বুধবার, ২ ডিসেম্বর, ২০২০

বিদিশার দিশা (উপন্যাস) (পিয়ালী চক্রবর্তী)


 

Copyright©All Rights Reserved
Piyali Chakravorty
করিমগঞ্জ জেলার দত্তপাড়া গ্রামের ব্যানার্জী বাড়ির ছোটমেয়ে বিদিশা | আজকে ওর উচ্চ মাধ্যমিকের রেজাল্ট বেরিয়েছে | প্রতিটি পরীক্ষার মতো এই পরীক্ষাতেও দুর্দান্ত রেজাল্ট করেছে ও | বাড়িতে ওর মা - বাবা - দাদা খুব খুশি |

সারা পাড়ার লোককে মিষ্টি বিতরণ করে মেয়ের গর্বে গর্বিত বিনয়বাবু বাড়ি ফিরে দেখলেন , মেয়ে মুখটাকে তেলো হাঁড়ির মতো কালো করে বসে আছে , আর বিদিশার দাদা নবেন্দু খুব আস্ফালন করছে |

বিনয়বাবু চোখের ইশারায় ওনার স্ত্রী সবিতা দেবীকে জিজ্ঞাসা করলেন কি ব্যাপার ?

সবিতাদেবী : তোমার মেয়ের কান্ডজ্ঞান বলে কিছু আছে ? এখানকার কলেজে ভর্তি না হয়ে ওনার ইচ্ছে হয়েছে শিলচর শহরে গিয়ে সেন্ট অগাস্তিন ওম্যান্স  কলেজে ভর্তি হবে | নবেন্দু আমাকে বলছিলো , শিলচর শহরে চেনাজানা না থাকলে খুব মুশকিল | একেই তো বহু লোকের বসবাস , তার ওপর খুব গাড়ি- ঘোড়ার ভীড় ওখানে | এই মেয়ে ওখানে গিয়ে পড়বে বলে জেদ  ধরেছে , আর দাদার সাথে মারপিট করেছে | খেয়েছেও দুটো চড় , তাই এখন মুখটা বাংলার পাঁচ করে বসে আছে |

বিদিশা এতক্ষন চুপ করে বসে সব কথা হজম করছিলো , এখন ওর বাবার সামনে উঠে এসে কান্না শুরু করে দিলো , ' বাবা , আমি সেন্ট অগাস্তিন কলেজে ফিজিক্স অনার্স নিয়ে পড়তে চাই | তুমি কারুর কথা শুনবেনা , তুমি আমাকে ওই কলেজে ভর্তি করিয়ে দাও বাবা | আমি কথা দিচ্ছি একদম রাস্তায় বেরোবোনা শিলচর গিয়ে | কলেজে পড়বো আর হোস্টেলে থাকবো | তুমি অমত কোরোনা বাবা | '

মেয়ের করুণ আবদার শুনে বিনয়বাবু আর থাকতে পারলেন না | স্ত্রী এবং ছেলের বিরুদ্ধে গিয়ে মেয়েকে কথা দিলেন , ' তুই যা চাইছিস , তাই হবে মা | তুই আর কাঁদিসনি | তোর কান্না আমি সহ্য করতে পারিনা |

বিদিশা বাবার কথা শুনে আনন্দে লাফিয়ে উঠে বাবার গলা জড়িয়ে একটা হামি দিয়ে দিলো গালে | নবেন্দু আর সবিতাদেবীও সিন দেখে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়লেন | নিমরাজি হয়েও ওরা বিদিশার শিলচর যাত্রায় মত দিয়ে দিলেন |

এবারে আমাদের বিদিশার একটু বর্ণনা দেওয়া যাক | বেশ ফর্সা গোলগাল চেহারা (36 - 36 - 36) , চোখে সোনালী ফ্রেমের বড়োসড়ো চশমা | সাধারণত মাথার দুপাশে দুটো বিনুনি বেঁধে রাখাই ওর কাছে সুবিধাজনক | আসলে নিজের সাজপোশাক বা শরীরের মাপজোক নিয়ে ও কোনোদিনই ভেবে দেখেনি | ওর মা- ই এসব খেয়াল রাখেন |

আর আমরা সবাই জানি , মায়েরা খেয়াল রাখলে বাচ্চাদের সাধ্য নেই যে কম খেয়ে উঠে পড়বে | সেইজন্যই ছোটবেলা থেকে খাওয়া দাওয়ার দিকে ঝোঁকটা ওর বেশ বেশিই |

তাছাড়া আমাদের বিদিশা খুব ভালো গান করতে পারে | লতা - আশা থেকে শুরু করে সুনিধি চৌহান - নেহা কক্কর সবার গানই খুব ভালো তুলে নেয় কয়েকবার শোনার পরেই |

একটা অনন্য বৈশিষ্ট্য আছে ওর মুখে | মুখটা লাবণ্যময় এবং মায়াভরা চোখদুটি নিষ্পাপ শিশুদের মতো সরল |

কিন্তু আমরা জানি , এই দুনিয়া হলো কঠোর , এখানে টিকে থাকার জন্য সরল হয়ে থাকলে চলবেনা | ওই কথায় আছে না , ' নরম মাটি খুঁড়তে মজা | '

যাইহোক , সবিতাদেবী চোখের জলে ভেসে কলিজার টুকরো মেয়েকে শিলচর সেন্ট অগাস্তিন কলেজে ফিজিক্স অনার্স পড়তে পাঠালেন |

বিনয়বাবু আর নবেন্দু বিদিশাকে নিয়ে সকাল সকাল রওনা হয়ে গেলো | সন্ধ্যার ট্রেনে বাড়ি ফিরতে হবে ওদের দুজনকে | সকাল দশটা নাগাদ ওরা সেন্ট অগাস্তিন কলেজের সামনে পৌঁছলো |

আগে থেকে এডমিশন সংক্রান্ত সব নিয়মকানুন সমাধা হয়েই ছিল | কলেজের ইউনিফর্ম , রুটিন , খাতা - পেন - পেন্সিল সব গুছিয়ে নিয়ে বিদিশা হোস্টেলের দিকে রওনা হলো | সাথে ওর বিশাল বড়ো দুটো ব্যাগও রয়েছে , যার মধ্যে কাপড়-চোপড়ের থেকে খাবার-দাবারের পরিমান অনেক বেশি |

বিনয়বাবু আর নবেন্দু ওকে হোস্টেল পৌঁছে দিয়ে এলেন | তারপর এলো বিদায়পর্ব | দাদা আর বাবাকে জড়িয়ে ধরে বিদিশার সে কি কান্না | কিন্তু নিজের ভবিষৎ ও নিজেই পছন্দ করে নিয়েছে | তার দায়ও নিশ্চই ওকেই নিতে হবে |

মেয়েকে শান্ত করে , ছেলের সাথে বিনয়বাবু বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন |

সেন্ট অগাস্তিন কলেজে প্রবেশ করার সময় যে পরিমাণ উৎফুল্লতা বিদিশার মনে ছিল , তা ধীরে ধীরে ম্লান হতে আরম্ভ করলো | কেন ? আগামী পর্বে তার উত্তর পাওয়া যাবে |
Copyright©All Rights Reserved
Piyali Chakravorty

 

Copyright©All Rights Reserved
Piyali Chakravorty
প্রথমদিন হোস্টেলে বাবা আর দাদা বিদিশাকে ছেড়ে চলে যাবার পর ওর মনটা বেজায় খারাপ | তার মধ্যে গোদের ওপর বিষফোঁড়ার মতো এসে জুটলো ওর রুমমেট |

রুমিটাকে দেখেই ওর মনে হলো ,মাআআগোওওওও , কি চ্যাংড়া মেয়ে রে বাবা | ঘরে ঢুকেই নিজের ব্যাগপত্র রেখে সেই মেয়ে , ' ওরে বাবা , কি গরম পড়েছে আজকে' , বলে টি - শার্ট খুলে ফ্যানের তলায় বসে সিগাটের ধরালো | ফোনেও কাকে অশ্রাব্য গালিগালাজ করছে |

সেসব দেখে-শুনে বিদিশার কান দিয়ে যেন ধোঁয়া বেরোচ্ছে | এককোণে চুপ করে দাঁড়িয়ে সেই মেয়ের কীর্তিকলাপ দেখে ওর নিজেরই লজ্জায় মাটিতে মিশে যাবার উপক্রম |

হটাৎ সেই মেয়ের দৃষ্টি পড়লো বিদিশার ওপর | থম মেরে সে খানিক্ষন চেয়ে রইলো ওর দিকে | তারপর খ্যাক খ্যাক করে বিশ্রী হেসে ওকে বললো , ' ওই , তোর নাম কি বে ? সে যাই নাম হোক না কেন , যা পাহাড়ের মতো গতর বানিয়েছিস , তোকে আমি হিমালয় / হিমু বলে ডাকবো | '

ওর কথা শুনে বিদিশার মনে হেব্বি দুঃখ হচ্ছে , তবুও ঘাড় নাড়িয়ে সম্মতি জানালো |

ওই মেয়ে : আমার নাম জিজ্ঞেস করলি না তো ? আমি হলাম মেঘা | চল এখন আমার সাথে কমন রুমে , সিনিয়র দিদিরা ডেকেছে সব ফ্রেশারদেরকে |

বিদিশার কোনো আইডিয়াই নেই যে সিনিয়র দিদিরা কেন ডেকেছে ওদেরকে | মেঘা তো যাবার জন্য একপায়ে খাড়া | ওর চোখের সামনেই নির্লজ্জের মতো ড্রেস চেঞ্জ করে নিলো |

তারপর ওকে ধাক্কা দিয়ে বললো , ' চল , এখন আর বটগাছের মতো দাঁড়িয়ে থাকতে হবেনা , হেব্বি মস্তি হবে এখন কমন রুমে | '

বিদিশাও একটু খুশি খুশি ভাব নিয়ে চললো মেঘার সাথে | মনে অনেক আশা , হয়তো কোনো ভালো কিছু হবে এখন কমন রুমে |

কমন রুমে তখন প্রায় সব ফ্রেশাররাই এসে গেছে | মেঘা বিদিশার সাথে ঢুকতেই ওদেরকে সবাই লরেল - হার্ডি বলে সম্বোধন করে হেসে একে অপরের ওপর গড়িয়ে পড়লো |

বিদিশা মনে মনে বুঝে নিলো ওর চাপ আসতে চলেছে | এর থেকে গ্রামের কলেজে পড়লেই ভালো হতো | কমন রুমে প্লাস্টিকের চেয়ার পাতা রয়েছে | মেঘা গিয়ে একটা চেয়ারে বসে পাশের মেয়েগুলোর সাথে এমনভাবে ঘুলে - মিলে গেলো যেন ওর জন্মের চেনা এক - এক জন |

বিদিশা তখনো চুপ করে দাঁড়িয়ে | কেউ একজন চেঁচিয়ে উঠে ওকে বললো , ' কি রে ! কলাগাছ ! তুই ওখানে মদনার মতো দাঁড়িয়ে আছিস কেন ? তোর নিতম্বদেশকে একটু রেস্ট দে | বসে যা একটা চেয়ারে | '

বিদিশার কান লাল হয়ে উঠছে লজ্জায় আর অপমানে | ও কমন রুম থেকে বেরিয়ে যেতে যাচ্ছিলো | কিন্তু বাজখাঁই গলায় একজন সিনিয়র দিদি ওকে বললো , ' তুই বেরিয়ে যাচ্ছিস যে ! তোকে ধরে আনতে আমাদের তো ক্রেন আনতে হবে রে | '

ঘরের সব মেয়েরা অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো , আর বিদিশার মনে হলো , মাটি খুঁড়ে তার মধ্যে ঢুকে গিয়ে নিস্তার পায় এদের হাত থেকে | '

এবারে শুরু হলো পরিচয় পর্ব | সিনিয়র দিদিরা সবাই একে একে নিজেদের পরিচয় দিলো | তারা সবাই ফিজিক্স অনার্স ফাইনাল ইয়ারের ছাত্রী | ওদের নাম হলো কৃত্তিকা , স্নেহা , প্রজ্ঞা আর রণিতা |

বিদিশার ওদেরকে দেখে মনে হলো 'দা মোস্ট নটোরিয়াস স্টুডেন্ট অফ দা ব্যাচ' | বাঁদরামিতে এদের জুড়ি মেলা ভার হবে |

এবারে এলো ফ্রেশরেদের পরিচয় দেবার পালা | ফ্রেশাররা তো শুধু পরিচয় দিয়েই নিষ্কৃতি পাবেনা , ওদেরকে বিভিন্ন ধরণের র‌্যাগিং- এর সন্মুখিন হতে হবে |

কাউকে গান গাওয়ানো , কাউকে নাচানো , কাউকে আবার ক্যাট- ওয়াক করানো ইত্যাদি চলতে লাগলো |

সবাই কিন্তু বেশ সাবলীলভাবেই দিদিদের আবদার মেটাতে ব্যস্ত | মেঘার ভাগ্যে পড়েছিল , সৌরভ গাঙ্গুলির মতো টি - শার্ট ওড়ানো |

ও বিন্দাস টি - শার্ট খুলে মাথার ওপর ঘোরাতে লাগলো |

বিদিশার মনে হলো , ইসসসসস , ভাগ্য ভালো আমার ভাগে এই কাজটা পড়েনি , তাহলে লজ্জায় আজকে মরেই যেতাম হয়তো |

ভাবতে ভাবতেই বিদিশার ডাক পড়লো | দিদিগুলো ওকে দেখে নিজেদের মধ্যে কিছু একটা আলোচনা করে নিলো | তারপর ওকে বললো , ' তুই স্ট্রিপ করে দেখা | '

বিদিশা বেচারি জানেও না স্ট্রিপ মানে কি ! সবাই কোলাহল আর বিশ্রী হাসিতে ওকে আরো জর্জরিত করে তুললো |

ও জিজ্ঞাসা করলো , ' স্ট্রিপ কি ? '

ব্যাস , আর যায় কোথায় ! সবাই এমন একটা ভাব দেখালো , যেন "স্ট্রিপ" শব্দের মানে না জানা মহাপাপ |

দিদিগুলোর মধ্যে দুজন উঠে এলো ওর সামনে | প্রজ্ঞা দিদি বললো , ' আপনার ভেতরে বাহিরে কি কি দর্শনীয় স্থান আছে , সেগুলোর ভ্রমণ করানোর নামই হলো স্ট্রিপ | এখন আশা করি বুঝে গেছিস | নাও স্টার্ট | '

মোবাইলে ইংলিশ গান চালিয়ে দিয়ে সবাই বিদিশাকে চিয়ার আপ করছে আর হাসছে | কি যে হবে এখন !
Copyright©All Rights Reserved
Piyali Chakravorty 

Copyright©All Rights Reserved
Piyali Chakravorty
লজ্জায় বিদিশার মুখ লাল হয়ে যাচ্ছে | ও কিছুতেই করবেনা স্ট্রিপ | কিন্তু দিদিগুলো ভয় দেখাতে লাগলো যদি না করে তাহলে সারাবছর জ্বালিয়ে খাবে ওকে |

কমন রুমের মাঝখানে দাঁড় করিয়ে ওরা বিদিশার দিকে চেয়ে চোখ টিপে ইশারা করলো , ' কাম অন , ডু ইট | '

বিদিশা বুঝে নিলো যে , এদের হাত থেকে পরিত্রান পাওয়া সম্ভব নয় | বেচারি কাঁদতে কাঁদতে প্রথমে ওড়না খুলে ফেললো , তারপর যেই না কামিজ খুলেছে , সঙ্গে সঙ্গে কমন রুমে থাকা সব মেয়েদের মধ্যে হাসির যেন ঢেউ উঠলো |

কেউ বলতে লাগলো , ' একি রে ! এ তো পুরো চর্বির পাহাড় | '

কেউ বললো , ' বাবা , পেটটা দেখ , এম .আর .এফ টায়ারও হার মেনে যাবে | দেখি তো গুনে কটা টায়ার জমা করেছিস ! এক - দুই - তিন ...

আরেকজন বলে উঠলো , ' আরে ভাই , টায়ার তো লাগবেই বল , এই বুলডোজার টেনে নিয়ে যাবার জন্য | '

প্রজ্ঞা দিদি বলে উঠলো , ' থেমে গেলে কেন শিল্পা শেট্টি , দেখাও..... দেখি তোমার জলবা |'

বিদিশা রাগে , অপমানে , লজ্জায় কুঁকড়ে গিয়েও সালোয়ার খুলতে বাধ্য হলো , তা নাহলে এরা ছাড়বেনা |

সালোয়ার খুলতে হাসির রোল আরো দ্বিগুন আকার ধারণ করলো |

প্রজ্ঞা দিদি বলে উঠলো , ' একি রে ! পা , নাকি কলাগাছ ! শুধু কলাটাই নেই আর কি | '

বিদিশা কান্না শুরু করলো এবারে | অনুরোধ করতে লাগলো ওকে ছেড়ে দেবার জন্য | কিন্তু ওদের মতো নির্দয়ের কাছে ক্ষমা ভিক্ষা করা আর মোষের সামনে বাঁশি বাজানো একই ব্যাপার |

মানুষের মন তো ওরা বুঝবেনা ওরা শুধুই মজা চায় ...শুধুই মজা...| বিদিশার হাজার অনুরোধ উপরোধ , কান্না কাটিতেও ওদের পাথর মন অনড় রইলো |

বাধ্য হয়ে কুঁকড়ে গিয়ে যেই না ও অন্তর্বাস খুলেছে , সবাই হাসতে হাসতে একে অপরের ওপর পড়ে গেলো |

প্রজ্ঞা দিদিটাই সবচেয়ে নির্মম আর পাজী | ও বলে উঠলো , ' ওবাবা , এ তো পুরো দশ কেজির ডাম্বেল রে | এগুলো নিয়ে চলিস কিভাবে ? তা , এগুলো নিয়ে এক্সারসাইজ করিস নাকি ! এত হৃষ্টপুষ্ট !!! '

বিদিশা হাউহাউ করে কাঁদতে লাগলো , ' আমি আর পারবোনা , দয়া করে আমাকে ছেড়ে দাও , এবারে আমি মরে যাবো | দয়া করো তোমরা আমার ওপরে | '

ওর হাহাকার আর কান্না দেখে হয়তো দয়া হয়েছিলো সিনিয়র দিদিগুলোর মনে |

কৃত্তিকা আর স্নেহা দিদি বিদিশার সামনে এসে বললো , ' আরে , তুই এত কান্না কাটি করছিস কেন ! এখানে তো আমরা সবাই মেয়ে | নে , তাড়াতাড়ি সব পরে নে , আমরা আড়াল করছি | '

বিদিশা অন্ধকারের মধ্যেও যেন হালকা আলোর দিশা খুঁজে পেলো | ওর অনুরোধে অন্তত শেষ লজ্জাটুকু তো বাঁচলো |

বিদিশার কান্না দেখে ঘরের সবাই খুব অপ্রস্তুত হয়ে পড়লো | সত্যিই তো , এতটা বাড়াবাড়ি করা উচিত হয়নি ওদের |

মেঘা চুপ করে বসে এতক্ষন সব কিছু হজম করছিলো | এবারে ও উঠে এসে বিদিশাকে সাহায্য করতে লাগলো | সবার সহযোগিতায় বিদিশার লজ্জা ভাবটা একটু কেটেছে | রাগিং পর্ব এখানেই সমাপ্ত |

এবারে সিনিয়র দিদিরা ওদেরকে স্নাক্স- এর প্যাকেট আর কোল্ড ড্রিঙ্কস খাওয়ানোর পরে সবাই মিলে বসে একসাথে গল্প করছে |

বিদিশা একটা চেয়ার টেনে যেই বসলো , বেচারা পলকা প্লাস্টিকের চেয়ারটা ওর ভার সহ্য করতে না পেরে , চেয়ার টার পা - গুলো বেঁকে গিয়ে যেন পদ্মফুলের মতো ছড়িয়ে গেলো , আর বিদিশা মাটিতে ধপাস | আবার বেইজ্জতি সবার সামনে , আবার হাসির রোল পড়ে গেলো নতুন করে |
Copyright©All Rights Reserved
Piyali Chakravorty 

Copyright©All Rights Reserved
Piyali Chakravorty
চূড়ান্ত অপমানিত হয়ে হোস্টেলের রুমে ফিরে বিদিশা বালিশে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে | আজকের অপমান , লাঞ্ছনা , যন্ত্রনা ওর মনে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করলো , যা কোনোদিনও ওর মন থেকে মোছা যাবেনা |

বাড়িতেও ফোন করে যে কিছু জানাবে , তারও উপায় নেই | নিজের জীবন ও নিজেই বেছে নিয়েছে | প্রচুর টাকা খরচ করে ওর বাবা ওকে আকাঙ্খিত কলেজে ভর্তি করিয়েছেন | এখন যদি ফোন করে বাড়িতে এইসব কথা জানায় , তাহলে ওর কলেজ ছাড়িয়ে বাবা নিয়ে চলে যাবে | এতে যেমন আর্থিক অপচয় তেমনই মানসিক অশান্তির সৃষ্টি |

তাই নিজের সাথে হওয়া এই অপমানগুলোকে হজম করে এই কলেজেই পড়তে হবে ওকে |

ক্লান্ত শরীরে কাঁদতে কাঁদতে বিদিশা ঘুমিয়ে পড়েছিলো | হটাৎ মেঘা কোথা থেকে ঝড়ের বেগে ঘরে এসে ঢুকলো | ওকে ঘুমোতে দেখে একটা ধাক্কা মেরে উঠিয়ে দিলো | ও ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে আছে মেঘার দিকে |

মেঘা : এই যে , ভিজে কাঁথা , এতো কান্ড হয়ে গেলো আর তুই শালা মোষের মতো পড়ে পড়ে ঘুমোচ্ছিস ? এতো ঘুমিয়ে ঘুমিয়েই তো এই বিশাল বপু খানা বানিয়েছো বাবা |

বিদিশা : মেঘা , প্লিজ এরকম বোলোনা , আমি মানসিকভাবে খুব ভেঙে পড়ছি | আমার মতো মেয়ের শহরের কলেজে এসে পড়ার ইচ্ছেটাই ভুল ছিল | এখন না গিলতে পারছি , না উগরাতে |

মেঘা : তোর শরীর শুধু মোটা নয় , মাথাটাও দেখছি মোটা | লজ্জা করেনা ! এতো কান্ড করলো ওরা তোর সাথে , এর জবাব দেবার ইচ্ছে করেনা ! আমি হলে তো এমন জবাব দিতাম যে ওরা আর ঘুরে দাঁড়াতে পারতোনা |

বিদিশা : আমি তোমার মতো এতো স্ট্রং নয় | কোনোদিন শহুরে জীবনযাপন করিনি , গ্রামের মেয়ে আমি , আমার কি এরকমটাই হওয়া স্বাভাবিক নয় ?

মেঘা : ফার্স্ট অফ অল তুই আমাকে তুমি...তুমি... লাগিয়েছিস কেন বলতো ! আমি কি তোর লাভার নাকি ওয়ারা !

বিদিশা : আমি হুট্ করে কাউকে তুই বলে ডাকতে পারিনা |

মেঘা : ওই তো !!! এই পারিনা , সেই পারিনা , পারিস টা  কি তাহলে ! এখনকার দিনের মেয়ে হয়ে এরকম ন্যাকা*দা হয়ে থাকলে হবে ! তোর সিরিয়াস মেক ওভারের দরকার আছে |

বিদিশা : মেকওভার মানে ! কি করতে হবে আমাকে !

মেঘা : তোর চিন্তা নেই রে , তোকে ঘাড়ে দশ কেজি ওজন নিয়ে মিলিটারি মার্চ করবো না | জাস্ট একটু বডি ল্যাঙ্গুয়েজে চেঞ্জ করলেই হবে | আর হ্যাঁ , একটু আধটু শরীরের যত্ন নে | এরকম চর্বির পাহাড় হয়ে গেছিস , সেটাও তো খুব আনহেলদি |

বিদিশা : আসলে ছোটবেলা থেকেই মা খাইয়ে খাইয়ে আমার স্বভাবটা একদম পেটুক বানিয়ে দিয়েছে | এখন আর চেষ্টা করলেও কমাতে পারছিনা |

মেঘা : খাওয়া কমাতে হবেনা , ব্যাস একটু একটু এক্সারসাইজ স্টার্ট কর কাল থেকে | আমি এতক্ষন তোর জন্যেই কলেজের জিমটা ভালো করে দেখে এলাম | তোকে তো আর দীপিকা পাডুকোন বানাতে পারবোনা | জাস্ট বডি ল্যাঙ্গুয়েজ চেঞ্জ করার জন্য যতটা হয় করবি জিম |

বিদিশা চুপচাপ রইলো | মেঘার কথা অগ্রাহ্য করার কোনো উপায়ই নেই | যা বাঁদর মেয়ে , কি করে বসবে বলা যায়না | তবে হ্যাঁ , মেয়েটার মনটা ভালো বলেই মনে হয় |

মেঘা : কি রে ! হাঁ করে চেয়ে কি ভাবছিস ! যা বললাম মনে থাকে যেন | আর তোর মধ্যে পড়াশুনো ছাড়া অন্য কোনো গুন আছে ? মানে ধর , নাচ , গান , বাজনা , অভিনয় এনিথিং?

