বৃহস্পতিবার, ২৩ জুন, ২০২২

শিরোনাম - লড়াকু ✍️ ডা: অরুণিমা দাস


শিরোনাম - লড়াকু
✍️ ডা: অরুণিমা দাস

রাশিয়ার ভেলাচিনকোভা শহর, একটি প্রাইমারী স্কুলে পেরেন্ট টিচার মিটিং চলছে। মিটিংয়ের মধ্যমণি এলেনা মাথা নিচু করে চুপ হয়ে বসে আছে। স্কুলে আর আসতে চায় না ও, বাড়িতে জানিয়েছে সেটা। মিডটার্ম পরীক্ষায় রেজাল্ট খুবই বাজে হয়েছে ওর। ফ্রেন্ডস কেউ ভালো করে কথা বলে না। আরও বেশি যেনো কুকড়ে গেছে মেয়েটা। ওর বাবা মাকে হেড মিস্ট্রেস বলছেন 'ভেরি পুওর পারফরম্যান্স,সি হ্যাস ডাল ব্রেন টোটালি'! নো নীড টু সেন্ড হার স্কুল এনিমোর। এলেনার মা মারিয়া আর থাকতে না পেরে বলে ওঠে ইউ ক্যান্ট ডু লাইক দিস ম্যাম, হার ব্রেন ইস নট ডাল। আই চ্যালেঞ্জ ইউ সি ক্যান ডু বেটার রেজাল্ট ইন দ্য ফাইনাল এক্সাম। এটা বলে এলেনা কে নিয়ে বেরিয়ে যায় মারিয়া,পিছন পিছন আসতে থাকে জেমস,এলেনার বাবা। মারিয়া কে বলে ইউ হ্যাভ ডান রং। এভাবে ওকে নিয়ে চলে এলে, এটা ঠিক নয়। মারিয়া বলে যা করেছি ঠিক করেছি। বাড়ি গিয়ে এলেনা কে ভালো করে জিজ্ঞেস করতেই কেঁদে ফেলে এলিনা, জানায় নিজের সমস্যার কথা। ওয়ার্ড চিনতে ওর প্রবলেম হয়, মনে হয় যেনো ওয়ার্ড গুলো ড্যান্স করছে। আর ম্যাথস ক্যালকুলেশন করতেও প্রবলেম হয়। মারিয়া জেমস কে বললো এই যে প্রবলেম গুলো হচ্ছে ওর টিচাররা বুঝতে পারছে না নয়তো বুঝতে চাইছে না। 
জেমস বললো আমাদের কী করা উচিত? মারিয়া বললো চলো ডক্টর দেখাই ওকে। ইচ্ছে করে তো ও আর এরকম করছে না। প্রথমে ফ্যামিলি ফিজিশিয়ান কে দেখানো হলো এলেনা কে। উনি সব শুনে বললেন নিউরো মেডিসিন কাউকে দেখানো হোক। জেমস হাল ছেড়ে দিচ্ছিল, বললো ব্যর্থ হবো মারিয়া, এলেনা কে সুস্থ কী করা যাবে? মারিয়া বললো চেষ্টা তো করে দেখি। নিউরো ডক্টর এলেনার সিম্পটম দেখে কতো গুলো টেস্ট করতে দিলেন। ফাইনালি ডায়াগনসিস হলো ডিসলেক্সিয়া উইথ ডিসগ্রফিয়া অ্যান্ড ডিসক্যালকুলিয়া। বয়স যত বাড়ে তত এই প্রবলেম গুলো বাড়ে। ছোটবেলায় বোঝা যায় না যে প্রবলেম গুলো কতটা সিভিয়ার! নিউরো ডক্টর এলেনাকে 'সেন্টার ফর অ্যাসিসট্যান্স ফর চিলড্রেন উইথ লার্নিং ডিফিকাল্টিসের' বৈজ্ঞানিক পরিচালক ও রাশিয়ান ডিসলেক্সিয়া অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য ডরোথির সাথে যোগাযোগ করতে বলেন। মেডিসিনের থেকেও বেশি ওর স্পীচ থেরাপি আর রাইটিং  ইমপ্রুভমেন্ট এর দরকার ওর। ডরোথির সাথে এলেনা কন্ট্যাক্ট করে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেয় রেগুলার থেরাপি চলতে থাকে এলেনার। মাস তিনেক পর বেশ ভালো উন্নতি হয় ওর অবস্থার। স্কুল টিচাররা ওর অবস্থা বুঝতে পারার পর এখন আর তাড়িয়ে দেওয়ার কথা বলে না। ফ্রেন্ডস দের মত এলেনাও সব ওয়ার্ড চিনতে পারে,তবে ধীরে ধীরে। শুধু মাত্র মারিয়া হাল ছেড়ে দেয়নি বলেই এলেনার জীবন ব্যর্থতার আঁধারে পর্যুবসিত হয়ে যায়নি। নতুন করে জীবনে চলার শক্তি পেয়েছে এলেনা। এভাবেই  এগিয়ে যাক ও নিজের উদ্দেশ্য সফল করার লক্ষ্যে আরও একধাপ। 

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

শিরোনাম - শুভযাত্রা। ✍️ডা: অরুণিমা দাস


 শিরোনাম - শুভযাত্রা
✍️ডা: অরুণিমা দাস

হোক মায়াবী চাঁদের রাত বা আনন্দের বরসাত
বাঁচবো মোরা আনন্দেতে রেখে হাতে হাত।

কলাপাতাই হবে যে আমাদের আমরেলা
খুশির স্রোতে মোরা ভাসাবো মোদের ভেলা। 

দুঃখ যে নেই বিন্দুমাত্র,ডুব দিয়েছি সুখ সাগরে
ভরসার হাত পেয়ে ধন্য জীবন,পৌঁছে ঠিকই যাবো পারে।

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

রবিবার, ১৯ জুন, ২০২২

টেলোমিয়ার উইল টেল দ্য স্টোরি ✍️ডা: অরুণিমা দাস

টেলোমিয়ার উইল টেল দ্য স্টোরি
✍️ডা: অরুণিমা দাস

বুড়ো হতে আমরা কেউ চাই না কিন্তু স্বাভাবিক নিয়মে বার্ধক্য আসে। বার্ধক্যের কারণ কী,এই সত্য জানতে উঁকি দিতে হবে আমাদের শরীরের ভেতরে। 
একটা বছর কাটিয়ে আমরা নতুন বছরে পা দিয়েছি। বাড়ছে বছরের সংখ্যা,সঙ্গে বয়স বাড়ছে। একটু একটু করে বড় হচ্ছি আমরা বা বলা ভাল বুড়ো হচ্ছি আমরা। মানুষের জীবনে বৃদ্ধি ও বিকাশের পাঁচটি দশার মধ্যে সর্বশেষ দশা হল বার্ধক্য। কিন্তু মজার কথা হল এই দশায় কেউই আমরা পৌঁছতে চাই না। এই বার্ধক্যে না যেতে চাওয়ার কারণই হল আমরা বার্ধক্যজনিত রোগকে ভয় পাই এবং শুধু তাই নয়, বার্ধক্য আমাদের কাছ থেকে আমাদের কাজের শক্তি কেড়ে নেয় আর একাকীত্বও বাড়িয়ে দেয়।
এককথায় বার্ধক্য হল এমন এক দশা যেখানে শারীরিক ক্ষমতা হারাতে থাকে,বিভিন্ন রোগ শরীরে বাসা বাঁধতে থাকে,মানুষ পরনির্ভরশীল হয়ে পড়ে। ২০১৫ সালে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী সমগ্র পৃথিবীতে ৬০ বছর বয়সি বৃদ্ধের সংখ্যা ছিল ১২ শতাংশ, যা বেড়ে ২০৫০ সালে প্রায় ২২ শতাংশ হবে বলে ধারণা বিজ্ঞানীদের। কিন্তু শুধুই কি কালের নিয়মে বয়সবৃদ্ধির সঙ্গে আমাদের ত্বক কুঁচকে যায়, দৃষ্টিশক্তি কমে যায়, কর্মক্ষমতা হারায় আর বিভিন্ন রোগ দেখা যায় নাকি তার পেছনে রয়েছে কোনও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা? এরই হদিশ পেতে চেষ্টা করা যাক।

আমরা কেন বুড়ো হই,এই সহজ সত্যিটাকে বুঝতে গেলে সবার প্রথমে আমাদের দেহের কোষের দিকে একবার উঁকি দিতে হবে। কারণ সব রহস্য যে ওখানেই লুকিয়ে রয়েছে। আমাদের দেহের গঠনগত ও কার্যগত একক কোষের মধ্যে থাকা দুটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কোষ অঙ্গাণু নিউক্লিয়াস ও মাইটোকনড্রিয়া বা আরও নিখুঁতভাবে বলতে গেলে এই দুই কোষ অঙ্গাণুর মধ্যে থাকা ডি এন এ এই কাজের মূল হোতা। ডি এন এ এর ক্ষতি ও তার মেরামতির ভুল,আমরা প্রায় সকলেই এই সত্যিটার সঙ্গে পরিচিত যে আমাদের দেহের গঠন থেকে শুরু করে সমস্ত কার্যকারিতার পেছনে রয়েছে নির্দিষ্ট ডি এন এ। তাই ডি এন এ এর এই গুরুত্বের কথা মাথায় রেখেই আমাদের কোষের মধ্যেই থাকে ডি এন এ এর ত্রুটি মেরামতির যন্ত্রপাতি। কোষীয় কোনও রাসায়নিক বিক্রিয়ার কারণে বা ইউভি রশ্মির কারণে যদি ডি এন এ এর কোনও ক্ষতি হয় তাহলে কোষের মধ্যে থাকা সেসব যন্ত্রপাতি দ্রুত  ডি এন এ এর সেই অংশটি মেরামত করে দেয় এবং এই ঘটনা কোষে প্রায় অবিরাম চলতেই থাকে। কারণ ডি এন এ এর প্রতিলিপিকরণের (রেপ্লিকেশন) সময় অনিচ্ছাকৃত হওয়া ক্ষতি,কোষের মধ্যে তৈরি হওয়া ROS (Reactive Oxygen Species) অর্থাৎ সুপার অক্সাইড, পারক্সাইড ইত্যাদি খুব দ্রুত ডি এন এ এর ক্রোমোজোম বিন্যাসে পরিবর্তন ঘটায় ফলে ডি এন এ তার স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা হারিয়ে অস্বাভাবিক হয়ে ওঠে আর এই অস্বাভাবিকতাকে রুখতেই ডি এন এ এর ত্রুটি মেরামতির যন্ত্রপাতি কাজ করে এর স্বাভাবিক ক্রিয়াশীলতা বজার রাখার চেষ্টা করে। কিন্তু মুশকিল হল এইসব তীব্র অক্সিডেজের বিরুদ্ধে কাজ করতে করতে অনেক সময় ডি এন এ এর ত্রুটি মেরামতির যন্ত্রপাতিও নিজের কার্যক্ষমতা হারিয়ে ফেলে তখন কোষে এই ত্রুটিপূর্ণ ডি এন এ এর আধিক্য বাড়তে থাকে। ফলস্বরূপ কোষও তার কার্যকারিতা হারায় ও ধীরে ধীরে কোষ বার্ধক্য দশায় প্রবেশ করে। এভাবেই ডি এন এ এর ত্রুটি মেরামতির যন্ত্রপাতির ত্রুটিজনিত কারণে এক এক করে দেহের বিভিন্ন কোষগুলি বার্ধক্যের দশায় উপনীত হয়। এখানে একটি কথা না বললেই নয়, সেটি হল কৃত্রিম ও প্রক্রিয়াজাত খাবার গ্রহণ, যথেচ্ছ ধূমপান ইত্যাদি দেহকোষে এই ROS (রিয়াকটিভ অক্সিজেন স্পিসিস) এর পরিমাণ বৃদ্ধি করার পেছনে বহুলাংশে দায়ী। এ ছাড়া UV রশ্মি, দূষণ ইত্যাদি তো রয়েছেই।

টেলোমিয়ারের দৈর্ঘ্যের সংক্ষিপ্তকরণ - বার্ধক্যের এটা হলো মূল কারণ। 
যে-কোনও ক্রোমোজোমের শেষ প্রান্তে থাকা অংশটিকে টেলোমিয়ার বলা হয়। এই টেলোমিয়ার অংশটি কিন্তু রিপিটেটিভ কিছু ডি এন এ সিকোয়েন্স দ্বারাই তৈরি অর্থাৎ এই অংশে একই ডি এন এ সিকোয়েন্সের বারংবার পুনরাবৃত্তি ঘটে। তবে এই টেলোমিয়ার ক্রোমোজোমের শেষপ্রান্তকে যেকোনও ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে। সাধারণত ডি এন এ প্রতিলিপিকরণের (রেপ্লিকেশন) সময় প্রত্যেকবার প্রতিলিপিজনিত ত্রুটির কারণে একটু একটু করে এই টেলোমিয়ার অংশটি বাদ পড়তে থাকে। এভাবে টেলোমিয়ার অংশটি বাদ পড়তে থাকার ফলে ওই নির্দিষ্ট কোষটির ডি এন এ তার প্রতিলিপিকরণের ক্ষমতা হারায় ফলে ওই কোষও তার বিভাজন ক্ষমতা হারিয়ে ধীরে ধীরে অ্যাপোপটোসিস (প্রোগ্রামড সেল ডেথ) পদ্ধতির মাধ্যমে ধ্বংস হয়ে যায় এবং এভাবে কোষের মৃত্যু ঘটার ফলে বার্ধক্যের সূচনা হয়। সাধারণত যেকোনও সুস্থ স্বাভাবিক কোষ তার জীবনকালে চল্লিশ থেকে ষাট বার বিভাজিত হতে পারে তারপর সে তার বিভাজন ক্ষমতা হারায়। কোষের বিভাজনের এই সীমাবদ্ধতাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলে হেফ্লিক লিমিট। পেনসিলভেনিয়ার উইস্টার ইন্সটিটিউটের লিওনার্ড হেফ্লিকের নাম অনুসারে এর নামকরণ করা হয়েছে। কোষের এই বার্ধক্যই কিন্তু গোটা একটি জীবকে বার্ধক্য দশার দিকে ধীরে ধীরে ঠেলে দেয়। বার্ধক্যদশায় দেখা-যাওয়া সমস্ত ধরনের অক্ষমতার পেছনে আসল কারণ কিন্তু এগুলোই।

মাইটোকনড্রিয়ায় থাকা ডি এন এ এর ত্রুটিআমরা হয়তো অনেকেই জানি না যে নিউক্লিয়াস ছাড়াও আমাদের মাইটোকনড্রিয়ার মধ্যেও থাকে DNA। সাধারণত ৩৭ টির মতো জিন সমন্বিত এই অঙ্গাণুটি আমাদের কোষের শক্তিঘর (পাওয়ার হাউস) হিসেবেই পরিচিতি পেয়ে এসেছে। আমাদের ক্ষেত্রে যদিও এই DNA কোনও প্রকার বৈশিষ্ট্যের জন্য দায়ী নয়,কিন্তু সমস্যা হল আমাদের ক্ষেত্রে এর কোনও উপকারিতা না থাকলেও এর যে-কোনও ত্রুটি আমাদের সমগ্র কোষের কার্যকারিতাকে ব্যর্থ করতে যথেষ্ট। আগেই বলা হয়েছে যে এই মাইটোকনড্রিয়া আমাদের কোষের শক্তিঘর হিসেবে কাজ করে আর এই কার্য সম্পাদনের জন্য যে প্রক্রিয়াটি সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ সেটি হল ইলেকট্রন ট্রান্সপোর্ট চেইন বা ETC যার মাধ্যমেই আমাদের তথাকথিত শক্তি ATP বা অ্যাডিনোসিন ট্রাই ফসফেট উৎপন্ন হয় ও কোষের বিভিন্নপ্রকারের ক্রিয়া সম্পাদন করে। এই ইলেকট্রন ট্রান্সপোর্ট চেনের মধ্যে দিয়ে তীব্র অক্সিডাইসড ইলেকট্রন যাতায়াত করার সময় ভুলবশত যদি তারা সেই পথ থেকে বিচ্যুত হয় তা হলেই সেখানে মুক্ত মূলক তৈরি হয় যা তাদের তীব্র অক্সিডেজ ক্রিয়ার দ্বারা অঙ্গাণুটির ক্ষতি করে আর সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে তার ডি এন এ এর। যেহেতু ইলেকট্রন ট্রান্সপোর্ট চেনের মাধ্যমে ATP তৈরি হওয়ার সময় উপজাত হিসেবে অক্সিজেনও তৈরি হয় তাই এই মুক্ত মূলকগুলি সাধারণত সুপার অক্সাইড,পারক্সাইড ইত্যাদি হয়ে থাকে আর এগুলিই হল ROS (Reactive Oxygen Species) যা শুধু মাইটোকনড্রিয়ার নয়, সমগ্র কোষের তথা নিউক্লিয়াসে থাকা ডি এন এ এরও ক্ষতি করে। মাইটোকনড্রিয়াকে শক্তিঘর-এর পাশাপাশি ROS উৎপাদনের প্রধান কেন্দ্র হিসেবেও দেখা হয়ে থাকে। সাধারণত একটি কোষে একশোটিরও বেশি মাইটোকনড্রিয়া থাকে। তাই এখানে সৃষ্ট ROS সমগ্র কোষের ক্ষতি করতে সমর্থ। এই ROS এর ফলে মাইটোকনড্রিয়ার ডি এন এ এর সজ্জাক্রমের পরিবর্তন ঘটে সেখানে মিউটেশন দেখা যায়, ফলে ইলেকট্রন ট্রান্সপোর্ট চেনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রোটিন সংশ্লেষণে সে ব্যর্থ হয়,ফলস্বরূপ এ টি পি উৎপাদন ব্যাহত হয় আর তার পাশাপাশি সমগ্র কোষের ক্রিয়াও শক্তির অভাবে প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। শুধু তাই নয়,বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন রোগ যেমন, অ্যালজাইমার,পারকিনসন প্রভৃতি রোগের কারণও এই মুক্ত মূলক। ১৯৫৬ সালে হারম্যান,বার্ধক্যের অন্যতম কারণ হিসেবে মুক্ত মূলকের এই তত্ত্বটি সবার সামনে তুলে ধরেন।

এতো গেলো বয়স বাড়ার কারণ, এরপর দেখা যাক বয়স বাড়ার সাথে সাথে কি কি মানসিক পরিবর্তন ঘটে। এমনিতেই বয়স বাড়লে স্মৃতিশক্তি ক্ষীণ হয়, কাছের মানুষরা অনেকটা দূরে ঠেলে দেওয়ায় একাকীত্ব বোধ হয়,নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ে মানুষ। এসব দুর করার জন্য নিজেকে সবসময় কিছু না কিছু কাজে এনগেজ রাখা উচিত। এতে অ্যালজাইমার ও অন্যান্য স্নায়ুরোগ প্রতিহত হয়।

আবার প্রোজেরিয়া নামক রোগে আক্রান্ত হলে কমবয়সীদের বয়স্কদের মতন দেখতে হয়। 

আচ্ছা আমরা কি কখনও ভেবে দেখেছি যে কিছু মানুষ অল্প বয়সেই প্রায় বার্ধক্যদশা যাপন করে আর কিছু মানুষ আশি বছর বয়সেও একদম সুস্থ সবল ও রোগমুক্ত জীবন কাটায়। এর পেছনে কারণ জানতে গেলে সবার আগে আঙুল উঠবে আমাদের জীবনযাত্রার মানের দিকে। নিয়মিত শরীরচর্চার অভাব, প্রসেসড খাবার খাওয়া, অসময়ে ঘুম,খাওয়া ও সর্বোপরি অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন আমাদের অল্প বয়সেই কর্মক্ষমতা হারিয়ে যাওয়ার মূল কারণ। এবার আসা যাক বিখ্যাত বডিবিল্ডার মনোহর আইচের কথায় যিনি ছোটবেলায় একবার কালাজ্বরে আক্রান্ত হন এবং ফলস্বরূপ তাঁর শরীর-স্বাস্থ্য ভেঙে যায়। পরে কঠিন পরিশ্রম ও নিয়মিত শরীরচর্চার মাধ্যমে তিনি সম্পূর্ণরূপে সুস্থ জীবনযাপন করেন,তাঁর শারীরিক গঠন ছিল দেখার মতো। এমনকী তিনি ১০৪ বছর পর্যন্ত অর্থাৎ মৃত্যুর আগে পর্যন্তও কোনও রোগে ভুগেছিলেন বলেও জানা যায় না। তাই কমবয়সী থাকতে গেলে কোনও বাহ্যিক ক্রিম,বোটক্স ইত্যাদির দরকার পড়ে না। শুধু প্রয়োজন পড়ে সঠিক জীবনযাত্রার মানের, যার দ্বারা আমরা একশো বছর না হোক অন্তত ৬০ বা ৮০ পর্যন্ত সুস্থ স্বাভাবিক রোগমুক্ত জীবন কাটাতে পারি বা তথাকথিত যুবক যুবতী থাকতে পারি।

পরিসংখ্যান সূত্র : গুগল

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

শনিবার, ১৮ জুন, ২০২২

ন্যানোমেডিসিন-চিকিৎসা বিজ্ঞানে আলোর দিশা ✍️ডা: অরুণিমা দাস

বিজ্ঞান ভিত্তিক আলোচনা
 বিষয় - উন্মুক্ত 

ন্যানোমেডিসিন-চিকিৎসা বিজ্ঞানে আলোর দিশা
✍️ডা: অরুণিমা দাস

ন্যানোপ্রযুক্তি দিয়ে চিকিৎসা বিজ্ঞানে কিভাবে উন্নয়ন করা যায় তা নিয়ে বিজ্ঞানীরা কাজ করছেন অনেক বছর ধরে। বিশেষ করে ডিএনএ নিয়ে বিজ্ঞানীদের আগ্রহ অনেক বেশী। বিজ্ঞানের নতুন এই ক্ষেত্রটিকে বলা হল ন্যানো-মেডিসিন। 
মহাশূন্যে ভেসে বেড়াচ্ছে মানুষের তৈরি রোবট। চাঁদ কিংবা মঙ্গল গ্রহে রোবট পাঠাচ্ছে মানুষ। এবার বিজ্ঞানীরা রোবট পাঠাবে আপনার শরীরের ভেতর! নিশ্চয় বিশ্বাস হচ্ছে না! অবিশ্বাস্য এ ঘটনাই হয়তো কিছুদিন পর হবে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ। এখন যেভাবে ট্যাবলেট গিলে খাচ্ছি, ভবিষ্যতে হয়তো কোনো ক্যামেরা গিলে খেতে হবে। এন্ডোস্কোপি আর কোলোনস্কপিতে ক্যামেরার সাহায্যেই আভ্যন্তরীন জিনিস দেখা হয়। কোনোদিন হয়তো শরীরে ইনজেকশন দিয়ে ঢুকিয়ে দেওয়া হবে রোবট!
এসব রোবট হবে আকারে খুবই ছোট। ১০০ ন্যানোমিটারের মতো। ১ ন্যানোমিটার হলো ১ মিটারের ১০০ কোটি ভাগের ১ ভাগ! এদের ন্যানোরোবট না বলে ন্যানোমেডিসিন বলাই ভালো। এরা সহজেই রক্তের সঙ্গে মিশে যেতে পারে। এরা সাধারণত গোলাকার হবে। গোলাকার পার্টিকেলের মধ্যে মেডিসিন ভরে দেওয়া থাকবে। এই ন্যানোমেডিসিন মানুষের দেহকোষ বা ব্যাকটেরিয়ার কোষের থেকে ছোট, কিন্তু এক অণু ওষুধ থেকে আকারে বড়। যেহেতু সাধারণ ওষুধ অণু থেকে বড়, তাই রক্তে এরা দীর্ঘক্ষণ কার্যকর থাকবে। আকার অণু থেকে বড় হলেও এরা রক্তনালিকায় জমাট বাঁধবে না। ন্যানোমেডিসিনের বাইরের অংশে অনেক সময় বিজ্ঞানীরা জৈব অণু যুক্ত করে দেন। এই অণুগুলোর কাজ হলো সঠিক জায়গায় মেডিসিনকে কাজ করতে সাহায্য করা। যেমন বাইরে যুক্ত এসব অণু টিউমার কোষকে চিনতে পারে। তাই ন্যানোমেডিসিন কোনো সুস্থ কোষকে আক্রান্ত না করে শুধু টিউমার কোষের বিরুদ্ধেই কাজ করতে পারবে। সেক্ষেত্রে ক্যান্সার টিউমার গুলোর চিকিৎসা অনেক সহজ হয়ে যাবে। ন্যানোমেডিসিন আবার মেশিনের মতো কাজ করতে পারে। তারা কোষপ্রাচীরে গর্তও তৈরি করতে পারে। 

ন্যানোর আলোকে ইনসুলিন:
হাতের ওপর টর্চের আলো পড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরে ঢুকে গেল মেডিসিন। পুরো কাজটা হলো চোখের পলকে আর কোনো সুচের খোঁচা ছাড়াই! ইনজেকশন যাঁরা ভয় পান নিঃসন্দেহে এ রকম টর্চ তাঁদের খুবই প্রয়োজন। এমন জাদুকরী টর্চ কিন্তু আর কল্পবিজ্ঞানে সীমাবদ্ধ নেই। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা ইনসুলিন গ্রহণের ক্ষেত্রে একে বাস্তবে রূপ দিয়েছেন। তাঁরা গোলাকৃতি ন্যানোপার্টিকেল তৈরি করেছেন, সেগুলো ত্বকের ওপর রেখে অতিবেগুনি রশ্মি ফেললেই ইনসুলিন শরীরে প্রবেশ করবে। ডায়াবেটিস ছাড়াও ক্যানসার চিকিৎসায় 'ন্যানোজেনারেটর' নামে আরেক ধরনের অতি ক্ষুদ্র ওষুধ সরবরাহকারী পার্টিকেল গবেষকেরা তৈরি করেছেন। ইঁদুরের ওপর গবেষণা চালিয়ে দেখা গেছে, বিশেষভাবে তৈরি এই ন্যানোজেনারেটর শুধু ক্যানসার কোষগুলোতেই উচ্চমাত্রায় ওষুধ সরবরাহ করে। তাই ক্যানসার কোষের আশপাশের সুস্থ কোষগুলোর কোনো ক্ষতি হয় না। ন্যানোমেডিসিনের কাজ শুধু ওষুধ সরবরাহতেই সীমাবদ্ধ নেই। ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের প্রফেসর কস্টাস কস্টারেলস ন্যানো–আকৃতির সুই তৈরি করেছেন। সার্জারিতে এর বিশেষ ভূমিকা আছে। ছোট আকৃতির কোষে সিরিঞ্জ বা স্কালপেল দিয়ে কাজ করা যায় না। ন্যানোসুই সেসব জায়গায় সহজেই ঢুকে পড়ে আর কোষে প্রয়োজনমতো পরিবর্তন আনে। যে কোষে সার্জারি করতে হবে তাকে চেনার জন্য সুচের আগায় নির্দিষ্ট কোনো পদার্থ যুক্ত থাকে। তাই আশপাশের কোষের ক্ষতি না করে শুধু টার্গেট কোষেই ন্যানোসুই সার্জারি করতে পারে।
'কোয়ান্টাম ডটস' নামের আরেক ধরনের ন্যানোপার্টিকেল রোগ নির্ণয়ে সাহায্য করে। এর ভেতরের দিকটা ধাতব আর বাইরের দিকটা বিশেষ খোলসে আবৃত। এই বিশেষ ধরনের গঠনের জন্য শরীরে কোনো নির্দিষ্ট রোগ দেখলেই কোয়ান্টাম ডটস ফ্লুরোসেন্ট আলো নিঃসরণ করে। স্ক্যানারের সাহায্যে সেই আলোর উপস্থিতি দেখে কোনো রোগ আছে কি না,সে সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়।

কম্পোনেন্ট অফ ন্যানোমেডিসিন:
ন্যানোমেডিসিনকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। হার্ড ন্যানোমেডিসিন ও সফট ন্যানোমেডিসিন। হার্ড ন্যানোমেডিসিন সাধারণত গ্রাফিন দিয়ে তৈরি করা হয়। গ্রাফিনকে খুব পাতলা শিটে পরিণত করা যায়। এই শিট দিয়ে ফাঁপা নল বা গোলকের মতো গঠন তৈরি করা যায়। হার্ড ন্যানোমেডিসিনে ধাতব পদার্থও থাকতে পারে। কিন্তু বিজ্ঞানীদের ঝোঁক সফট ন্যানোমেডিসিনের দিকেই বেশি। দেহের ভেতর স্বাভাবিকভাবেই বিভিন্ন জটিল জৈব পদার্থ তৈরি হয়, সফট ন্যানোমেডিসিন শারীরিক এই প্রক্রিয়ার দ্বারাই অণুপ্রাণিত হয়ে তৈরি। প্রোটিন, ফ্যাট বা ডিএনএর মতো জৈব অণু দিয়ে সফট ন্যানোমেডিসিনগুলো তৈরি। এদের প্রাকৃতিক ন্যানোমেশিনও বলা হয়। এ ক্ষেত্রে ডিএনএ অণুর বিশেষ কদর আছে বিজ্ঞানীদের কাছে। পছন্দমতো ক্ষারকের অণুক্রম সাজিয়ে বিভিন্ন দৈর্ঘ্যের 
ডি এন এ তৈরি করা যায়। ডিএনএ অণুগুলো নিজেরা বিভিন্নভাবে ভাঁজ হয়ে ক্ষুদ্র ত্রিমাত্রিক আকার ধারণ করে। এভাবে বিজ্ঞানীরা পছন্দমতো আকার দিতে পারেন ডিএনএকে।
অরিগ্যামি শিল্পীরা যেমন কাগজকে ভাঁজে ভাঁজে সাজিয়ে ফুল-পাখির মতো জটিল সব আকৃতি দিতে পারেন তেমন বিজ্ঞানীরাও ল্যাবে ডি এন এ কে এমনভাবে আকার দিতে পারেন। বিভিন্ন আকারের 
ডি এন এ দেহের বিভিন্ন জায়গায় ওষুধ পরিবহনের কাজ করে। কাজ শেষে কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছাড়া নিজেরাই ধ্বংস হয়ে যায়। ডি এন এ অণুর মতো আর কোনো পদার্থ এত নির্ভুল আর স্বকীয়ভাবে কাজ করতে পারে না। ল্যাবে বেস অণুগুলো যেভাবে সাজিয়ে দেওয়া হয়, ডিএনএ শরীরের ভেতর ঠিক তেমনভাবেই ভাঁজ হয়ে যায়। বলা যেতে পারে, বিজ্ঞানীদের কাছে ডি এন এ ই হলো সবচেয়ে বিশ্বস্ত অণু, এটা দেহের ভেতরেও বিজ্ঞানীদের আদেশ অক্ষরে অক্ষরে মেনে ঠিকমতো নিজের কাজ করতে পারে।
অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটি এবং চাইনিজ অ্যাকাডেমি অব সাইন্সেসের গবেষকেরা ক্যানসার কোষ ধ্বংস করার জন্য ডিএনএ ন্যানোরোবট তৈরি করেছেন। মাত্র ৬০-৯০ ন্যানোমিটার আকারের ন্যানোবট গুলো তৈরি করা হয় চ্যাপ্টা আয়তাকার ডিএনএ শিট দিয়ে। ন্যানোবটের গায়ে থ্রোম্বিন নামের এনজাইম যুক্ত থাকে। ন্যানোবট টিউমার বা ক্যানসার কোষের কাছাকাছি পৌঁছে গেলে থ্রোম্বিন কাজ করা শুরু করে। যে রক্তনালিকা ক্যানসার কোষকে রক্ত সরবরাহ করত থ্রোম্বিন তার রক্ত জমাট বাঁধিয়ে দেয়, যাতে কোষে আর রক্ত যেতে না পারে। এতে কোষগুলো মারা যায়। কিন্তু ন্যানোবট সুস্থ কোষের মধ্যে কীভাবে চিনতে পারে ক্যানসার কোষকে? এখানে ন্যানোবটকে সাহায্য করে ডিএনএ অ্যাপ্টামার। ন্যানোবট যদি কোনো ক্যানসার কোষের কাছাকাছি চলে আসে তখন ডিএনএ অ্যাপ্টামারগুলো ক্যানসার কোষের নিউক্লিওলিনের সঙ্গে যুক্ত হয়। নিউক্লিওলিন একধরনের বিশেষ প্রোটিন যা কেবল ক্যানসার কোষেই প্রকাশ পায়। সুস্থ কোষে এদের দেখা যায় না। ল্যাবরেটরিতে ইঁদুরের ওপর পরীক্ষা চালিয়ে দেখা গেছে যে এ ধরনের ন্যানোবট ক্যানসার কোষের ওপর মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যেই কাজ শুরু করে দিতে পারে।
ভাইরাসকে প্রাকৃতিক ন্যানোমেশিন বলে মনে করা হয়। ভাইরাস শরীরের ভেতর ঢুকে মানুষের দেহকোষে গর্ত তৈরি করে নিজেদের ডিএনএ কোষের ভেতরে ঢুকিয়ে দেয়। এভাবেই ভাইরাস দেহে রোগ তৈরি করতে পারে। বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন অক্ষতিকর ভাইরাসকে ন্যানোমেশিন হিসেবে ব্যবহার করেন। এ ক্ষেত্রে ভাইরাসের বাইরে এমন একটা কৃত্রিম আবরণ তৈরি করে দেওয়া হয় যাতে এদের দেখতে শরীরের নিজস্ব কোষের মতো দেখায়। তাই আমাদের ইমিউন সিস্টেম তাকে আর চিনতে পারে না।
দক্ষিণ কোরিয়ার বিজ্ঞানীদের একটি দল ন্যানোব্যান্ডেজ নামের বিশেষ একধরনের ব্যান্ডেজ তৈরি করেছে, যা রোগীর মাংসপেশির সংকোচন-প্রসারণ বা ত্বকের অস্বাভাবিক অবস্থা বুঝতে পেরে ডাক্তারকে রোগীর জন্য সঠিক মেডিসিন বাছাইয়ে সাহায্য করে।

ন্যানোমেডিসিনের ভবিষ্যৎ:
ডিএনএ ন্যানোমেডিসিন যে চিকিৎসাবিজ্ঞানের এক নতুন চমক, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এখন এই চমককে চমকপ্রদভাবে হাতে–কলমে কাজে লাগানোর চেষ্টায় ব্যস্ত গবেষকেরা। ন্যানোমেডিসিনকে নির্ভরযোগ্য ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াহীন ভাবে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কাজ চলছে। ধাতব পদার্থ ব্যবহার করতে হয় বলে কিছু কিছু ক্ষেত্রে এখনো এটি সামান্য ক্ষতি করতে পারে। তবে সব প্রতিকূলতা পার করতে পারলে ন্যানোমেডিসিন আমাদের দিতে পারে স্মার্ট চিকিৎসাসেবা। রে ক্রুজওয়েলের মতো ভবিষ্যতবাণী দেওয়া আশাবাদীরা অবশ্য আরও এক ধাপ এগিয়ে ভবিষ্যতবাণী করেছেন। আগামী শতাব্দীতে এই ন্যানোবট নাকি মরণশীল মানুষকে দিতে পারবে অমরত্বের স্বাদ,এইরকম টাই আশা করা যাচ্ছে।

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

শুক্রবার, ১৭ জুন, ২০২২

শিরোনাম - ইচ্ছেপূরণ ✍️ ডা: অরুণিমা দাস


শিরোনাম - ইচ্ছেপূরণ
✍️ ডা: অরুণিমা দাস

আকাশের বুকে জমেছে কালোমেঘ নিয়ে কতো অভিমান
ব্রিজ চায় তাকে ছুঁতে,অন্তর করে আনচান।

ব্যস্ত মহানগরের রাস্তায় ছুটে চলে গাড়ীর দল
গগনচুম্বী ইচ্ছে তাদের মনে জাগায় কোলাহল।

সময় নেই কারোর হাতে ছুটছে সকলে গন্তব্যস্থলে
আকাশ আছে সাক্ষী যে তার, মেঘপিওন যে তাই বলে।

সফল হোক এই ছুটে চলা ইচ্ছেপূরণ হোক সবার
অভিমানী মেঘ সরে রোদ উঠুক,জয় আসুক অনিবার।

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

বৃহস্পতিবার, ১৬ জুন, ২০২২

অন্তর্দৃষ্টি ✍️ ডা: অরুণিমা দাস

অন্তর্দৃষ্টি
✍️ ডা: অরুণিমা দাস

বছর তিনেক আগের ঘটনা এটা, চণ্ডীগড় গিয়েছি  পোস্ট গ্রাজুয়েট এন্ট্রান্স এক্সাম দেওয়ার জন্য। ইচ্ছে ছিল এক্সাম দিয়ে দু একটা দেখার মত জায়গায় ঘুরে নেবো। পরীক্ষা দিয়ে এসে প্ল্যান মত পরের দিন বেরোলাম ঘুরতে। রক গার্ডেন, রোজ গার্ডেন এগুলোর খুব নাম শুনেছিলাম হোটেল মালিকের কাছে। প্রথমে গেলাম রোজ গার্ডেন এর দিকে। নানা রঙের গোলাপের সমারোহ, দিল তো পুরো গার্ডেন গার্ডেন হয়ে গেছিলো। বেশ খানিকটা সময় রোজ গার্ডেনে কাটিয়ে রওয়ানা হলাম রক গার্ডেনের দিকে। রক গার্ডেনে পাথরের তৈরি নানা জিনিস দেখতে লাগলাম, অপূর্ব কারুকার্য করা সব। ঘুরতে ঘুরতে একটা জলাশয়ের কাছে এসে পৌঁছলাম। পাথরের ধাপ বেয়ে জল গড়িয়ে এসে পড়ছে সেই জলাশয়ে, নয়নাভিরাম দৃশ্য সব। জলাশয় টা পেছনে রেখে এগিয়ে যাচ্ছি একটা জায়গায় দেখি বেশ কিছু লোকের জটলা, কাছে গিয়ে দেখলাম একজন ভদ্রলোক বসে পোট্রেট আঁকছেন আর পাশে রাখা রয়েছে ওনার কর্মকাণ্ডের সব নজির। কেউ কেউ কিনেও নিচ্ছে এক দুটো পোট্রেট। এক সময় ভিড় কমতে দেখলাম যিনি পোট্রেট গুলো আঁকছেন তার চোখে একটা কালো চশমা। ওনার পাশে থাকা ভদ্রলোককে জিজ্ঞেস করলাম, চশমা পরে উনি ছবি আঁকেন? তিনি বললেন হ্যাঁ, আসলে ওর দৃষ্টি শক্তি খুব ক্ষীণ। অপটিক নিউরাইটিস রোগে আক্রান্ত ও, রড কোষ শুকিয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। ও ওই ক্ষীণ দৃষ্টি দিয়েই প্রকৃতির চিত্র রূপ মানসপটে কল্পনা করে রং তুলি দিয়ে পোট্রেট এঁকে ফেলে। শুনে খুব অবাক হলাম আর মনে মনে শিল্পীকে কুর্নিশ জানালাম। এরা সব জন্মগত প্রতিভা,ঈশ্বরের আশীর্বাদ ধন্য। মাঝে মাঝেই ছেলেটি হিন্দিতে বলছিল "মেরা আঁখো কি রশনি চলা যা রহে হ্যায় তো কেয়া হুয়া,মন মে উজালা লেকে  বৈঠা হু! কিসিকা তাকত নেহি হ্যায় উস রশনি কো মুঝসে ছিন সাকতে হ্যায়!" এরকম মন ভালো করা কথা শুনে ভীষন ভালো লাগছিলো। মনের জোর থাকলে কোনোকিছুই অসম্ভব নয় এই দুনিয়ায়। দুটো পোট্রেট কিনেছিলাম ওই ছেলেটির কাছ থেকে। হাসি মাখা মুখটা আজও মনে পড়ে আর বাকী দিন গুলো ভালোই ঘুরেছিলাম চণ্ডীগড়। এসব মানুষ গুলোর না হেরে যাওয়ার কাহিনী গুলোই কারোর কারোর জীবনে ঘুরে দাঁড়ানোর অনুপ্রেরণা হয়ে যায় একটা সময়। ভালো থাকুক জীবনযুদ্ধে পরাজিত না হওয়া এসব মানুষেরা। 

