বুধবার, ২ ডিসেম্বর, ২০২০

# বিষয় - 'হিন্দুধর্ম'

নাম - 'হিন্দু-হিন্দুত্ব এবং বিবর্তন'
   ✍মৃদুল কুমার দাস।
   
            ( ৩য় পর্ব )
আলোচনায় প্রথমে আসি ধর্ম গ্রন্থ না থাকার ফলে কি সুবিধা হয়েছিল।
সে অনেক সুবিধা। যেমন -
  ১। ধর্মগ্রন্থ ছিল না বলে সময়ের দাবীতে ধর্মগ্রন্থ সংস্কারের দাবি ওঠেনি।
২। হিন্দু জাতিকে পরজাতি নিপীড়ক,পর জাতি আগ্রাসক, ধর্মান্তরীকরণের বদনাম বইতে হয়নি।
৩। বরং গর্বের সঙ্গে বলতে পেরেছে হিন্দু ধর্ম পরম সহিষ্ণু। ধর্মের সঙ্গে ধর্মের লড়াইয়ের কথা বলেনি। এমনকি নিজেকে সবার থেকে শ্রেষ্ঠ বলে কখনই জাহির করেনি।
৪। ধর্মগ্রন্থ না থাকলেও হিন্দুধর্মের প্রকৃত শক্তির উৎস অধ্যাত্মবাদ। এই অধ্যাত্মবাদ থেকে জন্ম নিয়েছে মূল্যবোধ। এই মূল্যবোধই ধর্মগ্রন্থ না থাকার অভিমানকে অতিক্রম করে ভারতীয় সংস্কৃতির ভিৎ বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য রচনা করেছে।
  এই মূল্যবোধ এসেছে বেদ উপনিষদের শিক্ষাকে ভিত্তি করে। সেই ভিত্তি হলো ষড়দর্শন। যেমন - কপিলের সাংখ্য, পতঞ্জলির যোগশাস্ত্র, গৌতমের ন্যায়, কণাদের বৈশেষিক,জৈমিনীর পূর্ব মীমাংসা এবং ব্যাসের বেদান্ত।
এই সাংখ্য দর্শন প্রাচীন গ্রীসকেও প্রভাবিত করেছিল। এই দর্শনের ভাবধারার সক্রেটিস থেকে অ্যারিস্টটল পর্যন্ত হেরাক্লিটাস থেকে ডিমোক্রিটাস এপিকিউরাস পর্যন্ত প্রভাবিত হতে দেখা গিয়েছিল। সাংখ্য ঈশ্বর সম্পর্কে নীরব - Knowledge of virtueর সম্পর্ক জুড়েছেন। এই দার্শনিকের মতে নিবৃত্তিই জীবনের একমাত্র কাম্য কারণ জাগতিক জীবনে প্রাপ্তি দ্বারা আকাঙ্ক্ষার নিবৃত্তি হয় না। যেমন - খাদ্যে ক্ষুধার নিবৃত্তি,পানীয়ে তৃষ্ণার নিবৃত্তি হয় সাময়িক, কেননা এরা বারবার ফিরে আসে। তাই বলা হয় ভোগের মধ্যে নিবৃত্তি নেই। ত্যাগবৃত্তি অনুশীলনেই নিবৃত্তি আসে। তা আসে সৎকার্যের অনুশীলনের দ্বারা। তা থেকে আসে আনন্দ। এই আনন্দের মধ্যে থাকে প্রকৃত নিবৃত্তি। এই হল সাংখ্যের নীতিবাদ।
পতঞ্জলির যোগশাস্ত্র সাংখ্যের পরিপূরক। পতঞ্জলি যোগের প্রয়োগের কথা পাই উপনিষদ, মহাভারত,জৈন ও বৌদ্ধ দর্শনে। এই যোগশাস্ত্র চার অধ্যায়ে বিভক্ত - সমাধি, সাধনা, বিভূতি ও কৈবল্য। মানুষ নির্দিষ্ট পথে মনোসংযোগ করে কীভাবে পূর্ণতা বা কৈবল্য পেতে পারে যোগ তারই ব্যাখ্যা করে। দৈহিক ও মানসিক শক্তিকে সংযত ও সংহত করে তাতে পূর্ণতা প্রাপ্তির কথা বলা হয়েছে। আর তিনি কাজের পাঁচটি উৎসের কথা বলেছেন। যথা - রাগ,হিংসা,আমিত্ব, অবিদ্যা ও অভিনিবেশ। অভিনিবেশ অর্থাৎ মৃত্যুভয় আসে বেঁচে থাকার প্রবৃত্তি থেকে। বস্তুজগতের সঙ্গে যোগ ঘটে অবিদ্যা থেকে বিদ্যা দিয়ে। আর রাগ, হিংসা, আমিত্ব - এই সব অবিদ্যার প্রবৃত্তি,যা পার্থিব সুখভোগে উৎসাহিত করে। তাই সকল দুঃখের কারণ হয়ে ওঠে। তা থেকে মুক্তির পথ হলো যোগ। যোগ আনে ত্যাগের নিষ্কাম নিবৃত্তি। তা থেকে আসে আনন্দ। এই ত্যাগ ও নিষ্কাম কর্মই হল ভারতের বাণী। আর এই যোগসূত্রের প্রয়োগ করার আটটি উপায় আছে। যথা - যম,নিয়ম,আসন, প্রাণায়াম, প্রত্যাহার, ধারণা, ধ্যান ও  সমাধি। এই আটটি বিধি দিয়ে আমরা আমাদের ভেতরকার অবচেতন মন (sub- conscious mind) ও ক্লেশ ধ্বংস করতে পারি।
এবার আসি গৌতমের ন্যায়সূত্রের কথায়। ন্যায় দর্শন বলেছে ঈশ্বর পরম পুরুষ। তিনিই সৃষ্টির প্রধান হোতা। আর এই সৃষ্টি ও স্রষ্টার ভেতরকার রহস্য অনুধাবন করতে পারলে আত্মার মুক্তি ঘটে। প্রথম গ্রন্থ গৌতমের 'ন্যায়সূত্র'। তারপরে একে একে যেমন বাৎসায়ণের 'ন্যায়ভাষ্য',উদ্যোতকারের 'ন্যায়বর্তিকা', বাচস্পতিরও 'ন্যায়বর্তিকা',... আর নবদ্বীপে বাসুদেব সার্বভৌমের 'তত্ত্বচিন্তামণি'।
বৈশেষিক প্রণেতা কণাদের 'বৈশেষিক সূত্র'। ন্যায়ের বিস্তারিত আলোচনাই হলো বৈশেষিক। ন্যায় ও বৈশেষিক দর্শনকে বলা হয় অসৎকার্যবাদ। ন্যায় ও বৈশেষিক দর্শন উভয়েই বেদের অনুমোদিত কার্য সম্পন্ন করাই নীতি ধর্ম বলে প্রচার করেছে।
আর পূর্ব মীমাংসা বৈদিক বিধিনিষেধ ও ক্রিয়াকান্ডের ব্যাখ্যামূলক দর্শন। এই দর্শনের আদিগ্রন্থ জৈমিনীর 'পূর্ব-মীমাংসা সূত্র'। 
     ব্রাহ্মণ্য ধর্মের যখন যায় যায় অবস্থা,বুদ্ধদেব ব্রাহ্মণ্য ধর্মের অরাজকতার হাত থেকে মানুষকে রক্ষা করেছিলেন তাঁর 'ত্রিপিটক' ও 'ধম্মপদ'- এ যাগজ্ঞ,বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ালেন বলে। আর মানুষকে মুক্তির পথ দেখালেন। বুদ্ধদেব না এলে ব্রাহ্মণ্য ধর্ম যে অরাজকতার মধ্যে যাচ্ছিল তার হাত হতে রক্ষা পাওয়া খুব মুসকিল ছিল। বুদ্ধের জন্যই ব্রাহ্মণদের খুব দুর্দিন ঘনিয়ে এলো। ভবিষ্যত নিয়ে তাঁরা বড়ই শঙ্কিত হলেন। যখন এই ত্রিপিটক ও ধম্মপদকে সামাল দিতে 'শ্রীমদ্ভাগবৎ গীতা' ও 'উপনিষদ'  জ্যোতির্ময় পুরুষের কথা তুলে ধরা হলো তখন বুদ্ধ চুপ করে রইলেন। বর্ণাশ্রম ধর্মের একটা আধ্যাত্মিক ভিত্তি রচিত হয়েছিল বলে। এই ব্রাহ্মণ্য ধর্ম সলিল সমাধি থেকে উদ্ধার পেল। এছাড়া কুমারিল ভট্টও তাঁর বৈশেষিক গ্রন্থ 'শ্লোকবর্তিকা' 'তন্ত্রবর্তিকা'... গ্রন্থ দিয়েও ব্রাহ্মণ্য ধর্মকে