শুভ আধ্যাত্মিক আলোচনা-বাসর।
# বিষয় - *আধ্যাত্মিক।*
# নাম- *আত্মা-প্রসঙ্গ।*
✍ - মৃদুল কুমার দাস।
আত্মা ও পরমাত্মা - আত্মা জীবের ভেতরকার এক অদৃশ্য শক্তি ( আধ্যাত্মিক ভাষ্যে যার পরিচয়- সাইকিক বিয়িং- Psychic Being),আর পরমাত্মা হলেন পরমব্রহ্ম শক্তি। পরমাত্মাই আত্মার মধ্য দিয়ে প্রকাশ,যার পরিচয় দিতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ বলেই ফেললেন- *"ত্রিভুবনেশ্বর আমায় নইলে তোমার প্রেম যে হত মিছে।"*
পরমাত্মা থেকেই আত্মার সৃষ্টি। পরমাত্মার অংশ বলে আত্মাও পরমাত্মার মত অবিনশ্বর। আত্মা পরমাত্মার অংশ বলে পরমাত্মার মত আত্মাও পবিত্র। আত্মার সেবা হলেই পরমাত্মার সেবা হয় - *"জীবে প্রেম করে যেই জন,সেই জন সেবিছে ঈশ্বর।"* জীব সেবা মানেই আত্মার সেবা। সেবা দান ও গ্রহণের মধ্য দিয়ে আত্মা পবিত্র হয়ে ওঠার মধ্যে একটি অন্যতম উপায়। এই স্বরূপ বা কী? স্বরূপ জানতে যেতে হবে যাজ্ঞবল্ক্যের উপনিষদের কাছে। তাহলে যাওয়া যাক সেই উপনিষকার,হিন্দুধর্মের এক বিশিষ্ট প্রবক্তা যাজ্ঞবল্ক্যের কাছে।
তর্ক যুদ্ধে গার্গীর কাছে যাজ্ঞবল্ক্য এই হারেন আর কি একের পর পর এক প্রশ্নে জেরবার হয়ে। শেষে আত্মার স্বরূপ জানতে গিয়ে যাজ্ঞবল্ক্য বলেছিলেন মেয়েদের এ নিয়ে জানার অধিকার নেই। সেই একই ভাবে স্ত্রী মৈত্রেয়ী যখন জীবনের অমৃতত্ত্ব কি জানতে চাইলেন,গার্গীকে এড়িয়ে গেলেও মৈত্রেয়ীকে পারেননি এড়াতে। জীবনের অমৃতত্ত্ব বোঝাতে গিয়ে আত্মার স্বরূপ বুঝিয়ে ছিলেন।
আত্মার স্বরূপ মৈত্রেয়ীকে বোঝাতে গিয়ে
যাজ্ঞবল্ক্য বলছেন____
১. প্রাণ দ্বারা প্রাণিত যে হচ্ছে তাই তার আত্মা। সব কিছুরই সে অভ্যন্তরীন। তাকে চোখে দেখা যায় না।
২. পৃথিবীতে থেকেও পৃথিবীর অন্তরালে,
পৃথিবী যার শরীর, যে পৃথিবীর অভ্যন্তরে থেকে পৃথিবীকে নিয়ন্ত্রন করছে সেই তোমার আত্মা। সেই অন্তর্যামী ও অমৃতত্ত্ব।
এই আত্মাই হল ব্রহ্ম। ব্রহ্ম মানে বৃহৎ। আত্মা সম্পর্কিত জানবার জ্ঞানই হল ব্রহ্ম
জ্ঞান।
আত্মা এক ও অবিনশ্বর।আত্মা এক বলে
তা হতে জীবের সৃষ্টি একটাই নিয়মে। একটি কোষ হয় বহুকোষীয়। একটি মানুষ ছড়িয়ে পড়ে বহু মানুষে।
যাজ্ঞবল্ক্য বলছেন মানুষের দুটি সত্ত্বা। ব্যষ্টি ও সমষ্টি। মানুষ ব্যষ্টি হয়ে যখন বাঁচে,তখন সে নিজের জন্য বাঁচে। যখন সমষ্টি সত্ত্বা নিয়ে বাঁচে তখন তার বাঁচাটা হয়
দেশের জন্য। সমাজের জন্য। ব্যক্তি সত্ত্বা তখন সমষ্টি সত্ত্বার মধ্যে নিজেকে বিলিয়ে দেবে। এই সমষ্টি সত্ত্বাই হল বিশ্ব সত্ত্বা। বিশ্ব সত্ত্বা অক্ষয়,অমর। যে বিশ্ব সত্ত্বার স্বরূপ সম্পর্কে না জেনে পৃথিবী থেকে বিদায় নেয় সে হয় কৃপার পাত্র। আর যে বিশ্ব সত্ত্বা
তথা ব্রহ্ম সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করে পৃথিবীতে আর ফিরে আসে না, তাকে আর জন্ম নিতে হয় না। মুক্তি পায় সে।
ইহ জগত তাকে অমরত্ব দিয়ে ধারন করে।
এই আত্মার বাইরে যা কিছু তাই আর্ত। এই আর্ত অর্থাৎ বাইরের শক্তি আনে
বিচ্ছিন্ন এককের বোধ। আর তখন সেই হয়
খন্ডিত। কেবল ব্যক্তি সত্ত্বার অধিকারী।
তাহতে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক এই একক সত্ত্বা কি তাহলে বৃথা ?
