সঠিক মানচিত্র
আর কিছু সময় পর থেকে স্বাধীনতা দিবস ৭৫ তমের সাক্ষী হব আমরা। কত মানুষের হাত ছেড়ে দিতে হল, তারা আর পঁচাত্তরের স্বাধীনতা দেখতে পেলো না। কি হবে দেখে! অনেকেই হতাশায় বলেন, আবেগহীনতা বাড়ছে। স্বাধীনতা দিবস নিয়ে সেই আবেগহীনতা বাড়ছে। বাড়ছে অসুরক্ষিত হতাশা ।
কেন এই স্বাধীনতা? কি দিল এই স্বাধীনতা? কত প্রশ্ন। শয়ে শয়ে লেখা দেখি কি পাইনির হিসেব সাজিয়ে সুন্দর করে পরিবেশিত হয়। না পাওয়া ব্যাথা আগাছার মতো বড়ো হতে হতে কখন যেন ঢেকে দিয়েছে সেই কষ্টে পাওয়া দিনের আন্তরিকতাকে। সেই টিভি খুলে প্যারেড দেখার বিস্ময়, এখনের শিশুদের চোখে বিস্ময় নেই। রুটিনে আবদ্ধ এও একটা দিন। হয় পতাকা ওড়ানো, কিন্তু যেন মন মরা, রোজ দেখে একঘেয়ে হয়ে যাওয়া দৃশ্য। তার ওপর আকাল। সমস্যা দরজায় টোকা দিয়েছে।
দেশের মাটি, যাতে মাথা আপনাআপনি নুয়ে আসে সেই যে দেশে ভায়ের মায়ের স্নেহ, কোথাও পাওয়া যাবে না ....কবি নিশ্চিত ছিলেন। সেই সুজলাং সু ফলনাং শস্য শ্যামলং মাটি ....তাকে আপনার ভাবার ধরন পাল্টে গেছে। এখন এই দিনটি ছুটির দিন উৎসব মাত্র। আমাদের মত নির্বিবাদে মানুষ গান কবিতা নাচে দিনটাকে খুঁজে নেবার চেষ্টা করি। কিন্তু সত্যিই কি আমরা চিনি এই দেশের মাটিকে? কতটুকু মাটি আমাদের দেশ!! মানচিত্রে অবশ্য পাওয়া যাবে এর উত্তর। কিন্তু মনে কি সত্যিই আমরা মানি!
আমরা " বসুন্ধরা কুটুম্বকম্" আইডিওলজি নিয়ে ব্যস্ত আছি। উদার মনোভাব নিয়ে রবীন্দ্রনাথের শেখানো পথে বিশ্বায়নের পথে হাঁটি। কিন্তু আমার দেশের মাটি ভাষার ছোট্ট পরিধির মাঝে আবদ্ধ। কাঁটাতার টোপকে ছুটি গলা জড়াতে কিন্তু অন্য রাজ্যকে বলতে পারি না ... আমি তো তোমাদের লোক। আমাদের স্বাধীনতা দেশের মাটিকে এক ত্রিশঙ্কু অবস্থায় রেখে দিয়েছে। ধর্ম না ভাষা! প্রশ্ন চিহ্ন তুলে তিরঙ্গাকে সর্বদা চ্যালেঞ্জ দিচ্ছে।
জানি না দেশের মাটি বলতে কতটুকু বুঝি? তবে ক্রিকেট কিংবা অলম্পিকে জিতলে বুকের ভেতর একটা চিন চিনে আবগ কাঁপিয়ে দেয়। এটাই হয়ত দেশপ্রেম। ভারতীয় দেশ ভক্তি। এখানে দেশের মাটির মানচিত্র স্পষ্ট। কিন্তু উন্নাসিকতায় কেউ কাউকে ছেড়ে কথা বলে না। কথায় কথায় শুনি.... বাঙালীরা আত্মকেন্দ্রিক এবং পলিটিক্স বাজ। গা জ্বলে কিনা বলুন? জ্বলে, জ্বলতে পারে। কিন্তু কখনও ভাবি না... ননবেঙ্গলী মত কেউ "নন" কথাটা কোন প্রদেশে ব্যবহার করে না। সুতরাং তালি দু হাতেই বাজে। তাই তো কখনও যুবা নেতার গলায় শুনি " ভারত টুকরো টুকরো হবে। " কি সেই হতাশা যাতে এমন তেঁতো বক্তব্য উঠে আসে!! দেশের মাটি বলতে আঁকড়ে ধরি প্রাদেশিক জীবন যাত্রাকে। বিশ্ব মানবতার বিশাল আদর্শ তৈরীর আগে তাই প্রাদেশিক রেষারেষি বন্দ করতে হবে।