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

রবিবার, ৫ জুন, ২০২২

শিরোনাম - আধুনিকতা বর্জিত ✍️ ডা: অরুণিমা দাস

শব্দ-দিন
শিরোনাম - আধুনিকতা বর্জিত
✍️ডা: অরুণিমা দাস

বর্তমান যুগে আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে সবকিছুতেই। কিন্তু এখনো কিছু মানুষ আছেন যাদের স্পর্শ করতে পারেনি আধুনিকতা, কোনো না কোনো ভাবে তারা অনাড়ম্বর জীবন যাপনে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। আজ জেনে নেওয়া যাক সেরকম কিছু মানুষের কথা। আজ চোখ রাখা যাক ইন্দোনেশিয়ার এক অনামী গ্রাম যেখানে বাস করে তাংতু রা।
বেশ কিছু বছর আগে ইন্দোনেশিয়ার সরকার তাংতুদের গ্রামে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেন। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে তাংতুরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে সরকারের এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করে। এর ফলে আজও পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলি বিদ্যুতের আলোয় আলোকিত থাকলেও তাংতুরা আলোকমেলা থেকে স্বেচ্ছায় নিজেদের বঞ্চিত করে রেখেছে।
সভ্যতার ধর্ম সময় যত এগোবে ততই নিত্য নতুন প্রযুক্তি এসে হাজির হবে। অবশ্যই তা গ্রহণ করার বাছবিচার থাকবে মানুষের কাছে। বিজ্ঞানের কাজ ই হলো কেবলমাত্র সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া। কিন্তু এই সময়ে দাঁড়িয়ে তথাকথিত সভ্য হয়েও এশিয়া মহাদেশে এমন একটি জনগোষ্ঠী আছে যারা যাবতীয় আধুনিক প্রযুক্তি বর্জন করে চলে। এমনকি আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়া এড়িয়ে চলবে বলে এই জনগোষ্ঠীর সদস্যরা আজ পর্যন্ত কোন‌ও গাড়িতে ওঠেনি! এই বিশেষ জনগোষ্ঠী বাদুই নামে পরিচিত। এই জনগোষ্ঠীর মধ্যে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ভাগ আছে আর তারা সকলেই যে আধুনিক প্রযুক্তি এড়িয়ে চলে তা নয়। কেবলমাত্র অতি রক্ষণশীল তাংতু বাদুইরা এই কঠোর সংযমের সঙ্গে আজও জীবন যাপন করে চলেছে।
ইন্দোনেশিয়ার বানতেন প্রদেশের লিবাক রিজেন্সিতে বাদুই আদিবাসী গোষ্ঠী বাস করে। বাইরের দুনিয়ায় এদের বাদুই নামে ডেকে থাকলেও এরা নিজেদের কেনিকিস নামে পরিচয় দেয়। এদের মূল তিনটি ভাগ হলো তাংতু,পানামপিং এবং ডাংকা। এরমধ্যে তাংতু গোষ্ঠীটি লিবাক রিজেন্সির জঙ্গলের একেবারে মধ্যস্থলে বসবাস করে। এরা কাঠের তৈরি বাড়িতে থাকে এবং মূলত সাদা ও নীল রঙের পোশাক পড়ে এবং মাথায় সাদা রঙের পাগড়ি বাঁধে।
পানামপিং বাদুইরা তুলনায় অনেকটা কম রক্ষণশীল। তারা তাংতুদের আশেপাশের গ্রামগুলিতে থাকে। এদেরকে অতি রক্ষণশীল তাংতুরা অনেক সময় বাদুই বলে মনে করতে চায় না। তবে অতীতে নিষিদ্ধ থাকলেও বর্তমানে তাংতু ও পানামপিংদের মধ্যে বিবাহের প্রচলন ঘটেছে। ডাংকা বাদুইরা আসলে বাদুই নয়। তারা অন্য আদিবাসী গোষ্ঠী। কিন্তু এই অঞ্চলে এসে দীর্ঘদিন যাবৎ তাংতু ও পানামপিংদের সংস্পর্শে থাকার ফলে বাদুই সংস্কৃতির সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। ডাংকারা নিজেদের বাদুই বলে পরিচয় দিলেও তাংতু ও পানামপিংরা তাদেরকে বাদুই বলে মনে করে না।
স্বেচ্ছায় অন্ধকারে থাকতে ভালবাসেন বাদুই জনগোষ্ঠীর মানুষ। এই আদিবাসী গোষ্ঠীর সর্বোচ্চ নেতাকে 'পুন' বলে সম্বোধন করা হয়। তাকে তিন গোষ্ঠীর বাদুইরাই মান্য করে চলে। মূলত তাংতু বাদুইদের থেকেই 'পুন' নির্বাচিত হন। বাদুইদের ধর্মের নাম 'সুন্দা উইউইটান'। তাদের মতে, প্রাচীনকালে এক দেবতা তাঁর নিজের জীবন দিয়ে তাদেরকে রক্ষা করেছিল। তাই সমস্তরকম ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানের আগে তারা ওই দেবতাকে স্মরণ করে থাকেন। তাংতু বাদুইরা মনে করেন, সেই দেবতা নিজের হাতে তাদের এই বাসস্থান গড়ে তুলেছিলেন, তাই তারা জঙ্গলের মধ্যবর্তী অঞ্চল ছেড়ে অন্য কোথাও যেতে চায় না। এই আদিবাসী গোষ্ঠীটি মনে করে জীবিতকালে যা কিছু ঘটছে সব‌ই পূর্বনির্ধারিত। তাদের ধারণা প্রকৃতির কোন‌ও কিছুই পরিবর্তন করা হল অনৈতিক কাজ। সেই জন্যই তারা বিদ্যুৎ,আধুনিক ইন্টারনেট, যানবাহন এগুলির কিছুই ব্যবহার করে না।
কিন্তু পানামপিংরা বিদ্যুৎ এর পাশাপাশি মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট, টেলিভিশন সব‌ই ব্যবহার করে। এমনকি অনেক পানামপিং বর্তমানে পুরানো লোকায়ত ধর্ম ছেড়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করছে।

এরকম ভাবেই সহজ সরল জীবন যাপনে অভ্যস্ত থাকুক এসব গোষ্ঠীর মানুষেরা। থাক সরলতার ছোঁয়া, আধুনিকতার মোড়ক দিয়ে নিজেদের আচ্ছাদিত না করে যদি এনারা ভালো থাকতে পারেন থাকুন। সত্যিই শিক্ষণীয় এনাদের জীবন যাত্রা। 
বিলাসবহুল জীবনের প্রতি নেই তাদের কোনো লোভ
আধুনিকতায় অভ্যস্ত মানুষেরা বিলাসিতা না পেলে দেখায় শুধু ক্ষোভ।

চেষ্টা করে দেখাই যাক না সরল অনাড়ম্বর জীবনে সাধারণ মানুষ ফিরতে পারে কিনা! ক্ষতি তো কিছুই নেই, আখেরে লাভই আছে এতে। 

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস
ছবি সৌজন্যে : গুগল

মঙ্গলবার, ২৪ মে, ২০২২

ডোয়ার্ফি ✍️ডা: অরুণিমা দাস

 ডোয়ার্ফি
✍️ডা: অরুণিমা দাস

উহহু! কপালের বাঁদিকটা চিনচিন করে উঠলো ব্যথায়। উঠে বসতে গেলো বরফি,কিন্তু পারলোনা। শরীরটা বড্ড দুর্বল লাগছে ওর। পাশের বেডে থাকা এক বয়স্ক দাদু বললেন আহা উঠো না বাছা! অনেকটা কেটে গেছিলো তোমার, রক্তও বেরিয়েছিল অনেক। তাই এখন একটু দুর্বল লাগবে। সিস্টার মেডিসিন রেডী করছিল,ওদের কথা শুনে বরফির বেডের পাশে এসে বললো এখন একদম রেস্ট তোমার। কতগুলো সেলাই পড়েছে জানো! আমার আবার রেস্ট! হাসালে দিদি। সার্কাস দেখাতে দেখাতে জীবনটাই একটা সার্কাস হয়ে গেছে। এরম বোলোনা বরফি। সেদিন তুমি না থাকলে ওই বাচ্চাটাকে বাঁচানো যেত কি! সেদিনটা আর মনে করতে চাইনা দিদি। বাচ্চাটা রাস্তা পার করতে গিয়ে একটু হলেই ট্রাকের তলায় পড়ছিল। আমি খালি দৌড়ে গিয়ে ওকে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিয়েছিলাম। আর নিজে টাল সামলাতে না পেরে পাথরের ওপর মাথাটা ঠোক্কর খেয়ে গেছিলো। তারপর আর মনে নেই কিছু। তারপরেরটা আমি বলছি! বলতে বলতে ঘরে ঢুকলেন ডা: পল্লব। আরে আপনি স্যার? হ্যা বরফি আমি! আর শুধু আমিই নই সেদিন যে বাচ্চাটাকে বাঁচিয়ে ছিলে তার মা বাবা আর সে তিনজনেই এসেছে তোমার সাথে দেখা করবে বলে। তাই! আমার সাথে?চোখে মুখে বিস্ময় ফুটে উঠে বরফির। কেমন আছো আঙ্কেল? জিজ্ঞেস করে সেদিনের সেই বাচ্চাটা যাকে বরফি বাঁচিয়েছিল। বরফির চোখ দিয়ে অজান্তেই দু ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ে, এত সম্মান কেউ দেয়নি তাকে আজ পর্যন্ত। সার্কাসে সবাই ওই দেড় ফুট,কালার বয় এসব বলেই ডাকতো। ভালো আছি বাবু, তুমি কেমন আছো? আমিও ভালো আছি আঙ্কেল। আচ্ছা আঙ্কেল তোমার সেদিনকার জামা আর ওসব রঙিন চুল, টমেটোর মত লাল নাক ওগুলো কোথায় গো? ওহ ওগুলো! ওসবতো আমি সার্কাসে খেলা দেখানোর সময় পরিগো। এখন তো হাসপাতালে আছি,তাই ওসব পরিনি। বাবুর বাবা মা এগিয়ে এসে বললো কি বলে যে আপনাকে ধন্যবাদ দেবো বরফি আমরা জানিনা। সেদিন আপনি তুতুনকে না বাঁচালে আমাদের জীবনে আঁধার নেমে আসতো আজ। আপনার কাছে আমাদের কৃতজ্ঞতার শেষ নেই আর। না না এসব বলবেন না আপনারা,বরফি বললো। ছোটবেলা থেকে মা বাবা ছাড়া আছি তো,জানি কষ্টটা। আজ যদি আমি বামন না হয়ে সাধারণ মানুষের মতো চেহারার অধিকারী হতাম কেউ আর ঘেন্না করতো না আমায়। এরম বোলো না বরফি। তোমার এই রঙিন পোশাকের নিচে আছে একটা রঙিন মন যেটা দিয়ে তুমি সবাইকে আনন্দ দান করো, ডা: পল্লব বললেন। আচ্ছা শোনো বরফি এনারা কি বলছেন? তুতুনের বাবা বরফির হাত ধরে বললেন আমি তো বাড়ীর জন্য বেশী সময় দিতে পারি না, বাচ্চাটা একা একাই থাকে। ওর মাও তো নানান কাজে ব্যস্ত থাকে। তুমি ওর সর্বক্ষণের সঙ্গী হবে? আমাদের বাড়িতে থাকবে ওর গভর্নেস হয়ে? কিন্তু আমার সার্কাসের কাজ? আমার ওখানকার বন্ধুরা? ওদের ছেড়ে আমি কি করে থাকবো? বরফি বলে। অনেক আশা নিয়ে এসেছি গো আমরা,বরফি। মাফ করবেন আমায়, আমি আমার সার্কাস ছেড়ে কোথাও যাবো না,মন টিকবে না। এটাই এখন আমার ঘর বাড়ী সব হয়ে গেছে। কিরে ডোয়ার্ফি! আছিস কেমন? শুনলাম একদম হিরোর মত একটা বাচ্চার জীবন বাঁচিয়েছিস! মালিক আপনি? সার্কাসের মালিককে দেখে বরফি খুব অবাক হয়। দেখ কারা এসেছে! বলতে বলতে মালিকের পেছনে আরো তিন চারজন বেঁটে মানুষ ঢোকে। বরফি কে বলে তুই কি আমাদের ছেড়ে চলে যাবি রে? না না আমি তুতুনের বাবাকে বলে দিলাম আমার সার্কাস আর বন্ধুদের ছেড়ে গিয়ে কোথাও শান্তি পাবো না আমি। ডোয়ার্ফি, কাল তোর ছুটি হবে হাসপাতাল থেকে, আমরা এসে নিয়ে যাবো তোকে। এরপর একসপ্তাহ রেস্ট তোর, খেলা দেখাতে হবে না। পুরো সুস্থ হয়ে খেলা দেখাস না হয় আবার। মালিকের কথা শুনে বরফির বেশ ভালো লাগে,এদের ছেড়ে কিছুতেই সে শান্তি পাবে না অন্য জায়গায় গিয়ে। তুতুন মুখ ঝুলিয়ে বসেছিল, বরফি বললো কি হলো? কথা বলবেনা আমার সাথে? না আঙ্কেল তুমি তো আমার বাড়ী গেলে না! যাবো বাবু, তোমার ঠিকানা নিয়ে রাখলাম। যখন এখানে আসবো সার্কাস দলের সাথে ঠিক তোমার সাথে দেখা করে যাবো। আর এখন যতদিন সার্কাস থাকবে এখানে তুমি এসো মাঝে মাঝে,দেখা হবে,প্রমিস! কোনো মায়ায় আর জড়াতে চায়না বরফি, সেই বাঁধন ছিঁড়ে গেলে কষ্ট অনেক বেশি তাতে। তার চেয়ে ডোয়ার্ফি হয়ে রঙিন পোশাকে মানুষকে আনন্দ দেওয়ার কাজটাই বরং ভালো। মনের মাঝে বেজে উঠলো 
"জিনা ইহা, মরনা ইহা ইসকে ইসিভা জানা কাহান!
 জী চাহে জব হামকো আওয়াজ দো,হাম হ্যায় বহি, হাম থে যাহা।"

 ©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

বৃহস্পতিবার, ১৯ মে, ২০২২

গল্পঃ শীতোষ্ণতা। ✍️ নন্দিনী তিথি


এককালে এক অজ্ঞাত মরুভূমির এককোণে একটা বসতি গড়ে উঠেছিলো। একে অন্যকে ভালোবেসে নিজ নিজ বাড়ি ছেড়েছিল দু'জন তরুণ-তরুণী। তখন এই অজানা মরুভূমিই তাঁদের আশ্রয় দিয়েছিল। এরপরে এখানে থেকেই একে অন্যের হাত ধরে শুরু হয় তাঁদের পথ চলা। প্রতিদিন ভোর হতেই দু'জনে চলে যেতো কাজে আর বাড়ি ফিরতো সন্ধ্যে নামার আগে কোনো কোনো দিন সন্ধ্যে ঘোরও হয়ে যেতো। তাঁদের এই নিরলস পরিশ্রমের কারণ ছিলো দু'টো- ১. পেটের চাহিদা মেটানো এবং  ২. সাথে দু'টো টাকা জমানো।

এইভাবেই ওদের জীবন শুরু হলো, এবং চলতে লাগলো। ঋতু পরিবর্তনে ওদের প্রায়শই সমস্যায় পরতে হতো। সবথেকে যে সমস্যাটা বেশি হতো- গ্রীষ্মকালে ওদের মরুভূমির পাশে থাকাটা খুব কষ্টকর হয়ে যেতো। বিশেষ করে তরুণী আশার। কিন্তু তরুণ সুভাষ কিছুতেই গরমের কাছে হার মানতো না। ছোটবেলা থেকেই প্রতিনিয়ত মেডিটেশন ছিলো ওর সঙ্গী। এইসময় আশাকে সঙ্গে নিয়ে যতক্ষণ পারতো মেডিটেশনে বসতো আর চলে যেতো "মনের বাড়িতে"। মনের বাড়িতে তাদের বাড়িটি হতো তুষারের তৈরি, রোদ্রের তাপকে বানিয়ে নিতো বরফের শীতলতা। চারিপাশে থাকতো বৃষ্টির মুখরতা, মনের বাড়িতে গিয়ে রোদ্রের দুপুরকে বানিয়ে নিতো শীতের দুপুর, এবং সোয়েটার খুলে নদীতে নামতো শীতে কাঁপতে কাঁপতে। মেডিটেশনে মনের বাড়িতে গিয়ে ওরা গ্রীষ্মকালকে বর্ষাকাল, বসন্তের চিরিচিরি হাওয়া মাখানো দিন, এবং মাঝেমধ্যে শীতকালের কনকন শীতার্ত মানুষ বানিয়ে নিতো নিজেদেরকে। আর এই মেডিটেশন করার পর প্রতিবেলা তরুণ সুভাষবাবু তরুণী আশাকে বলতো আমাদের মেয়ে সন্তান হলে না আমরা ওর নাম রাখবো 'শীতষ্ণতা' ঠিকাছে আশা! আশা ওর কথা শুনে প্রত্যেকবারই একখানা মিঠামাখা হাসি দিয়ে বলতো- হুম। প্রথমে প্রায় ছ'মাস ওরা অন্যান্য কোনো বসতির সাথেই আলাপী তথা পরিচিত হয়ে উঠতে পারেনি। কারণ ওদের লক্ষ্য ছিলো নিজেদের পায়ে দাঁড়ানো মানে স্বচ্ছলতা। পরে ওদের একটু উঠে দাঁড়ানোর পরে আস্তে আস্তে ওদের পরিচিতি বাড়লো, সবাই ওদের ভালো জানতে শুরু করলো। তরুণ সুভাষকে সবাই একটু অন্যরকম ভালোবাসত। কোনো দরকারি কাজ বা কোনো আচার- অনুষ্ঠানের মিটিং, কোনো বড় দায়িত্ব নেয়ার ব্যাপারে, কোনো‌‌ কাজের যুক্তিসংহত পরামর্শ যেন তাঁকে ছাড়া হতোই না।

এইভাবে ওদের জীবন অতিবাহিত হতে লাগলো। এরই মাঝে চলে এলো ওদের ভালোবাসার প্রথম সন্তান। আনন্দে ওরা দিশেহারা, ফুটফুটে উজ্জ্বল শ্যামলা বর্ণের একটা ফুল যেন ওদের ঘরে এসে আলোকিত করলো, পরিপূর্ণতা আনলো জীবনের। নাম রাখলো চড়ুই। দুষ্টমিতে একশো'তে একশো ছিলো তাঁদের চড়ুই, কিন্তু ছোটবেলা থেকেই ওর মধ্যে একটা ব্যক্তিতের স্পর্শ লক্ষ্য করা গিয়েছিল। ধীরে ধীরে ওদের আরো দু'টো সন্তান এলো প্রথমে মেয়ে পরে আবারও একটা ছেলে। ওদের নাম রাখলো- পূর্ণতা আর নিপুণ। ওদের পরিবার এবার একদম পরিপূর্ণ। সবগুলোই বেশ মেধাবী ছিলো। লেখাপড়া ছাড়া অন্য কোনোকিছুতে নিপুণের মন নেই। সবথেকে শান্ত স্বভাবের ছেলে, একদম মায়ের স্বভাব পেয়েছে। পূর্ণতা! লেখাপড়ায় ভালো, কথাবার্তায় সে স্পষ্টবাদী,  স্বাধীনচেতা মনোভাবের। কিন্তু একটু বেশি একগুঁয়েমি স্বভাবের। আর চড়ুইয়ের কথা বলতে! সে যেমন দুষ্টুমিতে হাফেজ তেমন লেখাপড়ায় তেমনি বুদ্ধিমত্তায়, সামাজিকতায়। মানুষ কথায় বলে প্রথম তথা বড় সন্তান একটু হ্যাবলা স্বভাবের হয় কারণ তাঁরা সবার থেকে একটু বেশিই আদর পায়। আর উচ্ছন্নে যায়। কিন্তু চড়ুইয়ের ক্ষেত্রে পুরো উল্টো ব্যাপার।

