*মন্বন্তর*
সুদেষ্ণা দত্ত
ইতিহাস বিষয়ের শিক্ষার্থী ও শিক্ষক হওয়ায় মন্বন্তর বলতে বাংলা ১১৭৬ ও ইংরেজি ১৭৭০ এর মন্বন্তরের কথাই প্রথম মনে আসে।যদিও ১৩৫০ বঙ্গাব্দে একটি দুর্ভিক্ষ হয়েছিল যা পঞ্চাশের মন্বন্তর নামে পরিচিত। মন্বন্তরের আক্ষরিক অর্থ দুর্ভিক্ষ।বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় হান্টারের Annals of Rural Bengal এর অনুকরণে তাঁর বিখ্যাত ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসে দক্ষ শিল্পীর তুলিতে এই ১১৭৬ এর দুর্ভিক্ষের করুন চিত্র অঙ্কন করেছেন।
ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের অন্যতম কারণ যে প্রকৃতির বিরূপতা তা বোধহয় আজ আর কারও অজানা নয়।ইং ১৭৬৮ খ্রিস্টাব্দ থেকে অনাবৃষ্টির ফলে কৃষি উৎপাদন হ্রাস পেতে থাকে।১৭৬৯ খ্রিস্টাব্দেও বৃষ্টি না হওয়ায় দেশে খাদ্যাভাব দেখা দেয়।
প্রাকৃতিক কারণে দুর্ভিক্ষ দেখা গেলেও সুপ্রকাশ রায় এই দুর্ভিক্ষকে “ইংরেজ সৃষ্ট ছিয়াত্তরের মন্বন্তর” বলে অভিহিত করেছেন।তার পিছনে অবশ্য যথার্থ কারণ ছিল।প্রকৃতির বিরূপতার তীব্রতা ও ভয়াবহতা বৃদ্ধি পেয়েছিল শোষণ,নিপীড়নের ফলে।দ্বৈত শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তন ও কোম্পানীর রাজস্ব নীতি দুর্ভিক্ষের প্রকোপ বৃদ্ধি করেছিল।এরফলে কৃষকদের অবস্থা হয়েছিল শোচনীয়।এই অবস্থায় অজন্মার ফলে খাদ্যাভাব দেখা দেয়।শস্যক্ষেত্রে বিপর্যয়ের ফলে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পায়।তা সত্ত্বেও রাজস্ব আদায়ের কঠোরতা হ্রাস পায়নি।এই দুর্দশা দূর করতে কোম্পানী কোন ত্রাণ ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি।উপরন্তু এই অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে কোম্পানী ও তার কর্মচারীরা একচেটিয়া বাণিজ্যিক অধিকারের সুযোগে পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি করেছিল।এমনকি দুর্ভিক্ষের সময় কম দামে চাল কিনে বেশি দামে বিক্রির জন্য গুদামজাত করে রাখে।অশনি সংকেত চলচ্চিত্রে এর রূপায়ণ আমরা দেখেছি।এই কৃত্রিম চহিদা সৃষ্টির ফলে ভয়াবহতা আরও বৃদ্ধি পায়।এছাড়া কোম্পানীর নিজের সৈন্যবাহিনীর জন্য প্রচুর খাদ্য শস্য ক্রয় করে মজুত করেছিল এবং কোম্পানী বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে খাদ্যশস্যের অবাধ চলাচল নিষিদ্ধ করে দিয়েছিল।
দুর্ভিক্ষের ফলে জনসংখ্যা হ্রাস পাচ্ছিল।রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ সেই অনুপাতে কমেনি।দুর্ভিক্ষের সময় রাজস্ব আদায়ের জন্য ছিল ‘নাজাই প্রথা’-অর্থাৎ যারা পালায়নি বা বেঁচে ছিল তাদের উপর চাপানো হয়েছিল অতিরিক্ত অর্থের বোঝা।
আমরা বর্তমান পরিস্থিতেও দেখছি প্রতিকূল অবস্থায় বেশ কিছু মানুষ অসদুপায় অবলম্বন করছেন।দুর্ভিক্ষের ফলেও চুরি-ডাকাতির সংখ্যা আতঙ্কজনকভাবে বাড়তে থাকে।গ্রামে গ্রামে ডাকাতরা নির্ভয়ে ডাকাতি করে বেড়াত।দিনাজপুরে সন্ন্যাসী বিদ্রোহ শুরু হয়।আগে সমতলভূমির মানুষরা ডাকাতদের গতিবিধির উপর লক্ষ্য রাখত এবং সরকারের পক্ষে তাদের দমন করা সহজ হত।কিন্তু দুর্ভিক্ষের ফলে জমিজমা ছেড়ে চলে যাওয়ায় তাদের উপদ্রব বাড়তে থাকে।
ছিয়াত্তরের মন্বন্তর বাংলার অর্থনীতিকে এক গভীর বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দেয়।অধ্যাপক বিনয় ভূষণ চৌধুরী মন্তব্য করেছিলেন, “The famine affected the economy mainly by causing extensive rural depopulation.”
বাংলার শিল্পও বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।রেশম ও তাঁত শিল্পে জড়িত শ্রমিকদের মধ্যেই মৃত্যুহার ছিল সবচেয়ে বেশি।অস্বাভাবিকভাবেই দুর্ভিক্ষের পর শিল্প উৎপাদন ব্যাপকভাবে হ্রাস পায়।মাঝিমাল্লা ও গরুর গাড়ির গারোয়ানের মৃত্যুর ফলে যান চলাচল ব্যাহত হয় এবং তার ফলেও ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বুদ্ধদেব বসুর,
“তোমারে স্মরণ করি আজ এই দারুন দুর্দিনে
হে বন্ধু হে প্রিয়তম।সভ্যতার শ্মশান শয্যায়
সংক্রামিত মহামারী মানুষের মর্মে ও মজ্জায় ...”
লোভ-লালসা মানবতার স্খলনে সমাজ সংসার জুড়ে আজ মানব হৃদয়েও জাগ্রত মন্বন্তর।
©কপিরাইট রিজার্ভড ফর সুদেষ্ণা দত্ত।
ছবি সৌজন্য:গুগুল।

খুব ভালো লাগল ❤❤
উত্তরমুছুনছিয়াত্তরের মন্বন্তর এর সাথে ইতিহাস বইয়ের পাতাতেই প্রথম পরিচয়.... সত্যি কথা বলতে কি সেই ছোট বয়সে সেই সময়কার ভয়াবহ বর্ননা পড়ে একটা অদ্ভুত কষ্ট হতো... আজ ছোট্ট পরিসরে সুদেষ্ণার এই লেখাটা নতুন করে সেই সেই কষ্ট টাকে জাগিয়ে তুললো.... বলা যেতে পারে আজকের সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে এই লেখাটা আরো কিছু উপলব্ধিও করালো...
উত্তরমুছুনঅসাধারণ একটা লেখা উপহার দিলি! 👍👍❤️❤️💯💐🌷
উত্তরমুছুন