছিল কমলাদি । কারো সাথে কথা বললেই হাউমাউ করে কাঁদত। এমন করে তো চলে না! রাত রাত জেগে অনুভব করেছেন। দায়িত্ব দিয়ে গেছেন জামাইবাবু। তাঁর কাজগুলো যে শেষ করতে হবে। খাতাপত্র  বাড়ীতে এনে দেখতে শুরু করলেন পাশে চেনা চেটার এ্যাকাউন্টারকে বসিয়ে। বিশাল অর্থনৈতিক ঘাবলা । ডুবে যেত আর কয়েক ধাপ পরে। মহিলা পার্টির মুখ্য ভূমিকায় থাকত যে মহিলা, তার স্বামী এই ঘাবলাবাজির কারন। রমলাদি ছয় মাস পরে বাইরে বের হলেন। আমরা দেখলাম ব্যক্তিগত অনুভব তাকে শক্তপোক্ত সাহসী করে তুলেছে। সাথে নিয়ে গেছে লাতুপুতু চেহারা বোকা মিষ্টি হাসিটা। 

🙏💐

# নাম- বাস্তব ও আবেগ। ✍ - মৌসুমী চন্দ্র।

বাস্তব ঘটনা অনুধাবনের পর আপনার শারীরিক কিছু পরিবর্তন হয়-----
*যেমন কোন নারী যদি শারীরিক মানসিক ভাবে নিগৃহীত হয় মস্তিষ্কের পিটুইটারি গ্ল্যান্ড ঠিক মত কাজ করে না, সে ধীরে ধীরে মানসিক জোর হারিয়ে ফেলে।
*যে মানুষটি " আজকে যে মুখে মারে বিশ্ব,চুপচাপ হয়ে যাবে কাল সে,কাল সে"বাস্তব কোন অপ্রীতিকর ঘটনা তার কল্পনা, স্বপ্নের জগতের উপর
প্রভাব ফেলে তার স্নায়ুকে দুর্বল করে দেয়।
*  ছেলে, বৌমা বিদেশে থাকে সেন দম্পতি
বড় অসুখী হয়ে পড়েন, বাস্তব পরিস্থিতিতে বড়
একাকীত্বে ভুগতে ভুগতে ডিপ্রেশনের রুগী হয়ে
পড়েন।
*হঠাৎ কোন ছেলে বা মেয়ে  অতিরিক্ত প্রতিযোগিতায় বাস্তব অবস্থার সম্মুখীন হয়ে
ঘরকুনো হয়ে গিয়ে,দেহে ফ্যাটের আধিক্যহেতু ব্লাড সুগার বেড়ে যায়।
*একজন মেধাবী ছাত্রীকে কোন গুরুস্থানীয় মানুষের অসভ্য আচরণের ফলে তার শরীরে হঠাৎ উত্তেজনার ফলে যৌন নির্যাতনের ফলে যৌন সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে।
*খুব ভালো মেধাবী ছাত্র বা ছাত্রী বিশেষ বাস্তব কারণে খারাপ রেজাল্ট করলে তার চিন্তা নিম্নমুখী
হয়,এমনকি নিজের সম্বন্ধে খারাপ ধারনা তাকে আত্মহননের দিকে নিয়ে যেতে পারে।
*হঠাৎ বাস্তব আবেগের বশবর্তী হয়ে কোন অন্তঃসত্ত্বা
নারীর গর্ভপাত ঘটলে, তার বন্ধ্যাত্ব সৃষ্টি হতে পারে। 
*অতি আধুনিক সমাজে স্ট্যাটাস,পার্টি মেইন্টেন করে মদ্যপান অধিক পরিমাণে করলে, লিভার ক্যান্সার মৃত্যুর কারণ হতে পারে
*বর্তমানে এই করোনাপরিস্থিতিতে চূড়ান্ত বাস্তব অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে সব ছাত্রছাত্রীদের অধিক মোবাইল ব্যবহারের ফলে, চোখের ও কানের রোগে
ভুগছে, শারীরিকভাবে অলস হয়ে পড়ছে।