সবথেকে মেধাবী ছিলো চড়ুই। ওকে নিয়ে ওদের অনেক আশা। কিন্তু দিন দিন ওরা বড় হতে লাগলো, খরচ ডাবল থেকে ডাবল হচ্ছিল। তিনটা ছেলেমেয়ের খরচ চালাতে গিয়ে ওদের সংসার টানাপোড়েনের মধ্যে দিয়ে চলতে লাগলো। আর পেরে উঠছিলো না ওরা, কোথা দিয়ে ওদের লেখাপড়ার খরচ চালাবে! চড়ুই মেডিক্যালে, পূর্ণতা মেট্রিকে গ্লোল্ডেন পেয়ে সদ্য ইন্টারে ভর্তি হলো। ভর্তি হতে অনেক খরচ, আবার বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী, প্রাইভেট না পড়লেই নয়। আর ছোটটা নিপুণ সে কেবল দশম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হয়েছে। এত্তো খরচ কোথা দিয়ে চালাবে, এই নিয়ে বাবু সুভাষের দিন রাত্রি ঘুম নেই চোখে। লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যাওয়ার পথে প্রায়। সবে গড়ে ওঠা স্বপ্নগুলো যেন ভূমিকম্প লেগে শেষ হয়ে যাওয়ার পথে। এমতাবস্থায় চিন্তায় দিশেহারা হয়ে বাবু সুভাষ এই অবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়ার কোনো উপায় খুঁজে না পেয়ে অবশেষে ঠিক করলো চড়ুইকে বিয়ে দেবে, এই চিন্তা মাথায় চাপালো। বাবার অবস্থা দেখে চড়ুইও মুখ বুঝে বাবার সিদ্ধান্তে মত দিলো। অনেক প্রস্তাব ভেঙ্গে যাওয়ার পর অবশেষে রায় বংশের একমাত্র মেয়ে একতার সঙ্গে  চড়ুইয়ের বিয়ে ঠিক হলো। দিন ঠিক করে ভালোভাবে বিয়ে কার্য সম্পন্ন হলো। সৃষ্টিকর্তা নিজেই বোধহয় এমন মর্যাদাশালী পরিবারের সঙ্গে বাবু সুভাষের পরিবারকে মিলিয়ে দিয়েছেন। এমন মেয়ে যেন পৃথিবীতে লাখে একটা। তার স্বভাবের পরিচয় দিতে গেলে তা বরফের মতো শান্ত, আচরণ তার বিজ্ঞ বিচারকের মত নৈপুণ্য, কথাবার্তায় যেন সে মায়া আর ভালোবাসার মন ভুলানো অধিকারী, হাঁটাচলায় মায়াবতী লক্ষ্মী, হাত পায়ের গঠন তা ঈশ্বর বোধহয় একটু বেশিই স্বযত্নে বানিয়েছেন। এখন আর তার গুনের বর্ণনায় না গিয়ে এবারে ক্ষ্যান্ত হই। কিন্তু একতার চেহারার গঠন ভালো হলেও অতটা সুন্দরী ছিলো না। বাবু সুভাষ যেন আজ ঈশ্বরের কাছ থেকে সেই মেয়েকে পেয়েছেন, যেখানে প্রতিদিন মেডিটেশনের পরে স্ত্রী আশাকে বলতো আমাদের মেয়ে হলে তাঁর নাম রাখবো 'শীতোষ্ণতা'। সেই শীতোষ্ণতাকে। আনন্দের অশ্রু ঝরিয়ে বরণ ডালা সাজিয়ে দু'জনে মিলে একতার হাতে চুমু খেয়ে বললো- "আয় মা শীতোষ্ণতা, তুই আমাদের সেই স্বপ্নের বাড়ির মেয়ে যার নাম কত বছর আগে ঠিক করে রেখেছিলাম। আজ এতো দিন ‌পরে  ঈশ্বর পাঠালো, কাছে পেলাম তোকে আমরা। 

আনন্দের জোয়ারে ভেসে যাচ্ছিলো সুভাষ আর আশার পরিবার। সবার চোখে বৃষ্টির মতো অশ্রু ঝরেছিলো সেদিন। সবাই আজ প্রতিষ্ঠিত, চড়ুই ডাক্তার হয়ে সে দুঃস্থ অসহায়দের পাশে দাঁড়িয়েছে, পূর্ণতা একজন ভার্সিটির আদর্শবান শিক্ষিকা হয়ে ভালোবাসার মানুষকে বিয়ে করে সুখে সংসার করছে, ভদ্র ছেলে নিপুণ সদ্য ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে বেরিয়েছে। আর সবার আদরের রায় বংশের মেয়ে শীতোষ্ণতা(একতা) আজ ব্যাংকার এবং আশা সুভাষের কাছে থেকে তাদেরকে নাতিশীতোষ্ণতার মহিমায় ভরিয়ে রাখছে। 

বিশ্বেতে শান্তির পরিবার আজ আশা-সুভাষের পরিবার। আর বিরাজমান রবে চিরকাল।

Copyright © All Rights reserved Nandini Tithi.

বুধবার, ১৮ মে, ২০২২

ক্লিওপেট্রা ও অজানা কিছু ইতিহাস ✍️ ডা: অরুণিমা দাস


 ক্লিওপেট্রা ও অজানা কিছু ইতিহাস
✍️ ডা: অরুণিমা দাস

মাত্র ৩৯ বছরের সংক্ষিপ্ত জীবনে কখনো ছিলেন রাজকন্যা,কখনো বা পরাক্রমশালী রানী, আর কখনো তিনি ছিলেন প্রেয়সী। ক্লিওপেট্রাকে মনে করা হয় সম্মোহনী সৌন্দর্য্য ও ক্ষমতার স্বত্ত্বাধিকারী। রুপোলি পর্দায় তাঁকে রুপসী হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও আধুনিক ইতিহাসবিদদের মতে,পরমাসুন্দরী হিসেবে তার খুব বেশি খ্যাতি ছিল না। তবে তাঁর তীক্ষ্ম বুদ্ধিমত্তা, মন্ত্রমুগ্ধকর ব্যক্তিত্ব, সহজাত রসবোধ,প্রচণ্ড উচ্চাভিলাষ ও তা বাস্তবায়নের অদম্য ইচ্ছাশক্তির জোরে তিনি সর্বকালের সেরা মহিলাদের মধ্যে স্থান করে নিয়েছেন। ক্লিওপেট্রাকে ঘিরে ইতিহাসে বিতর্ক আর রহস্যের যেন শেষ নেই। যেমন রহস্যময় তার জীবন ও রাজ্য শাসন,তেমনি রহস্যময় তার প্রেম। তাঁকে নিয়ে গল্প-কবিতা-উপন্যাসের পাশাপাশি নির্মিত হয়েছে চলচ্চিত্রও। উইলিয়াম শেক্সপিয়র, জর্জ বার্নাড শ,জন ড্রাইডেন, প্লুটার্ক, হেনরি হ্যাগার্ড, ড্যানিয়েল প্রত্যেকেই আলাদাভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন তাঁর চরিত্র। হ্যালিওয়েল তাকে 'দ্য উইকেডেস্ট উইম্যান ইন দ্য হিস্ট্রি' হিসেবে অভিহিত করেছেন।
প্রেম আর মৃত্যু এই নারীর জীবনে একাকার হয়ে গেছে। তিনি যেমন ভালোবাসার উদ্যাম হাওয়া বইয়ে দিতে পারতেন,তেমনি প্রয়োজনে মারাত্মক হিংস্র হতেও বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ করতেন না।
দান্তের মতে,লালসার শাস্তি হিসেবে তিনি নরকের দ্বিতীয় স্তরে দাউ দাউ করে পুড়ছেন। কারো কারো দৃষ্টিতে তিনি ছিলেন 'সারপেন্ট অব দ্য নাইল'। অনেকে আবার তাঁর আবেদনময়ী দিকটিকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। ফারাও রাজবংশের সর্বশেষ রাণী ক্লিওপেট্রা শুধুমাত্র মিশরীয় ইতিহাসের এক বিস্ময়কর নামই নন, ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত নারীদের মধ্যেও তিনি একজন।

ক্লিওপেট্রার সংক্ষিপ্ত জীবনী - খ্রিস্টপূর্ব ৬৯ সালে প্রাচীন মিসরের আলেকজান্দ্রিয়ায় জন্ম ক্লিওপেট্রার।তার পুরো নাম ক্লিওপেট্রা সপ্তম ফিলোপেটর। মেসিডোনিয়ান বংশোদ্ভূত সপ্তম মিশরীয় রানী হওয়ায় তাকে এই পরিচিতি বহন করতে হয়। 
গ্রিক শব্দ kleos আর pater থেকেই ক্লিওপেট্রা। যার স্ত্রী বাচক অর্থ করলে দাঁড়ায় "গ্লোরী অফ দ্য ফাদার"। তার আগে আরো ছয়জন কিওপেট্রা ছিলেন। তার পূর্বপুরুষ টলেমি ছিলেন মহামতি আলেক্সান্ডারের একজন সেনাপতি। খ্রিষ্টপূর্ব ৩২৩ সালে আলেক্সান্ডার মারা গেলে তার অন্যতম সেনাপতি টলেমি মিশরে স্বাধীন রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করেন। কিওপেট্রা এই বংশেরই শেষ শাসক। তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে মিসরে প্রায় ৩০০ বছরের মেসিডোনিয়ান শাসনের অবসান ঘটে। তার মায়ের দিকের পরিচয় অবশ্য পাওয়া যায় না। এ কারণে তিনি রোমানদের মতো শ্বেতাঙ্গ ছিলেন নাকি মিশরীয়দের মতো কৃষ্ণাঙ্গ তা জানা যায়নি।

অধিকাংশ ইতিহাসবিদের মতে খ্রিস্টপূর্ব ৫১ অব্দে রোম সম্রাট টলেমি অলেতিস মারা যান। মারা যাওয়ার আগে তার বিশাল সাম্রাজ্য ১৮ বছর বয়সী কন্যা ক্লিওপেট্রা [ক্লিওপেট্রা-৭] ও ১o বছর(কারো কারো মতে ১২ বছর) বয়সী পুত্র টলেমি-১৩-কে উইল করে দিয়ে যান। সেই সঙ্গে মৃত্যুর সময় রোমান নেতা পম্পেকে রাজ্য ও তার সন্তানদের দেখাশোনা করার দায়িত্ব দিয়ে যান। তখনকার মিশরীয় আইন অনুসারে দ্বৈত শাসনের নিয়মে রানী ক্লিওপেট্রার একজন নিজস্ব সঙ্গী থাকা বাধ্যতামূলক ছিল। কাজেই ক্লিওপেট্রাকে বিয়ে করতে হয় তারই ছোটভাই টলেমি-১৩ কে, যখন টলেমির বয়স ছিল মাত্র ১০বছর (কারো কারো মতে ১২ বছর)। ফলে আইনগতভাবে রাজ্য পরিচালনার দায়িত্বভার অর্পিত হলো ক্লিওপেট্রা এবং তার স্বামী (ওরফে ছোট ভাই) ত্রয়োদশ টলেমির উপর। ক্ষমতায় আরোহণের পর নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়েও ক্লিওপেট্রা তার শাসন চালিয়ে গেলেন।
ধারণা করা হয় কিওপেট্রার বড় দুই বোনের একজন (ক্লিওপেট্রা ষষ্ঠ) শৈশবেই মারা গিয়েছিলেন ও অপরজনকে (বেরেনিস) টলেমি অলেতিস-ই হত্যা করেছিলেন। এ ছাড়া ক্লিওপেট্রার ছোট আরো দুটি ভাই ছিল।
সে সময়ের মুদ্রায় অঙ্কিত ক্লিওপেট্রার প্রসন্ন ভাব, গোলাকার দৃঢ় চিবুক,ধনুকের মতো ঢেউ খেলানো ভুরু যুগলের নিচে অনিন্দ্য সুন্দর চোখ, প্রশস্ত ললাট আর সুতীক্ষ্ম নাকের চমৎকার সমন্বয় দেখা যায়। প্রখর বুদ্ধিমত্তা আর যেকোনো পরিস্থিতিতে খাপ খাইয়ে নেয়ার ক্ষমতা,সম্মোহনী ব্যক্তিত্ব তাকে করেছিল তুলনাহীন। তবে ক্লিওপেট্রা ও টলেমি-১৩ এর মধ্যকার সুসম্পর্ক স্থায়ী হয়নি। সিংহাসনে বসার মাস কয়েক পরেই দু’জনের মধ্যকার সম্পর্কে চিড় ধরে। ক্লিওপেট্রাও সব সরকারি দলিলপত্র থেকে তার ভাইয়ের নাম মুছে ফেলতে থাকেন। এমনকি মুদ্রায় তার একক পোর্ট্রেট ও নাম সংযোজন করেন। তবে তিনিও টিকতে পারেননি। দুর্ভিক্ষ, বিশৃঙ্খলা, প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের ফলে ক্লিওপেট্রাকেও সরে যেতে হয় ক্ষমতা থেকে। কিন্তু তিনি দমে যাননি মোটেও ধারণা করা হয় বোন আরসিনোইকে নিয়ে আরব সৈন্যদের সহায়তায় তিনি সিরিয়ায় চলে যান এ সময়।
ক্লিওপেট্রার মৃত্যু ও সমাধি নিয়ে নানান মত রয়েছে, সাথে রয়েছে রহস্যও।
তাঁর সৌন্দর্যের প্রতিদ্বন্দ্বী তিনিই। চোখের চাহনি বুকে কাঁপন ধরায় অতি বড় সম্রাটেরও। তীব্র অথচ সূক্ষ্ম কামনার অট্টহাসি কিংবা ডুমুরের ডালিতে থাকা বিষাক্ত অ্যাম্পের ছোবলের কথা লেখা আছে ইতিহাসের পাতায়। মিশরের সেই রহস্যময়ী ক্লিওপেট্রা এখনও বিস্ময়। তাঁর জীবনের গল্প এখনও ছত্রে ছত্রে রহস্যে মোড়া। মৃত্যু, সে তো আরও গভীর রহস্যময়। কোথায় তাঁর সমাধি, সেটাও এত দিন অধরা ছিল। মিশরীয় সেই রহস্যের জট খুলছে একটু একটু করে। একদল গবেষকের দাবি, অচিরেই খোঁজ মিলতে পারে ক্লিওপেট্রার সমাধির। ক্লিওপেট্রা সাধারণ মানুষের কাছে একটা ধাঁধার মতো। ইতিহাসের এক একটা অধ্যায়, এক এক রকম ভাবে তুলে ধরেছে তাঁর বর্ণময় জীবনকে। ক্লিওপেট্রা সপ্তম থিয়া ফিলোফেটর ছিলেন মিশরের রানি। প্রাচীন মিশরের শেষ ফারাও। তাঁর জন্মের আগে ছিলেন ছ’জন ক্লিওপেট্রা। 

খ্রিস্টপূর্ব ৩০ সাল। বন্দি ক্লিওপেট্রা বিষাক্ত অ্যাম্পের কামড় খেয়ে আত্মহত্যা করেন। কথিত আছে এই সাপ তাঁর কাছে ডুমুরের ঝুড়িতে লুকিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।এর পরের অধ্যায়টা পুরোপুরি রহস্যে মোড়া। সেই যে হারিয়ে গেলেন ক্লিওপেট্রা, তাঁর কবরের খোঁজও মিলল না। জনশ্রুতি, অ্যান্টনির সঙ্গেই তাঁকে সমাধি দেওয়া হয়েছিল। অনেকের বিশ্বাস আলেকজান্দ্রিয়াতেই সমাহিত করা হয় ক্লিওপেট্রাকে। ৩৬৫ খ্রিস্টাব্দে সুনামিতে ধ্বংস হয় এই শহর। অনেকে আবার মানেন আলেকজান্দ্রিয়ার অদূরে নীল নদের অববাহিকায় ট্যাপোসিরিস ম্যাগনায় রয়েছে তাঁর সমাধি। এই দাবিতেই মান্যতা দিচ্ছেন গবেষকরা। কারণ সম্প্রতি সেখানে একটি সমাধি আবিষ্কার করেছেন পুরাতত্ত্ববিদরা। সেখানে রয়েছে ২০০০ বছরের পুরোনো দুটি মমি। এই মমি দু’টি সোনার পাতে মোড়া। পুরাতত্ত্ববিদদের দাবি, তৎকালীন মিশরীয় সমাজের উচ্চপদস্থদের এ ভাবে সমাহিত করা হত। এক্সরে করে দেখা গিয়েছে মমি দু’টির মধ্যে একটি পুরুষ। অন্যটি নারী। সোনার ওই পাতে কিছু গুবরে পোকার ছবি পাওয়া গিয়েছে। যা মিশরে পুনর্জন্মের প্রতীক। এর থেকে পুরাতত্ত্ববিদদের অনুমান, এগুলি তৎকালীন মিশরের কোনও ক্ষমতাশালী পুরোহিতের। যাঁদের সঙ্গে ক্লিওপেট্রার যোগাযোগ ছিল। মমির পাশে কিছু মুদ্রাও পাওয়া গিয়েছে, যা ক্লিওপেট্রার সময়ের। এই দলের প্রধান,লিভারপুল বিশ্ববিদ্যালয়ের মিশরীয়বিদ্যার অধ্যাপক গ্লেন গডেনহো জানান, ২০০০ বছর পুরোনো ওই মমি দুটি। তাই সেগুলির পরীক্ষায় কিছুটা সময় লাগবে। তবে মমি দুটি যে ভাবে সোনার পাতে মোড়া ছিল, তাতে পরিষ্কার, সেগুলি তৎকালীন মিশরের কোনও ক্ষমতাশালী ব্যক্তির। টোপোসিরিস ম্যাগনায় ১৪ বছর ধরে খননকাজ চালাচ্ছেন ক্যাথলিন মার্টিনেজ। তিনিও আশাবাদী ওই এলাকায় অচিরেই খোঁজ মিলবে ক্লিওপেট্রার সমাধির। কারণ ওই এলাকার খুব কম অংশেই এখনও খননকাজ চালানো সম্ভব হয়েছে।এমনটা হলে ইতিহাসের সবচেয়ে চর্চিত একটা অধ্যায় স্পষ্ট হবে। ফিরে আসবেন সেই সুন্দরী, যাঁর সৌন্দর্যে মজে তামাম বিশ্ব। হয়তো জানা যাবে কী ভাবে হারিয়ে গেলেন ক্লিওপেট্রা, পাঠকদের সামনে আসবে আরও অজানা ইতিহাস। অপেক্ষায় রইলাম জানার জন্য।


এই ইতিহাস সংক্ষেপে বলছিলেন বিমল বাবু তার সহকারী অমিত বাবুকে। আজ অফিসে বিমল বাবু তার স্বেচ্ছাবসরের চিঠি দিতে এসেছেন। অমিত বাবু বললেন আপনার তো একটাই মেয়ে, তার বিয়ের কথা ভাববেন না? চাকরি ছেড়ে দিচ্ছেন যে!
- আর বলবেন না, মেয়ের জন্যই তো চাকরি ছাড়ছি। 
- কেনো কেনো?
- মেয়ে এখন একটা বড়ো কোম্পানি তে জব করছে, সিনিয়র কনসালট্যান্ট। আমাকে আর ওর মাকে কলকাতায় ফেলে রাখবে না। মুম্বাই নিয়ে চলে যাবে। বলছে তোমরা যেমন ছোটবেলায় আমায় আগলে রেখে মানুষ করেছো এখন আমার দায়িত্ব তোমাদের আগলে রাখা। আর কদিন এরকম ছুটে দৌড়ে অফিস যাবে? দু বছর কম চাকরি করলে কিছু যাবে আসবে না। তাই আজ চাকরি ছাড়ার চিঠি দিয়ে পরশু চলে যাবো মুম্বাই। 
- ও আচ্ছা। আপনারই কপাল বিমল বাবু।
- কেনো? আপনার তো ছেলেকে নিয়ে খুব গর্ব, অনেক বড় চাকরি করে যে।
- হ্যা, তা করে। কিন্তু মনটা আপনার মেয়ের মতো বড়ো নয়। বলেই দিয়েছে নিজেরা নিজেদের সামলে রেখো। বছরে এক আধবার হয়তো আসবে, তাও যদি ক্লায়েন্টের দরকার হয় তবেই। 
- আমার মেয়েকে নিয়ে খুব গর্ব হয়। ছেলে না থাকার কোনো দুঃখই নেই আমার। সত্যিই 'সি ইস গ্লোরি অফ ফাদার।' আজ আসি, অফিসের বাকি কাজ গুলো করে নিই। পরশু না হয় যাওয়ার আগে আপনার সাথে দেখা করে নেবো।
- হ্যা, আসুন। খুব ভালো থাকবেন। আপনার মেয়ের নাম ক্লিওপেট্রা হলে কিন্তু বেশ হতো। 
- হা হা, ভালো বলেছেন। আসি। আবার দেখা হবে।
একগাল হাসি নিয়ে বিমল বাবু বেরিয়ে গেলেন অমিত বাবুর ডেস্ক থেকে।

গুগল, ক্লিওপেট্রা র জীবনী, হায়রোগ্লিফের দেশে বই থেকে কিছু তথ্য নেওয়া হয়েছে। আর শেষ অংশটি  ক্লিওপেট্রার নামের সাথে মিল রেখে একটা ছোট গল্পের রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেছি মাত্র।  
 
©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

বুধবার, ১১ মে, ২০২২

পথের ডাক

দিগন্ত বিস্তৃত মেঘলা আকাশ

বৃষ্টিভেজা ফাঁকা রাস্তা

সঙ্গে চারিপাশে অসংখ্য বৃক্ষের মেলা…

মন বলে চল পালাই কোথা..

