মঙ্গলবার, ২৪ মে, ২০২২

ডোয়ার্ফি ✍️ডা: অরুণিমা দাস

 ডোয়ার্ফি
✍️ডা: অরুণিমা দাস

উহহু! কপালের বাঁদিকটা চিনচিন করে উঠলো ব্যথায়। উঠে বসতে গেলো বরফি,কিন্তু পারলোনা। শরীরটা বড্ড দুর্বল লাগছে ওর। পাশের বেডে থাকা এক বয়স্ক দাদু বললেন আহা উঠো না বাছা! অনেকটা কেটে গেছিলো তোমার, রক্তও বেরিয়েছিল অনেক। তাই এখন একটু দুর্বল লাগবে। সিস্টার মেডিসিন রেডী করছিল,ওদের কথা শুনে বরফির বেডের পাশে এসে বললো এখন একদম রেস্ট তোমার। কতগুলো সেলাই পড়েছে জানো! আমার আবার রেস্ট! হাসালে দিদি। সার্কাস দেখাতে দেখাতে জীবনটাই একটা সার্কাস হয়ে গেছে। এরম বোলোনা বরফি। সেদিন তুমি না থাকলে ওই বাচ্চাটাকে বাঁচানো যেত কি! সেদিনটা আর মনে করতে চাইনা দিদি। বাচ্চাটা রাস্তা পার করতে গিয়ে একটু হলেই ট্রাকের তলায় পড়ছিল। আমি খালি দৌড়ে গিয়ে ওকে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিয়েছিলাম। আর নিজে টাল সামলাতে না পেরে পাথরের ওপর মাথাটা ঠোক্কর খেয়ে গেছিলো। তারপর আর মনে নেই কিছু। তারপরেরটা আমি বলছি! বলতে বলতে ঘরে ঢুকলেন ডা: পল্লব। আরে আপনি স্যার? হ্যা বরফি আমি! আর শুধু আমিই নই সেদিন যে বাচ্চাটাকে বাঁচিয়ে ছিলে তার মা বাবা আর সে তিনজনেই এসেছে তোমার সাথে দেখা করবে বলে। তাই! আমার সাথে?চোখে মুখে বিস্ময় ফুটে উঠে বরফির। কেমন আছো আঙ্কেল? জিজ্ঞেস করে সেদিনের সেই বাচ্চাটা যাকে বরফি বাঁচিয়েছিল। বরফির চোখ দিয়ে অজান্তেই দু ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ে, এত সম্মান কেউ দেয়নি তাকে আজ পর্যন্ত। সার্কাসে সবাই ওই দেড় ফুট,কালার বয় এসব বলেই ডাকতো। ভালো আছি বাবু, তুমি কেমন আছো? আমিও ভালো আছি আঙ্কেল। আচ্ছা আঙ্কেল তোমার সেদিনকার জামা আর ওসব রঙিন চুল, টমেটোর মত লাল নাক ওগুলো কোথায় গো? ওহ ওগুলো! ওসবতো আমি সার্কাসে খেলা দেখানোর সময় পরিগো। এখন তো হাসপাতালে আছি,তাই ওসব পরিনি। বাবুর বাবা মা এগিয়ে এসে বললো কি বলে যে আপনাকে ধন্যবাদ দেবো বরফি আমরা জানিনা। সেদিন আপনি তুতুনকে না বাঁচালে আমাদের জীবনে আঁধার নেমে আসতো আজ। আপনার কাছে আমাদের কৃতজ্ঞতার শেষ নেই আর। না না এসব বলবেন না আপনারা,বরফি বললো। ছোটবেলা থেকে মা বাবা ছাড়া আছি তো,জানি কষ্টটা। আজ যদি আমি বামন না হয়ে সাধারণ মানুষের মতো চেহারার অধিকারী হতাম কেউ আর ঘেন্না করতো না আমায়। এরম বোলো না বরফি। তোমার এই রঙিন পোশাকের নিচে আছে একটা রঙিন মন যেটা দিয়ে তুমি সবাইকে আনন্দ দান করো, ডা: পল্লব বললেন। আচ্ছা শোনো বরফি এনারা কি বলছেন? তুতুনের বাবা বরফির হাত ধরে বললেন আমি তো বাড়ীর জন্য বেশী সময় দিতে পারি না, বাচ্চাটা একা একাই থাকে। ওর মাও তো নানান কাজে ব্যস্ত থাকে। তুমি ওর সর্বক্ষণের সঙ্গী হবে? আমাদের বাড়িতে থাকবে ওর গভর্নেস হয়ে? কিন্তু আমার সার্কাসের কাজ? আমার ওখানকার বন্ধুরা? ওদের ছেড়ে আমি কি করে থাকবো? বরফি বলে। অনেক আশা নিয়ে এসেছি গো আমরা,বরফি। মাফ করবেন আমায়, আমি আমার সার্কাস ছেড়ে কোথাও যাবো না,মন টিকবে না। এটাই এখন আমার ঘর বাড়ী সব হয়ে গেছে। কিরে ডোয়ার্ফি! আছিস কেমন? শুনলাম একদম হিরোর মত একটা বাচ্চার জীবন বাঁচিয়েছিস! মালিক আপনি? সার্কাসের মালিককে দেখে বরফি খুব অবাক হয়। দেখ কারা এসেছে! বলতে বলতে মালিকের পেছনে আরো তিন চারজন বেঁটে মানুষ ঢোকে। বরফি কে বলে তুই কি আমাদের ছেড়ে চলে যাবি রে? না না আমি তুতুনের বাবাকে বলে দিলাম আমার সার্কাস আর বন্ধুদের ছেড়ে গিয়ে কোথাও শান্তি পাবো না আমি। ডোয়ার্ফি, কাল তোর ছুটি হবে হাসপাতাল থেকে, আমরা এসে নিয়ে যাবো তোকে। এরপর একসপ্তাহ রেস্ট তোর, খেলা দেখাতে হবে না। পুরো সুস্থ হয়ে খেলা দেখাস না হয় আবার। মালিকের কথা শুনে বরফির বেশ ভালো লাগে,এদের ছেড়ে কিছুতেই সে শান্তি পাবে না অন্য জায়গায় গিয়ে। তুতুন মুখ ঝুলিয়ে বসেছিল, বরফি বললো কি হলো? কথা বলবেনা আমার সাথে? না আঙ্কেল তুমি তো আমার বাড়ী গেলে না! যাবো বাবু, তোমার ঠিকানা নিয়ে রাখলাম। যখন এখানে আসবো সার্কাস দলের সাথে ঠিক তোমার সাথে দেখা করে যাবো। আর এখন যতদিন সার্কাস থাকবে এখানে তুমি এসো মাঝে মাঝে,দেখা হবে,প্রমিস! কোনো মায়ায় আর জড়াতে চায়না বরফি, সেই বাঁধন ছিঁড়ে গেলে কষ্ট অনেক বেশি তাতে। তার চেয়ে ডোয়ার্ফি হয়ে রঙিন পোশাকে মানুষকে আনন্দ দেওয়ার কাজটাই বরং ভালো। মনের মাঝে বেজে উঠলো 
"জিনা ইহা, মরনা ইহা ইসকে ইসিভা জানা কাহান!
 জী চাহে জব হামকো আওয়াজ দো,হাম হ্যায় বহি, হাম থে যাহা।"

 ©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

বৃহস্পতিবার, ১৯ মে, ২০২২

গল্পঃ শীতোষ্ণতা। ✍️ নন্দিনী তিথি


এককালে এক অজ্ঞাত মরুভূমির এককোণে একটা বসতি গড়ে উঠেছিলো। একে অন্যকে ভালোবেসে নিজ নিজ বাড়ি ছেড়েছিল দু'জন তরুণ-তরুণী। তখন এই অজানা মরুভূমিই তাঁদের আশ্রয় দিয়েছিল। এরপরে এখানে থেকেই একে অন্যের হাত ধরে শুরু হয় তাঁদের পথ চলা। প্রতিদিন ভোর হতেই দু'জনে চলে যেতো কাজে আর বাড়ি ফিরতো সন্ধ্যে নামার আগে কোনো কোনো দিন সন্ধ্যে ঘোরও হয়ে যেতো। তাঁদের এই নিরলস পরিশ্রমের কারণ ছিলো দু'টো- ১. পেটের চাহিদা মেটানো এবং  ২. সাথে দু'টো টাকা জমানো।

এইভাবেই ওদের জীবন শুরু হলো, এবং চলতে লাগলো। ঋতু পরিবর্তনে ওদের প্রায়শই সমস্যায় পরতে হতো। সবথেকে যে সমস্যাটা বেশি হতো- গ্রীষ্মকালে ওদের মরুভূমির পাশে থাকাটা খুব কষ্টকর হয়ে যেতো। বিশেষ করে তরুণী আশার। কিন্তু তরুণ সুভাষ কিছুতেই গরমের কাছে হার মানতো না। ছোটবেলা থেকেই প্রতিনিয়ত মেডিটেশন ছিলো ওর সঙ্গী। এইসময় আশাকে সঙ্গে নিয়ে যতক্ষণ পারতো মেডিটেশনে বসতো আর চলে যেতো "মনের বাড়িতে"। মনের বাড়িতে তাদের বাড়িটি হতো তুষারের তৈরি, রোদ্রের তাপকে বানিয়ে নিতো বরফের শীতলতা। চারিপাশে থাকতো বৃষ্টির মুখরতা, মনের বাড়িতে গিয়ে রোদ্রের দুপুরকে বানিয়ে নিতো শীতের দুপুর, এবং সোয়েটার খুলে নদীতে নামতো শীতে কাঁপতে কাঁপতে। মেডিটেশনে মনের বাড়িতে গিয়ে ওরা গ্রীষ্মকালকে বর্ষাকাল, বসন্তের চিরিচিরি হাওয়া মাখানো দিন, এবং মাঝেমধ্যে শীতকালের কনকন শীতার্ত মানুষ বানিয়ে নিতো নিজেদেরকে। আর এই মেডিটেশন করার পর প্রতিবেলা তরুণ সুভাষবাবু তরুণী আশাকে বলতো আমাদের মেয়ে সন্তান হলে না আমরা ওর নাম রাখবো 'শীতষ্ণতা' ঠিকাছে আশা! আশা ওর কথা শুনে প্রত্যেকবারই একখানা মিঠামাখা হাসি দিয়ে বলতো- হুম। প্রথমে প্রায় ছ'মাস ওরা অন্যান্য কোনো বসতির সাথেই আলাপী তথা পরিচিত হয়ে উঠতে পারেনি। কারণ ওদের লক্ষ্য ছিলো নিজেদের পায়ে দাঁড়ানো মানে স্বচ্ছলতা। পরে ওদের একটু উঠে দাঁড়ানোর পরে আস্তে আস্তে ওদের পরিচিতি বাড়লো, সবাই ওদের ভালো জানতে শুরু করলো। তরুণ সুভাষকে সবাই একটু অন্যরকম ভালোবাসত। কোনো দরকারি কাজ বা কোনো আচার- অনুষ্ঠানের মিটিং, কোনো বড় দায়িত্ব নেয়ার ব্যাপারে, কোনো‌‌ কাজের যুক্তিসংহত পরামর্শ যেন তাঁকে ছাড়া হতোই না।

এইভাবে ওদের জীবন অতিবাহিত হতে লাগলো। এরই মাঝে চলে এলো ওদের ভালোবাসার প্রথম সন্তান। আনন্দে ওরা দিশেহারা, ফুটফুটে উজ্জ্বল শ্যামলা বর্ণের একটা ফুল যেন ওদের ঘরে এসে আলোকিত করলো, পরিপূর্ণতা আনলো জীবনের। নাম রাখলো চড়ুই। দুষ্টমিতে একশো'তে একশো ছিলো তাঁদের চড়ুই, কিন্তু ছোটবেলা থেকেই ওর মধ্যে একটা ব্যক্তিতের স্পর্শ লক্ষ্য করা গিয়েছিল। ধীরে ধীরে ওদের আরো দু'টো সন্তান এলো প্রথমে মেয়ে পরে আবারও একটা ছেলে। ওদের নাম রাখলো- পূর্ণতা আর নিপুণ। ওদের পরিবার এবার একদম পরিপূর্ণ। সবগুলোই বেশ মেধাবী ছিলো। লেখাপড়া ছাড়া অন্য কোনোকিছুতে নিপুণের মন নেই। সবথেকে শান্ত স্বভাবের ছেলে, একদম মায়ের স্বভাব পেয়েছে। পূর্ণতা! লেখাপড়ায় ভালো, কথাবার্তায় সে স্পষ্টবাদী,  স্বাধীনচেতা মনোভাবের। কিন্তু একটু বেশি একগুঁয়েমি স্বভাবের। আর চড়ুইয়ের কথা বলতে! সে যেমন দুষ্টুমিতে হাফেজ তেমন লেখাপড়ায় তেমনি বুদ্ধিমত্তায়, সামাজিকতায়। মানুষ কথায় বলে প্রথম তথা বড় সন্তান একটু হ্যাবলা স্বভাবের হয় কারণ তাঁরা সবার থেকে একটু বেশিই আদর পায়। আর উচ্ছন্নে যায়। কিন্তু চড়ুইয়ের ক্ষেত্রে পুরো উল্টো ব্যাপার।

সবথেকে মেধাবী ছিলো চড়ুই। ওকে নিয়ে ওদের অনেক আশা। কিন্তু দিন দিন ওরা বড় হতে লাগলো, খরচ ডাবল থেকে ডাবল হচ্ছিল। তিনটা ছেলেমেয়ের খরচ চালাতে গিয়ে ওদের সংসার টানাপোড়েনের মধ্যে দিয়ে চলতে লাগলো। আর পেরে উঠছিলো না ওরা, কোথা দিয়ে ওদের লেখাপড়ার খরচ চালাবে! চড়ুই মেডিক্যালে, পূর্ণতা মেট্রিকে গ্লোল্ডেন পেয়ে সদ্য ইন্টারে ভর্তি হলো। ভর্তি হতে অনেক খরচ, আবার বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী, প্রাইভেট না পড়লেই নয়। আর ছোটটা নিপুণ সে কেবল দশম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হয়েছে। এত্তো খরচ কোথা দিয়ে চালাবে, এই নিয়ে বাবু সুভাষের দিন রাত্রি ঘুম নেই চোখে। লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যাওয়ার পথে প্রায়। সবে গড়ে ওঠা স্বপ্নগুলো যেন ভূমিকম্প লেগে শেষ হয়ে যাওয়ার পথে। এমতাবস্থায় চিন্তায় দিশেহারা হয়ে বাবু সুভাষ এই অবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়ার কোনো উপায় খুঁজে না পেয়ে অবশেষে ঠিক করলো চড়ুইকে বিয়ে দেবে, এই চিন্তা মাথায় চাপালো। বাবার অবস্থা দেখে চড়ুইও মুখ বুঝে বাবার সিদ্ধান্তে মত দিলো। অনেক প্রস্তাব ভেঙ্গে যাওয়ার পর অবশেষে রায় বংশের একমাত্র মেয়ে একতার সঙ্গে  চড়ুইয়ের বিয়ে ঠিক হলো। দিন ঠিক করে ভালোভাবে বিয়ে কার্য সম্পন্ন হলো। সৃষ্টিকর্তা নিজেই বোধহয় এমন মর্যাদাশালী পরিবারের সঙ্গে বাবু সুভাষের পরিবারকে মিলিয়ে দিয়েছেন। এমন মেয়ে যেন পৃথিবীতে লাখে একটা। তার স্বভাবের পরিচয় দিতে গেলে তা বরফের মতো শান্ত, আচরণ তার বিজ্ঞ বিচারকের মত নৈপুণ্য, কথাবার্তায় যেন সে মায়া আর ভালোবাসার মন ভুলানো অধিকারী, হাঁটাচলায় মায়াবতী লক্ষ্মী, হাত পায়ের গঠন তা ঈশ্বর বোধহয় একটু বেশিই স্বযত্নে বানিয়েছেন। এখন আর তার গুনের বর্ণনায় না গিয়ে এবারে ক্ষ্যান্ত হই। কিন্তু একতার চেহারার গঠন ভালো হলেও অতটা সুন্দরী ছিলো না। বাবু সুভাষ যেন আজ ঈশ্বরের কাছ থেকে সেই মেয়েকে পেয়েছেন, যেখানে প্রতিদিন মেডিটেশনের পরে স্ত্রী আশাকে বলতো আমাদের মেয়ে হলে তাঁর নাম রাখবো 'শীতোষ্ণতা'। সেই শীতোষ্ণতাকে। আনন্দের অশ্রু ঝরিয়ে বরণ ডালা সাজিয়ে দু'জনে মিলে একতার হাতে চুমু খেয়ে বললো- "আয় মা শীতোষ্ণতা, তুই আমাদের সেই স্বপ্নের বাড়ির মেয়ে যার নাম কত বছর আগে ঠিক করে রেখেছিলাম। আজ এতো দিন ‌পরে  ঈশ্বর পাঠালো, কাছে পেলাম তোকে আমরা। 

আনন্দের জোয়ারে ভেসে যাচ্ছিলো সুভাষ আর আশার পরিবার। সবার চোখে বৃষ্টির মতো অশ্রু ঝরেছিলো সেদিন। সবাই আজ প্রতিষ্ঠিত, চড়ুই ডাক্তার হয়ে সে দুঃস্থ অসহায়দের পাশে দাঁড়িয়েছে, পূর্ণতা একজন ভার্সিটির আদর্শবান শিক্ষিকা হয়ে ভালোবাসার মানুষকে বিয়ে করে সুখে সংসার করছে, ভদ্র ছেলে নিপুণ সদ্য ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে বেরিয়েছে। আর সবার আদরের রায় বংশের মেয়ে শীতোষ্ণতা(একতা) আজ ব্যাংকার এবং আশা সুভাষের কাছে থেকে তাদেরকে নাতিশীতোষ্ণতার মহিমায় ভরিয়ে রাখছে। 

বিশ্বেতে শান্তির পরিবার আজ আশা-সুভাষের পরিবার। আর বিরাজমান রবে চিরকাল।

Copyright © All Rights reserved Nandini Tithi.

বুধবার, ১৮ মে, ২০২২

ক্লিওপেট্রা ও অজানা কিছু ইতিহাস ✍️ ডা: অরুণিমা দাস


 ক্লিওপেট্রা ও অজানা কিছু ইতিহাস
✍️ ডা: অরুণিমা দাস

মাত্র ৩৯ বছরের সংক্ষিপ্ত জীবনে কখনো ছিলেন রাজকন্যা,কখনো বা পরাক্রমশালী রানী, আর কখনো তিনি ছিলেন প্রেয়সী। ক্লিওপেট্রাকে মনে করা হয় সম্মোহনী সৌন্দর্য্য ও ক্ষমতার স্বত্ত্বাধিকারী। রুপোলি পর্দায় তাঁকে রুপসী হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও আধুনিক ইতিহাসবিদদের মতে,পরমাসুন্দরী হিসেবে তার খুব বেশি খ্যাতি ছিল না। তবে তাঁর তীক্ষ্ম বুদ্ধিমত্তা, মন্ত্রমুগ্ধকর ব্যক্তিত্ব, সহজাত রসবোধ,প্রচণ্ড উচ্চাভিলাষ ও তা বাস্তবায়নের অদম্য ইচ্ছাশক্তির জোরে তিনি সর্বকালের সেরা মহিলাদের মধ্যে স্থান করে নিয়েছেন। ক্লিওপেট্রাকে ঘিরে ইতিহাসে বিতর্ক আর রহস্যের যেন শেষ নেই। যেমন রহস্যময় তার জীবন ও রাজ্য শাসন,তেমনি রহস্যময় তার প্রেম। তাঁকে নিয়ে গল্প-কবিতা-উপন্যাসের পাশাপাশি নির্মিত হয়েছে চলচ্চিত্রও। উইলিয়াম শেক্সপিয়র, জর্জ বার্নাড শ,জন ড্রাইডেন, প্লুটার্ক, হেনরি হ্যাগার্ড, ড্যানিয়েল প্রত্যেকেই আলাদাভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন তাঁর চরিত্র। হ্যালিওয়েল তাকে 'দ্য উইকেডেস্ট উইম্যান ইন দ্য হিস্ট্রি' হিসেবে অভিহিত করেছেন।
প্রেম আর মৃত্যু এই নারীর জীবনে একাকার হয়ে গেছে। তিনি যেমন ভালোবাসার উদ্যাম হাওয়া বইয়ে দিতে পারতেন,তেমনি প্রয়োজনে মারাত্মক হিংস্র হতেও বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ করতেন না।
দান্তের মতে,লালসার শাস্তি হিসেবে তিনি নরকের দ্বিতীয় স্তরে দাউ দাউ করে পুড়ছেন। কারো কারো দৃষ্টিতে তিনি ছিলেন 'সারপেন্ট অব দ্য নাইল'। অনেকে আবার তাঁর আবেদনময়ী দিকটিকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। ফারাও রাজবংশের সর্বশেষ রাণী ক্লিওপেট্রা শুধুমাত্র মিশরীয় ইতিহাসের এক বিস্ময়কর নামই নন, ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত নারীদের মধ্যেও তিনি একজন।

ক্লিওপেট্রার সংক্ষিপ্ত জীবনী - খ্রিস্টপূর্ব ৬৯ সালে প্রাচীন মিসরের আলেকজান্দ্রিয়ায় জন্ম ক্লিওপেট্রার।তার পুরো নাম ক্লিওপেট্রা সপ্তম ফিলোপেটর। মেসিডোনিয়ান বংশোদ্ভূত সপ্তম মিশরীয় রানী হওয়ায় তাকে এই পরিচিতি বহন করতে হয়। 
গ্রিক শব্দ kleos আর pater থেকেই ক্লিওপেট্রা। যার স্ত্রী বাচক অর্থ করলে দাঁড়ায় "গ্লোরী অফ দ্য ফাদার"। তার আগে আরো ছয়জন কিওপেট্রা ছিলেন। তার পূর্বপুরুষ টলেমি ছিলেন মহামতি আলেক্সান্ডারের একজন সেনাপতি। খ্রিষ্টপূর্ব ৩২৩ সালে আলেক্সান্ডার মারা গেলে তার অন্যতম সেনাপতি টলেমি মিশরে স্বাধীন রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করেন। কিওপেট্রা এই বংশেরই শেষ শাসক। তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে মিসরে প্রায় ৩০০ বছরের মেসিডোনিয়ান শাসনের অবসান ঘটে। তার মায়ের দিকের পরিচয় অবশ্য পাওয়া যায় না। এ কারণে তিনি রোমানদের মতো শ্বেতাঙ্গ ছিলেন নাকি মিশরীয়দের মতো কৃষ্ণাঙ্গ তা জানা যায়নি।