বাঁচিয়েছিলেন। স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ গীতায় ভক্তিযোগের মোক্ষম প্রয়োগের কথা বলেছিলেন বলে বুদ্ধ চুপ করে ছিলেন। গীতার এই ভক্তিযোগই আনল দেবালয় বানিয়ে বিগ্রহ পূজো করা। এই বিগ্রহ পূজো অবশ্য বৌদ্ধদের কাছ থেকে নেওয়া। বুদ্ধের মূর্তি গড়ে পূজা প্রচলন বৌদ্ধরাই প্রথম শুরু করেছিলেন। অবশ্য এই মূর্তি পূজোর বুদ্ধিটা ভারতীয় নয়,গ্রীক পৌত্তলিকতা থেকে নেওয়া। এই মূর্তি পূজোর প্রচলন হয় গুহা মন্দির ও খাড়া মন্দির বানিয়ে। মন্দির প্রতিষ্ঠার সাথে যাগযজ্ঞের রীতি রেওয়াজ অনেকটাই থিতিয়ে গেল। উত্তরে গুহা মন্দির,আর দক্ষিণে খাড়া মন্দির ( যা স্থপত্য ভাস্কর্যের নিদর্শন)। মন্দির প্রতিষ্ঠার সাথে সাথে বৈদিক যুগের অবসান ঘটল। এলো পৌরাণিক যুগ। সে খ্রীষ্টপূর্ব ২০০ শতকের পর। এই সময় আবার রচিত হয়েছিল মনুর 'মনুসংহিতা' বা মানবধর্মশাস্ত্র। তার আগে তাহলে বেদান্ত যুগের ভূমিকা কী ছিল তা জানা দরকার। 
সবচেয়ে জনপ্রিয় হল বেদান্ত দর্শন বা ব্রহ্ম মীমাংসা। বেদান্তের শিক্ষাই সমাজ ও পরিবাকে সঠিক পথ দেখিয়েছিল। বেদান্ত সূত্রের চারটি অধ্যায়। প্রথম অধ্যায়ে ব্রহ্মকে পরম সত্য বলে জানা। দ্বিতীয় অধ্যায়ে বিরুদ্ধ মতের খন্ডন। তৃতীয় অধ্যায় ব্রহ্ম বিদ্যালাভের উপায়। আর চতুর্থ অধ্যায়ে ব্রহ্ম বিদ্যা লাভের ফলাফল লেখা আছে। এই বেদান্ত সূত্র উপনিষদের তত্ত্বানুসারী।
ব্রহ্ম এক। এই মায়াময় ব্রহ্মাণ্ডে তিনি বিভিন্ন রূপে প্রকট হন। জগৎ ততক্ষনই সত্য যতক্ষণ না আমরা ব্রহ্মকে উপলব্ধি করতে পারছি।
পরবর্তীকালে এই বেদান্ত দর্শনের বিভিন্ন ব্যাখ্যা দেখতে পাই। যেমন - ভাস্করের ভেদাভেদবাদ,রামানুজের বিশিষ্টাদ্বৈতবাদ.... গৌড়ীয় বৈষ্ণবগণের অচিন্ত্যভেদাভেদবাদ।
  শঙ্করাচার্য অদ্বৈত বেদান্তের অবিদ্যাকেই কর্মের উৎস বলেছেন। কর্ম কামপ্রসূত। অর্থাৎ কামনা থেকে যা সৃষ্ট। এই কামনা অবিদ্যাপ্রসূত। এই অবিদ্যা হল জাগতিক জড় ও জৈবের মধ্যে একাত্মবোধ। তাই কামনা বা এষণা থেকে কর্মে প্রবৃত্তি জাগে। এই এষণা ত্রিবিধ - পুত্রৈষণা (sex), বিত্তৈষণা( material gain),লোকৈষণা (will to pleasure) - এই এষণা অবিদ্যাপ্রসূত। বৌদ্ধধর্মে এই এষণাকে 'তহ্না'(তৃষ্ণা) বলা হয়েছে। যা সকল দুঃখের কারণ। 
সৎকার্য দ্বারা গুণ ও ধর্ম লাভ করা যায়। আর অসৎ কর্মের দ্বারা পাপ ও অধর্ম অর্জিত হয়। এই গুণ ও ধর্মই হলো সুখ দাতা। আর পাপ ও অধর্ম দুঃখ দাতা। অর্থাৎ গুণার্জন ব্যতীত সুখ লাভ হয় না,দোষ ব্যতীত দুঃখ লাভ হয় না।
