মঙ্গলবার, ১ ডিসেম্বর, ২০২০

মায়ের আঁচল(সুদেষ্ণা দত্ত)


 মায়ের আঁচল(সুদেষ্ণা দত্ত)

অণু গল্প

             তমসার শ্বশুরবাড়ীতে আজ সাজসাজ রব।বিয়ের ৫ বছর পর মা হতে চলেছে তমসা।আজ ওর সাধ।ভারী শরীর আর ভারী কাঞ্জিভরম শাড়ীতে জবুথবু তমসা।সমস্ত নিয়ম ও খাওয়াদাওয়া মেটার পর সবাই একটু হাল্কা চালে, হঠাৎই একটা জোর শব্দে সচকিত হয় সবাই।দেখে দো’তলায় উঠতে গিয়ে শাড়ীতে পা আটকে পড়ে গেছে তমসা।তৎক্ষনাৎ ডাক্তারখানায় নিয়ে যাওয়া হয় তাকে।প্রাথমিক কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর দেখা যায় তমসা মোটামুটি সুস্থ আছে।আর বাচ্চারও হৃৎস্পন্দন পাওয়া যাচ্ছে।সকলেরই প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়া হৃৎপিণ্ডে প্রাণসঞ্চার হয়—এ যেন প্রচন্ড দাবদাহের পরে এক পশলা বৃষ্টির শান্তি।

          চাতকের জল চাওয়ার মত সেই বহু প্রতীক্ষিত দিন আজ উপস্থিত।হাসপাতালে ভর্তি করা হয় তমসাকে।একটি ফুটফুটে পরীর মত মেয়ের জন্ম দেয় তমসা।কিন্তু জন্মের পর বাচ্চার শরীরে কিছু অসঙ্গতি দেখা যায়।দু’দিন পর অপরিণত অবস্থাতেই মায়ের ডানার আশ্রয় ছেড়ে পরীদের দেশে পাড়ি দেয় সে।ডাক্তারবাবু জানান সিঁড়ি থেকে পড়ে তমসার স্পাইনাল কর্ডে আঘাত লাগায় শিশুটির মাথায় আঘাত লাগে।স্বভাবতঃই সবাই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে যায়।বছর দু’য়েক পর তমসা ও তার স্বামী তমাল আবার বাচ্চার জন্য চেষ্টা করার পরিকল্পনা করে।ডাক্তারের কাছে গেলে তিনি জানান তমসার ওভারি ও ইউটেরাসে বাসা বেঁধেছে একাধিক টিউমার এবং ডাক্তারবাবু তমসার মা হওয়ার আকাঙ্ক্ষায় জল ঢেলে দিয়ে কিছু দিনের মধ্যেই তমসার ওভারি ও ইউটেরাস বাদ দেন।চরম মানসিক অবসাদে ভুগতে থাকা তমসা পরিবার-পরিজন থেকে নিজেকে ক্রমশঃ দূরে সরিয়ে নেয়।সমাজ-স্বজনদের আসল চেহারাও তার সামনে পরিষ্কার হয়ে যায়।কিন্তু তমসার স্বামী তমালের তমসার প্রতি ভালবাসা একটুও কমে না,সে ক্রমাগত চেষ্টা করে তমসাকে অবসাদ থেকে বার করে আনতে।

              তমসা গৃহবধূ।কিন্তু তমসার অনেক বন্ধুই কর্মরতা।তাই তারা তমালের সঙ্গে পরামর্শ করে দু-একজন তাদের বাচ্চাকে কর্মক্ষেত্রে যাওয়ার আগে তমসার কাছে রেখে যায়।তমসাও মা ডাক শুনতে না পারার যন্ত্রণা থেকে ধীরে ধীরে মুক্তি পেতে থাকে।প্রয়োজনের তাগিদে ধীরে ধীরে অনেক শিশুরই জায়গা হয় তমসার ‘মায়ের আঁচল’ এর আশ্রয়ে।কিন্তু সব শিশুই এখানে পরিযায়ী।নির্দিষ্ট সময় পর সবার থাকে বাসায় ফেরার তাগিদ।কিন্তু লোপা নামে একটি ফুটফুটে শিশু ত ‘মা’কে মায়ার বাধঁনে আষ্টে-পৃষ্টে জড়িয়ে ফেলে।তমসাও লোপার মধ্যে তার হারানো মেয়েকে খুঁজে পায়।আজ তমসা বৃদ্ধা।কিন্তু লোপা আজও তার যশোদা ত ‘মা’র প্রতি তার সন্তান হওয়ার দায়িত্ব-কর্তব্য পালন করে যায়।আজ লোপার মেয়ে অদ্রিজার জন্মদিনে পায়েস দিতে দিতে তার গ্র্যানি তমসা ভাবে ‘ভালবাসা জীবনে বার বার আসে’।তমসার দু’চোখ বেয়ে আনন্দাশ্রু বইতে থাকে।