ইংরেজি বছরের প্রথম দিন ওনারা সপথ নেন, দেখাদেখি আমরাও শিখে নিয়েছি। কিন্তু ১৫ই আগস্ট, প্রতি বছর যে স্বাধীনতা উপভোগ করছি। কখনও কি ভেবেছি একবছরের জন্য এই দেশের মাটির সপথ নেয়া হোক। কখনও কি প্রয়োজন ছাড়া কোন একটি প্রাদেশিক ভাষা শেখার চেষ্টা করেছি। আমার পরিচিত একজন আমায় লিখেছিলেন " প্লিজ হিন্দি নয়, বাংলা নয়ত ইংরেজি তে এস ও মেস লিখো। অবাক হয়ে ভাবলাম বিদেশী ভাষা জানা এতো কি গর্বের বিষয় হয়ে গেল যে একটু বেঁকা ভাবে বলাই যায় দেশীয় অন্যভাষা শিখতে জানতে লজ্জা কিংবা ঔদাসীন্য বোধ করি। এটা কি ছিল গর্ব ,স্বীকারক্তি, না কটাক্ষ।
দেশ সম্পর্কে কিছু মানুষ কিছু জানেই না। মানে ইতিহাস ভূগোল অর্থনীতি কিংবা বৈদেশিক নীতি। সাধারণ অনেক মানুষ আছে যারা জানেন না ২৬শে জানুয়ারি কেন হয়? দেশের সীমান্ত গ্রামের মানুষের জীবন কেমন অনেকে তার কোন খবরের প্রত্যাশা না করেই বলে আই লাভ মাই ইন্ডিয়া।
দেশের মাটির প্রতি মায়া তখন জাগবে যখন একাত্ম হতে পারবো। যখন আঙুল তুলে কেন্দ্র রাজ্য করে চেঁচিয়ে মরবো না। কিছু নেই। রেশন নেই রাস্তা নেই কারেন্ট নেই বস্তি বেকারত্ব কালোবাজারি কিংবা গুস খোরি আছে বলে দেশের মাটির প্রতি বিতৃষ্ণা ঠিক সমস্যা সমাধান নয়। স্বাধীনতা প্রাপ্তির দিন থেকে আজ ৭৪ টি বছর কাটিয়ে এসে ভারতবাসীর গর্ব করা উচিত। একটা লুটে যাওয়া ছিঁড়ে ফেলা দেশ বিশ্ব আসনে সেরার জায়গা করে নিয়েছে। ভারতের বৈদেশিক নীতি এখান এমন জায়গায়, সেখানে তাকিয়ে বলাই যায়.... তুমি ঘৃনা করো, কিংবা ভালোবাসো, হে বিশ্ব তুমি আমাদের ইগনোর করতে পারবে না। ছটি দশক পেরিয়ে এসে ভারত অর্থনৈতিক শিক্ষা এবং চিন্তা শক্তিতে অনেক অগ্ৰসর করেছে তা হয়ত বিতর্কিত চোখে দেখলে বোঝা যাবে না। ভারত ও ভারতবাসীর গড় জীবন যাপনের ধরন বলে দেবে হিসেব। হলফ করে বলা যায় পৃথিবীর পশ্চিমে ছোটা অনেকে স্বীকার করবে এই দেশে শান্তি অনেক বেশি। অনেক বিষয়ে নিশ্চিন্ত বিশ্লেষণ প্রতিবাদ কিংবা স্বাধীন চলাফেরার সুযোগ আছে। যারা এই দেশের মাটির দিকে আঙুল তুলে বলে " আতঙ্কিত " তাদের কাছে প্রশ্ন তবে এখনও এই দেশ ছাড়তে পারলেন না কেন? এই দেশ সেই জায়গা যেখানে কেবল নিজেদের নাগরিক নয়, বিদেশী শরনাগতদের দীর্ঘ বছর সুরক্ষা দিয়ে এসেছে। তসলিমা ও লামা তার নিদর্শন। সুরক্ষা আছে বলেই, যারা নিজেদের অসুরক্ষিত ভাবে, তারাও মিটিং মিছিল এমনকি সাংসদে বসার জায়গা পায়। এই দেশের মাটি, সব পেয়েছির দেশ। পৃথিবীর যে কোন দেশে ঘুরে এসে দেখবেন ভারতীয় আন্তরিকতা ও আবেগ অবশ্যই আলাদা স্পর্শ দেবেই।