কোনো এক অদৃশ্য ডাকের হাতছানি।

যা লুকিয়ে আছে ঐ পথের বাঁকে র পরে..

আমি আসছি,হে পথ আমি তোমার পথিক,


তোমার ডাকে সারা দিতে আমি আসছি..।।


🙏🙏🙏🙏

রবিবার, ১ মে, ২০২২

মে দিবস(সুদেষ্ণা দত্ত)

 


মে দিবস(সুদেষ্ণা দত্ত)

মে দিবস–অর্থাৎ শ্রমিক দিবস(১লা মে)।শ্রমিকরা নানা দাবিদাওয়া ও অধিকার আদায়ের জন্য নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছিলেন।বিশ্বের আপামর শ্রমিককে শ্রদ্ধা নিবেদনেই আজকের এই দিনের মাহাত্ম্য লুকিয়ে আছে।শ্রমিক দিবসের গুরুত্ব,কেন এই দিনের নির্বাচন এসব মাথা ভারী করা লেখনীর ভার আমার কলম বইতে পারবে না।তাই সে গতিপথ পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

            যিনি শ্রম দান করেন,তিনিই শ্রমিক।প্রত্যেকের নিজের মত করেই কিছু চাহিদা,আশা থাকে।আকাশের বুকে সজল মেঘ বৃষ্টির ভার বয়ে বারি ধারা ঝরে স্নিগ্ধ করে আমাদের।পাহাড় তার বুকে নদীকে বয়ে বেড়ায়।বৃক্ষ ফল দান করে আমাদের খাদ্যভান্ডার সমৃদ্ধ করে।ফুল দান করে,করে প্রকৃতির সৌন্দর্যায়ন(বানান নিল না)।কিন্তু সেই বৃক্ষের মালিকানা যে আমাদের তাই ছেদনেও পড়ে না চোখের দু’ফোঁটা জল,নেই শাস্তির বিধান!কেউ দেয় উষ্ণতা,কেউ দেয় শীতলতা।কিন্তু মা-বাবা বা গুরুজনদের অবজ্ঞা করলে যেমন ভবিষ্যতে পস্তাতে হয়,তেমনই এই প্রকৃতির বিরুদ্ধাচরণ করলে সেও ধারণ করে ভয়াল রূপ।তার নেই কোন অর্থ বা স্বার্থের দাবি।তার দাবি খুব কম,তুমি আমায় এক বিন্দু দিলে,আমি তোমায় এক কাঁড়ি দিয়ে ভরিয়ে দেব।কিন্তু হায়...

              দেহের অনেক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ অনেক সময় বিশ্রাম পেলেও,একবার ভাবুন হৃৎপিন্ড যদি আট ঘণ্টা কাজের দাবি জানাত,আমাদের কী অবস্থা হত।কিন্তু আমরা অতিরিক্ত তেল-মশলা খেয়ে,ব্যায়াম বর্জন করে তার প্রতি বিমাতৃসুলভ আচরণ করি।তখন সেও অবাধ্য সন্তানের মতই সময়ের আগেই তার ঘড়ি ঘরে তালা ঝুলিয়ে দেয়।

              নারী-তিনি যখন মা বা স্ত্রী বা সন্তান,পরিবারের ধারণকারিণী,পুরুষ-তিনি যখন সন্তান,বাবা বা স্বামী পরিবার বহনকারী-কখনও হয়তো নদীর মজে যাওয়ার মতই এই সম্পর্কেও পলি পড়ে।কিন্তু অনেকসময়ই স্নেহ,মমতা,ভালবাসা,কর্তব্য দিয়ে সংসার তটিনীকে এগিয়ে নিয়ে যায় দাবিহীন।শুধু দাবি একটু ভালবাসা-সহানুভূতির।যে কোন ক্ষেত্রে একে অপরকে বুঝলে বোঝা না হয়ে বোঝাপড়া সহজ হয়।মালিক-শ্রমিক না ভেবে সকলের তরে সকলে আমরা ভাবলে বোধহয় শ্রমিক দিবসের প্রয়োজন হয় না।

 

©কপিরাইট রিজার্ভড ফর সুদেষ্ণা দত্ত।

ছবি-সংগৃহীত

বুধবার, ২৭ এপ্রিল, ২০২২

এস্কিমোস লাভ টু লিভ ইন নর্থ পোল ✍️ ডা: অরুণিমা দাস

এস্কিমোস লাভ টু লিভ ইন নর্থপোল
✍️ ডা:অরুণিমা দাস

উত্তরমেরু এলাকা মানুষের কাছে এক রহস্যময় জগৎ। সেখানে আকাশে থাকে অদ্ভুত রঙের অরোরা,আর বছরের দীর্ঘ সময় ধরে চলে আলো আঁধারের খেলা। বরফের তৈরি ইগলুতে বাস করে সেখানকার এস্কিমোরা। কেন তারা বাস করে প্রচণ্ড ঠাণ্ডা আর বরফের মধ্যে সে নিয়েও রয়েছে অনেক প্রশ্ন। এই ঠান্ডায় জমে বেঁচে থাকতে থাকতে তাদেরও তো ইচ্ছে করে নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে যেতে,কিন্তু যায় না তারা। আর কেনোই বা যায়না? সেই উত্তর খুঁজতে খুঁজতে হারিয়ে গেছিলাম ওদের দেশে,ওদের জীবনযাত্রা,খাদ্যাভ্যাস এসব পড়তে গিয়ে ওদের সাথে একাত্ম হয়ে পড়েছিলাম। ফিরে গেছিলাম স্কুল জীবনের দিন গুলোতে, ভূগোল ইতিহাসের সময়টাতে। যা জেনেছি সেটাই সংক্ষেপে লিখছি।

উত্তর মেরুর চারপাশে আলাস্কা,কানাডা,গ্রিনল্যান্ড ও রাশিয়া। উত্তর মেরু এক বিশাল এলাকা যার আয়তন প্রায় সম্পূর্ণ উত্তর আমেরিকার সমান। উত্তর মেরুতে বলতে গেলে সারা বছরই শীত থাকে ও শীতে তাপমাত্রা গড়ে মাইনাস ৪০ ডিগ্রিতে চলে আসে।উত্তর মেরু অঞ্চলে গ্রীষ্মকাল শুরু হয় জুলাই মাসের মাঝামাঝি এবং থাকে প্রায় আগস্টের শেষ পর্যন্ত। উত্তর মেরুতে গ্রীষ্মে জন্মে বিভিন্ন গাছপালা। উত্তর মেরু জোনের দক্ষিণাংশে আছে বরিল বনভূমি যা তাইগা বা স্নো ফরেস্ট নামেও পরিচিত।এতে ফার,লার্চ,মাউন্টেন অ্যাশ ও ফায়ারউইডের মতো বার্চ গাছ দেখা যায়। তবে আর্কটিক তুন্দ্রা এলাকায় বার্চ,উইলো,হিথ, লিঙ্গোনেবেরি,বাইবেরি,ব্লুবেরি,আর্কটিক পপি, কটনগ্রাস,লিঞ্চেন এবং মসেস নামের ঘাস দেখা যায়।

উত্তর মেরু এলাকার মানুষ কাঁচা বা খুব অল্প সেদ্ধ মাংস খেতে অভ্যস্ত। এভাবে মাংস খাওয়া হলে তাতে ভিটামিন সি পাওয়া যায়। পর্যাপ্ত শাক-সবজি পাওয়া না গেলেও এভাবে তারা ভিটামিন সি পেয়ে যায়। শীতকালে দীর্ঘদিন সূর্যের আলো পাওয়া না গেলেও গ্রীষ্মকালে এ এলাকায় সূর্যের আলো পাওয়া যায়। এ সময় পাওয়া সূর্যের আলোতে এবং বিভিন্ন খাবারের মাধ্যমে তাদের শরীরের ভিটামিন ডি এর চাহিদা মিটে যায়।

এস্কিমোরা কেন ঠান্ডা এলাকা ছেড়ে যায় না?এস্কিমোরা কেন প্রচণ্ড ঠাণ্ডা এলাকা ছেড়ে দক্ষিণের নাতিশীতোষ্ণ এলাকায় চলে আসে না?এটা একটা সাধারণ প্রশ্ন,উত্তর টাও বেশ অন্যরকমের।এস্কিমোদের দক্ষিণের নাতিশীতোষ্ণ এলাকায় চলে যাওয়ার কোনো কারণ নেই। তারা নিজের এলাকাতেই বেশ আরাম করেই বেঁচে আছে। অন্য এলাকায় গেলেই বরঞ্চ তাদের বিভিন্ন সমস্যা দেখা দেয়।১৯৮০ সালে দুজন ডেনিস চিকিৎসক বেঙ ও ডাইবার্জ গ্রীনল্যান্ডে কাজ করার সময় লক্ষ্য করেন এস্কিমোরা হার্ট ডিজিস ইমিউনড সত্যি কথা বলতে তারা কোন এস্কিমোকেই হার্ট ডিজিসে আক্রান্ত হতে দেখেননি তারা।ডেনিস অধিবাসীদের তুলনায় এস্কিমোদের রোগের বালাই অনেক কম। শুধু হার্ট ডিজিস ই নয়,স্কিন ডিজিস এছাড়াও রিউম্যাটিক ডিজিস বা জয়েন্ট সংক্রান্ত সমস্যা বহুলাংশে কম বা খুব কম শতাংশ লোকের হয় বললেই চলে।
এতো ভালো যখন থাকা যায় উত্তরে,খামোখা শুধু গরম পাবার জন্য নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে গিয়ে লাভ টা কি! তাই তারা উত্তর মেরুতে জমে যাওয়া ঠান্ডায় অবস্থান করতেই সাচ্ছন্দ্যবোধ করে।

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস


শুক্রবার, ২২ এপ্রিল, ২০২২

ভার্চুয়াল সম্পর্কের কথকথা ✍️ডা: অরুণিমা দাস


"দূরকে করেছে নিকট,আর পরিবার যে হয়েছে অনেক দূরের
মানুষ হয়েছে যান্ত্রিক,ভূমিকা যে রয়েছে এতে ভার্চুয়্যাল জগতের।"
     
যোগাযোগ প্রযুক্তির উন্নয়নের সুবাদে মানব সমাজ প্রবেশ করেছে নতুন এক জগতে। এর নাম ভার্চুয়াল জগত। বর্তমান প্রজন্মের ছেলে মেয়েরা ভার্চুয়াল জগতের মধ্যে প্রবেশ করে প্রতিনিয়ত নিজেরা শারীরিক কিংবা মানসিক ভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছে এবং এই দুর্বলতা হওয়ার প্রধান কারণ হচ্ছে ভার্চুয়াল জগত তাদের চোখের ঘুম প্রতিনিয়ত কেড়ে নিচ্ছে! ভার্চুয়াল জগতে আমরা মানুষ থেকে মানুষ অনেক দূরে সরে যাচ্ছি। বিশ্বস্ততার জায়গা, আস্থার জায়গা,সম্পর্কের জায়গা এসব থেকে আমরা বহুদূরে। আমরা একটা ভার্চুয়াল জীবন আছি আছি,আবার নেই নেই!এরকম সম্পর্কের মধ্যে প্রতিদিন ধাবিত হচ্ছি। বর্তমানে বিশ্বে যে প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে তাহলো তরুন তরুণীরা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটানোর চেয়ে মোবাইলের মাধ্যমে ভার্চুয়াল জগতে সময় ব্যয় করাকে বেশি পছন্দ করে। এর ফলে পারিবারিক আড্ডায় বসার প্রবণতা কমে গেছে। শুধু তাই নয় এই ভার্চুয়াল জগত মানুষের ঘুম কেড়ে নিচ্ছে।
কন্টিনিউয়াস একই পশ্চার মেইনটেইন করে মোবাইল বা ল্যাপটপ ব্যবহার করে তাহলে নেক মাসল স্প্যাসম হয়ে ব্রেনে অক্সিজেন সরবরাহ কমে যায়,রক্ত সঞ্চালনেও ব্যাঘাত ঘটে যার ফলে খুব তাড়াতাড়ি ক্লান্তি আসে এবং এই জন্য কাজের প্রতি কনসেন্ট্রেশন কম হয়ে যায়। বসে বসে কাজ করার দরুন আর সেডেন্টারী লাইফ স্টাইলের দরুন শরীরে মেদ জমছে,স্থূলতা দেখা দিচ্ছে। ওভারওয়েট, ওবেসিটি থেকে শুরু করে স্ট্রেসের জন্য টাইপ টু ডায়াবেটিস হবার সম্ভাবনা বাড়ছে। চোখে মোবাইলের আলো, ল্যাপটপের আলো কন্টিনিউয়াস পড়ছে আর এর ফলে ইচিং,ওয়াটারিং, রেডনেস দেখা দিচ্ছে। রাতে ঘুম ঠিক মতো হয় না, স্লিপ অ্যাপনিয়া দেখা দিতে পারে। 

যদিও অনেকের মতে সোশ্যাল মিডিয়া সামাজিক বন্ধন তৈরি করে কিন্তু এই এই মিডিয়া আবার আমাদের অনেক দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। ভার্চুয়াল এই জগতে আমাদের চাওয়া আর পাওয়ার মধ্যে জীবনটা আটকে গেছে।

এক গবেষণায় দেখা গেছে, ইন্টারনেটের নেশার কারণে ঘুম থেকে উঠতেও একেকজনের গড়ে দেরি হয় প্রায় ৯০ মিনিট। চিকিৎসকদের মতে, এভাবে দীর্ঘদিন ঘুমের সমস্যা চলতে থাকলে দেখা দিতে পারে হৃদরোগ এবং অ্যাংজাইটির সমস্যা। এর আগে ২০১৫ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে,যেসব কম বয়সী রোগী হার্ট অ্যাটাকের সমস্যা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়, তাদের ৯০ শতাংশই পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘুমাতে পারেন না। এর ফলে এটা স্পষ্ট যে,ভার্চুয়াল জগত আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলছে। ভার্চুয়াল জগত আমাদের জন্য যেমন নানা সুযোগ ও সম্ভাবনা তৈরি করেছে ঠিক তেমনি বাড়িয়ে দিয়েছে বিপদের আশঙ্কা। একটু অসতর্কতা ও অসচেতনতা বড় ধরনের বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। ভার্চুয়াল জগত হচ্ছে এমন এক জগত যেখানে মানুষে মানুষে সংযোগ ঘটে কম্পিউটার,মোবাইল তথা যন্ত্রের সহযোগিতায়। ভার্চুয়াল ওয়ার্ল্ড বা ভার্চুয়াল জগত পরিভাষাটি প্রথমবার ব্যবহার করেন উইলিয়াম গিবসন। তিনি হচ্ছেন সায়েন্স ফিকশনের বিখ্যাত লেখক। মানুষে-মানুষে যে যোগাযোগ ও লেনদেন তা বাস্তব জগতের বিপরীতে বিশ্বজনীন এবং এখানে একজন ব্যক্তি পরিচয় গোপন রাখতে পারে। এই জগতের নির্দিষ্ট সীমা-পরিসীমা নেই। আমরা যে ইন্টারনেট ব্যবহার করি তা সম্পর্কে একটু চিন্তা করলেই এই বাস্তবতা উপলব্ধি করা সম্ভব। বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে কোটি কোটি মানুষ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, ইমেইল ও চ্যাটরুমের মাধ্যমে ভার্চুয়াল জগতে তৎপরতা চালান।ইন্টারঅ্যাকশন  হচ্ছে ভার্চুয়াল জগতের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। যেখানে একসঙ্গে পরস্পরকে দেখা যায়,কথা বলা যায়,লিখে বা না লিখে মনের ভাব প্রকাশ করা যায়। রেডিও,টিভি ও পত্রপত্রিকার মতো গণমাধ্যমে যা সম্ভব নয়। বিশ্বায়নের যুগে এই জগতে প্রতিনিয়ত পরিবর্তন ঘটছে। তথ্য ও যোগাযোগ সংক্রান্ত প্রযুক্তির সহযোগিতায় এসব ঘটনা ঘটছে। ভার্চুয়াল জগত মানুষের সামনে এমন সব দিগন্ত খুলে দিয়েছে যা জ্ঞান-বিজ্ঞানের উন্নয়ন এবং সচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজে লাগানো সম্ভব। ভার্চুয়াল জগতের নানা ইতিবাচক দিক থাকলেও এর বিপদের মাত্রাও কম নয়। এই জগতে তৎপর সব শ্রেণির মানুষেরই বিপদে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ বাস্তব জগতের মতো ভার্চুয়াল জগতেও তৎপর রয়েছে নানা পর্যায়ের অপরাধী। যারা ভালো মানুষের ছদ্মবেশে প্রতিনিয়ত মানুষের ক্ষতি করে যাচ্ছে। কখনো হাতিয়ে নিচ্ছে মানুষের সর্বস্ব। 

একটা সময় ছিল ঘুম থেকে উঠে আমরা ফ্রেশ হয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে বা বসে পত্রিকার পাতায় চোখ রাখতাম আর আজ ঘুম থেকে উঠে বিছানার মধ্যে বসে থেকে ফেসবুকে চোখ থাকে।
ভার্চুয়াল জগতের কারণে বাবা-মা এবং শিশুদের মধ্যে দূরত্ব বাড়ার ধরণটা এতটাই ভয়াবহ যে,ছুটির দিনে কোথাও বেড়াতে গিয়েও শিশুরা মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত থাকে। আনন্দের মুহূর্তগুলো সঠিকভাবে উপভোগ করার অনুভূতিই যেন মরে যাচ্ছে ভেতর থেকে। এমত অবস্থায় বাবা-মা,শিক্ষক ও অভিভাবকদের উচিত বর্তমান প্রজন্মের তরুন তরুনীর ও শিশুদের ভার্চুয়াল জগতের নেতিবাচক প্রভাব থেকে নিজ নিজ সন্তানদের দূরে রাখার সর্বাত্মক চেষ্টা চালানো।

ভার্চুয়্যাল জগতের সাথে অবশ্যই সম্পর্ক রাখা দরকার কারণ কিছু পজিটিভ দিক অবশ্যই রয়েছে যেমন ভিডিও কল, অনলাইন ক্লাস রুম ইত্যাদি আরো অনেক কিছু। কিন্তু একটা ব্যালান্সড রিলেশন রাখা উচিত বলে আমার মনে হয়। লিমিটের বাইরে কোনো কিছু ব্যবহার করলে সেটাতো অবশ্যই মানসিক ও শারীরিক দুটো স্বাস্থ্যের পক্ষেই ক্ষতিকর।

পরিশেষে একটাই কথা বলার -
 "থাকো যে জগতেই,দিনের কিছু সময় নিজের সাথে কাটিও
 তবেই বুঝতে পারবে তুমিও যে অনন্য ও অদ্বিতীয়।"