আদৌ নয়। বলা হয় এ ধরনের সত্ত্বা অসম্পূর্ণ। এরা মৃত্যুতেও শান্তি পায় না।
তাই বলা হয় আত্মা একা নয়। আত্মার সঙ্গে আত্মার মিলন চলে অহরহ। থাকে অনন্ত তৃপ্তি। সেই প্রবনতা থেকে নারী পুরুষের মিলন অনন্ত ব্রহ্ম জ্ঞানের সমান।
আত্মার মৃত্যু নেই, মৃত্যু আছে কেবল নশ্বর দেহে। নশ্বর দেহের যখন আত্মা বিশ্ব সত্ত্বার সঙ্গে মিলনের পথ পেয়ে যায়,তখন নশ্বর দেহের মৃত্যু ভয় দূর হয়। আর মৃত্যু ভয় তারই দূর হয় না যে নিজের ব্যক্তি
সত্ত্বার বিলোপ ঘটাতে পারে না। তাকেই এক প্রকার পরাজয়ের গ্লানি ভর করে। বিশ্ব সত্ত্বার সঙ্গে মিলিত হতে যে পারে সেই তো বলতে পারে মৃত্যুতে সব শেষ নয়। ব্রহ্ম জ্ঞানী হলে মৃত্যুভয় দূর হয়। ব্যক্তি মানুষের মৃত্যু আছে,মনুষ্যশ্রেনীর নেই। কোনো ব্যক্তি মানুষ না থাকতে পারে, কিন্তু মনুষ্য সমাজ থাকবেই।
এই উপনিষদিক ভাবনায় তাই রবীন্দ্রনাথ
বলেছেন_____
" বিশ্বভরা প্রাণ/ তাহারি মাঝখানে
আমি পেয়েছি মোর স্থান..."
আত্মার স্বরূপ মোটামুটি একটা ধারণা হল। যে ব্রহ্মের অংশ সেই তো পবিত্র। কিন্তু আত্মার দোষ আছে, আত্মাতে সেই দোষ আসে মোহ থেকে,অহং থেকে। ব্যবহারিক জীবনের চাওয়া পাওয়ার ভোগাকাঙ্খা থেকে লোভ লালসা,মিথ্যাচার,ঈর্ষা,হিংসা,ক্রোধ তথা সকল জীবনের নেতিবাচক দিকগুলি আত্মাকে অপবিত্র করে। মূল্যবোধ - দান দয়া সংযম,সততা,ভাব,ভক্তি, ভালবাসা দিয়ে পরমাত্মার কাছাকাছি হতে হয়। ভগবানের কৃপালাভ পেতে হলে আত্মার পবিত্রতা রক্ষা করে চলতে হয়। ভগবানের সেবার পথে আত্মার শুদ্ধতা আসে। ত্যাগ, তিতিক্ষা,দয়া,করুণা,বিশ্বাস,নিবেদন,ধ্যান সব আত্মাকে পবিত্র রাখার এক একটি বলিষ্ঠ উপাদান। জগৎ মায়াময়,মায়া আনে অহংকার। অহংকার মুক্ত না হলে জীবন মিথ্যা মনে হয়। মিথ্যাচার নিয়ে বাঁচার মধ্যে জীবনকে বড়ই লঘু মনে হয়। আত্মার পবিত্রতা মানেই দরদী,সহানুভূতিশীল,উদারতা,নির্লোভ - এক অমৃতময় জীবনের অংশীদার হওয়া যায়। শত দুঃখের মধ্যেও সেই তো হাসতে পারে যার আত্মা পবিত্র।
*****
# কপিরাইট রিজার্ভ ফর মৃদুল কুমার দাস।