শনিবার, ৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২১

# নাম- 'যেথায় আমি ঘর বেঁধেছি' (আধ্যাত্মিক) - পর্ব-১৮ ✍- মৃদুল কুমার দাস।

মার্গারেট এক কনকনে ঠান্ডার রবিবারে লেডি ইসাবেলের বাড়ির ঘরোয়া পরিবেশে ভারতীয় সন্ন্যাসীর বক্তৃতা শুনতে যাচ্ছেন।  তবে দ্বিধা পিছু ছাড়ে না। অনেক ধর্মীয় আলোচনা তো শুনেছেন,ইনি আর কি নতুন কথা শোনাবেন! এলেন সবার শেষে। অভ্যাগত জন পনেরো লেডি ইসাবেলের বাড়িতে। একেবারে শেষে বসলেন চুপিসারে। সময় ১৮৯৫ এর ১০ নভেম্বর। অপরাহ্ন। খ্রিস্ট ধর্ম তাঁকে ততটা খুশি করতে পারেনি। অনেক প্রশ্নের উত্তর অধরা থেকে গেছে। তবে বৌদ্ধধর্ম বেশ লাগে। খুব পছন্দের। ভারতীয় সন্ন্যাসীর সেদিনের বেদান্তের উপর বক্তব্যে মার্গারেটের মনে এলো মুগ্ধতা। শোনার হলে হয় ভাব মুহূর্তে চলে গেল। আগাগোড়া মন দিয়ে শুনলেন বক্তব্য। নিজের মনের প্রাসঙ্গিক প্রশ্নের সন্ন্যাসীর কাছ থেকে সদুত্তর মন্দ লাগেনি। ক্রমে লন্ডনে নানা স্থানে স্বামীজীর আরো কিছু ধর্মীয় বক্তৃতা ও প্রশ্নোত্তর শুনতে মার্গারেট অংশগ্রহণ করেন। সর্বত্রে খুব মনোযোগ দিয়ে শুনতেন। আর ক্রমাগত প্রশ্ন করে মনের মধ্যে যাবতীয় সংশয় দূর করতেন। অবশেষে তাঁর বিশ্বাস এলো, এতদিন তিনি যে ধর্মীয় জীবনের সন্ধানে দিশেহারা হচ্ছিলেন তার সব মীমাংসা এই ভারতীয় সন্ন্যাসীর কাছেই আছে। আর অচিরে গুরু বলে ভাবতে কোনও দ্বিধা বোধ করলেন  না। ঠিক এর এক দশক পরে ২৬ জুলাই, ১৯০৪ এ স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে মিস জোসেফিন ম্যাকলাউডকে লিখেছিলেন- "মনে করো,যদি সে সময়ে স্বামীজী লন্ডনে না আসতেন,জীবনটা নিরর্থক হয়ে যেত। কারণ আমি সর্বদাই জানতাম আমি এক সম্ভাবনার প্রতীক্ষায় আছি। সব সময়ে বলে এসেছি একটা আহ্বান আসবে। আর সত্যই তা এলো।" এই দশবছরে তখন অনেক অনেক পাওয়ার জগতে নিবেদিত প্রাণের থেকে নিবেদিতা নামের সার্থকতা সাফল্যের সঙ্গে প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছেন। তবে চরম দুঃখের ভার বহন করেছেন গুরুকে অকালে হারিয়ে।
  স্বামীজীর সত্যনিষ্ঠা,দৃঢ়চেতা ও সবার উপরে মানব দরদী মনের পরিচয়ই স্বামীজীকে গুরু মানতে সব দ্বিধা কেটে গিয়েছিল। পরাধীন ভারতবর্ষের দুঃখ দুর্দশার পাশে দাঁড়ানোর ইচ্ছা প্রবল হয়ে ওঠে। দুঃখী ভারতবর্ষের পাশে অকপটে দাঁড়ানোর জন্য স্বামীজীর কাছে ইচ্ছা প্রকাশ করলেন মার্গারেট। বিনিময়ে স্বামীজীর কাছ থেকে আলমোড়া থেকে ২৯ জুলাই ১৮৯৭ এ লেখা চিঠি পেলেন মার্গারেট। সেই  চিঠিতে মার্গারেটকে আগাগোড়া পরামর্শ ছিল- "তোমাকে খোলাখুলি