মার্গারেটের দেশএখন নতুন,ঠিকানা নতুন। ঠিকানা তখনো ক্ষীণ সূত্রে জোড়া,মোমবাসা জাহাজ যতক্ষণ কলকাতা বন্দরে দাঁড়িয়ে। যেন মোমবাসার মনোভাব- দেখো দেশটা কেমন লাগে,ভালো না লাগলে চলে এসো যেমনিভাবে এনেছি তেমনি করে নিয়ে চলে যাবো।
তা আর হওয়ার নয়। এক্কেবারে পাকাপাকি সিদ্ধান্ত,তিনি এখানে থাকতে এসেছেন। এ দেশ আমার দেশ করে নেওয়ার সাধনা সে যতই ক্লেষদায়ক হোক এই তো আমার বাল্যের পৃথিবীর মানচিত্রে বাবার আঙুল ছুঁয়ে দেখিয়ে দেওয়া সেই দেশ,যেখানের ডাকে এই তো এলাম, সে কি চলে যাওয়ার জন্য। তবে জানা যায়,আর যখন ফিরে যাওয়ার জন্য এখানে আসেননি,তখন মোমবাসা জাহাজ ছেড়ে যাওয়ার আগে জাহাজে একটি পার্টির ব্যবস্থা হয়,সেই পার্টিতে মার্গারেট আমন্ত্রিত হন।
কলকাতায় পৌঁছে প্রথমে কোথায় উঠেছিলেন তাই নিয়ে মতান্তর দেখা যায়। যেমন প্রব্রাজিকা মুক্তিপ্রাণা তথ্য দিয়ে বুঝিয়েছিলেন - 'পূর্বব্যবস্থানুযায়ী মার্গারেট চৌরঙ্গী অঞ্চলে এক হোটেলে উঠিলেন। পরে মিস মুলার কলকাতায় প্রত্যাবর্তন করিলে সম্ভবত তাহার সহিত একত্র অবস্থান করেন। স্বামীজীর পত্রে জানা যায় মিস মুলার তাঁহাদের বাসের জন্য পূর্বেই এক বাড়ী ভাড়া লইয়াছিলেন। নতুন জীবন আরম্ভ হইল।'
অদ্বৈত আশ্রম থেকে প্রকাশিত মার্গারেটের সহস্র পত্রাবলীর প্রথম চিঠিতে মার্গারেট ঠিকানা লিখেছেন - 'কেয়ার অফ মিস ব্যাবোনান, ৪৯-পার্ক স্ট্রিট,কলকাতা।' এই চিঠি লিখেছিলেন ৩১ জানুয়ারী,১৯৯৮,চিঠির প্রাপকের নাম মিসেস এরিক হ্যামন্ড। সেই চিঠিতে লিখেছিলেন- "যতক্ষণ মোমবাসা জাহাজ কলকাতা বন্দরে রয়েছে, ততক্ষণ ইংল্যান্ডের কিছুটা আমার সঙ্গে থেকে যাচ্ছে।" এই চিঠিতে লিখেছিলেন জাহাজে পার্টির কথা।
নবাগতা অতিথির জীবনে আশ্রয়ের সাথে সাথে বাংলাভাষা শিক্ষার তালিমের দ্রুত ব্যবস্থা হয় - দুখানি ছোটো সাইজের ঠাকুর শ্রাশ্রীরামকৃষ্ণের উপদেশ সম্বলিত বই দিয়ে। শিক্ষক হিসেবে স্বামীজী পাঠিয়েছিলেন স্বামী স্বরূপানন্দকে,মার্গারেটের ব্যাবনকে লেখা পত্র থেকে তা জানতে পারি। অবশ্য ভিন্ন মতও পাই স্বরূপানন্দের বদলে অন্য কেউ ছিলেন।
মার্গারেট যে ঘরটিতে ছিলেন সেই ঘরটির বর্ণনাতে পাই ঘরের দরজা আটখানা। বাথরুম লাগোয়া চার। "... সঙ্গে ক্যামেরা থাকলে তোমাদের ছবি পাঠাতে পারতাম।" জানিয়েছিলেন এক প্রাণখোলা পরিবেশের কথা।