অধিকাংশ ইতিহাসবিদের মতে খ্রিস্টপূর্ব ৫১ অব্দে রোম সম্রাট টলেমি অলেতিস মারা যান। মারা যাওয়ার আগে তার বিশাল সাম্রাজ্য ১৮ বছর বয়সী কন্যা ক্লিওপেট্রা [ক্লিওপেট্রা-৭] ও ১o বছর(কারো কারো মতে ১২ বছর) বয়সী পুত্র টলেমি-১৩-কে উইল করে দিয়ে যান। সেই সঙ্গে মৃত্যুর সময় রোমান নেতা পম্পেকে রাজ্য ও তার সন্তানদের দেখাশোনা করার দায়িত্ব দিয়ে যান। তখনকার মিশরীয় আইন অনুসারে দ্বৈত শাসনের নিয়মে রানী ক্লিওপেট্রার একজন নিজস্ব সঙ্গী থাকা বাধ্যতামূলক ছিল। কাজেই ক্লিওপেট্রাকে বিয়ে করতে হয় তারই ছোটভাই টলেমি-১৩ কে, যখন টলেমির বয়স ছিল মাত্র ১০বছর (কারো কারো মতে ১২ বছর)। ফলে আইনগতভাবে রাজ্য পরিচালনার দায়িত্বভার অর্পিত হলো ক্লিওপেট্রা এবং তার স্বামী (ওরফে ছোট ভাই) ত্রয়োদশ টলেমির উপর। ক্ষমতায় আরোহণের পর নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়েও ক্লিওপেট্রা তার শাসন চালিয়ে গেলেন।
ধারণা করা হয় কিওপেট্রার বড় দুই বোনের একজন (ক্লিওপেট্রা ষষ্ঠ) শৈশবেই মারা গিয়েছিলেন ও অপরজনকে (বেরেনিস) টলেমি অলেতিস-ই হত্যা করেছিলেন। এ ছাড়া ক্লিওপেট্রার ছোট আরো দুটি ভাই ছিল।
সে সময়ের মুদ্রায় অঙ্কিত ক্লিওপেট্রার প্রসন্ন ভাব, গোলাকার দৃঢ় চিবুক,ধনুকের মতো ঢেউ খেলানো ভুরু যুগলের নিচে অনিন্দ্য সুন্দর চোখ, প্রশস্ত ললাট আর সুতীক্ষ্ম নাকের চমৎকার সমন্বয় দেখা যায়। প্রখর বুদ্ধিমত্তা আর যেকোনো পরিস্থিতিতে খাপ খাইয়ে নেয়ার ক্ষমতা,সম্মোহনী ব্যক্তিত্ব তাকে করেছিল তুলনাহীন। তবে ক্লিওপেট্রা ও টলেমি-১৩ এর মধ্যকার সুসম্পর্ক স্থায়ী হয়নি। সিংহাসনে বসার মাস কয়েক পরেই দু’জনের মধ্যকার সম্পর্কে চিড় ধরে। ক্লিওপেট্রাও সব সরকারি দলিলপত্র থেকে তার ভাইয়ের নাম মুছে ফেলতে থাকেন। এমনকি মুদ্রায় তার একক পোর্ট্রেট ও নাম সংযোজন করেন। তবে তিনিও টিকতে পারেননি। দুর্ভিক্ষ, বিশৃঙ্খলা, প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের ফলে ক্লিওপেট্রাকেও সরে যেতে হয় ক্ষমতা থেকে। কিন্তু তিনি দমে যাননি মোটেও ধারণা করা হয় বোন আরসিনোইকে নিয়ে আরব সৈন্যদের সহায়তায় তিনি সিরিয়ায় চলে যান এ সময়।
ক্লিওপেট্রার মৃত্যু ও সমাধি নিয়ে নানান মত রয়েছে, সাথে রয়েছে রহস্যও।
তাঁর সৌন্দর্যের প্রতিদ্বন্দ্বী তিনিই। চোখের চাহনি বুকে কাঁপন ধরায় অতি বড় সম্রাটেরও। তীব্র অথচ সূক্ষ্ম কামনার অট্টহাসি কিংবা ডুমুরের ডালিতে থাকা বিষাক্ত অ্যাম্পের ছোবলের কথা লেখা আছে ইতিহাসের পাতায়। মিশরের সেই রহস্যময়ী ক্লিওপেট্রা এখনও বিস্ময়। তাঁর জীবনের গল্প এখনও ছত্রে ছত্রে রহস্যে মোড়া। মৃত্যু, সে তো আরও গভীর রহস্যময়। কোথায় তাঁর সমাধি, সেটাও এত দিন অধরা ছিল। মিশরীয় সেই রহস্যের জট খুলছে একটু একটু করে। একদল গবেষকের দাবি, অচিরেই খোঁজ মিলতে পারে ক্লিওপেট্রার সমাধির। ক্লিওপেট্রা সাধারণ মানুষের কাছে একটা ধাঁধার মতো। ইতিহাসের এক একটা অধ্যায়, এক এক রকম ভাবে তুলে ধরেছে তাঁর বর্ণময় জীবনকে। ক্লিওপেট্রা সপ্তম থিয়া ফিলোফেটর ছিলেন মিশরের রানি। প্রাচীন মিশরের শেষ ফারাও। তাঁর জন্মের আগে ছিলেন ছ’জন ক্লিওপেট্রা। 

খ্রিস্টপূর্ব ৩০ সাল। বন্দি ক্লিওপেট্রা বিষাক্ত অ্যাম্পের কামড় খেয়ে আত্মহত্যা করেন। কথিত আছে এই সাপ তাঁর কাছে ডুমুরের ঝুড়িতে লুকিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।এর পরের অধ্যায়টা পুরোপুরি রহস্যে মোড়া। সেই যে হারিয়ে গেলেন ক্লিওপেট্রা, তাঁর কবরের খোঁজও মিলল না। জনশ্রুতি, অ্যান্টনির সঙ্গেই তাঁকে সমাধি দেওয়া হয়েছিল। অনেকের বিশ্বাস আলেকজান্দ্রিয়াতেই সমাহিত করা হয় ক্লিওপেট্রাকে। ৩৬৫ খ্রিস্টাব্দে সুনামিতে ধ্বংস হয় এই শহর। অনেকে আবার মানেন আলেকজান্দ্রিয়ার অদূরে নীল নদের অববাহিকায় ট্যাপোসিরিস ম্যাগনায় রয়েছে তাঁর সমাধি। এই দাবিতেই মান্যতা দিচ্ছেন গবেষকরা। কারণ সম্প্রতি সেখানে একটি সমাধি আবিষ্কার করেছেন পুরাতত্ত্ববিদরা। সেখানে রয়েছে ২০০০ বছরের পুরোনো দুটি মমি। এই মমি দু’টি সোনার পাতে মোড়া। পুরাতত্ত্ববিদদের দাবি, তৎকালীন মিশরীয় সমাজের উচ্চপদস্থদের এ ভাবে সমাহিত করা হত। এক্সরে করে দেখা গিয়েছে মমি দু’টির মধ্যে একটি পুরুষ। অন্যটি নারী। সোনার ওই পাতে কিছু গুবরে পোকার ছবি পাওয়া গিয়েছে। যা মিশরে পুনর্জন্মের প্রতীক। এর থেকে পুরাতত্ত্ববিদদের অনুমান, এগুলি তৎকালীন মিশরের কোনও ক্ষমতাশালী পুরোহিতের। যাঁদের সঙ্গে ক্লিওপেট্রার যোগাযোগ ছিল। মমির পাশে কিছু মুদ্রাও পাওয়া গিয়েছে, যা ক্লিওপেট্রার সময়ের। এই দলের প্রধান,লিভারপুল বিশ্ববিদ্যালয়ের মিশরীয়বিদ্যার অধ্যাপক গ্লেন গডেনহো জানান, ২০০০ বছর পুরোনো ওই মমি দুটি। তাই সেগুলির পরীক্ষায় কিছুটা সময় লাগবে। তবে মমি দুটি যে ভাবে সোনার পাতে মোড়া ছিল, তাতে পরিষ্কার, সেগুলি তৎকালীন মিশরের কোনও ক্ষমতাশালী ব্যক্তির। টোপোসিরিস ম্যাগনায় ১৪ বছর ধরে খননকাজ চালাচ্ছেন ক্যাথলিন মার্টিনেজ। তিনিও আশাবাদী ওই এলাকায় অচিরেই খোঁজ মিলবে ক্লিওপেট্রার সমাধির। কারণ ওই এলাকার খুব কম অংশেই এখনও খননকাজ চালানো সম্ভব হয়েছে।এমনটা হলে ইতিহাসের সবচেয়ে চর্চিত একটা অধ্যায় স্পষ্ট হবে। ফিরে আসবেন সেই সুন্দরী, যাঁর সৌন্দর্যে মজে তামাম বিশ্ব। হয়তো জানা যাবে কী ভাবে হারিয়ে গেলেন ক্লিওপেট্রা, পাঠকদের সামনে আসবে আরও অজানা ইতিহাস। অপেক্ষায় রইলাম জানার জন্য।


এই ইতিহাস সংক্ষেপে বলছিলেন বিমল বাবু তার সহকারী অমিত বাবুকে। আজ অফিসে বিমল বাবু তার স্বেচ্ছাবসরের চিঠি দিতে এসেছেন। অমিত বাবু বললেন আপনার তো একটাই মেয়ে, তার বিয়ের কথা ভাববেন না? চাকরি ছেড়ে দিচ্ছেন যে!
- আর বলবেন না, মেয়ের জন্যই তো চাকরি ছাড়ছি। 
- কেনো কেনো?
- মেয়ে এখন একটা বড়ো কোম্পানি তে জব করছে, সিনিয়র কনসালট্যান্ট। আমাকে আর ওর মাকে কলকাতায় ফেলে রাখবে না। মুম্বাই নিয়ে চলে যাবে। বলছে তোমরা যেমন ছোটবেলায় আমায় আগলে রেখে মানুষ করেছো এখন আমার দায়িত্ব তোমাদের আগলে রাখা। আর কদিন এরকম ছুটে দৌড়ে অফিস যাবে? দু বছর কম চাকরি করলে কিছু যাবে আসবে না। তাই আজ চাকরি ছাড়ার চিঠি দিয়ে পরশু চলে যাবো মুম্বাই। 
- ও আচ্ছা। আপনারই কপাল বিমল বাবু।
- কেনো? আপনার তো ছেলেকে নিয়ে খুব গর্ব, অনেক বড় চাকরি করে যে।
- হ্যা, তা করে। কিন্তু মনটা আপনার মেয়ের মতো বড়ো নয়। বলেই দিয়েছে নিজেরা নিজেদের সামলে রেখো। বছরে এক আধবার হয়তো আসবে, তাও যদি ক্লায়েন্টের দরকার হয় তবেই। 
- আমার মেয়েকে নিয়ে খুব গর্ব হয়। ছেলে না থাকার কোনো দুঃখই নেই আমার। সত্যিই 'সি ইস গ্লোরি অফ ফাদার।' আজ আসি, অফিসের বাকি কাজ গুলো করে নিই। পরশু না হয় যাওয়ার আগে আপনার সাথে দেখা করে নেবো।
- হ্যা, আসুন। খুব ভালো থাকবেন। আপনার মেয়ের নাম ক্লিওপেট্রা হলে কিন্তু বেশ হতো। 
- হা হা, ভালো বলেছেন। আসি। আবার দেখা হবে।
একগাল হাসি নিয়ে বিমল বাবু বেরিয়ে গেলেন অমিত বাবুর ডেস্ক থেকে।

গুগল, ক্লিওপেট্রা র জীবনী, হায়রোগ্লিফের দেশে বই থেকে কিছু তথ্য নেওয়া হয়েছে। আর শেষ অংশটি  ক্লিওপেট্রার নামের সাথে মিল রেখে একটা ছোট গল্পের রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেছি মাত্র।  
 
©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

বুধবার, ১১ মে, ২০২২

পথের ডাক

দিগন্ত বিস্তৃত মেঘলা আকাশ

বৃষ্টিভেজা ফাঁকা রাস্তা

সঙ্গে চারিপাশে অসংখ্য বৃক্ষের মেলা…

মন বলে চল পালাই কোথা..

কোনো এক অদৃশ্য ডাকের হাতছানি।

যা লুকিয়ে আছে ঐ পথের বাঁকে র পরে..

আমি আসছি,হে পথ আমি তোমার পথিক,


তোমার ডাকে সারা দিতে আমি আসছি..।।


🙏🙏🙏🙏

রবিবার, ১ মে, ২০২২

মে দিবস(সুদেষ্ণা দত্ত)

 


মে দিবস(সুদেষ্ণা দত্ত)

মে দিবস–অর্থাৎ শ্রমিক দিবস(১লা মে)।শ্রমিকরা নানা দাবিদাওয়া ও অধিকার আদায়ের জন্য নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছিলেন।বিশ্বের আপামর শ্রমিককে শ্রদ্ধা নিবেদনেই আজকের এই দিনের মাহাত্ম্য লুকিয়ে আছে।শ্রমিক দিবসের গুরুত্ব,কেন এই দিনের নির্বাচন এসব মাথা ভারী করা লেখনীর ভার আমার কলম বইতে পারবে না।তাই সে গতিপথ পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

            যিনি শ্রম দান করেন,তিনিই শ্রমিক।প্রত্যেকের নিজের মত করেই কিছু চাহিদা,আশা থাকে।আকাশের বুকে সজল মেঘ বৃষ্টির ভার বয়ে বারি ধারা ঝরে স্নিগ্ধ করে আমাদের।পাহাড় তার বুকে নদীকে বয়ে বেড়ায়।বৃক্ষ ফল দান করে আমাদের খাদ্যভান্ডার সমৃদ্ধ করে।ফুল দান করে,করে প্রকৃতির সৌন্দর্যায়ন(বানান নিল না)।কিন্তু সেই বৃক্ষের মালিকানা যে আমাদের তাই ছেদনেও পড়ে না চোখের দু’ফোঁটা জল,নেই শাস্তির বিধান!কেউ দেয় উষ্ণতা,কেউ দেয় শীতলতা।কিন্তু মা-বাবা বা গুরুজনদের অবজ্ঞা করলে যেমন ভবিষ্যতে পস্তাতে হয়,তেমনই এই প্রকৃতির বিরুদ্ধাচরণ করলে সেও ধারণ করে ভয়াল রূপ।তার নেই কোন অর্থ বা স্বার্থের দাবি।তার দাবি খুব কম,তুমি আমায় এক বিন্দু দিলে,আমি তোমায় এক কাঁড়ি দিয়ে ভরিয়ে দেব।কিন্তু হায়...

              দেহের অনেক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ অনেক সময় বিশ্রাম পেলেও,একবার ভাবুন হৃৎপিন্ড যদি আট ঘণ্টা কাজের দাবি জানাত,আমাদের কী অবস্থা হত।কিন্তু আমরা অতিরিক্ত তেল-মশলা খেয়ে,ব্যায়াম বর্জন করে তার প্রতি বিমাতৃসুলভ আচরণ করি।তখন সেও অবাধ্য সন্তানের মতই সময়ের আগেই তার ঘড়ি ঘরে তালা ঝুলিয়ে দেয়।

              নারী-তিনি যখন মা বা স্ত্রী বা সন্তান,পরিবারের ধারণকারিণী,পুরুষ-তিনি যখন সন্তান,বাবা বা স্বামী পরিবার বহনকারী-কখনও হয়তো নদীর মজে যাওয়ার মতই এই সম্পর্কেও পলি পড়ে।কিন্তু অনেকসময়ই স্নেহ,মমতা,ভালবাসা,কর্তব্য দিয়ে সংসার তটিনীকে এগিয়ে নিয়ে যায় দাবিহীন।শুধু দাবি একটু ভালবাসা-সহানুভূতির।যে কোন ক্ষেত্রে একে অপরকে বুঝলে বোঝা না হয়ে বোঝাপড়া সহজ হয়।মালিক-শ্রমিক না ভেবে সকলের তরে সকলে আমরা ভাবলে বোধহয় শ্রমিক দিবসের প্রয়োজন হয় না।

 

©কপিরাইট রিজার্ভড ফর সুদেষ্ণা দত্ত।

ছবি-সংগৃহীত

বুধবার, ২৭ এপ্রিল, ২০২২

এস্কিমোস লাভ টু লিভ ইন নর্থ পোল ✍️ ডা: অরুণিমা দাস

এস্কিমোস লাভ টু লিভ ইন নর্থপোল
✍️ ডা:অরুণিমা দাস

উত্তরমেরু এলাকা মানুষের কাছে এক রহস্যময় জগৎ। সেখানে আকাশে থাকে অদ্ভুত রঙের অরোরা,আর বছরের দীর্ঘ সময় ধরে চলে আলো আঁধারের খেলা। বরফের তৈরি ইগলুতে বাস করে সেখানকার এস্কিমোরা। কেন তারা বাস করে প্রচণ্ড ঠাণ্ডা আর বরফের মধ্যে সে নিয়েও রয়েছে অনেক প্রশ্ন। এই ঠান্ডায় জমে বেঁচে থাকতে থাকতে তাদেরও তো ইচ্ছে করে নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে যেতে,কিন্তু যায় না তারা। আর কেনোই বা যায়না? সেই উত্তর খুঁজতে খুঁজতে হারিয়ে গেছিলাম ওদের দেশে,ওদের জীবনযাত্রা,খাদ্যাভ্যাস এসব পড়তে গিয়ে ওদের সাথে একাত্ম হয়ে পড়েছিলাম। ফিরে গেছিলাম স্কুল জীবনের দিন গুলোতে, ভূগোল ইতিহাসের সময়টাতে। যা জেনেছি সেটাই সংক্ষেপে লিখছি।

উত্তর মেরুর চারপাশে আলাস্কা,কানাডা,গ্রিনল্যান্ড ও রাশিয়া। উত্তর মেরু এক বিশাল এলাকা যার আয়তন প্রায় সম্পূর্ণ উত্তর আমেরিকার সমান। উত্তর মেরুতে বলতে গেলে সারা বছরই শীত থাকে ও শীতে তাপমাত্রা গড়ে মাইনাস ৪০ ডিগ্রিতে চলে আসে।উত্তর মেরু অঞ্চলে গ্রীষ্মকাল শুরু হয় জুলাই মাসের মাঝামাঝি এবং থাকে প্রায় আগস্টের শেষ পর্যন্ত। উত্তর মেরুতে গ্রীষ্মে জন্মে বিভিন্ন গাছপালা। উত্তর মেরু জোনের দক্ষিণাংশে আছে বরিল বনভূমি যা তাইগা বা স্নো ফরেস্ট নামেও পরিচিত।এতে ফার,লার্চ,মাউন্টেন অ্যাশ ও ফায়ারউইডের মতো বার্চ গাছ দেখা যায়। তবে আর্কটিক তুন্দ্রা এলাকায় বার্চ,উইলো,হিথ, লিঙ্গোনেবেরি,বাইবেরি,ব্লুবেরি,আর্কটিক পপি, কটনগ্রাস,লিঞ্চেন এবং মসেস নামের ঘাস দেখা যায়।

উত্তর মেরু এলাকার মানুষ কাঁচা বা খুব অল্প সেদ্ধ মাংস খেতে অভ্যস্ত। এভাবে মাংস খাওয়া হলে তাতে ভিটামিন সি পাওয়া যায়। পর্যাপ্ত শাক-সবজি পাওয়া না গেলেও এভাবে তারা ভিটামিন সি পেয়ে যায়। শীতকালে দীর্ঘদিন সূর্যের আলো পাওয়া না গেলেও গ্রীষ্মকালে এ এলাকায় সূর্যের আলো পাওয়া যায়। এ সময় পাওয়া সূর্যের আলোতে এবং বিভিন্ন খাবারের মাধ্যমে তাদের শরীরের ভিটামিন ডি এর চাহিদা মিটে যায়।

এস্কিমোরা কেন ঠান্ডা এলাকা ছেড়ে যায় না?এস্কিমোরা কেন প্রচণ্ড ঠাণ্ডা এলাকা ছেড়ে দক্ষিণের নাতিশীতোষ্ণ এলাকায় চলে আসে না?এটা একটা সাধারণ প্রশ্ন,উত্তর টাও বেশ অন্যরকমের।এস্কিমোদের দক্ষিণের নাতিশীতোষ্ণ এলাকায় চলে যাওয়ার কোনো কারণ নেই। তারা নিজের এলাকাতেই বেশ আরাম করেই বেঁচে আছে। অন্য এলাকায় গেলেই বরঞ্চ তাদের বিভিন্ন সমস্যা দেখা দেয়।১৯৮০ সালে দুজন ডেনিস চিকিৎসক বেঙ ও ডাইবার্জ গ্রীনল্যান্ডে কাজ করার সময় লক্ষ্য করেন এস্কিমোরা হার্ট ডিজিস ইমিউনড সত্যি কথা বলতে তারা কোন এস্কিমোকেই হার্ট ডিজিসে আক্রান্ত হতে দেখেননি তারা।ডেনিস অধিবাসীদের তুলনায় এস্কিমোদের রোগের বালাই অনেক কম। শুধু হার্ট ডিজিস ই নয়,স্কিন ডিজিস এছাড়াও রিউম্যাটিক ডিজিস বা জয়েন্ট সংক্রান্ত সমস্যা বহুলাংশে কম বা খুব কম শতাংশ লোকের হয় বললেই চলে।
এতো ভালো যখন থাকা যায় উত্তরে,খামোখা শুধু গরম পাবার জন্য নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে গিয়ে লাভ টা কি! তাই তারা উত্তর মেরুতে জমে যাওয়া ঠান্ডায় অবস্থান করতেই সাচ্ছন্দ্যবোধ করে।

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস


শুক্রবার, ২২ এপ্রিল, ২০২২

ভার্চুয়াল সম্পর্কের কথকথা ✍️ডা: অরুণিমা দাস


"দূরকে করেছে নিকট,আর পরিবার যে হয়েছে অনেক দূরের
মানুষ হয়েছে যান্ত্রিক,ভূমিকা যে রয়েছে এতে ভার্চুয়্যাল জগতের।"
     
যোগাযোগ প্রযুক্তির উন্নয়নের সুবাদে মানব সমাজ প্রবেশ করেছে নতুন এক জগতে। এর নাম ভার্চুয়াল জগত। বর্তমান প্রজন্মের ছেলে মেয়েরা ভার্চুয়াল জগতের মধ্যে প্রবেশ করে প্রতিনিয়ত নিজেরা শারীরিক কিংবা মানসিক ভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছে এবং এই দুর্বলতা হওয়ার প্রধান কারণ হচ্ছে ভার্চুয়াল জগত তাদের চোখের ঘুম প্রতিনিয়ত কেড়ে নিচ্ছে! ভার্চুয়াল জগতে আমরা মানুষ থেকে মানুষ অনেক দূরে সরে যাচ্ছি। বিশ্বস্ততার জায়গা, আস্থার জায়গা,সম্পর্কের জায়গা এসব থেকে আমরা বহুদূরে। আমরা একটা ভার্চুয়াল জীবন আছি আছি,আবার নেই নেই!এরকম সম্পর্কের মধ্যে প্রতিদিন ধাবিত হচ্ছি। বর্তমানে বিশ্বে যে প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে তাহলো তরুন তরুণীরা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটানোর চেয়ে মোবাইলের মাধ্যমে ভার্চুয়াল জগতে সময় ব্যয় করাকে বেশি পছন্দ করে। এর ফলে পারিবারিক আড্ডায় বসার প্রবণতা কমে গেছে। শুধু তাই নয় এই ভার্চুয়াল জগত মানুষের ঘুম কেড়ে নিচ্ছে।
কন্টিনিউয়াস একই পশ্চার মেইনটেইন করে মোবাইল বা ল্যাপটপ ব্যবহার করে তাহলে নেক মাসল স্প্যাসম হয়ে ব্রেনে অক্সিজেন সরবরাহ কমে যায়,রক্ত সঞ্চালনেও ব্যাঘাত ঘটে যার ফলে খুব তাড়াতাড়ি ক্লান্তি আসে এবং এই জন্য কাজের প্রতি কনসেন্ট্রেশন কম হয়ে যায়। বসে বসে কাজ করার দরুন আর সেডেন্টারী লাইফ স্টাইলের দরুন শরীরে মেদ জমছে,স্থূলতা দেখা দিচ্ছে। ওভারওয়েট, ওবেসিটি থেকে শুরু করে স্ট্রেসের জন্য টাইপ টু ডায়াবেটিস হবার সম্ভাবনা বাড়ছে। চোখে মোবাইলের আলো, ল্যাপটপের আলো কন্টিনিউয়াস পড়ছে আর এর ফলে ইচিং,ওয়াটারিং, রেডনেস দেখা দিচ্ছে। রাতে ঘুম ঠিক মতো হয় না, স্লিপ অ্যাপনিয়া দেখা দিতে পারে। 

যদিও অনেকের মতে সোশ্যাল মিডিয়া সামাজিক বন্ধন তৈরি করে কিন্তু এই এই মিডিয়া আবার আমাদের অনেক দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। ভার্চুয়াল এই জগতে আমাদের চাওয়া আর পাওয়ার মধ্যে জীবনটা আটকে গেছে।

এক গবেষণায় দেখা গেছে, ইন্টারনেটের নেশার কারণে ঘুম থেকে উঠতেও একেকজনের গড়ে দেরি হয় প্রায় ৯০ মিনিট। চিকিৎসকদের মতে, এভাবে দীর্ঘদিন ঘুমের সমস্যা চলতে থাকলে দেখা দিতে পারে হৃদরোগ এবং অ্যাংজাইটির সমস্যা। এর আগে ২০১৫ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে,যেসব কম বয়সী রোগী হার্ট অ্যাটাকের সমস্যা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়, তাদের ৯০ শতাংশই পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘুমাতে পারেন না। এর ফলে এটা স্পষ্ট যে,ভার্চুয়াল জগত আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলছে। ভার্চুয়াল জগত আমাদের জন্য যেমন নানা সুযোগ ও সম্ভাবনা তৈরি করেছে ঠিক তেমনি বাড়িয়ে দিয়েছে বিপদের আশঙ্কা। একটু অসতর্কতা ও অসচেতনতা বড় ধরনের বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। ভার্চুয়াল জগত হচ্ছে এমন এক জগত যেখানে মানুষে মানুষে সংযোগ ঘটে কম্পিউটার,মোবাইল তথা যন্ত্রের সহযোগিতায়। ভার্চুয়াল ওয়ার্ল্ড বা ভার্চুয়াল জগত পরিভাষাটি প্রথমবার ব্যবহার করেন উইলিয়াম গিবসন। তিনি হচ্ছেন সায়েন্স ফিকশনের বিখ্যাত লেখক। মানুষে-মানুষে যে যোগাযোগ ও লেনদেন তা বাস্তব জগতের বিপরীতে বিশ্বজনীন এবং এখানে একজন ব্যক্তি পরিচয় গোপন রাখতে পারে। এই জগতের নির্দিষ্ট সীমা-পরিসীমা নেই। আমরা যে ইন্টারনেট ব্যবহার করি তা সম্পর্কে একটু চিন্তা করলেই এই বাস্তবতা উপলব্ধি করা সম্ভব। বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে কোটি কোটি মানুষ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, ইমেইল ও চ্যাটরুমের মাধ্যমে ভার্চুয়াল জগতে তৎপরতা চালান।ইন্টারঅ্যাকশন  হচ্ছে ভার্চুয়াল জগতের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। যেখানে একসঙ্গে পরস্পরকে দেখা যায়,কথা বলা যায়,লিখে বা না লিখে মনের ভাব প্রকাশ করা যায়। রেডিও,টিভি ও পত্রপত্রিকার মতো গণমাধ্যমে যা সম্ভব নয়। বিশ্বায়নের যুগে এই জগতে প্রতিনিয়ত পরিবর্তন ঘটছে। তথ্য ও যোগাযোগ সংক্রান্ত প্রযুক্তির সহযোগিতায় এসব ঘটনা ঘটছে। ভার্চুয়াল জগত মানুষের সামনে এমন সব দিগন্ত খুলে দিয়েছে যা জ্ঞান-বিজ্ঞানের উন্নয়ন এবং সচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজে লাগানো সম্ভব। ভার্চুয়াল জগতের নানা ইতিবাচক দিক থাকলেও এর বিপদের মাত্রাও কম নয়। এই জগতে তৎপর সব শ্রেণির মানুষেরই বিপদে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ বাস্তব জগতের মতো ভার্চুয়াল জগতেও তৎপর রয়েছে নানা পর্যায়ের অপরাধী। যারা ভালো মানুষের ছদ্মবেশে প্রতিনিয়ত মানুষের ক্ষতি করে যাচ্ছে। কখনো হাতিয়ে নিচ্ছে মানুষের সর্বস্ব। 