তাই জীবনের কাম্য চারটি বিষয় - ধর্ম,অর্থ,কাম, মোক্ষ। অর্থ জাগতিক আকাঙ্ক্ষা পূরণ করে। কাম মানসিক আকাঙ্ক্ষা পূরণ করে। ধর্ম মানবিক ও সামাজিক আকাঙ্খা,আর মোক্ষ আনে আত্মিক আনন্দ। মোক্ষই জীবনের পরম পাওয়া, তাই দেয় পরমানন্দ। বাকি তিনটি জাগতিক গুণাগুণের অধীন। বুদ্ধ এই পরমানন্দের কথা বলেছেন। আত্মা পরমানন্দের পথে মুক্তি পায়। বার বার আর জন্ম নিতে হয় না। তাই হল মানব জীবনের শ্রেষ্ঠ কাম্য। জাগতিক ধর্মাধর্মের উর্ধ্বে উঠে মানবাত্মাকে পরম ব্রহ্মের সঙ্গে লীন হয়ে অভেদাত্মা লাভ করতে হবে। তাই মানব জীবনের পরম পাওয়া ও তাই হল পরমানন্দ। বৌদ্ধধর্মের এই হল মূল কথা।
এইভাবে আধ্যাত্মিক জীবন থেকে মূল্যবোধ লাভই হল ভারতীয় দর্শনের মূল কথা। বৈদিক সভ্যতাই এই মূল্যবোধের পথ দেখিয়েছে। বৈদিক ব্রাহ্মণ তথা হিন্দু তার পরিচালক। ক্রম বিবর্তনের ধারায় আরো অনেক ধর্ম এসে ভারতীয় দর্শনে মিলিত হয়েছিল। যা পাশ্চাত্যে পর্যন্ত এই মূল্যবোধের প্রভাব পড়েছিল এবং পাশ্চাত্য ঋণ স্বীকার করতেও ভুল করেনি। তাই প্রাচীন ধর্মগুলির( খ্রিস্টান,পারসিক,ইসলাম ...) সমসাময়িক হয়েও নিজস্ব ধর্মগ্রন্থ না থাকা সত্ত্বেও বিশ্বব্যাপী কি বিপুল প্রভাব বিস্তার করেছিল হিন্দুধর্ম তার নীতি শাস্ত্রগ্রন্থগুলির দ্বারা! হিন্দু ধর্মের এই নীতিশাস্ত্র একজায়গায় থেমে থাকেনি। সময়ে সময়ে রচিত বলে বহুত্ববাদ তার ভিত্তি। আর এই ভিত্তিই তাকে দেখিয়েছে বিবর্তনের পথ। তাই সময়ের সাথে সাথে নিজেকে বদলে নিতে পারার সহিষ্ণুতা তা থেকেই এসেছিল। নিছক কোনো মতে নিজেকে আটকে রাখেনি বলেই বিবর্তন প্রক্রিয়া তার ভেতরে প্রধান শক্তি জুগিয়েছে। সৌন্দর্য দান করেছে। 
কি সেই বিবর্তনের প্রক্রিয়া ছিল,যার জন্য পাশ্চাত্য অনেক কিছু শিখেছিল! এই বিবর্তনের পরিচয় নিয়ে আলোচনা পরের পর্বে। সেই সঙ্গে বৈদিক যুগে নারীর অবস্থান কেমন ছিল তা নিয়েও আলোচনা হবে।
                      ( চলবে )
@ copyright reserved for Mridul Kumar Das.

১১টি মন্তব্য:

  1. দারুণ তথ্যবহুল লেখনী । অনেক ধন্যবাদ দাদা🙏

    উত্তরমুছুন
  2. ধন্যবাদ। শুভেচ্ছা। অভিনন্দন ❤💫💫💥💥😆😆

    উত্তরমুছুন
  3. অনির্বচনীয়।কতটা যে আমাদের মূলে নিয়ে যাচ্ছেন তা হয়ত আপনিই জানেন না দাদা।

    উত্তরমুছুন
  4. লেখায় স্রোত আছে। ভাসছিল এখন।

    উত্তরমুছুন

শিরোনাম - দুরত্ব✍️ ডা: অরুণিমা দাস

 শিরোনাম - দুরত্ব ✍️ ডা: অরুণিমা দাস আধুনিকতা মানেই অন্যরকম একটা ব্যাপার, উন্নতির পথে এগিয়ে যাবার সিড়ি তৈরি করে দেয় আধুনিকতা। আজকাল কেউ আ...