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

বুধবার, ২০ এপ্রিল, ২০২২

শিরোনাম - বাড়িয়ে দাও তোমার হাত ✍️ডা: অরুণিমা দাস


গল্প ১: সোমবারের নাইট ডিউটি, মোটামুটি সারারাত কাজ করে গল্প ঠিক তৈরি হয়েই যায়। রাত আটটায় হ্যান্ডওভার নিতে গিয়ে বুঝলাম আজও আমার ভাগ্য সুপ্রসন্ন নয়। সার্জারিতে আটটা কেস পেন্ডিং। বুঝলাম ঘুম আজ আর ভুল করেও আসবে না আমার চোখে। সার্জারি একটা কেস আন্ডার করেছি,নিউরোসার্জারির দিদি এসে বললো হাইড্রসেফালাস এর বাচ্চা এসেছে একটা।
বুঝলাম আজ সত্যিই সারা রাতের মামলা। সার্জারি কেস একটু স্টেবল হতে নিউরো ওটিতে দৌড়ালাম। গিয়ে দেখি একটা চার বছরের বাচ্চা ওটির দরজার দিকে হাত বাড়িয়ে কাঁদছে,বুঝলাম মাকে খুঁজছে। বাইরে গিয়ে বাচ্চার মাকে সব বুঝিয়ে হাই রিস্ক কনসেন্ট ফর্ম সাইন করালাম। বাচ্চার মা আমার হাত ধরে বললো এই নিয়ে চারবার ওটি হচ্ছে ওর, একটু দেখবেন। কী আর বলবো! ভাষা খুঁজে পেলাম না সান্তনা দেওয়ার। হাইড্রোসেফলাস যে পুরোপুরি সারার নয়,ভেনট্রিকুলো পেরিটোনিয়াল সান্ট করেই সারাজীবন চলতে হবে। খালি বললাম চিন্তা করবেন না। হাতটা মুক্ত করে চলে এলাম। ঘন্টাখানেক পর ওটি শেষ হলে বাইরে রিকভারিতে বাচ্চা টাকে রাখা হলো। অল্প অল্প চোখ খুলছে। মাথাটা এত বড় যে চোখ খুলতেও পারছেনা ঠিক করে। ওর সাথে গিয়ে কথা বলে এলাম। বাচ্চাটার মা বললো আপনাদের ভরসার হাত না থাকলে চারবার ওটির ধাক্কা ও কিভাবে সামলাতো জানি না। বললাম চিন্তা করো না,ওর মনে লড়াই করার জন্য একটা অদম্য ইচ্ছে আছে,সেটাই ওকে জিতিয়ে দেবে। বলে হেসে বেরিয়ে গেলাম, নেক্সট কেস ওয়েটিং যে।

 গল্প ২: এটাও গতরাতের গল্প, সার্জারির একটা কেস পেপটিক পারফোরেশন। গিয়ে দেখি ছত্রিশ বছরের একটা লোক পেট ব্যথায় কাতরাচ্ছে। জিজ্ঞেস করলাম প্রতিদিন কতো পেগ চলে? কিছুক্ষন চুপ করে রইলো, তারপর বললো ওই একদিন ছাড়া ছাড়া খাই। বললাম পেট তো ফুটো করে ফেলেছ এই বয়সেই। বললো আমি ভালো হয়ে যাবো তো? বাড়িতে বউ,মেয়ে,বাবা,মা আছে। আর আমি একাই উপার্জন করি সংসারে। জ্ঞান তো ভালোই আছে দেখছি, তাহলে এসব খাও কেনো?
তোমার হাতে যখন সংসারের দায়িত্ব তাহলে সেই হাতকে পঙ্গু হতে দিওনা। ওরা তোমায় ভালোবাসে,ভরসা করে। ভরসার হাতটা সরিয়ে নিওনা। যাইহোক প্রপার কাউন্সেলিং করে কেস আন্ডার হলো। তিনঘণ্টা ধরে ওটি চলার পর ভগবানের আশীর্বাদে আর প্রপার ইন্ট্রাওপারেটিভ মনিটরিং এর জন্য ওকে রিভার্স করতে পারলাম। রোগী ওটি থেকে বেরোনোর আগে বললো আর ওসব ছোঁব না। শুনে হাসলাম,জানি এই ক্রেভিং এমন যে সহজে ও অ্যালকোহল ছাড়তে পারবেনা। বাড়ীর লোককে পোস্ট অপ রিহ্যাব এর অ্যাডভাইস দিয়ে রাত তিনটের দিকে রেস্ট রুমে চলে এলাম।

 গল্প ৩: রেস্টিং রুমে গিয়ে দেখি কেক সাজানো হয়ে গেছে, সিনিয়র আমার জন্য অপেক্ষা করছে। আজ থার্ড য়ার দিদির লাস্ট দিন ডিউটির। একমাস পর ওর এমডি ফাইনাল এক্সাম। প্রথম যখন ডিউটি পড়েছিল দিদিকে খুব ভয় পেতাম। কোনো ড্রাগস, ডোজ,ডাইলিউশন কিছু জানতাম না। বই পড়েও কিছু বুঝতে পারতাম না। দিদির হাত ধরেই সব শেখা হলো আসতে আসতে। দিদি বললো আর একমাস পর তুই থার্ড ইয়ার,এতদিন হাতে ধরে যা শিখিয়েছি কিছু ভুলিস না যেনো। দিদির হাত ধরে বললাম তোমার সাথে কাজ করে কনফিডেন্স পেয়েছি অনেক,এখন একাই সব কাজ করি। গর্বের ছোঁয়া দেখতে পেলাম দিদির চোখে মুখে। চলো কেকটা কেটে ফেলো। আজকের দিনে আর ইমোশনাল হয়োনা। আরও একটা বছর আমাকে কাটাতে হবে, তোমার কথা খুব মনে পড়বে গো। দিদি ছুরি বসিয়ে ফেলেছে ততক্ষনে কেকের ওপরে, আমি আর আর এম ও ম্যাম অল দ্য বেস্ট উইশ করলাম দিদিকে। সত্যিই দিদি কাজ শেখার জন্য হাত না ধরলে অনেক কিছুই অজানা থেকে যেতো।
দিদি চলে গেলো, নেক্সট ইয়ার আমিও বেরিয়ে যাবো,আমার জুনিয়র কে কিছু শিখিয়ে যাবো আর শিখবো ও নতুন অনেক কিছু। সিনিয়রিটি পরম্পরায় এরকম ভরসার হাত  ধরে এগিয়ে চলুক জুনিয়ররা। আর দিদির হোয়াটসঅ্যাপ স্ট্যাটাস দেওয়া কমপ্লিমেন্ট "উইথ মাই হার্ড ওয়ার্কিং অ্যান্ড বেস্ট জুনিয়র" এই কথাটাই পরম প্রাপ্তি পোস্ট গ্রাজুয়েশন পিরিয়ডে। অল দ্য বেস্ট দিদি ফর ইউর আপকামিং এক্সাম। সোমবার রাতের গল্প শেষ হলো। জানলা দিয়ে আলো আসছে, আর রাত কোথায়? সকাল আটটা বেজে গেছে। ডিউটি রুম থেকে বেরিয়ে হাঁটা দিলাম হস্টেলের পথে। আবার যে ডিউটি আছে সাড়ে নটা থেকে। এই রাত খুব স্মরণীয় হয়ে থাকবে আমার কাছে।

সত্য ঘটনা অবলম্বনে

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

ছবির সাথে কতটা গেলো জানি না। মন চাইলো, তাই লিখে ফেললাম।

সোমবার, ১১ এপ্রিল, ২০২২

#নাম ― 'বিদেহী আত্মা স্মরণে'। ✍🏼 মৃদুল কুমার দাস।

             ।। লতা মঙ্গেশকর।।
                 (১৯২৯ – ২০২২)
 শতবর্ষ থেকে একবছর দূরে 'মেরী আওয়াজ হি পেহচান হ্যায়' -এর কিন্নরকন্ঠী নাইটিঙ্গল, বহুকন্ঠের এককন্ঠী মেলডি লতাজীর জীবনাবসান ভারতীয় জীবনধারার কাছে মর্মান্তিক দুঃখের, কিন্তু সুখের বিষয় তিনি থেকে যাবেন প্রজন্মবিস্তারিত হয়ে। 
 সঙ্গীত জগতে প্রথম পদার্পণ মারাঠি ভাষায় গান দিয়ে। তারপর হিন্দি, বাংলা সহ ছত্রিশটি আঞ্চলিক ভাষায় তৎসহ পাশ্চাত্য সঙ্গীতে অবদান ভবি ভোলার নয়। তাঁর কন্ঠে ত্রিশ হাজার গান আছে,যা কোনো কন্ঠশিল্পীর নেই। বাঙালির প্রিয়জন। হেমন্ত-লতার যুগলবন্দী অনবদ্য ছিল। এমনকি হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে এমনই ঘণিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের মেয়ে রানুর জন্মের আগে স্ত্রী বেলা দেবীকে সাধ ভক্ষণ করিয়েছিলেন।
    এমন আত্মীয় পেয়ে দুর্লভ সৌভাগ্যের অধিকারী হয়েছে বাঙালি। বাংলার তাঁতের শাড়ী,বাংলা কথাসাহিত্যের বিশেষ করে শরৎচন্দ্রের উপন্যাসের অন্ধ ভক্ত ছিলেন। শরৎচন্দ্র মারাঠা অনুবাদে পড়তেন। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে ছিল ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সুরে সবচেয়ে বেশী গান গয়েছিলেন। এছাড়াও সুধীন দাশগুপ্ত,রবীন চ্যাটার্জি, সলিল চৌধুরীর সুরে গান গেয়েছিলেন। বাঙালি কানে তাঁর কন্ঠে গাওয়া গান বাঙালির কানে যেন অমৃতসুধা। যেমন ―
  হেমন্ত মুখপাধ্যায়ের সুরে বন্দেমাতরম্ গান হয়ে গেছে কালজয়ী,কালজয়ী বাংলা গান –
 একবার বিদায় দে মা...,সাতভাই চম্পা..., বৃষ্টি বৃষ্টি এ কোন অপরূপ সৃষ্টি...,অন্তবিহীন কাটে না যে দিন..., আমি চিরদিন তোমারই থাকব...,ও মোর ময়না গো...,ঘুমঘুম নিঃঝুম রাতের মায়ায়...
  হিন্দিতে কালজয়ী গান ― সত্যম শিবম সুন্দরম...,আ গলে লাগ যা....
 তাঁর কাছে বাঙালি মাত্রেরই ঋণ অপরিশোধ্য। ঋণ অন্তহীন। তাঁকে বিনম্র শ্রদ্ধা।
               
             ।। সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় ।।
                 (১৯৩১ ― ২০২২)

   বাংলা সঙ্গীতের আকাশে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় সন্ধ্যাতারা। বাবা নরেন্দ্র মুখোপাধ্যায়। মা হেমলতা দেবী। ছয় সন্তানের কনিষ্ঠ সন্ধ্যা। সঙ্গীত ঘরানায় মানুষ। মাও ভাল গান গাইতেন। তবে বাবার কাছে ভক্তিমূলক গান ― "প্রভু যে তুমি দাও দরশন" ― দিয়ে গানের ভূবনে যাত্রা শুরু করেন। মাত্র বারো বছরের সদ্য কিশোরী। এলেন কলকাতা বেতার ভবনে গল্পদাদুর আসরে। প্রথম গান গাইলেন গীতিকার অজয় ভট্টাচার্যের কথায় ও সুরে – "যদি না ফুরাল গান/ করিল দুয়ারে লতা/ নয়নে আছে গো জল।" পেলেন হাতে পাঁচটি টাকা। প্রথম রোজগার। সে কি আনন্দ! সেই যে শুরু সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় মানেই "এ শুধু গানের দিন...।" সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় মানেই বাঙালির আবেগ,বাঙালির ভালবাসা।
  ১৯৪৬ এ গিরিন চক্রবর্তীর কথায় ও সুরে তের বছর দশ মাস বয়সে প্রথম রেকর্ড ― "তোমার আকাশে ঝিলমিল করে...।" ১৯৪৮ এ রাইচাঁদ বড়ালের সুরে 'অঞ্জনগড়' ও রবীন চট্টোপাধ্যায়ের সুরে 'সমাপিকা'য় প্রথম নেপথ্য গান গেয়ে সিনেমা জগতে উজ্জ্বল হয়ে উঠলেন। রবীন্দ্রসঙ্গীত,নজরুলগীতি, চলচ্চিত্রের আধুনিক গান একদিকে,অন্যদিকে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের মধ্য দিয়ে অপ্রতিরোধ্য গতিতে ধেয়ে চললেন তিনি। 
  'অগ্নিপরীক্ষা', 'সবার উপরে','পথে হল দেরী' চলচ্চিত্রে নপথ্য কন্ঠে সুচিত্রা সেনের লিপে সে এক মণিকাঞ্চন যোগ যেন। ঠিক যেমন উত্তমকুমারের লিপে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। সলিল চৌধুরীর সুরে রকমারি সব গান ― "উজ্জ্বল এক ঝাঁক পায়রা..., ― কাটা কাটা  ছন্দে সলিল যেভাবে ধরেন,সন্ধ্যা সেভাবে ছবি আঁকেন। 'সপ্তপদী'-র  "এই পথ যদি না শেষ হয়..." কিংবা 'নায়িকা সংবাদ'–এ "কি মিষ্টি দেখো মিষ্টি..." কালজয়ী হয়ে আছে। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা – "মধুর মধুর বংশী বাজে..",বা যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের - "থই থই শাওন এল ওই...", 'মায়ামৃগ' ছবিতে – "ও বক বক বক বকম বকম পায়রা..", 'জয়জয়ন্তী ছবিতে – "আমাদের ছুটি ছুটি...", নচিকেতা ঘোষের সুরে ― "মায়াবতী মেঘে এল তন্দ্রা...", 'চিরদিনের' ছবিতে মান্না দে-র সঙ্গে দ্বৈত কন্ঠে– "আমি তোমার চিরদিনের..." আরো কত কত অজস্র গান বাঙালির শ্রুতিতে মুগ্ধতায় ভরিয়ে রেখেছিলেন। উস্তাদ বড়ে গোলামের কথায় ― "দেখো বেটা, এক ভাগ শিখনা হ্যায়,তিন ভাগ শুননা হ্যায়।"― এটাই তাঁর জীবনের মূলমন্ত্র ছিল। সারাদিন তিনি গান শুনতেন। রেওয়াজ করতেন। তিনি নশ্বর দেহে আর নেই, কিন্তু আছেন সুরের ঠিকানায় আম বাঙালির হৃদয়ে। তাঁর কাছে বাঙালি অন্তহীন ঋণী। তাঁকে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা।
           *****
            ।। 'শাঁওলি মিত্র' ।।
                (১৯৪৮ ― ১৯২২)
   
বিখ্যাত বাবা ও মায়ের সন্তান বিখ্যাত হন,ব্যতিক্রম দু'একটি ছাড়া। বাবা শম্ভু মিত্র, মা তৃপ্তি মিত্রের একমাত্র সন্তান শা়ঁওলি মিত্র মাত্র চুয়াত্তর বছরে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে শবদেহ হলেন। সিরিটি মহাশ্মশান যখন ত়াঁকে ধারণ করল তখন ত়াঁর পাশে ছিলেন একমাত্র মানসপুত্র সায়ক চক্রবর্তী ও মানসকন্যা অর্পিতা ঘোষ। তাঁর তাই নির্দেশ ছিল ইচ্ছাপত্রে - "তাঁর শবদেহকে যেন অযথা ফুলের মালার বোঝা বইতে না হয়। দাহ হওয়ার পর যেন সবাই জানতে পারে।" এমন ইচ্ছা পিতা শম্ভু মিত্রের মত,এও যেন পিতার কাছ থেকে  নির্দেশ পাওয়া। বাপের বেটি তো! এই নীরবে চলে যাওয়াটা আমাদের কাছে অনুভূত হল তিনি বড্ড অকালে চলে গেলেন। বারে বারে নিজস্ব পরিসরে বিশ্বাস নিয়ে গড়া সম্পর্কের ভাঙন শাঁওলি মিত্রকে একা করে দিত। শাঁওলি মিত্র আমাদের রিক্ত করে কোন পরপারে চলে গেলেন তাঁর স্পষ্টতম ও মিষ্টতম বাংলা বলাটিকে নিয়ে।
   ঋত্বিক ঘটকের 'যুক্তি তক্ক আর গপ্প' চলচ্চিত্রে বঙ্গবালা চরিত্র দিয়ে যাত্রা শুরু। মঞ্চে প্রথম পদার্পণ রবীন্দ্রনাথের 'ডাকঘর' নাটকের অমল চরিত্র রূপায়ণ দিয়ে। আর দেখতে দেখতে বাংলা নাট্যমোদি দর্শকের কাছে তিনি শাঁওলির চেয়ে 'নাথবতী অনাথবৎ' নামে বেশী আদরনীয় হয়ে গেলেন। জীবনের শ্রেষ্ঠ অভিনয় - 'নাথবতী অনাথবৎ'–এর শুরু তবলাতরঙ্গ বেজে ওঠা দিয়ে। বাজছে মন্দিরা, মৃদঙ্গ। মঞ্চে সার বেঁধে বসা জুড়ির দলের দিকে মুখটি ফিরে তিনি। একটা কালো কাঠের জলচৌকির ওপরে দুলছে একটা লম্বা বেণী। একটি আলতারাঙা পায়ের নূপুর তাল রাখছে ছন্দে। জুড়ির দল গান ধরেছে, গানের শেষে কথক ঠাকরুণ পেন্নাম করে বলে উঠলেন ‘‘এক অভাগিনী মেয়ের কথা! রানি, কিন্তু রানি নয়!
 'নাথবতী অনাথবৎ’ -এ এমন কুশলী অভিনয় দেখে নাট্য রসবেত্তা মাত্রেরই মনে বিস্ময়ের ঢেউ আছড়ে পড়ে। এই নাট্যবাংলার ইতিহাসে পেশাদার রঙ্গালয়ের বাইরে একমাত্র ‘নীলদর্পণ’ ছাড়া এত সাড়া-জাগানো অভিনয় আর হয়েছে কিনা সন্দেহ! একবার এক ঘটনা ঘটেছিল - মা তৃপ্তি মিত্র হঠাৎ অসুস্থ। তখন তিনি কলকাতার বাইরে নাথবতীর এক নাট্যশো শেষে সেই অবস্থায় মেকাপ না তুলে মাকে দেখতে ছুটে এলেন। মেক আপ তোলার সময়টুকু পর্যন্ত দিতে চাননা,কারণ পরের শো আছে বলে। 
   আর 'ডাকঘর' মঞ্চাভিনয় করার সময়ও ঘটনা যা ভোলার নয় - ছোটবেলা খুব অসুখে ভুগতেন। একবার তিনি জ্বরে শয্যাশায়ী। মা তৃপ্তি মিত্র 'ডাকঘর' নাটক বিছানায় দিয়ে বললেন- "তোকে অমলের অভিনয় করতে হবে।" সেদিন সেই নাটকটি পড়ে ছোট্ট শাঁওলি খুব কেঁদেছিলেন। অমলের অভিনয়ে খুব সাফল্য পেয়েছিলেন। নাটকে ডেডিকেটরাই এমন ইতিহাস গড়ার সুযোগের সদ্ব্যবহার করে থাকেন। মেয়ে শয্যাশায়ী,ওই পারবে অমলের ভেতরটা দেখতে, এটাই তো মোক্ষম সময়।
   তাঁর মঞ্চসফল অভিনয় যেমন - 'পুতুল খেলা', 'একটি রাজনৈতিক হত্যা', 'হযবরল', 'কথা অমৃতসমান', 'লঙ্কাদহন', 'পাগলা ঘোড়া', 'পাখি', 'গ্যালিলিওর জীবন', 'যদি আর একবার'।
      সংগীত নাটকের জন্য অ্যাকাদেমিক পুরস্কার পান ২০০৩ এ,২০০৯ এ পদ্মশ্রী,২০১২ তে পান বঙ্গবিভূষণ। রাজনীতি থেকে শত যোজন দূরে থাকতেন। কিন্তু সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রাম আন্দোলনের আন্যতম মুখ হয়ে উঠেছিলেন। মহাশ্বেতা দেবী চলে যাওয়ার পর বাংলা অ্যাকাদেমির তিনি দায়িত্ব নিয়েছিলেন। আবার একসময় স্বেচ্ছায় দায়িত্ব ছেড়েও দেন। তাঁর সম্পর্কে সফল মঞ্চাভিনেত্রী ও জাতীয় পুরস্কারে ভূষিতা সুদীপ্তা চক্রবর্তী এই অকাল প্রয়াণকে ঘিরে স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে বলেছেন - "অনেক আদর পেয়েছি। অনেক ভালবাসা। আদর করে কত কি খাইয়েছিলেন। আমি তাঁর বন্ধু বিপ্লবকেতন চক্রবর্তীর মেয়ে! অনেক কিছু শিখেছি। মঞ্চাভিনয়ের খুঁটিনাটি। অবাক চোখে তাকিয়ে দেখেছি ত়াঁর অভিনয় সেই ছোট্টবেলা থেকে। আমার নাটক দেখে ফোন করে খুব প্রশংসা করেছিলেন। আনন্দে কেঁদেই ফেলেছিলাম। বড় হয়ে একসঙ্গে সিনেমায় একটা কাজ করার আর্জি নিয়ে গিয়েছিলাম। রাজি হননি। তাই আর একসঙ্গে কাজ করার বা একদম সামনে থেকে অভিনয় দেখার সৌভাগ্য হল না।" আর সেই সাথে বাংলা নাট্যমোদি দর্শকও বাঁচবে শুধু 'নাথবতী আনাথবৎ'-এর স্মৃতি নিয়ে। বাংলার নাট্যমোদী দর্শকের হৃদয়ে চির অম্লান। চির ঋণী। তাঁকে বিনম্র শ্রদ্ধা।
                      *****