একটা সময় ছিল ঘুম থেকে উঠে আমরা ফ্রেশ হয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে বা বসে পত্রিকার পাতায় চোখ রাখতাম আর আজ ঘুম থেকে উঠে বিছানার মধ্যে বসে থেকে ফেসবুকে চোখ থাকে।
ভার্চুয়াল জগতের কারণে বাবা-মা এবং শিশুদের মধ্যে দূরত্ব বাড়ার ধরণটা এতটাই ভয়াবহ যে,ছুটির দিনে কোথাও বেড়াতে গিয়েও শিশুরা মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত থাকে। আনন্দের মুহূর্তগুলো সঠিকভাবে উপভোগ করার অনুভূতিই যেন মরে যাচ্ছে ভেতর থেকে। এমত অবস্থায় বাবা-মা,শিক্ষক ও অভিভাবকদের উচিত বর্তমান প্রজন্মের তরুন তরুনীর ও শিশুদের ভার্চুয়াল জগতের নেতিবাচক প্রভাব থেকে নিজ নিজ সন্তানদের দূরে রাখার সর্বাত্মক চেষ্টা চালানো।

ভার্চুয়্যাল জগতের সাথে অবশ্যই সম্পর্ক রাখা দরকার কারণ কিছু পজিটিভ দিক অবশ্যই রয়েছে যেমন ভিডিও কল, অনলাইন ক্লাস রুম ইত্যাদি আরো অনেক কিছু। কিন্তু একটা ব্যালান্সড রিলেশন রাখা উচিত বলে আমার মনে হয়। লিমিটের বাইরে কোনো কিছু ব্যবহার করলে সেটাতো অবশ্যই মানসিক ও শারীরিক দুটো স্বাস্থ্যের পক্ষেই ক্ষতিকর।

পরিশেষে একটাই কথা বলার -
 "থাকো যে জগতেই,দিনের কিছু সময় নিজের সাথে কাটিও
 তবেই বুঝতে পারবে তুমিও যে অনন্য ও অদ্বিতীয়।"

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

বুধবার, ২০ এপ্রিল, ২০২২

শিরোনাম - বাড়িয়ে দাও তোমার হাত ✍️ডা: অরুণিমা দাস


গল্প ১: সোমবারের নাইট ডিউটি, মোটামুটি সারারাত কাজ করে গল্প ঠিক তৈরি হয়েই যায়। রাত আটটায় হ্যান্ডওভার নিতে গিয়ে বুঝলাম আজও আমার ভাগ্য সুপ্রসন্ন নয়। সার্জারিতে আটটা কেস পেন্ডিং। বুঝলাম ঘুম আজ আর ভুল করেও আসবে না আমার চোখে। সার্জারি একটা কেস আন্ডার করেছি,নিউরোসার্জারির দিদি এসে বললো হাইড্রসেফালাস এর বাচ্চা এসেছে একটা।
বুঝলাম আজ সত্যিই সারা রাতের মামলা। সার্জারি কেস একটু স্টেবল হতে নিউরো ওটিতে দৌড়ালাম। গিয়ে দেখি একটা চার বছরের বাচ্চা ওটির দরজার দিকে হাত বাড়িয়ে কাঁদছে,বুঝলাম মাকে খুঁজছে। বাইরে গিয়ে বাচ্চার মাকে সব বুঝিয়ে হাই রিস্ক কনসেন্ট ফর্ম সাইন করালাম। বাচ্চার মা আমার হাত ধরে বললো এই নিয়ে চারবার ওটি হচ্ছে ওর, একটু দেখবেন। কী আর বলবো! ভাষা খুঁজে পেলাম না সান্তনা দেওয়ার। হাইড্রোসেফলাস যে পুরোপুরি সারার নয়,ভেনট্রিকুলো পেরিটোনিয়াল সান্ট করেই সারাজীবন চলতে হবে। খালি বললাম চিন্তা করবেন না। হাতটা মুক্ত করে চলে এলাম। ঘন্টাখানেক পর ওটি শেষ হলে বাইরে রিকভারিতে বাচ্চা টাকে রাখা হলো। অল্প অল্প চোখ খুলছে। মাথাটা এত বড় যে চোখ খুলতেও পারছেনা ঠিক করে। ওর সাথে গিয়ে কথা বলে এলাম। বাচ্চাটার মা বললো আপনাদের ভরসার হাত না থাকলে চারবার ওটির ধাক্কা ও কিভাবে সামলাতো জানি না। বললাম চিন্তা করো না,ওর মনে লড়াই করার জন্য একটা অদম্য ইচ্ছে আছে,সেটাই ওকে জিতিয়ে দেবে। বলে হেসে বেরিয়ে গেলাম, নেক্সট কেস ওয়েটিং যে।

 গল্প ২: এটাও গতরাতের গল্প, সার্জারির একটা কেস পেপটিক পারফোরেশন। গিয়ে দেখি ছত্রিশ বছরের একটা লোক পেট ব্যথায় কাতরাচ্ছে। জিজ্ঞেস করলাম প্রতিদিন কতো পেগ চলে? কিছুক্ষন চুপ করে রইলো, তারপর বললো ওই একদিন ছাড়া ছাড়া খাই। বললাম পেট তো ফুটো করে ফেলেছ এই বয়সেই। বললো আমি ভালো হয়ে যাবো তো? বাড়িতে বউ,মেয়ে,বাবা,মা আছে। আর আমি একাই উপার্জন করি সংসারে। জ্ঞান তো ভালোই আছে দেখছি, তাহলে এসব খাও কেনো?
তোমার হাতে যখন সংসারের দায়িত্ব তাহলে সেই হাতকে পঙ্গু হতে দিওনা। ওরা তোমায় ভালোবাসে,ভরসা করে। ভরসার হাতটা সরিয়ে নিওনা। যাইহোক প্রপার কাউন্সেলিং করে কেস আন্ডার হলো। তিনঘণ্টা ধরে ওটি চলার পর ভগবানের আশীর্বাদে আর প্রপার ইন্ট্রাওপারেটিভ মনিটরিং এর জন্য ওকে রিভার্স করতে পারলাম। রোগী ওটি থেকে বেরোনোর আগে বললো আর ওসব ছোঁব না। শুনে হাসলাম,জানি এই ক্রেভিং এমন যে সহজে ও অ্যালকোহল ছাড়তে পারবেনা। বাড়ীর লোককে পোস্ট অপ রিহ্যাব এর অ্যাডভাইস দিয়ে রাত তিনটের দিকে রেস্ট রুমে চলে এলাম।

 গল্প ৩: রেস্টিং রুমে গিয়ে দেখি কেক সাজানো হয়ে গেছে, সিনিয়র আমার জন্য অপেক্ষা করছে। আজ থার্ড য়ার দিদির লাস্ট দিন ডিউটির। একমাস পর ওর এমডি ফাইনাল এক্সাম। প্রথম যখন ডিউটি পড়েছিল দিদিকে খুব ভয় পেতাম। কোনো ড্রাগস, ডোজ,ডাইলিউশন কিছু জানতাম না। বই পড়েও কিছু বুঝতে পারতাম না। দিদির হাত ধরেই সব শেখা হলো আসতে আসতে। দিদি বললো আর একমাস পর তুই থার্ড ইয়ার,এতদিন হাতে ধরে যা শিখিয়েছি কিছু ভুলিস না যেনো। দিদির হাত ধরে বললাম তোমার সাথে কাজ করে কনফিডেন্স পেয়েছি অনেক,এখন একাই সব কাজ করি। গর্বের ছোঁয়া দেখতে পেলাম দিদির চোখে মুখে। চলো কেকটা কেটে ফেলো। আজকের দিনে আর ইমোশনাল হয়োনা। আরও একটা বছর আমাকে কাটাতে হবে, তোমার কথা খুব মনে পড়বে গো। দিদি ছুরি বসিয়ে ফেলেছে ততক্ষনে কেকের ওপরে, আমি আর আর এম ও ম্যাম অল দ্য বেস্ট উইশ করলাম দিদিকে। সত্যিই দিদি কাজ শেখার জন্য হাত না ধরলে অনেক কিছুই অজানা থেকে যেতো।
দিদি চলে গেলো, নেক্সট ইয়ার আমিও বেরিয়ে যাবো,আমার জুনিয়র কে কিছু শিখিয়ে যাবো আর শিখবো ও নতুন অনেক কিছু। সিনিয়রিটি পরম্পরায় এরকম ভরসার হাত  ধরে এগিয়ে চলুক জুনিয়ররা। আর দিদির হোয়াটসঅ্যাপ স্ট্যাটাস দেওয়া কমপ্লিমেন্ট "উইথ মাই হার্ড ওয়ার্কিং অ্যান্ড বেস্ট জুনিয়র" এই কথাটাই পরম প্রাপ্তি পোস্ট গ্রাজুয়েশন পিরিয়ডে। অল দ্য বেস্ট দিদি ফর ইউর আপকামিং এক্সাম। সোমবার রাতের গল্প শেষ হলো। জানলা দিয়ে আলো আসছে, আর রাত কোথায়? সকাল আটটা বেজে গেছে। ডিউটি রুম থেকে বেরিয়ে হাঁটা দিলাম হস্টেলের পথে। আবার যে ডিউটি আছে সাড়ে নটা থেকে। এই রাত খুব স্মরণীয় হয়ে থাকবে আমার কাছে।

সত্য ঘটনা অবলম্বনে

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

ছবির সাথে কতটা গেলো জানি না। মন চাইলো, তাই লিখে ফেললাম।

সোমবার, ১১ এপ্রিল, ২০২২

#নাম ― 'বিদেহী আত্মা স্মরণে'। ✍🏼 মৃদুল কুমার দাস।

             ।। লতা মঙ্গেশকর।।
                 (১৯২৯ – ২০২২)
 শতবর্ষ থেকে একবছর দূরে 'মেরী আওয়াজ হি পেহচান হ্যায়' -এর কিন্নরকন্ঠী নাইটিঙ্গল, বহুকন্ঠের এককন্ঠী মেলডি লতাজীর জীবনাবসান ভারতীয় জীবনধারার কাছে মর্মান্তিক দুঃখের, কিন্তু সুখের বিষয় তিনি থেকে যাবেন প্রজন্মবিস্তারিত হয়ে। 
 সঙ্গীত জগতে প্রথম পদার্পণ মারাঠি ভাষায় গান দিয়ে। তারপর হিন্দি, বাংলা সহ ছত্রিশটি আঞ্চলিক ভাষায় তৎসহ পাশ্চাত্য সঙ্গীতে অবদান ভবি ভোলার নয়। তাঁর কন্ঠে ত্রিশ হাজার গান আছে,যা কোনো কন্ঠশিল্পীর নেই। বাঙালির প্রিয়জন। হেমন্ত-লতার যুগলবন্দী অনবদ্য ছিল। এমনকি হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে এমনই ঘণিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের মেয়ে রানুর জন্মের আগে স্ত্রী বেলা দেবীকে সাধ ভক্ষণ করিয়েছিলেন।
    এমন আত্মীয় পেয়ে দুর্লভ সৌভাগ্যের অধিকারী হয়েছে বাঙালি। বাংলার তাঁতের শাড়ী,বাংলা কথাসাহিত্যের বিশেষ করে শরৎচন্দ্রের উপন্যাসের অন্ধ ভক্ত ছিলেন। শরৎচন্দ্র মারাঠা অনুবাদে পড়তেন। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে ছিল ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সুরে সবচেয়ে বেশী গান গয়েছিলেন। এছাড়াও সুধীন দাশগুপ্ত,রবীন চ্যাটার্জি, সলিল চৌধুরীর সুরে গান গেয়েছিলেন। বাঙালি কানে তাঁর কন্ঠে গাওয়া গান বাঙালির কানে যেন অমৃতসুধা। যেমন ―
  হেমন্ত মুখপাধ্যায়ের সুরে বন্দেমাতরম্ গান হয়ে গেছে কালজয়ী,কালজয়ী বাংলা গান –
 একবার বিদায় দে মা...,সাতভাই চম্পা..., বৃষ্টি বৃষ্টি এ কোন অপরূপ সৃষ্টি...,অন্তবিহীন কাটে না যে দিন..., আমি চিরদিন তোমারই থাকব...,ও মোর ময়না গো...,ঘুমঘুম নিঃঝুম রাতের মায়ায়...
  হিন্দিতে কালজয়ী গান ― সত্যম শিবম সুন্দরম...,আ গলে লাগ যা....
 তাঁর কাছে বাঙালি মাত্রেরই ঋণ অপরিশোধ্য। ঋণ অন্তহীন। তাঁকে বিনম্র শ্রদ্ধা।
               
             ।। সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় ।।
                 (১৯৩১ ― ২০২২)

   বাংলা সঙ্গীতের আকাশে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় সন্ধ্যাতারা। বাবা নরেন্দ্র মুখোপাধ্যায়। মা হেমলতা দেবী। ছয় সন্তানের কনিষ্ঠ সন্ধ্যা। সঙ্গীত ঘরানায় মানুষ। মাও ভাল গান গাইতেন। তবে বাবার কাছে ভক্তিমূলক গান ― "প্রভু যে তুমি দাও দরশন" ― দিয়ে গানের ভূবনে যাত্রা শুরু করেন। মাত্র বারো বছরের সদ্য কিশোরী। এলেন কলকাতা বেতার ভবনে গল্পদাদুর আসরে। প্রথম গান গাইলেন গীতিকার অজয় ভট্টাচার্যের কথায় ও সুরে – "যদি না ফুরাল গান/ করিল দুয়ারে লতা/ নয়নে আছে গো জল।" পেলেন হাতে পাঁচটি টাকা। প্রথম রোজগার। সে কি আনন্দ! সেই যে শুরু সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় মানেই "এ শুধু গানের দিন...।" সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় মানেই বাঙালির আবেগ,বাঙালির ভালবাসা।
  ১৯৪৬ এ গিরিন চক্রবর্তীর কথায় ও সুরে তের বছর দশ মাস বয়সে প্রথম রেকর্ড ― "তোমার আকাশে ঝিলমিল করে...।" ১৯৪৮ এ রাইচাঁদ বড়ালের সুরে 'অঞ্জনগড়' ও রবীন চট্টোপাধ্যায়ের সুরে 'সমাপিকা'য় প্রথম নেপথ্য গান গেয়ে সিনেমা জগতে উজ্জ্বল হয়ে উঠলেন। রবীন্দ্রসঙ্গীত,নজরুলগীতি, চলচ্চিত্রের আধুনিক গান একদিকে,অন্যদিকে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের মধ্য দিয়ে অপ্রতিরোধ্য গতিতে ধেয়ে চললেন তিনি। 
  'অগ্নিপরীক্ষা', 'সবার উপরে','পথে হল দেরী' চলচ্চিত্রে নপথ্য কন্ঠে সুচিত্রা সেনের লিপে সে এক মণিকাঞ্চন যোগ যেন। ঠিক যেমন উত্তমকুমারের লিপে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। সলিল চৌধুরীর সুরে রকমারি সব গান ― "উজ্জ্বল এক ঝাঁক পায়রা..., ― কাটা কাটা  ছন্দে সলিল যেভাবে ধরেন,সন্ধ্যা সেভাবে ছবি আঁকেন। 'সপ্তপদী'-র  "এই পথ যদি না শেষ হয়..." কিংবা 'নায়িকা সংবাদ'–এ "কি মিষ্টি দেখো মিষ্টি..." কালজয়ী হয়ে আছে। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা – "মধুর মধুর বংশী বাজে..",বা যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের - "থই থই শাওন এল ওই...", 'মায়ামৃগ' ছবিতে – "ও বক বক বক বকম বকম পায়রা..", 'জয়জয়ন্তী ছবিতে – "আমাদের ছুটি ছুটি...", নচিকেতা ঘোষের সুরে ― "মায়াবতী মেঘে এল তন্দ্রা...", 'চিরদিনের' ছবিতে মান্না দে-র সঙ্গে দ্বৈত কন্ঠে– "আমি তোমার চিরদিনের..." আরো কত কত অজস্র গান বাঙালির শ্রুতিতে মুগ্ধতায় ভরিয়ে রেখেছিলেন। উস্তাদ বড়ে গোলামের কথায় ― "দেখো বেটা, এক ভাগ শিখনা হ্যায়,তিন ভাগ শুননা হ্যায়।"― এটাই তাঁর জীবনের মূলমন্ত্র ছিল। সারাদিন তিনি গান শুনতেন। রেওয়াজ করতেন। তিনি নশ্বর দেহে আর নেই, কিন্তু আছেন সুরের ঠিকানায় আম বাঙালির হৃদয়ে। তাঁর কাছে বাঙালি অন্তহীন ঋণী। তাঁকে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা।
           *****
            ।। 'শাঁওলি মিত্র' ।।
                (১৯৪৮ ― ১৯২২)
   
বিখ্যাত বাবা ও মায়ের সন্তান বিখ্যাত হন,ব্যতিক্রম দু'একটি ছাড়া। বাবা শম্ভু মিত্র, মা তৃপ্তি মিত্রের একমাত্র সন্তান শা়ঁওলি মিত্র মাত্র চুয়াত্তর বছরে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে শবদেহ হলেন। সিরিটি মহাশ্মশান যখন ত়াঁকে ধারণ করল তখন ত়াঁর পাশে ছিলেন একমাত্র মানসপুত্র সায়ক চক্রবর্তী ও মানসকন্যা অর্পিতা ঘোষ। তাঁর তাই নির্দেশ ছিল ইচ্ছাপত্রে - "তাঁর শবদেহকে যেন অযথা ফুলের মালার বোঝা বইতে না হয়। দাহ হওয়ার পর যেন সবাই জানতে পারে।" এমন ইচ্ছা পিতা শম্ভু মিত্রের মত,এও যেন পিতার কাছ থেকে  নির্দেশ পাওয়া। বাপের বেটি তো! এই নীরবে চলে যাওয়াটা আমাদের কাছে অনুভূত হল তিনি বড্ড অকালে চলে গেলেন। বারে বারে নিজস্ব পরিসরে বিশ্বাস নিয়ে গড়া সম্পর্কের ভাঙন শাঁওলি মিত্রকে একা করে দিত। শাঁওলি মিত্র আমাদের রিক্ত করে কোন পরপারে চলে গেলেন তাঁর স্পষ্টতম ও মিষ্টতম বাংলা বলাটিকে নিয়ে।
   ঋত্বিক ঘটকের 'যুক্তি তক্ক আর গপ্প' চলচ্চিত্রে বঙ্গবালা চরিত্র দিয়ে যাত্রা শুরু। মঞ্চে প্রথম পদার্পণ রবীন্দ্রনাথের 'ডাকঘর' নাটকের অমল চরিত্র রূপায়ণ দিয়ে। আর দেখতে দেখতে বাংলা নাট্যমোদি দর্শকের কাছে তিনি শাঁওলির চেয়ে 'নাথবতী অনাথবৎ' নামে বেশী আদরনীয় হয়ে গেলেন। জীবনের শ্রেষ্ঠ অভিনয় - 'নাথবতী অনাথবৎ'–এর শুরু তবলাতরঙ্গ বেজে ওঠা দিয়ে। বাজছে মন্দিরা, মৃদঙ্গ। মঞ্চে সার বেঁধে বসা জুড়ির দলের দিকে মুখটি ফিরে তিনি। একটা কালো কাঠের জলচৌকির ওপরে দুলছে একটা লম্বা বেণী। একটি আলতারাঙা পায়ের নূপুর তাল রাখছে ছন্দে। জুড়ির দল গান ধরেছে, গানের শেষে কথক ঠাকরুণ পেন্নাম করে বলে উঠলেন ‘‘এক অভাগিনী মেয়ের কথা! রানি, কিন্তু রানি নয়!
 'নাথবতী অনাথবৎ’ -এ এমন কুশলী অভিনয় দেখে নাট্য রসবেত্তা মাত্রেরই মনে বিস্ময়ের ঢেউ আছড়ে পড়ে। এই নাট্যবাংলার ইতিহাসে পেশাদার রঙ্গালয়ের বাইরে একমাত্র ‘নীলদর্পণ’ ছাড়া এত সাড়া-জাগানো অভিনয় আর হয়েছে কিনা সন্দেহ! একবার এক ঘটনা ঘটেছিল - মা তৃপ্তি মিত্র হঠাৎ অসুস্থ। তখন তিনি কলকাতার বাইরে নাথবতীর এক নাট্যশো শেষে সেই অবস্থায় মেকাপ না তুলে মাকে দেখতে ছুটে এলেন। মেক আপ তোলার সময়টুকু পর্যন্ত দিতে চাননা,কারণ পরের শো আছে বলে। 
   আর 'ডাকঘর' মঞ্চাভিনয় করার সময়ও ঘটনা যা ভোলার নয় - ছোটবেলা খুব অসুখে ভুগতেন। একবার তিনি জ্বরে শয্যাশায়ী। মা তৃপ্তি মিত্র 'ডাকঘর' নাটক বিছানায় দিয়ে বললেন- "তোকে অমলের অভিনয় করতে হবে।" সেদিন সেই নাটকটি পড়ে ছোট্ট শাঁওলি খুব কেঁদেছিলেন। অমলের অভিনয়ে খুব সাফল্য পেয়েছিলেন। নাটকে ডেডিকেটরাই এমন ইতিহাস গড়ার সুযোগের সদ্ব্যবহার করে থাকেন। মেয়ে শয্যাশায়ী,ওই পারবে অমলের ভেতরটা দেখতে, এটাই তো মোক্ষম সময়।
   তাঁর মঞ্চসফল অভিনয় যেমন - 'পুতুল খেলা', 'একটি রাজনৈতিক হত্যা', 'হযবরল', 'কথা অমৃতসমান', 'লঙ্কাদহন', 'পাগলা ঘোড়া', 'পাখি', 'গ্যালিলিওর জীবন', 'যদি আর একবার'।
      সংগীত নাটকের জন্য অ্যাকাদেমিক পুরস্কার পান ২০০৩ এ,২০০৯ এ পদ্মশ্রী,২০১২ তে পান বঙ্গবিভূষণ। রাজনীতি থেকে শত যোজন দূরে থাকতেন। কিন্তু সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রাম আন্দোলনের আন্যতম মুখ হয়ে উঠেছিলেন। মহাশ্বেতা দেবী চলে যাওয়ার পর বাংলা অ্যাকাদেমির তিনি দায়িত্ব নিয়েছিলেন। আবার একসময় স্বেচ্ছায় দায়িত্ব ছেড়েও দেন। তাঁর সম্পর্কে সফল মঞ্চাভিনেত্রী ও জাতীয় পুরস্কারে ভূষিতা সুদীপ্তা চক্রবর্তী এই অকাল প্রয়াণকে ঘিরে স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে বলেছেন - "অনেক আদর পেয়েছি। অনেক ভালবাসা। আদর করে কত কি খাইয়েছিলেন। আমি তাঁর বন্ধু বিপ্লবকেতন চক্রবর্তীর মেয়ে! অনেক কিছু শিখেছি। মঞ্চাভিনয়ের খুঁটিনাটি। অবাক চোখে তাকিয়ে দেখেছি ত়াঁর অভিনয় সেই ছোট্টবেলা থেকে। আমার নাটক দেখে ফোন করে খুব প্রশংসা করেছিলেন। আনন্দে কেঁদেই ফেলেছিলাম। বড় হয়ে একসঙ্গে সিনেমায় একটা কাজ করার আর্জি নিয়ে গিয়েছিলাম। রাজি হননি। তাই আর একসঙ্গে কাজ করার বা একদম সামনে থেকে অভিনয় দেখার সৌভাগ্য হল না।" আর সেই সাথে বাংলা নাট্যমোদি দর্শকও বাঁচবে শুধু 'নাথবতী আনাথবৎ'-এর স্মৃতি নিয়ে। বাংলার নাট্যমোদী দর্শকের হৃদয়ে চির অম্লান। চির ঋণী। তাঁকে বিনম্র শ্রদ্ধা।
                      *****

            ।। বাপি লাহিড়ী ।।
              (১৯৫২ ― ২০২২)

