মঙ্গলবার, ১ ডিসেম্বর, ২০২০

নীল রঙের স্বপ্ন

 দিল্লি ইউনিভার্সিটির লনে নীল অগ্নিহোত্রীর সাথে দেখা হয়েছিল। গ্রুপ থিয়েটারের রিহার্সাল করছিল। পথ নাটিকায় তাদের অসম্ভব সুন্দর পার্ফরমেন্স দেখে নীলাঞ্জনা মুগ্ধ হয়েছিল। যদিও ছেলেটার সাবজেক্টের সাথে তার জমিন আসমান ফারাক ছিল, তবু কেমন যেন আকর্ষণ অনুভব করত । আজন্ম বাঙলার বাইরে থাকা প্রবাসী বাঙালী নীলাঞ্জনার হোম সিটি ইন্দোর। মধ্যপ্রদেশ ওর নিশ্বাসের সাথে মিশে গেছে। তাই "নন বেঙ্গলি " ব্যবধান বা ধারনা তার মধ্যে ঠিক আসেনা। নীলাঞ্জনারা দাস। 


ইউনিতে থাকতে দু বছরের সিনিয়র নীল একটু কাছে এসেছিল, ঠিক বন্ধু আর প্রেম সম্পর্কের মধ্য এক লালা ল্যান্ডে। ভালো লাগত ওর গা ছুঁয়ে বসে রিহার্সাল দেখা, কিংবা হস্টেলের গেটে পৌঁছে দেওয়া, কিংবা ক্যান্টিনে তুমুল ঝড় তোলা মুহুর্তে চোখাচোখি, ব্যাস ওই টুকুই। আর্টের ছেলে... শিল্প জীবন করে নীল অগ্নিহোত্রী ভেসে গেল প্যারিস নিউইয়র্ক করে পৃথিবীর অলিতে গলিতে। কখন ধুলো পড়ে গেছে সেই অর্ধপরিবাহী সম্পর্কে। আদৌ কি সম্পর্ক ছিল! নীলাঞ্জনা জীবনের লড়াইয়ে ভুলে গেছে। 


এমবিএ, অফিস, প্রমোশনের সাথে নীলাঞ্জনা একটা ঝাঁ চকচকে অফিসের চিফ এক্সিকিউটিভ। নামের সাথে গর্জাস জীবন মুম্বাই কোলাবা। অফিসের ভেতরে এক স্থাপত্য নতুন বসানো হবে, তার প্রয়োজনে নীল অগ্নিহোত্রী আবার নীলাঞ্জনার সামনে। একটু বেশি স্মার্ট আর চুপ হয়েছে। আরও হ্যান্ডসাম বলা যায়। চোখটা তেমন আছে আবেগী। তবে আরও উদাস হয়েছে। অফিসের কাজে দেখা আবেগ চেপে রাখে নীলাঞ্জনা। ফোন নম্বর পেল, অফিস থেকে ফিরে ফোন লাগায়। ওপাশ থেকে আওয়াজে সামান্য শ্লেষ.... " চিনেছো তবে"

"না চেনার কি আছে? একই তো আছো। "

" তুমি কিন্তু অনেক চেঞ্জ হয়েছো, অনেক আকর্ষণীয়া। "

" ডিনার করবে? "

" তোমার লেবেলে যদি ঘা না লাগে "

" যাঃ, অফিসে গসিপ চাইনি তাই, এত দিন পরে দেখা! "

" মনে আছে কিছু? "

" আছে, তোমার সান্নিধ্যে একটা আকর্ষণ ছিল, তুমি তখন তুমুল শিল্পী, আমাদের হার্টথ্রব। আমরা তখন শিশু গন্তব্যে নেই। তুমি মনে রাখবে ভাবিনি নীল। ভাবলাম ফোন করলে চিনতে অসুবিধা হবে। "

" যদি বলি তোমার চুলের মিষ্টি গন্ধ এখনও মনে আছে, অবাক হবে? রিহার্সালে আমায় ছুঁয়ে তোমার খোলা চুল কথা বলত। মনে পড়ে। "

আজ ও দীর্ঘ আট বছর পরেও এই কথায় বুক কাঁপে। কেন যে বত্রিশ বছরের নীলাঞ্জনা এখনও বিয়ে করেনি জানে না। আসলে এ বিষয়ে তেমন করে ভাবেই নি। পদ আর অর্থের পেছনে কি সে তবে বৃথাই দৌড়েছে! না তা কেন?  এই পরিচয়ের তো দরকার ছিল। কিন্তু আজকাল বড়ো একা লাগে, মনে হয় কারও জন্য ঘরে ফিরতে। কেউ তার অপেক্ষায় থাকুক, কেউ তার চুলের গন্ধে বলুক থাকনা ওটা খোলাই থাক না। " কোথায় আসবে? কটায়?খোলা চুলে এসো " নীলের গলার আওয়াজ, নীলাঞ্জনা যেন ঘোরের মধ্যে বলে, " এ্যাঁ নটা ঠিক হবে না? তুমি গেস্ট হাউসে আছো তো, ওখান থেকে তুলে নেব? "