বিদিশা : একটু একটু গান গাইতে পারি |

মেঘা : আচ্ছা , দেখা যাক কি করা যায় তোর জন্য |

বিদিশার সাথে কথা বলে মেঘা সিগারেট খেতে খেতে ওর বয় ফ্রেন্ডকে ফোন করে অশ্রাব্য ভাষায় কথা শুরু করলো |

আর বিদিশা ভাবলো কাল থেকে কি যে হবে ! বাবারে .....জিম গিয়ে নাজানি কি করতে হবে ! ভয়ে ওর অন্তরাত্মা কুঁকড়ে গেলো |
Copyright©All Rights Reserved
Piyali Chakravorty 

Copyright©All Rights Reserved
Piyali Chakravorty
গায়ের চাদরটা টেনে নিয়ে কুঁকড়ে ঘুমিয়ে আছে বিদিশা | তখন ভোর পাঁচটা | মেঘা ঘুম থেকে উঠে জিম যাবার জন্য রেডি | বিদিশাকে ঘুম থেকে ডেকে তুলতে ওর খারাপ লাগছিলো | গতকাল ওর ওপর দিয়ে যা ঝড় গেছে , হয়তো সারারাত ভালো করে ঘুমোতে পারেনি |

কিন্তু এখন দয়া দেখানোর সময় নয় | বিদিশার ভালোর জন্যেই ওর ওপর একটু অত্যাচার করা এখন বাঞ্চনীয় |

সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে মেঘা বিদিশার চাদরটা একটানে সরিয়ে ওর পিঠে চাপড় মেরে মেরে ওকে ঘুম থেকে ডেকে তুললো |

বিদিশা : উফফফ ! মা ! জ্বালিয়োনা তো , বলে আবার ঘুমোতে যাচ্ছিলো | হটাৎ সম্বিৎ ফিরে চোখ পিটপিট করে দেখলো সামনে মেঘা দাঁড়িয়ে | মেঘাকে দেখে ও ধড়মড় করে বিছানার ওপর উঠে বসল |

মেঘা : কি মহারানী ! পড়ে পড়ে ভোঁসভোঁস করে ঘুমোচ্ছেন ! পনেরো মিনিট টাইম দিলাম , এক্ষুনি রেডি হয়ে নে , নাহলে কিন্তু হেব্বি কেলাবো |

বিদিশা : ওরে বাবা , পনেরো মিনিট মাত্র ! বলে তাড়াতাড়ি বিছানা ছেড়ে নেমে ফ্রেশ হতে বাথরুম চলে গেলো |

বিছানা থেকে নামার সময় বেচারা দুর্বল সিঙ্গেল খাট টা ক্যাঁচ ক্যাঁচ করে প্রায় জবাব দিতে বসেছিল আর কি | মেঘা ফিক করে হেসেও সিরিয়াস হয়ে গেলো | মনে মনে ভাবলো , বডি শেমিং মোটেই ভালো কাজ নয় |

বিদিশা জিম যাবার জন্য সালোয়ার কামিজ পরে রেডি হয়ে এসেছে |

মেঘা : একি রে !!! তুই এইসব কুর্তি ফুর্তি পরে জিম করবি ! শালা , একটা ট্রাকপ্যান্ট বা মিনিমাম একটা লেগিন্স আর টি - শার্ট জুটলোনা তোর ?

বিদিশা : ( মুখটা কালো করে ) আমি কি করে জানবো , এই কলেজে ভর্তি হয়ে আমাকে জিম করতে হবে ! জানলে ঠিক নিয়ে আসতাম |

মেঘা : তাহলে আর কি করা ! অগত্যা , চল , কোনো ছুতো করে ট্রেনিং মিস করা চলবেনা |

বিদিশাকে সঙ্গে করে ও পৌঁছলো জিমে | আরো অন্তত জনা পাঁচেক মেয়ে বিভিন্ন ইন্সট্রুমেন্টে ট্রেনিং করছিলো | বিদিশাকে দেখে সবাই মোটামুটি চিনে নিলো , এই সেই মেয়ে যাকে গতকাল সিনিয়র দিদিরা স্ট্রিপ করিয়েছে | সবাইকার মুখেই একটা চাপা হাসি লক্ষ্য করলো বিদিশা |

ট্রেনার খুব কড়া স্বভাবের মহিলা , সেই জন্য কেউ বিদিশার ওপর খোলাখুলি খিল্লি ওড়াতে পারলোনা | ট্রেনার বিদিশাকে ডায়েট চার্ট রেডি করে দিয়ে , ওয়েট মেপে , বডি ফ্যাট ইনডেক্স মেপে , ওর জন্য একটা ট্রেনিং গাইডলাইন ঠিক করলো |

ট্রেনারের কথামতো ওকে ট্রেডমিলে হাঁটা দিয়ে শুরু করতে হবে | স্পিড লিমিট 2 km/h রেখে ও হাঁটা শুরু করলো |

কয়েক মিনিট পরে ট্রেনার এসে যেই স্পিডটা 2 থেকে 3 km/h করেছে , এই সামান্য তারতম্যের জন্য বিদিশা হড়কে , হামাগুড়ি দিয়ে , গড়িয়ে ট্রেডমিল থেকে মেঝেতে এসে ধড়াস |

এবারে হাসির রোল পড়ে গেলো পুরো জিমে | যাইহোক , খাবি খেতে খেতে কোনোমতে ট্রেনিং শেষ করতে না করতেই বিদিশার খিদেয় পেটের মধ্যে ছুঁচোয় ডন বৈঠক মারতে লেগেছে |

ও এদিক ওদিক চেয়ে মেঘাকে বললো , ' আচ্ছা , আমরা ব্রেকফাস্ট করবো কখন ? '

মেঘা : ( মনে মনে মায়া জন্মেছে বিদিশার ওপর , তাও ছদ্ম রাগ দেখিয়ে ) ওরে , এক্ষুনি এক্সারসাইজ শেষ করে এক্ষুনি খেয়ে নিবি ! তাহলে তো দ্বিগুন বেগে মোটা হবি রে !

মেঘার কথায় বিদিশা বুঝে নিলো , এই জিম ওর জীবনে কাল হয়ে এসেছে | একেই তো গড়িয়ে পড়ে হাঁটুতে লাগলো , তার ওপর বলছে এখন খাবারও দেবেনা | ধুর , কাল থেকে আর এসব জিম - ফিম করবোনা বাবা | না খেয়ে মরবো নাকি ! হুউউহহহ !

বিদিশার চোখমুখ দেখে মেঘা সব বুঝতে পারলো যে ওর মনে কি চলছে |

মেঘা : তোর রাগ হয়না নিজের ওপরে ! একটা জড়ভরতের মতো থাকিস ! তোকে তো বলেছি , তুই দীপিকা পাডুকোন হবিনা , কিন্তু মিনিমাম একটা পার্সোনালিটি যদি ডেভেলপ না করিস তাহলে আজকালকার সমাজে তোকে ছাগলেও মুড়িয়ে খাবে |

কথাটা খুব রূঢ় হলেও , কঠিন বাস্তব | নিজের ভালো পাগলেও বোঝে | বিদিশা বুঝতে পারলো , গতকাল ওর সাথে হওয়া অপমানটা শুধু ওরই গায়ে লাগেনি , গায়ে লেগেছে এই ভালো মনের বাঁদর মেয়েটার গায়েও | মনে মনে ও মেঘাকে বন্ধু মানতে শুরু করলো |
Copyright©All Rights Reserved
Piyali Chakravorty 

Copyright©All Rights Reserved
Piyali Chakravorty
প্রথম দিন ক্লাসে ঢুকতেই বিদিশাকে দেখে সবাই জঘন্য হাসি শুরু করলো | ও মন খারাপ করে একটা পছন্দমতো ডেস্কে বসতেই সেটা খচমচ করে উঠলো | হাসির স্রোত আরো বেড়ে গেলো |

প্রথম দিন , প্রথম ক্লাসটাই ভাইস প্রিন্সিপাল স্যারের | থার্মোডাইনামিক্স এর ক্লাস শুরু হলো | প্রত্যেকেই যথেষ্ট মনোযোগ সহকারে ক্লাস করলো , কারণ ভাইস প্রিন্সিপাল স্যার খুব কড়া স্বভাবের |

এবারে এলো প্রশ্ন - উত্তরের পর্ব | স্যারের প্রত্যেকটা প্রশ্নেই বিদিশা হাত তুলছে এবং সঠিক উত্তরও দিয়ে দিচ্ছে | ব্যাপারটা স্যার খেয়াল করলেন | ক্লাসের শেষে উনি বিদিশার উদ্দেশ্যে "ভেরি গুড" বলে বেরিয়ে গেলেন |

মেঘা খুব খুশি হলো ওর এই ভোলিভালি বন্ধুটার জন্য | আর বাকিদের মুখগুলো তখন দেখার মতো , সব এক একটা বাংলার পাঁচ হয়ে , নিমপাতা গেলার মতো মুখ করে বসে আছে |

সেদিনকার সবকটা ক্লাসেই বিদিশা যাকে বলে ,  ' 'জাস্ট ফাটিয়ে দিলো ' | ক্লাসের মেয়েগুলো মুখ চুন করে বসে রইলো আর সুযোগ খুঁজতে লাগলো কিভাবে বিদিশাকে অপমানিত করা যায় |

বেচারি বিদিশা সেই সুযোগ দিয়েও দিলো | সেদিনকার মতো সব ক্লাস শেষ | এখন লাঞ্চ টাইম | বিদিশার তো কখন থেকে পেটে ছুঁচোয় ডন মারছে | ব্রেকফাস্টও তো ঠিক করে হয়নি |

খাবার দেখে বিদিশা যেন হামলে পড়লো | অন্যদের খাওয়া শুরু হতে না হতেই ওর অলরেডি এক প্লেট ভাত শেষ | উঠে গিয়ে ও আবার ভাত নিতে লাগলো | তখনি শুরু হলো টোন - টিটকিরি |

কেউ বলছে , ' মানুষের সাথে হাতি বসে খাচ্ছে ' ,

কেউ বলছে , ' তোর কি তিন- চারখানা স্টমাক নাকি রে ' ?

কেউ আবার নিজের থালার যত খাবার ওর পাতে ঢেলে দিয়ে বললো , তোকে খাওয়াতে তো হোস্টেল ফেল মেরে যাবে রে ! যা ডাইনোসরের মতো গিলছিস ! হ্যাঁ রে , মাংস খাবার সময় কি তোর আস্ত একটা খাসি লাগবে ?

এত অপমান সহ্য করে কি খাওয়া যায় ! বিদিশা খাবারের প্লেট ফেলে উঠে নিজের রুমে চলে গেলো |

কিছুক্ষন পরে মেঘা এসে বললো , ' আচ্ছা , তোর খিদে পেয়েছে মানলাম , কিন্তু একটু ধীরে - সুস্থে খেতে পারলিনা ? মেয়েরা ওরকম গোগ্রাসে গিললে সবারই তো চোখে লাগবে বল ! মনে রাখিস , তোর টোটাল বডি ল্যাঙ্গুয়েজে চেঞ্জ করতে হবে |

বিদিশা : খিদে পেলে আমার মাথার ঠিক থাকেনা |

মেঘা : থাকেনা বললে তো চলবেনা কাকা ! একটু চেঞ্জ করো নিজের চলন - বলন | নাহলে এরকমই প্রতি পদক্ষেপে সবাই তোকে চেটে ছাড়বে |

বিদিশা : সকালেও তো কিছু খেতে দিলে না সেভাবে ! ঐটুকু কর্ন - ফ্লেক্স আর একটু দুধ খেয়ে কি কারুর পেট ভরে !

মেঘা : ঐটুকুই যথেষ্ট , আস্তে আস্তে এইটুকুতে এডজাস্ট হয়ে যাবে দেখিস | আর তাছাড়া , নিজের ডাম্বেল গুলোর দিকেও নজর দাও বোকাহাঁদা | ওগুলো তো এবারে চাঁদ - সূর্যকেও ঢেকে দেবে , এমন বড়ো বড়ো পাহাড় হয়ে উঠছে !

বিদিশা : তুমিও এরকমভাবে বলছো ! তুমি না আমার বন্ধু ! আমার মেন্টর !

মেঘা : আমি কেউ নই , এখনো তুই আমাকে ' তুমি 'করে ডাকিস |

বিদিশা : আচ্ছা বাবা , আজ থেকে তোমাকে' তুই ' করে বলবো , এখন শান্তি !

মেঘা : দেখি , আগেই ফ্রি হ-তো আমার সাথে | তবে বুঝবো | আচ্ছা , আমার এখন এত ভাটানোর সময় নেই | ওদিকে আমার গাধা বয় - ফ্রেন্ড টা হাঁ করে আমার ফোনের অপেক্ষায় বসে আছে |

বলে মেঘা একটা সিগারেটে ধরিয়ে ওর বয় - ফ্রেন্ডকে ফোন করলো |

ওদের দরজায় কেউ নক করছে | বিদিশা দরজা খুলে দেখলো ইউনিয়নের চার - পাঁচটা মেয়ে দাঁড়িয়ে | ওরা বলে গেলো , আগামীকাল সকাল দশটার সময় কলেজ অডিটোরিয়ামে পৌঁছে যেতে | নবীন বরণ উৎসব আছে কাল |

বিদিশা খুব খুশি | কালকে নিশ্চই খুব মজাদার ফাংশন দেখা যাবে |
Copyright©All Rights Reserved
Piyali Chakravorty 

Copyright©All Rights Reserved
Piyali Chakravorty
সকাল সকাল উঠে জিম টিম করে বিদিশা পুরো ফিট , নবীন বরণ দেখতে যাবে বলে |

মেঘার মনে কোনো তাপ - উত্তাপ নেই , বরং বিদিশার জন্য ওর চিন্তা হচ্ছে | মেয়েটা এত আশা করে আছে , না জানি আবার কোন অপমান ওর জন্য অপেক্ষা করছে |

অডিটোরিয়াম যাবার আগে মেঘা সাবধান করে দিলো বিদিশাকে , ' শোন , তুই নবীন বরণ দেখার জন্য যা লাফালাফি করছিস , নিজেকে একটু সামলে রাখিস বাবা , নাহলে তুই হয়তো পরে আবার ধাক্কা খেতে পারিস , আর তখন আমার কাছে এসে ফ্যাঁচফ্যাঁচ করে কাঁদলে তোকে তার ওপরেই কেলাবো বলে রাখলাম | '

বিদিশা : এই , তোর মুখে এত জঘন্য ভাষা কেন রে ! ভালো কথায় বলতে পারিসনা কিছু ?

মেঘা : ভালো কথাই তো বলছি রে বোকাগাধা | আমি খারাপ কথা বলতে শুরু করলে প্যান্টে মুতে দিবি |

বিদিশা : ছিঃ ....অসভ্য মেয়ে কোথাকার | তোর বেচারা বয় - ফ্রেন্ডটার জন্য আমার দুঃখ হয় | কোন জংলীর হাতে পড়লো সে বেচারা !

মেঘা : ওসব তুই বুঝবিনা রে , ওকে দুবেলা পেটভরে  গালাগাল না দিলে , না ও শান্তি পাবে না আমি |

বিদিশা : প্রেম অতি জটিল বস্তু , আমার বুঝে কাজ নেই বাবা |

মেঘা : আচ্ছা , সে সময় এলেই সব বুঝবি ওয়াড়া | এখন চল | যা বললাম , মনে থাকে যেন |

মেঘার কথায় বিদিশার এখন একটু একটু ভয় লাগছে | যদি আবার কেউ অপমান করে ওকে !

যাই হোক , সবাই মোটামুটি অডিটোরিয়ামে এসে জড়ো হয়েছে | ফাংশনটার আয়োজন করেছে সিনিয়র দিদিরা আর ইউনিয়নের মেয়েরা মিলে |

স্টেজে এঙ্কর- এর দিকে চোখ পড়তেই বিদিশা ভয়ে কাঁটা | ওটা তো সেই সবচেয়ে দুষ্টু প্রজ্ঞা দিদিটা বলে মনে হচ্ছে | হায় ভগবান ! যেখানে বাঘের ভয় , সেখানেই সন্ধ্যে হয় ! আজকের ফাংশানেও প্রজ্ঞা দিদি !

হাতে মাইক নিয়ে সেই বাজখাঁই গলায় চেঁচিয়ে উঠলো প্রজ্ঞা , ' হ্যালো এভরিওয়ান ! আমাকে তো তোরা আগেও দেখেছিস , সেই যেদিন তোদের খিঁচাই করেছিলাম কমন রুমে ! '

সবাই চেঁচিয়ে উঠলো , হ্যালো প্রজ্ঞাদিদি |

প্রজ্ঞা : তা , আজকের ফাংশন শুরু করা যাক একটা আইটেম ড্যান্স দিয়ে |

যেহেতু এই অনুষ্ঠানে কোনো স্যার বা গুরুজন স্থানীয় কেউ উপস্থিত নয় , সবাই ফুলটু মস্তির মুডে | থার্ড ইয়ারের একটা দিদির "চিটিয়া কলাইয়া ভে" দিয়ে ফাংশন শুরু হলো |

সব বাঁদর মেয়েগুলো নিজেদের সিটে উঠেই নাচতে শুরু করেছে | বিদিশা ভয়ে ভয়ে চুপ করে বসে আছে | কেউ ওর দিকে খেয়াল করলেই চাপ কেস |

যাক , এই গানটা ভালোয় ভালোয় কেটে গেলো | বিদিশা ঠাকুরের নাম জপ করছে মনে মনে , ' জয় মা বিপত্তারিণী , রক্ষা করো মা | '

তারপর একটা দিদি গিটার বাজাবে আর অন্য একজন গান গাইবে বলে স্টেজে উঠলো | ওরা ' 'তুহি ইয়ে মুঝকো বতাদে , চাহু ম্যা ইয়া না ' দুজনে মিলে খুব সুন্দরভাবে উপস্থাপন করলো | ওদের গান শেষ হতে সবাই হাততালিতে ফেটে পড়লো |

এরপরে ৫ জন দিদি মিলে একটা কমেডি শো করলো | সেটাও দারুন ভালো লাগলো সবার | তারপর আরো কয়েকজন গান গাইলো , নাচলো , ইত্যাদি ইত্যাদি |

দেখতে দেখতে ফাংশনের শেষ পর্ব এসে উপস্থিত | ফ্যাশন শো | পনেরোজন ব্যাপক ফিগারের দিদিরা সেই শো- তে অংশগ্রহণ করেছে | কিন্তু গোল বাঁধলো কে শো - স্টপার হবে সেই নিয়ে |

হটাৎ ভীড়ের মধ্যে বসে থাকা গাব্দুগুব্দু বিদিশার কথা মনে পড়ে গেলো প্রজ্ঞার , ' বেশ ভালো জমেছিলো মালটাকে নিয়ে সেদিন কমন রুমে | আজকেও সবাইমিলে একটু আনন্দ করা যাক | ' এই ভেবে প্রজ্ঞা আবার স্টেজে উঠে এলো |

হাতে মাইক নিয়ে এনাউন্স করলো , ' বিদিশা , ফার্স্ট ইয়ার ফিজিক্স অনার্স , যেখানেই থাকিস না কেন , এই মুহূর্তে স্টেজের সামনে চলে আয় | ' এনাউন্স শুনে বিদিশার হাত পা কাঁপতে লাগলো |
Copyright©All Rights Reserved
Piyali Chakravorty 

Copyright©All Rights Reserved
Piyali Chakravorty
কথায় আছে না , ' একা রামে রক্ষা নেই , সুগ্রীব দোসর | ' বিদিশার ক্ষেত্রে প্রজ্ঞাদিদির অনেকগুলো সুগ্রীব জুটে গিয়ে লুকিয়ে বসে থাকা বিদিশাকে অডিটোরিয়ামের মাঝখান থেকে টেনে নিয়ে গেলো স্টেজের সামনে |

ভয়ে বেচারার হাত- পা যেন পেটের মধ্যে সেঁধিয়ে গেছে | ওকে দেখে ব্যাপক ফিগারের দিদিগুলোর কি হাসি ! 'এ হবে আজকের শো- স্টপার ! এ তো পুরো গন্ধমাদন পর্বত তুলে এনেছিস প্রজ্ঞা ! চলতে গেলে তো এর নাজুক কোমর লছকে যাবে | '

এত অপমান কিছুতেই সহ্য করা যায়না | বিদিশা রাগ চেপে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো | দিদিগুলোর মধ্যে একজন ওর সামনে এসে পেটে আঙুল দিয়ে খোঁচা মেরে মেরে জিজ্ঞাসা করলো , ' আপকি ইয়ে সুপার সেক্সি ফিগার কে রাজ ক্যা হ্যায় ! '

বিদিশা সাংঘাতিক চটে গেলো | It's enough..কলেজ থেকে যদি ওকে তাড়িয়েও দেওয়া হয় , কুছ পরোয়া নেহি , ভেবে বিদিশা মারলো একটা টেনে ঘুসি সেই দিদিটার মুখের ডান - দিকে | আর চেঁচিয়ে বলে উঠলো , ' অনেক বাঁদরামো করেছিস তোরা | এবারে আমার পেছনে লাগার আগে দুবার ভাববি | '

ঘটনার আকস্মিকতায় পুরো অডিটোরিয়াম স্তব্ধ | মেঘা বুঝে নিলো , কেস কেলো হয়ে গেছে | ও তাড়াতাড়ি ভিড় ঠেলে বিদিশার পাশে এসে দাঁড়ালো |

মার খেয়ে ওই হাড়গিলগিলে দিদি তো পুরো কেঁদেকেটে একসা | সব সিনিয়র দিদিরা মিলে বিদিশাকে ঘিরে ধরলো | মেঘা দেখলো বেগতিক |

ও চেঁচিয়ে উঠে বললো , ' প্লিজ , তোমরা ওকে ছেড়ে দাও , ও না বুঝে হাত চালিয়ে ফেলেছে | দয়া করে ছাড়ো ওকে তোমরা | '

প্রজ্ঞা বিদিশার একদম সামনে এগিয়ে এলো , ' খুব হাত চালানোর শখ না তোর ? বড়দেরকে সন্মান দিতে জানিসনা ! মুখে মুখে কথা হচ্ছিলো , তুই কোন সাহসে ওর গায়ে হাত তুললি ! '

বিদিশা একদম দৃঢ়ভাবে জবাব দিলো , ' মুখে মুখে কথা হচ্ছিলো ! তাই নাকি ! ও এসে আমার পেটে  আঙুল দিয়ে জোরে জোরে খোঁচা মারছিলো | আমি মোটা বলে কি আমার ব্যাথা পাওয়াও বারণ ? আর সম্মানের কথা বলছো ! প্রথম দিন থেকে তোমরা আমার সাথে যে অসভ্যতা করে চলেছো , তার পরেও তোমাদেরকে সন্মান করতে বলছো ! সন্মান দিলে তবেই অর্জন করা যায় | দাঁড়িয়ে আছো কেন ! আমাকে মারো , মারো আমাকে , তোমাদের সেই সৎসাহসটুকুও নেই যে আমায় মারবে | কেন জানো ! তোমরা নিজেরাই জানো যে কি কি করেছো আমার সাথে আজ পর্যন্ত , সেই কথা যদি আমি প্রিন্সিপাল স্যারকে গিয়ে বলি ,  ফাইনাল ইয়ারের পরীক্ষার আগেই ঘাড় ধাক্কা দিয়ে তোমাদের বের করে দেবে কলেজ থেকে | '

প্রজ্ঞা : এটা তুই ভালো করলিনা , এর ফল ভোগ করতে হবে তোকে |

মেঘা এবারে চেঁচিয়ে উঠলো , ' যা করার করে নাও , আমি বিদিশার সাথে আছি | প্রিন্সিপাল স্যারকে যদি জানাতেই হয় , তাহলে দুজনে মিলে গিয়ে জানাবো | তোমাদের শয়তানি অনেক সহ্য করেছে আমার নিরীহ গোবেচারা বন্ধুটা | এখন আর নয় | আমি আছি ওর পাশে | দেখি কি করতে পারো তোমরা | '

বলে মেঘা বিদিশার হাত ধরে টেনে নিয়ে বেরিয়ে গেলো অডিটোরিয়াম থেকে | আর সিনিয়র দিদিগুলো দাঁড়িয়ে রইলো স্থবিরের মতো |

বাইরে বেরিয়ে মেঘা বিদিশাকে বললো , ' আরে বস , কোথায় ছিল তোমার এই উগ্রমূর্তি ভাই ! জিয়ো কাকা , আমি হেব্বি খুশি তোর আজকের মাইক টাইসনের মতো ঘুসিটার জন্য | এই নাহলে আমার বন্ধু ! চল আজকে তোকে পার্টি দেবো ক্যান্টিনে | কি খাবি বল ! '

বিদিশা চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে , চোখে জল |

মেঘা : ওই , কাঁদছিস কেন বে !

বিদিশা : আমার অনেক জন্মের ভাগ্য যে তোর মতো একজন বন্ধুকে পাশে পেয়েছি |

মেঘা : ওরে না না , পুরো সেন্টি হয়ে গেছিস রে | আর কাঁদতে হবেনা , চল , খুব খিদে পাচ্ছে | '

বিদিশা : কি খাওয়াবি !