       সত্তরেই সঙ্গীত দুনিয়া হারাল তার ঝকঝকে তাজা তরুণ বাপি লাহিড়ীকে। তরুণই তো। সত্তর কোনো বয়স নাকি! গান শুনতে শুনতে যখন সকলে প্রবল উন্মাদনায় মত্ত, হঠাৎ জীবনের মঞ্চ ছেড়ে যাওয়া,আর গানের মঞ্চে সুর তাল থমকে গেলে দর্শককে যেমন বিমর্ষতা গ্রাস করে এও তাই― অকাল বিদায় কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী বাপির জন্য সমান বিমর্ষ।
   বাবা অপরেশ লাহিড়ী ও মা বাঁশরী লাহিড়ী দুই গুনী শিল্পীর সন্তান বাপি লাহিড়ী। স্বনামধন্য হবেন এ আর বিচিত্র কি। কিন্তু স্বনামধন্য হতে কম কাঠ খড় পোড়াতে হয়নি। বাবার গলদঘর্ম পরিশ্রম ছিল। সে পরিশ্রম বৃথা যায়নি, কারণ পিতা বুঝতেন গুনের কদর। মাত্র চার বছরে ভাল তবলা বাজাতেন বাপি। গুরু সামতাপ্রসাদ। তারপর একে একে পিয়ানোসহ বেশ কিছু বাদ্যযন্ত্রে খুব দক্ষ হয়ে ওঠেন। ১৯৬৪ তে মাত্র তের বছর বয়সে বাবার গানে সুর করলেন বাপি। এর পর এল ১৯৬৮ তে 'দাদু' ছায়াছবিতে সঙ্গীত পরিচালনার সুযোগ। এই ছবিতে আরো অনেকে ছিলেন সঙ্গীত পরিচালক,যেমন কালীপদ সেন,অনিল দত্ত সুবোধ রায় প্রমুখ। এর পর ১৯৭২ এ 'জনতার আদালত' ছবিতে এককভাবে সঙ্গীত পরিচালনা করলেন,যাতে গান গাইলেন অপরেশ লাহিড়ী ও বাঁশরী লাহিড়ী,এস প্রসাদ ও অমর পাল। কিন্তু বাবার কাছে মনের মত প্রত্যাশিত খ্যাতি আসছিল না দেখে বোম্বাই নিয়ে গেলেন। শুরু হল নতুন পর্ব। বাবার ছেলের জন্য খুব পরিশ্রম করলেন। কেননা বাপির প্রতিভার প্রতি বাবার অগাধ আস্থা ছিল বলে। আর সেই সূত্রে অচিরে ফল এল গানের কম্পিজিশন ঝোঁক থেকে। ১৯৭৩ এ প্রথম 'নানহা শিকার' হিন্দি ছবিতে সুরারোপ করলেন। ১৯৭৪ এ 'এক লড়কি বদনাম সি' ছবিতে কিশোরকুমার ও লতার গলায় – "রহে না রহে চাহে হাম অওর তুম...", ১৯৭৬ এ 'দিল সে মিলা দিল' ছবিতে – "ইয়ে ন্যায়না ইয়ে কাজল...", ১৯৭৭ এ 'আপ কি খাতির' ছবিতে– রবীন্দ্রসঙ্গীত "ফুলে ফুলে ঢলে ঢলে.." গানটির আদলে লতার গলায় গাওয়ালেন ― "রাজা মেরে তেরে লিয়ে...", ১৯৭৮ তে 'কলেজ গার্ল' ছবিতে কিশোরকুমারের গলায় গাওয়ালেন ― "পেয়ার মাঙ্গা হ্যায় তুমহি সে...", ১৯৭৯ তে 'মনোকামনা' ছবিতে নিজেই গাইলেন ― "তুমহারা পেয়ার চাহিয়ে...", ১৯৮১ তে 'জোস' ছবিতে আশা ভোঁশলেকে দিয়ে গাওয়ালেন ― "সব কুছ তো হ্যায়..." ইত্যাদি। এ তো গেল সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে বাপির জনপ্রিয়তার কথা। 
 এর পর বাপি লাহিড়ীর হাত ধরে এল ডিস্কো জমানা। ১৯৮২ তে 'ডিস্কো ড্যান্সার' দিয়ে শুরু। সে এক উন্মাদনা বলে উন্মাদনা! একই ঘরানার 'ড্যান্স ড্যান্স' ছবিটিও। ঊষা উত্থুপের গলায়― "হরি ওম হরি..",সালমা আগার গলায় – "ঝুম ঝুম ঝুম বাবা..." সঙ্গীত পরিচালনার সে এক নতুন যুগ। 'নমক হালাল' ছবির কিশোর কন্ঠে ― "পগ ঘুঙ্গরু..." - এতে কাওয়ালির বিচিত্র প্রয়োগ লক্ষনীয়। এই ছবিতে আশা ভোঁশলের গলায় ―"জওয়ানি জানেমন..." আবার অন্য আঙ্গিকে। 'শরাবি' ছবিতে – "দে দে পেয়ার ...",গুন্ডে' ছবির ― "তু নে মারি এন্ট্রিয়াঁ...", 'ডার্টি পিকচার'- এ "উলাল্লা উলাল্লা..." বাপি জনপ্রিয়তায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী। ১৯৮১ তে বিভূতি মুখোপাধ্যায়ের কথায় নিজের সুরে যে গানটি ― "আমি বিশ্বাস করি সঙ্গীতে/ তাই বিশ্বাস করি ভগবান/আমি এই পৃথিবীতে জন্মে জেনেছি /সঙ্গীত জীবনের আরেক নাম..." এটাই তাঁর জীবনের যেন মূলমন্ত্র। সঙ্গীত সম্পর্কে আসল উপলব্ধি। তিনি সমগ্ৰ দেশের স্বনামধন্য, বাঙালির জন্যও। তাঁকে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা। বিদেহী আত্মার  রইল শান্তি কামনা।
            *******

বৃহস্পতিবার, ৩১ মার্চ, ২০২২

গ্রন্থালোচনা ✍️ ডা: অরুণিমা দাস

 গ্রন্থালোচনা
✍️ ডা: অরুণিমা দাস

নীহার রঞ্জন গুপ্ত সম্পর্কে কিছু কথা ও তাঁর লেখা 'হাসপাতাল' উপন্যাসের পাঠ প্রতিক্রিয়া

লেখক পরিচিতি -
 ডাঃ নীহাররঞ্জন গুপ্ত (জন্মঃ ৬ই জুন, ১৯১১ – মৃত্যুঃ ২০শে ফেব্রুয়ারি, ১৯৮৬) একজন ভারতীয় বাঙালি লেখক। তিনি ছিলেন জনপ্রিয় রহস্য কাহিনীকার এবং চিকিৎসক। তিনি বিখ্যাত গোয়েন্দা চরিত্র  কিরীটি রায়ের স্রষ্টা হিসেবে উপমহাদেশে স্মরণীয় হয়ে আছেন।১৯১১ সালের ৬ই জুন তৎকালীন  যশোরের (বর্তমান নড়াইল জেলার) লোহাগড়া উপজেলার ইটনায় জন্মগ্রহণ করেন। তার পরিবার ছিল বিখ্যাত কবিরাজ বংশীয়। তার পিতা-মাতার নাম সত্যরঞ্জন গুপ্ত এবং লবঙ্গলতা দেবী। তিনি শৈশবকাল কাটিয়েছেন কলকাতায়।
ছোটবেলা থেকেই তিনি সবসময় স্বপ্ন দেখতেন লেখক হবার। একসময় তিনি  শান্তিনিকেতনে  গিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের  আশীর্বাদ গ্রহণসহ তাঁর অটোগ্রাফ সংগ্রহ করেন। আঠারো বছর বয়সে নীহাররঞ্জন তার প্রথম উপন্যাস রাজকুমার 
রচনা করেন। ইংল্যান্ডে অবস্থানকালীন সময়ে তিনি গোয়েন্দা গল্প রচনায় আগ্রহান্বিত হয়ে লেখার উত্তরন ঘটান এবং আগাথা ক্রিস্টির সাথে সাক্ষাৎ করেন। ভারতে ফিরে এসে তিনি তার প্রথম গোয়েন্দা উপন্যাস  কালোভ্রমর রচনা করেন। এতে তিনি গোয়েন্দা চরিত্র হিসেবে কিরীটি রায়কে সংযোজন করেন যা বাংলা গোয়েন্দা সাহিত্যে এক অনবদ্য সৃষ্টি। পরবর্তীতে কিরীটি খুব জনপ্রিয়তা পায় বাঙালি পাঠকমহলে। তিনি বাংলা সাহিত্যে রহস্য কাহিনী রচনার ক্ষেত্রে অপ্রতিদ্বন্দ্বী লেখক ছিলেন। উপমহাদেশীয় প্রেক্ষাপট ও উপযোগী করে রচিত হয়েছে তার রহস্য উপন্যাসগুলো। বর্মা বা অধুনা মায়ানমার দেশের কথা বার বার ঘুরে ফিরে এসেছে তার রচনায়। এ পর্যন্ত প্রায় পঁয়তাল্লিশটি উপন্যাসকে  বাংলা ও হিন্দি ভাষায় চলচ্চিত্রায়ণ করা হয়েছে যথাক্রমে টলিউড ও বলিউডে এছাড়াও তিনি শিশুদের উপযোগী সাহিত্য পত্রিকা সবুজ সাহিত্যের সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৮৮ সালে  বাংলাদেশের বিখ্যাত চিত্রকর এস এম সুলতান  ইটনায় অবস্থিত নীহাররঞ্জন গুপ্তের বাসভবনে  শিশুস্বর্গ প্রতিষ্ঠা করেন। ২৪ নভেম্বর, ১৯৯৩ সালে নড়াইলের তৎকালীন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ আলী হোসেন এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। পরবর্তীতে এস এম সুলতানের মৃত্যুর পর শিশু সংগঠনের কর্মীরা তা দখল করে। ২০০৩ সালে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ নীহাররঞ্জন গুপ্তের বাসভবন অধিগ্রহণ ও সংরক্ষণের জন্য উদ্যোগী হয়। কিন্তু, আজ অবদি এ বিষয়ে কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি।

সদ্য পড়ে শেষ করেছি ওনার লেখা একটি বই, হাসপাতাল। খুব সংক্ষিপ্ত ভাবে সেই প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করার চেষ্টা করছি।

"সৌজন্য বল, বন্ধুত্ব বল, তার মধ্যে অর্থের দেনাপাওনা আনতে নেই। কারণ তাতে করে অতি বড় বন্ধুত্ব বা সৌজন্যের মধ্যেও চিড় খেতে পারে।" -হাসপাতাল

যেহেতু ডাক্তার তাই হাসপাতাল নামে একটা উপন্যাস থাকবেনা আর তা পড়বোনা - তা কি হয়। সব ডাক্তারদের এই বইটি পড়া উচিত বলে আমার মনে হয়। এক মেয়ের জীবন সংগ্রাম। মেয়েদের নিত্য দিনের ইনকমপ্লিট এবরশনের অভিজ্ঞতা। আর পুরুষ সমাজের নিত্য অভ্যাস। হয়ত দিনশেষে বইটি সেই ডাক্তারনীকে করে তুলবে অনেক শক্ত। দিনশেষে কি শর্বরী কি খুব সুখে ছিল? রাত গুলো কি নির্ঘুম হয়নি মাঝে মাঝে? শৈবাল এর দিকটা উপন্যাসে কমই ছিল। সেও বিশাল ভুলের সাক্ষী। কিন্তু সংসারে জেদ, অভিমান খুব খারাপ জিনিস। একপক্ষের জেদ সংসারে আরেকপক্ষকে জেদ করতে শেখায়। মানুশ বেশিদিন সহ্য করেনা। অপরদিকে জলি সেই একরোখা স্বামীকেই মানিয়ে নেবার অসম্ভব ক্ষমতায় কি সুন্দর সাজিয়ে নিল। স্বামীও হয়ে গেল সামাজিক। স্বামীকেও মাঝে মাঝে কম্প্রোমাইজ করতে হয়। আর উপন্যাসের নামের প্রতি সুবিচার রেখে বারবার এসেছে রোগীদেরকথা, ডাক্তারদের কথা, অসহ্য রোগের কথা। আর দিনশেষে লেখক দাবী রেখেছেন ভবিষ্যতের দিকে। রোগের এই জ্বালা থেকে মানুষ যেন মুক্তি পায়। চিকিৎসকের জীবন যে একটা ব্যবসা নয় এটুকু যেন সবাই জানতে পারে। অর্থের মোহে কেউ যেন শতকরা নব্বইজন ডাক্তারের মত ডাক্তারী পড়তে না যায়। আজও যে সব জীবানু মানুষের শরীরে রোগ ছড়িয়ে তাদের অকাল মৃত্যুমুখে টেনে নিয়ে যাচ্ছে তাদের যেন ধ্বংস করার পথ খুজে পায় পড়াশোনা করে। এই রোগ ও রোগের দু:স্বপ্নকে মুছে ফেলে যেন সব চিকিৎসক মঙ্গলের, শান্তির, সুন্দর স্বাস্থ্যের সন্ধান দিতে পারে মানুষকে।

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

মঙ্গলবার, ২৯ মার্চ, ২০২২

হোক কষ্ট - আছি পাশে

 হোক কষ্ট- আছি পাশে
✍️ডা: অরুণিমা দাস


গল্প ১:পার্কের বেঞ্চে বাবার সাথে বসে আছে একটা ছোট্ট ছেলে। আপন মনে বল নিয়ে খেলা করছে। সামনে দিয়ে একটা আইস ক্রিম গাড়ী যাচ্ছিল। ছেলেটা এক দৃষ্টে তাকিয়ে আছে ওই দিকে। বাবা মনের কথা বুঝতে পেরে একটা আইস ক্রিম কিনে এনে দিলেন ছেলেটিকে। যতটা না খেলো তার চেয়ে বেশি ফেলে নষ্ট করলো। জামা কাপড়ের অবস্থাও খারাপ হলো। দুর থেকে একজন ভদ্রমহিলা জিনিসটা লক্ষ্য করছিলেন। কাছে এসে বললেন কি অভদ্র ছেলে রে বাবা! কোনো ম্যা শেখায় নি মা বাবা। শুনে ছেলেটির বাবা বেঞ্চ থেকে উঠে গিয়ে বললেন ম্যানার্স! হোয়াটস দ্যাট? ওসব ম্যানার্স আপনার কাছে রাখুন। আমার ছেলে অটিজমে আক্রান্ত। আমার কাছে খুব স্পেশাল ও। যখন ওর মা জানতে পারে ও অটিস্টিক চাইল্ড, ছেড়ে চলে যায় ওকে। আমিই ছেড়ে যেতে পারিনি ওকে। ওর মনের ভাষা বুঝতে রেগুলার নেটে পড়াশোনা করি। এখন আর কোনো অসুবিধে হয় না। ও নিজের মতো করে একটা জগৎ বানিয়ে নিয়েছে যেখানে শুধু আমি ছাড়া কেউ নেই। রোজ দৌড়ে ছুটে অফিস করি, ওকে নিয়েই অফিস যাই, যতই কষ্টে জর্জরিত থাকি ওকে আমি ঠিক মানুষ করবোই। পাশে আছি ওর সবসময়। ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি শক্তি দিন আমায়। ছেলেটি বাবার কোলের কাছে এসে বললো বাব..বা। চলো বাবা আমরা বাড়ি যাই, বললেন ছেলের বাবা। ছেলেকে নিয়ে পার্ক থেকে চলে গেলেন। ভদ্রমহিলা সরি বললেন,কিন্তু শোনার মত কেউ ছিলো না সেখানে। মনে মনে এক অসহায় বাবার লড়াইকে কুর্নিশ জানালেন। 


গল্প ২ : আন্ডার গ্রাজুয়েট করছি যখন মেডিসিন ক্লাসে দেখতাম এক স্যার সবসময় মেয়েকে নিয়ে ডিউটি তে আসতেন। মেয়েটিকে ডক্টরস রুমে বসিয়ে আমাদের ক্লাস নিতেন। ক্লাস শেষ হয়ে গেলে মেয়েকে গিয়ে পড়াতেন, অঙ্ক করাতেন। একদিন কথা প্রসঙ্গে আমাদের মেডিসিন ওয়ার্ডের গ্রুপ ডি দাদা কে জিজ্ঞেস করলাম স্যার মেয়েকে নিয়ে এরকম সব জায়গায় যান? দাদা বললো হ্যা ম্যাডাম, স্যারের স্ত্রী তো সিজোফ্রেনিয়াতে আক্রান্ত।  নিজের বাপের বাড়ীতে থাকেন। স্যার প্রথমে খুব ভেঙে পড়েছিলেন। পরে নিজেকে সামলে নেন মেয়ের কথা ভেবে। এখন মেয়েকে এক মুহুর্ত কাছছাড়া করেন না। আপনাদের ক্লাস নেবেন, রাউন্ড দেবেন তারপর ঠিক সময় মতো মেয়েকে কোচিং ক্লাসে নিয়ে ছুটবেন। সব শুনে মনে মনে
স্যারের প্রতি শ্রদ্ধা আরও বেড়ে গেলো। পরে স্যারের মেয়ের সাথে ভালো সম্পর্ক হয়ে গেছিলো আমাদের। স্যার বলতেন আমাদের, জীবনে যতই কষ্ট আসুক, হার মানবিনা। লড়াই করে যাবি শেষ পর্যন্ত। ঈশ্বরও তোদের পাশে এসে দাঁড়াবেন। স্যারের কথা গুলো মেনে চলার চেষ্টা করি আজও।


গল্প ৩ : সোমবারের রাত, নাইট ডিউটি। কিছু ঘটবেনা এটা হতেই পারে না। অর্থোপেডিক বন্ধু এসে বললো একটা বয়স্ক মহিলা এসেছে, হিপ ডিসলোকেশন নিয়ে। ওর হিপ প্রপার পজিশনে এনে প্লাস্টার করবো। বললাম আচ্ছা কর, আই ভি ড্রাগস দিয়ে সিডেট করে রাখবো। টেবিলে গিয়ে দেখি এক আশি বছরের বয়স্কা মহিলা। অসহ্য যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। জিজ্ঞেস করলাম কতদিন আগে হয়েছে? বললো দিন পনেরো হবে। এতদিন আসোনি কেনো গো? বললো নাতনীর পরীক্ষা ছিল, ওকে কে রান্না করে দেবে? ওর তো নিজের কেউ নেই। আজ আর পারছিলাম না যন্ত্রণা সহ্য করতে, তাই ও নিয়ে এলো। বাইরে হাই রিস্ক কনসেন্ট নিতে গিয়ে দেখলাম নাতনি কাঁদছে। বললাম এই বয়সে অনেক সমস্যা হতে পারে, তাই বন্ড সাইন করতে হবে তোমায়। হাতে ধরে বললো আমার কেউ নেই ম্যাডাম উনি ছাড়া। এতদিন কোমর যন্ত্রণা নিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে ছিল শুধু আমার জন্য, আজ আর লুকোতে পারেনি আমার থেকে। আজ একপ্রকার জোর করে নিয়ে এলাম। সব শুনে সাইন করিয়ে নিয়ে ভেতরে এলাম। মহিলা বললেন ওর আরও দুটো পরীক্ষা বাকি গো। বললাম এতো ভেবো না সব ঠিক হয়ে যাবে। যখন এক্স রে প্লেট দেখলাম, দেখি একটা ফেমোরাল হেড ইমপ্ল্যান্ট বসানো আছে সেটাই ডিসলোকেট হয়েছে। এটা একদিনের ঘটনা নয়। একমাস ধরে ধরে এটা নিজের জায়গা থেকে সরে গেছে ক্রমশ। আর বুঝতে পেরেও শুধু নাতনীর কথা ভেবে বৃদ্ধা অসহ্য যন্ত্রণা নিয়েও সহ্য করে গেছে কষ্টটা।তারপর শুরু হলো ম্যানিপুলেশন, টানা ৪৫ মিনিটের চেষ্টায় কিছুটা মোবিলাইজ হলো ফেমোরাল হেড। ফাইব্রোসিস হয়ে হেড আর্টিকুলেশনের জায়গাটা ছোট হয়ে যাওয়ার জন্য পুরোটা ঠিক হলো না। বলা হলো অপারেশন লাগবে। সেটা শুনেও বৃদ্ধা বললো যা হবে আমার নাতনীর পরীক্ষার পর। আমায় এখন বাড়ি ছেড়ে দাও। ব্রেস পড়িয়ে প্লাস্টার করে ছেড়ে দেওয়া হলো ওনাকে। 
সত্যিই এই মানুষের লড়াই গুলো কি অদ্ভুত রকমের। কেউ নিজের জন্য ভাবছে না। প্রাণপাত করছে নিজের ছেলে, মেয়ে বা নাতি নাতনীর জন্য। 

ছবির সাথে লেখাটা গেলো কিনা জানিনা, তবে ছবি দেখে যেটা বুঝলাম, সবাই নিজের ভেতরে যন্ত্রণা নিয়েও ঈশ্বরের কাছে লড়াইয়ের শক্তির জন্য প্রার্থনা করে যাচ্ছে অবিরত নিজেদের আপনজনদের রক্ষা করার জন্য। লড়াই চলছে প্রতিনিয়ত,বেঁচে থাকার আর বাঁচিয়ে রাখার লড়াই। 

