# নাম - 'হিন্দু-হিন্দুত্ব এবং বিবর্তন...'
✍ মৃদুল কুমার দাস।
( ১ম পর্ব )
সে দু'হাজার বছরের সৃষ্টির কথা। বেদ,উপনিষদ,ব্রাহ্মণ্য সাহিত্য, মহাকাব্যদ্বয়,পুরাণ,উপপুরাণ, শ্রীমদ্ভগবদগীতা, কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র,বাৎসায়ণের কামসূত্র....। তার সঙ্গে ধর্ম সম্প্রদায়ের ছড়াছড়ি ও অগণিত প্রবক্তা। নানা মুনির নানা মত। সকলের মধ্যে জাহিরের বেদম ব্যস্ততা। রেহাই ছিল না বৈদেশিক শক্তির আক্রমণও।
সৃষ্টির প্রলয়োল্লাসের সময়কাল শুনতে দু'হাজারের অধিক কিছু সময় (খ্রীষ্টপূর্ব১৫০০ থেকে ৬০০ খ্রিস্টাব্দ)। সৃষ্টির নিরিখে এই সময় বলতে গেলে নিতান্তই অল্প। বলতে দ্বিধা নেই, বিশ্বে সৃষ্টির এমন প্রলয়োল্লাস প্রাচীন সভ্যতাগুলির কেউ এই কৃতিত্ব জাহির করতে পারে না। বা কৃতিত্বের অধিকারী নয়। এ যেমন আমাদের গর্ব, তেমনি এটাও ঠিক যে আমরা কতখানি যোগ্য উত্তরসূরী! ও বলতে গেলে তর্ক ওঠা স্বাভাবিক।
শুরু খ্রীষ্টপূর্ব ১৫০০ থেকে। প্রস্তুতি আরো দু'তিনশ' বছর আগে থেকেই বলতেই হয়। প্রদীপ জ্বালানোর পূর্বে যেমন সলতে পাকাতে হয় এও ঠিক তেমনি। বা সূর্যোদয়ের পূর্বে ঊষার আবির্ভাবের মতো। আর শেষ যদি ৬০০ খ্রিস্টাব্দ ধরা হয় তার জের চলছিল আরো অন্তত দু'পাঁচশ' বছর তো বটেই। যেমন দৌড়বাজ সীমান্ত ছুঁয়েও আরো কিছুটা দৌড়ে গিয়ে নিজেকে সামাল দেন,এও ঠিক তারই মতো।
তবে মুসকিল এই পর্বত প্রমাণ সৃষ্টির প্রত্যেকের সুনির্দিষ্ট সময়কাল উল্লেখ করা। যেমন বেদ আনুমানিক খ্রীষ্টপূর্ব ১৫০০ থেকে রচিত,কেউ কেউ বলেন খ্রিস্টপূর্ব ১২০০ থেকে। সূত্র সাহিত্যগুলি খ্রিস্টপূর্ব ৫০০। মহাকাব্য দুটি খ্রীষ্টপূর্ব পঞ্চম শতক হতে পঞ্চম শতকের মধ্যে। আনুমানিক সময়সীমা শতকের মধ্যে বলতে হয়। সুনির্দিষ্ট সাল তারিখ বলা অসম্ভব। ইতিহাসকে তাই নিয়ে একটা বিড়ম্বনা সহ্য করতে হয়।
ভারতীয়দের এই পর্বত প্রমাণ সৃষ্টি নিয়ে ইহুদি, ইসলাম, খ্রীষ্টানের পাশে তো একটা ধর্মের পরিচয় চাই। কি সে পরিচয়? পরিচয় সিন্ধু থেকে হিন্দু নাম এসেছিল। নামটাও বেশ! ছোট্ট নাম। কিন্তু এর তাৎপর্য...!