অঙ্কণে ও লিখনে মৌসুমী চন্দ্র

# নাম- জীবন যেরকম। ✍ - মৃদুল কুমার দাস।

বাক্য আলোচনা-বাসর। 
  #বিষয় - *বাস্তব ঘটনা অনুধাবনের পরেই আমাদের শারীরিক কিছু পরিবর্তন হয়। তাই আমাদের ব্যক্তিগত অনুভব।*
  # নাম- *জীবন যেরকম।*
    ✍ - মৃদুল কুমার দাস। 

         জীবন প্রকৃতির দান। প্রকৃতিই জীবনকে করে গতিশীল,প্রাকৃতিক নির্বাচনের প্রত্যেকেই অধীন। আর প্রকৃতির সঙ্গে অস্তিত্বের জন্য লড়াই( struggle for existence)। এই লড়াইটাই অহরহ জন্ম দেয় বাস্তবতা।
  বাস্তবতার জন্ম হয় বস্তুপ্রকৃতি থেকে। আর হৃদয়ে যখন সে প্রতিবিম্বিত হয়,তখন হৃদয়ে একপ্রকার প্রতিক্রিয়া অনুষ্ঠিত হয়। তারই নাম প্রকাশ। প্রকাশ ব্যতীত জীবন হয় না। প্রকাশ  জীবনকে দেয় গতিশীলতা,হৃদয়ে প্রকাশ হল একপ্রকার গতিশীল অবস্থা। এই প্রকাশ মনের অধীন। মন যেভাবে গ্রহণ করবে সেভাবেই মন প্রকাশের ক্ষমতা ধারণ করবে। 
  এই মন শরীরের গঠনের উপর নির্ভর করে। শরীরে বিভিন্ন হরমোনাল গ্রন্থি আছে। তারাই প্রকাশের দুটি ধারা জন্ম দেয় - একটি বাস্তব ও অপরটি আবেগ। 
    আবেগ ছাড়া জীবন হয়না বলেই আবেগের কিছু ক্ষতিকর দিক আছে,কিছু উপকারী দিক আছে। এজন্য আমরা বলি জীবন মানেই ঠিক ও ভুলের অঙ্গ। জীবন মাত্রেরই ভুল থাকে। জীবন মানেই ঠিক থাকবে। এই ভুল ও ঠিকের ব্যালান্সই হল জীবনের অস্তিত্বের মূল। ভুল মরণকাঠি। ঠিক জিয়নকাঠি। যাকে বলে জীববিজ্ঞানের ভাষায় অভিযোজন। 
   জীবন প্রকৃতিজাত বলেই জীবনকে অভিযোজন করতে হয় ব্যক্তির সাথে ব্যক্তির, ব্যক্তির সাথে বস্তুর। বস্তু থেকে ভাবের আমদানিকে বলে বাস্তব। তা থেকেই বাস্তব ঘটনার জন্ম হয়। যেমন বাস্তব নিয়ম পথে নামলে বামদিক দিয়ে যেতে হয়। গাড়ি ঘোড়ার যাতায়াতের মধ্যে নিশ্চয় ব্যক্তি চলবে না। ট্রেনে,প্লেনে,জাহাজে ওঠা নামার একটা সিস্টেমটাই বাস্তব,কেননা তখন ব্যক্তি বস্তুর অধীন। বিন্দুমাত্র নিয়ম  ভঙ্গ হলেই মৃত্যু নিশ্চিত। সমুদ্রের ঢেউ ধরার মধ্যে আনন্দ আবেগ থেকে জন্ম নেয়,কিন্তু আবেগের মাত্রা ছাড়িয়ে গেলে মৃত্যু আসে,তাই বস্তুর কাছে নিজের নিয়ম মেনে চলাটাই বাস্তব। এতো গেল বস্তুর সঙ্গে ব্যক্তির আবেগ ও বাস্তবের সম্পর্ক। সুখ, আনন্দ আবেগ থেকে উপলব্ধি,আর ব্যক্তির পরাজয় থেকে মৃত্যু বাস্তবের  অনুভূতি। এবার আসি ব্যক্তির সঙ্গে ব্যক্তির আবেগ ও বাস্তবের সম্পর্কের কথায়।