মেঘা : আরে , ঐদিন দ্বিতীয় পুরুষ সিনেমাটা দেখলাম | ওতে খোকা বলে যে চরিত্র , তার ফ্যাভ হলো চিকেন চাউমিন আর চিলি ফিশ | আমি না , পুরো খোকার ফ্যান হয়ে গেছি | আজকে ওই মেনুই খাবো আমরা |

বিদিশা মনে মনে ভাবলো , ' কি সরল , বাচ্চাদের মতো মন এই বাঁদর মেয়েটার | থ্যাংক গড যে ও আমার রুম পার্টনার | '

দুজনে হাসতে হাসতে হাত ধরাধরি করে চলে গেলো ক্যান্টিনের দিকে |
Copyright©All Rights Reserved
Piyali Chakravorty 

Copyright©All Rights Reserved
Piyali Chakravorty
প্রজ্ঞা আর ওর দলবল বিদিশাকে অপদস্থ করার সুযোগ খুঁজতে লাগলো | ওকে মেরে-ধরে বা বডি শেমিং করে কোনো লাভ হবেনা | অন্য কোনো উপায় খুঁজে বের করতে হবে | ওরা তক্কে তক্কে রইলো সেরকম সুযোগের আশায় |

-----------------------------------------------

ওদিকে বেশ কয়েকমাস কেটে গেছে | ভালো মতো থিওরি এবং প্রাকটিক্যাল ক্লাস চলছে , তার সাথে সাথে সমানতালে চলছে বিদিশার পার্সোনালিটি ডেভেলপমেন্টের ক্লাস মেঘার কাছে |

সামনেই ফার্স্ট সেমেস্টারের পরীক্ষা | সবাই পড়াশুনো নিয়ে খুব ব্যস্ত | বিদিশা রাত - দিন এক করে পড়াশুনো করছে | আর মেঘা পড়াশুনোর সাথে সাথে ওর রাজ্যের বাঁদরামিও সমান তালে চালিয়ে যাচ্ছে |

দেখতে দেখতে পরীক্ষার দিনটা এসে গেলো | বিদিশার প্রিপারেশন খুব ভালো | মেঘা আর বিদিশা ব্রেকফাস্ট করে নিয়ে একসাথে পরীক্ষা হলে পৌঁছলো |

স্যার এসে খাতা , কোয়েশ্চেন পেপার দিয়ে দিলেন | আর পাঁচ মিনিটের মধ্যেই পরীক্ষা শুরু | বেল পড়লো | স্যার এনাউন্স করলেন , ' স্টুডেন্টস , ইউ ক্যান স্টার্ট রাইটিং | '

সবাই লিখতে শুরু করে দিলো | হটাৎ , মিনিট পনেরো পরে , বিদিশার পেটের মধ্যে সাংঘাতিক মোচড় দিয়ে উঠলো | প্রচন্ড জোরে পটির প্রেশার অনুভব করলো ও | আর যেন সহ্য করা যাচ্ছেনা | তাড়াতাড়ি উঠে গিয়ে স্যারকে বললো , ' মে আই গো টু ওয়াশরুম ? '

স্যার : ইউ মে |

বিদিশা একদৌড়ে চলে গেলো ওয়াশরুমে | তাড়াতাড়ি করে পটি সেরে দৌড়োতে দৌড়োতে ফিরলো এক্সাম হলে | এতে ওর প্রায় 25 মিনিট মতো সময় নষ্ট হলো | খুব টেনশনে পড়ে গেলো বেচারি |

ও ফিরতে মেঘা চোখের ইশারায় ওকে জিজ্ঞাসা করলো , ' কি হয়েছে ! ' ও ইশারায় বুঝিয়ে দিলো |

আবার মিনিট কয়েক পর বিদিশার খুব জোরে পেটব্যাথা শুরু হলো | ওর আর তখন স্যারের থেকে পারমিশন নেবার সময় নেই | ঘামতে ঘামতে দৌড়ে ওয়াশরুম পৌঁছনোর আগেই ও নিজের জামাকাপড় নোংরা করে ফেলেছে |

ওয়াশরুমে গিয়ে নিজেকে পরিষ্কার করতে করতে ওর প্রায় আধ - ঘন্টা সময় নষ্ট হয়ে গেলো | তাড়াতাড়ি করে বাইরে বেরিয়ে এক্সাম হলের দিকে যেতে গিয়ে আবার শুরু হলো পেটব্যাথা .....তারপর আবার .....আবার......আবার..... সবমিলিয়ে পাঁচ - ছয়বার ও যাওয়া - আসা করতে লাগলো |

ততক্ষনে পরীক্ষা শেষ হতে আর মাত্র মিনিট কুড়ি বাকি | কান্নায় ভেঙে পড়ে বিদিশা দৌড় লাগলো এক্সাম হলের দিকে |

ওদিকে বিদিশা এতোক্ষণেও হলে না ফেরায় মেঘার টেনশন শুরু হয়েছিল | বিদিশাকে কাঁদতে কাঁদতে ফিরতে দেখে , তাও ও খানিকটা নিশ্চিন্ত হলো | কিন্তু সময় তো আর বেশি বাকি নেই | ও কোয়েশ্চেন পেপার শেষ করবে কিকরে ?

১০০ নম্বরের মধ্যে মাত্র ২৮ নম্বরের উত্তর লিখতে না লিখতেই এক্সাম ওভার হবার বেল পড়লো | স্যার এসে সবার কাছ থেকে খাতা জমা নিয়ে চলে গেলেন |

ক্লাসের বাকি স্টুডেন্টরা বিদিশাকে ঘিরে ধরলো | মেঘা এসে ক্রন্দনতত বিদিশাকে জিজ্ঞাসা করলো , ' কোথায় ছিলিস এতক্ষন ? ফেল করে যাবি তো এই পেপারটায় | '

বিদিশা কাঁদতে কাঁদতে সব ঘটনা বললো | বাকি স্টুডেন্টরা শুনে টিপ্পনি কাটলো , ' অতো রাক্ষসের মতো খেলে পেট খারাপ হবেনা ! পরীক্ষার দিন সকালেও এতো খেতে পারে ! '

যে যার মতো হল থেকে বেরিয়ে গেলো | ক্লাসে তখন শুধু মেঘা আর বিদিশা | দরজা দিয়ে প্রজ্ঞা আর সেই বিদিশার হাতে ঘুষি খাওয়া দিদিটা এসে ঢুকলো |

প্রজ্ঞা : ( বিদিশাকে উদ্দেশ্য করে ) কি রে ! ফার্স্ট সেমের ফার্স্ট এক্সাম কেমন হলো তোর ? বলে বাঁকা হাসি হাসতে লাগলো |

বিদিশা আর মেঘা সব বুঝে গেলো | এরাই ! এরাই বিদিশার ব্রেকফাস্টে কোনো ভাবে এমন কিছু মিশিয়ে দিয়েছিলো যার জন্য ওর এই অবস্থা হলো |

বিদিশা তখন আর কিছু বলা বা শোনার মতো পরিস্থিতিতে নেই | কাউকে দোষারোপ করতেও পারবেনা , কারণ সবাই ওই একই খাবার খেয়েছিলো | কারুর কিছু হলোনা , শুধু ওরই হলো , এটা যদি স্যারদের কাছে কমপ্লেইন করা হায় , তাতে কিচ্ছু প্রমান করা যাবেনা |

প্রজ্ঞা : জলে নেমে তোরা কুমীরের সাথে বিবাদ করে নিলি ! এতবড়ো সাহস তোদের ? ইয়ে তো সির্ফ ট্রেইলার থা , পিকচার অভি বাকি হ্যায় | বলে প্রজ্ঞা বীরদর্পে ক্লাস থেকে বেরিয়ে গেলো |

মেঘা : তুই চিন্তা করিসনা রে , তুই যে কত ভালো স্টুডেন্ট সব স্যারেরা জানেন | চল , আমরা দুজনে মিলে প্রিন্সিপাল স্যারকে গিয়ে আবার তোর পরীক্ষা দেওয়ানোর ব্যবস্থা করার অনুরোধ করি |

বিদিশা চুপ করে কেঁদেই চলেছে | কে জানে কি আছে ওর কপালে |
Copyright©All Rights Reserved
Piyali Chakravorty 

Copyright©All Rights Reserved
Piyali Chakravorty
স্তব্ধ বিদিশাকে সঙ্গে নিয়ে মেঘা ছুটলো প্রিন্সিপাল স্যারের কেবিনে | বেশ কিচ্ছুক্ষন অপেক্ষার পর ওরা ভেতরে প্রবেশ করার অনুমতি পেলো | স্যারের সামনে বিদিশা কান্নায় ভেঙে পড়লো | কোনো কথা বেরোচ্ছেনা ওর মুখ দিয়ে |

মেঘাই শুরু করলো , ' স্যার , ও আমার বেস্ট ফ্রেন্ড বিদিশা | আজকে আমাদের ফার্স্ট সেমের পরীক্ষা শুরু হয়েছে | পরীক্ষা চলাকালীন ও খুব অসুস্হ হয়ে পড়ে | বার বার ওয়াশরুমে যেতে বাধ্য হয় | পুরো সময়টাই ওর নষ্ট হয়ে যায় | ১০০ নম্বরের মধ্যে মাত্র ২৮ নম্বরের উত্তর লিখতে সমর্থ হয় ও | কিন্তু আপনি বিশ্বাস করুন স্যার , ও খুব ভালো স্টুডেন্ট | আপনি আমাদের ফিজিক্স ডিপার্টমেন্টের সব স্যার আর মাডামদেরকে জিজ্ঞাসা করে দেখতে পারেন যে ও পড়াশুনোয় কতটা মনোযোগী | দয়া করে ওর রি- টেস্টের ব্যবস্থা করে দিন স্যার , নাহলে ওর মার্কশীটে লাল কালির দাগ থেকে যাবে | খুব নরম মনের মেয়ে ও , কিছুতেই তা সহ্য করতে পারবেনা | '

বিদিশা ততক্ষনে চোখের জল চাপতে মুখটা ওড়না দিয়ে ঢেকে রেখেছে |

প্রিন্সিপাল স্যার : বিদিশা , আমি চেষ্টা করে দেখছি , তোমার জন্য কি করা যেতে পারে | একদম ভেঙে পড়োনা | আমি ডিপার্টমেন্টের টিচারদের সাথে কথা বলে তোমাকে আজকেই জানাচ্ছি | আর বাকি পেপার গুলোর জন্য ভালো করে রিভাইস করো |

প্রিন্সিপাল স্যারের কথায় বিদিশা আশার আলো খুঁজে পেলো |

কাঁদতে কাঁদতে ও বললো , ' দয়া করুন স্যার , আমার জন্য সর্বাপেক্ষা কঠিন প্রশ্নপত্র তৈরী করতে বলুন , একটা সুযোগ দিন আমাকে , নিজেকে প্রমাণিত করার |

স্যার : ঠিক আছে , আমি দেখছি কি করা যায় | তোমরা এখন আসতে পারো | আমি ডিপার্টমেন্টের সাথে কথা বলে জানাচ্ছি আজকেই |

ওরা স্যারের কেবিন থেকে বেরিয়ে যেতেই , বিদিশাদের পরীক্ষা হলে কর্তব্যরত স্যারকে প্রিন্সিপাল ডেকে পাঠালেন | ওনার মুখ থেকে শোনা কথার ভিত্তিতে উনি সিসিটিভি ক্যামেরা দেখে , সম্পূর্ণ ঘটনাটা বুঝতে পারলেন | সিসিটিভি তে পরিষ্কারভাবে দেখা যাচ্ছে বিদিশা বরংবার ওয়াশরুমে যাচ্ছে - আসছে | উনি বুঝতে পারলেন যে বিদিশার সত্যিই শরীর খারাপ করেছিল |

ফিজিক্স এর ডিপার্টমেন্টাল হেড এবং ভাইস প্রিন্সিপাল স্যারকে ডেকে , ওনাদের সাথে কথা বলে  উনি বুঝতে পারলেন বিদিশা সত্যিই খুব ভালো ছাত্রী |

সবার সাথে কথা বলে উনি ঠিক করলেন , বিদিশাকে রি - টেস্টের সুযোগ অবশ্যই দেওয়া উচিত |

কলেজের এডমিশন লিস্ট চেক করে বিদিশার ফোন নম্বর খুঁজে পেলেন | তৎক্ষণাৎ উনি বিদিশাকে ফোন করে ওনার ডিসিশান জানিয়ে দেওয়া সমীচীন বলে  মনে করলেন , কারণ মেয়েটা একেই অসুস্থ , তার ওপর খুব টেনশনে আছে | দেরি করা ঠিক হবেনা |

বিদিশা নিজের রুমে পায়চারি করছে | টেনশনে মনে হচ্ছে হৃদপিন্ডটা লাফ মেরে মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসবে | মেঘা ওকে স্বান্তনা দিয়েই চলেছে | এমন সময় ঘরের নিস্তব্ধতা ভেদ করে বিদিশার ফোনটা বেজে উঠলো | আননোন নম্বর |

বিদিশা ফোন ধরে , ' হ্যালো ' বলতেই প্রিন্সিপাল স্যার বলে উঠলেন , ' আমরা সমস্ত দিক বিচার করে , এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি যে ,......

এতটুকু শুনেই বিদিশা কাঁদতে শুরু করলো , ভয়ে ফোনটা ওর হাত থেকে পড়ে যাবার উপক্রম |

প্রিন্সিপাল স্যার: কেঁদোনা বিদিশা , আমরা সবাই মিলে ঠিক করেছি , আগামী রবিবার তোমার রি - টেস্টের ব্যবস্থা করা হবে | '

হুররেএএএএ..... বিদিশা স্যারের সাথে কথা বলতে বলতেই চেঁচিয়ে উঠলো | কান্নাজড়ানো গলায়  বিদিশার উল্লাস প্রিন্সিপাল স্যারকেও প্রসন্নতায় ভরিয়ে তুললো |

মেঘা সঙ্গে সঙ্গে ছুটে এসে বিদিশাকে জড়িয়ে ধরলো | এই প্রথমবার বিদিশা মেঘার চোখে জল দেখলো , সে শুধু ওর বন্ধুর জন্য ভালোলাগায় ভরা |

মেঘা ঘরের দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে চেঁচামেচি শুরু করে দিলো , ' শুনছো , সবাই শোনো , বিদিশার আবার রি - টেস্ট হবে | আমার বন্ধু ফেল করবেনা | চরম খুশি আজকে মেঘা |

খবরটা ছড়িয়ে পড়তে বেশিক্ষন সময় লাগলোনা |

বিদিশার সুখবরটা প্রজ্ঞার মনে তীরের মতো এসে বিঁধলো , ' এভাবে হলোনা , এখন অন্য পন্থা অবলম্বন করতে হবে দেখছি | পরীক্ষাটা শেষ হোক , তারপরই তো কলেজ সোশ্যাল আছে | ঐদিন মজা টের পাওয়াব বাছাধনকে | সবার সামনে যদি অপদস্থ করতে না পারি , আমার নাম প্রজ্ঞা নয় |
Copyright©All Rights Reserved
Piyali Chakravorty 

Copyright©All Rights Reserved
Piyali Chakravorty
দেখতে দেখতে পরীক্ষা শেষ হয়ে গেলো | সামনেই কলেজ সোশ্যালে | সাজো সাজো রব পুরো ক্যাম্পাসে |

সোশ্যালে আসছেন বলিউডের বিখ্যাত , জনপ্রিয় গায়ক তথা সংগীত পরিচালক হিমু রেশম | পুরো কলেজ ওনার আতিথেয়তা করার জন্য উদগ্রীব হয়ে আছে |

বিদিশা আর মেঘা বেশ চিন্তায় আছে | প্রজ্ঞা এবারেও না কোনো গন্ডগোল পাকায় |

দুর্দান্ত সব প্রোগ্রামের আয়োজন করা হচ্ছে সোশ্যালে | সাথে থাকবে হিমু রেশমের গান | ওফফ .....পুরো ফাটাফাটি |

সন্ধ্যা আগতপ্রায় | একটু পরেই শুরু হবে প্রোগ্রাম | একটা ঝাঁ চকচকে কালো রঙের মার্সেডিস এসে ঢুকল কলেজের গেট দিয়ে | সবাই দৌড়ে গিয়ে ভীড় জমালো সেই গাড়ি ঘিরে | হিমু রেশম এসে গেছেন | প্রিন্সিপাল স্যার নিজে গিয়ে ওনাকে স্বাগতম জানালেন |

কিছুক্ষনের মধ্যেই প্রোগ্রাম শুরু হয়ে গেলো | সঞ্চালক হলেন শিলচর শহরের সবার প্রিয় দেবদীপ | প্রোগ্রাম শুরু হলো জাতীয় সঙ্গীত দিয়ে | তারপর একের পর এক নামকরা শিল্পীরা স্টেজ অলংকৃত করে কেউ গান , কেউ নাচের মধ্যে দিয়ে বিনোদনের অন্য মাত্রা এনে দিলেন |

এবারে এলো কলেজ স্টুডেন্টদের কৃতিত্ব দেখানোর পালা | প্রজ্ঞা নড়েচড়ে বসলো | এবারেই ওই পাহাড়ের মতো বিদিশাকে শেষ করতে হবে | ভীষণ বাড় বেড়েছে তাই না !

একে একে কলেজ স্টুডেন্টরা স্টেজে উঠে কেউ নাচ , কেউ গান , কেউ আবৃত্তি করে শোনাতে লাগলো | দেবদীপ পর পর নাম এনাউন্স করে চলেছে , আর পর পর স্টুডেন্টরা যে যার পারফরমেন্স খুব সুন্দর ভাবে উপস্থাপন করছে |

হটাৎ নাম ডাকা হলো , ' বিদিশা ব্যানার্জী , স্টেজে চলে এসো | ' বিদিশার তো থরহরি কম্প শুরু হলো | ও তো কোনো পারফরমেন্সেই নিজের নাম দেয়নি | ওর নাম ধরে ডাকা হলো কেন ? '

ভাবতে ভাবতে প্রজ্ঞা আর ওর দলবল বিদিশার সামনে এসে দাঁড়ালো | আর ওকে জোর করে ঠেলে ঠুলে নিয়ে গেলো স্টেজের দিকে |

স্টেজের সামনে গিয়ে ও দিশাহারা হয়ে পড়লো | আবার সঞ্চালক ওর নাম ধরে ডাকতে , ও স্টেজে উঠতে বাধ্য হলো |

দেবদীপ ওর হাতে একটা মাইক্রোফোন ধরিয়ে দিলো | বিদিশার এখনো কোনো আইডিয়াই নেই , যে ওকে ঠিক কি করতে হবে ?

দেবদীপ চিৎকার করে বলে উঠলো , এখন একটি গান পরিবেশন করবেন , আপনাদেরই কলেজের ফিজিক্স অনার্সের প্রথম বর্ষের ছাত্রী বিদিশা ব্যানার্জী |

মেঘার এখন শান্তি | কারণ ও জানে , ওর বন্ধুটি একটি যথেষ্ট গুণবতী গায়িকা | বিদিশার হাত-পা কাঁপা ধীরে ধীরে কম হয়ে এলো |

ও শুরু করলো আজকের সন্ধ্যায় গাওয়া ওর প্রথম গান , হুবহু আশা ভোঁসলের কণ্ঠের অনুকরণে , ' ঝুমকা গিরা রে , বরেলি কে বাজার মে | '

প্রজ্ঞা যে কোথায় লুকোবে , কোথায় পালাবে বুঝে উঠতে পারছেনা | ওর এখন মনে হচ্ছে ভূমি ফেটে ভাগ হয়ে যাক , আমি একটু মুখ লুকিয়ে বাঁচি |

গানটি শেষ হবার পর হাততালিতে ফেটে পড়লো পুরো অডিটোরিয়াম | হিমু রেশম উঠে দাঁড়িয়ে বিদিশাকে কুর্নিশ জানালেন এবং আরো কয়েকটি গান গাইবার অনুরোধ করলেন |

বিদিশা শুরু করলো ওর দ্বিতীয় গান , ' সুন রাহা হ্যায় না তু , রো রহি হুঁ ম্যায় | ' হুবহু শ্রেয়া ঘোষালের কণ্ঠে |

তৃতীয় গান আর কোনো শিল্পীর কণ্ঠস্বরে নয় , সম্পূর্ণ নিজের কণ্ঠে গাইলো বিদিশা , লগ যা গলে , কে ফির ইয়ে হাসি রাত হো না হো | '

গানের শেষে সবাই এতটাই মুগ্ধ যেন হাততালি দিতেও ভুলে গেছে |

হিমু স্যার বিদিশার সামনে এসে ওর মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করলো , ' বাচ্চি , তুনে দিল জিত লিয়া | মেরে নেক্সট অ্যালবাম মে লিডিং সিঙ্গার বনেগি ? '

বিদিশা আপ্লুত , আনন্দাশ্রু বয়ে চলেছে ওর চোখ দিয়ে | ও পায়ে হাত দিয়ে হিমু স্যারকে প্রণাম করলো |

মেঘা আনন্দে চেয়ারে উঠে নাচতে শুরু করে দিয়েছে |

প্রজ্ঞা আর ওর দলবলকে কেউ কোত্থাও খুঁজে পেলোনা সেই সন্ধ্যায় | প্রজ্ঞার প্রতিশোধ বিদিশার কাছে শাপে বর হয়ে উঠলো |

বিদিশা সেই দিন সেই সন্ধ্যায় খুঁজে পেলো নিজের দিশা |

সবাই হয়তো স্মার্ট , সুন্দরী , শিক্ষিতা , ধনী হয়না | কিন্তু প্রত্যেকটি মানুষের মধ্যেই ভগবান এমন কিছু গুন দিয়ে আমাদেরকে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন , যা কদরের যোগ্য | তাই কোনসময় কাউকে ছোট করা , মনে আঘাত দেওয়া , বডি শেমিং , এইধরণের ক্রিয়াকলাপ করার আগে আমাদের ভেবে দেখা উচিত যে , এরজন্য হয়তো সেই মানুষটির অন্তরাত্মা কাঁদতে পারে | আর আমরা জানি , আত্মা হলো পরমাত্মার অংশ | তাই মানুষকে কষ্ট দেওয়া মানে ঈশ্বরকে কষ্ট দেবার সমান | কাউকে ভালোবাসতে না পারি , অকারণে কাউকে ঘৃণা করার কোনো অধিকার আমাদের নেই 🙏
Copyright©All Rights Reserved
Piyali Chakravorty

🌹 🌹🌹🌹🌹সমাপ্ত🌹🌹🌹🌹🌹




আত্মমর্যাদা । (পারমিতা মন্ডল।)

আত্মমর্যাদা ।

পারমিতা মন্ডল ।

।।।।।।।।।।।   💐পর্ব ----১ 💐  ।।।।

"তুমি আজই এখান থেকে চলে যাবে দিদি ? তা কোথায়  যাবে ঠিক করেছো ?"  হ‍্যাঁরে ,এখানে আমার আর এক মুহূর্ত ভালো লাগছে না ।আমি আজই এখান থেকে চলে যাবো । এই পরিবেশ আমার কাছে বড় অচেনা লাগছে । দম বন্ধ হয়ে আসছে আমার । ভাবছি অনেক দূরে  কলকাতাতেই  যাবো যেখানে কেউ আমাকে চিনবে না । জীবন টাকে নতুন করে আবার শুরু করবো ।  " কেন রে তোর ওখানে আমাকে একটু থাকতে দিবি না?"
"কি যে বলেন দিদি , আমি হলাম গরীব মানুষ । আমার কাছে কি তুমি থাকতে পারবে ? তোমার কষ্ট হবে যে ।"  "না রে  রমেশ , গরীব বড় লোকের কথা নয় । তোর কাছে আমি কতদিনই বা থাকবো ? আমাকে তো কিছু একটা করতে হবে বল ! জমানো টাকায় কতদিন চলবে ? তাছাড়া তুই তো জানিস কাবেরীর পুরো খরচ আমিই দেই । তাই কাজ তো আমাকে করতেই হবে ।  নাহলে ওর পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাবে । ওকে তো আমিই ভরসা দিয়ে  দায়িত্ব নিয়ে , আমার কাছে নিয়ে এসেছিলাম সবার বিরুদ্ধে গিয়ে । ওর সব দায়িত্ব তো আমারই । তাই কাজ তো আমাকে করতেই হবে ।সে যে কাজই হোক না কেন? তবে এখানে আমি আর থাকবো না। তুই তো জানিস সব।"

"তাই বলছিলাম কলকাতায় কোথাও একটা ছোট খাটো ঘর আমাকে ভাড়া করে দে । আমি ওখানে চলে যাব । এই পরিবেশে আমার আর একদিন ও থাকতে ইচ্ছা করছে না "। বলেই ঝরঝর করে কেঁদে ফেললেন  তপতি দি । জন্ম থেকেই তিনি   এখানে ছিলেন না । তবে বহু দিন হয়ে গেল পুরুলিয়ায় এই গ্রাম‍্য পরিবেশের   সাথে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছেন । গ্রামের এই সরল সাদাসিধে মানুষ গুলো ওনাকে খুব ভালো বাসতো । কিন্তু কি এমন হলো যে তিনি এখানে আর একটু ও থাকতে চাইছেন না ।

চলে এলেন  কলকাতায় । সল্টলেকের কাছে যে বড় বস্তিটা আছে তার কাছে একটা টালির চালের ঘর ভাড়া পেলেন তপতী দিদি । বেশী বড় বাড়ি ভাড়া নিতে গেলে টাকা বেশি লাগবে । তার চেয়ে এই ভালো ।বৃদ্ধা মাকে নিয়ে  সবকিছু ছেড়ে এখানে এসে উঠলেন তিনি । "না, আর পিছন ফিরে তাকাবো না । যা হয়েছে ভলোই হয়েছে ।অন‍্যায়ের সাথে আপস করা যায়না । তার চেয়ে এই ভালো ।কিন্তু এভাবে তো চলবেনা । একটা কাজ তো যোগাড় করতে হবে। একে তো কলকাতা শহর ।তার উপর জানাশোনা কেউ নেই । ঐ শুধু এক রমেশ দরোয়ান ছাড়া ।  রমেশকে বলেছিল যদি কোন কাজ যোগাড় করে দিতে পারে ।  ছেলেটা অনেক করেছে আমার জন্য। এখনো করছে । কিন্তু এখানে কাজ পাওয়া খুব মুসকিল। তাছাড়া আমার যা বয়স তাতে কোন কোম্পানিতে ও কাজ পাবো না । আর বেশী দূর হয়ে গেলে যাতায়াত ও করতে পারবো না। " এই সব নানান চিন্তা আসছে মনের মধ্যে ।

