বুধবার, ২ ডিসেম্বর, ২০২০

খড়ের চালায় টপছে জল

 বিষয় # প্রবন্ধ  

❣❣❣❣❣❣❣❣❣❣❣❣❣❣❣❣❣❣❣❣❣❣❣




গ্রাম মানেই অপূর্ব সবুজ

গ্রাম মানেই দৃষ্টি মধুর

গ্রাম মানে কুঁড়ে চালা ঘর, 

পুকুর ভরা শাপলা ফুলে

শরতের হাঁক ডাক। 


খড়ের চালায় টপছে জল

পুকুর ভরা সোনা টলমল, 

ঘোমটা দেয়া কলসী যায়

সাঁঝ বেলা শাঁখের ফুক

ওরে আমার বাউরী মেয়ে

মনে কেন এত দুখ? 


ঠিক তাই গ্রাম শুধু সৌন্দর্যের স্বপ্ন ঘেরা জাদু বাক্স নয়। আছে ছোট  দুখের গল্প ভরা। আছে ঘৃনা বিতৃষ্ণা রাজনীতি চেঁচামেচি হতাশা। আছে ভালবাসার বৈধ অবৈধ গল্পে ভরা যাপন গাথা। আছে বেঁচে থাকার নিরলস প্রচেষ্টা। আছে আবেগ আছে জয় আছে চিতা। 

আমার গ্রাম বাংলা এমন একটা জীবন্ত চালচিত্র। ঘটে চলা ঘটনার নিরবিচ্ছিন্ন মালা। প্রতি নিয়ত তার স্বতঃস্ফুর্ত বিকাশ। এক সময় শিক্ষিতের সংখ্যা খুব কম ছিল। শুনেছি ম্যাট্রিক পাশ একজনকে আশে পাশের অনেক গ্রাম থেকে প্রচুর মানুষ দেখতে এসে ছিল।  সেই গ্রাম এখন ঘরে ঘরে স্কুল কলেজে যাওয়া গ্রামবাসী অনেক নতুন নতুন দিশার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। গ্রাম তখন কিছু মানুষের হাতে চলত কিছু মানুষ তার রূপায়নে বুদ্ধি এবং পয়সা ঢালত।তখনকার পরিবেশে পারিবারিক বোধ সম্বন্ধে স্বাধীনতা ছিল  আবেগ ছিল। হয়ত জন সংখ্যা কমের কারনে একটা সুন্দর আঙ্গীক দিতে পেরেছিল। দূর্গা পুজার শৈল্পিক উৎসব পরিচালনা তার প্রমাণ। এখনও দূর্গা আসেন হৈ চৈ প্রানের আবেগ সব আছে। তবে সেই  মৌলিক শিল্পবোধে কোথাও যেন ঘাটতি চোখে পড়ে, সহুরে রুচিবোধের অনুকরণ যেন। আমার কাছে বেসুরা লাগে। মনে হয় এখনকার গ্রামীন জীবনে সহুরে  ছায়া। সাঁওতাল মেয়ে খোঁপায় কাঠের চিরুনির বদলে প্লাস্টিকের চিরুনি দেয়। কেমন যেন একটা বেখাপ্পা ভাব। গ্রামের সেই সতেজতা চলে গিয়ে রাজনৈতিক থাবা। আবেগের বদলে মেকি হৃদ্যতা যায়গা করেছে। 