   আবেগ ছাড়া পারিবারিক বন্ধন হয় না,মানুষের তথা দেশের সেবা হয় না। ভালবাসা,দান,দয়া,সংযম,নির্ভিকতা,মুক্ত জীবনের উল্লাস ছাড়া জীবনের উপভোগ্য হয় না। আর এর মধ্যে জীবনের চরম সত্যগুলি জীবনের অস্তিত্বকে চরম মূল্যবান করে,আবেগের থেকেও বড় তখন বাস্তব। লোভ মানুষকে আবেগতাড়িত করে ক্ষতি করে বেশি,বাস্তবে শিক্ষা হয় তত। যেমন সারদা ও রোজভ্যালিতে টাকা জমালে কম সময়ে দ্বিগুণ ফিরে আসবে। এই লোভে পা দেওয়ার পর,নির্দিষ্ট সময়ে ডবল ফেরত হবে কি, যে টাকাটা জমিয়েছিল,সেটাই ফেরত এলো না,তারপর উপলব্ধিটা কেমন হয়। সকল কার্যই ফল দেয়। আর এই ফল হল সাফল্য হলে ভাল ফল ও ব্যর্থ হলে মন্দ ফলের  উপলব্ধির হয়। 
    জীবন মানেই যেকোনো কর্ম। কর্ম মানেই ফল। ফল মানেই ভাল ও মন্দের উপলব্ধি। 
    ক্ষমতা লোভ,আইনের শাসন,শাসনের আইন, পরিশ্রমের ফল,স্বার্থপরতা, অ্যাথেলেটিক্সে কম্পিটিশন করে  সোনার পদক গলায় ঝুললে অনুভূতি সঙ্গে সঙ্গে আসবে। লড়াইটা বাস্তব, তার ফলটা আবেগ দিয়ে উপভোগ। পরীক্ষার হলটা বাস্তব,ফলটা আবেগ দিয়ে উপভোগ্য। প্রত্যেক ক্রিয়ারই বিপরীত প্রতিক্রিয়া,আপেক্ষিকতাবাদ,বস্তুমূলক বাস্তবতা ও জীবনের সঙ্গে জীবনের যোগ যেখানে যত বাস্তবতা তত শিক্ষা হচ্ছে তার ফল। আর ফলভোগটা ব্যক্তিবিশেষের কাছে আবেগের উপভোগ্য। আবেগ ছাড়া উপভোগ্য হয় না। শুধু বাস্তব, শুধুই আবেগ জীবনকে পূর্ণতা দেয় না। তবে এটা সত্য বাস্তব কখনো ঠকায় না। আবেগ ছাড়া চলার উপায় নেই,সে আবার ক্ষেত্রবিশেষে ভয়ঙ্কর ক্ষতির কারণ হয়। বাস্তবের সঙ্গে আবেগের ব্যালান্সই জীবনকে খুব মূল্যবান করে। 
                  ******
# কপিরাইট রিজার্ভ ফর মৃদুল কুমার দাস।

শিরোনাম - দুরত্ব✍️ ডা: অরুণিমা দাস

 শিরোনাম - দুরত্ব ✍️ ডা: অরুণিমা দাস আধুনিকতা মানেই অন্যরকম একটা ব্যাপার, উন্নতির পথে এগিয়ে যাবার সিড়ি তৈরি করে দেয় আধুনিকতা। আজকাল কেউ আ...