।।।।।।।।।।।‌।।  💐💐💐পর্ব  ২💐💐💐 ।।।।।।

"আজ একমাস হলো আমি মাকে নিয়ে এখনে চলে এসেছি । এখনো কোনো কাজ পাইনি । কিন্তু এভাবে বসে বসে খেলে তো সব টাকা শেষ হয়ে যাবে। কাবেরী কেই বা টাকা পাঠাবো কি করে ?" মনে মনে ভাবছে তপতি দি ।  কাবেরী তো এসব কিছুই জানে না ।এমন সময় রমেশ এলো ।  রমেশের খুব খারাপ লাগছে আমাকে এভাবে দেখে ।তারপর কোন কাজ নেই । ও একটা কাজের খোঁজ নিয়ে এসেছে । কিন্তু বলতে ইতস্ততঃ করছে । একটি বাচ্চা মেয়ের পুরো দায়িত্ব নিতে হবে। ওর  মা চাকরি করেন। তাই মেয়েক ঠিক মতো দেখাশোনা করতে পারে না ।ওরা এমন একজন লোক খুঁজছে , যে মেয়েটিকে স্কুলে পৌঁছে দিতে  ও নিয়ে আসতে পারবে , আবার তার পড়াশোনা ও খাওয়া দাওয়ার ও দায়িত্ব নিতে পারবে । অর্থাৎ গভর্নেস ।  মেয়েটি তৃতীয় শ্রেণীতে পড়ে ।

কোন কাজ ছোট না ।তাই সব শুনে রাজি হয়ে যান তপতি দি । পাঁচ হাজার টাকা মাইনে দেবে ।  তার থেকে বড় কথা কাজের মধ্যে থাকলে সবকিছু ভুলে থাকা যাবে।
যাইহোক কিছু তো হবে। তাছাড়া ঘরে বসে থাকতেও আর ভালো লাগছে না । পুরনো কথা মনে পড়ে যাচ্ছে । তার থেকে কিছু একটা কাজ করলে মন ভালো থাকবে । তাই রাজি হয়ে যায় তপতী ।

আজ  তিন মাস হলো মিমির  দেখা শোনা করছে তপতী দি ।ভালোই লাগছে । এ এক নতুন জীবন । কি মিষ্টি মেয়েটা । এই কয়দিনে কেমন আপন করে নিয়েছে ।তপতী দি মিমিদের বাড়িরই একজন হয়ে গেছেন ।  মিমির বাবা বাইরে থাকেন কর্মসূত্রে  । মিমির মা  দুই ছেলে মেয়েকে নিয়ে এখানে থাকেন ।  ওনাকে খুব সকালে বেরিয়ে যেতে হয় । ঠাকুমা আছেন ।রান্নার লোক ও আছে ।কিন্তু মেয়ের পড়াশোনার খুব ক্ষতি হয়ে যাচ্ছিল । ছেলে নাইনে পড়ে ।ও যখন ছোট ছিল তখন ওর বাবা কাছে ছিল । দুজনে মিলে মিসে কাজ করে ছেলেকে বড় করেছেন। কিন্তু মেয়ের জন্য গভর্নেস  রাখতে হলো । কাজের লোক নয় । লেখা পড়া জানা একজন শিক্ষিত মানুষ ।যে মিমির পুরো দায়িত্ব নিতে পারবে। মিমির পড়াশোনাও দেখতে পারবে । পেয়েও গেল তপতী দি কে ।

।সকালে মিমি কে যখন স্কুলে পৌঁছে দিতে যায তপতি দি , তখন খুব ভালো লাগে।  কেমন একটা উদাস দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন স্কুল বিল্ডিং টার দিকে ।ছেলে মেয়েদের ঐ কোলাহল , ঘন্টার আওয়াজ, মায়েদের ব‍্যাস্ততা, দেখে তিনি কোথায় যেন হারিয়ে যান।  নিজের অজান্তেই চোখে দুফো়ঁটা জল চলে আসে। এই পরিবেশ তার যে বড় চেনা । খুব আপন । নীরবে কিছুক্ষন দাঁড়িয়ে থাকেন । তার পর আস্তে আস্তে ফিরে আসেন ।

মিমির দাদা ঋক ক্লাস  নাইনে পড়ে । ও খুব ভালো  পড়াশোনায়। তপতী দিকে মাসি বলে ডাকে ‌। নিজের মাসির মতোই ভালো বাসে ।ওদের ঠাকুমা কনকচাঁপা দেবীও তপতী দিকে খুব ভালো বেসে ফেলেছেন । সবচেয়ে বড় কথা নাতি নাতনির পুরো দায়িত্ব নিয়ে নিয়েছেন তপতী দি। তাইতো এতো ভালো বেসে ফেলেছেন । তাছাড়া নাতনি মিমি এবার  প্রথম পরীক্ষায় খুব ভালো ফল করেছে ।তাই ওর মাও খুশি । এদিকে ঋককে সারাদিন পড়তে হয়। ওর ক্লাস নাইন ।তাই  পাঁচজন শিক্ষক শিক্ষিকা । বেচারা সারাদিন দৌড়ায়।  দুজন স‍্যার শুধু বাড়িতে আসেন । একজন  অংক  করান আর একজন বাংলা । তাই ওর যাতে কোন অসুবিধা না হয় সেটাও দেখেন তপতি দি।  স‍্যার আসার আগেই ওকে জোর করে খাইয়ে দেন ।

কিন্তু সেদিন ঘটে গেল এক অঘটন ।  ঋকের অংক স‍্যার খুব কড়া ।অংক করে না রাখলে খুব বকাবকি করেন । কিন্তু ঋক তো অংক গুলো  ঠিক করে  বুঝতে পারেনি । তাই স‍্যারের কাছে পড়বে না বলে বায়না  করছিল ।  এমন সময় স‍্যার চলে এলেন ।  ঋকের সব অংক করা হয়নি বলে  বকতে শুরু করলেন । একে তো ছেলে টা পড়তে চাইছিল না তারপর বকলে তো কিছুই মাথায় ঢুকবে না ।।   অংকটা স‍্যার যতবার বোঝাচ্ছেন  ঋক  ধরতেই পারছে  না ।   হঠাৎ স‍্যারের উ়ঁচু গলায় বকা খেয়ে ঋক ঘাবড়ে যায় । এবং সে কাঁদতে শুরু করে। এমন সময় হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে তপতিদি ঘরে ঢুকে গেলেন। ঋকের কাছ থেকে খাতাটা নিয়ে স‍্যারের  সামনে খুব সহজ পদ্ধতিতে অংকটা করে দিলেন । পর পর বেশ কয়েক টা অংক করে বোঝানোর পর ঋক খুব সহজেই বুঝতে পারলো । খুব খুশি ঋক ।স‍্যার তো কখনো এই পদ্ধতিতে অংক করাননি ।  এদিকে  স‍্যার চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে ছিলেন তপতিদির দিকে । জীবনে কখনো এতটা অপমানিত  তিনি বোধহয় হননি এর আগে । বাড়ির সামান্য একটি গভর্নেস তাকে অংক শেখাতে এসেছে ।

হঠাৎ সম্বিত ফিরে পান তপতিদি। তিনি যেন অন্য জগতে চলে গিয়েছিলেন । না ,না এটা তিনি ঠিক কাজ করেননি ।তার ভুল হয়ে গেছে। স‍্যার হয়তো অপমানিত হয়েছেন । এবার একাজটাও যাবে । উনি নিশ্চয়ই  ঋকের বাবা মাকে বলবেন ।  আর একজন সামান্য গভর্নেসের এই স্পধা  ওরা মেনে নেবে না । কাল থেকে আর কাজ থাকবে না । কেন যে তিনি এরকম বারবার করেন । স‍্যার কে দেখে বোঝাই যাচ্ছে উনি প্রচণ্ড রেগে গেছেন। তপতিদি স‍্যারের কাছে ক্ষমা চেয়ে বললেন," আসলে ঋকের কান্না  দেখে তিনি উত্তেজিত হয়ে একাজ করে ফেলেছেন । তার ভুল হয়ে গেছে।"

।।।।।।।‌‌। 💐💐💐পর্ব --৩💐💐💐💐
সেদিন অন্য দিনের তুলনায় একটু তাড়াতাড়ি বাড়িতে চলে এলেন তপতিদি । রাতে বিছানায় শুয়ে আজ অনেক দিন পর আবার উথাল পাথাল করছে মনের মধ্যে । পুরুলিয়া শহরের প্রত‍্যন্ত গ্রামে একটা স্কুল । সেখানের  একজন সহকারী শিক্ষিকার পদে যোগদান করেন তপতিদি । চোখে স্বপ্ন মনে আশা নিয়ে শুরু করেন চাকরি জীবন। শিক্ষকতার সাথে সাথে কিভাবে গ্রামের মানুষের উন্নতি করা যায় সে চেষ্টা ও করেন তিনি । কিছু দিনের মধ্যে গ্রামের সবার কাছে তিনি খুব জনপ্রিয় হয়ে যান ।স্কুলের বিষয় ছাড়াও অনেকে আসতেন তার কাছে সাহায্যের জন্য । কারো ছেলের অসুখ, কারো মেয়ের বিয়ের জন্য টাকা দরকার , তিনি সাহায্য করতেন । সংসারে তপতিদির মা ছাড়া আর কেউ নেই । তিনি বিয়ে করেননি । তাই ওদের সাহায্য করতে কোন অসুবিধা হতো না । যদিও তখন  টিচারদের মাইনে এতোটা ছিল না।

তার এই জনপ্রিয়তা অনেকেই ভালো চোখে দেখতেন না । আবার তপতিদির জন্য তাদের অসুবিধাও হচ্ছিল । তাই ওরা চেষ্টা করছিল তপতিদি কে বিপদে ফেলার ।সেই সুযোগ ও একদিন চলে এলো । ক্লাস এইটের একটি না বালিকা মেয়ে কাবেরীকে জোর করে বিয়ে দিচ্ছিল ।  কাবেরী পড়তে চেয়ে ছিল । কিন্তু অভাবের সংসারে বাবা মা তার সেই কথা শোনেনি ।   তাই কাবেরীও সুযোগ খুঁজছিল পালানোর । অবশেষে সে বিয়ের আসর ছেড়ে পালিয়ে আসে  তপতি দির কাছে । তপতিদি লুকিয়ে রাখে মেয়েটিকে তার কাছে ।  তারপর পুলিশে খবর দেন কিন্তু কিছুক্ষনের মধ্যে গ্রামের লোকজন এসে হামলা করে । গ্রামের মাতব্বররাও আসে ওদের সাথে । ওরা তপতিদির বিরুদ্ধে মেয়ে পাচার করার অভিযোগ আনে । ওরাও খবর দেয় পুলিশে । ওরা টাকা খাইয়ে কেসটাকে উল্টো করে সাজিয়ে ফাঁসিয়ে দেয় তপতিদিকে। কাবেরীও ভয় পেয়ে মিথ্যা সাক্ষী দিয়ে দেয় । পুলিশ এ্যরেস্ট করে তপতিদিকে ।  কিন্তু অভিযোগ প্রমাণ করতে না পেরে ছেড়ে দেয় । এতো বড় আপমান তিনি এর আগে কখনোই হননি । যে গ্রামের উন্নতির জন্য গ্রামের মানুষকে ভালো বেসে জীবনের এতো গুলো বছর কাটিয়ে দিলেন , এদের সাথে আজ তারা তাকে ভুল বুঝলো ??  কাবেরীর মা যখন ছোট বোনটার জন্ম দিতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ে ছিল তখন  তো তপতিদি নিজের খরচায় গাড়ি ভাড়া করে হসপিটালে নিয়ে যান । এরা সব ভুলে গেল !

তপতিদিকে তাড়াতে না পারলে লুটে পুটে খেতে পারছিলো না ওরা ।তাই এই নোংরা পলিটিক্স করে । মনের দুঃখে চাকরি ছেড়ে দেন তিনি ।  অনেকেই বলেছিল  "আপনি হেরে গিয়ে পালিয়ে যাচ্ছেন । আপনার লড়াই করা উচিত "। কিন্তু কাদের জন্য লড়াই করবেন তিনি ?  তার নিজের প্রয়োজন  তো সামান্য  ছিল । রোজগারের অর্ধেকের বেশী টাকা তো ভালো বেসে এদের পিছনে খরচ করেছেন । আর আজ এরা –– যেভাবেই হোক অন্য কোন কাজ যোগাড় করে নেবেন ।কিন্তু এই অপমান সহ‍্য করে এখানে এক মুহূর্ত নয়। চলে এলেন কলকাতায় ।

এইসব ভাবতে ভাবতে কখন যেন ঘুমিয়ে পড়ে ছিলেন । উঠে দেখেন সকাল হয়ে গেছে ।  আজ আর মিমিদের বাড়িতে যেতে হবে না। কাল যা অন‍্যায় করেছেন তাতে ঋকের স‍্যার খুব রেগে গেছেন । উনি নিশ্চয়ই ঋকের মাকে সব বলেছেন ।  কিছুই আর ভালো লাগছে না । সততা, আদর্শ এগুলোর আজ আর কোন দাম নেই ।   এমন সময় দরজায় কে যেন ধাক্কা দিল । এতো সকালে কে এলো ?  দরজা খুলেই অবাক তপতিদি ।ঋকের মা এসেছে । হয়তো কয়েকটা কটু কথা বলবে ।  সে ভুল করেছে ঠিকই তাই বলে বাড়িতে চলে এলো ? উনি আরো অবাক হয়ে গেলেন পিছনে সেই অংকের স‍্যার ও এসেছেন দেখে।

ঋকের মা বললেন," আপনি আজ গেলেন না তাই আমাকেই আসতে হলো । আজ থেকে শুধু মিমির না , ঋকের দায়িত্ব ও আপনি নেবেন "।কি বলছেন ইনি ? নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছেন না । এমন সময় পিছন থেকে কে যেন "ম‍্যাম" বলে ডেকে উঠলো । ভুল শুনলেন কি ? না, না ঋকের স‍্যার কাছে এগিয়ে এসে বলল , "আমাকে  চিনতে পারলেন না ম‍্যাম ?" আমি জয়ন্ত । কানু মিস্ত্রির ছেলে । আপনি টাকা না দিলে আমি লেখা পড়াই শিখতে পারতাম না কোন দিন । আপনি আমাকে চিনতে পারেন নি । কিন্তু সেদিন যখন আপনি ওভারে ঘরে ঢুকে পড়াতে শুরু করলেন তখন আপনাকে দেখে চিনেছিলাম । কিন্তু মেলাতে পারিনি ।  আপনার পড়ানোর  সেই সহজ ভঙ্গিমা আজও আমি ভুলিনি ।

জয়ন্ত পায়ে হাত দিয়ে প্রনাম করলো ।তারপর সব কথা শুনলো ।তপতিদি বললেন"' টাকার থাকে আদর্শ, সন্মান এগুলো অনেক বড়। তাই আমি সব ছেড়ে চলে এসেছি ।"

আজ অনেক দিন হয়ে গেল তপতিদি তার যোগ্য সন্মান ফিরে পেয়েছেন। না', না  চাকরিতে আর ফিরে যাননি । জয়ন্তর কোচিং সেন্টারে তিনি একজন আদর্শ শিক্ষিকা হিসাবে   ছেলে মেয়েদের মানুষ গড়ার কাজ করে চলেছেন ।

সমাপ্ত।


মায়ের পরশ (পিয়ালী চক্রবর্তী)

 


ছোট্ট রিয়া । মায়ের সাথে থাকে । দুবছর আগে একটা গাড়ি দুর্ঘটনায় ওর বাবার মৃত্যু হয় । সংসারে নেমে আসে চরম দুর্গতি । 


মা - মেয়ের সংসার । মা মীরা দেবীর পেটে অত বিদ্যা নেই যে, তিনি কোনো অফিসে কাজ করতে পারবেন । লোকের বাড়ি বাড়ি ঘুরে পরিচারিকার কাজ করেন তিনি । ওনার একটা চোখ নেই । বহু কষ্টে সারাদিন পরিশ্রমের ফলে যে অর্থ উপার্জন হয়, তা দিয়ে তিনি মেয়েকে ভালো স্কুলে ভর্তি করিয়েছেন । 


প্রথমদিন স্কুল থেকে ফিরেই রিয়ার মন খারাপ । স্কুলের কজন বাচ্চারা ওকে নিয়ে হাসাহাসি করেছে । তারা ওকে "কানিবুড়ির মেয়ে" বলে বলে উত্যক্ত করে তুলেছে সারাদিন । মায়ের প্রতি বিতৃষ্ণায় ওর মনটা ভরে উঠেছে । কি বিশ্রী আর ভয়ঙ্কর দেখতে লাগে ওর মা কে । এরকম মা থাকার চেয়ে না থাকা ভালো ।


দিন গড়িয়ে মাস, মাস গড়িয়ে বছর । সময়ের সাথে সাথে ওর মায়ের প্রতি ঘৃণা আরো বেড়ে চলে ।


একদিন বাড়ি ফিরে মাকে অসময়ে বিছানায় শুয়ে থাকতে দেখে ও ভাবে, "মহারাণীর আবার হলো টা কি! পড়ে পড়ে ঘুমোচ্ছে ।" অশ্রদ্ধা ভরে মা কে ডাকে, "উঠে খেতে দাও । এতো ঘুম ভালো নয় ।" 


মায়ের শরীরও যে খারাপ থাকতে পারে, তা যেনো ওর মাথাতেই এলো না । মীরা দেবী কোনমতে শরীরটা টেনে বিছানা থেকে তুলে নিয়ে গেলেন রান্নাঘরের দিকে । মাথা ঘুরে পড়ে গেলেন তিনি ।  রিয়া দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলো, মা কে ধরলোও না সে । উল্টে চরম বাক্যটা তার মুখ দিয়ে বেরিয়ে এলো সেদিন, "মরতে পারো না? তোমার জন্য স্কুলে আমি হাসির পাত্রী । একচোখো কানিবুড়ি কোথাকার ।" 


মীরা দেবী সব শুনেও কিচ্ছু বললেন না । ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে ভাত বেড়ে থালাটা সুন্দর করে সাজিয়ে , জলের গ্লাস পাশে রেখে আবার শুয়ে পড়লেন । মা কে শুয়ে পড়তে দেখে রিয়া মুখ বাঁকালো । আর মনে মনে ঠিক করলো এই কানিবুড়ির কাছ থেকে যত সম্ভব তাড়াতাড়ি বেরিয়ে যেতে হবে । নাহলে সমাজে আর মুখ দেখানো যাচ্ছে না । 


দেখতে দেখতে কেটে গেল বেশ কয়েকটি বছর । রিয়া ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করেছে । মীরা দেবী যথাসাধ্য পরিশ্রম করে ওকে পড়িয়েছেন মনের মতো করে । চাকরি পেয়েই মা কে একা ফেলে রেখে চলে গেল রিয়া । সেই যে গেলো, তার পরে মায়ের সাথে সমস্তরকমের যোগাযোগ বন্ধ করে দিলো । অফিসের এক সহকর্মীর সাথে প্রণয় ও পরিণয়ে আবদ্ধ হলো সে । বছর দুয়েক পরে কোল আলো করে এলো ওর পুত্র । 


এভাবে সুখে শান্তিতে মায়ের ছত্রছায়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কেটে গেল আরও পাঁচ বছর ।  পুত্র ঋষির পাঁচ বছরের জন্মদিনের দিন সকালে কলিং বেলের আওয়াজ পেয়ে দরজা খুলে রিয়া দেখে, সামনে ওর মা দাঁড়িয়ে আছে । বয়সের ভারে মা আরও ভয়ানক ও কুৎসিত হয়ে উঠেছে । রিয়ার আঁচল ধরে থাকা ঋষি ওই রূপ দেখে ভয়ে কেঁদে উঠলো । রিয়ার ধৈর্য্চ্যুতি ঘটলো । মায়ের গালে সশব্দে একটা চপেটাঘাত করে বলে উঠলো,  "জন্মদিনের দিন ছেলেকে ভয় দেখাতে এসেছি কানিবুড়ি । ভেবেছিলাম মরে গেছিস । এখনো বেঁচে আছিস তুই? আমার বাড়ির ত্রিসীমানায় তোকে আর কোনোদিনও দেখলে, চোর বদনাম দিয়ে পুলিশের হাতে তুলে দেবো ।" সশব্দে দরজাটা মায়ের মুখের ওপর বন্ধ করে দিলো সে ।


কেটে গেল বেশ কটা দিন । একদিন ওর নামে একটা চিঠি এলো । চিঠিটা খুলে দেখলো ওর মায়ের চিঠি । পড়তে শুরু করলো ।


সোনা, 

ছোটোবেলা থেকেই আমার রূপের জন্য অনেক কষ্ট সয়েছিস তুই । তোকে হাসির খোরাক বানিয়েছে তোর বন্ধুরা । বিশ্বাস কর, যেদিন তুই আমাকে বলেছিলিস সেই কথা, সেদিন থেকে আমি মরমে মরে আছি । সেদিনই নিজেকে শেষ করে দিতাম যদি তোর দ্বায়িত্ব আমার মাথার ওপরে না থাকতো । কিন্তু, জন্ম দিয়েছি তোকে । তোর বাবা চলে গেছে আমাদেরকে একা করে দিয়ে । আমিও যদি চলে যেতাম তাহলে এই বিশাল পৃথিবীতে একা মেয়ের পক্ষে বাঁচা খুবই মুশকিল । আমি চাইনি তোর জীবনটাও আমার মতো লোকের বাড়ি কাজ করে কাটুক । তাই ছেড়ে যেতে পারিনি সেদিন । আমার চোখটা এরকম ছিল না রে । যেদিন তোর বাবার গাড়ি দুর্ঘটনা ঘটে, সেদিন আমার অল্প চোট লাগলেও, তোর একটা চোখে সাংঘাতিক আঘাত লেগেছিল । তোর বাবার লাইফ ইন্স্যুরেন্সের টাকা দিয়ে আমি তোর চোখ অপারেশন করাই । নিজের একটা চোখ সেদিন দিয়ে দিয়েছিলাম যাতে, আমার বাচ্চা দুচোখ ভরে পৃথিবীটাকে দেখতে পারে । দূরে থাকলেও সব সময় তোর খোঁজ রাখতাম আমি । নাতিটাকে জন্মদিনের দিন আশীর্বাদ করতে গেছিলাম । ভাবতে পারিনি ও আমাকে দেখে ভয় পেয়ে যাবে । ছেলের ভয় পাওয়া দেখে একজন মায়ের যা কর্তব্য তুই সেটাই করেছিস আমাকে চড় মেরে । সেই জন্য আমার কোনো দুঃখ নেই রে । আসলে এই জীবনের বোঝা আমি আর বইতে পারছিনা । ক্ষমা করে দে আমায়, আজকে চিরবিদায় নিলাম তোর জীবন থেকে । এই চিঠি পেয়ে আমার খোঁজ করতে আসিসনা আর । আমি আর কোত্থাও নেই । সুখে থাকিস, ভালো থাকিস সোনা । 


ইতি

কানিবুড়ি


রিয়ার হাতেধরা চিঠি চোখের জলে ভিজে গেল । মায়ের প্রতি করা প্রতিটাদিনের সমস্ত ভুল-অন্যায়-অত্যাচার-পাপগুলো মনে পড়তে লাগলো ওর । আত্মগ্লানিতে বিষাক্ত হয়ে উঠলো ওর মন - প্রাণ । সত্যি মায়েরা কি এমনই হয়?

