বুধবার, ১১ আগস্ট, ২০২১

#নাম-মন্বন্তর। ✍️ - মৃদুল কুমার দাস।

শুভ শব্দ আলোচনা বাসর।
  #বিষয়- *শব্দ আলোচনা।*  # নাম- *মন্বন্তর*।
  ✍️- মৃদুল কুমার দাস।

   মন্বন্তর একটি অভাবের ভাব বোঝাতে শব্দবন্ধ। মৃত্যু, হাহাকার,ক্ষুধা, শ্মশান, কাফন,দুর্দিন, দুর্যোগ,মারী, মড়ক নরক - কথাগুলো মানব সভ্যতার দুঃখজনক অবস্থা কতখানি সেখানে এক লহমায় হাজির করে। 
  মণ্বন্তর-পীড়িত জীবনের এক মর্মন্তুদ কাহিনির দুটি অধ্যায়ের সময়কাল - একটি ১৭৭০ খ্রিষ্টাব্দের,বাংলা সন ১১৭৬ বঙ্গাব্দ,অপরটি ১৯৪৩ খ্রিষ্টাব্দ বা বাংলা সন ১৩৫০ বঙ্গাব্দ। দুই মন্বন্তর সোনার বাংলা সেদিন শ্মশান বাংলায় পরিণত হয়েছিল। দুই মন্বন্তরের একটি দিয়ে ব্রিটিশ সরকারের পত্তন,পরেরটি দিয়ে পতন। দুই মন্বন্তরের মধ্যবর্তী ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শাসনে আমারা ব্রিটিশ উপনিবেশের অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়েছিলাম। আমরা নিজেদের জন্ম ভূমিতে পরাধীনতার গ্লানি নিয়ে সে মর্মান্তিক বেদনা বয়ে বেড়িয়েছিলাম কীভাবে তারই ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়। ১৭৭০ থেকে ১৯৪৩ - এই একশ'পঁচাত্তর বছরের ইতিহাসে মন্বন্তর ও পরাধীনতা,স্বাধীনতা আন্দোলন,রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম, বিপ্লব,আত্মবলি দান,সব যেন একটা আমাদের বিধিলিপি নির্দিষ্ট দুর্ভাগ্যের ইতিবৃ্ত্ত। এই মন্বন্তর নিয়ে কিছু কথায় আসা যাক। 
  সাহিত্য, চিত্রকলা,চলচ্চিত্র, নাটকে ১৯৪৩ এর মন্তরের কথা কতভাবে যে বোঝানো হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। 
    ১৭৭০ বা ছিয়াত্তরের মন্বন্তর পলাশীর যুদ্ধ(১৭৫৭)-এর পর বনিক ইংরেজের হাতে মানদন্ড রাজদন্ডে পরিণত হতে যেটুকু বাকি ছিল বক্সারের যুদ্ধে মীরকাসিমের পরাজয়ের পর থেকে ব্রিটিশ কোম্পানি পেয়ে গেল আমাদের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করার পূর্ণ অধিকার। ক্লাইভ ও ওয়ারেন হেস্টিংসের দ্বৈতপীড়নে,রাজস্ব আদায়ের রেজা খাঁ ও সিতাব রায়ের নৃসংশ আচরণে বাংলার ভাগ্যাকাশে দুর্ভিক্ষের মাঝে প্রশাসনিক অত্যাচার, রাজস্ব আদায়ের লুঠতরাজের অরাজকতায় সোনার বাংলা শ্মশান বাংলায় পরিণত হওয়ার পরিচয় বঙ্কিমচন্দ্র চট্টপাধ্যায়ের 'আনন্দমঠ' অন্যতম প্রমাণ। 'আনন্দমঠ'-এর সন্তান দল দুর্ভিক্ষের বিরুদ্ধে বিপ্লবী সন্তান দল ছিল। 'দেবী চৌধুরাণী' উপন্যাসের ভবানী পাঠক বঙ্কিমচন্দ্রের সিভালরিক হিরোর(ধনীর ধন ছিনিয়ে দরিদ্রের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়া) একটি দিশাও মন্বন্তরের বিরুদ্ধে একটা বলিষ্ঠ প্রত্যয়ের কথাও পাই। সেদিন পথে প্রান্তে মানুষের মৃত্যুর মিছিল, আকাশে মৃত মানুষকে ঘিরে আকাশে চিল শকুন,আর স্থলভূমিতে নিষ্ঠুর শাসক মানুষ আর সেদিন মানুষের অবস্থায় ছিল না।