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

রবিবার, ২৭ মার্চ, ২০২২

#নাম ― প্রতাপচন্দ্র মজুমদার। ✍️ ― মৃদুল কুমার দাস।

#শিরোনাম ― 
    প্রতাপচন্দ্র মজুমদার।
    ✍️― মৃদুল কুমার দাস।

    হিন্দুধর্মের আঙিনায় বহুচর্চিত স্বনামধন্যগণের নামের তালিকায় ঊনবিংশ শতাব্দীর আটের-নয়ের দশকে একটি উল্লেখযোগ্য নামের সংযোজন ঘটেছিল,তিনি হলেন প্রতাপচন্দ্র মজুমদার(২অক্টোবর ১৮৪০- ২০ মে ১৯০৫)। পরিচয়― প্রেসিডেন্সী কলেজের প্রাক্তনী, 'ব্যাঙ্ক অফ বেঙ্গল'-এর কর্মী, ব্রহ্মানন্দ কেশবচন্দ্র সেনের উক্ত ব্যাঙ্কের সহকর্মী, 'নববিধান ব্রাহ্মসমাজ'- এর কেশবচন্দ্রের উৎসাহী সমর্থক, আমেরিকায় প্রথম পদার্পন(২৮ আগষ্ট,১৮৮৩, ম্যারাথন জাহাজ হতে বোস্টন বন্দরে),চিকাগো ধর্মসম্মেলনে (১৮৯৩) স্বামীজীর যোগদানের সময় নানা অপপ্রচারে যুক্ত হওয়া,এমনকি চিকাগো ধর্মসম্মেলনে 'অ্যাডভাইসরি কাউন্সিল'-এর মনোনীত সদস্য,'মেড ইন ইন্ডিয়া,লাভস ইন ইউ.এস.এ' শ্লোগানের উদ্গাতা। জন্ম বাঁশবড়িয়া গ্রামে, জেলা হুগলি। 
  কেন তাঁর হিন্দু ধর্মের প্রচারক হয়ে প্রথম আতলান্তিক পেরিয়ে আমেরিকায় যাওয়া! বলা হয় দূঃসাহস বটে! এর আগে হুগলীরই রাজা রামমোহন রায় কালপানি পাড়ি দিয়ে বিলেতে যাওয়ার দুঃসাহস দেখিয়েছিলেন। কিন্তু আমেরিকা যাওয়ার দুঃসাহস আর তাঁর হয়ে ওঠেনি। তাঁর ইংল্যান্ডেই অকালমৃত্যু ঘটেছিল। প্রতাপচন্দ্র আমেরিকা পাড়ি দেওয়া জরুরী মনে করেছিলেন কারণ দিনকেদিন মাইনে-করা ক্রিশ্চিয়ান মিশনারিগণ যেভাবে এই উপমহাদেশে এসে হিন্দুধর্মের নিরন্তর কুৎসা রটনা করে চলেছেন, এর একটা বিহিত না হলে নয়। শিক্ষিত মধ্যবিত্ত এ বঙ্গের যুবসমাজ যেভাবে খ্রিস্টধর্মের দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে, ধর্মান্তরিত হওয়ার একটা ট্রেন্ড তৈরী হতে চলেছে, এর বিহিত একটা নাহলে হিন্দুধর্মের বড়ই দুর্দিন আসতে চলেছে। ইংল্যান্ডে, আয়ারল্যান্ডে তবু বেশ কিছুটা হিন্দুধর্ম প্রচার পেলেও মহাশক্তিধর দেশ আমেরিকায় প্রচার বাকি থাকায় কোনো কাজের কাজ হচ্ছে না। ইদানিং পশ্চিমী দুনিয়ার পাশ্চাত্যের শিরোমণি মানে আমেরিকা,ঐ আরকি তেলা মাথায় তেল না দিলে প্রচার-মেলা জমে না। আমেরিকা জানলে, স্বীকৃতি দিলে আমরা তবেই স্বীকৃতি পাব। বিশ্বের ধনী দেশের থেকে প্রচার পাওয়া কার না সখ জাগে! আমেরিকা বললে তবেই আমরা নিজেদের চিনব,যেমন চিনেছিলাম স্বামী বিবেকানন্দকে। তাই আমেরিকায় যেকোনোভাবে হিন্দুধর্মকে পৌঁছে দিতেই হবে। সেখানে 'ভাগবদ্গীতা'র ইংরেজি অনুবাদ পৌঁছানো খুব জরুরী। কেননা সেখানে গীতার মর্ম বোঝার রালফ উড্রো এমারসনের মত  অনেক পন্ডিত আছেন। 
  ইউটেরিয়ান চার্চের সহযোগিতায় ১৮৭৪ এ ইউরোপব্যাপী (ইংল্যান্ড, জার্মানি...) হিন্দুধর্মের প্রচার সেরেছিলেন। তারপরে ১৮৭৯ তে মাথায় আসে আমেরিকার কথা। তারই ক'বছর পরে ১৮৮৩-র জানুয়ারী মাসে কলকাতায় নববিধান ব্রাহ্মসমাজের উৎসবে আমেরিকায় হিন্দুধর্ম প্রচারের সর্বসম্মত প্রস্তাব গৃহীত হয়। দায়িত্বভার অর্পিত হয় প্রতাপচন্দ্র মজুমদারের উপর। সেইমত প্রতাপচন্দ্র মজুমদার আতলান্তিক পেরিয়ে আমেরিকায় পৌঁছন ১৮৮৩-র ২৮ আগষ্ট। আর এই প্রচারের ব্যায়বাহূল্য নিরসনের জন্য একটি অর্থ সংগ্রহের কমিটি গঠিত হয়েছিল। এই ঘটনাকেই   আমেরিকায় হিন্দুধর্ম প্রচারের প্রথম ভিত্তিপ্রস্তর বলে অভিহিত করা হয়। এর পর ১৯৬৫ পর্যন্ত চলল নিরন্তর প্রয়াস যা ছিল লক্ষ্যে পড়ার মত। এই কর্মযজ্ঞের প্রতিনিধিস্থানীয় ছিলেন এগারজন। তাঁরা হলেন ― প্রথম প্রতাপচন্দ্র মজুমদার(১৮৮৩)। এরপর ক্রমে ক্রমে ২.মোহিনীমোহন চট্টোপাধ্যায় (১৮৮৬), ৩.স্বামী বিবেকানন্দ (১৮৯৩), ৪.স্বামী সারদানন্দ (১৮৯৬), ৫.স্বামী অভেদানন্দ (১৮৯৭), ৬.স্বামী তুরীয়ানন্দ (১৮৯৯), ৭.স্বামী ত্রিগুণাতীতানন্দ (১৯০৩), ৮.পরমহংস যোগানন্দ(১৯২০), ৯.মহানাব্রত ব্রহ্মচারী(১৯৩৩), ১০. শ্রীচিন্ময়কুমার ঘোষ (১৯৪৬), ১১. আচার্য অভয়াচরণ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ (১৯৬৫)।
  আমেরিকায় হিন্দুধর্ম প্রচারের আদি পুরুষ হলেন প্রতাপচন্দ্র মজুমদার। তিনি ইয়োরোপে 'ব্রিটিশ অ্যান্ড ফরেন ইউনিটারিয়ান অ্যাসোসিয়েশন' -এর সম্পাদক রেভারেন্ড রবার্ট স্পিয়ার্সের সম্পাদিত পত্রিকা 'দ্য ক্রিশ্চান লাইফ'পত্রিকায় প্রথম লেখা শুরু করেছিলেন। পত্রিকার বিজ্ঞাপনে প্রতাপচন্দ্র মজুমদার সম্পর্কে এভাবে বলা হয়েছিল, ভারতে ইংরেজ শাসনের পক্ষে জনমত গড়ে তোলা প্রত্যেক ইংরেজের কর্তব্য,এই সংক্রান্ত মতামত নিয়ে প্রতাপচন্দ্র মজুমদারের বক্তব্যগুলি গ্রহণ করা জরুরী,যা এদেশের পক্ষে অত্যন্ত হিতকর হবে। রবার্ট স্পিয়ার্সের সহযোগিতায় মজুমদারের সভাগুলিতে যথেষ্ট লোক সমাগম হত বক্তব্য শুনতে। বার্মিংহাম টাউনহলে তো প্রায় তিন হাজারের মত শ্রোতা হাজির হয়েছিলেন। এর পর তিনি যান আমেরিকায়। আমেরিকায় যাওয়ার জন্য আমন্ত্রণ পেয়েছিলেন ইউনিটারিয়ান সোসাইটির অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথি যাজক রেভারেন্ড পুটনামের কাছ থেকে।
     আমেরিকায় প্রতাপচন্দ্রের দিনে দিনে ক্রমেই জনপ্রিয়তা বাড়তে লাগল দেখে আমেরিকার 'আমেরিকান ইউনিটারিয়ান অ্যাসোসিয়েশন' সমূহ দায়িত্বভার গ্রহণ করেছিল শ্রীমজুমদারের। 
   শ্রীমজুমদার সারাটোগা-য় যে বক্তৃতা করেন তাতে ভারতবর্ষের ধর্ম-সংস্কার সম্পর্কে যা বলেছিলেন আমেরিকাবাসীর সে মুগ্ধতার শেষ ছিল না। তা থেকে ভারতবর্ষ নিয়ে আমেরিকানরা প্রবল আগ্রহী হন। সবার দৃষ্টি পড়ে  প্রাচ্যের এই পরিব্রাজক হিন্দু দার্শনিক, শিক্ষক ও ধর্মস্কারকের দিকে। তাতে কে ছিলেন না ― জাতীয় নেতা, ধরর্মযাজক থেকে অগণিত আলোকশিক্ষিত আমেরিকানবাসীগণ। তাঁর বক্তব্যে এও বার বার উঠে এসেছে, খ্রিস্টধর্মের প্রতি ভারতীয়গণ যথেষ্ট শ্রদ্ধাশীল। 
  আমেরিকায় বিভিন্ন সভায় যখন প্রতাপচন্দ্র বক্তৃতা শুরু করতেন তখন শুরুতে সংস্কৃত মন্ত্র তো কখনো কখনো নীরবতা পালন করতেন। আর বলতেন সারা বিশ্বে ধর্মীয় বৈচিত্র্যের কথা। আর সাহসের সঙ্গে বলতেন পাশ্চাত্যও এবার সনাতন ভারতবর্ষ থেকে কিছু ধর্মপ্রচারক নিজেদের দেশে আনুক,তাহলে ধর্মের মধ্যে বৈচিত্র্য ক্রমশ বোঝা যাবে,ধর্মীয় উদারতা আসবে। আর অকপটে যে কথা দিয়ে আমেরিকাকে মুগ্ধ করে ফেলেছিলেন তাহল ― "আমি নিজেও একজন হিন্দু প্রোটেস্টান্ট। ইতিহাস পড়ুন, বৈদিক চিন্তার বিরুদ্ধে ভারতে প্রতিবাদ-স্বরূপ সাংখ্য এসেছিল, বৌদ্ধ ধর্মও সনাতন ধর্মের বিরুদ্ধে এক প্রবল প্রতিবাদ, মধ্যযুগে শিখধর্ম ও বাংলার বৈষ্ণবধর্মও একধরনের প্রতিবাদ এবং ঊনিশ শতকের ব্রাহ্মধর্মও আর এক প্রতিবাদ।" 
   প্রতাপচন্দ্রের এও এক শ্রেষ্ঠ কীর্তি ইংরেজিতে রচিত 'দ্য ওরিয়েন্টাল ক্রাইস্ট' বইটির জন্য, যা তাঁকে লেখক ও চিন্তাবীদ হিসেবে আমেরিকানদের কাছে যথেষ্ট স্বীকৃতি এনে দিয়েছিল। 
  সুতরাং এটা নিঃসন্দেহে প্রমাণিত  পাশ্চাত্যে প্রতাপচন্দ্র মজুমদার ভারতীয় সনাতন ধর্মের কথা প্রথম শুনিয়েছিলেন। এই ভারতচিন্তনের কথায় আমেরিকা সেদিন রুদ্ধদ্বার উদ্ঘাটন করেছিল। সেইজন্য যখন ১৮৯৩ এ চিকাগো মহাধর্মসম্মেলন হয়েছিল তখন সেই মহাধর্মসভার 'অ্যাডভাইসরি কাউন্সিল'-এর তিনি একজন মনোনীত সদস্য হয়েছিলেন।
                          ****
#কপিরাইট রিজার্ভ ফর মৃদুল কুমার দাস।

শুক্রবার, ২৫ মার্চ, ২০২২

গ্রন্থালোচনা (হায়রোগ্লিফের দেশে )



 বইয়ের নাম - হায়রোগ্লিফের দেশে
 
 ✍️ ডা: অরুণিমা দাস



কদিন আগে পড়ে শেষ করেছি হায়রোগ্লিফের দেশে বইটি। লেখক হলেন অনির্বাণ ঘোষ যিনি পেশায় একজন ডক্টর (সার্জেন)বর্তমানে লন্ডনে থাকেন। মিশরের ইতিহাস এতো সুন্দর ভাবে তুলে ধরেছেন তিনি যে বইটি পড়া শুরু করলে শেষ না হওয়া পর্যন্ত মনে একটা অতৃপ্তি থেকে যায়। ইতিহাস যে বোরিং না হয়ে এত ইন্টারেস্টিং হতে পারে তার পরিচয় পাই লেখকের লেখায়। বইটি পড়ে প্রতিক্রিয়া নিজের ভাষায় ব্যক্ত করার চেষ্টা করছি।

মিশর...ইতিহাস বা ভ্রমণপ্রেমীদের কাছে এটি কেবল একটি নাম নয়,আবেগও বটে। সেই আবেগকেই দুই মলাটে বন্দী করার চেষ্টা করেছেন অনির্বাণ ঘোষ। উনার এই চেষ্টা সত্যিই প্রশংসার দাবী রাখে। সহজ ঘরোয়া আড্ডার ভঙ্গিতে মিশরের বেশকিছু উল্লেখযোগ্য ব্যাপারস্যাপার তুলে ধরেছেন 'হায়রোগ্লিফের দেশে'। জানিয়েছেন বেশ কিছু অজানা গল্প।
মিশরের নাম শুনলেই সবার আগে কাকাবাবুর 'মিশর রহস্য'-এর কথা মনে পড়ে যায়। অবশ্য শুধু আমার নয়,প্রদীপ্ত আর স্পন্দনেরও কিন্তু মিশরের নাম শুনলে পিরামিডের আগে কাকাবাবুর ছবিই চোখের সামনে ভাসতে থাকে।প্রদীপ্ত আর স্পন্দনই গল্পের মূল চরিত্র, অবশ্য ভবেশদাকেও ভুললে চলবে না। কারণ তিনিই তো আমাদের মিশর ঘোরাবেন। চলমান এনসাইক্লোপিডিয়া হলেন ভবেশ দা। আসলে এটা কোনো ইতিহাসের বই নয়। তার চেয়ে বলা ভালো স্পন্দন,প্রদীপ্ত আর ভবেশদার আড্ডা এটা। মিশরের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের বর্ণনা গল্পচ্ছলে বলে আমাদের মোহাবিষ্ট করে গেছেন ভবেশদা। মিশর নামটাতেই কেমন যেন একটা রহস্য রহস্য গন্ধ পাওয়া যায়। মিশরে কিন্তু শুধু পিরামিড আর তুতেনখামেনই না, আরো অনেক কিছুই ছিল। ওসাইরিস, হায়ারোগ্লিফ, বুক অব দ্য ডেড, ফারাও নামের রহস্য, স্ফিংসের মূর্তি, ওবেলিস্ক, পিরামিড কীভাবে বানানো হলো, আর্কিওলজিস্টদের পরিচয়, ক্লিওপেট্রার ইতিহাসসহ আরো অনেক কথা এই বইয়ে উঠে এসেছে। সেই সাথে ইতিহাসের বিষয়গুলো ভালোমতো বোঝানোর জন্য ছবি আর ম্যাপ তো ছিলই। তবে বইয়ের শেষে পেলাম বেশ বড়সড় একটা চমক! ভবেশদার ইঙ্গিত দেখে মনে হচ্ছে পরের কোনো বইতেও আমরা আবারও এই ত্রয়ীর দেখা পাবো।ইতিহাসের মতন একটা কঠিন বিষয় যারা সহজ ভাষায় পড়তে চায়, তাদের জন্য এই বইটা খুব স্পেশাল একটা বই হবে আশা রাখি। বোঝাই যায় লেখক কতটা পড়াশুনা করে এই বইটা লিখেছেন। তাই তো অবলীলায় মিশরের অজানা ইতিহাস ও রহস্য সম্পর্কে কথা বলতে পেরেছেন তিনি। যাদের মিশরের প্রাচীন ইতিহাস সম্পর্কে জানার বিশেষ আগ্রহ আছে, তাদের জন্য এই বইটা খুব উপভোগ্য এবং আকর্ষনীয়। 
আর বাংলায় খুব সম্ভবত প্রাচীণ মিশর নিয়ে লেখা সেরা বই। গল্পের ছলে রহস্য সৃষ্টি করে প্রাচীন মিশরের কাহিনি বলায় ইতিহাসের কাঠখোট্টা ভাবও নেই। প্রাচীন মিশরের দেব দেবী, মিথ, ফারাও, পিরামিড, ভ্যালি অভ কিংস, টেম্পল অভ আবু সিম্বল, হায়ারোগ্লিফ, মমি, অবিলিস্ক, স্ফিংক্স, নেপোলিয়ন আর আলেকজান্ডারের মিশর আক্রমণ, আলেকজেন্দ্রিয়ার বিখ্যাত লাইব্রেরি আর লাইটহাউস, বিখ্যাত সব আর্কিওলজিস্ট আর তাদের আবিষ্কারের দুর্দান্ত কাহিনি, আখনাতেন, রামেসিস, তুতানখামেন, অনিন্দ্য সুন্দরী নেফারতিতি, ইতিহাসের প্রথম মহিলা ফারাও হাতশেপশুত, ক্লিওপেট্রা কি নেই এই এখানে। সাথে ক্লাসিক সব ছবি আর দুর্দান্ত সব ইলাস্ট্রেশন। পুরো বইটি ভীষণরকম উপভোগ্য। হায়রোগ্লিফের দেশে আপনার যাত্রা শুভ হোক। 

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

মঙ্গলবার, ২২ মার্চ, ২০২২

ধরো হাল শক্ত হাতে


  ধরো হাল শক্ত হাতে
 ✍️ডা: অরুণিমা দাস
    

 গল্প ১ :
প্রথম গল্প অরিনকে নিয়ে। আমাদের কলেজে শিশু বিভাগে ঠাই এখন ওর। বয়স ছয় বছর। যখন জন্মেছিল তখন থেকেই বোঝা গেছিলো নানান শারীরিক ত্রুটি আছে ওর। জন্মের ৭ দিন পর মা ওকে ছেড়ে পালিয়ে যায়। জীবন যুদ্ধে অসুস্থ ছেলে কে নিয়ে লড়াই করার শক্তি ছিল না ওর মায়ের, তাই পালিয়ে বেঁচেছিল। রেখে গেছিলো একটা চিঠি শুধু। কিন্তু হার মানেনি ওয়ার্ডের চিকিৎসক আর নার্স রা। নিয়মিত চিকিৎসা, প্রপার স্পিচ থেরাপি, ফিজিওথেরাপি আর অরিনের প্রতি তাদের ভালোবাসায় অরিন আজ পুরোপুরি হাঁটতে না পারলেও ক্রাচের সাহায্যে হেঁটে চলে নিজের কাজ টুকু করতে পারে। চোখের কিছু ত্রুটির কারণে দেখতে সমস্যা হলেও আগের চেয়ে অনেক কম। কদিন আগেই পায়ে কাঁচ ফুটিয়ে একটা বড়ো ঘা তৈরি করেছিল পায়ে। আমার কাছে প্রি আনেস্থেটিক চেক আপের জন্য যখন আসে, ওকে বলি ভয় পাস না। ওই টুকু বাচ্চা উত্তর দিল "এখন আর ভয় পাই না দিদি, আমি লোহাও হজম করে নিতে পারি।" জন্মের সাতদিন পর থেকে যার জীবন যুদ্ধে লড়াই চলছে তার কাছে এটা তো খুবই সামান্য ব্যাপার। এখন ওর ওটি হয়ে গেছে। সুস্থ আছে ও। ওটি ঢোকার আগে কোনদিন দেখা হলে গুড মর্নিং বলে ছোট্ট একটা হাসি দেয়। এই হাসি হার না মানার হাসি বুঝতে পারি। ওই ছোট্ট শিশু আমার কাছে বিরাট অনুপ্রেরণা।

 গল্প ২: গতকালের নাইট ডিউটি নিয়ে একটা গল্প। আমার প্রতিটি নাইট ডিউটি তে কিছু না কিছু ঘাটা কেস হবেই। কাল ও তাই হয়েছে বলার অপেক্ষা রাখে না। মাঝরাতে একটা পেশেন্ট ভর্তি হলো বার্স্ট আবডোমেন নিয়ে। এরকম পেশেন্ট সাধারণত ইলেক্টিভ কেস হিসেবে ভর্তি হয়, ইমার্জেন্সী তে এসেছে মানে খারাপ অবস্থা। জিজ্ঞেস করলাম এতদিন কি করছিলে? বললো দিদি পেটে ব্যান্ডেজ জড়িয়ে থাকতাম, পরীক্ষা ছিল বলে ভর্তি হইনি। আজ বিকেলে পরীক্ষা দিয়ে ফেরার সময় বাকি স্টিচ গুলো খুলে যাওয়ায় এত যন্ত্রণা হচ্ছিলো যে আর থাকতে পারলাম না। তবে পরীক্ষা খুব ভালো দিয়েছি ম্যাম। সত্যিই সফলতা এভাবেই আসে, বুঝলাম। কমফোর্ট জোনের বাইরে বেরিয়ে চড়াই উতরাই পেরিয়ে বোধহয় সফলতাকে ছোঁয়া যায়।
পোস্ট অপ পিরিয়ডে সে এখন ভালোই আছে আশা করি। 

 গল্প ৩: এটা হলো অন্য এক লড়াইয়ের গল্প যে লড়াইতে না জিতলে হয়তো আজ প্রথম দুটো গল্প লেখার মত অবস্থায় আসতাম না। এমবিবিএস পাস করার পর ইন্টার্নশিপ তো মন দিয়েই করেছিলাম, পেরিফেরি কলেজ মানেই কাজের খুব চাপ। ওই এক বছরে বই থেকে অনেক দূরে চলে গেছিলাম। ফাইনাল ইয়ারের পড়ার চাপ থেকে মুক্তি পেয়েছিলাম বলে আর বই পত্র ছুঁয়েও দেখতাম না। ডবল ডিউটি, নার্সিং হোম, হাউস স্টাফ শিপ করছি। প্রচুর পয়সার মুখ দেখছি কিন্তু পরে বুঝলাম নামের পাশে স্পেশালিটি ডিগ্রী না থাকলে এসব উপার্জন বেকার। সব বন্ধুরা দেখতাম পোস্ট গ্রাজুয়েট এন্ট্রান্স এক্সামের জন্য পড়ছে। বই পত্র কিনলেও পড়তে ইচ্ছে করতো না। ডিউটি আর ঘুম এভাবেই চলছিল। হাউসস্টাফশিপ করে আরো এক বছর নষ্ট করলাম। তখন কিছু বন্ধুরা চান্স পেয়ে গেছে এম ডি তে। সেই বছরটা মন দিয়ে পড়ার চেষ্টা করলাম। পড়ার বইগুলোতে মনোনিবেশ করতে বেশ কষ্ট হচ্ছে, খালি ঘুম পেয়ে যাচ্ছে। চব্বিশ খানা সাবজেক্টের একদিনে এক্সাম আর তিনশোটা কোয়েশ্চন আর হলের সাড়ে তিন ঘণ্টা আমার ভাগ্য নির্ধারণ করবে ভেবেই আতঙ্কিত হতাম। যাইহোক এভাবে এক বছর গেলো, পরীক্ষা দিলাম। রেজাল্ট হলো না কিছুই, নো র‍্যাঙ্ক এলো। ভাবলাম আরেকটা বার ট্রাই নিয়ে দেখি। আরো একটা বছর কোনো রকম ইনকাম নেই সেই অবস্থায় পড়তে বসা। কোনো আত্মীয়দের সাথে কথা বলতাম না ভয়ে। কারণ কথা হলেই জিজ্ঞেস করতো " কি রে এমবিবিএস পাস করে করলি টা কি! পোস্ট গ্রাজুয়েট এন্ট্রান্স ক্র্যাক করতে না পারলে কি করবি?" এই কথা গুলো মনের ওপর এত প্রভাব ফেলতে লাগলো যে পড়ায় মন বসাতে পারতাম না। তারপর নিজেকে পুরোপুরি আলাদা করে নিলাম বাইরের জগৎ থেকে। বুঝলাম নিজের  মোটিভেটার নিজেকেই হতে হবে। পড়তে সবসময় ভালো লাগতো না। মাঝে মাঝে ইউ টিউব সন্দীপ মাহেস্বরী র ভিডিও দেখতাম। যথাসময়ে পরীক্ষা এসে গেলো। এক বছর পড়ার পড়েও রেজাল্ট কোনো রকম হলো। যা স্কোর হলো তাতে বড়জোর এনাটমি, বায়োকেমিস্ট্রি আসবে। কিন্তু এই সাবজেক্ট গুলোর সাথে অতটা হৃদ্যতা ছিল না। সবাই বললো দুবার হলো এবার জি ডি এম ও শিপ জয়েন করে গ্রামে চলে যা। কিন্তু কোনোদিন নিজের মন ছাড়া কারোর কথা শুনিনি। বাড়িতে সবাইকে বুঝিয়ে নিজের কলেজ প্যাথলজিতে হাউস স্টাফ শিপ নিলাম কারণ ক্লাস করার আর বই কেনার খরচটা উঠে যাবে এতে। ছ মাস মত ডিউটি করলাম। কিছুটা টাকা জমিয়ে বাড়িতে বসলাম শেষ তিন মাস পরে পরীক্ষা দেবো বলে। সব বন্ধুরা পেয়ে গেছে ততদিনে চান্স। কেউ ফার্স্ট ইয়ার, কেউ বা সেকেন্ড ইয়ার। ওদের দেখলে কষ্ট হতো খুব, কিন্তু ভেঙে পড়লে চলবে না জানতাম। তাই শেষ তিনমাস আদা জল খেয়ে লাগলাম। এটাই শেষ চান্স। আর কোনো চান্স পাবো না আমি কারণ সিলেবাসে আমূল পরিবর্তন আসছে পরের বছর। রাতে তিন চার ঘণ্টা ঘুম আর বাকি সব সময় পড়া, রিভিশন দিতে লাগলাম। সোশ্যাল মিডিয়া থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে নিলাম। পরীক্ষা এসে গেলো জানুয়ারি তে। এক রাতের কালীপূজার মত একটা পরীক্ষা জীবনের পরবর্তী গন্তব্য নির্ধারণ করবে। পরীক্ষা দিলাম হলো আগের দুবারের চেয়ে ভালোই। রেজাল্ট যেদিন বেরোলো স্কোর দেখে বুঝলাম না আর গ্রামে যেতে হবে না। আমার লড়াই বিফলে যায়নি।
 কাউন্সেলিংয়ের ধাপ উত্তীর্ণ হয়ে শেষে নিজের মনোমত কলেজে পছন্দমত সাবজেক্ট নিয়ে ভর্তি হলাম। দেখা যাক এর পর কি হয়! সুপার স্পেশালিটি নিয়ে পড়তে পারি কিনা!! একটা কথা সব সময় মাথায় রাখি, কঠোর পরিশ্রমের কোনো বিকল্প নেই। দেরিতে হলেও সাকসেস আসতে বাধ্য। 
         "এই জীবনের পথ সোজা নয় যেন,
                  বড়ো আঁকাবাঁকা বন্ধুর।।"
এই কথা গুলো মাথায় রেখে চলার চেষ্টা করি। স্বপ্ন দেখি হয়তো কোনো একদিন কোনো স্টেজ দাড়িয়ে আমিও কাউকে অনুপ্রেরণা মূলক কথা বলবো, লড়াইতে জেতার আদর্শ পথের দিশা হয়তো বা দেখাতে পারবো।