©All copyrights are reserved by Sudeshna Dutta


৩৩টি মন্তব্য:

  1. খুব সুন্দর লাগল। ধন্যবাদ। 👌👌💫💫💥💥💯💯

    উত্তরমুছুন
  2. মন ছুঁয়ে গেলো.... নারী জীবনের এক নির্মম বাস্তবের সাথে ভালোবাসার মেলবন্ধন ঘটিয়ে এত্ত সহজ সরল ভাবে উপস্থাপন করার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। আরও লেখা পাওয়ার অপেক্ষায় রইলাম....🙏🏼🙏🏼🙏🏼

    উত্তরমুছুন
  3. তমসার মতো হাসবেন্ড সব ঘরে ঘরে হোক।তাহলে কিছু হলেও সন্তান না হওয়ার কষ্ট কিছুটা উপশম হবে। কি দারুণ লিখেছো❤

    উত্তরমুছুন
  4. দিদিভাই, এত সুন্দর লেখাটা। একটা মানুষের মোটামুটি পুরো জীবনটা খুব সুন্দর ভাবে ব্যক্ত করেছো একটা অনুগল্পে। মনে খুবই দাগ কাটলো। মনে হচ্ছে তমসার জীবনটা যেন চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি। ওর আনন্দে চোখে জল এসে গেল। আশা করি তুমি আরো এইরকম অনুগল্প লিখে আমাদের মন ভরিয়ে রাখবে।

    উত্তরমুছুন
  5. গল্পটি পড়লাম খুবই ভালো লাগল। আগেরদিন তোমার রচিত কবিতাটিও খুবই ভালো লেগেছিল। যাকে বলে সময়োচিত পরিবেশন।
    যাক ক্রমশঃ প্রকাশিতব্যর মতো এগিয়ে চলো।
    শুভেচ্ছান্তে~তুষার কাকু।

    উত্তরমুছুন
  6. বাস্তব জীবনের প্রতিচ্ছবি পেলাম...সুন্দর লিখন শৈলী

    উত্তরমুছুন
  7. সু, কি সুন্দর গল্প লিখেছো। খুব ভালো লাগলো।👌👌

    আরও পাওয়ার আশায় রইলাম।😍

    উত্তরমুছুন
  8. খুব সুন্দর লিখেছো বন্ধু।❤️❤️❤️

    উত্তরমুছুন
  9. দারুণ ভালো লাগল । মন ছুঁয়ে যাওয়া একটা গল্প ।

    উত্তরমুছুন
  10. ভীষণ সুন্দর হয়েছে ম্যাম

    উত্তরমুছুন
  11. খুব ভালো লাগলো ম্যাম। খুব সুন্দর লিখেছেন।
    - বর্ষা

    উত্তরমুছুন
  12. শূণ্যতার থেকে পূর্ণতার দিকে যাত্রা, যাত্রী তমশা আর বাহন সুদেষ্ণা...

    উত্তরমুছুন
  13. সত্যের সন্ধানে আমার বোন।।।। খুব সুন্দর

    উত্তরমুছুন

শিরোনাম - দুরত্ব✍️ ডা: অরুণিমা দাস

 শিরোনাম - দুরত্ব ✍️ ডা: অরুণিমা দাস আধুনিকতা মানেই অন্যরকম একটা ব্যাপার, উন্নতির পথে এগিয়ে যাবার সিড়ি তৈরি করে দেয় আধুনিকতা। আজকাল কেউ আ...