Copyright © All Rights Reserved

Piyali Chakravorty

# বিষয় - 'হিন্দুধর্ম'

নাম - 'হিন্দু-হিন্দুত্ব এবং বিবর্তন'
   ✍মৃদুল কুমার দাস।
   
            ( ৩য় পর্ব )
আলোচনায় প্রথমে আসি ধর্ম গ্রন্থ না থাকার ফলে কি সুবিধা হয়েছিল।
সে অনেক সুবিধা। যেমন -
  ১। ধর্মগ্রন্থ ছিল না বলে সময়ের দাবীতে ধর্মগ্রন্থ সংস্কারের দাবি ওঠেনি।
২। হিন্দু জাতিকে পরজাতি নিপীড়ক,পর জাতি আগ্রাসক, ধর্মান্তরীকরণের বদনাম বইতে হয়নি।
৩। বরং গর্বের সঙ্গে বলতে পেরেছে হিন্দু ধর্ম পরম সহিষ্ণু। ধর্মের সঙ্গে ধর্মের লড়াইয়ের কথা বলেনি। এমনকি নিজেকে সবার থেকে শ্রেষ্ঠ বলে কখনই জাহির করেনি।
৪। ধর্মগ্রন্থ না থাকলেও হিন্দুধর্মের প্রকৃত শক্তির উৎস অধ্যাত্মবাদ। এই অধ্যাত্মবাদ থেকে জন্ম নিয়েছে মূল্যবোধ। এই মূল্যবোধই ধর্মগ্রন্থ না থাকার অভিমানকে অতিক্রম করে ভারতীয় সংস্কৃতির ভিৎ বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য রচনা করেছে।
  এই মূল্যবোধ এসেছে বেদ উপনিষদের শিক্ষাকে ভিত্তি করে। সেই ভিত্তি হলো ষড়দর্শন। যেমন - কপিলের সাংখ্য, পতঞ্জলির যোগশাস্ত্র, গৌতমের ন্যায়, কণাদের বৈশেষিক,জৈমিনীর পূর্ব মীমাংসা এবং ব্যাসের বেদান্ত।
এই সাংখ্য দর্শন প্রাচীন গ্রীসকেও প্রভাবিত করেছিল। এই দর্শনের ভাবধারার সক্রেটিস থেকে অ্যারিস্টটল পর্যন্ত হেরাক্লিটাস থেকে ডিমোক্রিটাস এপিকিউরাস পর্যন্ত প্রভাবিত হতে দেখা গিয়েছিল। সাংখ্য ঈশ্বর সম্পর্কে নীরব - Knowledge of virtueর সম্পর্ক জুড়েছেন। এই দার্শনিকের মতে নিবৃত্তিই জীবনের একমাত্র কাম্য কারণ জাগতিক জীবনে প্রাপ্তি দ্বারা আকাঙ্ক্ষার নিবৃত্তি হয় না। যেমন - খাদ্যে ক্ষুধার নিবৃত্তি,পানীয়ে তৃষ্ণার নিবৃত্তি হয় সাময়িক, কেননা এরা বারবার ফিরে আসে। তাই বলা হয় ভোগের মধ্যে নিবৃত্তি নেই। ত্যাগবৃত্তি অনুশীলনেই নিবৃত্তি আসে। তা আসে সৎকার্যের অনুশীলনের দ্বারা। তা থেকে আসে আনন্দ। এই আনন্দের মধ্যে থাকে প্রকৃত নিবৃত্তি। এই হল সাংখ্যের নীতিবাদ।
পতঞ্জলির যোগশাস্ত্র সাংখ্যের পরিপূরক। পতঞ্জলি যোগের প্রয়োগের কথা পাই উপনিষদ, মহাভারত,জৈন ও বৌদ্ধ দর্শনে। এই যোগশাস্ত্র চার অধ্যায়ে বিভক্ত - সমাধি, সাধনা, বিভূতি ও কৈবল্য। মানুষ নির্দিষ্ট পথে মনোসংযোগ করে কীভাবে পূর্ণতা বা কৈবল্য পেতে পারে যোগ তারই ব্যাখ্যা করে। দৈহিক ও মানসিক শক্তিকে সংযত ও সংহত করে তাতে পূর্ণতা প্রাপ্তির কথা বলা হয়েছে। আর তিনি কাজের পাঁচটি উৎসের কথা বলেছেন। যথা - রাগ,হিংসা,আমিত্ব, অবিদ্যা ও অভিনিবেশ। অভিনিবেশ অর্থাৎ মৃত্যুভয় আসে বেঁচে থাকার প্রবৃত্তি থেকে। বস্তুজগতের সঙ্গে যোগ ঘটে অবিদ্যা থেকে বিদ্যা দিয়ে। আর রাগ, হিংসা, আমিত্ব - এই সব অবিদ্যার প্রবৃত্তি,যা পার্থিব সুখভোগে উৎসাহিত করে। তাই সকল দুঃখের কারণ হয়ে ওঠে। তা থেকে মুক্তির পথ হলো যোগ। যোগ আনে ত্যাগের নিষ্কাম নিবৃত্তি। তা থেকে আসে আনন্দ। এই ত্যাগ ও নিষ্কাম কর্মই হল ভারতের বাণী। আর এই যোগসূত্রের প্রয়োগ করার আটটি উপায় আছে। যথা - যম,নিয়ম,আসন, প্রাণায়াম, প্রত্যাহার, ধারণা, ধ্যান ও  সমাধি। এই আটটি বিধি দিয়ে আমরা আমাদের ভেতরকার অবচেতন মন (sub- conscious mind) ও ক্লেশ ধ্বংস করতে পারি।
এবার আসি গৌতমের ন্যায়সূত্রের কথায়। ন্যায় দর্শন বলেছে ঈশ্বর পরম পুরুষ। তিনিই সৃষ্টির প্রধান হোতা। আর এই সৃষ্টি ও স্রষ্টার ভেতরকার রহস্য অনুধাবন করতে পারলে আত্মার মুক্তি ঘটে। প্রথম গ্রন্থ গৌতমের 'ন্যায়সূত্র'। তারপরে একে একে যেমন বাৎসায়ণের 'ন্যায়ভাষ্য',উদ্যোতকারের 'ন্যায়বর্তিকা', বাচস্পতিরও 'ন্যায়বর্তিকা',... আর নবদ্বীপে বাসুদেব সার্বভৌমের 'তত্ত্বচিন্তামণি'।
বৈশেষিক প্রণেতা কণাদের 'বৈশেষিক সূত্র'। ন্যায়ের বিস্তারিত আলোচনাই হলো বৈশেষিক। ন্যায় ও বৈশেষিক দর্শনকে বলা হয় অসৎকার্যবাদ। ন্যায় ও বৈশেষিক দর্শন উভয়েই বেদের অনুমোদিত কার্য সম্পন্ন করাই নীতি ধর্ম বলে প্রচার করেছে।
আর পূর্ব মীমাংসা বৈদিক বিধিনিষেধ ও ক্রিয়াকান্ডের ব্যাখ্যামূলক দর্শন। এই দর্শনের আদিগ্রন্থ জৈমিনীর 'পূর্ব-মীমাংসা সূত্র'। 
     ব্রাহ্মণ্য ধর্মের যখন যায় যায় অবস্থা,বুদ্ধদেব ব্রাহ্মণ্য ধর্মের অরাজকতার হাত থেকে মানুষকে রক্ষা করেছিলেন তাঁর 'ত্রিপিটক' ও 'ধম্মপদ'- এ যাগজ্ঞ,বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ালেন বলে। আর মানুষকে মুক্তির পথ দেখালেন। বুদ্ধদেব না এলে ব্রাহ্মণ্য ধর্ম যে অরাজকতার মধ্যে যাচ্ছিল তার হাত হতে রক্ষা পাওয়া খুব মুসকিল ছিল। বুদ্ধের জন্যই ব্রাহ্মণদের খুব দুর্দিন ঘনিয়ে এলো। ভবিষ্যত নিয়ে তাঁরা বড়ই শঙ্কিত হলেন। যখন এই ত্রিপিটক ও ধম্মপদকে সামাল দিতে 'শ্রীমদ্ভাগবৎ গীতা' ও 'উপনিষদ'  জ্যোতির্ময় পুরুষের কথা তুলে ধরা হলো তখন বুদ্ধ চুপ করে রইলেন। বর্ণাশ্রম ধর্মের একটা আধ্যাত্মিক ভিত্তি রচিত হয়েছিল বলে। এই ব্রাহ্মণ্য ধর্ম সলিল সমাধি থেকে উদ্ধার পেল। এছাড়া কুমারিল ভট্টও তাঁর বৈশেষিক গ্রন্থ 'শ্লোকবর্তিকা' 'তন্ত্রবর্তিকা'... গ্রন্থ দিয়েও ব্রাহ্মণ্য ধর্মকে বাঁচিয়েছিলেন। স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ গীতায় ভক্তিযোগের মোক্ষম প্রয়োগের কথা বলেছিলেন বলে বুদ্ধ চুপ করে ছিলেন। গীতার এই ভক্তিযোগই আনল দেবালয় বানিয়ে বিগ্রহ পূজো করা। এই বিগ্রহ পূজো অবশ্য বৌদ্ধদের কাছ থেকে নেওয়া। বুদ্ধের মূর্তি গড়ে পূজা প্রচলন বৌদ্ধরাই প্রথম শুরু করেছিলেন। অবশ্য এই মূর্তি পূজোর বুদ্ধিটা ভারতীয় নয়,গ্রীক পৌত্তলিকতা থেকে নেওয়া। এই মূর্তি পূজোর প্রচলন হয় গুহা মন্দির ও খাড়া মন্দির বানিয়ে। মন্দির প্রতিষ্ঠার সাথে যাগযজ্ঞের রীতি রেওয়াজ অনেকটাই থিতিয়ে গেল। উত্তরে গুহা মন্দির,আর দক্ষিণে খাড়া মন্দির ( যা স্থপত্য ভাস্কর্যের নিদর্শন)। মন্দির প্রতিষ্ঠার সাথে সাথে বৈদিক যুগের অবসান ঘটল। এলো পৌরাণিক যুগ। সে খ্রীষ্টপূর্ব ২০০ শতকের পর। এই সময় আবার রচিত হয়েছিল মনুর 'মনুসংহিতা' বা মানবধর্মশাস্ত্র। তার আগে তাহলে বেদান্ত যুগের ভূমিকা কী ছিল তা জানা দরকার। 
সবচেয়ে জনপ্রিয় হল বেদান্ত দর্শন বা ব্রহ্ম মীমাংসা। বেদান্তের শিক্ষাই সমাজ ও পরিবাকে সঠিক পথ দেখিয়েছিল। বেদান্ত সূত্রের চারটি অধ্যায়। প্রথম অধ্যায়ে ব্রহ্মকে পরম সত্য বলে জানা। দ্বিতীয় অধ্যায়ে বিরুদ্ধ মতের খন্ডন। তৃতীয় অধ্যায় ব্রহ্ম বিদ্যালাভের উপায়। আর চতুর্থ অধ্যায়ে ব্রহ্ম বিদ্যা লাভের ফলাফল লেখা আছে। এই বেদান্ত সূত্র উপনিষদের তত্ত্বানুসারী।
ব্রহ্ম এক। এই মায়াময় ব্রহ্মাণ্ডে তিনি বিভিন্ন রূপে প্রকট হন। জগৎ ততক্ষনই সত্য যতক্ষণ না আমরা ব্রহ্মকে উপলব্ধি করতে পারছি।
পরবর্তীকালে এই বেদান্ত দর্শনের বিভিন্ন ব্যাখ্যা দেখতে পাই। যেমন - ভাস্করের ভেদাভেদবাদ,রামানুজের বিশিষ্টাদ্বৈতবাদ.... গৌড়ীয় বৈষ্ণবগণের অচিন্ত্যভেদাভেদবাদ।
  শঙ্করাচার্য অদ্বৈত বেদান্তের অবিদ্যাকেই কর্মের উৎস বলেছেন। কর্ম কামপ্রসূত। অর্থাৎ কামনা থেকে যা সৃষ্ট। এই কামনা অবিদ্যাপ্রসূত। এই অবিদ্যা হল জাগতিক জড় ও জৈবের মধ্যে একাত্মবোধ। তাই কামনা বা এষণা থেকে কর্মে প্রবৃত্তি জাগে। এই এষণা ত্রিবিধ - পুত্রৈষণা (sex), বিত্তৈষণা( material gain),লোকৈষণা (will to pleasure) - এই এষণা অবিদ্যাপ্রসূত। বৌদ্ধধর্মে এই এষণাকে 'তহ্না'(তৃষ্ণা) বলা হয়েছে। যা সকল দুঃখের কারণ। 
সৎকার্য দ্বারা গুণ ও ধর্ম লাভ করা যায়। আর অসৎ কর্মের দ্বারা পাপ ও অধর্ম অর্জিত হয়। এই গুণ ও ধর্মই হলো সুখ দাতা। আর পাপ ও অধর্ম দুঃখ দাতা। অর্থাৎ গুণার্জন ব্যতীত সুখ লাভ হয় না,দোষ ব্যতীত দুঃখ লাভ হয় না।
তাই জীবনের কাম্য চারটি বিষয় - ধর্ম,অর্থ,কাম, মোক্ষ। অর্থ জাগতিক আকাঙ্ক্ষা পূরণ করে। কাম মানসিক আকাঙ্ক্ষা পূরণ করে। ধর্ম মানবিক ও সামাজিক আকাঙ্খা,আর মোক্ষ আনে আত্মিক আনন্দ। মোক্ষই জীবনের পরম পাওয়া, তাই দেয় পরমানন্দ। বাকি তিনটি জাগতিক গুণাগুণের অধীন। বুদ্ধ এই পরমানন্দের কথা বলেছেন। আত্মা পরমানন্দের পথে মুক্তি পায়। বার বার আর জন্ম নিতে হয় না। তাই হল মানব জীবনের শ্রেষ্ঠ কাম্য। জাগতিক ধর্মাধর্মের উর্ধ্বে উঠে মানবাত্মাকে পরম ব্রহ্মের সঙ্গে লীন হয়ে অভেদাত্মা লাভ করতে হবে। তাই মানব জীবনের পরম পাওয়া ও তাই হল পরমানন্দ। বৌদ্ধধর্মের এই হল মূল কথা।
এইভাবে আধ্যাত্মিক জীবন থেকে মূল্যবোধ লাভই হল ভারতীয় দর্শনের মূল কথা। বৈদিক সভ্যতাই এই মূল্যবোধের পথ দেখিয়েছে। বৈদিক ব্রাহ্মণ তথা হিন্দু তার পরিচালক। ক্রম বিবর্তনের ধারায় আরো অনেক ধর্ম এসে ভারতীয় দর্শনে মিলিত হয়েছিল। যা পাশ্চাত্যে পর্যন্ত এই মূল্যবোধের প্রভাব পড়েছিল এবং পাশ্চাত্য ঋণ স্বীকার করতেও ভুল করেনি। তাই প্রাচীন ধর্মগুলির( খ্রিস্টান,পারসিক,ইসলাম ...) সমসাময়িক হয়েও নিজস্ব ধর্মগ্রন্থ না থাকা সত্ত্বেও বিশ্বব্যাপী কি বিপুল প্রভাব বিস্তার করেছিল হিন্দুধর্ম তার নীতি শাস্ত্রগ্রন্থগুলির দ্বারা! হিন্দু ধর্মের এই নীতিশাস্ত্র একজায়গায় থেমে থাকেনি। সময়ে সময়ে রচিত বলে বহুত্ববাদ তার ভিত্তি। আর এই ভিত্তিই তাকে দেখিয়েছে বিবর্তনের পথ। তাই সময়ের সাথে সাথে নিজেকে বদলে নিতে পারার সহিষ্ণুতা তা থেকেই এসেছিল। নিছক কোনো মতে নিজেকে আটকে রাখেনি বলেই বিবর্তন প্রক্রিয়া তার ভেতরে প্রধান শক্তি জুগিয়েছে। সৌন্দর্য দান করেছে। 
কি সেই বিবর্তনের প্রক্রিয়া ছিল,যার জন্য পাশ্চাত্য অনেক কিছু শিখেছিল! এই বিবর্তনের পরিচয় নিয়ে আলোচনা পরের পর্বে। সেই সঙ্গে বৈদিক যুগে নারীর অবস্থান কেমন ছিল তা নিয়েও আলোচনা হবে।
                      ( চলবে )
@ copyright reserved for Mridul Kumar Das.

নতুন মা।

নতুন মা।

পারমিতা মন্ডল।

কোন দিন ইচ্ছা ছিল না ভালো  বেসে বিয়ে করার দিশার ।তবুও কোথা থেকে যেন ভালো বাসা হয়ে গেল । তাও একজন এমন মানুষের সাথে । তাদের এই ভালো বাসা কখনো সফল হবে সেটা ভাবেইনি  দিশা ।অনেকটা তারই জেদে বিয়েটা  শেষ পর্যন্ত হয় ।যে পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে অনেক মেয়ে শেষ পর্যন্ত পিছিয়ে আসে, সেখানে  দিশা ঘুরে দাঁড়িয়ে লড়াই করেছে ।কোন ভাবেই ভালো বাসার মানুষকে হারিয়ে যেতে দেয়নি। ভালো বাসার মা্নুষের পাশে তো এভাবেই দাঁড়ানো উচিৎ ।


অনিকের সাথে পরিচয় হয়েছিল একটা গানের অনুষ্ঠানের মাধ্যমে।  ব‍্যারাকপুরের সুকান্ত সদনে একটা বাউল গানের আয়োজন করা হয়েছিল। সেখানে নামীদামী শিল্পীদের সাথে দিশাও একটা গান করার সুযোগ পায় ।কিন্তু তখনো শিল্পীরা এসে না পৌঁছনোয় কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে অনীক এসে দিশাকে আরো দুটো গান করার অনুরোধ করে । অবশ্য দিশাও খুব ভালো গান করে ।ছোট খাট অনেক  অনুষ্ঠান  সে এর আগেও করেছে ।এই ভাবে অনীকের সাথে আলাপ হয়েছিল দিশার ।


অনীক ব‍্যাংকে চাকরি করে ।সারা দিন প্রচন্ড ব‍্যাস্ত ।তার জীবনে একটা বড় ঘটনা ঘটে গিয়েছিল ।সেই থেকে সে ডিপ্রেশনে চলে গিয়েছিল ।তখন ওর বন্ধুরা ওকে গানের দলের সাথে যুক্ত করে দেয় । গান মানুষের মন ভাল করে দেয় । তাছাড়া এদিকে ব‍্যাস্ত থাকায় তার অতীতের স্মৃতি ভুলতে অনেক সহজ হয়। আজ অনীক অনেকটা স্বাভাবিক । স্মৃতিকে আঁকড়ে ধরে মানুষ তো আর বাঁচতে পারে না ।


এদিকে অনুষ্ঠানের সূত্র ধরে অনীকের সাথে মাঝে মাঝেই দেখা হতে লাগে দিশার ।ফোনেও কথা  হয় ।এই ভাবে ভালো লাগা থেকে আস্তে আস্তে ভালো বাসায় পরিনত  হয়। দিশা অনীককে ভালো বেসে ফেলে । কিন্তু অনীক যেন কেমন। বুঝেও  বুঝতে চায় না ।তাহলে অনীক কি অন্য কাউকে ভালো বাসে ? বুঝতে পারে না দিশা ।না , অনীকের সাথে কথা বলতে, হবে, মনে মনে ভাবে দিশা ।


ওদিকে অনীকের ও ভালো লাগে দিশাকে । কিন্তু সে কিভাবে ভালো বাসবে ? তাছাড়া তার সব কথা শুনলে দিশা কি ওকে ভালো বাসবে ? কখনোই না ।কোন মেয়েই ইচ্ছা করে এমন একটা জীবন বেছে নিতে চায় না ।আর অনীক ও চায় না দিশা তার জীবনের সাথে জড়িয়ে পড়ুক । তাই আজ দুদিন ধরে দিশার  ফোনও ধরে না অনীক।


কিন্তু  এদিকে দিশাকে তো অনীকের সাথে কথা বলতেই হবে । সামনে একটা বড় প্রোগ্রাম আছে।সেটা নিয়ে ও আলোচনা করতে হবে অনীকের সাথে । তাছাড়া অনীক কেন এমন করছে ,।সেটা ওকে জানতেই হবে । তাই  আগুপিছু না ভেবে অনীকের বাড়ির ঠিকানা যোগাড় করে আজ  রবিবার দিশা চলে এলো অনীকের সাথে দেখা করতে ওদের বাড়িতে।


বাড়ি খুঁজে পেতে খুব একটা অসুবিধা হলো না।একজন দেখিয়ে দিল অনীকের বাড়িটা ।বেল টিপতেই একজন বয়স্ক মহিলা এসে দরজা খুলে দিল। দিশা নিজের পরিচয় দিয়ে অনীককে একটু ডেকে দিতে বলল। তখনই একটি বাচ্চা মেয়ে ছুটে এলো ।"ঠাম্মা ঠাম্মা কে এসেছে গো ?"--বলে একেবারে দিশার সামনে চলে এলো।কি সুন্দর দেখতে মেয়েটা ।একেবারে চোখ জুড়িয়ে যায় । ওর ঠাকুমা বললো" যা বাবাকে ডেকে নিয়ে আয় , বল একজন আন্টি এসেছে।"  চমকে যায় দিশা । বাবাকে মানে ? ওকি অনীকের  মেয়ে ? মনে মনে ভাবে। এমন সময় ওর ঠাকুমা বললেন  --"মেয়েটা বড়ই দস‍্যি।আমি সামলাতে পারিনা।

"

ওর পোড়া কপাল ।কি আর বলবো বলো ? ওকে জন্ম দিতে দিয়ে গিয়েই তো ওর মা মারা গেল । খোকাকে কতবার আবার বিয়ের কথা বললাম। কিন্তু ও রাজিই  হলো না ।এখন এই মেয়ে নিয়ে হয়েছে আমার সমস্যা। আমি কি পারি বলো? আমার তো বয়স হয়েছে।"!


চোখ ঝাপসা হয়ে গেল দিশার ।  সে তো মনে মনে অনীককে ভালো বেসে ফেলেছে। কিন্তু অনীক হয়তো এই জন্য তাকে এড়িয়ে চলতো । এখন সে কি করবে ? "আন্টি আন্টি এই দেখো বাবাকে ধরে এনেছি। " তিন্নির ডাকে পিছন ফিরে তাকায় দিয়া । অনীকের হাত ধরে টেনে আনছে তিন্নি । দিশাকে দেখে চমকে যায় অনীক ।মুখটা যেন ফ‍্যাকাসে হয়ে যায় ।দিশা পরিবেশটাকে হালকা করার জন্য হেসে বলে" ঠিক করেছো তিন্নি ধরে এনে ।" দিশা বলল আসলে ফোনে না পেয়ে বাড়িতে চলে এসেছি ।ঐ প্রোগ্রামটা নিয়ে কথা বলার ছিল । সেদিন তিন্নি  দিশাকে পেয়ে খুব খুশি হয়েছিল। যাওয়ার সময় অনেক বার দিশাকে আবার আসতে বলল। কেমন যেন মায়া পড়ে গেল মেয়েটার উপর।


দিশা চলে এলো বাড়িতে । এখন সে কি করবে কিছুই বুঝতে পারছে না । সে তো অনীককে ভালো বেসে ফেলেছে ।অনীকের সাথে দেখা করতে হবে। সেদিন প্রোগ্রামের শেষে অনীকের সাথে কথা হয় দিশার।  অনীক বলে সে অনেক বার দিশাকে বলতে চেয়েছে ,যে সে বিবাহিত। তার মেয়ে আছে । কিন্তু সে সুযোগ অনীক পায়নি । তাই দিশা যা শাস্তি দেবে তাইই মাথা পেতে নেবে অনীক । দিশা


অনীক কে বড় শাস্তি দিতে চায় । সে বিয়ে করতে চায় অনীককে । কিন্তু দিশার বাড়ির লোকজন, তার বাবা মা । তারা কি মেনে নেবে , একজন দো'জ বরের সাথে বিয়ে দিতে ? যার আবার একটি মেয়েও আছে ।অনেক বোঝায়

অনীক । কিন্তু দিশা কিছুই শোনেনা ।


অনেক কষ্টে সবাই কে রাজি করায় দিশা ।অনীক ও পুরনো স্মৃতি বুকে চেপে রেখে নতুন ভাবে জীবন শুরু করে , দিশা আর তিন্নিকে নিয়ে ।আসুন আমরা সবাই মিলে প্রার্থনা করি প্রতিটি ভালো বাসার বিয়ে যেন এভাবেই সফল ,হয়। ভালো থাকুক ওরা------*।


সমাপ্ত।


প্রিয়তমা তোমাকে (পিয়ালী চক্রবর্তী)



আজ বহুদিন পরে আবীর বাড়ির বাইরে পা রেখেছে । নিজ পছন্দের গাড়িটি ড্রাইভ করতে করতে শুনছে জীবনানন্দ দাশের "দু'জন" কবিতাটি, “আমাকে খোঁজো না তুমি বহুদিন....কতদিন আমিও তোমাকে খুঁজি নাকো । এক নক্ষত্রের নিচে তবু,

একই আলো পৃথিবীর পারে,

আমরা দুজনে আছি,

পৃথিবীর পুরনো পথের রেখা হয়ে যায় ক্ষয়, প্রেম ধীরে মুছে যায়, নক্ষত্রকেও একদিন মরে যেতে হয়… ”

 । আর হারিয়ে যাচ্ছে বিগত সুখের দিনগুলোয়, যখন তার জীবনে ছিল রাইমা । 


কলেজের নবীনবরণ অনুষ্ঠান । হৈ - চৈ কাণ্ড যাকে বলে । প্রথম বছর ফিজিক্স অনার্সের ছাত্রী রাইমা চ্যাটার্জী । মোহময়ী সাজে বন্ধুদের সাথে হাসির ঢেউ তুলে প্রবেশ করলো কলেজ অডিটোরিয়ামে । বেশ কিছু ছেলের আত্মা খাবি খেতে শুরু করেছে ইতিমধ্যেই । একেই ওই ফেটে পড়া রূপ, তার ওপরে মুক্তোর মতো দাঁতের সুন্দর হাসি । ছেলেদেরকে খুব একটা দোষ দেওয়া যায় না । 


অনুষ্ঠান শুরু হলো । হাতে মাইক নিয়ে তৃতীয় বর্ষ মাথাম্যাটিক্স অনার্সের আবীর সঞ্চালকের ভূমিকায় । ব্লু - জিন্সের সাথে দুধসাদা পাঞ্জাবী আর চোখে রিমলেস চশমায়, ছ ফুটের স্বাস্থ্যবান আবীরকে দেখে "হায়!! হায়!!" রব তুলবেনা এমন মেয়ে বিরল । 


জীবনানন্দের "বনলতা সেন" কবিতার একটি ছত্র পাঠের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শুরু করলো আবীর, "চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা,

মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য; অতিদূর সমুদ্রের ’পর,

হাল ভেঙে যে-নাবিক, হারায়েছে দিশা,

সবুজ ঘাসের দেশ যখন সে, চোখে দেখে দারুচিনি-দ্বীপের ভিতর,

তেমনি দেখেছি তারে, অন্ধকারে; বলেছে সে, ‘এতদিন কোথায় ছিলেন?’

পাখির নীড়ের মতো চোখ, তুলে নাটোরের বনলতা সেন ।


স্টেজের সামনের দিকে বসা রাইমা তো পুরো কুপোকাত । যাকে বলে, "লাভ অ্যাট ফার্স্ট সাইট" । আবীরের চোখের অতলে মনের হদিস পাবার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠলো রাইমার মন । যতক্ষণ অনুষ্ঠান চললো, সঞ্চালকের দিক থেকে নজর তুলতে পারলোনা রাই । 


অনুষ্ঠানের শেষে স্টেজ থেকে নেমে আবীর ওর সামনে দিয়ে চলে গেলো । বাকি সব ছেলেরা যেমন চোখ দিয়ে ওকে গিলে খায়, আবীরের মধ্যে সেরকম কোনো প্রবণতাই নেই । বরং দেখে মনে হলো বেশ নাক উঁচু আছে । এ ছেলেকে বশে আনতে বেগ পেতে হবে । মনে মনে রাইমা ঠিক করলো, প্রথমেই ওর মোবাইল নম্বরটা জানতে হবে । 


ওরই এক বান্ধবী ম্যাথস ডিপার্টমেন্টে প্রথম বর্ষের ছাত্রী । রাই ওকেই দায়ভার চাপিয়ে দিলো আবীরের নম্বর জোগাড় করার । সেদিনই টিফিন ব্রেকে ওর বান্ধবী এসে  ক্যান্টিনে ওর সাথে দেখা করে আবীরের নম্বর দিয়ে গেলো । রাই যেনো হাতে আকাশের চাঁদ পেলো । 


তড়িঘড়ি মোবাইল নম্বরটা সেভ করে নিল ফোনে । WhatsApp এ পিং করলো, "হাই!" কিছুক্ষণের মধ্যে রিপ্লাই এলো, "হ্যালো, হু ইজ ইট?"

