রাত্রের শেষ প্রহরের ঘন্টা পরেছে প্রাসাদ দেউড়িতে।ক্রমশঃ জাগরণ হবে এক ব্যাস্ত প্রাসাদের। ভিস্তিরা জল নিয়ে বেরোবে শহরের রাজপথে। রাজপ্রাসাদে একই সময় নালা থেকে জল তুলে ধোয়া শুরু হবে সমস্ত প্রাঙ্গণ। তারপরে একে একে কক্ষে কক্ষে আসবে জল।অন্যদিকে পাচনাগারে পাচকের সহকারী জ্বালাবে একে একে পঞ্চান্নটি মাটির উনুন। শুরু হবে দিনের খাদ্য প্রস্তুতের কাজ। প্রাসাদ সংলগ্ন দেব মন্দিরের পুরোহিত এতক্ষণে প্রস্তুত হচ্ছেন কিছুক্ষণ পরেই ঊষাগমে শুরু করবেন বেদ পাঠ। নিজের কক্ষের লাগোয়া অলিন্দে দাঁড়িয়ে ঊষার আগমন দেখছেন সত্যবতী। চোখে তার রাত্রি জাগরন ক্লান্তি। আজ কয়েকদিন হল নিদ্রা দূর হয়েছে তার চোখ থেকে।
প্রাসাদ অলিন্দে দাঁড়িয়ে সত্যবতী দেখছিলেন ঋজু সৌম্য প্রবীণ বৃষস্কন্ধ পুরুষটি প্রাসাদের সিংহদুয়ার দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছেন ধীর গতিতে। ঊষাকালে শরীরচর্চা করে নদীতে অবগাহন করার দীর্ঘ দিনের অভ্যাস এই সিংহ-কটি পুরুষটির। আচ্ছা যদি ওই বৃদ্ধ শান্তনুর বদলে এই পুরুষটি তাঁর স্বামী হতেন? সত্যবতীর চেয়ে বয়স দেবব্রতর বেশী অবশ্যই। তাহলে? তাহলে আজ কি এত কিছু ঘটতো? তাঁকে কি আজ এইভাবে যেতে হত এই হস্তিনাপুর প্রাসাদ ছেড়ে? সুপুরুষ,ধীর বাচন,ভয়ঙ্কর যোদ্ধা এই পুরুষটিকে কামনা না করে থাকা কঠিন। সেই কঠিন কাজ সত্যবতী করেছেন এতকাল। অবশ্য এই পুরুষ ভীষ্ম বলেই একাজ সহজ ছিল।আসক্তির লেশমাত্র দেখেননি কখনো এর চোখে সত্যবতী। সামনে এলে সর্বদা মাটির দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে মাতৃসম্বোধনে কথা বলেছেন ভীষ্ম। কখনও বা দাসেয়ী বলেও সম্বোধন করেছেন তাঁকে। দাস রাজার কন্যা তাই দাসেয়ী। তিনি দেবব্রতের চোখে দেখেছেন এক সুদূর দৃষ্টি,এক অমোঘ শূন্যতা। তার উৎস কি?ব্যাকুল হবার মতন মানুষ সত্যবতী না। তা তিনি হনও নি।কিন্তু বুকের কাছে কখনো কখনো একটা তীব্র মোচড় অনুভব করেছেন। আচ্ছা,সত্যবতীর রূপ জানেন গঙ্গাপুত্র? দেখেছেন কখনো, দূর থেকে হলেও? জানা নেই তাঁর। একবার,শুধু একবার অত্যন্ত কৌতুহলে তাঁকে পরীক্ষা করেছিলেন সত্যবতী। ভ্রাতার পত্নীদ্বয়ের গর্ভ উৎপাদনের প্রস্তাব নিয়ে। ভেঙে দেখতে চেয়েছিলেন এই নির্বাক পুরুষকে। সেই প্রথম স্বর উচ্চগ্রামে গিয়েছিল কিঞ্চিত। যখন ভীষ্ম তাঁকে স্মরণ করিয়েছিলেন তাঁর কাছে করা প্রতিজ্ঞার কথা।
-ইন্দ্র যদিচ স্বর্গচ্যুত হয়,ধর্ম যদিচ স্বর্গচ্যুত হয়…ভীষ্ম তবুও তাঁর প্রতিজ্ঞাচ্যুত হবেন না।
সত্যবতী প্রতিটি কথাকে পরম আস্বাদে গ্রহণ করেছিলেন। কোথাও যেন শান্তিও হচ্ছিল তাঁর। তাঁর পুত্রবধুদের ক্ষেত্রোৎপাদনে আগ্রহ যদি দেখাতেন গঙ্গাপুত্র তাহলে হয় তো অন্তরে ক্ষুণ্ণই হতেন সত্যবতী।কেন হলেন না ভীষ্ম রাজি? শুধু কি তাঁরই প্রতিজ্ঞার জন্য?