অনেক অনেক দিন পর নিজেকে দেখে নীলাঞ্জনা। সত্যি সে আকর্ষণীয় হয়েছে! লাল মেরুন সিফন  স্লিভলেস ব্লাউজ হল্কা সাজ। নীল পাশে। একটা মায়াবী সন্ধ্যা , ছাড়তে ইচ্ছা করে না এ সময় আর নীলকে। এমন কটা ডিনার, নীলকে এখন নীলাঞ্জনা ফ্ল্যাটে নিয়ে এসেছে । ওর বিদেশে শিল্প ওয়ার্কশপ আছে, দেশ বিদেশের ভষ্কর্য তৈরি কেনা বেচা সেই নিয়ে পড়াশোনা সেমিনার ও নতুন শিল্পীদের জায়গা করে দেওয়া নীল অগ্নিহোত্রীর কোম্পানির কাজ। নীলাঞ্জনা বিস্মিত হয় শিল্প নিয়ে ওর চিন্তা ভাবনা দেখে। কখনও ও কোন ইন্সটিটিউশনে লেকচার দিতেও যায়। নাটক চলছে পাশাপাশি। ল্যাপটপ খুলে নীলাঞ্জনার খাটে ওর খোলা পেটে মাথা দিয়ে বোঝায় সব। নীল নেশা এনে দিয়েছে জীবনে। ওর চুলে বিলি কাটছে নীলাঞ্জনা। দুজনেই বেড সেয়ার করেছে আনন্দে, গভীর আবেগে। কোন বন্ধন ছাড়া এক রিলেশন বিশ্বাস করে নীল, নীলাঞ্জনা মেনে নিয়েছে। না কোন বন্ধন নয়, এক অবাধ মিলন আর নেশা ডোবা দৈহিক মানসিক আকর্ষণ ছাড়া জীবনের  পাত্র পূর্ণো হয়ে উথলে উঠবে কি করে! বেশ কিছু মাস নীল অগ্নিহোত্রীর আদরে লতপত হয়ে তাকে মুক্তি দিল। মন খারাপ ছিল কিন্তু আঁটকায়নি। তেমন প্রটেকশন কিছু না নিলেও পিল নিত নীলাঞ্জনা। অবাঞ্ছিত কোন বন্ধন তারা চায়নি। এ বেশ ভালো হল। আবার কোন ঝড়ের রাতে হয়ত নীল কড়া নাড়বে! নীলাঞ্জনা এখন কানায় কানায় পূর্ণ, নতুন উদ্যোগে অফিসের নতুন ব্রাঞ্চের সর্বাধিকারী হতে পারবে। ভালো লাগছে স্বপ্ন নীল এই দিনগুলোকে বার বার উলটে পলটে দেখতে। 


হঠাৎ সব ব্ল্যাঙ্ক। অফিস থেকেই হসপিটালে দিল। নীলাঞ্জনা অন্য কিছুর জন্য ভয় পাচ্ছিল। অনাকাঙ্খিত মাতৃত্ব!! না রেজাল্টে ওকে এইচ আই ভি পজিটিভ বলা হয়েছে। অফিস জেনেছে। ফিসফিস, গুজ গুজ। অনেক পরিচিত জন সরে যাচ্ছে। একঘরে হয়ে থাকে। কিন্তু কি ভাবে? রিপোর্ট , সেক্সকে আঙুল তুলে দেখিয়েছে। নীল!  ওকি জানতো? নাকি ও বেচারাও অসুস্থ হয়েছে । খোঁজ নিতে চায় পরিচিত সব পথ বন্ধ। নীলাঞ্জনা ধীরে ধীরে শেষ হয়ে যাচ্ছে। অকাল ধূসরতা ছেয়ে গেছে ওর জীবনে। ঠিক সেই সময় একটা লেখা পেল। নীল কালি নিয়ে হিজিবিজি করত যে পেপারে। তা ওর ঘরের এক কোনে। কি লেখা? চোখের দৃষ্টি কম হচ্ছে.... লেখা --- কখনও কাউকে সরি বলবো না, কেন বলবো!! ওদের আমি যৌন সুখদি। ওদের খিদে মেটাই। শুকনো এই পৃথিবীতে ভালবাসাদি। না নীলাঞ্জনাকে কখনও বলব না, আমি শেষ স্টেজ মরতে চলেছি। মৃত্যু ওর ও আসুক। কি এসে যায়! আমাদের প্রেমের মুহুর্ত ও কখনও অস্বীকার করতে পারবে? 


( এইডস দিবসে। সাবধান ও সংযত থাকুন । দৈহিক ও মানসিক সুস্থ্য থাকুন) 

শর্মিষ্ঠা ভট্ট✍


৬টি মন্তব্য:

শিরোনাম - দুরত্ব✍️ ডা: অরুণিমা দাস

 শিরোনাম - দুরত্ব ✍️ ডা: অরুণিমা দাস আধুনিকতা মানেই অন্যরকম একটা ব্যাপার, উন্নতির পথে এগিয়ে যাবার সিড়ি তৈরি করে দেয় আধুনিকতা। আজকাল কেউ আ...