রাই : আপনার একজন গুণমুগ্ধ ভক্ত ।

আবীর : ওহ্হঃ, রিয়েলি!!

রাই : ইয়াপ । ক্যান উই মিট । আই এম এট ইয়োর কলেজ ক্যান্টিন ।

আবীর : ওয়েট করুন, আসছি ।


মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই ক্যান্টিনে ঢুকে ওই নম্বরটায় মেসেজ করতে যাবে, এমন সময় পেছন থেকে ওর পেশীবহুল কাঁধে কোমল হাতের স্পর্শ অনুভূত হলো । ঘুরে দাঁড়িয়ে রাইকে দেখে ওর রূপের ঝলকে আবীর পুরো ফ্ল্যাট । 

আবীর : আপনি, মানে তুমি করেছিলে মেসেজ? 

রাই : হুম । হ্যালো, আমি রাইমা চ্যাটার্জী । 

আবীর : আমি আবীর ভট্টাচার্য । চলো, বসে কথা বলি । 


এভাবে আলাপ হবার পরে রোজ কথা বলতে বলতে দিনের পর দিন যেন কোন ফাঁকে পার হয়ে যায় । দুজনেই পছন্দ করে দুজনকে । কেউই বলতে পারেনা একে অপরকে নিজেদের মনের কথা ।


কালক্রমে চলে এলো স্বরস্বতী  পুজো, অর্থাৎ, বাঙালির প্রেম দিবস । আবীর মনে মনে ঠিক করেছে , আজকে রাই কে ওর মনের কথা বলতেই হবে । ওদিকে রাইও আবীরকে মনের কথা বলতে ব্যাকুল । ওদের প্ল্যান মতো অঞ্জলি দিয়ে প্রসাদ খেয়ে ওরা যাবে একটা সিনেমা দেখতে । 


দূর থেকে হলুদ শাড়ি, খোলাচুল, আর প্রসাধনীর বাহুল্যে রাইমাকে আসতে দেখে আবীরের মনে যেন তুফান উঠলো । আজকে বলতেই হবে ওকে যা বলার ।


রাইমা দূর থেকে নীল পাঞ্জাবী আর সাদা চোস্ত পরিহিত আবীরকে দেখে নিজেকে আর যেন সামলাতে পারছিল না । আজকেই ওকে নিজের করে নিতে হবে । আর যেন অপেক্ষা সইছেনা এই প্রাণে । 


দুজন দুজনার কাছে এলো । একসাথে অঞ্জলি দিয়ে প্রসাদ খেয়ে আবীরের গাড়িতে উঠলো দুজন । আবীর আড় চোখে তাকাতে তাকাতে চললো পুরো রাস্তাটা । সিনেমা হলে পৌঁছে সোজা ঢুকে গেলো হলের ভেতরে । টিকিট আগে থেকেই কেটে রেখেছিল আবীর । 


হল অন্ধকার হতেই দুজনের বুকে ধুকপুকানি শুরু হয়ে গেল । এই প্রথম অন্ধকারে পাশাপাশি ওরা দুজন । সিটের হাতলে রাখা রাইমার হাত । আবীর আর যেনো লোভ সামলাতে পারলোনা । রাইমার কোমল হাতটা ধরে নিলো ওর জিম করা শক্ত তালুর মধ্যে । রাইমা গলতে শুরু করেছে আগেই । এখন আর নিজেকে সামলাতে না পেরে মাথাটা ঠেকিয়ে দিলো আবীরের কাঁধে । 


দুজনের শ্বাস প্রশ্বাসই ঘন হয়ে এলো । আবীর ডান হাত দিয়ে রাইমাকে টেনে মিশিয়ে নিলো ওর বুকের সাথে । শক্ত পুরুষালি বুকে রাইমার নরম শরীর যেন পিষে গেল । পরম সুখাবেশে রাইমার চোখ দুটো বন্ধ হয়ে এলো । আবীর ওর ঠোঁটের কাছে নিজের ঠোঁট এনে বললো, "ভালোবাসি" । রাইমা আবীরের মাথাটা ধরে টেনে এনে ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়ে দিয়ে বললো, "আমিও, খুব বেশি ।"


শুরু হলো ওদের প্রেমকাহিনী । চোখধাঁধানো এই জুটিকে দেখে কলেজের অনেকেই ঈর্ষান্বিত । আবীরের বেস্ট ফ্রেন্ড কুণালের বার্থ ডে পার্টি সেদিন । গার্লফ্রেন্ড হিসেবে রাইমারও নিমন্ত্রণ । পার্টি হবে পার্ক স্ট্রিটের এক নামকরা নাইট ক্লাবে । বন্ধুদের সাথে সাথে প্রত্যেকের পার্টনারদেকেও ইনভাইট করেছে কুনাল । আবীরের বারণ করা স্বত্তেও রাইমা বেশ কিছু ছেলের সাথে ডিস্কোথেকে কোমর দোলাচ্ছিলো মিউজিকের তালে তালে । আবীর দেখছিল, আর ওর গা জ্বালা করছিল । অজানা অচেনা ছেলেদের সাথে অত নাচের কি আছে কে জানে । মনে মনে ভাবতে লাগলো, আজকে আচ্ছা করে ঝাড় দেবে ও রাইমাকে ।


খাওয়া দাওয়ার সাথে সাথে মদ্য পানও চলছিল সমান তালে । রাইমার ড্রিংক করা সহ্য হয়না । তবুও সেই ছেলেগুলোর পাল্লায় পড়ে দুটো ব্লাডি মেরি খেয়ে ও প্রায় অচেতন । আবীর পড়লো মহা মুশকিলে । ওকে বাড়ি পৌঁছে দিতে হবে । রাইমাকে একটা সোফায় বসিয়ে ও গেল পার্কিং লট থেকে গাড়িটা বের করতে । গাড়ি বের করে লাউঞ্জে ফিরে এসে দেখে, যে সোফায় রাইমা বসে ছিল সেটা ফাঁকা । ও ভাবলো হয়তো টয়লেটে গিয়ে থাকবে রাই । 


লেডিস টয়লেটের কাছে দাঁড়িয়ে রইলো বেশ কিছুক্ষণ । রাইএর পাত্তা নেই । আবীর এবারে ভয় পেয়ে গেল । প্রায় আধঘন্টা পার হয়ে গেছে ।  কুণালকে বলে পার্টি লাউঞ্জে গান বন্ধ করিয়ে মাইকে আনাউন্স করতে লাগলো রাই এর নাম । কোনো পাত্তা নেই । 


এমন সময় ওদের বন্ধুদের মধ্যে একজন চেঁচাতে চেঁচাতে ছুটে এলো স্টেজের সামনে । ভয়ে , টেনশনে কথা জড়িয়ে যাচ্ছে তার । জড়ানো গলায় যতটুকু বললো, "রাইমা, পেছনের দিকে বাগানে, পড়ে আছে ।" 


আবীরের পায়ের তলায় যেন মাটি সরে গেল । একদৌড়ে পেছনের দিকের বাগানটায় গিয়ে দেখে, সম্পূর্ণ বিবস্ত্র, রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছে ওর প্রাণের চেয়েও প্রিয়, ওর প্রিয়তমা রাই । শরীরটা যেন ছিঁড়ে কুটে খেয়েছে কামাতুর জানোয়ারের দল । গলায় কেউ যেন ধারালো কিছু দিয়ে আঘাত করেছে । সবার বুঝতে বাকি রইলো না রাইমাকে কেউ বা কারা ধর্ষণ করে খুন করে ফেলে রেখে পালিয়েছে । 


কিছুক্ষণের মধ্যে পুলিশ এসে রাইমার বডি হাসপাতালে ময়নাতদন্তের জন্যে পাঠিয়ে দিলো । আবীরকে জিজ্ঞাসাবাদ করে কিছু পাওয়া গেলো না, কারণ ও সেই যে চুপ করে গেছে , অঝোরে চোখ দিয়ে জল পড়ে চলেছে ওর, কোনদিকে নজরই নেই । 


নাইট ক্লাবের সিসিটিভি ভিডিও ফুটেজ দেখে অপরাধীদের শনাক্ত করতে বেগ পেতে হয়নি পুলিশদের । কিন্তু, আবীর আর ফিরতে পারেনি স্বাভাবিক জীবনে । পড়াশুনো ছেড়ে দিয়ে গত পাঁচ বছর গৃহবন্দী থাকার পরে আজ এত বছর পরে রাস্তায় বেরোলো ও । 


গাড়িতে তখন চলছে জীবনানন্দের আরেক অপূর্ব সৃষ্টি, “সুরঞ্জনা, ওইখানে যেয়ো নাকো তুমি,

বোলো নাকো কথা ওই যুবকের সাথে,

ফিরে এসো সুরঞ্জনা,

নক্ষত্রের রুপালি আগুন ভরা রাতে,

ফিরে এসো এই মাঠে, ঢেউয়ে,

ফিরে এসো হৃদয়ে আমার,

দূর থেকে দূরে.....আরও দূরে.....

যুবকের সাথে তুমি যেয়ো নাকো আর। ”


চোখের জলে রাস্তা ঝাপসা হয়ে এলো । কিন্তু, পথ তো চলতেই হবে, অপেক্ষা তো করতেই হবে ওকে ওর রাইমার জন্য । ও যে বলে রেখেছিল রাইমার প্রাণহীন দেহের কানে কানে, “শেষবার তার সাথে যখন হয়েছে দেখা মাঠের উপরে

বলিলাম, ‘একদিন এমন সময়

আবার আসিয়ো তুমি, আসিবার ইচ্ছা যদি হয়!–

পঁচিশ বছর পরে!”

Copyright © All Rights Reserved

Piyali Chakravorty

ক্লান্ত পথিক

    ক্লান্ত পথিক
                 চন্দনা লাহা



আমি তো সেদিন ক্লান্ত পথিক

আমার চেনা রাস্তার মাঝে।

আমি তো সেদিন জড় স্তুপ, ভাঙ্গা বালতি

ঘরে ফিরছি পূর্ণিমার সাঁঝে।।

আমি তো সেদিন ভেঙ্গে যাওয়া ঘর,

রাস্তায় মচকে যাওয়া ডাল।

আমি তো সেদিন লুটিয়ে পড়া পাতা,

আমি নিস্তেজ বিকাল।।

আমি তো সেদিন হরিণ মাংস

আমিতো পাঁঠার বলি।

আমিতো সেদিন লোভের স্বীকার

তাই আমি ক্লান্তির পথ চলি।।

আমি তো সেদিন একা নির্জন

চেনা রাস্তার মাঝে।

কত চেনা মানুষ অচেনা হলো

দেখা দিল অসভ্য ইতর সাজে।।

খড়ের চালায় টপছে জল

 বিষয় # প্রবন্ধ  

❣❣❣❣❣❣❣❣❣❣❣❣❣❣❣❣❣❣❣❣❣❣❣




গ্রাম মানেই অপূর্ব সবুজ

গ্রাম মানেই দৃষ্টি মধুর

গ্রাম মানে কুঁড়ে চালা ঘর, 

পুকুর ভরা শাপলা ফুলে

শরতের হাঁক ডাক। 


খড়ের চালায় টপছে জল

পুকুর ভরা সোনা টলমল, 

ঘোমটা দেয়া কলসী যায়

সাঁঝ বেলা শাঁখের ফুক

ওরে আমার বাউরী মেয়ে

মনে কেন এত দুখ? 


ঠিক তাই গ্রাম শুধু সৌন্দর্যের স্বপ্ন ঘেরা জাদু বাক্স নয়। আছে ছোট  দুখের গল্প ভরা। আছে ঘৃনা বিতৃষ্ণা রাজনীতি চেঁচামেচি হতাশা। আছে ভালবাসার বৈধ অবৈধ গল্পে ভরা যাপন গাথা। আছে বেঁচে থাকার নিরলস প্রচেষ্টা। আছে আবেগ আছে জয় আছে চিতা। 

আমার গ্রাম বাংলা এমন একটা জীবন্ত চালচিত্র। ঘটে চলা ঘটনার নিরবিচ্ছিন্ন মালা। প্রতি নিয়ত তার স্বতঃস্ফুর্ত বিকাশ। এক সময় শিক্ষিতের সংখ্যা খুব কম ছিল। শুনেছি ম্যাট্রিক পাশ একজনকে আশে পাশের অনেক গ্রাম থেকে প্রচুর মানুষ দেখতে এসে ছিল।  সেই গ্রাম এখন ঘরে ঘরে স্কুল কলেজে যাওয়া গ্রামবাসী অনেক নতুন নতুন দিশার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। গ্রাম তখন কিছু মানুষের হাতে চলত কিছু মানুষ তার রূপায়নে বুদ্ধি এবং পয়সা ঢালত।তখনকার পরিবেশে পারিবারিক বোধ সম্বন্ধে স্বাধীনতা ছিল  আবেগ ছিল। হয়ত জন সংখ্যা কমের কারনে একটা সুন্দর আঙ্গীক দিতে পেরেছিল। দূর্গা পুজার শৈল্পিক উৎসব পরিচালনা তার প্রমাণ। এখনও দূর্গা আসেন হৈ চৈ প্রানের আবেগ সব আছে। তবে সেই  মৌলিক শিল্পবোধে কোথাও যেন ঘাটতি চোখে পড়ে, সহুরে রুচিবোধের অনুকরণ যেন। আমার কাছে বেসুরা লাগে। মনে হয় এখনকার গ্রামীন জীবনে সহুরে  ছায়া। সাঁওতাল মেয়ে খোঁপায় কাঠের চিরুনির বদলে প্লাস্টিকের চিরুনি দেয়। কেমন যেন একটা বেখাপ্পা ভাব। গ্রামের সেই সতেজতা চলে গিয়ে রাজনৈতিক থাবা। আবেগের বদলে মেকি হৃদ্যতা যায়গা করেছে। 


গ্রামের ক্লাব ঘরে লাইব্রেরি হবে। ঠিক করা হল সর্বক্ষণ থাকবে গোবেচারা গৌর , লাইবেরিয়ান বলা হবে। সেই সামান্য লাইব্রেরি, বুর্জোয়া দখলদারি হিসেবে চিহ্নিত করে ভাগ হয়ে গেল দুই দল। উঠতি গ্রামীণ মানুষ আর পুরানো গ্রাম কল্যাণ শাখা।আগের বছর যারা দশমীতে একে অন্যের বাড়ি গিয়ে মিষ্টি প্রনাম বিনিময় করেছে। তারাই হয়ে উঠল একে অন্যের শ্রেণী শত্রু। সেই প্রথম রাজনীতি আঁচড় দিল গ্রামটায়। এখন শ্রেণী নেই কেবল শত্রুই শত্রু " তোরা আমরা" । সুবিধার্থে আমার তোমার। না পোশালে  কে কার? ঘর যা। রবীন্দ্রসঙ্গীত এখন হাজুর নতুন তোলা কোঠা বাড়ি, যার চাল টিনের ওখানে বাজে। ক্লাস তৈরির আপ্রাণ চেষ্টা। খোলা সমাজ একে একে অনুসরনের থেকে অনুকরনের দিকে নজর দেয় বেশি। তোমার আছে আমার নেই থেকে এই মনোভাবের প্রাদুর্ভাব ঘটে। আমাদের চাষ করা চাচার কিছুই ছিল না। "বাবু" বলত কিন্তু তার নিজস্ব একটা আত্মসম্মান ছিল। এবং  নানা সম্বোধনে সবাই তা রক্ষা করে চলা হত। চাচা কখনও অন্ধ অনুকরনে নিজেকে হাস্যকর করেননি। অনেকে প্রশ্ন করবেন তবে কি নীচু হয়ে হত দরিদ্র হয়ে কাটিয়ে দেবে, পরিবর্তন আসবে না! ঠিকই তো যুগের সাথেই তাল মিলিয়ে চলাই তো জীবন। 


এখনকার গ্রাম কাদায় হাঁটি না। সিমেন্টের পথ এগিয়ে গেছে অনেক ভেতর। বাল শিক্ষা ব্যবস্থা চলছে। ছেলে মেয়েদের হাতে মোবাইল। ঘরে টিভি। প্রত্যেকে বাংলা নয় ইংরেজিতেও সাক্ষর করে দিতে পারে। হিন্দিগানে গুনগুনায়। সাত পুরুষের নাম ভুলে যায় শ্রাদ্ধে মন্ত্র পড়ে ' এঃ বচ'। সামান্য একটু পয়সা হলেই বিশাল বিবাহ অনুষ্ঠিত হয়। জীবন এখন দেখাদেখির ওপর বিরাজমান। তবু যা আজও অক্ষুন্ন গ্রামের হাওয়া। কার ঘরে কি হল ভেসে বেড়ায়। জীবন চরৈবতি । কত ঘটনা মুড়ে তৈরি হচ্ছে মর্ডান গ্রাম। আমার গ্রাম তোমার গ্রাম। 


তবু ভালবাসা আছে। তবু প্রেম করে ময়না, পথের ধারে সাইকেলের হান্ডেলে হাত দিয়ে। ছোট নদী পলি পড়ে বর্ষায় টোইটুম্বুর হয়ে বান ডাকে। খাল ভরে গেছে প্লাস্টিকে, চাষের জন্য জল কি করে আসবে ভাববে পঞ্চায়েত। ভোট দি ভাই.... গ্রাম নিয়ে ভাবুক ওরা। অবৈধ পোল করে খাল বন্ধ... দরকার বা কি! চাষাবাদই একে একে উঠে যাচ্ছে। জল নালী ঠিক থেকে লাভ কি? গ্রামের চড়ক বৈশাখের মেলার থেকে মহকুমায় হস্তশিল্প মেলার চাউমিন বেশি স্বাদের হয়। ওখানে ছুটি নতুনের খোঁজে। গ্রাম জীবন এখন ফুল স্পিড নিয়েছে সভ্যতার নেশা। ছুঁতে হবে মায়ামৃগকে। সম্পূর্ণভাবে ছুঁলে আমার গ্রাম হয়ত হারিয়ে যাবে। 


আমার গ্রামের আটচালায় মা দুগ্গা আসে

আমার গাঁয়ে শালুক বনে ফ্ল্যাট গজিয়ে ওঠে। 

রাশোন মিয়াঁর গোয়াল ফাঁকা 

বাঁঝা চাষ চলছে বারো মাস, 

কালো ধোঁয়ায় বুক ভরেছে.. 

বুকের ভেতর কেবল হাঁপোর টান।। 


ধন্যবাদ....... 


শর্মিষ্ঠা ভট্ট 🖋

রক্ষক

 


লক ডাউনের পর অফিস তবু কিছুটা সময়ের মার্সি করছিলো, কিন্তু ট্রেন চালু হতেই আবার পুরোনো নিয়মে।এমনিতে বেসরকারি অফিসে নয় দশ ঘন্টা কাজ নর্মাল প্র্যাকটিস তার ব্যতিক্রম মাসে দিন সাতেক তো হবেই হবে।সংসারের কারণে অপর্ণার কাজটা খুব জরুরী ছিলো।অপর্ণা এই অফিসে ডেপুটি আকাউন্টেন্ট,পদটা শুনতে ভারী লাগলেও অপর্ণা আসলে 23/24 বছরের পাতলা ছিপ ছিপে তরুণী,ভগবান রূপের কোনো খামতি দেননি,অনেকের হার্ট থ্রব হলেও নিজে কাউকে এখনো হৃদয়ে বসাতে পারেনি।ভাড়া বাড়ী পঙ্গু বাবা,মানসিক রোগগ্রস্ত ভাই তাঁদের মধ্যেই বাঁচার পথ খুঁজে নিতে পথে নেমেছে অপর্ণা।তার জীবনের স্বপ্নরা আজ তারার মত অমাবস্যার অন্ধকারে ঢাকা।

    ইয়ার এন্ডিং ব্যালেন্স সিট জমাদেবার সময় এসে গেছে সেই কাজ করতে করতে এখন রাত প্রায় এগারোটা।লাস্ট রানাঘাট লোকালের পিছনে প্রায় দৌড়ে দৌড়ে তাকে উঠতে হলো।জেনারেল কামড়া হলেও লোকজন খুব একটা বেশি নেই।পিছনের দিকের একটা জানালার দিক ফাঁকা দেখে অপর্ণা বসে পরে।হরিহর কাকাকে ফোন করে দেয় তারজন্য একটু অপেক্ষা করতে তাকে যেনো বাড়ি ছেড়ে দেয়।রাত বারোটা তো বাজবেই বাড়ি পৌঁছতে পৌঁছতে।তার সিটের অন্য প্রান্তে একজন বছর 40-42 এর লোক বসে,সে এক দৃষ্টে অপর্ণাকে জরিপ করে চলেছে।পোশাক আশাক দেখে মনে হচ্ছে কোনো কারখানার শ্রমিক, খুব সম্ভবত অবাঙালী।অপর্না সেদিক থেকে নিজের দৃষ্টি সরিয়ে নেয়।সামনের সিটের একটা লোক ঘুমে ঢুলছে, তিনটে বছর 25 র ছেলে নিজেদের গেমে মশগুল,অপর্ণার উপস্থিতি সেটাও টের পায়নি।এতো রাতের ট্রেনে একা অপর্না এর আগে কোনোদিন যায়নি,ভয় যে লাগছিলো না সেটা ঠিক নয়।বরানগরে বেশ কিছু লোক উঠলেও সোদপুরে প্রায় পুরোটাই ফাঁকা হয়ে গেলো।ফুটবোর্ডে কিছু বাদাম ওয়ালা,ফল ওয়ালা ছাড়া অপর্নার সিটের কাছে ওই মাঝ বয়সী লোকটা এই মাত্র দুজন।অপর্না নিজের মনে সাহস সঞ্চয় করতে লাগলো।জানলার উপর হাত রেখে তাতে মাথা রাখলো।ঠান্ডা হাওয়া লেগে একটু তন্দ্রা মতো এসেছিলো হটাৎ চমকে উঠলো ঘাড়ে একটা গরম নিঃশ্বাস পড়তে,চকিতে তাকিয়ে দেখে সেই মাঝ বয়সী লোকটা কখন তার গা ঘেঁষে এসে বসেছে,তারই গরম নিঃশ্বাস তার ঘাড় ছুঁয়ে গেছে।ভয়ার্ত চোখে অপর্না তার দিকে তাকাতে লোকটা কি রকম কদর্য ভাবে নোংরা হাসি দিয়ে তার আরো কাছে আসতে উদ্যত হলো।

      নাহ দৌড়লে আজ ট্রেনটা ঠিক মিস হতো স্বপ্না দরজার লম্বা রড টা ধরে হাঁফাতে লাগলো।এই লাস্ট রানাঘাট লোকাল তার প্রতিদিনের ট্রেন। গিরশ পার্ক থেকে মেট্রোয় দমদম সেখান থেকে লাস্ট রানাঘাট লোকাল।আজ শালা হারামি বুড়োটার জন্য ট্রেন টাই মিস হয়ে যাচ্ছিল।শালা বুড়োর বাঁধানো দাঁত তাও কাঠ বাদাম খাওয়ার শখ এখনো ষোল আনা।স্বপ্না ঘাড়ে গলায় হাত বুলিয়ে দেখতে থাকে ,শালা সারা গায়ে কামড়ে দাগ ধইরে দিয়েছে।মাল যদিও ডবলের থেকেও বেশি দিয়েছে।আজকে সারাদিনের কামাই খারাপ হয়নি।বুকের খাঁজে লুকানো যৌবন বিক্রির টাকা স্বপ্না টেনে বের করে গুনতে থাকে।

    গাড়ি টিটাগর ছাড়লো,লোকজন কমে এসেছে স্বপ্না ভাবলো একটু সিটে বসে জিরবে হটাৎ একটা মেয়ের কথায় তার নজরে আসে ট্রেনের পিছনে জানলার ধারে একটা জন্তু মাংসের গন্ধ পেয়ে লালসা মাখা মুখে এগিয়ে যাওয়ার দৃশ্য।স্বপ্না নিজেও কেনো জানিনা এই সব জন্তু শিকার করতে ভালোবাসে।তার ভিতরে লুকিয়ে থাকা তার প্রথম ভালোবাসার সেই হিংস্র নখের যন্ত্রনা তাকে আরো হিংস্র করে তোলে।এই পুরুষ জাতটা কে ভালোবেসেই ঘর ছেড়ে আজ সে সোনাগাছির স্বপ্না সুন্দরী।বাপের দেওয়া পূর্ণিমা নামটা স্বপ্নের অমাবস্যায় ঢেকে গেছে।স্বপ্না মুখে হাত দিয়ে একটা সিটি মারে।জন্তুটা অপর্ণার দিক থেকে ঘুরে দরজার দিকে তাকায়।স্বপ্না তখন দক্ষিণী জানলার পাল্লা একটু ফাঁক করে পতঙ্গকে আহ্বান করতে থাকে।জন্তুটা না চাইতে জল পাওয়ার মতো দুটো গাছে দুটো ফল দেখে লোভ সামলাতে পারেনা।নিজের সিট ছেড়ে দরজার দিকে এগিয়ে যায়।স্বপ্নার চোখের মণি শিকার কে কাছ থেকে দেখে জ্বল জ্বল করে জ্বলে ওঠে।

     অপর্না দেখতে পায় রাতের রানাঘাট লোকালের বীভৎস দৃশ্য।লোকটা উন্মোত্তের মতো জানালার পাল্লা খুলে বাইরের শোভা খুঁজতে ব্যাস্ত, ট্রেনর যান্ত্রিক আর্তনাদ অন্ধকার চিরে ছুটে চলা তারই মাঝে হটাৎ একটা ধাক্কা অন্ধকার চিরে একটা মানুষের আর্তচিৎকার, তারপর নিস্তব্ধতা শুধু ট্রেনের আওয়াজ খট খট।