সত্য ঘটনা অবলম্বনে

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

মঙ্গলবার, ১৫ মার্চ, ২০২২

বেঙ্গলি কালচার

বেঙ্গলি কালচার
 
✍️ডা: অরুণিমা দাস



বাঙালি সংস্কৃতি বলতে সাধারণত বোঝানো হয় বিশেষ সমাজের সাহিত্য, সংগীত, ললিত কলা, ক্রিড়া, মানবিকতা, জ্ঞানের উৎকর্ষ ও আরো অনেক শান্তি ও সৌন্দর্যের সমাহার। এর পরও ব্যাপক দৃষ্টিতে দেখলে সংস্কৃতি হলো মানুষের জ্ঞান, আচার-আচরণ, বিশ্বাস, রীতিনীতি, নীতিবোধ, চিরাচরিত প্রথা, সমষ্টিগত মনোভাব, সামাজিক প্রতিষ্ঠান এবং অর্জিত কীর্তিসমূহ। নৃতাত্ত্বিক দিক দিয়ে সংস্কৃতি আবার ভিন্ন ধরনের একটি জটিল ধারণা। যেহেতু সব সংস্কৃতিই উৎস, বিকাশ, মূল্যবোধ এবং সংগঠনের দিক দিয়ে বিশিষ্ট, তাই বাহ্যিক রূপরেখা, তার বিবিধ প্রকাশ এবং নির্যাসে এক সংস্কৃতি অন্য সংস্কৃতি থেকে যথেষ্ঠ পৃথক। হাজার হাজার বছর ধরে নানা নৃতাত্ত্বিক এবং ধর্মীয় গোষ্ঠী ও শাখা-গোষ্ঠী, নানা শ্রেণির মিলন, পারস্পরিক প্রভাব এবং সমন্বয়ের ফলে গড়ে উঠেছে বঙ্গীয় সংস্কৃতি। বহু শতাব্দী ধরে সংস্কৃতির বিভিন্ন, এমনকি, পরস্পর-বিরোধী উপাদানের সহাবস্থান এবং সমন্বয়ের ফলে বঙ্গীয় অঞ্চলে বাঙালিত্বের এমন এক বৈশিষ্ট্য গড়ে উঠেছে যাকে বলা যায় বঙ্গীয় সংস্কৃতি এবং এক কথায় বলা যায় বঙ্গদেশ ও বাংলাভাষীদের সংস্কৃতি।
বাঙালি সংস্কৃতির ভিত্তি  বঙ্গীয় সংস্কৃতি যেহেতু বাংলাদেশ এবং বাংলাভাষীদের সংস্কৃতি, সে কারণে ‘বাঙ্গালা’ নামে একটি স্বতন্ত্র অঞ্চল গড়ে ওঠার আগে অথবা বাংলা ভাষা পুরোপুরি বঙ্গীয় বৈশিষ্ট্য লাভ করার আগেকার আঞ্চলিক সংস্কৃতিকে বাঙালি সংস্কৃতি বলে অন্তত তত্ত্বগতভাবে আখ্যায়িত করা যায় না। আবার এও স্বীকার্য যে,সুলতানি আমলের বাঙ্গালা রাজ্য অথবা বাংলা ভাষা গড়ে ওঠার মুহূর্ত থেকে বাঙালি সংস্কৃতির জন্ম হয়নি। বঙ্গীয় সংস্কৃতির ভিত্তি গড়ে উঠেছিলো আরো অনেক আগে থেকে।
বাঙ্গালা নামে পরিচিত এই বিরাট এলাকায় ছিলো অনেকগুলি রাজ্য-গৌড়, রাঢ়, দক্ষিণ রাঢ়, সুহ্ম, বরেন্দ্রী,সমতট এবং বঙ্গ। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে আরও ছোটোখাটো রাজ্য ছিল। ১৩৫০-এর দশকে গৌড়ের সুলতান শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ সোনারগাঁ জয় করে ‘শাহ-ই বাঙালিয়ান’ অর্থাৎ বাঙালিদের শাহ উপাধি গ্রহণ করেন। বৃহত্তর ‘বাঙ্গালা’র জন্ম তার আগে হয়নি। অন্য দিকে, বাংলা ভাষাও আবার মোটামুটি ওই সময়েই নিজের বৈশিষ্ট্য অর্জন করে স্বতন্ত্র ভাষার রূপ লাভ করে। দুদিক থেকেই বিবেচনা করলে বঙ্গীয় সংস্কৃতির বয়স তাই আটশো অথবা বড় জোর এক হাজার বছর। এর চেয়ে একে পুরানো বলে গণ্য করা যায় না। কিন্তু এই সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল এই অঞ্চলের হাজার হাজার বছরের পুরানো সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ওপর ভিত্তি করে। একটা দৃষ্টান্ত দিয়ে বলা যায় যে, খাদ্যাভ্যাসের কারণে বাঙালিদের নাম ‘ভেতো’ বাঙালি। আর্য অথবা মুসলমানরা এ দেশে ধান আনেননি, ধানের চাষ এ অঞ্চলে আরম্ভ হয়েছিল অন্তত পাঁচ হাজার বছর আগে। পরে কখনো আর্য, কখনো সেন, কখনো তুর্কি, কখনো আফগান, কখনো মোগল এবং সবশেষে ইংরেজরা বঙ্গভূমি দখল করেছেন, তবু বাঙালিদের ভাত খাওয়ার অভ্যাসে পরিবর্তন হয়নি। ভাত বাঙ্গালীর একটি সাংস্কৃতিক ভিত্তি।
বঙ্গীয় সংস্কৃতির স্বাতন্ত্র্যের কারণ ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যান্য সংস্কৃতির সঙ্গে যথেষ্ট মিল থাকলেও,বঙ্গভূমির ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য এবং বিবিধ নৃতাত্ত্বিক সংমিশ্রণের ফলে এর সংস্কৃতি নিজস্বতা লাভ করেছে। এর অবস্থান দীর্ঘদিনের শাসনকেন্দ্র দিল্লি থেকে শত শত মাইল দূরে ভারতীয় উপমহাদেশের একেবারে এক প্রান্তে। ধর্ম, দর্শন ও ধারণা, সাংস্কৃতিক ধারা ও শাসনকাঠামো - যা কিছু এই প্রান্তিক ভূখন্ডে এসে পৌঁছেছে, তা-ই অল্পকালের মধ্যে বঙ্গীয় চরিত্র দিয়ে প্রভাবিত হয়েছে। তদুপরি জালের মতো বিস্তৃত নদী-শাখা নদী এবং বনভূমি-পরিপূর্ণ বঙ্গদেশ আবার বহু ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে, ফলে এসব অঞ্চলেও সংস্কৃতি খানিকটা স্বাতন্ত্র্য লাভ করেছেন। এসব উপ-সংস্কৃতিও জাতি, ধর্ম, বর্ণ, এবং বহু উপভাষার কারণে বৈশিষ্ট্যমন্ডিত।
বৈদিক,বৌদ্ধ, জৈন এবং ইসলাম ধর্মের মতো প্রধান প্রধান ধর্মের উৎপত্তি-স্থান থেকে বঙ্গভূমি বহু দূরে অবস্থিত,সে কারণে এই সব ধর্মের কোনোটাই তার আদি এবং অকৃত্রিম রূপে এ অঞ্চলে পৌঁছায়নি। তদুপরি, এসব বহিরাগত ধর্মের সঙ্গে স্থানীয় ধর্মীয় বিশ্বাস এবং আচারের সমন্বয় ঘটেছে। এভাবে বঙ্গদেশের হিন্দু, বৌদ্ধ,জৈন এবং ইসলাম ধর্ম যেমন বঙ্গীয় বৈশিষ্ট্যপূর্ণ তেমনি বিভিন্ন ধর্মের অনুসারীদের মধ্যেও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান এবং সামাজিক রীতিনীতির কিছু মিল লক্ষ করা যায়। সপ্তম শতাব্দীতে চীনা পর্যটক হিউয়েন সাং লিখেছেন যে,তিনি বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী স্থানীয় লোকদের ধর্মীয় দর্শন,আচার-আচরণ এবং সামাজিক রীতিনীতিতে অনেক সাদৃশ্য দেখেছেন। তিনি আরও লক্ষ করেন যে,বঙ্গীয় বৌদ্ধধর্ম মূল বৌদ্ধধর্ম থেকে অনেকটাই আলাদা।
বসতি এবং নৃতত্ত্ব পশ্চিম, উত্তর এবং মধ্যবঙ্গের তুলনামূকভাবে উঁচু এলাকা ছাড়া প্রাচীন বঙ্গভূমির অন্যান্য এলাকায় লোকবসতি ছিল খুব কম। মনে হয়,এখন যেমন জনবসতির একক হিসেবে হাজার হাজার গ্রাম গড়ে উঠেছে, সুলতানি আমলের আগে তা তেমন সংখ্যায় গড়ে ওঠেনি। দশম শতাব্দী থেকে রচিত বাংলা ভাষার আদি নিদর্শন চর্যাপদে গ্রামের কোনো উল্লেখ নেই। নিরাপত্তা এবং উৎপাদনের জন্যে লোকেরা তখন বোধ হয় ‘পুরী’ এবং ‘নগরে’ বাস করতেন। বসতির এই বৈশিষ্ট্য উপ-নাগরিক সামন্ততান্ত্রিক সংস্কৃতি গড়ে ওঠার সম্ভবত প্রধান কারণ ছিল। আর নৃতাত্ত্বিক দিক দিয়ে বেশির ভাগ বাঙালিই অস্ট্রো-এশিয়াটিক, কিন্তু দ্রাবিড় গোষ্ঠীও এর মধ্যে মিশিছে। এই দুটি প্রধান নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী ছাড়া, বাঙালিদের মধ্যে তিববতী-চীনা এবং সেমেটিক রক্তেরও সংমিশ্রণ ঘটেছে।
সামাজিক গঠন বাঙালি সমাজ আগাগোড়াই পিতৃতান্ত্রিক এবং সোপানভিত্তিক। আর্যরা বঙ্গদেশে আসার আগে পর্যন্ত সামাজিক কাঠামো ঠিক কেমন ছিলো তা জানা না-গেলেও প্রাক-আর্যযুগে জাতিভেদ প্রথা ছিলো বলে মনে হয় না। অপর পক্ষে, আর্যরা যে বৈদিক ধর্ম নিয়ে এসেছিলেন, তাতে জাতিভেদ এবং বর্ণভেদ অনুযায়ী গোটা সমাজ চারটি স্তরে বিন্যস্ত ছিলো। এগুলো হলো ব্রাহ্মণ,ক্ষত্রিয়, বৈশ্য এবং শূদ্র। ব্রাহ্মণদের সংখ্যা কম হলেও, তাঁরাই ছিলেন সমাজে সবচেয়ে শ্রদ্ধেয় এবং প্রভাবশালী আর সমাজের বিরাট সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ।শূদ্ররা ছিলেন সবচেয়ে নিচের তলায় অবস্থিত এবং সবচেয়ে অবহেলিত ও শোষিত। দারুণ বৈষম্যকারী এই বর্ণভেদ প্রথা কেবল ধর্মের দিক দিয়েই বৈষম্য সৃষ্টি করেনি, বরং এ ছিল সামাজিক এবং অর্থনৈতিক বৈষম্যের ধর্মের বিধিবদ্ধ স্থায়ী ব্যবস্থা। বর্ণভেদ প্রথা কার্যত শ্রেণিভেদ প্রথা ছাড়া অন্য কিছু নয়। তা সত্ত্বেও জাতিভেদ-প্রথা সমাজের নিচের তলার লোকেরা নিজেদের মধ্যে কঠোরভাবে পালন করতেন না।
জাতিভেদ প্রথা বর্ণভেদেরই বহিঃপ্রকাশ। এই প্রথা অনুযায়ী শূদ্ররা অস্পৃশ্য। ক্ষত্রিয়দের সংখ্যা বঙ্গদেশে খুব কম ছিল। বৈশ্য এবং অন্য কোনো কোনো গোষ্ঠীর হিন্দুদের দিয়ে পরে তৈরি হয় কায়স্থ সম্প্রদায়। এ ছাড়া বৈদ্য সম্প্রদায় হলেন চিকিৎসা পেশার সঙ্গে জড়িত। তত্ত্বগতভাবে বৌদ্ধ এবং মুসলমানদের মধ্যে কোনো জাতিভেদ প্রথা থাকার কথা নয়, কিন্তু বঙ্গদেশে এসে তাঁরাও এই প্রথা দিয়ে প্রভাবিত হন এবং এক ধরনের জাতিভেদ প্রথার মধ্যে পড়ে যান। 
 মুসলমানরা আসার পর বর্ণহিন্দুরা সাধারণ মুসলমানদেরও গণ্য করতেন শূদ্রদের মতো। মুসলমানরা নিজেরা তাঁদের সমাজকে বিভক্ত করেন আশরাফ এবং আতরাফ এই দুই ভাগে। আতরাফ ছিলেন প্রধানত দেশীয় এবং নিম্নশ্রেণির মুসলমানরা। এই শ্রেণিভেদ প্রথা দিয়ে মুসলমানরা এতোটাই প্রভাবিত হয়েছিলেন যে,তাঁরা মসজিদেও এটা বজায় রাখেন সেখানে সুলতান এবং তাঁর ঘনিষ্ঠজনদের জন্যে থাকতো উঁচু আসন। এ ছাড়া
আশরাফ এবং আতরাফদের মধ্যে বিবাহ হতো না, অথবা তাঁরা একত্রে ভোজনও করতেন না। বঙ্গসমাজের শতকরা আশি ভাগ অথবা তারও বেশি শূদ্র এবং গ্রামের মুসলমান। তাঁরাই ছিলেন উৎপাদন ব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি জড়িত - চাষী, শ্রমিক এবং নাপিত,জেলে, ছুতোর এবং জোলাদের মতো পেশাদার দক্ষ শ্রমিক।
মধ্যযুগে পরিবারগুলো একক পরিবার ছিল না, যদিও পরিবারের আয়তন ছিলো ছোট। উনিশ শতকের গোড়া থেকে হিন্দুদের মধ্যে একান্নবর্তী পরিবার গড়ে উঠতে থাকে বিশেষ করে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত এবং ছোট-বড় জমিদার পরিবারে। জমির মালিকদের মধ্যে এই প্রথা সম্ভবত গড়ে উঠেছিল ১৭৯৩ সালে প্রণীত চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের অন্যতম ফলাফল হিসেবে।
ধর্ম এবং বিশ্বাস খ্রিস্টের জন্মের কয়েক শতাব্দী আগে মোটামুটি একই সময়ে বৈদিক এবং বৌদ্ধধর্ম বঙ্গদেশে পৌছেছিল। তারপর এই দুই ধর্ম স্থানীয় ধর্ম ও বিশ্বাসসমূহকে প্রভাবিত করে। চন্দ্রকেতুগড়ের প্রত্নতাত্ত্বিক ভগ্নাবশেষ থেকে মনে হয় হিন্দু রাজারা দক্ষিণ-পশ্চিম বঙ্গ অর্থাৎ দক্ষিণ রাঢ়ে খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয়/দ্বিতীয় শতাব্দীর মধ্যে নিজেদের বেশ শক্ত ভিত্তির ওপর স্থাপিত করেন। অপরপক্ষে,আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দী থেকে গড়ে ওঠা মহাস্থানগড়ের ভগ্নাবশেষ দেখে মনে হয় বৌদ্ধরা তখনই পুন্ড্রবর্ধন অর্থাৎ উত্তরবঙ্গে বেশ বড়ো রকমের বসতি স্থাপন করেছিলেন। এই দুই ধর্ম এতো প্রবল ছিল যে, এদের প্রভাবে স্থানীয় ধর্মগুলো ধীরে ধীরে প্রায় লোপ পায়। তবে এই দুই ধর্মকেও স্থানীয় ধর্ম এবং আচার-আচারণ যথেষ্ট প্রভাবিত করে। যেমন বৈদিক ধর্মে স্থানীয় অনেক দেবদেবী ঢুকে পড়েন, যাঁদের অস্তিত্ব মূল বৈদিক ধর্মে ছিল না।
বঙ্গদেশের সবচেয়ে পুরানো যে রাজার কথা নিশ্চিতভাবে জানা যায়, তাঁর নাম শশাঙ্ক। সপ্তম শতাব্দীর এই রাজা ছিলেন হিন্দু। অপর পক্ষে, বৌদ্ধ পাল-রাজাদের রাজত্ব আরম্ভ হয় পরের শতাব্দীতে।শশাঙ্ক কেবল হিন্দুধর্মের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন না,তিনি বৌদ্ধদের ওপর নির্যাতন চালিয়েছিলেন। পাল রাজারা কয়েক শতাব্দী ধরে বৌদ্ধধর্মের পৃষ্ঠপোষণা করলেও, হিন্দুদের ওপর নিপীড়ন করেছিলেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায় না। পালদের পর যে সেন বংশ ক্ষমতায় বসেন, তাঁরা ছিলেন হিন্দুধর্মের উৎসাহী পৃষ্ঠপোষক। বৌদ্ধরা তাঁদের আমলে নির্যাতিত হয়েছিলেন বলে প্রমাণ রয়েছে। তাঁদের শাসনকালে বৌদ্ধ ধর্ম তার গৌরব হারায় এবং বৌদ্ধদের সংখ্যা দ্রুত হ্রাস পায়। সেনরা, তদুপরি, বর্ণভেদ প্রথাকে কঠোরভাবে প্রচলিত করেন এবং সংস্কৃত শাস্ত্র ও সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষণা করেন।
১২০৪ সালে লক্ষ্মণসেনকে পরাজিত করে বখতিয়ার খলজী মুসলিম শাসন প্রবর্তন করলে পরিবর্তনের আরও একটা ঢেউ আসে। খলজীর পরপর বঙ্গভূমিতে এসেছিলেন অনেক মুসলমান ধর্মপ্রচারক। অংশত সুলতানের সহায়তা নিয়ে তাঁরা স্থানীয় লোকদের ইসলাম ধর্মে দীক্ষা দেওয়ার কাজ উৎসাহের সঙ্গে আরম্ভ করেন। প্রথম দুইশত বছরে ইসলামে দীক্ষা দেওয়ার কাজ কতোটা সাফল্য লাভ করেছিল, তা পরিষ্কার জানা না গেলেও এ সময়ে বৌদ্ধদের সংখ্যা খুবই হ্রাস পায় এবং হিন্দুদের মন্দির নির্মাণের কাজ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। সেনরা যে বর্ণভেদ প্রথা জোরালোভাবে চালু করেছিলেন, তার অত্যাচার থেকে রক্ষা পাওয়ার উদ্দেশে বৌদ্ধরা একযোগে ইসলামে দীক্ষা নিয়েছিলেন কিনা, তা অনুমানের বিষয়। তাছাড়া, নিম্নবর্ণের হিন্দুরাও ব্যাপক সংখ্যায় ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন বলে মনে হয়। শক্তি প্রয়োগ করে ইসলাম ধর্মে দীক্ষা দেওয়ার বহু প্রমাণ থাকলেও, অন্তত তত্ত্বগতভাবে ইসলাম ধর্মে যে-সামাজিক সাম্যের কথা বলা হয়েছে, তা বহু সংখ্যক দীক্ষার কারণ হতে পারে।
এর পরবর্তী কয়েক শতাব্দীতে বঙ্গভূমিতে ইসলাম ধর্মের যথেষ্ট বিবর্তন হয়। পারস্য থেকে আসা পীর/দরবেশরা যে-ভক্তিবাদী ইসলাম ধর্ম প্রচার করেছিলেন, স্থানীয় লোকেরা তা দিয়ে আকৃষ্ট হয়েছিলেন। অপরপক্ষে, আরব ধর্মপ্রচারকরা নিয়ে এসেছিলেন মৌলবাদী ইসলাম, যা স্থানীয় লোকেদের আকৃষ্ট করেনি। সতেরো শতক নাগাদ বঙ্গীয় ইসলাম আগেকার বৌদ্ধ এবং হিন্দু ধর্মের মতোই একটা স্থানীয় সমন্বয়ী ধর্মের রূপ লাভ করে এবং সমাজের নিচের তলার লোকেরা এই বঙ্গীয় ইসলাম দিয়েই প্রভাবিত হন।
ইসলাম ধর্মের এই আক্রমণের মুখে হিন্দু ধর্মের মধ্যেও সংস্কার চলতে থাকে। যেমন, দেবীবর ঘটক হিন্দু ধর্মের পবিত্রতা রক্ষার উদ্দেশে বর্ণপ্রথার নিয়মগুলো আরও দৃঢ়ভাবে চালু করতে চেষ্টা করেন। কিন্তু সময়ের ধারা বইছিলো উল্টো খাতে। এই পরিস্থিতিতে ষোলো শতকের গোড়ায় চৈতন্যদেব (১৪৮৬-১৫৩৩) ভক্তি এবং প্রেমের আদর্শের ওপর স্থাপিত বৈষ্ণব ধর্ম প্রচার করেন। যে জাতিভেদ প্রথা সমাজকে স্থায়ী শ্রেণীতে বিভক্ত করেছিলো এবং যা ছিলো সামাজিক নির্যাতনের প্রধান হাতিয়ার, চৈতন্যদেব তাকে পুরোপুরি অস্বীকার করেন। এই ধর্ম কেবল হিন্দু ধর্মকে ইসলামের আক্রমণ থেকে রক্ষা করেনি, বরং পরবর্তী দু শতাব্দী ধরে বৈষ্ণব ও সামগ্রিকভাবে হিন্দু ধর্মচর্চায় নতুন জোয়ার এনেছিল। তাছাড়া এর প্রভাবে সহজিয়া,বাউল এবং কর্তা-ভজার মতো ভক্তিবাদী সম্প্রদায়ও জন্ম দেয়। এসব সম্প্রদায় প্রথমেই জাতিভেদকে অস্বীকার করে। তদুপরি এরা বিধিবদ্ধ ধর্মের চেয়ে গুরুভক্তি এবং নামহীন এক দেবতার ভজনাকে গুরুত্ব দেয়। বঙ্গভূমির বিচিত্র ধর্মগুলোর মধ্যে যদি কোনো মিল থেকে থাকে, তা হলো এই গোঁড়ামিবর্জিত নমনীয়তা এবং সমন্বয়ধর্মী ভক্তিবাদ।

