শুভ সান্ধ্যকালীন সাহিত্য আলোচনা-বাসর।
#বিষয় - *চিত্রশিল্প।*
#নাম -
*অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর।*
✍️ - মৃদুল কুমার দাস।
সৃষ্টির জন্য শ্রষ্টা হন মহৎ,যদি সৃষ্টি হয় সর্বোত্তম। জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়ি বঙ্গীয় শিল্প সংস্কৃতিতে নবজাগরণের একটি বিশেষ ঘরাণা ছিল। ঠাকুর বাড়ির এক একজন জ্যোতিষ্ক - সত্যেন্দ্রনাথ,জ্যোতিরীন্দ্রনাথ,রবীন্দ্রনাথ, গুণীন্দ্রনাথ,গগনেন্দ্রনাথ,সমরেন্দ্রনাথ,অবনীন্দ্রনাথ পরিমন্ডলে ঠাকুর বাড়ি শুধু কি,সমগ্র বাংলা আলোকপ্রাপ্তিতে ভাস্বরতা লাভ করেছিল। তাঁদের হাত ধরে এসেছিল ড্রামাটিক ক্লাব, পত্রপত্রিকা, শিশুপত্রিকা,খামখেয়ালিসভা- এ সবের মধ্যয দিয়ে সৃষ্টির এক একরকম উন্মাদনা বলতে উন্মাদনা! এই ধারায় দু'জন ছিলেন সেরার সেরা - একজন রবীন্দ্রনাথ ও অন্যজন অবনীন্দ্রনাথ। অবনীন্দ্রনাথ পিতা গুণীন্দ্রনাথকে অকালে হারিয়ে পিতৃব্য রবীন্দ্রনাথ তাঁর জীবনের প্রধান সহায় হয়ে উঠলেন। কবিরও অবনীন্দ্রনাথকে খুব দরকার পড়েছিল। যেভাবে খামখেয়ালী সভার দায়িত্ব পালনে এক মহীরুহ হয়ে উঠছেন, কবির না ভাল লেগে পারে। ধুরন্ধর এক প্রতিভার সার্থক গাইড হলেন রবীন্দ্রনাথ। অবনীন্দ্রনাথ ভাল গল্প বলতে পারেন, আর তাকে লেখায় প্রতিষ্ঠা ঠিকঠাক দিলেই কবির লক্ষ্যপূরণ ব্যর্থ হওয়ার নয়। কবির হাত ধরে চলল লেখিয়ে হওয়ার প্রবল তৎপরতা।
কবি অবনীন্দ্রনাথকে পেলেন তেপান্তরের মাঠে নিরুদ্দেশে যাত্রার গল্প বলার আবেশে,পেলেন কথকতার সুরে,আর চিত্ররচনার আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপ যেন হাতে নিয়ে ঠাকুর বাড়ির দক্ষিণের বারান্দার জগৎ ছিল তাঁর একান্ত নিজের। বিরল প্রতিভার অধিকারী মুখের ভাষাকে অনবদ্য চিত্ররূপ দেওয়ার অনায়াস দক্ষতা ছিল। আর অসাধারণ বাগ্মীগুণ তো ছিলই। অবনীন্দ্রনাথের শিল্পকীর্তিতে মুগ্ধ কবি একসময় রাণি চন্দকে রসিকতা করে অবন ঠাকুরের রচিত 'ঘরোয়া' প্রসঙ্গে বলেছিলেন- "সত্যিই অবনের সৃজনীশক্তি অদ্ভুত। তবে ওর চেয়ে আমার একটা জায়গায় শ্রেষ্ঠতা বেশি,তা হচ্ছে আমার গান। অবন আর যাই করুক গান গাইতে পারে না। সেখানে ওকে হার মানতেই হবে।" এই বলে কবি হাসতে লাগলেন। কবি নিজের সঙ্গে তুলনা করার এই সহজ রসিকতায় অবন নিয়ে কত আন্তরিক ছিলেন, তা আর বলার অবকাশ রাখে না।
অবনীন্দ্রনাথ তাঁর 'বুড়ো আংলা'য় লিখছেন - "কার বাড়ি? ঠাকুরবাড়ি,কোন ঠাকুর? ওবিন ঠাকুর - ছবি লেখে।" যে কারো বিস্ময়ের প্রশ্ন - ছবি আবার লেখা যায় নাকি? যায়। অবনীন্দ্রনাথ সেই ঘরাণার অগ্রদূত। সে কথাই ছবি ও লেখা দিয়ে প্রমাণ করে গিয়েছিলেন।