  তবে তেতাল্লিশের মন্বন্তর নিয়ে ইতিহাসের পাতা সবচেয়ে বেশী খরচ হতে লক্ষ্য করি। এখানেও ব্রিটিশ সরকারের বিদায় ঘন্টা বেজেছে,দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা,অজন্মা,খরা,খাদ্য নিয়ে মুজুতদারী প্রথা,স্থানে স্থানে কৃত্রিম খাদ্য সঙ্কট ও চোরাবাজার,সরকারের যুদ্ধের জন্য খাদ্যের মজুত সে এক কৃত্রিম খাদ্য সঙ্কট মেড ইন সরকারই দায়ী ছিল। সরকার সেই দুর্ভিক্ষ অনায়াসে মোকাবিলা করতে পারত,করেনি যেহেতু এদেশ ছেড়ে চলে যাবে,তাই ততটা তাদের আর প্রশাসনিক নজরদারি ছিল না। তার ফল  যে অতীব নিদারুণ ছিল দুটি নাটক - মন্মথ রায়ের 'ছেঁড়া তার' ও বিজন ভট্টাচার্যের 'নবান্ন' প্রধান নথি বললে অত্যুক্তি হয় না। সেদিন দিকে দিকে আকাশ বাতাসে ক্রন্দনরোল - ভাতের বদলে ফ্যান হলে চলবে। 
  "মানুষ এবং কুত্তাতে/ আজ সকলে অন্ন চাটি একসাথে/ আজকে মহাদুর্দিনে"( 'ডাস্টবিন'- দীনেশ দাশ) 
   "জঞ্জালের মতো জমে রাস্তায় রাস্তায়,/ উচ্ছিষ্টের আস্তাকুঁড়ে বসে বসে ধোঁকে,/আর ফ্যান চায়।"( 'ফ্যান'- প্রেমেন্দ্র মিত্র)
   একদিন যারা অন্ন যুগিয়েছে তারাই অন্নহীন হয়ে শহরের রাস্তায় রাস্তায় মৃত মানুষের মতো,মৃত্যুর মিছিলে তারা। তৎকালীন ছবি - এক মা সন্তানকে বুকের দুধ অনেক কষ্টে সংগ্রহের জন্য যতক্ষন সময় লাগে, সংগ্রহ করে পেছন ফিরে দেখে সন্তান মরে পড়ে। শেষে নিজেই সেই দুধটুকু পান করে চলতে থাকে। শহরময় এতো মৃত্যুর লাশের পাহাড় সেদিনও নদীর জলে মা ছেলেকে,বাবা মাকে সন্তান ভাসিয়ে ছিল। দাহ তো দূরের কথা। 
 চিত্রকলায় সেই মন্বন্তর নিখুঁতভাবে ধরা দিয়েছিল। দেবীপ্রসাদ রায়চৌধুরী,জয়নুল আবেদিন,চিত্তপ্রসাদদের ছবিতে মন্বন্তর নিখুঁত রূপ পেল। 
 আর বিশ্বযুদ্ধ, মন্বন্তর, স্বাধীনতা নিয়ে চলচ্চিত্রও সমান মুখর ছিল। মৃণাল  সেনের 'আকালের সন্ধানে' একটি কালজয়ী সৃষ্টি। 
  শুধু খাদ্য নয়,বস্ত্র নিয়েও বিখ্যাত গল্প 'দুঃশাসন'এর মতো গল্পও আজও রাজসাক্ষী হয়ে আছে।
   মন্বন্তরের ইতিহাস আমাদের অনেক সাবধানতার শিক্ষা দিয়েছে। আমাদের দেশ খাদ্যে স্বনির্ভর অনেকটাই। কিন্তু মন্বন্তরের ক্ষত কোনোদিন মেটার নয়। মেটাতেও চাই না। কারণ এই শিক্ষা আমাদের আর মন্বন্তরে ধ্বস্ত করবে না। তবে যা চিন্তা মহামারীকে নিয়ে।
            *****
#কপিরাইট রিজার্ভ ফর মৃদুল কুমার দাস।

৬টি মন্তব্য:

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল✍️ ডা: অরুণিমা দাস

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল ✍️ ডা: অরুণিমা দাস বর্তমানে অতিরিক্ত কর্মব্যস্ততার কারণে একটু বেশি সময় কাজে দেওয়ার জন্য হয়তো একের প্রতি অন্য...