নাম--খাওয়া(সুদেষ্ণা দত্ত)
খাদ্য গ্রহণের সময় অনেকেই প্রথম গ্রাস ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে নিবেদন করেন।তাই জগন্নাথ দেবের ছাপান্ন ভোগ দিয়ে শুরু করছি আজকের নিবেদন।পুরাণ মতে যশোদা বালক কৃষ্ণকে আট প্রহর খেতে দিতেন।দেবরাজ ইন্দ্রের রোষে পড়ে যখন একসময় মহাপ্রলয়ের সৃষ্টি হয়েছিল তখন শ্রীকৃষ্ণ জীব জগৎকে রক্ষা করতে কনিষ্ঠ আঙুলে গোবর্ধন পাহাড় তুলে নিয়ে সাতদিন ছিলেন নির্জলা উপবাসে।যে ছেলে দিনে আটবার খায় তাকে সাতদিন উপবাসে দেখে যশোদার মাতৃ হৃদয় ব্যাকুল হয়।তিনি ও ব্রজবাসীরা মিলে সাতদিনের আটপ্রহর হিসেবে ছাপ্পান্নটি পদ কৃষ্ণকে নিবেদন করেছিলেন।নারায়ণের সেই ছাপ্পান্ন ভোগই রূপভেদে মহাপ্রভুর ছাপ্পান্ন ভোগ।
ভিতরে মরিচ গুঁড়ো বাহিরে জুড়ায় সুতা।
তৈলে পাক করিয়া রান্ধে চিংড়ির মাথা।।
এই সুস্বাদু ব্যঞ্জনটি বরিশাল জেলার গন্ধ বহন করে আনে।স্থান,কাল ভেদে খাবারও নানা রকম হয়।ভাল রাঁধুনি কলমি শাকের গন্ধ নিয়ে পুকুর চেনে।যে কচু গাছের ছড়ার মত পাতা বেরিয়েছে,ফুলের মত হয়ে আছে গাছ--সেই গাছই গর্ভবতী বলে বুঝতেন পাকা রাঁধুনি।তারমধ্যে টইটম্বুর দুধ।ঠাকুমা—দিদিমাদের হাতের আচার,বড়ি, আমসত্ত্ব আজও কত নাতি—নাতনীর জিহ্বার লালা ক্ষরণ ঘটায়।
ইংরেজ আমলে বাংলাদেশে দুর্ভিক্ষ হয়েছিল প্রায় আঠারো বার।তবে মেছো বাঙালী কিন্তু ইংরেজ বা ডেনদের সঙ্গে মাছ খাওয়ায় পংক্তিভোজনে আসতেই পারবে না।ঈশ্বর গুপ্তের লেখনী থেকে জানা যায় ইংরেজদের সঙ্গে ভেটকি,চিংড়ি,ইলিশের প্রতিযোগিতার বাজার ছেড়ে বাঙালী কুচো চিংড়ি আর চুনো পুটিকেই অবলম্বন করে বাড়ায় তাদের স্বাদের আস্বাদ।আর বিদেশীরা বেছে নেয় দেশী তপসে।অষ্টাদশ,উনবিংশ শতকের গোড়ার দিকে এই তপসে মাছ ছিল কলকাতার ইংরেজদের আরাধনা।তপসে মাছ ইংরেজদের এত প্রিয় ছিল যে এক ডিস তপসে মাছ খাওয়ার জন্য বিলেত থেকে সমুদ্র যাত্রার ধকল নিতেও তারা প্রস্তুত ছিল।আমের মরসুমে তপসের আবির্ভাব বলে ঈশ্বর গুপ্তের মতে,
‘ এমন অমৃত ফল ফুলিয়াছে জলে।
সাহেবরা সুখে তাই ম্যাঙ্গো ফিশ বলে’।।
স্থাপত্যকে খাবারের সঙ্গে যুক্ত করে অযোধ্যার নবাবরা মাছকে প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেছেন।নবাব বংশের প্রতিষ্ঠাতা সাদাত আলি পুরোনো লখনৌয়ের কেল্লার নাম রাখেন মচ্ছিভবন।এই মাছের প্রতীকের আদি হিসেবে দুটি তত্ত্বের উল্লেখ আছে।প্রথমত,এই মাছ এক মান্য ধর্মীয় পুরুষ খাজা খিজিরের প্রতীক।তাঁর তত্ত্বাবধানেই ছিল পুরাণের সেই অমরত্বের কূপ।তিনি তার পবিত্র জল পান করেছিলেন।দ্বিতীয়ত,ইসলাম পূর্ব আমলে শেখ আব্দুল রহিম নামে বিজনৌরের এক ভাগ্যান্বেষী পারস্যে শাহী জায়গীর লাভ করেছিলেন।শেখ রহিম শাহী দরবার থেকে মৎস্য ধ্বজা দ্বারা সম্মানিত হয়েছিলেন।তাঁর কেল্লার একটা বাড়ীতে ছাব্বিশটা খিলান ছিল।তার প্রত্যেকটিতে দুটো-দুটো করে মোট বাহান্নটা মাছ খোদাই করা ছিল।তাই কেল্লাটির নাম হয়ে যায় মচ্ছিভবন।
কথিত আছে তৈমুর লঙের হাত ধরে ভারত ভূমির মাটি স্পর্শ করে প্রায় সকল মানুষের কাঙ্খিত বিরিয়ানি।আর কলকাতা বিরিয়ানি—যাতে আলু যুক্ত হয় তা আসে অযোধ্যার নবাব ওয়াজেদ আলি শাহের হাত ধরে।নবাব মেটিয়া বুরুজকে ছোটখাটো লখনৌতে পরিণত করেছিলেন।তাঁর শিরা—ধমনীর শোনিত ধারায় ছিল নবাবিয়ানা।সেই বিলাস—ব্যসনে নবাবী কোষাগারে টান পড়ে।আলুর দাম যদিও তখন কম ছিল না।কিন্তু মাংসের থেকে তো কম।তাই পর্তুগিজদের হাত ধরে আলু আসার পরেই পরিমাণ বাড়াতে সমস্ত নবাবী কর্মচারী ও সেনাবাহিনীর জন্য তৈরি হয় এই নতুন বিরিয়ানি।
সেই কবে মহাভারতের বনপর্বে যুধিষ্ঠির বলে গিয়েছিলেন, “সাধুগনের গৃহে তৃণ,ভূমি,জল ও সুনৃত এই চারি দ্রব্যের কোনকালেই অপ্রতুল থাকে না।গৃহস্থ ব্যক্তি পীড়িত ব্যক্তিকে শয্যা, শ্রান্ত ব্যক্তিকে আসন,তৃষিত ব্যক্তিকে পানীয়,ক্ষুধার্ত ব্যক্তিকে ভোজন ও অভ্যাগত ব্যক্তির প্রতি নয়ন,মন ও প্রিয় বচন প্রয়োগ ও উত্থান পূর্বক আসন প্রদান করবে।ইহাই সনাতন ধর্ম”।ভারতবাসী আজও এই ধারা বয়ে নিয়ে চলার চেষ্টা করছে।
©কপিরাইট রিজার্ভড ফর সুদেষ্ণা দত্ত।
ঋনস্বীকার:শ্রীপান্থর বিভিন্ন লেখনী,কল্লোল লাহিড়ীর রচনা,অন্তর্জাল।
ছবি সৌজন্য:গুগুল

দুর্দান্ত লেখা।
উত্তরমুছুনঅনেক কিছুই জানতে পারলাম।
👌💕🎉
"অতীব সুস্বাদু".....দারুন লেখনী....👌👌..
উত্তরমুছুন