এই হিন্দু নাম কে দিল? এই ধর্মের একটা ধর্মগ্রন্থও তো একটা চাই। কেননা প্রাচীন সব ধর্মের সমসাময়িক হিন্দু ধর্ম। সকলের যদি ধর্মগ্রন্থ থাকে তবে হিন্দুদের ধর্মগ্রন্থ থাকবে না কেন? কিন্তু কি অদ্ভুত ব্যাপার সেই যে ধর্মগ্রন্থহীন হয়ে হিন্দুদের চলা শুরু, আজও চলছে। কারণ ধর্মগ্রন্থ কোনটি হবে,তার মীমাংসা কোনো দিন করে উঠতে পারেনি বলে। কেন পারেনি? সেও এক কান্ড! এতো প্রবক্তা! এতো নীতি শাস্ত্র,মোক্ষ শাস্ত্র, এমনকি মহাকাব্য! সকলেই যে যার শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করে বসে আছেন। কার গ্রন্থ ধর্মগ্রন্থ হিসেবে গণ্য হবে? এটা ছেড়ে ওটা ধরলে আবার কারো কারো গোঁসা হয়। সামাল দেওয়া ছিল ততোধিক সমস্যা।
ধর্মগ্রন্থ না নিয়ে সেই যে যাত্রা শুরু করেছিল আজও তাই যথা পূর্বং তথা পরং। ধর্মগ্রন্থ না হয় বাদ দিলাম,এই হিন্দু নামকরণের পেছনেও একটা কাহিনি আছে। সেই কাহিনির কথায় আসি তাহলে।
হিন্দু নামে পরিচয় এসেছে অনেক পরে,প্রথম থেকেই এদেশের নাম ছিল ভারতবর্ষ। ভারতবর্ষের ধর্ম হিন্দু। এই হিন্দু নামকরণের সময় কালও বলা খুব মুসকিল। আনুমানিক বলে প্রসঙ্গান্তরে যেতে হয়,এও এক ব্যর্থতা।
'হিন্দু' শব্দটি কোনো ভারতীয় শব্দ নয়। আবার এও নয় কোনো সংস্কৃত বা প্রাকৃত বা দেশি শব্দ।
এই হিন্দু নাম এদেশে চালু হয় আরব-ইরাণ-তুরাণ থেকে আগত মুসলমানদের মুখে মুখে। তাঁরা আবার এই নামটি পেয়েছিলেন প্রাচীন ইরাণীয় নাম হিন্দু থেকে। যার আদি রূপ সিন্ধু। সিন্ধু নদের অববাহিকাকে জরাথুস্ত্রীয় ইরাণীরা বলতেন হিন্দু। যার প্রমাণ পাই ইরাণের সাশান বংশীয় জরাথুস্ত্র ধর্মাবলম্বী সম্রাট প্রথম সাপুর-এর ২৬২ খ্রিস্টাব্দের একটি শিলালিপি থেকে।
আবার এও মত চাউর হয় ইসলামরা নিজেদের ভারতীয়দের থেকে আলাদা করে বোঝানোর জন্য ভারতীয়দের হিন্দু নামে অভিহিত করেছিলেন। অবশ্যই দৃষ্টিভঙ্গি ধর্মীয়। এছাড়া আরেকটি মতও পাই সিন্ধু নদের পশ্চিম অববাহিকায় সীমাবদ্ধ ছিল ইসলামীয়রা। আর পূর্ব অববাহিকায় ভারতীয়রা, যাদের আলাদা করে বোঝানোর জন্য ইসলামীয়দের একটা মজ্জাগত উদ্দেশ্য তো বটেই, অভ্যাসও হয়ে গিয়েছিল।
