#বিষয় - *জন্মদিন-স্মরণে।*
#নাম - *'স্বামী বিবেকানন্দ।'*
✍️ - মৃদুল কুমার দাস।
দক্ষিণেশ্বরে নরেন্দ্রনাথের অচিরেই যোগাযোগ ঘটল। মিত্তির ম'শায়ের বাড়ীতে নরেনকে দেখে সপ্তরথির এক রথি দিব্য দৃষ্টিতে দেখলেন ঠাকুর। তাঁকে জড়িয়ে ধরতে খুব ইচ্ছে করছিল, কিন্তু চারদিকের মানুষ ও লোকলজ্জাজনিত কারনে নিজেকে সংযত রাখলেন। আর যাওয়ার সময় ঠাকুর নরেনকে দক্ষিনেশ্বরে আসার জন্য ডেকে গেলেন। নরেন রাজি হলেন,ও সে নাহয় হবে এমন একটা ভাব নিয়ে।
নরেন পায়ে পায়ে একদিন গেলেন। প্রথম প্রথম বিশ্বাসই হচ্ছে না ঈশ্বর দর্শন করাতে পারবেন কিনা। আর সেই নরেন ঠাকুরের তিরোধানের মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যে নরেন্দ্রনাথ কি হয়ে যাবেন ঠাকুরের কৃপায় সে তো সবার জানা।
নরেন ঠাকুরের সংসারে ঢুকে জানতে পারলেন-
এই জগতের রূপ এক নির্বাক শূন্য ব্রহ্মান্ডের মধ্যে প্রকাশিত যা অসীম মর্ত্য সীমায় এক আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় নেমে এসেছে। প্রকৃতি তাঁরই অলঙ্কার। তাঁকেই প্রকাশের জন্য মানুষের আকূতি থেকেই ঈশ্বর লাভের পথ খোঁজে। ঈশ্বরকে খুঁজতে গিরি গুহায় সাধু তপস্যার পথগামী হন। জগৎ সংসার তুচ্ছ জ্ঞান হয়। সকলের যদি এই ইচ্ছা পূরণ হত তাহলে সব মানুষ তো সাধু হয়ে যেতেন। কিন্তু তা তো নয়। হওয়ার কথাও নয়। মানুষ জগতের অংশ। পঞ্চভূত থেকে জন্ম। পঞ্চভূতের অংশ। এই জগৎ তার জন্য। জগত সংসারকে উপেক্ষা করে বাঁচা অসম্ভব। তাই মানুষ থাকে জগতের সীমাবদ্ধতার মধ্যে। স্বভাব তার সীমাবদ্ধ। তাই কোনো বস্তু যদি সীমাবদ্ধ হয় তবেই সে ভাল বোঝে। তাই কোনো কিছু বোধগম্য হতে হলে বস্তুকে বিভাজিত ও সীমিত হতেই হবে।
যেহেতু ঈশ্বর ও তাঁর শক্তি অবিভাজ্য ও অসীম, সেহেতু সীমাবদ্ধ মানুষের পক্ষে ভাগবতীয় শক্তি বোধগম্য হওয়া সম্পূর্ণ অসম্ভব। সাধু-সজ্জন ব্যতিক্রম। তাঁদের সংখ্যা মুষ্ঠিমেয়। জগত সীমাবদ্ধ চেতনা সম্পন্ন মানুষের। অবতার ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ ঈশ্বরের অংশ হয়েও শিষ্য নরেন্দ্রনাথকে জগৎ-নিরপেক্ষ হয়ে থাকতে দিলেন না। নরেন্দ্রনাথ জগৎ থেকে নির্বাসন চাইতেই ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁকে স্বার্থপরের দাগা দিলেন। ওটি হবে না। জগতকে শিক্ষা দিতে এসেছ, শিক্ষা দিতে হবে... ঘাড় পারবে।
কী সেই শিক্ষা?
'জীব সেবা শিব সেবা'।
দেশে ধর্মের ছড়াছড়ি। তার উপর খ্রিস্টানরা রাশি রাশি পাথর ঠেসে গুঁজে গীর্জার পর গীর্জা বানিয়ে চলছে। ধর্মের কথায় পেট ভরে না কবে ভরেছে? পেটে ক্ষুধা,ধর্মে পেট ভরবে না। গীর্জার বদলে যদি ওরা অন্ন দিত তাহলে মানুষ ধর্মের কথা শুনত। খালি পেটে ধর্ম হয়না। যে অন্ন দেবে মানুষ তার সঙ্গে। এই মর্ম বাণী ঠাকুর শিষ্যের কানে ঢেলে দিলেন। দরিদ্রকে নারায়ণ জ্ঞানে অন্ন সেবা দিতে হবে।
সীমাবদ্ধ চেতনায় আবদ্ধ মানুষ অনন্ত ও অখন্ড ঈশ্বরেরই বা কী বোঝে। বোঝে ক্ষুধা পেটে অন্ন। এই মোক্ষম কাজটি ঠাকুর শিষ্যকে দিয়ে করিয়ে নিলেন। তারপরে অখন্ড ঈশ্বরের কথা, মানুষ,প্রকৃতিও ঈশ্বরের অংশ বলতেই মানুষ কত সহজেই নিতে পারল। জীবে প্রেম থেকে ঈশ্বরে প্রেম এল। অখন্ড ঈশ্বরকে খন্ডরূপে যেই অনুধাবনের মধ্যে এল, অমনি অখন্ড ঈশ্বরের স্বরূপ উপলব্ধিতে আসার সুযোগ পেল। বহুর মধ্যে একত্বের ভাব কত সহজেই আনা গেল। ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ স্বামী বিবেকানন্দের মধ্যে সেই ভাববাদের জন্ম দিয়ে জগতকে কি সুন্দর শিখিয়ে পড়িয়ে নিলেন।
আর পাশ্চাত্য চেনাতেই আমরা চিনলাম। পাশ্চাত্যকে কীভাবে চিনিয়ে ছিলেন!