বলছি,এখন আমার দৃঢ় বিশ্বাস হয়েছে যে,ভারতের কাজে তোমার এক বিরাট ভবিষ্যত রয়েছে। ভারতের জন্য,বিশেষত ভারতের নারী সমাজের জন্য, পুরুষের চেয়ে নারীর- একজন প্রকৃত সিংহীর প্রয়োজন। ভারতবর্ষ এখনও মহীয়সী মহিলার  জন্মদান করতে পারছে না,তাই অন্য জাতি থেকে তাকে ধার করতে হবে। তোমার শিক্ষা,ঐকান্তিকতা,পবিত্রতা,অসীম ভালবাসা,দৃঢ়তা,সর্বোপরি তোমার ধমনীতে প্রবাহিত কেলটিক রক্তের জন্য তুমি ঠিক  সেইরূপ নারী,যাকে আজ প্রয়োজন।"
স্বামীজীর এই পত্রে মার্গারেট যেন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হলেন। স্বামীজীর অনুমতির এই তো প্রতিক্ষার অবদানের আশীর্বাদস্বরূপ পত্র। এবার ম্যাপে দেখানো বাবার সেই ভারতবর্ষের অমোঘ ডাকে মোমবাসা জাহাজে চেপে বসলেন স্বদেশ,আত্মীয়-বন্ধুবান্ধব,প্রতিষ্ঠিত সব জীবন ছেড়ে স্বামীজীর ভারত গঠনের ডাকে যোগদান করতে। কলকাতার মাটি ছিল মোমবাসা ১৮৯৮ এর ২৮ জানুয়ারী।
   মার্গারেটের সেই প্রথম দিনের অভিজ্ঞতা এতো মধুর হতে পারে তিনি কল্পনায়ও ভাবতে পারেননি। মার্গারেট মাটিতে পা দিয়ে দেখতে পেলেন স্বামীজী ভিড়ে ঠেলাঠেলির মধ্যে তাঁর দিকে এগিয়ে আসছেন। কি সৌম্য দর্শন!স্বামীজীর পরনে গেরুয়া আলখাল্লা,মাথায় পাগড়ি,মোজাহীন স্যান্ডেল পরা খালি পা। মার্গারেট গুরুকে প্রণাম করতে যাবেন যেই মাথা নিচু করেছেন,অমনি আরেক গেরুয়া বসনধারী সন্ন্যাসী জুঁই ও মালতী মেশানো সাদা ফুলের মালা মার্গারেটের গলায় পরিয়ে দিলেন। নতুন দেশে এমন বরণের রীতিতে অভিভূত মার্গারেট। সেদিনের মুহূর্তটি ছিল যেন প্রাচ্য তার ঘরে পাশ্চাত্যকে অতিথি দেবঃ ভবঃ আপ্যায়নের রীতিতে ঘরে তুলছে।
      মার্গারেট উদ্দিষ্ট লক্ষে ভারতে তো পৌঁছলেন। অত কিম্! তাঁর এর পর কর্মকান্ডের পরিচয় নিয়ে আসছি পরের পর্বে।
                       (চলবে)
@ কপিরাইট রিজার্ভ ফর মৃদুল কুমার দাস।


৫টি মন্তব্য:

  1. এককালের অতিথি মার্গারেটকে ঘরের মেয়ে নিবেদিতা করে তোলার আহ্বান পরম প্রভু নির্দেশিত।অসামান্য রচনা।কর্মকান্ড জানার প্রতীক্ষায় রইলাম দাদা।

    উত্তরমুছুন
  2. এককালের অতিথি মার্গারেটকে ঘরের মেয়ে নিবেদিতা করে তোলার আহ্বান পরম প্রভু নির্দেশিত।অসামান্য রচনা।কর্মকান্ড জানার প্রতীক্ষায় রইলাম দাদা।

    উত্তরমুছুন

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল✍️ ডা: অরুণিমা দাস

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল ✍️ ডা: অরুণিমা দাস বর্তমানে অতিরিক্ত কর্মব্যস্ততার কারণে একটু বেশি সময় কাজে দেওয়ার জন্য হয়তো একের প্রতি অন্য...