    স্বপ্না বুকের বোতাম দুটো আটকে নেয়।তাচ্ছিল ভাবে হাত দুটো ঝেড়ে নিয়ে নিজের মনেই বলে শালা,যাহ মায়ের ভোগে যা,কালকের কাগজে ছবি হবি,শখ মারাতে এইছো। অপর্না নির্বাক হয়ে স্বপ্নার দিকে তাকিয়ে থাকে।গাড়ি ব্যারাকপুর ঢুকতে থাকে অপর্ণার দিকে তাকিয়ে স্বপ্না বলে যাও মেয়ে বনের একটা পশু আমি শিকার করে তোমায় এ যাত্রায় বাঁচলাম বলে ভেবোনা আর কেউ আসবে না।আমি এবার নেবে যাবো,বাকি পথ তোমায় একাই যেতে হবে।নিজেকে রক্ষা করতে পারো ভালো না হলে আগামী দিনে তুমিও আমার সঙ্গে এই ট্রেন ধরো।লাস্যময়ী হাঁসি হাঁসতে হাঁসতে স্টেশনের উপর দিয়ে সবুজ শাড়ী পরিহিতা অপর্ণার রক্ষক মিলিয়ে যেতে থাকে। ট্রেন ব্যারাকপুর ছেড়ে গন্তব্যে রওনা দেয়।

            💐💐💐সমাপ্ত💐💐

মঙ্গলবার, ১ ডিসেম্বর, ২০২০

# বিষয় - 'হিন্দুধর্ম'

নাম  - 'হিন্দু-হিন্দুত্ব এবং বিবর্তন।'
   ✍ মৃদুল কুমার দাস।
            ( ২য় পর্ব )
ভারতবর্ষের অধিবাসী ভারতীয়। হিন্দু নামকরণ বিদেশীদের দেওয়া। ভারতীয় কারা ছিল, হিন্দু পরিচয় এলো কীভাবে এবার ফিরে দেখার পালা। 
নৃতাত্ত্বিকগণের মতে ভারতীয় জনসমূহের আদি স্তর নিগ্রোবটু বা নেগ্রিটো। অবশ্য এনিয়ে  একটা বিতর্ক রয়েই গেছে। তবে নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে ভারতের প্রথম অধিবাসী আদি অস্ত্রাল( Proto- Australoid)। তথা মূলবাসী। প্রত্যেক দেশের মূলবাসী থাকে যেমন - আমেরিকার আদিম অধিবাসী,আফ্রিকায়,তেমনি ভারতেরও।
এই অস্ত্রাল জাতিই ত্রিশ হাজার বছর আগে ভারত থেকে সিংহল, ইন্দোনেশিয়া,মেলানেশিয়া ও অস্ট্রেলিয়া হয়ে প্রশান্ত মহাসাগরের ইস্টার দ্বীপ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে ছিল। এরা কালো, বেঁটে, মাথা লম্বা থেকে মাঝারি। নাক চ্যাপ্টা। চুল তামাটে ও ঢেউ খেলানো। এরাই ভারতবর্ষের আদিম জাতি। এরাই হল কোল,ভিল,মুন্ডা,কুরুব, সাঁওতাল প্রভৃতি গোষ্ঠীর লোক।
এদের সঙ্গে প্রথমে বাইরে থেকে এসে যুক্ত হল ভূমধ্য নরগোষ্ঠী, যাদের ভাষা হলো দ্রাবিড়। এদের ভাষা দ্রাবিড় বলে এদের বলা হয় দ্রাবিড় জাতি।
এই দ্রাবিড় জাতি ভারতবর্ষে প্রথম নাগরিক সভ্যতা গড়ে তোলে। যার নিদর্শন উত্তর-পশ্চিম সীমান্তের হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারো সভ্যতা। আর এই সভ্যতা সিন্ধু নদের তীরে অবস্থিত ছিল বলে এর নাম সিন্ধু সভ্যতা। আবার সিন্ধু সভ্যতাকেও বলা হয় দ্রাবিড়ীয় সভ্যতা। এই দ্রাবিড়রা দৈহিক আকৃতিতে মাঝারি। মাথা লম্বা। পাতলা গড়ন। নাক ছোটো। রং কালো।
এই দ্রাবিড়দের অনুসরণ করে ভারতবর্ষে এসেছিল আলপীয়রা(Alpinoid)। একটি শাখা ইরাণে, আরেকটি ভারতে আসে। ইরানের শাখাকে ইরাণীয় আর্য। আর ভারতীয় শাখাকে বলে ভারতীয় আর্য। এদের ভাষাকে বলে আর্য ভাষা। এরাই ভারতবর্ষে আর্য সভ্যতার প্রতিষ্ঠাতা। 
  ভারতীয় আর্যদের গায়ের রং ফর্সা। মাথা গোল ও বিস্তৃত। চুল ও চোখ কালো। দেহ মাঝারি ও দীর্ঘ। নৃতাত্ত্বিকণণের অনুমান আলপীয়রা তথা আর্যদের জন্ম মধ্য এশিয়ার পার্বত্য অঞ্চলে। এদের ভারতে অনুপ্রবেশের সময়কাল ধরা হয় আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ - অবশ্য তারও আগে নিশ্চয়ই প্রস্তুতি ছিল, ভারতবর্ষে উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য।
  আর্যদের আধিপত্য বিস্তারের ফলে দ্রাবিড়রা উত্তর-পশ্চিম সীমান্তের দিকে বিতাড়িত হতে শুরু করেন। তাঁরা বিন্ধ্য পর্বতের দক্ষিণে এসে হাজির হন। এই বিন্ধ্যের দক্ষিণে দ্রাবিড়রা, আর উত্তরে আর্যরা বসবাস করতে থাকেন। বর্তমানে দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলির ভাষা দ্রাবিড় ভাষা বংশজাত। খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতক থেকে দ্রাবিড় জাতির গৌরবময় অধ্যায় শুরু হয়েছিল। রাষ্ট্রকূট, বিজয়নগর,পূর্ব-পশ্চিম চালুক্য,পহ্লব,সাতবাহন,মাইসর প্রভৃতি এঁরা দ্রাবিড় জাতির রাজন্যবর্গ ছিলেন। নিজেদেরকে এঁরা 'হিন্দু' রাজা বলে মনে করতেন। সর্বাগ্রে বিজয়নগরের রাজা 'হিন্দু রায়' নামে প্রসিদ্ধি লাভ করেন। এই পাঁচটি রাজ্য নিজেদের ব্রাহ্মণ জাতির বলে অভিহিত করেছিলেন, এঁদের বলা হতো 'পঞ্চ দ্রাবিড়'। আর উত্তরাংশের আর্যরা 'পঞ্চ গৌড়া' আখ্যায় ভূষিত হন।
দ্রাবিড় ভাষা বংশের প্রধান ভাষা একেবারে দক্ষিণের রাজ্যগুলির ভাষা, যেমন- তমিল,মালয়ালম, তেলেগু কন্নড়। তামিলনাডুর তামিল,কেরালার মালয়ালম( শঙ্করাচার্য কেরালার অধিবাসী ছিলেন বলে সংস্কৃত ভাষার প্রধান্য বেশী ছিল), কর্ণাটকের কন্নড়,অন্ধ্রের তেলেগু। উত্তর মধ্যদেশীয় ভাষাগুলি যেমন ওরাঁও,কুরুখ,মালতো। আর্যদের তাড়া খেয়ে দ্রাবিড়দের একটা ক্ষুদ্র গোষ্ঠী বিচ্ছিন্ন হয়ে পশ্চিম দিকে চলে যায়। এদের ভাষা 'ব্রাহুই'। বর্তমানে পাকিস্তানের বেলুচিস্তানে এই ব্রাহুই ভাষার নিদর্শন মেলে। এই ব্রাহুই ভাষার নিদর্শন থেকে প্রমাণিত হয় সিন্ধু সভ্যতা আসলে দ্রাবিড়ীয় সভ্যতা।
  আর্যরা ক্রমেই বৃহত্তর ভারতবর্ষের ( সিন্ধুর পূর্ব অববাহিকা) চালিকা শক্তি হয়ে ওঠেন। তাঁরাই আর্য সভ্যতার বীজ বপন করলেন। 
তাহলে বোঝাই যাচ্ছে আর্যরা বহিরাগত শক্তি। ক্রমে ভারতবর্ষে শৌর্য বীর্যবত্তায় তাঁরা এমনই আধিপত্য বিস্তার করেছিলেন তাঁদের দেখাদেখি সিন্ধুর পশ্চিম অববাহিকায় ইসলাম শাসকগণ বারবার চেষ্টা করেও হাজার দেড়েক বছরের চেষ্টাতেও সিন্ধুর পূর্ব অববাহিকাকে দখলে আনতে সফল হননি। আর্যদের সঙ্গে পেরে না ওঠা,আচার আচরণে সম্পূর্ণ পার্থক্য বোঝাতে ইসলামদেরই এই হিন্দু নামের আমদানি। 
  আর ভারতীয়রা জাতিগত পরিচয়ে একটি মিশ্র জাতি। কেননা অস্ট্রিক, দ্রাবিড় ও আর্যদের মিশ্রণে একটি মিশ্র জাতি বলে। 
  আর আর্যদের বর্ণশ্রেষ্ঠ হলেন ব্রাহ্মণ্য সম্প্রদায়। দেশ রক্ষার জন্য ক্ষত্রিয়, বাণিজ্যের জন্য বৈশ্য,আর এই তিন সম্প্রদায়কে সেবা করার জন্য শূদ্র - এই চতুরাশ্রম দিয়ে সমাজের পরিকাঠামো নির্মাণ করলেন তাঁরা। আর শূদ্রদের চেয়েও সমাজে নারীর অবস্থান ছিল সবচেয়ে সঙ্গীন।
     ব্রাহ্মণ সবার উপরে। তারাই বিধান দিলেন কেন তাঁরা শ্রেষ্ঠ! তাঁদের পরম পুরুষের মুখ হতে জন্ম বলে। তাঁরাই অগ্নিহোত্রী। যাগযজ্ঞের তাঁরাই প্রধান নিয়ামক- যজ্ঞকুন্ড বানানো, তাতে আগুন জ্বালিয়ে ঘৃতাহূতি দান, দেবদেবীর ভোজের জন্য যজ্ঞে পশুমাংস উৎসর্গ করা, সেই মাংস যাজক ও যজমানদের মধ্যে বিতরণ করা, সঙ্গে সোমরস পান - এইসব ছাড়াও অধ্যয়ন,নিজ নিজ বর্ণের বিহিত নির্ধারণ সংস্কার প্রতিপাদন করার প্রধান হোতা হলেন ব্রাহ্মন।
আর স্রষ্টার বাহু হতে জন্ম রাজন্যবর্গের। নাম ক্ষত্রিয়। কাজ হবে দেশ রক্ষা ও যুদ্ধবিগ্রহে সামিল হওয়া,প্রজাপালন,অসাধু নিগ্রহ করা। আর বৈশ্যের জন্ম পরমপুরুষের উরুদ্বয় থেকে। কৃষি, পশুপালন, ক্রয়-বিক্রয়ের বাণিজ্য হবে তাঁদের পেশা। শূদ্রের জন্ম পরমপুরুষের পা থেকে। তাই তার কর্তব্য হবে- 'পূর্ববর্ণপরতন্ত্রা' অর্থাৎ এই তিন বর্ণের সে হবে সেবক। এর প্রমাণ রয়েছে খ্রিস্টপূর্ব ১০০০ সালে রচিত ঋক্ বেদের দশম মন্ডলে।
        এই শূদ্র কারা? এদেশের অস্ট্রিক সম্প্রদায়ের মানুষ যাঁরা, যাঁদেরই পদানত করে এই আর্যসভ্যতার অভ্যুদয় ঘটেছিল। এই আর্যসভ্যতার ব্রাহ্মণ্যশ্রেনী ছিলেন সমাজের শিরোমণি। তাদের তৈরি চতুর্বেদ, বেদান্ত, নীতিশাস্ত্র, মহাকাব্য, মোক্ষ শাস্ত্র, কামশাস্ত্র... সে সৃষ্টির প্রলয়োল্লাস কীভাবে ঘটেছিল, তাঁদের তৈরি বিধিবিধান, বিশেষ করে নীতি শাস্ত্র ( ষড় দর্শন - কপিলের সাংখ্য, পতঞ্জলির যোগশাস্ত্র, গৌতমের ন্যায়, কণাদের বৈশেষিক,জৈমিনীর পূর্ব মীমাংসা এবং ব্যাসের বেদান্ত) প্রণেতা গণের দ্বারা সমাজে কীভাবে মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল - এই দু'হাজার বছরের ইতিহাসে পাই কেবল বিবর্তনের চিহ্ন। তার উপর আবার বিভিন্ন প্রবক্তা ও তাঁদের রচিত একের পর এক গ্রন্থও যা ৬০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত - এই দু'হাজার বছরের সময়সীমা ধরে এতো রাশি রাশি গ্রন্থ রচিত হল অথচ একটিকে অন্তত ধর্মগ্রন্থ বলে চিহ্নিত করা যেতে পরত। কিন্তু করা যায়নি কেন আগে বলেছি। ধর্মগ্রন্থ বলে চিহ্নিত না করতে পারার মধ্যে অসুবিধার চেয়ে সুবিধা হয়েছিল অনেক বেশি। বলতে গেলে শাপে বর হয়েছিল কীভাবে ও তা থেকে তৎকালীন হিন্দুত্বের পরিচয় কী ছিল, মূল্যবোধ ভিত্তিক জীবন কীভাবে গড়ে উঠেছিল, নীতি শাস্ত্রগুলির বিষয় কী ছিল, তাই নিয়ে আলোচনা পরের পর্বে।
                         (চলবে)

    @ copyright reserved for  Mridul Kumar Das.

নীল রঙের স্বপ্ন

 দিল্লি ইউনিভার্সিটির লনে নীল অগ্নিহোত্রীর সাথে দেখা হয়েছিল। গ্রুপ থিয়েটারের রিহার্সাল করছিল। পথ নাটিকায় তাদের অসম্ভব সুন্দর পার্ফরমেন্স দেখে নীলাঞ্জনা মুগ্ধ হয়েছিল। যদিও ছেলেটার সাবজেক্টের সাথে তার জমিন আসমান ফারাক ছিল, তবু কেমন যেন আকর্ষণ অনুভব করত । আজন্ম বাঙলার বাইরে থাকা প্রবাসী বাঙালী নীলাঞ্জনার হোম সিটি ইন্দোর। মধ্যপ্রদেশ ওর নিশ্বাসের সাথে মিশে গেছে। তাই "নন বেঙ্গলি " ব্যবধান বা ধারনা তার মধ্যে ঠিক আসেনা। নীলাঞ্জনারা দাস। 


ইউনিতে থাকতে দু বছরের সিনিয়র নীল একটু কাছে এসেছিল, ঠিক বন্ধু আর প্রেম সম্পর্কের মধ্য এক লালা ল্যান্ডে। ভালো লাগত ওর গা ছুঁয়ে বসে রিহার্সাল দেখা, কিংবা হস্টেলের গেটে পৌঁছে দেওয়া, কিংবা ক্যান্টিনে তুমুল ঝড় তোলা মুহুর্তে চোখাচোখি, ব্যাস ওই টুকুই। আর্টের ছেলে... শিল্প জীবন করে নীল অগ্নিহোত্রী ভেসে গেল প্যারিস নিউইয়র্ক করে পৃথিবীর অলিতে গলিতে। কখন ধুলো পড়ে গেছে সেই অর্ধপরিবাহী সম্পর্কে। আদৌ কি সম্পর্ক ছিল! নীলাঞ্জনা জীবনের লড়াইয়ে ভুলে গেছে। 


এমবিএ, অফিস, প্রমোশনের সাথে নীলাঞ্জনা একটা ঝাঁ চকচকে অফিসের চিফ এক্সিকিউটিভ। নামের সাথে গর্জাস জীবন মুম্বাই কোলাবা। অফিসের ভেতরে এক স্থাপত্য নতুন বসানো হবে, তার প্রয়োজনে নীল অগ্নিহোত্রী আবার নীলাঞ্জনার সামনে। একটু বেশি স্মার্ট আর চুপ হয়েছে। আরও হ্যান্ডসাম বলা যায়। চোখটা তেমন আছে আবেগী। তবে আরও উদাস হয়েছে। অফিসের কাজে দেখা আবেগ চেপে রাখে নীলাঞ্জনা। ফোন নম্বর পেল, অফিস থেকে ফিরে ফোন লাগায়। ওপাশ থেকে আওয়াজে সামান্য শ্লেষ.... " চিনেছো তবে"

"না চেনার কি আছে? একই তো আছো। "

" তুমি কিন্তু অনেক চেঞ্জ হয়েছো, অনেক আকর্ষণীয়া। "

" ডিনার করবে? "

" তোমার লেবেলে যদি ঘা না লাগে "

" যাঃ, অফিসে গসিপ চাইনি তাই, এত দিন পরে দেখা! "

" মনে আছে কিছু? "

" আছে, তোমার সান্নিধ্যে একটা আকর্ষণ ছিল, তুমি তখন তুমুল শিল্পী, আমাদের হার্টথ্রব। আমরা তখন শিশু গন্তব্যে নেই। তুমি মনে রাখবে ভাবিনি নীল। ভাবলাম ফোন করলে চিনতে অসুবিধা হবে। "

" যদি বলি তোমার চুলের মিষ্টি গন্ধ এখনও মনে আছে, অবাক হবে? রিহার্সালে আমায় ছুঁয়ে তোমার খোলা চুল কথা বলত। মনে পড়ে। "

আজ ও দীর্ঘ আট বছর পরেও এই কথায় বুক কাঁপে। কেন যে বত্রিশ বছরের নীলাঞ্জনা এখনও বিয়ে করেনি জানে না। আসলে এ বিষয়ে তেমন করে ভাবেই নি। পদ আর অর্থের পেছনে কি সে তবে বৃথাই দৌড়েছে! না তা কেন?  এই পরিচয়ের তো দরকার ছিল। কিন্তু আজকাল বড়ো একা লাগে, মনে হয় কারও জন্য ঘরে ফিরতে। কেউ তার অপেক্ষায় থাকুক, কেউ তার চুলের গন্ধে বলুক থাকনা ওটা খোলাই থাক না। " কোথায় আসবে? কটায়?খোলা চুলে এসো " নীলের গলার আওয়াজ, নীলাঞ্জনা যেন ঘোরের মধ্যে বলে, " এ্যাঁ নটা ঠিক হবে না? তুমি গেস্ট হাউসে আছো তো, ওখান থেকে তুলে নেব? "


অনেক অনেক দিন পর নিজেকে দেখে নীলাঞ্জনা। সত্যি সে আকর্ষণীয় হয়েছে! লাল মেরুন সিফন  স্লিভলেস ব্লাউজ হল্কা সাজ। নীল পাশে। একটা মায়াবী সন্ধ্যা , ছাড়তে ইচ্ছা করে না এ সময় আর নীলকে। এমন কটা ডিনার, নীলকে এখন নীলাঞ্জনা ফ্ল্যাটে নিয়ে এসেছে । ওর বিদেশে শিল্প ওয়ার্কশপ আছে, দেশ বিদেশের ভষ্কর্য তৈরি কেনা বেচা সেই নিয়ে পড়াশোনা সেমিনার ও নতুন শিল্পীদের জায়গা করে দেওয়া নীল অগ্নিহোত্রীর কোম্পানির কাজ। নীলাঞ্জনা বিস্মিত হয় শিল্প নিয়ে ওর চিন্তা ভাবনা দেখে। কখনও ও কোন ইন্সটিটিউশনে লেকচার দিতেও যায়। নাটক চলছে পাশাপাশি। ল্যাপটপ খুলে নীলাঞ্জনার খাটে ওর খোলা পেটে মাথা দিয়ে বোঝায় সব। নীল নেশা এনে দিয়েছে জীবনে। ওর চুলে বিলি কাটছে নীলাঞ্জনা। দুজনেই বেড সেয়ার করেছে আনন্দে, গভীর আবেগে। কোন বন্ধন ছাড়া এক রিলেশন বিশ্বাস করে নীল, নীলাঞ্জনা মেনে নিয়েছে। না কোন বন্ধন নয়, এক অবাধ মিলন আর নেশা ডোবা দৈহিক মানসিক আকর্ষণ ছাড়া জীবনের  পাত্র পূর্ণো হয়ে উথলে উঠবে কি করে! বেশ কিছু মাস নীল অগ্নিহোত্রীর আদরে লতপত হয়ে তাকে মুক্তি দিল। মন খারাপ ছিল কিন্তু আঁটকায়নি। তেমন প্রটেকশন কিছু না নিলেও পিল নিত নীলাঞ্জনা। অবাঞ্ছিত কোন বন্ধন তারা চায়নি। এ বেশ ভালো হল। আবার কোন ঝড়ের রাতে হয়ত নীল কড়া নাড়বে! নীলাঞ্জনা এখন কানায় কানায় পূর্ণ, নতুন উদ্যোগে অফিসের নতুন ব্রাঞ্চের সর্বাধিকারী হতে পারবে। ভালো লাগছে স্বপ্ন নীল এই দিনগুলোকে বার বার উলটে পলটে দেখতে। 


হঠাৎ সব ব্ল্যাঙ্ক। অফিস থেকেই হসপিটালে দিল। নীলাঞ্জনা অন্য কিছুর জন্য ভয় পাচ্ছিল। অনাকাঙ্খিত মাতৃত্ব!! না রেজাল্টে ওকে এইচ আই ভি পজিটিভ বলা হয়েছে। অফিস জেনেছে। ফিসফিস, গুজ গুজ। অনেক পরিচিত জন সরে যাচ্ছে। একঘরে হয়ে থাকে। কিন্তু কি ভাবে? রিপোর্ট , সেক্সকে আঙুল তুলে দেখিয়েছে। নীল!  ওকি জানতো? নাকি ও বেচারাও অসুস্থ হয়েছে । খোঁজ নিতে চায় পরিচিত সব পথ বন্ধ। নীলাঞ্জনা ধীরে ধীরে শেষ হয়ে যাচ্ছে। অকাল ধূসরতা ছেয়ে গেছে ওর জীবনে। ঠিক সেই সময় একটা লেখা পেল। নীল কালি নিয়ে হিজিবিজি করত যে পেপারে। তা ওর ঘরের এক কোনে। কি লেখা? চোখের দৃষ্টি কম হচ্ছে.... লেখা --- কখনও কাউকে সরি বলবো না, কেন বলবো!! ওদের আমি যৌন সুখদি। ওদের খিদে মেটাই। শুকনো এই পৃথিবীতে ভালবাসাদি। না নীলাঞ্জনাকে কখনও বলব না, আমি শেষ স্টেজ মরতে চলেছি। মৃত্যু ওর ও আসুক। কি এসে যায়! আমাদের প্রেমের মুহুর্ত ও কখনও অস্বীকার করতে পারবে? 