চিকাগো বিশ্বধর্ম মহাসম্মেলন। মহাসম্মেলনে প্রাণের আকূতিভরা জলদগম্ভীরস্বরে নিনাদিত কন্ঠে গোটা বিশ্ব শুনবে -
"সিস্টার্স অ্যান্ড ব্রাদার্স অফ আমেরিকা..."
এই কথাগুলো বলবেন বলেই কি তাই ভেবে তিনি ভারতবর্ষ ছেড়েছিলেন। না একদম না।
কলম্বাস হলের দর্শকাসনে সাত হাজার আমেরিকার বোদ্ধা নরনারী। অদূরে নিউ লিবার্টি বেলে শোনা গেল- টেন সলেম স্ট্রোকস্- সকাল দশটা,১১ সেপ্টেম্বর- ১৮৯৩ খ্রিস্টাব্দ। ঘন্টার ধ্বনিই যেন বলে দিচ্ছে -
'A new commandant I give unto you,that you love to another.'
পূর্ববর্তী বক্তাদের লিখিত বক্তব্য শুনে অভ্যস্ত শ্রোতৃগণ, দেখছেন অপার কৌতূহল ভরা দৃষ্টি নিয়ে,এ কোন সন্ন্যাসী যাঁর হাতে কোনো লেখিত বক্তব্য নেই। হিন্দুধর্মের উপর আলোকপাতের কি-ই বা আছে, তখন পাশ্চাত্য জানত প্রতাপ চন্দ্র মজুমদারের হিন্দুধর্ম, যিনি ( প্রতাপ চন্দ্র মজুমদার) আবার এই মহাসম্মেলনের অ্যাডভাইসরি কাউন্সিলের মনোনীত সদস্য,তাঁর বহূল প্রচারিত বক্তব্যের উর্ধ্বে কি এমন নতুন বার্তা দেবেন। তাই নিয়ে শ্রোতৃগণের অপার কৌতূহল! গোটা হল তখন দেখল এক আলোকময় পুরুষকে। আপাদমস্তক গেরুয়া বসনে আবৃত। নিস্তব্ধ গোটা সম্মেলন কক্ষ।
আর অমনি যেই না জলদগম্ভীর স্বরে নিনাদিত হয়ে উঠল- "হে আমেরিকাবাসী বোন ও ভাইয়েরা..." -সে যেন এক ব্রাহ্মমুহূর্ত! নিস্তব্ধ কক্ষ খান খান, যেন দর্শকাসন হলো বিদ্যুৎস্পৃষ্ট! উল্লাসে আসন ছেড় লাফিয়ে উঠলেন সকলে। ডিসিপ্লিন গেল ভেসে। তালি আর তালি। সে অনেকক্ষণ!
নিস্তব্ধ ডিসিপ্লিন কক্ষে গুরুই যেন শিষ্যের জিহ্বাগ্রে উপবিষ্ট হয়ে বলতে বলেছিলেন -
শোনাও তোমার মাতৃভূমির মর্মবাণী 'যত মত তত পথ।' শোনাও আমিই ভারতবর্ষ। দরিদ্র ভারতবাসী,চন্ডাল ভারতবাসী আমার ভাই। শোনাও বিশ্বের জন্য একটা মন্ত্র,যে মন্ত্রে ধর্ম,রাজনীতি,যুদ্ধ,সংঘাত সব দূর হয়ে যাক। সকলে আমার ভাই ও ভগিনী। বাইবেল,কোরান,বেদ জেন্দাবেস্তা সব এক। যথা -
*"নদীনাং বহোবম্বুবেগাঃ - যে যথা মাং প্রপদ্যন্তে। শান্তিই বেদ। ভ্রাতৃত্বই হলো অমৃতত্ত্ব।"*
******
#কপিরাইট রিজার্ভ ফর মৃদুল কুমার দাস।
খুব সুন্দর লেখা। পড়ে সমৃদ্ধ হলাম।
উত্তরমুছুনঅসম্ভব ভাল লেখা।সমৃদ্ধ হলাম।আপনার কাছে এমনটাই প্রত্যাশা থাকে।
উত্তরমুছুনঅনবদ্য
উত্তরমুছুনএমন সুন্দর সাজানো লেখা তৃপ্তি পাওয়া যায়।
উত্তরমুছুনঅসংখ্য ধন্যবাদ দাদা💐💝
অসাধারণ লেখা🙏🌸🙏
উত্তরমুছুনএই মন্তব্যটি লেখক দ্বারা সরানো হয়েছে।
উত্তরমুছুনঅপূর্ব লেখা
উত্তরমুছুনEngrossing 👍👍👍👍
উত্তরমুছুন🙏🙏💐💐
উত্তরমুছুন