ভাষা বাংলা ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা গোষ্ঠীর অন্যতম ভাষা। এ ভাষা বঙ্গভূমির আদি ভাষা ছিল না। তখন বিভিন্ন অঞ্চলের আদিবাসীদের মধ্যে বিভিন্ন ভাষা প্রচলিত ছিলো। আর্যরা সঙ্গে নিয়ে আসেন পূর্বাঞ্চলের প্রাকৃত ভাষা। বৌদ্ধরা এনেছিলেন পালি ভাষা, যা প্রাকৃতের মতো সংস্কৃত ভাষারই একটি মৌখিক রূপ। বহু শতাব্দী ধরে উচ্চারণ ও ব্যাকরণগত বিবর্তনের মধ্য দিয়ে এই প্রাকৃত থেকে বাংলা ভাষা স্বতন্ত্র রূপ লাভ করে। এই ভাষার আদি রূপ খানিকটা পাওয়া যায় দশম শতাব্দী থেকে রচিত চর্যাপদে। তবে বাংলা ভাষা তখনও একেবারে আলাদা ভাষা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেনি, মিশে ছিলো অহমিয়া এবং ওড়িয়া ভাষার সঙ্গে। তাই সঠিকভাবে বললে বলতে হয়, চর্যাপদে যে-বাংলা দেখা যায়, তা প্রাক্-বাংলা। আনুমানিক পনেরো শতকে রচিত শ্রীকৃষ্ণকীর্তন খাঁটি বাংলা ভাষার আদিতম নিদর্শন। মধ্যযুগের অন্যান্য কাব্য থেকেও সেকালের ভাষার আভাস পাওয়া যায় - যদিও এসব কাব্যের আদি পাঠ পাওয়া যায় না। এসব কাব্যের যে পান্ডুলিপি এ পর্যন্ত পাওয়া গেছে, সেগুলো মূল কাব্য রচিত হওয়ার অনেককাল পরের প্রতিলিপি। অপরপক্ষে, সেকালের গদ্যের কোনো নমুনাই বলতে গেলে পাওয়া যায় না।
বাংলা ভাষা যেহেতু সংস্কৃত ভাষার মৌখিক রূপ প্রাকৃত থেকে উৎপন্ন, সে কারণে এ ভাষার শব্দাবলীর প্রধান ভাগই হয় সংস্কৃত, নয়তো সংস্কৃত শব্দের বিবর্তিত রূপ (যেমন চন্দ্র থেকে চাঁদ)। তবে এ অঞ্চলের আদি ভাষাগুলোর কিছু শব্দও বাংলায় রয়ে গেছে (যেমন চাউল, ঢেঁকি)। স্থানীয় ভাষার কিছু বৈশিষ্ট্যও বহিরাগত বাংলাকে প্রভাবিত করেছে (যেমন, কোনো কোনো ক্রিয়া-বিভক্তিতে)। মুসলিম শাসন বাংলা ভাষাকে প্রভাবিত করেছিলো দুভাবে। প্রথমত, এ সময়ে বাংলা ভাষায় হাজার হাজার আরবি-ফারসি শব্দ ঢুকে পড়ে। দ্বিতীয়ত, যে বাংলাকে সেনরা অবহেলা করেছেন এবং ব্রাহ্মণরা ঘৃণা করেছেন, সুলতানরা পনেরো শতক থেকে তারই পৃষ্ঠপোষণা করতে আরম্ভ করেন। সতেরো/আঠারো শতকে কিছু পর্তুগিজ শব্দও বাংলা ভাষায় এসে যায় (যেমন  আনানাস)। বিদেশী ভাষার ঢেউ আর একবার বাংলা ভাষায় লাগে ব্রিটিশ রাজত্ব স্থাপিত হওয়ার পর। সেই সুবাদে এখন বাংলায় কয়েক হাজার ইংরেজি শব্দ প্রতিদিনের শব্দে পরিণত হয়েছে। বাক্য-গঠনে এবং যতিচিহ্নেও (যেমন কমা, সেমিকোলোন, আশ্চর্যবোধক চিহ্ন) ইংরেজির প্রভাব রয়েছে। এ ছাড়া, স্থানীয় ভাষা বাংলার চর্চা বাড়িয়ে আইন-আদালতের ভাষা ফারসিকে সরিয়ে দেওয়া যায় কিনা, তারও চেষ্টা ইংরেজ প্রশাসন করেছিল আঠারো শতকের শেষ কয়েক দশক ধরে। বাঙালি সংস্কৃতির অন্যান্য দিকের মতো বাংলা ভাষাও নমনীয় এবং সমন্বয়ধর্মী। ছাপাখানা প্রবর্তিত হওয়ার পর এবং নতুন ধরনের লেখ্য সংস্কৃতির প্রভাবে আঠারো শতকের দ্বিতীয় ভাগ থেকে বাংলা গদ্যচর্চা আগের তুলনায় অনেকটাই বৃদ্ধি পায়।
সাহিত্য চর্যাপদকে বাংলার নিদর্শন হিসেবে গণ্য করলে বাংলা সাহিত্যের ঐশ্বর্যমন্ডিত ঐতিহ্য প্রায় হাজার বছরের। অন্যান্য ভাষার সাহিত্যের মতো বাংলাও তার যাত্রা শুরু করেছিল ধর্মীয় কাব্য দিয়ে, আরও সঠিক করে বললে, ভক্তিবাদী গান দিয়ে। চর্যাপদ থেকে আরম্ভ করে মধ্যযুগের বিশাল সাহিত্যভান্ডার- এর প্রায় সবটাই হলো ঈশ্বরমুখী এবং এর মধ্যে ছিলো বৌদ্ধ, হিন্দু এবং মুসলমানদের ধর্মীয় সাহিত্য। ব্যতিক্রম দেখা যায় শাহ মুহাম্মদ সগীর,দৌলত কাজী এবং আলাওলের কিছু রোমান্টিক কাব্যে। হিন্দু কবিরা তাঁদের রোমান্টিক অনুভূতি, আবেগ এবং অভিজ্ঞতা প্রকাশ করেছিলেন রূপকের মাধ্যমে কেবল রাধাকৃষ্ণের প্রেমের কাহিনী নিয়ে রচিত বৈষ্ণব সাহিত্য। বস্তুতঃ উনিশ শতকের আগে পর্যন্ত বাঙালি কবিরা তাঁদের নিজেদের ‘মনের কথা’ বলতে গেলে প্রকাশই করেননি।
মধ্যযুগে সুফিবাদের মতো ভক্তিবাদী দর্শনের উদ্ভব এবং বৈষ্ণব, সহজিয়া, বাউল, কর্তাভজা ও সখীভাবকের মতো ধর্মীয় সম্প্রদায় আত্মপ্রকাশ করার পর সত্যপীর/সত্যনারায়ণ এবং দক্ষিণ রায়/বড় খান গাজীর মতো লৌকিক দেবতার দেখা মেলে। এবং সাহিত্যেও একটা সমন্বয়বাদী ধারার সৃষ্টি হয়। এই সাহিত্য ছিল বাঙালিত্বের ধারণাপুষ্ট। এ রকম এক অর্থে ধর্মনিরপেক্ষ ধর্ম এর আগে কখনও বঙ্গীয় সমাজে ছিল না। এই ক্রান্তিলগ্নে দেব-দেবীরাও মানুষের বেশে দেখা দিতে আরম্ভ করেন।
এরপর উনিশ শতকে ইংরেজি সাহিত্যের প্রভাবে বাঙালি কবি এবং লেখকরা মানবতা এবং নিজেদের ব্যক্তিগত আবেগ ও অনুভূতিকে তাঁদের লেখার মাধ্যমে প্রকাশ করতে আরম্ভ করেন। এই নতুন সাহিত্য ঈশ্বরমুখী নয়, মানবমুখী। সাহিত্যের বিষয়বস্ত্ত এবং মূল ভাবধারাই এ সময়ে বদলে যায়। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এটা একটা যুগান্তর। প্রকৃত পক্ষে, এই মানববাদী নতুন সাহিত্য দিয়েই বঙ্গীয় রেনেসাঁর সূচনা হয়। এতে বিরাট অবদান রেখেছেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, মাইকেল মধুসূুদন দত্ত, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। হিন্দু পুরাণভিত্তিক সাহিত্য নতুন করে লেখার সময়ে প্রথম দুজন তাদের পুনর্ব্যাখ্যা দান করেন এবং এই পুরাণের দেবদেবীকে মানুষে পরিণত করেন আর শেষের দুজন একই কাজ করেন, তবে একটু ভিন্ন রীতিতে।
আনুষ্ঠানিক শিক্ষা-ব্যবস্থার বিকাশ এবং ছাপাখানার প্রতিষ্ঠার ফলে বাংলা সাহিত্যে সৃজনশীলতার এমন স্ফূরণ ঘটে যে, যা এর আগে কখনো এমন ব্যাপকভাবে ঘটেনি। তবে এও সত্য যে, এই মুদ্রিত সাহিত্যের বিকাশ ঘটার ফলে মধ্যযুগে যে লোকসাহিত্য এবং মৌখিক সাহিত্যের শ্রীবৃদ্ধি হয়েছিলো, সেই ধারা দ্রুত শুকিয়ে আসে। তদুপরি, হিন্দু এবং মুসলমানদের মধ্যে নাগরিক সাহিত্যের বিকাশ ঘটে অসমানভাবে, কারণ মুসলমানরা হিন্দুদের তুলনায় ইংরেজি এবং বাংলা - উভয় শিক্ষায় অনেকটাই পিছিয়ে ছিলেন। তবে উনিশ শতকের শেষ দিক থেকে এই দু্ই সম্প্রদায়ের মধ্যে ব্যবধান ক্রমশ কমে আসতে আরম্ভ করে কারণ তখন থেকে আরম্ভ করে বিশ শতকের প্রথম কয়েক দশকের মধ্যে অনেক মুসলমান সাহিত্যিক আত্মপ্রকাশ করেন। এঁদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিলেন মীর মোশরাররফ হোসেন, নজরুল ইসলাম এবং জসীমউদ্দীন।
সাহিত্যে আরেকটি ঐতিহাসিক বিকাশ লক্ষ করা যায় তার আঙ্গিকের ক্ষেত্রে। মধ্যযুগে রচিত হয়েছিল কেবল আখ্যানমূলক কাব্য, কিন্তু উনিশ শতকে ইংরেজি সাহিত্য থেকে নতুন আঙ্গিক নিয়ে লেখা হয় মহাকাব্য,পত্রকাব্য,সনেট, খন্ড কবিতা, নাটক, উপন্যাস, ছোটগল্প এবং প্রবন্ধ। আর বিশ শতকে এসে বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথের হাতে আরও উন্নতমানের সাহিত্য রচিত হয় এবং তা বিশ্বমানের মর্যাদা লাভ করে।
নগরায়ণ এবং নাগরিক সাহিত্য বিকাশ লাভ করায়, লোকসাহিত্য একদিকে যেমন ক্ষয়িষ্ণুতার দিকে এগিয়ে যায়, তেমনি রবীন্দ্রনাথ, দীনেশচন্দ্র সেন এবং অন্যান্য উৎসাহী গবেষকদের সম্মিলিত চেষ্টার ফলে তা আবার লিখিত আকারে সংগৃহীত হয় এবং ব্যাপকতর পাঠকদের কাছে পৌঁছে যায়। ফলে লোকসাহিত্য ও লোকসঙ্গীত কতোটা ঐশ্বর্যমন্ডিত এবং সুন্দর, শহরের শিক্ষিত পাঠকরা ও শ্রোতারা তা অনুভব করেন।
বঙ্গীয় সমাজ প্রধানত গ্রামীণ বলে উপনিবেশিক আমলের মাঝামাঝি কাল পর্যন্ত বাংলা সাহিত্য খানিকটা সংস্কৃত এবং ফারসি সাহিত্য দিয়ে প্রভাবিত হলেও তা ছিল মূলত লৌকিক। ইংরেজি শিক্ষা এবং সাহিত্যই একে নাগরিক চরিত্র দান করে। তা সত্ত্বেও লোকসাহিত্যের প্রভাব একটু দুর্বলভাবে হলেও উনিশ ও বিশ শতকেও অব্যাহত থাকে। নাগরিক সম্প্রদায়ের শিকড়ও গভীরভাবে গ্রামে প্রোথিত হওয়ায়, বাংলা সাহিত্যে গ্রামের দিকে ফিরে তাকানোর একটা প্রবণতা লক্ষ করা যায়। যেমন জীবনানন্দ দাশ এবং বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় অথবা জসীমউদ্দীন এবং আল-মাহমুদের রচনায় বারবার গ্রাম ফিরে আসে নানা রূপে। এখনকার অসংখ্য উপন্যাস এবং নাটকেও গ্রামের দিকে ফিরে তাকানোর এই প্রবণতা লক্ষ করা যায়।
সঙ্গীত,নাটক,সিনেমা সাহিত্যের মতো বাংলা সঙ্গীতের উত্তরাধিকারও ঐশ্বর্যমন্ডিত। চর্যাপদ এবং মধ্যযুগের সাহিত্যের অনেকটাই ছিল আসলে গান। কোন রাগ এবং তালে গাইতে হবে প্রতিটি চর্যার (শ্রীকৃষ্ণকীর্তনেরও) শুরুতেই তা উল্লিখিত হয়েছে। গৌড় ও বঙ্গাল এবং আরও পরে ভাটিয়ালির মতো রাগসমূহের নাম থেকে বোঝা যায় যে বঙ্গভূমিতে সুবদ্ধ এবং লোকসঙ্গীতের নিজস্ব ধারা সেকালেই গড়ে উঠেছিল। বৈষ্ণব সঙ্গীতজ্ঞরা মধ্যযুগেই রাগ এবং লোকসঙ্গীতের সমন্বয় ঘটিয়ে বঙ্গের নিজস্ব ভক্তিবাদী কীর্তন গানের ধারা প্রবর্তন করেছিলেন এবং তাকে প্রামাণ্য রূপ দিয়েছিলেন। বঙ্গের আর আর-একটি বিশিষ্ট ভক্তিবাদী সঙ্গীতের ধারা হলো বাউল গান। এই বিশেষ শ্রেণির গানের একজন শ্রেষ্ঠ রচয়িতা এবং সুরকার ছিলেন লালন ফকির (১৭৭৪-১৮৯০)। বাউল গান তার সরলতা এবং সৌন্দর্যের জন্যে বিখ্যাত এবং এখন একুশ শতকের গোড়াতেও তার আবেদন হারিয়ে ফেলেনি। বাংলা সঙ্গীতের অন্যান্য ধারার মধ্যে আছে ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া, কবিগান, জারিগান ইত্যাদি। প্রথম দু ধরনের গান শহর এবং গ্রাম উভয় জায়গায় জনপ্রিয় আর শেষ দু ধারার গান গ্রামে খুবই জনপ্রিয়।
উনিশ শতকের গোড়ায় বঙ্গদেশে দু ধরনের সুবদ্ধ সঙ্গীতের সূচনা এবং বিকাশ লক্ষ করা যায়- টপ্পা ও আখড়াই এবং বাংলা ধ্রুপদ। তাছাড়া, এ সময়ে বাংলা সঙ্গীতের জগতে ইউরোপীয় বাদ্যযন্ত্র আসতে আরম্ভ করে, বিশেষ করে বেহালা এবং মাউথ অর্গান,যার সংক্ষিপ্ত রূপ হলো হারমোনিয়াম। বাংলা সাহিত্যের মতো বাংলা সঙ্গীতের ক্ষেত্রে উনিশ শতক থেকে আরম্ভ করে বিশ শতকের প্রথম ভাগ পর্যন্ত সৃজনশীলতার একটা স্ফূরণ ঘটে। এই সময়ে নিধু গুপ্ত, গিরিশচন্দ্র ঘোষ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, অতুলপ্রসাদ সেন এবং নজরুল ইসলামের মতো বিখ্যাত গীতিকার ও সুরকারের বিশাল অবদানে বাংলা গানের জগৎ সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে। বাঙালি সংস্কৃতির অন্যান্য শাখার মতো উনিশ শতকে যে গানের ধারা তৈরি হয়, তা ভারতীয় সঙ্গীত থেকে খানিকটা ভিন্ন এবং বঙ্গীয় বৈশিষ্ট্যমন্ডিত।
মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে বাদ্যযন্ত্রের বলতে গেলে কোনো উল্লেখ নেই। কিন্তু উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে বঙ্গদেশে নিজস্ব বাদ্যযন্ত্রীদের আবির্ভাব ঘটে। আর, বিশ শতকে বাদ্যযন্ত্রীদের সংখ্যাই কেবল বৃদ্ধি পায়নি, বরং আলাউদ্দীন খানের নেতৃত্বে আলি আকবর খান এবং রবিশঙ্করের মতো বিশ্বমানের শিল্পীদেরও বিকাশ ঘটে। বিশ শতকে কণ্ঠ শিল্পীরাও ‘রাগপ্রধান গান’ নামে সুবদ্ধ সঙ্গীতের একটি বিশিষ্ট ধারা গড়ে তোলেন। কিন্তু যে ধারার উদ্ভব এবং বিকাশ সবচেয়ে বেশি মাত্রায় ঘটে, তা হলো আধুনিক গান। এ গান আসলে রাগসঙ্গীত, লোকসঙ্গীত এবং পশ্চিমা সঙ্গীতের এক ধরনের সমন্বয়। এর আদি রচয়িতা রবীন্দ্রনাথ। তাঁর এসব গান রবীন্দ্রসঙ্গীত নামে বিখ্যাত এবং জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। নজরুল ইসলাম, পঙ্কজ মল্লিক, সলিল চৌধুরী এবং অন্যরা মিলে এই ধারায় নতুন নতুন বৈশিষ্ট্য নিয়ে আসেন। কিন্তু বেশির ভাগ আধুনিক গানেই রবীন্দ্রনাথ প্রবর্তিত দুটি বৈশিষ্ট্য কমবেশি অনুকরণ কর হয়। এই দুই বৈশিষ্ট্য হলো - গানের চারটি তুক বা সুরের স্তবক এবং কথার প্রাধান্য।
গীতগোবিন্দ এবং শ্রীকৃষ্ণকীর্তন থেকে মনে হয়, আদি-মধ্যযুগেও বঙ্গভূমিতে এক ধরনের সাঙ্গীতিক পালা প্রচলিত ছিলো। এ ছাড়া, সে সময়ে মুক্তমঞ্চ যাত্রাপালাও বিকাশ লাভ করতে থাকে। চৈতন্যদেব এ রকমের একটি পালায় অভিনয় করেছিলেন বলে জানা যায়। তার দু শতাব্দী পরে আঠারো শতকে যখন বাংলা গদ্য বিকাশ লাভ করতে থাকে, তখন যাত্রাপালায় কাহিনী এবং গদ্যসংলাপ বৃদ্ধি পায়। এর ফলে তাতে নাটকীয়তাও বাড়তে থাকে। বাঙালিরা আরও কতো কাল এই যাত্রা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতেন, তা অনুমানের বিষয়। কিন্তু ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি শাসন ভার নেওয়ার আগেই কলকাতায় একটি ইংরেজি থিয়েটার স্থাপিত হয়। কয়েক দশক পরে স্থাপিত হয় আরও বড় এবং আরও উন্নতমানের একটি থিয়েটার। এই দুই থিয়েটার বাঙালিদের জন্যে অনুকরণ করার মতো আদর্শ দান করে। গেরাশিম লেবেদফ নামে কলকাতায় বসবাসকারী একজন রুশ ভদ্রলোক বাঙালিদের উৎসাহ এবং চিন্তাকে আরও উস্কে দেন একটি ইংরেজি নাটক বাংলায় অনুবাদ করে বাঙালি অভিনেতা-অভিনেত্রীদের সাহায্যে ১৭৯৫ সালের শেষে এবং ১৭৯৬ সালের গোড়ার দিকে মঞ্চস্থ করার মাধ্যমে। এর জন্যে তিনি কলকাতায় একটি মঞ্চ নির্মাণ করিয়ে নিয়েছিলেন। ১৮৩০-এর দশকে প্রসন্নকুমার ঠাকুর এবং নবীন বসু যে একাধিক নাটক অথবা যাত্রা পালা নিজেদের মঞ্চে অভিনয় করিয়েছিলেন, লেবেদফের দৃষ্টান্ত তার পেছনে অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করা অসম্ভব নয়।
তবে ১৮৫২ সালের আগে বাংলা ভাষায় কোনো নাটক প্রকাশিত হয়নি। একবার নাটক রচনার ধারা শুরু হবার পরে পরবর্তী কয়েক বছরে আরও অনেকগুলো নাটক প্রকাশিত হয়েছিল। ইতোমধ্যে ১৮৫৭ সাল নাগাদ কলকাতায় ব্যক্তিগত উৎসাহে মঞ্চ নির্মাণ এবং তাতে নাটকের অভিনয় আরম্ভ হয়। প্রথম দিকে প্রধানত সামাজিক ও পৌরাণিক নাটক এবং প্রহসনের অভিনয় জনপ্রিয়তা অর্জন করে। এভাবে একাধিক মঞ্চে বেশ কয়েকটি নাটক ও প্রহসন সাফল্যের সঙ্গে অভিনীত হওয়ার পর শিক্ষিত সমাজ একটি সাধারণ মঞ্চ স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। শেষ পর্যন্ত ন্যাশনাল থিয়েটার নামে সেই মঞ্চ স্থাপিত হয় ১৮৭২ সালের ডিসেম্বর মাসে এবং সেখানে প্রথম অভিনীত হয় নীলচাষীদের ওপর অত্যাচারের কাহিনী নিয়ে রচিত দীনবন্ধু মিত্রের জনপ্রিয় নাটক নীলদর্পণ। তার কয়েক বছরের মধ্যে হিন্দু ন্যাশনাল থিয়েটার, গ্রেট ন্যাশনাল থিয়েটার এবং বেঙ্গল থিয়েটার নামে আরও কয়েকটি থিয়েটার গোষ্ঠী গড়ে ওঠে। সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী থিয়েটার ‘স্টার’ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৮৩ সালে। এর পেছনে সবচেয়ে বড়ো ভূমিকা ছিল সেকালের বিখ্যাত অভিনেতা ও নাট্যকার গিরিশচন্দ্র ঘোষ এবং বিখ্যাত অভিনেত্রী বিনোদিনী দাসীর।
বিশ শতকে আরও কয়েকটি নামকরা থিয়েটার প্রতিষ্ঠিত হয় এবং দেখা দেন শিশির ভাদুড়ী ও অহীন্দ্র চৌধুরীর মতো শক্তিশালী অভিনেতা। আর কিছু পরে যাত্রা শুরু হয় সিনেমা এবং টেলিভিশনের। বাংলা থিয়েটার এখনো বিশ্বমানের না হলেও, বিশেষ করে সত্যজিৎ রায়ের কয়েকটি চলচ্চিত্র সারা পৃথিবীতে খ্যাতি লাভ করেছে। সুযোগ এবং সুযোগ্য অভিনেতা-অভিনেত্রীদের অভাবে বাংলাদেশের সিনেমা-শিল্প অবশ্য অনেকটাই পিছিয়ে আছে। ১৯৪০ এর দশকে বহুরূপী নাট্যগোষ্ঠীর যাত্রা শুরু হওয়ার পর থেকে এবং নবান্ন নাটকের অভিনয় থেকে বাংলা থিয়েটার এবং নাটক উভয়েরই যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে। মুসলমান সমাজের বিরূপ মনোভাবের কারণে বাংলাদেশে নাটকের অভিনয় দীর্ঘকাল কোনো উৎসাহ পায়নি। কিন্তু স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের থিয়েটারে দ্রুত অগ্রগতি হয়েছে।
বহু শতাব্দী ধরে বাঙালি সংস্কৃতি পরিশীলিত এবং বৈদগ্ধ্য লাভ করে তা কেবল নাগরিক বৈশিষ্ট্য অর্জন করেনি, বরং একটা আন্তর্জাতিক চরিত্রও অর্জন করেছে। তা সত্ত্বেও সাধারণ বাঙালিরা মূলত লোক উপাদান দিয়ে মুগ্ধ হন। বাংলার লোকসাহিত্য, লোকসঙ্গীত, লোকনৃত্য, লোকনাট্য ইত্যাদির সঙ্গে ভক্তিবাদ বাঙালি মানসকে যথার্থভাবে প্রতিফলিত করে।
ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসন ও পরিবর্তনের জোয়ার  তেরো থেকে আঠারো শতকের মধ্যভাগ পর্যন্ত মুসলিম শাসনকে এক কথায় বলা যায় শাসকের পরিবর্তন- হিন্দুদের বদলে মুসলমানের। কিন্তু এর ফলে বাঙালি সমাজের সামন্ততান্ত্রিক কাঠামোয় তেমন কোনো মৌলিক পরিবর্তন আসেনি। ব্রিটিশ শাসনের সময়ে সেই সামন্ততন্ত্রের ভিত্তিতে নাড়া লাগে। ১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে প্রজাদের ওপর জমিদারদের পরোক্ষ শাসন বহাল থাকলেও, ব্যবসা-বাণিজ্য, নির্মাণ শিল্প, সেবামূলক শিল্পসহ অর্থনীতির সর্বত্রই দেখা দেয় পুঁজিবাদের প্রকাশ। এ সময়ে যে ব্যবসায়ী, ঋণদাতা এবং চাকুরিজীবী শ্রেণির উদ্ভব ঘটে তাও ঘটেছিল উপনিবেশিক শাসনের প্রয়োজনে।
স্থানীয় জনগণের প্রতি ভালোবাসা থেকে নয়, উপনিবেশিক শাসনের জন্য প্রয়োজনীয় জনবল তৈরি করার উদ্দেশ্যেই স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, টেক্সটবুক সোসাইটি ইত্যাদি প্রতিষ্ঠিত হয়। ফলে আনুষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থার অভূতপূর্ব উন্নতি হয়। বঙ্গীয় সমাজে এ ধরনের শিক্ষা-কাঠামো কখনও ছিল না। বলা যেতে পারে, এই শিক্ষাব্যবস্থা থেকে দেশীয়রা যে লাভবান হন, তা হয়েছিলেন পরোক্ষ ফল হিসেবে। উপনিবেশিক শক্তি যা-কিছু গুরুত্ব দিয়ে শক্ত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করে, তা করেছিল শোষণকে আরও ফলপ্রসূ করার উদ্দেশ্যে। কিন্তু এসব উদ্যোগের ফলে বঙ্গীয় সমাজের ভিত্তিমূলেই প্রবল ধাক্কা লেগেছিলো।
ব্রিটিশ আমলে বঙ্গদেশে একটি মধ্যবিত্ত শ্রেণি গড়ে ওঠে। এই শ্রেণিও গড়ে উঠেছিল উপনিবেশিক কারণে। উপনিবেশ থেকে কেন্দ্রে সম্পদ স্থানান্তরিত করা এবং উপনিবেশিক শাসন ব্যবস্থা সুচারুভাবে চালানোর উদ্দেশে একটা স্থানীয় মধ্যবিত্ত শ্রেণির দরকার ছিল-যার একাংশে থাকবে একটি ভূমি-মালিক শ্রেণি, অন্য অংশে থাকবে শিক্ষিত এবং চাকুরেদের একটি মধ্যবিত্ত শ্রেণি। এই মধ্যবিত্ত শ্রেণিই বঙ্গীয় গ্রামীণ সংস্কৃতিকে এগিয়ে নিয়ে এবং বৈদগ্ধ্য দান করে বর্তমান আকারে পৌঁছে দিয়েছে। ধর্মনিরপেক্ষ শাসন-ব্যবস্থা, আগেকার ধর্মীয় শিক্ষার জায়গায় উদারনৈতিক ইংরেজি শিক্ষার প্রসার এবং উন্নতি, পাশ্চাত্য ধ্যানধারণার প্রভাব, নগরায়ন এবং প্রযুক্তি - সবই আধুনিক বাঙালি মনন গঠনে সাহায্য করেছিল।
এই পরিবেশ দ্বারকানাথ ঠাকুর থেকে রাধাকান্ত দেব থেকে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের পিতার মতো সমাজের সকল ধরনের উদ্যোগী পুরুষের জন্যে বিবিধ সুযোগ-সুবিধার দ্বার খুলে দিয়েছিল। ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায় ১৮১০ সালের দিকে গ্রাম থেকে প্রথম যৌবনেই কলকাতায় এসেছিলেন ভাগ্যের সন্ধানে। প্রথমে এক দোকানে চাকুরি পেয়েছিলেন দু টাকা বেতনের। তিনি কলকাতায় না এলে এবং উপনিবেশিক শাসনের অধীনে নতুন সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি না হলে বাঙালি সমাজ বিদ্যাসাগর বলে কাউকে পেত না। অথবা রাধাকান্ত দেবের মতো একজন শূদ্র কলকাতার ব্রাহ্মণসহ হিন্দু অভিজাত সমাজের দলপতি হতে পারতেন না।