            ।। বাপি লাহিড়ী ।।
              (১৯৫২ ― ২০২২)

       সত্তরেই সঙ্গীত দুনিয়া হারাল তার ঝকঝকে তাজা তরুণ বাপি লাহিড়ীকে। তরুণই তো। সত্তর কোনো বয়স নাকি! গান শুনতে শুনতে যখন সকলে প্রবল উন্মাদনায় মত্ত, হঠাৎ জীবনের মঞ্চ ছেড়ে যাওয়া,আর গানের মঞ্চে সুর তাল থমকে গেলে দর্শককে যেমন বিমর্ষতা গ্রাস করে এও তাই― অকাল বিদায় কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী বাপির জন্য সমান বিমর্ষ।
   বাবা অপরেশ লাহিড়ী ও মা বাঁশরী লাহিড়ী দুই গুনী শিল্পীর সন্তান বাপি লাহিড়ী। স্বনামধন্য হবেন এ আর বিচিত্র কি। কিন্তু স্বনামধন্য হতে কম কাঠ খড় পোড়াতে হয়নি। বাবার গলদঘর্ম পরিশ্রম ছিল। সে পরিশ্রম বৃথা যায়নি, কারণ পিতা বুঝতেন গুনের কদর। মাত্র চার বছরে ভাল তবলা বাজাতেন বাপি। গুরু সামতাপ্রসাদ। তারপর একে একে পিয়ানোসহ বেশ কিছু বাদ্যযন্ত্রে খুব দক্ষ হয়ে ওঠেন। ১৯৬৪ তে মাত্র তের বছর বয়সে বাবার গানে সুর করলেন বাপি। এর পর এল ১৯৬৮ তে 'দাদু' ছায়াছবিতে সঙ্গীত পরিচালনার সুযোগ। এই ছবিতে আরো অনেকে ছিলেন সঙ্গীত পরিচালক,যেমন কালীপদ সেন,অনিল দত্ত সুবোধ রায় প্রমুখ। এর পর ১৯৭২ এ 'জনতার আদালত' ছবিতে এককভাবে সঙ্গীত পরিচালনা করলেন,যাতে গান গাইলেন অপরেশ লাহিড়ী ও বাঁশরী লাহিড়ী,এস প্রসাদ ও অমর পাল। কিন্তু বাবার কাছে মনের মত প্রত্যাশিত খ্যাতি আসছিল না দেখে বোম্বাই নিয়ে গেলেন। শুরু হল নতুন পর্ব। বাবার ছেলের জন্য খুব পরিশ্রম করলেন। কেননা বাপির প্রতিভার প্রতি বাবার অগাধ আস্থা ছিল বলে। আর সেই সূত্রে অচিরে ফল এল গানের কম্পিজিশন ঝোঁক থেকে। ১৯৭৩ এ প্রথম 'নানহা শিকার' হিন্দি ছবিতে সুরারোপ করলেন। ১৯৭৪ এ 'এক লড়কি বদনাম সি' ছবিতে কিশোরকুমার ও লতার গলায় – "রহে না রহে চাহে হাম অওর তুম...", ১৯৭৬ এ 'দিল সে মিলা দিল' ছবিতে – "ইয়ে ন্যায়না ইয়ে কাজল...", ১৯৭৭ এ 'আপ কি খাতির' ছবিতে– রবীন্দ্রসঙ্গীত "ফুলে ফুলে ঢলে ঢলে.." গানটির আদলে লতার গলায় গাওয়ালেন ― "রাজা মেরে তেরে লিয়ে...", ১৯৭৮ তে 'কলেজ গার্ল' ছবিতে কিশোরকুমারের গলায় গাওয়ালেন ― "পেয়ার মাঙ্গা হ্যায় তুমহি সে...", ১৯৭৯ তে 'মনোকামনা' ছবিতে নিজেই গাইলেন ― "তুমহারা পেয়ার চাহিয়ে...", ১৯৮১ তে 'জোস' ছবিতে আশা ভোঁশলেকে দিয়ে গাওয়ালেন ― "সব কুছ তো হ্যায়..." ইত্যাদি। এ তো গেল সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে বাপির জনপ্রিয়তার কথা। 
 এর পর বাপি লাহিড়ীর হাত ধরে এল ডিস্কো জমানা। ১৯৮২ তে 'ডিস্কো ড্যান্সার' দিয়ে শুরু। সে এক উন্মাদনা বলে উন্মাদনা! একই ঘরানার 'ড্যান্স ড্যান্স' ছবিটিও। ঊষা উত্থুপের গলায়― "হরি ওম হরি..",সালমা আগার গলায় – "ঝুম ঝুম ঝুম বাবা..." সঙ্গীত পরিচালনার সে এক নতুন যুগ। 'নমক হালাল' ছবির কিশোর কন্ঠে ― "পগ ঘুঙ্গরু..." - এতে কাওয়ালির বিচিত্র প্রয়োগ লক্ষনীয়। এই ছবিতে আশা ভোঁশলের গলায় ―"জওয়ানি জানেমন..." আবার অন্য আঙ্গিকে। 'শরাবি' ছবিতে – "দে দে পেয়ার ...",গুন্ডে' ছবির ― "তু নে মারি এন্ট্রিয়াঁ...", 'ডার্টি পিকচার'- এ "উলাল্লা উলাল্লা..." বাপি জনপ্রিয়তায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী। ১৯৮১ তে বিভূতি মুখোপাধ্যায়ের কথায় নিজের সুরে যে গানটি ― "আমি বিশ্বাস করি সঙ্গীতে/ তাই বিশ্বাস করি ভগবান/আমি এই পৃথিবীতে জন্মে জেনেছি /সঙ্গীত জীবনের আরেক নাম..." এটাই তাঁর জীবনের যেন মূলমন্ত্র। সঙ্গীত সম্পর্কে আসল উপলব্ধি। তিনি সমগ্ৰ দেশের স্বনামধন্য, বাঙালির জন্যও। তাঁকে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা। বিদেহী আত্মার  রইল শান্তি কামনা।
            *******

বৃহস্পতিবার, ৩১ মার্চ, ২০২২

গ্রন্থালোচনা ✍️ ডা: অরুণিমা দাস

 গ্রন্থালোচনা
✍️ ডা: অরুণিমা দাস

নীহার রঞ্জন গুপ্ত সম্পর্কে কিছু কথা ও তাঁর লেখা 'হাসপাতাল' উপন্যাসের পাঠ প্রতিক্রিয়া

লেখক পরিচিতি -
 ডাঃ নীহাররঞ্জন গুপ্ত (জন্মঃ ৬ই জুন, ১৯১১ – মৃত্যুঃ ২০শে ফেব্রুয়ারি, ১৯৮৬) একজন ভারতীয় বাঙালি লেখক। তিনি ছিলেন জনপ্রিয় রহস্য কাহিনীকার এবং চিকিৎসক। তিনি বিখ্যাত গোয়েন্দা চরিত্র  কিরীটি রায়ের স্রষ্টা হিসেবে উপমহাদেশে স্মরণীয় হয়ে আছেন।১৯১১ সালের ৬ই জুন তৎকালীন  যশোরের (বর্তমান নড়াইল জেলার) লোহাগড়া উপজেলার ইটনায় জন্মগ্রহণ করেন। তার পরিবার ছিল বিখ্যাত কবিরাজ বংশীয়। তার পিতা-মাতার নাম সত্যরঞ্জন গুপ্ত এবং লবঙ্গলতা দেবী। তিনি শৈশবকাল কাটিয়েছেন কলকাতায়।
ছোটবেলা থেকেই তিনি সবসময় স্বপ্ন দেখতেন লেখক হবার। একসময় তিনি  শান্তিনিকেতনে  গিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের  আশীর্বাদ গ্রহণসহ তাঁর অটোগ্রাফ সংগ্রহ করেন। আঠারো বছর বয়সে নীহাররঞ্জন তার প্রথম উপন্যাস রাজকুমার 
রচনা করেন। ইংল্যান্ডে অবস্থানকালীন সময়ে তিনি গোয়েন্দা গল্প রচনায় আগ্রহান্বিত হয়ে লেখার উত্তরন ঘটান এবং আগাথা ক্রিস্টির সাথে সাক্ষাৎ করেন। ভারতে ফিরে এসে তিনি তার প্রথম গোয়েন্দা উপন্যাস  কালোভ্রমর রচনা করেন। এতে তিনি গোয়েন্দা চরিত্র হিসেবে কিরীটি রায়কে সংযোজন করেন যা বাংলা গোয়েন্দা সাহিত্যে এক অনবদ্য সৃষ্টি। পরবর্তীতে কিরীটি খুব জনপ্রিয়তা পায় বাঙালি পাঠকমহলে। তিনি বাংলা সাহিত্যে রহস্য কাহিনী রচনার ক্ষেত্রে অপ্রতিদ্বন্দ্বী লেখক ছিলেন। উপমহাদেশীয় প্রেক্ষাপট ও উপযোগী করে রচিত হয়েছে তার রহস্য উপন্যাসগুলো। বর্মা বা অধুনা মায়ানমার দেশের কথা বার বার ঘুরে ফিরে এসেছে তার রচনায়। এ পর্যন্ত প্রায় পঁয়তাল্লিশটি উপন্যাসকে  বাংলা ও হিন্দি ভাষায় চলচ্চিত্রায়ণ করা হয়েছে যথাক্রমে টলিউড ও বলিউডে এছাড়াও তিনি শিশুদের উপযোগী সাহিত্য পত্রিকা সবুজ সাহিত্যের সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৮৮ সালে  বাংলাদেশের বিখ্যাত চিত্রকর এস এম সুলতান  ইটনায় অবস্থিত নীহাররঞ্জন গুপ্তের বাসভবনে  শিশুস্বর্গ প্রতিষ্ঠা করেন। ২৪ নভেম্বর, ১৯৯৩ সালে নড়াইলের তৎকালীন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ আলী হোসেন এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। পরবর্তীতে এস এম সুলতানের মৃত্যুর পর শিশু সংগঠনের কর্মীরা তা দখল করে। ২০০৩ সালে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ নীহাররঞ্জন গুপ্তের বাসভবন অধিগ্রহণ ও সংরক্ষণের জন্য উদ্যোগী হয়। কিন্তু, আজ অবদি এ বিষয়ে কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি।

সদ্য পড়ে শেষ করেছি ওনার লেখা একটি বই, হাসপাতাল। খুব সংক্ষিপ্ত ভাবে সেই প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করার চেষ্টা করছি।

"সৌজন্য বল, বন্ধুত্ব বল, তার মধ্যে অর্থের দেনাপাওনা আনতে নেই। কারণ তাতে করে অতি বড় বন্ধুত্ব বা সৌজন্যের মধ্যেও চিড় খেতে পারে।" -হাসপাতাল

যেহেতু ডাক্তার তাই হাসপাতাল নামে একটা উপন্যাস থাকবেনা আর তা পড়বোনা - তা কি হয়। সব ডাক্তারদের এই বইটি পড়া উচিত বলে আমার মনে হয়। এক মেয়ের জীবন সংগ্রাম। মেয়েদের নিত্য দিনের ইনকমপ্লিট এবরশনের অভিজ্ঞতা। আর পুরুষ সমাজের নিত্য অভ্যাস। হয়ত দিনশেষে বইটি সেই ডাক্তারনীকে করে তুলবে অনেক শক্ত। দিনশেষে কি শর্বরী কি খুব সুখে ছিল? রাত গুলো কি নির্ঘুম হয়নি মাঝে মাঝে? শৈবাল এর দিকটা উপন্যাসে কমই ছিল। সেও বিশাল ভুলের সাক্ষী। কিন্তু সংসারে জেদ, অভিমান খুব খারাপ জিনিস। একপক্ষের জেদ সংসারে আরেকপক্ষকে জেদ করতে শেখায়। মানুশ বেশিদিন সহ্য করেনা। অপরদিকে জলি সেই একরোখা স্বামীকেই মানিয়ে নেবার অসম্ভব ক্ষমতায় কি সুন্দর সাজিয়ে নিল। স্বামীও হয়ে গেল সামাজিক। স্বামীকেও মাঝে মাঝে কম্প্রোমাইজ করতে হয়। আর উপন্যাসের নামের প্রতি সুবিচার রেখে বারবার এসেছে রোগীদেরকথা, ডাক্তারদের কথা, অসহ্য রোগের কথা। আর দিনশেষে লেখক দাবী রেখেছেন ভবিষ্যতের দিকে। রোগের এই জ্বালা থেকে মানুষ যেন মুক্তি পায়। চিকিৎসকের জীবন যে একটা ব্যবসা নয় এটুকু যেন সবাই জানতে পারে। অর্থের মোহে কেউ যেন শতকরা নব্বইজন ডাক্তারের মত ডাক্তারী পড়তে না যায়। আজও যে সব জীবানু মানুষের শরীরে রোগ ছড়িয়ে তাদের অকাল মৃত্যুমুখে টেনে নিয়ে যাচ্ছে তাদের যেন ধ্বংস করার পথ খুজে পায় পড়াশোনা করে। এই রোগ ও রোগের দু:স্বপ্নকে মুছে ফেলে যেন সব চিকিৎসক মঙ্গলের, শান্তির, সুন্দর স্বাস্থ্যের সন্ধান দিতে পারে মানুষকে।

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

মঙ্গলবার, ২৯ মার্চ, ২০২২

হোক কষ্ট - আছি পাশে

 হোক কষ্ট- আছি পাশে
✍️ডা: অরুণিমা দাস


গল্প ১:পার্কের বেঞ্চে বাবার সাথে বসে আছে একটা ছোট্ট ছেলে। আপন মনে বল নিয়ে খেলা করছে। সামনে দিয়ে একটা আইস ক্রিম গাড়ী যাচ্ছিল। ছেলেটা এক দৃষ্টে তাকিয়ে আছে ওই দিকে। বাবা মনের কথা বুঝতে পেরে একটা আইস ক্রিম কিনে এনে দিলেন ছেলেটিকে। যতটা না খেলো তার চেয়ে বেশি ফেলে নষ্ট করলো। জামা কাপড়ের অবস্থাও খারাপ হলো। দুর থেকে একজন ভদ্রমহিলা জিনিসটা লক্ষ্য করছিলেন। কাছে এসে বললেন কি অভদ্র ছেলে রে বাবা! কোনো ম্যা শেখায় নি মা বাবা। শুনে ছেলেটির বাবা বেঞ্চ থেকে উঠে গিয়ে বললেন ম্যানার্স! হোয়াটস দ্যাট? ওসব ম্যানার্স আপনার কাছে রাখুন। আমার ছেলে অটিজমে আক্রান্ত। আমার কাছে খুব স্পেশাল ও। যখন ওর মা জানতে পারে ও অটিস্টিক চাইল্ড, ছেড়ে চলে যায় ওকে। আমিই ছেড়ে যেতে পারিনি ওকে। ওর মনের ভাষা বুঝতে রেগুলার নেটে পড়াশোনা করি। এখন আর কোনো অসুবিধে হয় না। ও নিজের মতো করে একটা জগৎ বানিয়ে নিয়েছে যেখানে শুধু আমি ছাড়া কেউ নেই। রোজ দৌড়ে ছুটে অফিস করি, ওকে নিয়েই অফিস যাই, যতই কষ্টে জর্জরিত থাকি ওকে আমি ঠিক মানুষ করবোই। পাশে আছি ওর সবসময়। ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি শক্তি দিন আমায়। ছেলেটি বাবার কোলের কাছে এসে বললো বাব..বা। চলো বাবা আমরা বাড়ি যাই, বললেন ছেলের বাবা। ছেলেকে নিয়ে পার্ক থেকে চলে গেলেন। ভদ্রমহিলা সরি বললেন,কিন্তু শোনার মত কেউ ছিলো না সেখানে। মনে মনে এক অসহায় বাবার লড়াইকে কুর্নিশ জানালেন। 


গল্প ২ : আন্ডার গ্রাজুয়েট করছি যখন মেডিসিন ক্লাসে দেখতাম এক স্যার সবসময় মেয়েকে নিয়ে ডিউটি তে আসতেন। মেয়েটিকে ডক্টরস রুমে বসিয়ে আমাদের ক্লাস নিতেন। ক্লাস শেষ হয়ে গেলে মেয়েকে গিয়ে পড়াতেন, অঙ্ক করাতেন। একদিন কথা প্রসঙ্গে আমাদের মেডিসিন ওয়ার্ডের গ্রুপ ডি দাদা কে জিজ্ঞেস করলাম স্যার মেয়েকে নিয়ে এরকম সব জায়গায় যান? দাদা বললো হ্যা ম্যাডাম, স্যারের স্ত্রী তো সিজোফ্রেনিয়াতে আক্রান্ত।  নিজের বাপের বাড়ীতে থাকেন। স্যার প্রথমে খুব ভেঙে পড়েছিলেন। পরে নিজেকে সামলে নেন মেয়ের কথা ভেবে। এখন মেয়েকে এক মুহুর্ত কাছছাড়া করেন না। আপনাদের ক্লাস নেবেন, রাউন্ড দেবেন তারপর ঠিক সময় মতো মেয়েকে কোচিং ক্লাসে নিয়ে ছুটবেন। সব শুনে মনে মনে
স্যারের প্রতি শ্রদ্ধা আরও বেড়ে গেলো। পরে স্যারের মেয়ের সাথে ভালো সম্পর্ক হয়ে গেছিলো আমাদের। স্যার বলতেন আমাদের, জীবনে যতই কষ্ট আসুক, হার মানবিনা। লড়াই করে যাবি শেষ পর্যন্ত। ঈশ্বরও তোদের পাশে এসে দাঁড়াবেন। স্যারের কথা গুলো মেনে চলার চেষ্টা করি আজও।