মার্গারেট আসার সাথে সাথে স্বামীজীর বিদেশী শিষ্য-শিষ্যার সংখ্যা দাঁড়াল ছয়। যেমন- মিঃ ক্যাপ্টেন সেভিয়ার ও মিসেস সেভিয়ার, মিস হেনরি মুলার, মিসেস বুল,মিস ম্যাকলাউড ও স্বয়ং মার্গারেট। মিস হেনরি মুলার স্বামীজীর বেলুড় মঠ স্থাপনের জমি কিনছেন,যা ১০ ফেব্রুয়ারিতে,১৮৯৮এ মিঃ ও মিসেস হ্যামন্ডকে লেখা একটি চিঠি থেকে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানতে পারি। আবার একসময় এই মিস মুলারের ঠাকুর শ্রাশ্রীরামকৃষ্ণ,স্বামীজীকে ছেড়ে নতুন ধারণা হয়েছিল- "সমস্ত জপতপ নোংরা জিনিস",স্বামীজীর প্রতি একসময়ের ভক্তিমতী মহিলার ভাবান্তর ঘটে এভাবেই - তাঁর প্রকৃত পথ বাইবেলীয় খ্রিস্টান - "ক্রিশ্চানিটিতে ফিরে যাচ্ছি।"- তা থেকে নিবেদিতার বিস্ময় - "আমরা কবে আবার ক্রিশ্চানিটি ত্যাগ করলাম। ১৮৯৯এর ৪জানুয়ারীতে বোসপাড়া লেন থেকে মিসেস হ্যামন্ডকে লেখা একটি চিঠিতে এই কথা জানতে পারি।
এমনকি দলত্যাগী মিস মুলার মার্কিন কনসাল জেনারেল প্যাটার্সনের সঙ্গে দেখা করে তাঁর আশঙ্কার কথা অকপটে বলেছেন। সেইসঙ্গে এও বলেছেন মায়ামোহ কেটে গেলে নিবেদিতাও তাঁর নতুন ভূমিকা ত্যাগ করবে।
আর মিস মুলার নিবেদিতার মোহ ত্যাগের জন্য মাসিক ১৫ টাকা যে দেবেন,তা হাতখরচ,পোশাক আশাক বাবদ। প্রাণের স্কুলের জন্য নয়। ব্যক্তিত্বময়ী নিবেদিতা এ নিয়ে কি সিদ্ধান্তে এসেছিলেন,স্কুল চালানোর উপায় কিভাবে বের করেছিলেন! তবে
আলমোড়া, ইসলামাবাদ, শ্রীনগর দিল্লি,আগ্রা,বারাণসী ইত্যাদি স্থান ভ্রমণ থেকে কলকাতায় ফিরে তাঁর যেটুকু অভিজ্ঞতা হয়েছিল অর্থাৎ তাঁর মনে হয়েছিল- ভারতবর্ষে হতাশার কিছুই ঘটেনি। আসলে হতাশা আছে,তিনি হতাশা নিরসণের কারিগর। হতাশা নিয়ে পা বাড়ালে হতাশাই তাকে ঘিরে ধরে। তিনি যে হতাশা ভাঙার গান গাইতে এসেছেন। তাঁকে হতাশা গ্রাস করবে, না তিনি হতাশাকে গ্রাস করবেন- এই মনের প্রবল উদ্দীপনা নিয়ে চলার জন্য নিবেদিত অনন্য এক প্রাণের চারিত্রিক দৃঢ়তা ও বলিষ্ঠতার নাম নিবেদিতা।
(চলবে)
@ কপিরাইট রিজার্ভ ফর মৃদুল কুমার দাস।
রবিবার, ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২১
# নাম- যেথায় আমি ঘর বেঁধেছি(আধ্যাত্মিক)। পর্ব - ১৯।✍ - মৃদুল কুমার দাস।
এতে সদস্যতা:
মন্তব্যগুলি পোস্ট করুন (Atom)
শিরোনাম - দুরত্ব✍️ ডা: অরুণিমা দাস
শিরোনাম - দুরত্ব ✍️ ডা: অরুণিমা দাস আধুনিকতা মানেই অন্যরকম একটা ব্যাপার, উন্নতির পথে এগিয়ে যাবার সিড়ি তৈরি করে দেয় আধুনিকতা। আজকাল কেউ আ...
কিছু জানার সঙ্গে অজানা অনেক তথ্য জানতে পারলাম। 🙏
উত্তরমুছুনধন্যবাদ। শুভেচ্ছা।❤❤
মুছুনপড়ে খুব ভালো লাগলো। অনেক অজানা তথ্য জানতে পারলাম।
উত্তরমুছুনধন্যবাদ। শুভেচ্ছা।❤❤
মুছুনদারুণ লাগলো
উত্তরমুছুনধন্যবাদ। শুভেচ্ছা।❤❤
উত্তরমুছুনদাদার লেখা তো সবসময় অসাধারণ..💐💝
উত্তরমুছুননিবেদিতার চরিত্রের বলিষ্ঠ দিকগুলি সুন্দরভাবে ফুটে উঠছে।আগামীর প্রতীক্ষায়।
উত্তরমুছুনখুব ভালো লাগলো দাদা ।পরের টার অপেক্ষায় রইলাম ।
উত্তরমুছুনঅসাধারণ
উত্তরমুছুন