আগেই বলা হয়েছে যে, বর্ণভেদ প্রথা কেবল ধর্মীয় ব্যবস্থা নয়, বরং সমাজ-কাঠামোর ওপরও তা গুরুতর প্রভাব ফেলেছিল। জীবিকার জন্যে একজন ব্যক্তি কী করবে, এই প্রথা স্থায়ীভাবে তা নির্ধারিত করে দিত। এই প্রথা অনুযায়ী জেলের বংশধরেরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম জেলে হবে; একই ভাবে নাপিতের বংশধরেরা নাপিত, জোলার বংশধরেরা জোলা, ঝাড়ুদারের বংশধরেরা ঝাড়ুদার, বৈদ্যের বংশধরেরা বৈদ্য এবং ব্রাহ্মণের বংশধরেরা ধর্মকর্মের কাজ করবে বলে প্রত্যাশা করতো। গ্রামের মুসলমানরাও মোটামুটি এই প্রথাই পালন করতেন। তাই তাঁরা বেশির ভাগ প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে কৃষিকাজে জড়িত ছিলেন। উপনিবেশিক আমলে এই কঠোর প্রথা শিথিল হতে থাকে এবং সমাজে সীমাহীন সচলতা আসে। মুসলমানসহ সমাজের নিচের তলার লোকরা কৌলিক বৃত্তির প্রতি আনুগত্যবশত দীর্ঘকাল ইংরেজি শিক্ষার দিকে এগিয়ে যাননি অথবা সেই সুবাদে নতুন যুগের সুবিধেগুলোর সুযোগ নেননি। ফলে তাঁরা শিক্ষাদীক্ষায় বর্ণহিন্দু এবং উচ্চশ্রেণির হিন্দুদের তুলনায় অনেক পিছিয়ে পড়েন।
উপনিবেশিক আমলে বাঙালি সমাজের অগ্রগতি হয়েছিল অসমানভাবে এবং প্রধানত সমাজের ওপর তলার লোকেরাই এর ফলে উপকৃত হয়েছিলেন। তা সত্ত্বেও উনিশ শতকের সমাজ এবং সংস্কৃতির অনেক দিকেই সৃজনশীলতার একটা অসাধারণ স্ফূরণ ঘটেছিলো। বিশেষ করে ভাষা, সাহিত্য, সঙ্গীত ও নাটকসহ প্রদর্শনমূলক শিল্পকলা, স্থাপত্য, ধর্ম ও সমাজ-সংস্কার, এমন কি, অনেক অর্থনৈতিক কর্মকান্ডেও এই স্ফূরণ লক্ষ করা যায়। রেনেসাঁর কেবল দুটি দিকের কোনো বিকাশ এ সময়ে তেমন দেখা যায় না- চিত্রশিল্প আর ভাস্কর্যের। ছয় শতাব্দীর মুসলিম শাসন এর আংশিক কারণ হতে পারে। স্থাপত্যেরও সেই অর্থে কোনো পুনর্জাগরণ হয়নি, যা হয়েছিল, তা হলো বিশেষ করে কলকাতা নগরীকে কেন্দ্র করে পাশ্চাত্য স্থাপত্যের বিকাশ। রোমান অথবা গ্রিক স্থাপত্যের মতো কোনো আদর্শ বঙ্গদেশে ছিলো না, যার অনুকরণে স্থাপত্যের রেনেসাঁ হতে পারে। বৌদ্ধদের স্থাপত্যরীতি মুসলিম আমলেই বর্জিত হয়েছিল। বৌদ্ধ স্থাপত্যের শ্রীবৃদ্ধি না-ঘটিয়ে তাঁরা নিয়ে এসেছিলেন পারস্য এবং দিল্লির স্থাপত্যের রীতি। কিন্তু ইংরেজরা এনেছিলেন স্থাপত্যের একেবারে নতুন আদর্শ। নতুন শহর কলকাতায় এই স্থাপত্যরীতি অনুকরণ করাও সহজ ছিল, কলকাতা আগে থেকেই নগরীর রূপ নিয়ে থাকলে এটা সম্ভব হতো না।
এই যে সংস্কৃতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে সৃজনশীলতার স্ফূরণ, ঐতিহাসিকরা একে সাধারণত বঙ্গীয় রেনেসাঁ বলে থাকেন। এতে অবদান রেখেছিলেন হিন্দু জমিদার শ্রেণি এবং শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণী। এ ছিলো ঐতিহাসিক এবং নতুন যুগসৃষ্টিকারী। এই রেনেসন্সের প্রভাবে বাঙালিরা ধর্মনিরপেক্ষতা, যুক্তিবাদ, উদারনৈতিকতা, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য, এক কথায় আধুনিকতার ধারণা দিয়ে প্রভাবিত হন। এ থেকে আবার পরের দিকে স্বাজাত্যবোধের জন্ম হয়। তবে বঙ্গীয় রেনেসাঁর প্রকাশ ছিল নিতান্ত আংশিক এবং সীমিত। কারণ রেনেসাঁর প্রধান দুটি ক্ষেত্র - চিত্রকলা এবং স্থাপত্যে এর কোনো প্রকাশ ঘটেনি, বা সমাজের প্রধান ভাগ অর্থাৎ মুসলমান এবং নিম্নবর্ণের হিন্দুরাও এর আলোক থেকে বঞ্চিত হয়েছিলেন। তবে পরে এই প্রক্রিয়া তাঁদেরও ধীরে ধীরে খানিকটা প্রভাবিত করেছিলো।
আধুনিক বাঙালিদের প্রাত্যহিক জীবনযাত্রা এবং বিবাহ ও পরিবারের মতো সামোজিক প্রতিষ্ঠানকেও পশ্চিমা চিন্তাধারা প্রভাবিত করেছিল। উপনিবেশিক আমলের আগে মহিলাদের রাখা হতো অশিক্ষিত এবং অন্তঃপুরে বন্দী করে। আর বিবাহ ছিলো নিতান্তই সন্তান জন্ম দিয়ে পরিবার গড়ে তোলার একটা প্রক্রিয়া। ইংরেজি শিক্ষা এই পুরুষতান্ত্রিক চিন্তাধারাকে পরিবর্তন করে - প্রথমত নাগরিক সমাজে। নগরের শিক্ষিত সমাজে এর ফলে স্ত্রীশিক্ষার প্রচলন হয় এবং পর্দাপ্রথাও ধীরে ধীরে শিথিল হয়। এমনকি মেয়েদের পোশাকেও দ্রুত পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। মোট কথা, উচ্চশ্রেণির নাগরিক সমাজের অনেক মহিলাই যথেষ্ট পরিমাণে আধুনিক হয়ে ওঠেন। রোমান্টিক প্রেমের ধারণাও ক্রমশ দানা বাঁধতে থাকে এবং সমাজও আস্তে আস্তে তা স্বীকার করে নেয়। তবে এখনও তা সামাজিক রীতিতে পরিণত হয়নি। রোমান্টিক প্রেমের উন্মেষের ফলে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক আগের থেকে ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠে এবং পারস্পরিক প্রেমের ওপর গড়ে ওঠে, এভাবে পরিবারে মহিলাদের মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। বস্ত্তত, বাঙালি নারীদের বর্তমান অবস্থা, বিশেষ করে শিক্ষিত নাগরিক সমাজের নারীদের অবস্থান মোটামুটি সন্তোষজনক ও ন্যায্য বলে বিবেচিত হতে পারে। কিন্তু এই অবস্থা থেকে উনিশ শতকের প্রথম দিকে তাঁদের অবস্থা কী শোচনীয় ছিলো, তা অনুমান করা অসম্ভব। পরিবর্তিত পরিবেশে পরিবার, সমাজ এবং অর্থনীতিতে নারীরা বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৪৭ সালের দেশবিভাগ এবং ১৯৫০ সালের দাঙ্গার পরে পূর্ব বাংলা থেকে ব্যাপকহারে শিক্ষিত হিন্দুদের দেশত্যাগ এবং ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মের ফলে নারীদের মর্যাদা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে এবং তাঁরা আগের তুলনায় গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভূমিকা পালন করার সুযোগ পাচ্ছেন।
দেশবিভাগের পর সংস্কৃতির পরিবর্তন দেশ থেকে সম্পদ পাচার করা এবং তার ফলে দেশের অর্থনৈতিক দুর্দশা ঘটানো ছাড়া, উপনিবেশিক শাসনের একটা প্রধান কুফল ছিল হিন্দু-মুসলমানের সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে। তার আগে এই দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে বিবাহ এবং ভোজন চলতো না বটে, কিন্তু গ্রামের মধ্যে তারা মোটামুটি শান্তিতে পাশাপাশি বসবাস করতেন শতাব্দীর পর শতাব্দী। তাঁদের মধ্যে গ্রাম-সম্পর্ক গড়ে ওঠার ফলে তাঁরা ছিলেন একটা বড়ো পরিবারের মতো। কিন্তু ব্রিটিশ শাসনের সময়ে দুই সম্পর্কের মধ্যে বিচ্ছিন্নতাবাদ ক্রমশ জোরদার হতে থাকে। এর প্রধান কারণ দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে অসমান উন্নয়ন। এর ফলে দুই সম্প্রদায়ের পারস্পরিক সম্পর্ক তিক্ত হয়ে ওঠে এবং পরস্পরের প্রতি বৈরিতা জন্ম নেয়। ১৯২৬ সাল থেকে তা সহিংস দাঙ্গার রূপ নেয়। এরই চূড়ান্ত পরিণতি হলো ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে বঙ্গ-বিভাগ, কার্যত যা হয়ে দাঁড়ায় বঙ্গ সংস্কৃতি ও সমাজের স্থায়ী বিভাগ।
মধ্যযুগের সাহিত্য থেকে মনে হয় না যে, উনিশ শতকের আগ পর্যন্ত বাঙালিদের মধ্যে রাজনীতি বা দেশপ্রেমের চেতনা জেগেছিল। মধ্যযুগে যেমন সমাজ-সচেতন কবি মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর চন্ডীমঙ্গল থেকে দেখা যায় দেশের রাজা বা সুলতান কে, তিনি তাও সঠিকভাবে জানতেন না। এমনকি, সুলতান কে তা তিনি পরোয়াও করতেন বলে মনে হয় না। বরং ডিহিদার কে, সেটা তাঁর জন্যে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিলো। গ্রামের লোকদের মধ্যে গ্রামের বাইরের অবস্থা সম্পর্কে তেমন আগ্রহও ছিল না। সাধারণ মানুষরা গোটা জীবন কাটিয়ে দিতেন দু-তিন মাইল ব্যাসার্ধের একটা বৃত্তের মধ্যে। দেশ শাসনে অংশ গ্রহণের সুযোগ উপনিবেশিক শাসন আমলেই সৃষ্টি হয়েছিল, যদিও তারই ফল দেশ-বিভাগ।
দেশবিভাগের দরুণ বঙ্গদেশ স্থায়ীভাবে দু ভাগে বিভক্ত এবং সমাজের প্রধান দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে ভেদ বড়ো করে দেখা দিলেও, পূর্ব পাকিস্তানের মুসলমান সম্প্রদায়ের ওপর এর একটা ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। দেশবিভাগ এবং পরে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ফলে পূর্ব পাকিস্তান থেকে উচ্চশ্রেণির হিন্দুরা ব্যাপকভাবে পশ্চিমবঙ্গে চলে যাওয়ায়, শিক্ষা এবং অর্থনৈতিক কার্যক্রমে যে মুসলমান সম্প্রদায় এ যাবৎ হিন্দুদের তুলনায় পিছিয়ে ছিলেন, তাঁরা রাতারাতি সর্বত্রই বিনা প্রতিযোগিতায় উন্নতির পথে এগিয়ে যাওয়ার সুবর্ণ সুযোগ পেলেন। ফলে শিক্ষিত এবং ছোট ব্যবসায়ীদের একটি মধ্যবিত্ত শ্রেণি তুলনামূলকভাবে কম সময়ের ভেতর মুসলমানদের মধ্যে গড়ে উঠলো।
পাকিস্তান আমলে এক দিকে শিক্ষার বিকাশ এবং অন্য দিকে শোষণ ও বাঙালিদের ওপর ভিন ভাষা আরোপের প্রয়াসের ফলে জন্ম নেয় ভাষা আন্দোলন (১৯৪৮-৫২)। ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুত্থানের আগ পর্যন্ত এই ভাষা আন্দোলন দেশের রাজনীতিকে বিপুলভাবে প্রভাবিত করে। তদুপরি পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে কেবল ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে যে মিলন কৃত্রিমভাবে ঘটানো হয়েছিল, তা থেকে অচিরেই বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে একটা স্বরূপের সংকট দেখা দেয়। তাঁরা বাঙালি ছিলেন কিনা, সে বিষয়ে কোনো কালেই তাঁরা নিশ্চিত ছিলেন না, কিন্তু ভাষা আন্দোলনের পর তাঁরাই ভাষাভিত্তিক ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে শরিক হন। এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বর্ধিত চর্চায়। শেষ পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানের সাহিত্যে প্রামাণ্য বাংলা ভাষা থেকে সামান্য ভিন্ন স্বাদের এক ধরনের বাংলার উন্মেষ লক্ষ করা যায়। তাছাড়া, ইতিবাচক ফল দেখা দেয় হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতি তাঁদের চিরকালের বিতৃষ্ণা, এমনকি, অবিশ্বাস ও ঘৃণা হ্রাস পায়। পশ্চিমবঙ্গেও মুসলমানদের সঙ্গে চাকরি-বাকরির ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা কমে যাওয়ায় দেশ বিভাগের কয়েক দশকের মধ্যে মুসলমানদের প্রতি অবিশ্বাস ও ঘৃণাবোধ হ্রাস পায়; যদিও দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা জন্মেনি।
দেশ-বিভাগ, স্বাধীন বাংলাদেশের উদ্ভব এবং সেই সঙ্গে জীবন রক্ষাকারী উন ঔষুধপত্র ও টিকা আবিষ্কারের ফলে দুই বাংলাতেই জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে, এবং তার ফলও পড়েছে বঙ্গীয় সমাজের ওপর। ফলে একদিকে বেকারত্ব ও দারিদ্র্য বৃদ্ধি পেয়েছে, অন্যদিকে গ্রামের ব্যাপক সংখ্যক লোক কাজের খোঁজে শহরে, এমনকি বিদেশে চলে যাচ্ছেন। উনিশ শতকের শেষ পর্যন্ত কালাপানি পার হয়ে বিদেশে যাওয়াকে লোকাচার অনুযায়ী রীতিমতো নিষিদ্ধ বলে গণ্য করা হতো, কিন্তু এখন যথাসর্বস্বের বিনিময়ে লোকে একবার বিদেশে গিয়ে কোনো কাজ করতে পারলে, তা সে কাজ যতোই তুচ্ছ হোক, জীবনকে ধন্য মনে করে। সেদিন বিগত যখন বাঙালিরা ঘরমুখো ছিলেন এবং বেকার থাকতে ভালোবাসতেন। বাংলাদেশে কর্মসংস্থানের অভাবে দেশের শতকরা প্রায় পাঁচ ভাগ লোক অন্যান্য দেশে কাজ করছেন, বেশির ভাগই সাধারণ শ্রমিক হিসেবে। তবে দক্ষ কিছু পেশাদারও অন্যান্য দেশে কাজ করছেন, এঁরা বেশির ভাগই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, ডাক্তার, আইনজীবী, সরকারী চাকুরে ইত্যাদি। হাজার হাজার বাঙালি বিদেশে সাফল্যের সঙ্গে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং ছোটখাটো শিল্প প্রতিষ্ঠানও গড়ে তুলেছেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর আর-একটা গোষ্ঠী বড়ো শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছেন কারণ একটা দেশ এসব ছাড়া চলতে পারে না। মুসলমান সমাজে এটা অভিনব।
গ্রাম থেকে ক্রমবর্ধমান মাত্রায় লোকজন শহরে চলে যাওয়ার ফলে জাতিভেদ প্রথা প্রায় লোপ পেয়েছে, কিন্তু তার জায়গায় শ্রেণিবৈষম্য দেখা দিয়েছে প্রবল আকারে। যেমন, নগরীতে এখন অত্যন্ত ধনী এবং বস্তিবাসীরা প্রায় পাশাপাশি বাস করেন। তা ছাড়া, ধনী এবং দরিদ্রের মধ্যে ভেদাভেদ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ব্যাপক শিল্পায়ন এবং ট্রেড ইউনিয়নের বিকাশ ঘটার পরে মুনিবদের প্রতি শ্রমিকদের আন্তরিক শ্রদ্ধাবোধ হ্রাস পেয়েছে, তার জায়গায় বৃদ্ধি পেয়েছে ঘৃণা এবং শত্রুতা। গ্রাম-সম্পর্কের মতো কোনো সম্পর্ক নগরীতের গড়ে ওঠে না। শিক্ষার হার দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং নাগরিক জীবনযাত্রা কেবল নগরবাসীদের ওপরই প্রভাব ফেলছে না, বরং তা শহরে বসবাসকারী গ্রামবাসীদের মাধ্যমে গ্রামেও প্রসারিত হচ্ছে। ফলে জীবনযাত্রাসহ গ্রামীণ সংস্কৃতির সব দিকই ক্রমবর্ধমান মাত্রায় নাগরিক সংস্কৃতি দিয়ে প্রভাবিত হচ্ছে।
সিনেমা এবং ইলেক্ট্রনিক মাধ্যমসহ যোগাযোগ ব্যবস্থার অভূতপূর্ব উন্নতি এবং সাম্প্রতিক বিশ্বায়নের প্রক্রিয়া বিভিন্ন বিরোধী সংস্কৃতিকেও কাছাকাছি নিয়ে আসছে এবং বিভিন্ন ধর্মীয় ও আঞ্চলিক সম্প্রদায়গুলো ঐক্যের দিকে যাচ্ছে। ওদিকে, ভাষার কথা চিন্তা করলে বলতে হয়, যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নতির ফলে প্রামাণ্য ভাষা আঞ্চলিক ভাষাগুলো দিয়ে এবং আঞ্চলিক ভাষাগুলো প্রামাণ্য ভাষা দিয়ে প্রভাবিত হচ্ছে। মুসলমানপ্রধান বাংলাদেশের ভাষায় যেমন মুসলিম জীবনের সঙ্গে জড়িত শব্দ বৃদ্ধি পাচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গের বাংলায় তেমনি বহু হিন্দি পরিভাষা ঢুকে পড়ছে। বলিউডের সিনেমা এবং ধারাবাহিক অনুষ্ঠানগুলিও বাঙালি সংস্কৃতির ওপর প্রভাব ফেলছে, বিশেষ করে পোশাক এবং সঙ্গীতে। পোশাকের পরিবর্তন অবশ্য মহিলাদের মধ্যেই সবচেয়ে বেশি লক্ষ করা যাচ্ছে। মহিলারা চিরদিনের শাড়ি বর্জন করে সালওয়ার-কামিজ পরতে আরম্ভ করেছেন। অথচ ছয়শো বছরের মুসলিম শাসন এবং দুশো বছরের ব্রিটিশ শাসনও শাড়িকে বদলাতে পারেনি, যদিও পূর্বোক্ত দুই আমলে পুরুষদের পোশাকে বিরাট পরিবর্তন এসেছিল। খাদ্যাভ্যাসেও এই দুই আমলের প্রভাব পড়েছিল।
খাদ্যাভ্যাস  বাঙালিরা চিরকাল ভেতো বাঙালি বলে পরিচিত হলেও, গত অর্ধশতকে তাঁদের খাদ্যাভ্যাসে বড়ো রকমের পরিবর্তন এসেছে। গরিবরা চালের বদলে শস্তা গমের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন, আর ধনীরা বিদেশী খাবারে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছেন, বিশেষ করে চীনা এবং পাশ্চাত্যের খাদ্যে। হ্যামবার্গার এবং হট ডগের মতো পশ্চিমা খাবার এবং স্থানীয়ভাবে তৈরি চীনা ও থাই খাবার নাগরিক সমাজে এতোই ছড়িয়ে পড়ছে যে, মহিলারা তা বাড়িতেও তৈরি করার কৌশল শিখে ফেলছেন।
অবশ্য এসব পরিবর্তন আসার পরও বাঙালিদের সঙ্গে কতোগুলো খাদ্যকে অভিন্ন করে দেখা হয়। মহিলারা যেমন শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে রান্নায় তাঁদের সৃজনশীলতার পরিচয় দিয়ে নানা রকমের মিষ্টান্ন এবং আচার তৈরি করেছেন, যা উপমহাদেশের অন্য কোথাও তৈরি হয় না। তাঁদের মিষ্টির জন্যে বাঙালিরা এতোই সুপরিচিত যে, গোপাল হালদার এক জায়গায় বাঙালি সংস্কৃতিকে রসিকতা করে রসগোল্লা এবং সন্দেশের সংস্কৃতি বলে বর্ণনা দিয়েছেন। কোনো কোনো খাবার আবার দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে স্বাদে এবং নামে খানিকটা আলাদা।
বাঙালি হিন্দু ও মুসলমানদের এবং ধনী ও দরিদ্রদের খাদ্যাভ্যাসের মধ্যে বিরাট পার্থক্য লক্ষ করা যায়। যেমন, উচ্চশ্রেণির মুসলমানরা মাংসের বিশেষ ভক্ত হলেও, হিন্দুরা সাধারণত মাছ এবং সবজি বেশি পছন্দ করেন। হিন্দুদের মধ্যে শাক্তরা অবশ্য মাংসের ভক্ত। আর, দরিদ্র হিন্দু ও মুসলমানদের খাদ্যাভ্যাস কমবেশি একই রকম, তাঁরা যা জোটাতে পারেন, তাই খান। চর্যাপদের একটি পংক্তি থেকে মনে হয় সেই প্রাচীন কালেও দরিদ্রের মধ্যে ভাতের টানাটানি ছিল, এখনো তাই আছে। দরিদ্রদের প্রধান খাদ্য ভাত আর শাক। মাঝেমধ্যে মাছ এবং ডাল। ডাল এক সময় বঙ্গদেশে ছিল বলে মনে হয় না। কিন্তু এখন ধনী ও গরিব সবাই ডাল পছন্দ করেন।
রান্নার পদ্ধতি হিন্দু এবং মুসলমানদের মধ্যে যথেষ্ট আলাদা। ভিন দেশ থেকে আসা উচ্চশ্রেণির মুসলমানরা স্থানীয় রীতিতে রান্না করা খাবার ভালোবাসতেন না। তাঁরা তাঁদের সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন সেইসব রান্না যা পরে মোগলাই খাবার নামে পরিচিত হয়। সাম্প্রতিক কালের আগ পর্যন্ত অবশ্য তা সাধারণ মুসলমানদের মধ্যেই প্রবেশ করেনি, হিন্দু সমাজে তো নয়ই। পর্তুগিজ এবং ইংরেজরা যখন তাঁদের সঙ্গে নতুন খাদ্য নিয়ে এলেন, তখন তাও ধীরে ধীরে হিন্দু ও মুসলমান উভয় সমাজে প্রবেশ করতে থাকে।
বাঙালিত্ব বিশেষ করে আধুনিক কালে বাঙালিদের সংস্কৃতি বিচিত্র রূপ লাভ করলেও, তার মধ্যে কিছু বৈশিষ্ট্য রয়ে গেছে, যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বাঙালি সমাজে স্থায়ী আসনে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল। যেমন, বাঙালি মহিলাদের এখনো উপমহাদেশের এক দল নারীর মধ্যে সহজেই আলাদা করে চিনে নেওয়া যাবে। ক্রমবর্ধমান ব্যস্ত জীবনযাত্রার মধ্যেও বাঙালিরা ঢিলেঢালা জীবনধারা পছন্দ করেন এবং কয়েকজন মিলে আড্ডা দিতে ভালোবাসেন। তাঁদের অনেকেই হুজুগে, দীর্ঘমেয়াদী ফলাফলের কথা না ভেবে সবাই মিলে লাফিয়ে পড়তে পছন্দ করেন। জীবনের বহু ক্ষেত্রে আধুনিক হয়ে উঠলেও, তাঁদের মধ্যে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের বিকাশ ঘটেছে সামান্যই। তাঁদের মধ্যে আত্মীয়তার বন্ধন খুব জোরালো। কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া,বিবাহের আয়োজন করেন পিতামাতারা, এবং তাঁদের মধ্যে বিবাহপূর্ব ও বিবাহ-বহির্ভুত প্রেম সামান্যই দেখা যায়। গ্রামীণ জনগণের মধ্যে দারিদ্র্য এবং ভূমিহীনতা বৃদ্ধি পেলেও মধ্যবিত্ত এবং ধনীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা এবং নিজেদের জাহির করার একটা সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। বিরাট সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালিরা আগে কৃষিনির্ভর ছিলেন, কিন্তু বিশ শতকে জনসংখ্যার বিস্ফোরণের ফলে অনেক বাঙালিই এখন গ্রামের বদলে শহরে গিয়ে স্বল্প-দক্ষ বা অদক্ষ শ্রমিকে পরিণত হয়েছেন। বাঙালি চরিত্রের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো তাঁরা সাধারণত নমনীয় মধ্যপন্থায় এবং সমন্বয়ধর্মিতায় বিশ্বাসী। সে কারণে তাঁরা যেকোনো উগ্রবাদের পথ সাধারণত এড়িয়ে চলেন। 

শিরোনাম - দুরত্ব✍️ ডা: অরুণিমা দাস

 শিরোনাম - দুরত্ব ✍️ ডা: অরুণিমা দাস আধুনিকতা মানেই অন্যরকম একটা ব্যাপার, উন্নতির পথে এগিয়ে যাবার সিড়ি তৈরি করে দেয় আধুনিকতা। আজকাল কেউ আ...