গ্রামের ক্লাব ঘরে লাইব্রেরি হবে। ঠিক করা হল সর্বক্ষণ থাকবে গোবেচারা গৌর , লাইবেরিয়ান বলা হবে। সেই সামান্য লাইব্রেরি, বুর্জোয়া দখলদারি হিসেবে চিহ্নিত করে ভাগ হয়ে গেল দুই দল। উঠতি গ্রামীণ মানুষ আর পুরানো গ্রাম কল্যাণ শাখা।আগের বছর যারা দশমীতে একে অন্যের বাড়ি গিয়ে মিষ্টি প্রনাম বিনিময় করেছে। তারাই হয়ে উঠল একে অন্যের শ্রেণী শত্রু। সেই প্রথম রাজনীতি আঁচড় দিল গ্রামটায়। এখন শ্রেণী নেই কেবল শত্রুই শত্রু " তোরা আমরা" । সুবিধার্থে আমার তোমার। না পোশালে  কে কার? ঘর যা। রবীন্দ্রসঙ্গীত এখন হাজুর নতুন তোলা কোঠা বাড়ি, যার চাল টিনের ওখানে বাজে। ক্লাস তৈরির আপ্রাণ চেষ্টা। খোলা সমাজ একে একে অনুসরনের থেকে অনুকরনের দিকে নজর দেয় বেশি। তোমার আছে আমার নেই থেকে এই মনোভাবের প্রাদুর্ভাব ঘটে। আমাদের চাষ করা চাচার কিছুই ছিল না। "বাবু" বলত কিন্তু তার নিজস্ব একটা আত্মসম্মান ছিল। এবং  নানা সম্বোধনে সবাই তা রক্ষা করে চলা হত। চাচা কখনও অন্ধ অনুকরনে নিজেকে হাস্যকর করেননি। অনেকে প্রশ্ন করবেন তবে কি নীচু হয়ে হত দরিদ্র হয়ে কাটিয়ে দেবে, পরিবর্তন আসবে না! ঠিকই তো যুগের সাথেই তাল মিলিয়ে চলাই তো জীবন। 


এখনকার গ্রাম কাদায় হাঁটি না। সিমেন্টের পথ এগিয়ে গেছে অনেক ভেতর। বাল শিক্ষা ব্যবস্থা চলছে। ছেলে মেয়েদের হাতে মোবাইল। ঘরে টিভি। প্রত্যেকে বাংলা নয় ইংরেজিতেও সাক্ষর করে দিতে পারে। হিন্দিগানে গুনগুনায়। সাত পুরুষের নাম ভুলে যায় শ্রাদ্ধে মন্ত্র পড়ে ' এঃ বচ'। সামান্য একটু পয়সা হলেই বিশাল বিবাহ অনুষ্ঠিত হয়। জীবন এখন দেখাদেখির ওপর বিরাজমান। তবু যা আজও অক্ষুন্ন গ্রামের হাওয়া। কার ঘরে কি হল ভেসে বেড়ায়। জীবন চরৈবতি । কত ঘটনা মুড়ে তৈরি হচ্ছে মর্ডান গ্রাম। আমার গ্রাম তোমার গ্রাম। 


তবু ভালবাসা আছে। তবু প্রেম করে ময়না, পথের ধারে সাইকেলের হান্ডেলে হাত দিয়ে। ছোট নদী পলি পড়ে বর্ষায় টোইটুম্বুর হয়ে বান ডাকে। খাল ভরে গেছে প্লাস্টিকে, চাষের জন্য জল কি করে আসবে ভাববে পঞ্চায়েত। ভোট দি ভাই.... গ্রাম নিয়ে ভাবুক ওরা। অবৈধ পোল করে খাল বন্ধ... দরকার বা কি! চাষাবাদই একে একে উঠে যাচ্ছে। জল নালী ঠিক থেকে লাভ কি? গ্রামের চড়ক বৈশাখের মেলার থেকে মহকুমায় হস্তশিল্প মেলার চাউমিন বেশি স্বাদের হয়। ওখানে ছুটি নতুনের খোঁজে। গ্রাম জীবন এখন ফুল স্পিড নিয়েছে সভ্যতার নেশা। ছুঁতে হবে মায়ামৃগকে। সম্পূর্ণভাবে ছুঁলে আমার গ্রাম হয়ত হারিয়ে যাবে। 


আমার গ্রামের আটচালায় মা দুগ্গা আসে

আমার গাঁয়ে শালুক বনে ফ্ল্যাট গজিয়ে ওঠে। 

রাশোন মিয়াঁর গোয়াল ফাঁকা 

বাঁঝা চাষ চলছে বারো মাস, 

কালো ধোঁয়ায় বুক ভরেছে.. 

বুকের ভেতর কেবল হাঁপোর টান।। 


ধন্যবাদ....... 


শর্মিষ্ঠা ভট্ট 🖋

৬টি মন্তব্য:

শিরোনাম - দুরত্ব✍️ ডা: অরুণিমা দাস

 শিরোনাম - দুরত্ব ✍️ ডা: অরুণিমা দাস আধুনিকতা মানেই অন্যরকম একটা ব্যাপার, উন্নতির পথে এগিয়ে যাবার সিড়ি তৈরি করে দেয় আধুনিকতা। আজকাল কেউ আ...