শুভ সান্ধ্য আলোচনা-বাসর
# বিষয় - *দেবদাসী প্রথা--একটি মেয়ে ও সমাজ জীবন কিভাবে প্রভাবিত করে?*
# নাম- *দেবদাসী।*
✍ - মৃদুল কুমার দাস।
*দেবদাসী* সমাজের একটি মুখ। এই দেবদাসী প্রথার অন্তর্ভুক্ত মাগধী প্রাকৃত সাহিত্যে সুতনুকা নামে দেবদাসীর কথা পাই-
*"সুতনুকা নাম দেবদাসিক্যী তং কাময়িথ বালানশোয়ে।/ দেবদিন্নে নাম লুপদখে।।"* - সুতনুকা নামে দেবদাসী বারানসীর রূপদক্ষ শিল্পী দেবদত্তকে কামনা করেছিলেন।
সেই সঙ্গে দ্বিতীয় দেবদাসী র নাম পাই কমলা। যে কিনা উত্তরবঙ্গের কার্তিকেয় মন্দিরের অপূর্ব সুন্দরী নৃত্যপটিয়সী দেবদাসী ছিলেন। যাকে লোকশিল্পী নির্মলেন্দু চৌধুরী তাঁর গানে বিখ্যাত করে রেখেছেন-
*"ভাল কইরয়্যা বাজাওরে দোতারা/ সুন্দরী কমলা নাচে।"*
কমলার সঙ্গে মনে পড়ে বৌদ্ধযুগে নগর নদী আম্রপালির কথা। মহানাম বৈশালীর প্রমোদ উদ্যানে এক মালী কুড়িয়ে পান দিব্য কন্যা আম্রপালিকে। নিঃসন্তান মহানাম সন্তান স্নেহে পালন করলেন। তাঁকে বিদুষিনী নারী হিসেবে গড়ে তোলেন। দিনে দিনে অপরূপা সুন্দরী হয়ে উঠলেন। কামকলা বিলাসে পটিয়সী। কিন্তু যেহেতু কুড়িয়ে পাওয়া কোনো দেবকন্যার মতো বলে নগরের সব জ্ঞানী গুণীদের ভোগ্যা হলেন। নগরের নটী তথা সর্বভোগ্যা রূপে গৃহীত হলেন। পুরুষতান্ত্রিক বিধানের কাছে মহানাম সন্তান হিসেবে পেয়ে সমাজের বিধানের কাছে বড়ই অসহায়। নগরের নটী করে সমর্পণ করতে হয় আম্রপালিকে।
সমাজে তিনধরণের নারী - সতী,দেবদাসী ও বিষকন্যা। এই দেবদাসীদের অবস্থা সমাজের বুকে সবচেয়ে করুণ ছিল। কারণ দেবদাসী বিক্রির মেলা বসত। দেবদাসীরা পরে বিক্রির চক্কর পড়ে বেশ্যায় পরিণত হয়। তাদের নিয়ে প্রধান পুরোহিতের ছিল কমিশনের ব্যবসা।
কর্নাটকের এক পার্বত্য নির্জন স্থানে এক মন্দির চত্বরে দেবদাসী বিক্রির মেলা বসত। তাই শুনে এক ইংরেজ পর্যটক ও সংবাদ পত্রের এডিটর সেই মেলায় যেতে চান। তখন তাঁর দোভাষী বললেন- "সর্বনাশ! এই কাজ করবেন না; খুন হয়ে যাবেন।" কারণ তা ছিল খুব গোপন ব্যাপার। পর্যটক ছিলেন সংবাদ পত্রের যেহেতু এডিটর,তাই বাইরে তথ্য পাচারের খবর পেলে ওরা খবর সংগ্রাহককে হত্যা করে ছাড়বে।
দক্ষিণ ভারতে এই দেবদাসী প্রথার রমরমা ব্যবসা ছিল। কর্ণাটক ছিল ঘাঁটি। তাকে ঘিরে তামিলনাড়ুর ভেল্লোর,রামনাথপুরম,তিরুনেলভেলু,অন্ধ্রপ্রদেশের চেকসোনামা,রাজামুন্ডুরী প্রভৃতি স্থান উল্লেখযোগ্য।যৌন আবেদনময়ী আদিবাসী মেয়েদের সস্তায় পাওয়া যেত। দেবদাসীদের গণিকাবৃত্তির কাজে লাগানোর কথা প্রথম প্রকাশ্যে আসে ১৯০৬ -৭ সালে। সে বছর আন্তর্জাতিক সনদে ভারতকে পতিতা মেয়েদের সম্পর্কে সই করতে হয়।