প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক ইরাণ থেকে কেনই বা 'হিন্দু' নামের উৎপত্তি হল? প্রমাণ হিসেবে তথ্য বলছে,ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা বংশের শাখা ইরাণীয় আর্যভাষা ও ভারতীয় আর্যভাষা। আর্যদের একটি ভাগ ইরাণে, আরেকটি ভাগ ভারতে প্রবেশ করে। উভয়েই ছিল অগ্নির উপাসক। ইরাণীয় আর্যরা রচনা করেন 'আবেস্তা',আর ভারতীয় আর্যরা 'ঋক্ সংহিতা'। উভয় দেশের এই আর্যরা দেশ ও কালের পরিস্থিতির পার্থক্য অনুযায়ী তাঁরা আচরণগত দিক দিয়ে আলাদা হয়ে যান। যেমন-
আবেস্তা ও বেদে দেবাসুর নামের অর্থ বিপর্যয় ঘটল। ইরাণীয়দের কাছে 'অহুর'( দেবতা অহুর মাজদা), ভারতীয়রা তাকেই বলতেন 'অসুর' তথা দৈত্য। আবেস্তার 'দয়েব'(দৈত্য) বৈদিক ভাষায় হলো 'দেব'। আবেস্তার অগ্নি উপাসনা হল- আগুন জ্বালালেই উপাসনা । কিন্তু বেদে আগুনকে জ্বালানোর আগে অগ্নির কুন্ড করতে হয়,যার নাম যজ্ঞ বেদি। অগ্নির এই হল উপাসনার আলাদা বিধি। উপাসনাকে কেন্দ্র করে এই পৃথক বিধি বিধান থেকে তাঁরা নিজেদের আলাদা হিসেবে চিহ্নিত করলেন।
আবার পার্থক্যের কারণ - সিন্ধু পরস্পরের মাঝে বিভেদ প্রাচীর। তাই পূর্ব অববাহিকার আর্যদের নিজেদের থেকে আলাদা বোঝাতে সিন্ধু থেকে হিন্দু উচ্চারণ করত।
প্রথমদিকে ভারতীয়রা 'হিন্দু' নামটি দিয়ে নিজেদের পরিচয় ভাবত না। বিদেশীদের দেওয়া নাম গ্রহণেও প্রথম প্রথম আপত্তি ছিল। ক্রমে সিন্ধুর পূর্ব অববাহিকায় বৃহত্তর ভারতবর্ষে ইসলামরা যখন ছড়িয়ে পড়তে শুরু করল (কেউ শাসনের লোভে,কেউ বা লুঠপাটের নেশায়) তখন ধর্মের ভিত্তিতে 'হিন্দু' কথাটির ব্যপক প্রচলন ঘটে। এই ব্যাপকতা আরো তীব্রতর হয় যখন ধরে ধরে হিন্দুদের ইসলামে ধর্মান্তরিত করা হতে লাগল।
এ তো গেল 'হিন্দু' নামের রহস্য। তাহলে এই হিন্দুদের পরিচয় কী? তাই নিয়ে পরের পর্বে আলোচনায় আসছি।
(ক্রমশ)
@ copyright reserved for Mridul Kumar Das.
তথ্যবহুল সুন্দর লেখনী।
উত্তরমুছুনধন্যবাদ। শুভেচ্ছা।💫💫💥💥
মুছুনঅপূর্ব তথ্য সমৃদ্ধ লেখা। পরবর্তী পর্যায়ের অপেক্ষায় রইলাম।
উত্তরমুছুনধন্যবাদ। শুভেচ্ছা। অনুপ্রাণিত। 💫💫💥💥
উত্তরমুছুনখুব ভালো লাগলো দাদা 👌👌👌👌🙏🙏🙏
উত্তরমুছুনধন্যবাদ। শুভেচ্ছা।❤💫💫💥🤚
মুছুনভালোই চলছে এগিয়ে চলুন পরবর্তী পর্বের অপেক্ষায় রইলাম।
উত্তরমুছুনধন্যবাদ। শুভেচ্ছা।❤❤💫💫💥💥🤚
উত্তরমুছুনআরও পড়তে চাই।
উত্তরমুছুনআরও পড়তে চাই।
উত্তরমুছুনঅসাধারণ তথ্যবহুল লেখা, গুরুদেব 🙏
উত্তরমুছুনপরের পর্বের অপেক্ষায় রইলাম।
ধন্যবাদ শুভেচ্ছা। অভিনন্দন। ভালবাসা।❤💫💫💥💥
উত্তরমুছুন