( এইডস দিবসে। সাবধান ও সংযত থাকুন । দৈহিক ও মানসিক সুস্থ্য থাকুন) 

শর্মিষ্ঠা ভট্ট✍


মায়ের আঁচল(সুদেষ্ণা দত্ত)


 মায়ের আঁচল(সুদেষ্ণা দত্ত)

অণু গল্প

             তমসার শ্বশুরবাড়ীতে আজ সাজসাজ রব।বিয়ের ৫ বছর পর মা হতে চলেছে তমসা।আজ ওর সাধ।ভারী শরীর আর ভারী কাঞ্জিভরম শাড়ীতে জবুথবু তমসা।সমস্ত নিয়ম ও খাওয়াদাওয়া মেটার পর সবাই একটু হাল্কা চালে, হঠাৎই একটা জোর শব্দে সচকিত হয় সবাই।দেখে দো’তলায় উঠতে গিয়ে শাড়ীতে পা আটকে পড়ে গেছে তমসা।তৎক্ষনাৎ ডাক্তারখানায় নিয়ে যাওয়া হয় তাকে।প্রাথমিক কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর দেখা যায় তমসা মোটামুটি সুস্থ আছে।আর বাচ্চারও হৃৎস্পন্দন পাওয়া যাচ্ছে।সকলেরই প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়া হৃৎপিণ্ডে প্রাণসঞ্চার হয়—এ যেন প্রচন্ড দাবদাহের পরে এক পশলা বৃষ্টির শান্তি।

          চাতকের জল চাওয়ার মত সেই বহু প্রতীক্ষিত দিন আজ উপস্থিত।হাসপাতালে ভর্তি করা হয় তমসাকে।একটি ফুটফুটে পরীর মত মেয়ের জন্ম দেয় তমসা।কিন্তু জন্মের পর বাচ্চার শরীরে কিছু অসঙ্গতি দেখা যায়।দু’দিন পর অপরিণত অবস্থাতেই মায়ের ডানার আশ্রয় ছেড়ে পরীদের দেশে পাড়ি দেয় সে।ডাক্তারবাবু জানান সিঁড়ি থেকে পড়ে তমসার স্পাইনাল কর্ডে আঘাত লাগায় শিশুটির মাথায় আঘাত লাগে।স্বভাবতঃই সবাই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে যায়।বছর দু’য়েক পর তমসা ও তার স্বামী তমাল আবার বাচ্চার জন্য চেষ্টা করার পরিকল্পনা করে।ডাক্তারের কাছে গেলে তিনি জানান তমসার ওভারি ও ইউটেরাসে বাসা বেঁধেছে একাধিক টিউমার এবং ডাক্তারবাবু তমসার মা হওয়ার আকাঙ্ক্ষায় জল ঢেলে দিয়ে কিছু দিনের মধ্যেই তমসার ওভারি ও ইউটেরাস বাদ দেন।চরম মানসিক অবসাদে ভুগতে থাকা তমসা পরিবার-পরিজন থেকে নিজেকে ক্রমশঃ দূরে সরিয়ে নেয়।সমাজ-স্বজনদের আসল চেহারাও তার সামনে পরিষ্কার হয়ে যায়।কিন্তু তমসার স্বামী তমালের তমসার প্রতি ভালবাসা একটুও কমে না,সে ক্রমাগত চেষ্টা করে তমসাকে অবসাদ থেকে বার করে আনতে।

              তমসা গৃহবধূ।কিন্তু তমসার অনেক বন্ধুই কর্মরতা।তাই তারা তমালের সঙ্গে পরামর্শ করে দু-একজন তাদের বাচ্চাকে কর্মক্ষেত্রে যাওয়ার আগে তমসার কাছে রেখে যায়।তমসাও মা ডাক শুনতে না পারার যন্ত্রণা থেকে ধীরে ধীরে মুক্তি পেতে থাকে।প্রয়োজনের তাগিদে ধীরে ধীরে অনেক শিশুরই জায়গা হয় তমসার ‘মায়ের আঁচল’ এর আশ্রয়ে।কিন্তু সব শিশুই এখানে পরিযায়ী।নির্দিষ্ট সময় পর সবার থাকে বাসায় ফেরার তাগিদ।কিন্তু লোপা নামে একটি ফুটফুটে শিশু ত ‘মা’কে মায়ার বাধঁনে আষ্টে-পৃষ্টে জড়িয়ে ফেলে।তমসাও লোপার মধ্যে তার হারানো মেয়েকে খুঁজে পায়।আজ তমসা বৃদ্ধা।কিন্তু লোপা আজও তার যশোদা ত ‘মা’র প্রতি তার সন্তান হওয়ার দায়িত্ব-কর্তব্য পালন করে যায়।আজ লোপার মেয়ে অদ্রিজার জন্মদিনে পায়েস দিতে দিতে তার গ্র্যানি তমসা ভাবে ‘ভালবাসা জীবনে বার বার আসে’।তমসার দু’চোখ বেয়ে আনন্দাশ্রু বইতে থাকে।

©All copyrights are reserved by Sudeshna Dutta


নিশা - দিশা (পিয়ালী চক্রবর্তী)


বারুইপুরের কাছেই বর্ধিষ্ণু ভট্টাচার্য বাড়ি । জমি - জমা, সম্পত্তি - প্রতিপত্তি কি নেই তাদের । বড়কর্তা, বিপত্নীক অমরীন্দ্রনাথ বাবু গত পরশু থেকে শয্যাশায়ী । আজ সন্ধ্যায় ইহজগতের মায়া কাটিয়ে চলে গেলেন । রেখে গেলেন দুই পুত্রসন্তান ও তাদের পরিবার এবং সাথে প্রচুর অর্থ - সম্পদ ।


ওনার শ্রাদ্ধশান্তির পরে দুই ভাই একদিন আলোচনায় বসলো । অনেক দিন থেকেই বাবার মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করে ছিল তারা । আজকে সেই সুবর্ণ সুযোগ তাদের হাতের মুঠোয় । তলে তলে এক প্রোমোটারের সাথে দুই ভাই আগেই কথা বলে রেখেছিলো । ওদের বিশাল জমি ও বাড়ি সেই প্রোমোটারের হাতে তুলে দিয়ে তারা নিজেরা নিজেদের মতো কলকাতায় বহুতল আবাসনে ফ্ল্যাট কিনে থাকবে সেই প্ল্যান । 


মাসখানেকের মধ্যেই হস্তান্তর প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলো । দুই ভাই আগে থেকেই ফ্ল্যাট বুক করে রেখেছিল । সেখানে তারা নিজের নিজের পরিবার সাথে নিয়ে স্থানান্তরিত হলো । 


দুই ভাইএর দুই মেয়ে । বড়ো ভাই দীনেন্দ্রনাথের মেয়ের নাম দিশা । আর ছোটভাই নৃপ্রেন্দ্রনাথের মেয়ের নাম নিশা । দুই বোন পিঠোপিঠি । দুজনের মধ্যে যাকে বলে হরিহর আত্মার সম্পর্ক । কেউ  কাউকে ছেড়ে একটা কাঁচা আমের টুকরো পর্যন্ত খায় না । ছোটো থেকে একসাথে বড়ো হয়েছে । একসাথে খাওয়া, শোওয়া, ওঠা, বসা, পড়া, খেলা এমনকি অসুস্থও হতো তারা একসাথেই । 


বাবা ও কাকা আলাদা আলাদা ফ্ল্যাটে গিয়ে উঠতে দুই বোনের যেনো নাভিশ্বাস ওঠার অবস্থা । বাচ্চাদুটো সারাদিন মনমরা হয়ে থাকাতো । না ঠিক করে খাওয়া, না ঘুম, না পড়াশুনায় মন, এমনকি আজকাল স্কুলেও যেতে চায় না তারা । সারাদিন ওদের মায়েরা ব্যতিব্যস্ত হয়ে থাকে ওদের নিয়ে । 


ধীরে ধীরে শুকিয়ে যেতে থাকে ফুলের মতো দুটো প্রাণ । শয্যা নেয় দিশা । ওদিকে নিশার অবস্থাও তথৈবচ । ওদের মা বাবারা কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছেন না কেনো ওদের এই অবস্থা । বিলাসবহুল আবাসনে পার্ক, বাচ্চাদের খেলার সামগ্রী কোনো কিছুরই অভাব নেই । তবুও তারা আজকাল কারুর সাথে কথাই বলতে চায়না, মিশতেই চায় না । 


নিশা করার সাথে কোনো কথা বলেনা । চুপ হয়ে গেছে চঞ্চল  মেয়েটা । 


ওদিকে ধুম জ্বর দিশার । ডাক্তার এলেন দেখতে । অভিজ্ঞ ডাক্তারের চোখে ধরা পড়লো অসুস্থতার আসল কারণ । মনকষ্টে ভুগে, অনাহারে ইমিউনিটি ব্যাপকভাবে ভেঙে পড়েছে আট বছর বয়সী মেয়েটার । তাই এই জ্বর । ডাক্তারবাবু দিশার বাবা - মায়ের কাছ থেকে জানতে চাইলেন দিশার মনকষ্টের কারণ । কথায় কথায় বেরিয়ে এলো আসল সত্য । সহোদরার মতো প্রিয় বোনের থেকে বিচ্ছেদের কারণেই ছোট বাচ্চাটির এই মনের অসুখ । 


সব শুনে ডাক্তারবাবু নিদান দিলেন, "যদি বাচ্চাকে স্বাভাবিক অবস্থায় আবার ফিরে পেতে চান তবে ওর বোনের সান্নিধ্য ওর জন্য খুব জরুরী । আপনারা শত ওষুধ - পথ্য করেও ওকে ঠিক করতে পারবেন না যদি না ওর বোনকে ওর কাছে এনে দেন । "


ডাক্তারের কথায় দুই ভাই ও তাদের বউদের টনক নড়লো ।  তারা ঠিক করলো একসাথে একটা বড়ো ফ্ল্যাটে যৌথ পরিবার হিসেবেই থাকবে । সত্যিকথা বলতে তাদের কারুরই এমন অণু পরিবারে থাকার অভ্যাস নেই । সবারই কম বেশি কষ্ট হচ্ছিল । 


বাচ্চারা তাদের সঠিক দিশা দেখালো । পারিবারিক মিলনের পরে ধীরে ধীরে সুস্থ স্বাভাবিক জীবন ফিরে পেল তারা । 


এই গল্পটি থেকে আমরা বুঝতে পারি, মানসিক সুস্থতাই শারীরিক সুস্থতার চাবিকাঠি । 

Copyright © All Rights Reserved

Piyali Chakravorty

ছবি সৌজন্যে : গুগল
 

# বিষয় - 'হিন্দুধর্ম'

# নাম - 'হিন্দু-হিন্দুত্ব এবং বিবর্তন...'
    ✍ মৃদুল কুমার দাস।
              (  ১ম পর্ব )

    সে দু'হাজার বছরের সৃষ্টির কথা। বেদ,উপনিষদ,ব্রাহ্মণ্য সাহিত্য, মহাকাব্যদ্বয়,পুরাণ,উপপুরাণ, শ্রীমদ্ভগবদগীতা, কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র,বাৎসায়ণের কামসূত্র....। তার সঙ্গে ধর্ম সম্প্রদায়ের ছড়াছড়ি ও অগণিত প্রবক্তা। নানা মুনির নানা মত। সকলের মধ্যে জাহিরের বেদম ব্যস্ততা। রেহাই ছিল না বৈদেশিক শক্তির আক্রমণও।
  সৃষ্টির প্রলয়োল্লাসের সময়কাল শুনতে দু'হাজারের অধিক কিছু সময় (খ্রীষ্টপূর্ব১৫০০ থেকে ৬০০ খ্রিস্টাব্দ)। সৃষ্টির নিরিখে এই সময় বলতে গেলে নিতান্তই অল্প। বলতে দ্বিধা নেই, বিশ্বে সৃষ্টির এমন প্রলয়োল্লাস প্রাচীন সভ্যতাগুলির কেউ এই কৃতিত্ব জাহির করতে পারে না। বা কৃতিত্বের অধিকারী নয়। এ যেমন আমাদের গর্ব, তেমনি এটাও ঠিক যে আমরা কতখানি যোগ্য উত্তরসূরী! ও বলতে গেলে তর্ক ওঠা স্বাভাবিক।
  শুরু খ্রীষ্টপূর্ব ১৫০০ থেকে। প্রস্তুতি আরো দু'তিনশ' বছর আগে থেকেই বলতেই হয়। প্রদীপ জ্বালানোর পূর্বে যেমন সলতে পাকাতে হয় এও ঠিক তেমনি। বা সূর্যোদয়ের পূর্বে ঊষার আবির্ভাবের মতো। আর শেষ যদি ৬০০ খ্রিস্টাব্দ ধরা হয় তার জের চলছিল আরো অন্তত দু'পাঁচশ' বছর তো বটেই। যেমন দৌড়বাজ সীমান্ত ছুঁয়েও আরো কিছুটা দৌড়ে গিয়ে নিজেকে সামাল দেন,এও ঠিক তারই মতো।
তবে মুসকিল এই পর্বত প্রমাণ সৃষ্টির প্রত্যেকের সুনির্দিষ্ট সময়কাল উল্লেখ করা। যেমন বেদ আনুমানিক খ্রীষ্টপূর্ব ১৫০০ থেকে রচিত,কেউ কেউ বলেন খ্রিস্টপূর্ব ১২০০ থেকে। সূত্র সাহিত্যগুলি খ্রিস্টপূর্ব ৫০০। মহাকাব্য দুটি খ্রীষ্টপূর্ব পঞ্চম শতক হতে  পঞ্চম শতকের মধ্যে। আনুমানিক সময়সীমা শতকের মধ্যে বলতে হয়। সুনির্দিষ্ট সাল তারিখ বলা অসম্ভব। ইতিহাসকে তাই নিয়ে একটা বিড়ম্বনা সহ্য করতে হয়।
  ভারতীয়দের এই পর্বত প্রমাণ সৃষ্টি নিয়ে ইহুদি, ইসলাম, খ্রীষ্টানের পাশে তো একটা ধর্মের পরিচয় চাই। কি সে পরিচয়? পরিচয় সিন্ধু থেকে হিন্দু নাম এসেছিল। নামটাও বেশ! ছোট্ট নাম। কিন্তু এর তাৎপর্য...!
   এই হিন্দু নাম কে দিল? এই ধর্মের একটা ধর্মগ্রন্থও তো একটা চাই। কেননা প্রাচীন সব ধর্মের সমসাময়িক হিন্দু ধর্ম। সকলের যদি ধর্মগ্রন্থ থাকে তবে হিন্দুদের ধর্মগ্রন্থ থাকবে না কেন? কিন্তু কি অদ্ভুত ব্যাপার সেই যে ধর্মগ্রন্থহীন হয়ে হিন্দুদের চলা শুরু, আজও চলছে। কারণ ধর্মগ্রন্থ কোনটি হবে,তার মীমাংসা কোনো দিন করে উঠতে পারেনি বলে। কেন পারেনি? সেও এক কান্ড! এতো প্রবক্তা! এতো নীতি শাস্ত্র,মোক্ষ শাস্ত্র, এমনকি মহাকাব্য! সকলেই যে যার শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করে বসে আছেন। কার গ্রন্থ ধর্মগ্রন্থ হিসেবে গণ্য হবে? এটা ছেড়ে ওটা ধরলে আবার কারো কারো গোঁসা হয়। সামাল দেওয়া ছিল ততোধিক সমস্যা।
   ধর্মগ্রন্থ না নিয়ে সেই যে যাত্রা শুরু করেছিল আজও তাই যথা পূর্বং তথা পরং। ধর্মগ্রন্থ না হয় বাদ দিলাম,এই হিন্দু নামকরণের পেছনেও একটা কাহিনি আছে। সেই কাহিনির কথায় আসি তাহলে। 
  হিন্দু নামে পরিচয় এসেছে অনেক পরে,প্রথম থেকেই এদেশের নাম ছিল ভারতবর্ষ। ভারতবর্ষের ধর্ম হিন্দু। এই হিন্দু নামকরণের সময় কালও বলা খুব মুসকিল। আনুমানিক বলে প্রসঙ্গান্তরে যেতে হয়,এও এক ব্যর্থতা।
  'হিন্দু' শব্দটি কোনো ভারতীয় শব্দ নয়। আবার এও নয় কোনো সংস্কৃত বা প্রাকৃত বা দেশি শব্দ।
এই হিন্দু নাম এদেশে চালু হয় আরব-ইরাণ-তুরাণ থেকে আগত মুসলমানদের মুখে মুখে। তাঁরা আবার এই নামটি পেয়েছিলেন প্রাচীন ইরাণীয় নাম হিন্দু থেকে। যার আদি রূপ সিন্ধু। সিন্ধু নদের অববাহিকাকে জরাথুস্ত্রীয় ইরাণীরা বলতেন হিন্দু। যার প্রমাণ পাই ইরাণের সাশান বংশীয় জরাথুস্ত্র ধর্মাবলম্বী সম্রাট প্রথম সাপুর-এর  ২৬২ খ্রিস্টাব্দের একটি শিলালিপি থেকে।
আবার এও মত চাউর হয় ইসলামরা নিজেদের ভারতীয়দের থেকে আলাদা করে বোঝানোর জন্য ভারতীয়দের হিন্দু নামে অভিহিত করেছিলেন। অবশ্যই দৃষ্টিভঙ্গি ধর্মীয়। এছাড়া আরেকটি মতও পাই সিন্ধু নদের পশ্চিম অববাহিকায় সীমাবদ্ধ ছিল ইসলামীয়রা। আর পূর্ব অববাহিকায় ভারতীয়রা, যাদের আলাদা করে বোঝানোর জন্য ইসলামীয়দের একটা মজ্জাগত উদ্দেশ্য তো বটেই, অভ্যাসও হয়ে গিয়েছিল।
প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক ইরাণ থেকে কেনই বা 'হিন্দু' নামের উৎপত্তি হল? প্রমাণ হিসেবে তথ্য বলছে,ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা বংশের শাখা ইরাণীয় আর্যভাষা ও ভারতীয় আর্যভাষা। আর্যদের একটি ভাগ ইরাণে, আরেকটি ভাগ ভারতে প্রবেশ করে। উভয়েই ছিল অগ্নির উপাসক। ইরাণীয় আর্যরা রচনা করেন 'আবেস্তা',আর ভারতীয় আর্যরা 'ঋক্ সংহিতা'। উভয় দেশের এই আর্যরা দেশ ও কালের পরিস্থিতির পার্থক্য অনুযায়ী তাঁরা আচরণগত দিক দিয়ে আলাদা হয়ে যান। যেমন-
   আবেস্তা ও বেদে দেবাসুর নামের অর্থ বিপর্যয় ঘটল। ইরাণীয়দের কাছে 'অহুর'( দেবতা অহুর মাজদা), ভারতীয়রা তাকেই বলতেন 'অসুর' তথা দৈত্য। আবেস্তার 'দয়েব'(দৈত্য) বৈদিক ভাষায় হলো 'দেব'। আবেস্তার অগ্নি উপাসনা হল- আগুন জ্বালালেই উপাসনা । কিন্তু বেদে আগুনকে জ্বালানোর আগে অগ্নির কুন্ড করতে হয়,যার নাম যজ্ঞ বেদি। অগ্নির এই হল উপাসনার আলাদা বিধি। উপাসনাকে কেন্দ্র করে এই পৃথক বিধি বিধান থেকে তাঁরা নিজেদের আলাদা হিসেবে চিহ্নিত করলেন।
আবার পার্থক্যের কারণ - সিন্ধু পরস্পরের মাঝে বিভেদ প্রাচীর। তাই পূর্ব অববাহিকার আর্যদের নিজেদের থেকে আলাদা বোঝাতে সিন্ধু থেকে হিন্দু উচ্চারণ করত।
প্রথমদিকে ভারতীয়রা 'হিন্দু' নামটি দিয়ে নিজেদের পরিচয় ভাবত না। বিদেশীদের দেওয়া নাম গ্রহণেও প্রথম প্রথম আপত্তি ছিল। ক্রমে সিন্ধুর পূর্ব অববাহিকায় বৃহত্তর ভারতবর্ষে ইসলামরা যখন ছড়িয়ে পড়তে শুরু করল (কেউ শাসনের লোভে,কেউ বা লুঠপাটের নেশায়) তখন ধর্মের ভিত্তিতে 'হিন্দু' কথাটির ব্যপক প্রচলন ঘটে। এই ব্যাপকতা আরো তীব্রতর হয় যখন ধরে ধরে হিন্দুদের ইসলামে ধর্মান্তরিত করা হতে লাগল।
  এ তো গেল 'হিন্দু' নামের রহস্য। তাহলে এই হিন্দুদের পরিচয় কী? তাই নিয়ে পরের পর্বে আলোচনায় আসছি।
                                  (ক্রমশ)
 @ copyright reserved for Mridul Kumar Das. 
         

# বিষয় - 'বিশ্ব এইডস দিবস।'

# বিষয় - 'বিশ্ব এইডস দিবসে
  #নাম- 'এইডস ভাইরাস'
    ✍ মৃদুল কুমার দাস। 
  
    করোনা ভাইরাসে বিশ্ব কাবু। এইডস ভাইরাসের কবলে বিশ্ব  এখনও নিরাপদ নয়। করোনার মতো বিশ্বকে দ্রুত গ্রাস না করলেও ১৯৮০-র দশকে ভয়ঙ্কর রূপেই হানা দিয়েছিল। এই রোগ সংক্রমণের সবচেয়ে বড় কারণ যৌন সংসর্গ,তাই রক্ষণশীল সমাজের  বদলে যেখানে ব্যাভিচার বেশি সেখানেই এই মারণ রোগ ছিল লাগাম ছাড়া। এই রোগের প্রকোপ উত্তর আমেরিকা ও আফ্রিকা ছিল তুলনামূলক বেশি- কাতারে কাতারে মানুষ মৃত্যুর মিছিলে সামিল হয়েছিলেন। 
 ভাইরাস বিচিত্র জড় বস্তু। নিজে কোনোরূপ বংশ বিস্তার লাভ করতে পারে না। কিন্তু জীব কোশে ঢুকলেই শুরু হয়ে যায় বংশ বৃদ্ধি। 
   এইচ আই ভি হলো রেট্রো ভাইরাস। মানে উল্টো কাজে খুব পারদর্শী। অন্যরা যেখানে ডিঅক্সিরাইবোনিউক্লিক অ্যাসিড(DNA) থেকে রাইবোনিউক্লিক অ্যাসিড (RNA)  বানায়,সেখানে রেট্রোভাইরাস বানায় RNA থেকে DNA। শরীরে ঢুকেই HIV  আক্রমন করে শ্বেতকণিকাকে। যাদের নাম 'টি কোশ'। বুকের ওপরের দিকে থাইমাস গ্রন্থিতে এই কোশ বড় হয় বলে একে 'টি কোশ' বলে।
 রোগ প্রতিরোধে এই টি কোশ  প্রধান ভূমিকা নেয়। আর এই টি কোশেই প্রথমে HIV আশ্রয় নেয়। টি কোশ নিজের  কাজের  বদলে HIV-র দাসের পরিণত হয়। টি কোশ তখন  নতুন নতুন HIV তৈরির কারখানা হয়ে ওঠে।
  এই HIV র বিরুদ্ধে প্রথম ১৯৮৭ সালে আমেরিকা ওষুধ বের করে। নাম অ্যাজিডোথাইসিডিন( AZT)। এর কাজ হলো টি কোশে HIV বংশবৃদ্ধির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা। এই AZT আশানুরূপ ফল দানে ব্যর্থ হলো। কারণ পরিসংখ্যান বিচারে ভুল ছিল। 
  গবেষণায় জানা গেল এইডস এগোয় তিন পর্যায়ে। প্রথম সপ্তাহে রোগ প্রবল। দ্বিতীয় ধাপে রোগের  লক্ষণ বেশ প্রশমিত। এটি একটি লঙ্ প্রসেস- কারো কারো ক্ষেত্রে বছর দশেক গড়াতে পারে। আর তৃতীয় তথা অন্তিম দশায় রোগ জানিয়ে বসে। আর রোগী মৃত্যুদিন গোনে।
 যখন প্রথম পর্যায়ে শুরু হচ্ছে তখন জ্বর,গায়ে চাকা চাকা দাগ বা মামারা শুরু হয়। এই সময় টি কোশের সংখ্যা দশ ভাগ কমে যায়। আর তার  স্থলে ভাইরাসের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়।
 দ্বিতীয় পর্যায়ে মানব দেহের সর্বশক্তিমান ক্ষমতা দিয়ে লড়তে থাকে। তাই দ্বিতীয় পর্যায় একটি লম্বা প্রসেস। আর পর্যায় রোগীর অন্তিম দশা।
  ATZ ব্যর্থ হওয়ায় ১৯৯৪ সালে এলো প্রোটিয়েজ ইনহেবিটর। এটি ভাইরাসের দ্বিতীয় পর্যায়ে কাজ করে। অর্থাৎ টি কোশে ভাইরাস যাতে না বাড়ে সেই ভূমিকায় অংশগ্রহণ করে।
  এই দ্বিতীয় স্তরটিই ভেরি ইন্টারেসটিং।
  এই নতুন ওষুধ নিয়ে গবেষণায় নামলেন কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের  ডেভিড দাই হো ও অ্যালান এস পেরেলসন। হো জীব বিজ্ঞানী,আর পেরেছেন থিওরিটিক্যাল ইমিউনোলজিস্ট।
  এঁরা দু'জন ক্যালকুলাসের সাহায্যে ভাইরাসের দ্বিতীয় পর্যায়ে সংখ্যার গতিবিধি-রেট পর্যবেক্ষণে নামলেন। অর্থাৎ এই সময় ভাইরাসের রেট কীভাবে বাড়ে কমে তারই পরিসংখ্যান বিচার করা।
  এই দ্বিতীয় পর্যায়ে ভাইরাসের  চরিত্র বুঝতে পারলেন যে ভাইরাস  এই সময় ঘুমিয়ে থাকে না। বরং দ্রুত হারে সংখ্যা বৃদ্ধিতে সক্রিয় থাকে। আর দেহের রোগ প্রতিরোধের সঙ্গে প্রবল সংঘর্ষের ফলে রোগীর দেহে লক্ষণ প্রকাশিত হয় না। হাজার কোটি ভাইরাস উৎপন্ন হলে হাজার কোটি কোশও সমানে টক্কর দিতে থাকে।
   হো ও প্রয়োগ দেখালেন এই যে লড়াই,তার জন্য  কোশকে বাইরে থেকে সাহায্যের দরকার। সেই সাহায্য একটি ওষুধে হবে না,ভাইরাস তাকে সহজেই বশে এনে ফেলবে। তাই ককটেল থেরাপিতে একাধিক ওষুধ প্রয়োগ করতে হবে। এই একাধিক ওষুধের বিরুদ্ধে ভাইরাস লড়তে নামে বলেই দ্বিতীয় পর্যায়ে রোগীর শরীরে এইডসের প্রকোপ দীর্ঘসূত্রী হয়।
 হো ও পেরেলসনের এই ককটেল থেরাপি এইডস চিকিৎসার নতুন দিগন্ত সুচিত করলেন। ককটেল থেরাপিতে চিকিৎসায় রোগ নির্মূল হয়নি সত্য,তবে এই চিকিৎসার ফলে রোগীর আয়ু ক'টা বছর  বাড়তে সাহায্য করেছে।
   হো-এর এই অবদানের জন্য ১৯৯৬ সালে 'টাইম' পত্রিকার  বিচারে ম্যান অফ দ্য ইয়ার হন। আর পেরেলসন ২০১৭ সালে চিকিৎসা বিজ্ঞানে ইমিউনোলজিতে অবদানের জন্য পান 'ম্যাক্স ডেনমার্ক প্রাইজ'।
 আজ বিশ্ব এইডস দিবসে এই দুই বিজ্ঞানীদের জানাই অন্তরের শ্রদ্ধা ভক্তির প্রণাম ও ভালবাসা। ❤❤🙏🙏
@ঋণস্বীকার- 'ভাইরাস দমনে ক্যালকুলাস' - পথিক গুহ( 'দেশ'- ২এপ্রিল,২০২০। পৃ: ৩৩,৩৪)।

শিরোনাম-সাহস✍️ ডা: অরুণিমা দাস

 শিরোনাম-সাহস ✍️ ডা: অরুণিমা দাস সত্যি কথা বলতে সত্য কিন্তু অপ্রিয় হয়। মিথ্যেকে আড়াল করার অনেক পন্থা পাওয়া গেলেও সত্যকে চাপা দেওয়া একটু...