#বিষয়- অনুগল্প।
✍ - মৃদুল কুমার দাস।
রমেন সিকদার,অফিসের বড়বাবু। অফিসে আসেন টোটো-বাস-ট্রেন আবার বাস,সেই বাস অফিসের গেটে নামিয়ে দেয়। অফিসের গেটে নিমাইয়ের চা দোকান। নিমাই ঘোষ। দোকানের নাম ঘোষ টি স্টল। গেটে ঢোকার আগে নিমাইকে সিগন্যাল দিয়ে যান চা পাঠিয়ে দিতে। নিমাই মাথা নেড়ে সায় দেয় ঠিক আছে। জগা,নিমাইয়ের অ্যাসিস্ট্যান্ট রেডি হয় চা দিয়ে আসতে। এক সঙ্গে ডজন খানেক চায়ের কাপ নিয়ে জগা ছুটবে এ টেবিল ও টেবিলে দিতে। আর যেতে যেতে জগা গাইবে হরি দিনেত গেল চা বইতে বইতে পার করো গো আমারে।
গেট কিপার মগন সিং জগার এই চা বওয়ার কাজটায় ততটা খুশি নয়। তার দেশ সেই বিখ্যাত ডেলোর পাহাড়ের খাঁজে। জগার সঙ্গে খুব ভাব। জগাকে কতবার বলেছে - "চল সর্বোচ্চ স্টেশন ঘুম দেখাব। দার্জিলিঙে ম্যালে ভাগ্নের চা দোকান আছে। সেখানে তোর একটা পাকা চাকরী করে দেব। এই চা দার্জিলিঙ থেকে আসে। আমি কতদিন তোর মানিককে ওখান থেকে চা এনে দিয়েছি।"
জগা কিন্তু একটাবারের জন্য না বলেনি। মাছ শিকারীর যেমন মাছ খেলিয়ে মাছ জল থেকে তুলে আনতে মজা, জগাও তেমনি মগনের সাথে মজা মজা খেলা করে। ঘুষ হিসেবে রোজ চায়ের গন্ধটা মগনের নাক বুলিয়ে নিয়ে যাবেই। আর মগন জগাকে কতবার এই দার্জিলিঙের চায়ের গল্প দিয়েছে। জগার প্রতি মগনের কেমন একটা মায়ার টান। হরিনামের টানের মতো।
জগা এ টেবিল সে টেবিল করে চা দিতে দিতে সবার শেষে রমেন বাবুর ঘরে ঢোকে। তখন সকলের টনক নড়ে রমেনবাবু এসে গেছেন। এবার ফাইল নিয়ে হাজির হওয়ার ডাক পড়ল বলে।
জগাকে রমেনবাবু খুব ভালোবাসেন। জগা চায়ের কাপ না দিয়ে গেলে কাজের মুড আসে না। জগাকে খুব বকেনও- "এই তো তোর বছর বারো বয়স! স্কুলের দাওয়া ছেড়ে চায়ের কাপ প্লেটের ঠনঠনাঠন শুনছিস।" চায়ে চুমুক দিয়ে মাথা নেড়ে খুব ভাল হয়েছে রমেনবাবুর চোখে মুখে ভাবটা ফুটে উঠলে তবে জগা বিদায় নেয়। জগার দেখতে দেখতে পাঁচ বছর হয়ে গেল এই চা বয় এর কাজ করা।
এবার জগা নিমাইয়ের কাছে দু'দিনের ছুটি চাইছে,মা অসুস্থ দেখতে যাবে। কিন্তু গেলে নিমাইয়ের চলবে কী করে। কিন্তু জগার যে যেতেই হবে। নিমাই ছাড়তে নারাজ। নিমাই না ছাড়ার কে! হাত, পা আছে যার তাকে কে আটকায়। নিমাইয়ের অগোচরে মোরগ ডাকা ভোরে উধাও।
নিমাই ক'দিন চা ঠিক মতো রমেনবাবুকে দিতে পারছে না। রমেনবাবুর কাজে মন বসে না। জগার মুখ ও হাতে পরিবেশিত চা না পেলে কাজে মন আসে না।
রমেনবাবুর গিন্নির হাতের চা এ এতো আয়েশ পান না। মাঝে মধ্যেই বলে ফেলেন- "জগার চা এর মতো করতে হবে না।"
গিন্নি বলেন- "ও তো নিমাইয়ের চা।"
রমেনবাবু বলেন "নিমাইয়ের চা কেউ বলে না। জগার চা বলে। নিমাই মানে তেতো বলে কি না কি জানি,জগার নামে পাবলিসিটি। দূর দূর অফিসের লোক এসে চা খাবে,আর টেবিলে টেবিলে চায়ের কাপ জগার পরিবেশনে সকলে মৌজ বানায়।"
গিন্নি বলেন- "একদিন ঐ চা খেতে নিয়ে যেও তো!"
এই বলে দু'জনে হাসেন।
সেদিন অফিস গেটে রমেনবাবু নিমাইয়ের দোকানের দিকে না তাকিয়ে হন হন করে যেতে যেতে বলছেন- "জগা চা দিয়ে যা।" প্রতিদিন নিমাইয়ের নাম ধরেন, আজ অজান্তে এই প্রথম জগার নাম উচ্চারণ করলেন।
নিমাইয়ের তখন দোকানে চা করতে হাত চলছেই না। টপটপ চোখে জল। দোকানে নিমাই অস্থির। শুধু রমেনবাবুর হাঁকডাকটুকু কানে গেল!
রমেনবাবু গেটে পৌঁছে দেখেন মগনের স্যালুট নেই। দু'পা পিছিয়ে দেখেন মগনের চোখে জল।
কৌতূহল ভরা দৃষ্টি নিয়ে বললেন- "কি হয়েছে? কাঁদছো কেন?"
মগন কাঁদতে কাঁদতে বলে- " স্যার আপনার চায়ের কাপ ভেঙে গেছে।"
- "মানে?"
- "যান নিমাইয়ের দোকানে স্যার বুঝতে পারবেন।"
রমেনবাবুর চোখের কোণ চিক চিক করে ওঠে।
- "হাত থেকে পড়ে চায়ের কাপ ভেঙে গেল বাবু, জগা আসার সময় ট্রেনে উঠতে গিয়ে অসাবধানে পা পিছলে চাকার তলায়...."
এক কাপ চা,জগার দাঁড়িয়ে থাকা,মগনের ম্যালের গল্প- সব এক কাপ গরম চায়ের ধোঁয়া হয়ে জগার দিকে যেন মিলিয়ে যাচ্ছে। সোহাগের কথা এমনি মহনীয় এক কাপ চাও জীবনের কথায় মিশে গেল।
******
@ কপিরাইট রিজার্ভ ফর মৃদুল কুমার দাস।
মন ছুঁয়ে গেলো
উত্তরমুছুনঅফুরন্ত শুভেচ্ছা দাদা...💐👌💝
উত্তরমুছুনবড় বেদনাবিধুর পরিসমাপ্তি।গল্পের বিষণ্ণতা মন ছুঁয়ে মনকেও ভারাক্রান্ত করল।
উত্তরমুছুনঅসাধারণ ।💐💐
উত্তরমুছুনখুব সুন্দর লিখেছেন।
উত্তরমুছুনখুবই ভালো
উত্তরমুছুন