রাগ করে অনেকেই বলবেন, তা হলে তো হয়েই গেলো, সব পেয়েছো দারিদ্র্য ধর্ম নিয়ে লাঠালাঠি অর্থনৈতিক ঘোটালা সামলাও। না সব জিনিস কয়েকটি বছরে পাল্টে যেতে পারে না। তিনশো বছর ইংরেজ শাসন ও শোষণের পর, মুখ থুবড়ে পড়ে যাইনি। পায়ে পা মিলিয়ে এগিয়ে তো গেছে দেশ। যা হয়নি তার জন্য আমরা, এই সাধারণ জনগণ কি দায়ী নয়!!আমরা সামান্য না পাওয়ায় ভাঙচুর করি। আন্দলন করে সাংসদের চেয়ার টেবিল ভাঙি মন্দির মজিদ ভাঙি, রেলের লাইন উবড়ে দি। একবারও ভাবি না রাষ্ট্রের সম্পত্তি বা ঐতিহাসিক ঐতিহ্য নষ্ট করা মানে নিজের পায়ে নিজেই কুড়ুল মারছি। দেশের মাটির পক্ষে সারা রাত কথা বলে যেতে পারি। অশিক্ষা কু শিক্ষার জন্য শিক্ষিত আমরা চায়ের দোকান ক্লাব ঘরে চেঁচিয়ে মরি। সামনে এসে একটিও খাতা কি কখনও কিনে দিয়েছি। কখনও কি পথ ঘটের গাড্ডা দেখে নিজে এগিয়ে গেছি? কখনও কি বলেছি বিভদ কি সে? কখনও কি দেশের মাটির জন্য এগিয়ে গেছি রাজনৈতিক অসৎ শক্তির বিরুদ্ধে! সাধারণ মানুষ চাইতে পারি, দিতে গেলে হিসেব করি। মলে বিনা বাক্যে জিনিস কিনি, আর সব্জি দোকানের বুড়ির সাথে পাঁচ টাকার দরাদরি করি। সরকারি নিয়ম ভাঙবো বলে ঘুষ দিয়ে তৈরি করি আর একটি অসৎ জনগণ। শত শত ভুলে আমরাই নিজেদের পিছিয়ে রাখি। স্বাধীনতার দায় ভার কেবল সরকারের নয়। জনগণ কখনও ভেবেছে এই বিপুল জনস্ফিতি কত ভয়ঙ্কর রূপ নিতে পারে! জন্মনিয়ন্ত্রণ আইন করলে মানতে পারবে কয়জন? দেশের মাটি ভাঁড় মে যাক, সবাই আখের গোছাই। আর দূর দেশের দিকে তাকিয়ে হাপিত্তেস করি। হয়নি আর পাইনি। রোজগারের পয়সা কেউ কি রোজকার কোন একটি গরীবের ঘর চালানোর কিছু কিনে দিতে চাইবে কেউ! দিনের পর দিন বিনা স্বার্থে? অথচ যদি নিম্নতম গরীবের সরকারি নির্দেশে লাইগেশন করানো হয়, মানবাধিকার বলে হায় হায় উঠবে। সরকারি প্রধানমন্ত্রী আবাসনে আসল আবাসিক নেই, বেচে দিয়ে আবার নতুন বস্তি হচ্ছে। দেখবে কে? বলবে কে? হায় দেশের মাটি। কেবল দোষারোপ নয়। এবার কিছু সপথের সময় এসেছে। আঙুল ওই দিকে নয় নিজের দিকে উঠুক। আসুন না ছোটো একটা সপথ করি কাল থেকে প্রাদেশিকতা ভুলবো। একটু নিজের দেশকে নিজের ভাববো।
শুভ রাত্রি, জয় হিন্দ।
নতুন স্বপ্ন দেখবো না, পুরনো স্বপ্ন সফল করবো। শিশুকে সঠিক মানচিত্র শেখাবো । ঠিক দেশের মাটি কতটা।।
স্বাধীনতা র শুভকামনা সবাইকে

খুব সুন্দর লাগল। অসাধারণ! 👍👍❤️❤️🌷🌷💯
উত্তরমুছুনধন্যবাদ🙏💕
মুছুনখুব ভাল লাগল।
উত্তরমুছুনধন্যবাদ🙏💕
উত্তরমুছুন