দেবদাসীরা দেবতার স্ত্রী। দেবমন্দিরে নিবেদিতা। দেবতার মৃত্যু নেই বলে দেবদাসীরা চির আয়ুস্মতী।
দক্ষিণভারতে প্রথা আছে যে মেয়ের বিয়েতে দেবদাসীরা হিজড়াদের মত নেচে নেচে তালি দেয় সেই মেয়ে নাকি চির আয়ুস্মতী হয়।
ভরতমুনী তাঁর নাট্যশাস্ত্র রচনার প্রেরণা লাভ করেছিলেন দেবদাসীদের নাচ দেখে। *ভারতনাট্যম* শৈলী দেবদাসীদের অবদান।
এই দেবদাসীদ প্রথা থেকে সমাজে গণিকাবৃত্তি এসেছিল। কলকাতার সোনাগাছি,বাগবাজারের হাড়কাটা গলি,কালীতীর্থ কালীঘাট ক্রমে যৌনপল্লী হয়ে ওঠে কর্ণাটক থেকে দেবদাসী সরবরাহ থেকে। কলকাতার সোনাগাছিতে প্রথম যে মেয়েটি আসে কর্নাটকের দুর্গম গ্রাম হুবলি থেকে আসে।এর আগে সে দুবার বিক্রি হয়েছিল। প্রথমবার ৮০০টাকায়। সে টাকা তার মা কেড়ে নিয়েছিল।যেতে হয়ে বোম্বাই। একবছরে হাজার পুরুষের দ্বারা ধর্ষিতা হয়। দিন রাত মিলিয়ে চার পাঁচবার।
পরের বছর এই ৬০০ টাকায়। এবারে টাকা গচ্ছিত রাখে পুরোহিতের কাছে। ফিরে গেলে পাঁচশ পাবে। আর পুরোহিত পাবে একশ'।
দেবদাসীদের নানা নাম। উৎস বিচারে। যাঁরা স্বেচ্ছায় দেবদাসী হয় তারা *দত্তা*। যে মেয়েদের মন্দিরের কর্তাদের কাছে বিক্রি করা হত তার নাম *বিক্রিতা*। যাঁরা পরিবারের স্বার্থে বিক্রি হত তারা *ভৃত্যা*। যাঁরা সত্যিকারের উৎসর্গ করত তারা হল *ভক্তা*। *গীতগোবিন্দ* এর রচয়িতা জয়দেবের স্ত্রী পদ্মাবতী ছিলেন পুরীর মন্দিরের দেবদাসী। তিনি দৈববানী শুনে অজয় নদের তীরে কেন্দুবিল্ব গ্রামে চলে এসে জয়দেবের সাধনসঙ্গিনী হন।
মন্দিরের সুনাম নির্ভর করত দেবদাসীদের সংখ্যার উপর। ১৯৩৪ এ মাদ্রাজ হাইকোর্ট বলল দেবদাসীদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে দিতে হবে। দেবদাসী প্রথা সম্পূর্ণ বে আইনী। নতুবা দেবদাসীদের বেশ্যা বলে গন্য করা হবে। গাঁধীর এই দেবদাসী প্রথা রঙের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।
দেবদাসী বেশ্যায় পরিণত হল। আর বাংলার বিধবাকুলও কাশিবাসী হওয়ার চেয়ে বেশ্যাবৃত্তি অনেক নিরাপদ ভাবত। দেবদাসী ও বেশ্যা,বিধবা ও বেশ্যা সমাজের এক সমস্যার চিরন্তন সাক্ষী হয়েছিল। বাংলা দেবদাসী ও বিধবার গতি বেশ্যাগিরিতে সমাজের এক করুন পরিণতির কথায় আজও আমাদের ধিক্কার দিয়েও বেদনার উপশম হয় না।
********
# কপিরাইট রিজার্ভ ফর মৃদুল কুমার দাস।
অসাধারণ।
উত্তরমুছুনএই তো দেবদাসীদের নিয়ে অপূর্ব সংকলন💐💝
উত্তরমুছুনঅপূর্ব তথ্যবহুল লেখা। 🙏
উত্তরমুছুনঅনেক তথ্যবহুল লেখা।
উত্তরমুছুনসমাজের বিলুপ্ত এক কলঙ্কিত অধ্যায় তুলে ধরা হয়েছে খুব সুন্দর ভাবে।
উত্তরমুছুন