আজ সব মনে পড়ছে একে একে তাঁর। এত দিন তিনিও বন্দী ছিলেন এই প্রাসাদের মায়াবী বন্ধনে। কর্তব্যের কারাগারে মূর্খ বন্দী এই প্রবীণের মতই।আজ সব একে একে ফিরে আসছে স্মৃতিতে। থাক্! আজ আর না।সামনের দিনগুলোতে সঙ্গে শুধুই সকল স্মৃতি। একে তিনি একটু একটু করে উলটে পালটে দেখবেন সঙ্গোপনে। লোক সমাজ জানবেনা,তাই বলতেও পারবেনা কিছু। দূরের থেকে হলেও এই একটি সঙ্গ ছিল তাঁর, যাঁর সন্নিধানে তাঁরও ইচ্ছা হত কিশোরীর মত রাঙা হয়ে উঠতে লাজে।
নাঃ তার হাতে আর বেশি সময় নেই। দাসী অলকাকে দিয়ে গঙ্গাপুত্র কে ডেকে পাঠালেন সত্যবতী। রাজ্যসভায় যাওয়ার আগে গঙ্গাপুত্র যেন একবার তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে যান।
সকাল বেলায় শস্ত্রাভ্যাস সেরে বসে আছেন যমুনার তীরে। মৃদু মৃদু শীতল হাওয়া আসছে যমুনার তীর থেকে।শীতের সময় আগতপ্রায়। এখনই সকালে বেশ ঠান্ডা জমে আসে। তেল মাখা গায়ে কিছক্ষণ বসে থাকার পরে তাঁরও মনে হয় একটু শীত করছে বোধ হয়। নিজের মনেই হাসেন দেবব্রত। কম বয়সে যখন শ্রেষ্ঠ যোদ্ধা হবার লোভ মনকে আচ্ছন্ন করে রাখতো তখন নিয়ম করে বছরে অন্তত চারমাস চলে যেতেন কনখলে। প্রতিদিন সূর্য বন্দনা করে স্নান করতেন ওই তীব্র স্রোতস্বিনী বরফ গলা জলের ধারায়। শরীরকে বশ না করতে পারলে কিছুতেই শ্রেষ্ঠ হওয়া যায় না। লোকে বলে জিতেন্দ্রিয় তিনি। লোকে বলে পিতার জন্য বিপুল স্বার্থত্যাগ করে যে দৃষ্টান্ত তিনি রেখেছেন তাতে তাঁর খ্যাতি থাকবে প্রলয়ের শেষ দিন অবধি। তাঁর আসন নাকি বাঁধা থাকবে স্বর্গে।কিন্তু তাঁর অন্তর কি বলে? কেউ জানে না। কর্তব্য আর কর্ম-এই দুই বাঁধনে নিজেকে এমন করে বেঁধেছেন যে লোক তো দূরস্থান নিজেরও শোনার যো নেই নিজের কথা। সারাদিন রাজ্যের নানান কাজে ব্যাস্ত থাকেন।ব্রাহ্মমুহুর্তে শয্যা ত্যাগ করেন। তারপরে পূজা-শরীরচর্চা সেরে দরবারের কাজে যাওয়া। সারা জীবন তিনি নারীসঙ্গ কে দূরে রেখেছেন। মনে পড়ে সত্যবতী একদিন এসেছিলেন তার কক্ষে। সেদিন মাতৃ সম্বোধনে সত্যবতী বিরক্ত হয়ে চলে গেছিলেন। সবই বোঝেন তিনি। আর একদিন, যেদিন হৃদয়ের দ্বার বন্ধ করে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন অম্বাকে। অম্বার অভিশাপ আজও বয়ে বেড়াতে হচ্ছে।
ছেদ পড়লো তাঁর ভাবনায়।তাঁর অঙ্গসংবাহক নিষাদ এসেছে।
-মহারাণী সত্যবতীর দূত এসেছে। মহারাণী আপনাকে একবার স্মরণ করেছেন। রাজ্যসভায় যাবার আগে একবার তাঁর সঙ্গে দেখা করে যেতে অনুরোধ করেছেন।
