#বিষয়_অপুষ্টি
#কলমে_অনিশা
"তুমি এখন যাও তো দিদিমণি", মুখ ঝামটা দিয়ে বলে উঠেন সুনিতা দেবী। "এই হয়েছে যত জ্বালা! কোথাও যাবে না আমার বউ, আর আমার নাতনি ও যাবে না। তুমি এলেই আমার বউটা ও যেন কেমন হয়ে যায়।" আশেপাশে বাড়ির লোকরা ও দাঁড়িয়ে যায়। একটু বুঝতে চেষ্টা করে কি হয়েছে। সুনীতা দেবী ও এই সুযোগের অপেক্ষা করে থাকেন। একটু ভিড় জমতেই শুরু করেন, "দেখো দেখি বাচা, আমার নাতনির অসুখ-বিসুখ নেই, দিব্যি ভালো মেয়ে। এমন চুপ করে শুয়ে থাকে, বসে থাকে তাতেই ওনার অশান্তি। পিছনে পড়ে আছে। রোজ আসচে আর তোমার নাতনির ওজন কম, ওজন কম। আরে বাব্বা, আমার নাতনিকে আমি রোজ চিপসের প্যাকেট কিনে দিই। ওই নিয়ে সারাদিন বসে থাকে। একটা একটা করে সারাদিন খায়। আমার ঘরে কি খাওয়ার অভাব? অপুষ্টি, অপুষ্টি করে মাতা খাচ্চে। আর এই বউটাও হয়েছে তেমনি। ওনার কথায় নাচতে শুরু করে দেবে। কোতায় না কোতায় পাঠাবে বলচে। রোজ 100 টা করে ট্যাকা দেবে আর বাচ্চাকে খাওয়ানো শেখাবে। আর ওর মাকে ও বাচ্চার রান্না করা শেখাবে। ঝোজো দিকিনি। বাড়ির সব রান্না তো ওই করে, ওকে আবার শেকাবেটা কি?"
দিদিমনি অর্থাৎ অনিন্দিতা, স্বেচ্ছায় সমাজসেবা করে। নিজেকে সমাজসেবীর তকমাটা লাগাতে চায় না। কিন্তু গরীব বস্তির বাচ্চা গুলো কে, কি করে ওখানে থেকে ও সুন্দর জীবন দেওয়া যায় অনবরত সেই চেষ্টা করে। সুনীতা দেবীর বাক্যবাণে একটু বিহ্বল হয়ে পড়ে সে। আবার বোঝাতে চেষ্টা করে, "মাসীমা শুনুন। ওর বয়স অনুযায়ী ওর যা ওজন হওয়ার কথা তার চেয়ে অনেক কম ওজন ওর। ওর মাথাটা শরীরের তুলনায় বড়। শরীরের চামড়াগুলো খসখসে হয়ে গেছে। এটাকে বলে ম্যারাসমাস।" ঝঙ্কার দিয়ে উঠলেন সুনীতা দেবী, "এবার তুমি যাও তো বাপু। আমাকে মরা মাস শেকাতে এয়েচেন। ওরম শরীলে হয়। নেয়ে আজ ওর মা ভালো করে তেল মাকায় নি। কাল থেকে আমি তেল নে বসবো। ডলে ডলে সারা শরীলে মাকাবো। তকন দেকো। আমার মেয়েটাও অমনি রোগা ছেল। একন তার চেহারা তোমার চেয়ে ও বেশী। বয়স কালে সব ঠিক হয়ে যাবে।" "তা মাসীমা, আপনার মেয়ের বাচ্ছা কত বড় হলো?" অনিন্দিতা জিজ্ঞেস করলো।
সুনীতাদেবীর গলার স্বর পাল্টে গেল। "আর বোলো না বাছা। জামাইটা আমার ভালোই রোজগার করে ভালো। বাড়িতে খাওয়া-দাওয়া ভালো। তাও আমার মেয়ের একটা বাচ্চা নষ্ট হয়ে গেল। আবার একটা হয়েছে পুরো প্যাঁকাটির মতো সরু সরু হাত-পা। ক'দিন বাঁচবে তা বলতে পারি না।" সুনীতা দেবীর চোখের জলে গলার স্বর রুদ্ধ হয়ে এলো।
অনিন্দিতা ধীরে ধীরে বললো, 'এটাই তো আপনাদের ভুল। এই যেমন আপনার নাতনি অপুষ্টিতে ভুগছে। ওর চিপসের প্যাকেটের দরকার নেই, দরকার উপযুক্ত পুষ্টিকর খাবার। যেটা আপনি না জানার ফলে ওকে দিতেই পারছেন না। এরজন্য অনেক সরকারী, বেসরকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে। আমি যেখানে আপনার নাতনিকে নিয়ে আপনার বৌমাকে যেতে বলছি ওখানে পনেরো দিন রাখবে। পুষ্টিকর খাবার দেবে, ও আপনার বৌমাকে শিখিয়ে দেবে কিভাবে ওগুলো তৈরী করবে, কোন সময় ওগুলো ওকে খাওয়াতে হবে সবকিছু। দরকার হলে আরো পনের দিন রাখবে।"
"কিন্তু আমার ঘরের কাজগুলো কে করবে? আমার বয়স হয়েচে। আমি আর কিছু পারিনা করতে।"
"কটা দিন মা-ছেলেতে চালিয়ে নিন। আর একটা কথা। আপনার নাতনি ভবিষ্যতে মা হবে। সেইজন্য এখন থেকেই তার শরীরের গঠন ঠিক মতো হওয়ার প্রয়োজন। একজন সুস্থ মা-ই পারে একটি সুস্থ শিশুর জন্ম দিতে। দেখবেন বৌমাকে অতি শাসনে রাখতে গিয়ে নাতনিকে আপনার মেয়ের মতো দুর্ভোগ না পোহাতে হয়।" কথাগুলো একভাবে বলে আর অনিন্দিতা আর সেখানে দাঁড়ায় না। কয়েক দিন ধরে অপমান সহ্য করতে করতে মানসিক ভাবে ভেঙ্গে পড়েছিল সে। এরা কিছুতেই নিজেদের ভালো বোঝে না! হঠাৎ একটা ক্ষীণ গলার স্বরে পিছনের দিকে তাকায়। দেখে, সুনীতা দেবীর বৌমা ওকে ডাকছে। কাছে এসে বলে, "আমি যাব দিদিমণি। আমার শাশুড়ি খুব কাঁদছে। বলছে দিদিমণি আমার চোখ খুলে দিয়েছে। তোর মেয়ের জন্য যা করতে হয় কর। ওর যাতে ভালো হয় তাই কর।"
অনিন্দিতার মনেও শান্তির ঢেউ খেলে গেল। "আমি পেরেছি। একজনকে হলেও শেষ পর্যন্ত আমি বোঝাতে পেরেছি।"
এমনি করে এক-একটি মেয়ে যদি একটি করে অপুষ্টিতে ভুগতে থাকা শিশুর পরিচর্যায় সহায়তা করে তবে অচিরেই আমাদের দেশ অপুষ্টি-নামক এই লজ্জাজনক অবস্থা থেকে চিরতরে মুক্তি পাবে।
@কপিরাইট রিজার্ভ ফর অনিশা কুমার।

অপূর্ব লিখলে অনি👏👏👏👏👏
উত্তরমুছুনদারুন।
উত্তরমুছুনকি দারুন লিখেছ। অসাধারণ! 👌👌❤❤⚘⚘🖋
উত্তরমুছুন