চিত্রশিল্পী হিসেবে তাঁর আঁকা একে একে পাই যেমন- ওমর খৈয়াম(জাপানী রীতিতে আঁকা),শহজাহাদপুরের দৃশ্যাবলী,আরোব্যোপন্যাসের গল্প,কবিকঙ্কন চন্ডী,সাজাহান, কৃষ্ণলীলিবিষয়ক চিত্রাবলী,বজ্রমুকুট,ঋতুসংহার,বুদ্ধ,সুজাতা। আর রচিত গ্রন্থাবলীর শুরু 'শকুন্তলা'(১৮৯৫) দিয়ে শুরু। একে একে রচিত গ্রন্থ, যেমন- 'ক্ষীরের পুতুল'(১৮৯৬),'রাজকাহিনী'(১৯০৯), 'ভারতশিল্প'(১৯০৯),বাংলার ব্রত (১৯১৯),খাজাঞ্চির খাতা(১৯২১),বাগেশ্বরী শিল্প প্রবন্ধাবলী(১৯২৯), 'বুড়ো আংলা'(১৯৪১),আর শেষ প্রকাশ 'রং বেরং'(১৯৫৮) দিয়ে,অবনীন্দ্রনাথ যখন আর নেই - ১৯৫১এর ৫ ডিসেম্বর আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। সবেতেই ছবিই যেন লেখা। লেখা ও ছবি চলছে হাতধরাধরি করে।
স্বয়ং কবি বলেছিলেন - "ছোটদের পড়বার মত বই বাংলা ভাষায় বিশেষ নেই। এ অভাব আমাদের ঘোচাতে হবে। তুমি লেখ।" আর সত্যিই সুকুমার রায়ের মতো দিনকে দিন হয়ে উঠতে লাগলেন - 'শকুন্তলা', 'ক্ষীরের পুতুল' - আর 'বাগীশ্বরী শিল্প প্রবন্ধাবলী'র অমরত্ব চিরকালীন এক রসবেত্তা সন্ধান পাই বলে। সুকুমার রায়ের 'আবোল তাবল'এর খেয়ালখোলা ভোলার সার্থক প্রতিমূর্তি। আবার কবির সৃষ্ট 'ঠাকুর্দা' চরিত্রের মূর্ত বিগ্রহ। ঠিক যেন অবনকে দেখে কবির ঠাকুর্দা চরিত্রটি যেন সৃষ্টি।
'কাটুম-কুটুম' নিয়ে মেতে ওঠার প্রসঙ্গে পরিচারিকার বলছে - "আপনি ওসব কী করছেন,সব ফেলে দিন,লোকে বলবে ভীমরতি ধরেছে।" তখন খেয়াল রাজা অবনীন্দ্রনাথ সহাস্যে বলেছেন -"নারে লোকে বলবে বাহাত্তুরে ধরছে।" - এই কথা রাণি চন্দ এর কাছে কবি শুনে কবিও সহাস্যে বলেছিলেন - "অবন একটা চিরকালের পাগল।"
সুকুমার রায়ের 'হ জ ব র ল' আর অবনীন্দ্রনাথের 'বুড়ো আংলা' পরস্পরের পরিপূরক। তবে পার্থক্য 'বুড়ো আংলা' কল্পরাজ্যের সাতরঙা ছবির আলোকবাহার আছে। যেন 'বুড়ো আংলা' Alice-এর বই হয়ে উঠেছে,কারণ অবনীন্দ্রনাথের রচনাও ছবি ও কথা যেন ডানা মেলেছে। যেন Alice-এর প্রেরণায় রচিত বুড়ো আংলা। ছবিই যে কোনো রচনাকে প্রাণবন্ত করে। আর ছোটদের তো আরো বেশী করে চাই। অবনীন্দ্রনাথ সেই চাহিদা পূরণের ভগীরথ। অবনীন্দ্রনাথ আজ আরো সমানে প্রাসঙ্গিক, এখন যে কোনো সৃষ্টিকে আমরা কথার সঙ্গে ছবি দিয়ে কথাকে আরো আকর্ষণীয় করে তুলি। তিনি যথার্থই রূপশিল্পী,চিত্রশিল্পী,কথাশিল্পী,গভীর ভাব ও ভাবনার শিল্পী,শিক্ষাগুরু অবনীন্দ্রনাথ রঙ,রূপ ও রসের ধারায় বাংলাসাহিত্যে চিরস্মরণীয়।
******
অসাধারণ লেখা
উত্তরমুছুনখুব সুন্দর লিখেছেন দাদা।
উত্তরমুছুনএমন সুন্দর লেখা উপহার আপনাকেই মানাচ্ছে দাদা।
উত্তরমুছুনঅনেক অজানাকে জানলাম
উত্তরমুছুনঅসম্ভব ভাল একটি লেখা।
উত্তরমুছুন