পুত্র দ্বৈপায়ন তাঁকে বলছে এই রাজপ্রাসাদ এখন বন্দীশালা। এ বন্দি শালা ত্যাগ করে বানপ্রস্থে যেতে। আশ্চর্য্য, এতদিন তাঁর মনেও হয়নি তিনি বন্দীশালায় আছেন? শান্তনুর মৃত্যুর পরেও তিনি আঁকড়ে থেকেছেন এই বন্দীত্ব! মহারাজ শান্তনুর মৃত্যুর পরে দ্ব্যার্থহীন ভাষায় জানিয়ে দিয়েছিলেন তিনি সহমৃতা হতে প্রস্তুত নন।তাঁর পুত্রদের প্রতিপালন অনেক বড় ধর্ম তাঁর কাছে।নিঃশব্দে তাঁকে সমর্থন করে গিয়েছিলেন ভীষ্ম।
ভীষ্মের ভয়ে কেউ টুঁ-শব্দটি করেননি। আজ সেই রাজ্য, রাজসভা আর ক্ষমতাকে ছেড়ে অরণ্যবাসীনি হতে হবে। কেন?কেন সত্যবতী? আহ্,কি যন্ত্রণা তাঁর ভিতরে,কি অসহ্য যন্ত্রণা! তিনি ধীর গতিতে গবাক্ষের কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন।
বাইরে এখন নরম লাল আলো একটু একটু করে ভেসে উঠছে। রাত্রির অন্ধকার কেমন পা পা হেঁটে চলে যাচ্ছে পর্দার আড়ালে। ওই,স্তবগান শুরু হচ্ছে মন্দিরে!
পুত্র ব্যাস যা ব্যাখ্যা করতে চাইছে তা তিনি জানেন।বশিষ্ঠ্য-বিশ্বামিত্র বা ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয় বিরোধ আজ আর বিষয় নয়! আজ নতুন যুগের সঙ্গে নতুন সংকট এসেছে।বেদধর্ম নয়, ধনের ধর্মই প্রবল এখন। গঙ্গা যমুনার দুই তীর ধরে যে অসংখ্য নগর গড়ে উঠেছে তাদের কেউ কেউ রাজশাসিত,কেউ কেউ গণের অধীন। সর্বত্রই এখন সামাজিক আইনের বিরোধ চলছে। যেখানে যে আইন আছে,সেখানে সেই আইনই মানুষের অসহ্য ঠেকছে! ধর্মের শাসন আর কোথায়ও অবশিষ্ট নেই। অধর্ম আর প্রজা শোষণ আর্যাবর্তের রাজাদের রাজ্যশাসনের মূলভিত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। যাগকে একসময় তো ছেড়ে যেতেই হবে, করুক উত্তরপুরুষ যা ভালো বোঝে। আর দেবব্রত তো থাকলেনই। এই প্রাসাদের বাইরের যে জীবন তাঁকে অমৃতের আস্বাদ একবার দিয়েছিল তারই কাছে ফেরাই উচিত।
রথ প্রস্তুত। রথে আরোহন করার সময় একবার ঘুরে তাকিয়েছিলেন উপর দিকে। প্রাসাদের অলিন্দে দেবব্রত দাঁড়িয়ে আছেন। বরাবরের মতই শান্ত নির্লিপ্ত, চোখে অপার শূন্যতা। শেষবারের মতো একবার দেখে নিলেন তাঁর প্রিয় হস্তিনাপুর কে। কিন্তু না, আটকাননি তাকে দেবব্রত। হয়তো দেবব্রত জানেন তার প্রয়োজন ফুরিয়েছে হস্তিনাপুরে। নগর সীমা পেরিয়ে রথ একসময় দিকচক্রপালে মিলিয়ে যায়। একা দেবব্রত বসে থাকেন যমুনার তীরে। অম্বার ঋণ যে তার এখনও শোধ হয়নি, মুক্তি তাই এখনো বহুদূর।
খুব সুন্দর লাগল। অসাধারণ!👌👌❤❤⚘⚘🖋
উত্তরমুছুনঅপরুপ...👌👌👌
উত্তরমুছুন