গল্প ৩ : সোমবারের রাত, নাইট ডিউটি। কিছু ঘটবেনা এটা হতেই পারে না। অর্থোপেডিক বন্ধু এসে বললো একটা বয়স্ক মহিলা এসেছে, হিপ ডিসলোকেশন নিয়ে। ওর হিপ প্রপার পজিশনে এনে প্লাস্টার করবো। বললাম আচ্ছা কর, আই ভি ড্রাগস দিয়ে সিডেট করে রাখবো। টেবিলে গিয়ে দেখি এক আশি বছরের বয়স্কা মহিলা। অসহ্য যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। জিজ্ঞেস করলাম কতদিন আগে হয়েছে? বললো দিন পনেরো হবে। এতদিন আসোনি কেনো গো? বললো নাতনীর পরীক্ষা ছিল, ওকে কে রান্না করে দেবে? ওর তো নিজের কেউ নেই। আজ আর পারছিলাম না যন্ত্রণা সহ্য করতে, তাই ও নিয়ে এলো। বাইরে হাই রিস্ক কনসেন্ট নিতে গিয়ে দেখলাম নাতনি কাঁদছে। বললাম এই বয়সে অনেক সমস্যা হতে পারে, তাই বন্ড সাইন করতে হবে তোমায়। হাতে ধরে বললো আমার কেউ নেই ম্যাডাম উনি ছাড়া। এতদিন কোমর যন্ত্রণা নিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে ছিল শুধু আমার জন্য, আজ আর লুকোতে পারেনি আমার থেকে। আজ একপ্রকার জোর করে নিয়ে এলাম। সব শুনে সাইন করিয়ে নিয়ে ভেতরে এলাম। মহিলা বললেন ওর আরও দুটো পরীক্ষা বাকি গো। বললাম এতো ভেবো না সব ঠিক হয়ে যাবে। যখন এক্স রে প্লেট দেখলাম, দেখি একটা ফেমোরাল হেড ইমপ্ল্যান্ট বসানো আছে সেটাই ডিসলোকেট হয়েছে। এটা একদিনের ঘটনা নয়। একমাস ধরে ধরে এটা নিজের জায়গা থেকে সরে গেছে ক্রমশ। আর বুঝতে পেরেও শুধু নাতনীর কথা ভেবে বৃদ্ধা অসহ্য যন্ত্রণা নিয়েও সহ্য করে গেছে কষ্টটা।তারপর শুরু হলো ম্যানিপুলেশন, টানা ৪৫ মিনিটের চেষ্টায় কিছুটা মোবিলাইজ হলো ফেমোরাল হেড। ফাইব্রোসিস হয়ে হেড আর্টিকুলেশনের জায়গাটা ছোট হয়ে যাওয়ার জন্য পুরোটা ঠিক হলো না। বলা হলো অপারেশন লাগবে। সেটা শুনেও বৃদ্ধা বললো যা হবে আমার নাতনীর পরীক্ষার পর। আমায় এখন বাড়ি ছেড়ে দাও। ব্রেস পড়িয়ে প্লাস্টার করে ছেড়ে দেওয়া হলো ওনাকে। 
সত্যিই এই মানুষের লড়াই গুলো কি অদ্ভুত রকমের। কেউ নিজের জন্য ভাবছে না। প্রাণপাত করছে নিজের ছেলে, মেয়ে বা নাতি নাতনীর জন্য। 

ছবির সাথে লেখাটা গেলো কিনা জানিনা, তবে ছবি দেখে যেটা বুঝলাম, সবাই নিজের ভেতরে যন্ত্রণা নিয়েও ঈশ্বরের কাছে লড়াইয়ের শক্তির জন্য প্রার্থনা করে যাচ্ছে অবিরত নিজেদের আপনজনদের রক্ষা করার জন্য। লড়াই চলছে প্রতিনিয়ত,বেঁচে থাকার আর বাঁচিয়ে রাখার লড়াই। 

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

রবিবার, ২৭ মার্চ, ২০২২

#নাম ― প্রতাপচন্দ্র মজুমদার। ✍️ ― মৃদুল কুমার দাস।

#শিরোনাম ― 
    প্রতাপচন্দ্র মজুমদার।
    ✍️― মৃদুল কুমার দাস।

    হিন্দুধর্মের আঙিনায় বহুচর্চিত স্বনামধন্যগণের নামের তালিকায় ঊনবিংশ শতাব্দীর আটের-নয়ের দশকে একটি উল্লেখযোগ্য নামের সংযোজন ঘটেছিল,তিনি হলেন প্রতাপচন্দ্র মজুমদার(২অক্টোবর ১৮৪০- ২০ মে ১৯০৫)। পরিচয়― প্রেসিডেন্সী কলেজের প্রাক্তনী, 'ব্যাঙ্ক অফ বেঙ্গল'-এর কর্মী, ব্রহ্মানন্দ কেশবচন্দ্র সেনের উক্ত ব্যাঙ্কের সহকর্মী, 'নববিধান ব্রাহ্মসমাজ'- এর কেশবচন্দ্রের উৎসাহী সমর্থক, আমেরিকায় প্রথম পদার্পন(২৮ আগষ্ট,১৮৮৩, ম্যারাথন জাহাজ হতে বোস্টন বন্দরে),চিকাগো ধর্মসম্মেলনে (১৮৯৩) স্বামীজীর যোগদানের সময় নানা অপপ্রচারে যুক্ত হওয়া,এমনকি চিকাগো ধর্মসম্মেলনে 'অ্যাডভাইসরি কাউন্সিল'-এর মনোনীত সদস্য,'মেড ইন ইন্ডিয়া,লাভস ইন ইউ.এস.এ' শ্লোগানের উদ্গাতা। জন্ম বাঁশবড়িয়া গ্রামে, জেলা হুগলি। 
  কেন তাঁর হিন্দু ধর্মের প্রচারক হয়ে প্রথম আতলান্তিক পেরিয়ে আমেরিকায় যাওয়া! বলা হয় দূঃসাহস বটে! এর আগে হুগলীরই রাজা রামমোহন রায় কালপানি পাড়ি দিয়ে বিলেতে যাওয়ার দুঃসাহস দেখিয়েছিলেন। কিন্তু আমেরিকা যাওয়ার দুঃসাহস আর তাঁর হয়ে ওঠেনি। তাঁর ইংল্যান্ডেই অকালমৃত্যু ঘটেছিল। প্রতাপচন্দ্র আমেরিকা পাড়ি দেওয়া জরুরী মনে করেছিলেন কারণ দিনকেদিন মাইনে-করা ক্রিশ্চিয়ান মিশনারিগণ যেভাবে এই উপমহাদেশে এসে হিন্দুধর্মের নিরন্তর কুৎসা রটনা করে চলেছেন, এর একটা বিহিত না হলে নয়। শিক্ষিত মধ্যবিত্ত এ বঙ্গের যুবসমাজ যেভাবে খ্রিস্টধর্মের দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে, ধর্মান্তরিত হওয়ার একটা ট্রেন্ড তৈরী হতে চলেছে, এর বিহিত একটা নাহলে হিন্দুধর্মের বড়ই দুর্দিন আসতে চলেছে। ইংল্যান্ডে, আয়ারল্যান্ডে তবু বেশ কিছুটা হিন্দুধর্ম প্রচার পেলেও মহাশক্তিধর দেশ আমেরিকায় প্রচার বাকি থাকায় কোনো কাজের কাজ হচ্ছে না। ইদানিং পশ্চিমী দুনিয়ার পাশ্চাত্যের শিরোমণি মানে আমেরিকা,ঐ আরকি তেলা মাথায় তেল না দিলে প্রচার-মেলা জমে না। আমেরিকা জানলে, স্বীকৃতি দিলে আমরা তবেই স্বীকৃতি পাব। বিশ্বের ধনী দেশের থেকে প্রচার পাওয়া কার না সখ জাগে! আমেরিকা বললে তবেই আমরা নিজেদের চিনব,যেমন চিনেছিলাম স্বামী বিবেকানন্দকে। তাই আমেরিকায় যেকোনোভাবে হিন্দুধর্মকে পৌঁছে দিতেই হবে। সেখানে 'ভাগবদ্গীতা'র ইংরেজি অনুবাদ পৌঁছানো খুব জরুরী। কেননা সেখানে গীতার মর্ম বোঝার রালফ উড্রো এমারসনের মত  অনেক পন্ডিত আছেন। 
  ইউটেরিয়ান চার্চের সহযোগিতায় ১৮৭৪ এ ইউরোপব্যাপী (ইংল্যান্ড, জার্মানি...) হিন্দুধর্মের প্রচার সেরেছিলেন। তারপরে ১৮৭৯ তে মাথায় আসে আমেরিকার কথা। তারই ক'বছর পরে ১৮৮৩-র জানুয়ারী মাসে কলকাতায় নববিধান ব্রাহ্মসমাজের উৎসবে আমেরিকায় হিন্দুধর্ম প্রচারের সর্বসম্মত প্রস্তাব গৃহীত হয়। দায়িত্বভার অর্পিত হয় প্রতাপচন্দ্র মজুমদারের উপর। সেইমত প্রতাপচন্দ্র মজুমদার আতলান্তিক পেরিয়ে আমেরিকায় পৌঁছন ১৮৮৩-র ২৮ আগষ্ট। আর এই প্রচারের ব্যায়বাহূল্য নিরসনের জন্য একটি অর্থ সংগ্রহের কমিটি গঠিত হয়েছিল। এই ঘটনাকেই   আমেরিকায় হিন্দুধর্ম প্রচারের প্রথম ভিত্তিপ্রস্তর বলে অভিহিত করা হয়। এর পর ১৯৬৫ পর্যন্ত চলল নিরন্তর প্রয়াস যা ছিল লক্ষ্যে পড়ার মত। এই কর্মযজ্ঞের প্রতিনিধিস্থানীয় ছিলেন এগারজন। তাঁরা হলেন ― প্রথম প্রতাপচন্দ্র মজুমদার(১৮৮৩)। এরপর ক্রমে ক্রমে ২.মোহিনীমোহন চট্টোপাধ্যায় (১৮৮৬), ৩.স্বামী বিবেকানন্দ (১৮৯৩), ৪.স্বামী সারদানন্দ (১৮৯৬), ৫.স্বামী অভেদানন্দ (১৮৯৭), ৬.স্বামী তুরীয়ানন্দ (১৮৯৯), ৭.স্বামী ত্রিগুণাতীতানন্দ (১৯০৩), ৮.পরমহংস যোগানন্দ(১৯২০), ৯.মহানাব্রত ব্রহ্মচারী(১৯৩৩), ১০. শ্রীচিন্ময়কুমার ঘোষ (১৯৪৬), ১১. আচার্য অভয়াচরণ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ (১৯৬৫)।
  আমেরিকায় হিন্দুধর্ম প্রচারের আদি পুরুষ হলেন প্রতাপচন্দ্র মজুমদার। তিনি ইয়োরোপে 'ব্রিটিশ অ্যান্ড ফরেন ইউনিটারিয়ান অ্যাসোসিয়েশন' -এর সম্পাদক রেভারেন্ড রবার্ট স্পিয়ার্সের সম্পাদিত পত্রিকা 'দ্য ক্রিশ্চান লাইফ'পত্রিকায় প্রথম লেখা শুরু করেছিলেন। পত্রিকার বিজ্ঞাপনে প্রতাপচন্দ্র মজুমদার সম্পর্কে এভাবে বলা হয়েছিল, ভারতে ইংরেজ শাসনের পক্ষে জনমত গড়ে তোলা প্রত্যেক ইংরেজের কর্তব্য,এই সংক্রান্ত মতামত নিয়ে প্রতাপচন্দ্র মজুমদারের বক্তব্যগুলি গ্রহণ করা জরুরী,যা এদেশের পক্ষে অত্যন্ত হিতকর হবে। রবার্ট স্পিয়ার্সের সহযোগিতায় মজুমদারের সভাগুলিতে যথেষ্ট লোক সমাগম হত বক্তব্য শুনতে। বার্মিংহাম টাউনহলে তো প্রায় তিন হাজারের মত শ্রোতা হাজির হয়েছিলেন। এর পর তিনি যান আমেরিকায়। আমেরিকায় যাওয়ার জন্য আমন্ত্রণ পেয়েছিলেন ইউনিটারিয়ান সোসাইটির অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথি যাজক রেভারেন্ড পুটনামের কাছ থেকে।
     আমেরিকায় প্রতাপচন্দ্রের দিনে দিনে ক্রমেই জনপ্রিয়তা বাড়তে লাগল দেখে আমেরিকার 'আমেরিকান ইউনিটারিয়ান অ্যাসোসিয়েশন' সমূহ দায়িত্বভার গ্রহণ করেছিল শ্রীমজুমদারের। 
   শ্রীমজুমদার সারাটোগা-য় যে বক্তৃতা করেন তাতে ভারতবর্ষের ধর্ম-সংস্কার সম্পর্কে যা বলেছিলেন আমেরিকাবাসীর সে মুগ্ধতার শেষ ছিল না। তা থেকে ভারতবর্ষ নিয়ে আমেরিকানরা প্রবল আগ্রহী হন। সবার দৃষ্টি পড়ে  প্রাচ্যের এই পরিব্রাজক হিন্দু দার্শনিক, শিক্ষক ও ধর্মস্কারকের দিকে। তাতে কে ছিলেন না ― জাতীয় নেতা, ধরর্মযাজক থেকে অগণিত আলোকশিক্ষিত আমেরিকানবাসীগণ। তাঁর বক্তব্যে এও বার বার উঠে এসেছে, খ্রিস্টধর্মের প্রতি ভারতীয়গণ যথেষ্ট শ্রদ্ধাশীল। 
  আমেরিকায় বিভিন্ন সভায় যখন প্রতাপচন্দ্র বক্তৃতা শুরু করতেন তখন শুরুতে সংস্কৃত মন্ত্র তো কখনো কখনো নীরবতা পালন করতেন। আর বলতেন সারা বিশ্বে ধর্মীয় বৈচিত্র্যের কথা। আর সাহসের সঙ্গে বলতেন পাশ্চাত্যও এবার সনাতন ভারতবর্ষ থেকে কিছু ধর্মপ্রচারক নিজেদের দেশে আনুক,তাহলে ধর্মের মধ্যে বৈচিত্র্য ক্রমশ বোঝা যাবে,ধর্মীয় উদারতা আসবে। আর অকপটে যে কথা দিয়ে আমেরিকাকে মুগ্ধ করে ফেলেছিলেন তাহল ― "আমি নিজেও একজন হিন্দু প্রোটেস্টান্ট। ইতিহাস পড়ুন, বৈদিক চিন্তার বিরুদ্ধে ভারতে প্রতিবাদ-স্বরূপ সাংখ্য এসেছিল, বৌদ্ধ ধর্মও সনাতন ধর্মের বিরুদ্ধে এক প্রবল প্রতিবাদ, মধ্যযুগে শিখধর্ম ও বাংলার বৈষ্ণবধর্মও একধরনের প্রতিবাদ এবং ঊনিশ শতকের ব্রাহ্মধর্মও আর এক প্রতিবাদ।" 
   প্রতাপচন্দ্রের এও এক শ্রেষ্ঠ কীর্তি ইংরেজিতে রচিত 'দ্য ওরিয়েন্টাল ক্রাইস্ট' বইটির জন্য, যা তাঁকে লেখক ও চিন্তাবীদ হিসেবে আমেরিকানদের কাছে যথেষ্ট স্বীকৃতি এনে দিয়েছিল। 
  সুতরাং এটা নিঃসন্দেহে প্রমাণিত  পাশ্চাত্যে প্রতাপচন্দ্র মজুমদার ভারতীয় সনাতন ধর্মের কথা প্রথম শুনিয়েছিলেন। এই ভারতচিন্তনের কথায় আমেরিকা সেদিন রুদ্ধদ্বার উদ্ঘাটন করেছিল। সেইজন্য যখন ১৮৯৩ এ চিকাগো মহাধর্মসম্মেলন হয়েছিল তখন সেই মহাধর্মসভার 'অ্যাডভাইসরি কাউন্সিল'-এর তিনি একজন মনোনীত সদস্য হয়েছিলেন।
                          ****
#কপিরাইট রিজার্ভ ফর মৃদুল কুমার দাস।

শুক্রবার, ২৫ মার্চ, ২০২২

গ্রন্থালোচনা (হায়রোগ্লিফের দেশে )



 বইয়ের নাম - হায়রোগ্লিফের দেশে
 
 ✍️ ডা: অরুণিমা দাস



কদিন আগে পড়ে শেষ করেছি হায়রোগ্লিফের দেশে বইটি। লেখক হলেন অনির্বাণ ঘোষ যিনি পেশায় একজন ডক্টর (সার্জেন)বর্তমানে লন্ডনে থাকেন। মিশরের ইতিহাস এতো সুন্দর ভাবে তুলে ধরেছেন তিনি যে বইটি পড়া শুরু করলে শেষ না হওয়া পর্যন্ত মনে একটা অতৃপ্তি থেকে যায়। ইতিহাস যে বোরিং না হয়ে এত ইন্টারেস্টিং হতে পারে তার পরিচয় পাই লেখকের লেখায়। বইটি পড়ে প্রতিক্রিয়া নিজের ভাষায় ব্যক্ত করার চেষ্টা করছি।

মিশর...ইতিহাস বা ভ্রমণপ্রেমীদের কাছে এটি কেবল একটি নাম নয়,আবেগও বটে। সেই আবেগকেই দুই মলাটে বন্দী করার চেষ্টা করেছেন অনির্বাণ ঘোষ। উনার এই চেষ্টা সত্যিই প্রশংসার দাবী রাখে। সহজ ঘরোয়া আড্ডার ভঙ্গিতে মিশরের বেশকিছু উল্লেখযোগ্য ব্যাপারস্যাপার তুলে ধরেছেন 'হায়রোগ্লিফের দেশে'। জানিয়েছেন বেশ কিছু অজানা গল্প।
মিশরের নাম শুনলেই সবার আগে কাকাবাবুর 'মিশর রহস্য'-এর কথা মনে পড়ে যায়। অবশ্য শুধু আমার নয়,প্রদীপ্ত আর স্পন্দনেরও কিন্তু মিশরের নাম শুনলে পিরামিডের আগে কাকাবাবুর ছবিই চোখের সামনে ভাসতে থাকে।প্রদীপ্ত আর স্পন্দনই গল্পের মূল চরিত্র, অবশ্য ভবেশদাকেও ভুললে চলবে না। কারণ তিনিই তো আমাদের মিশর ঘোরাবেন। চলমান এনসাইক্লোপিডিয়া হলেন ভবেশ দা। আসলে এটা কোনো ইতিহাসের বই নয়। তার চেয়ে বলা ভালো স্পন্দন,প্রদীপ্ত আর ভবেশদার আড্ডা এটা। মিশরের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের বর্ণনা গল্পচ্ছলে বলে আমাদের মোহাবিষ্ট করে গেছেন ভবেশদা। মিশর নামটাতেই কেমন যেন একটা রহস্য রহস্য গন্ধ পাওয়া যায়। মিশরে কিন্তু শুধু পিরামিড আর তুতেনখামেনই না, আরো অনেক কিছুই ছিল। ওসাইরিস, হায়ারোগ্লিফ, বুক অব দ্য ডেড, ফারাও নামের রহস্য, স্ফিংসের মূর্তি, ওবেলিস্ক, পিরামিড কীভাবে বানানো হলো, আর্কিওলজিস্টদের পরিচয়, ক্লিওপেট্রার ইতিহাসসহ আরো অনেক কথা এই বইয়ে উঠে এসেছে। সেই সাথে ইতিহাসের বিষয়গুলো ভালোমতো বোঝানোর জন্য ছবি আর ম্যাপ তো ছিলই। তবে বইয়ের শেষে পেলাম বেশ বড়সড় একটা চমক! ভবেশদার ইঙ্গিত দেখে মনে হচ্ছে পরের কোনো বইতেও আমরা আবারও এই ত্রয়ীর দেখা পাবো।ইতিহাসের মতন একটা কঠিন বিষয় যারা সহজ ভাষায় পড়তে চায়, তাদের জন্য এই বইটা খুব স্পেশাল একটা বই হবে আশা রাখি। বোঝাই যায় লেখক কতটা পড়াশুনা করে এই বইটা লিখেছেন। তাই তো অবলীলায় মিশরের অজানা ইতিহাস ও রহস্য সম্পর্কে কথা বলতে পেরেছেন তিনি। যাদের মিশরের প্রাচীন ইতিহাস সম্পর্কে জানার বিশেষ আগ্রহ আছে, তাদের জন্য এই বইটা খুব উপভোগ্য এবং আকর্ষনীয়। 
আর বাংলায় খুব সম্ভবত প্রাচীণ মিশর নিয়ে লেখা সেরা বই। গল্পের ছলে রহস্য সৃষ্টি করে প্রাচীন মিশরের কাহিনি বলায় ইতিহাসের কাঠখোট্টা ভাবও নেই। প্রাচীন মিশরের দেব দেবী, মিথ, ফারাও, পিরামিড, ভ্যালি অভ কিংস, টেম্পল অভ আবু সিম্বল, হায়ারোগ্লিফ, মমি, অবিলিস্ক, স্ফিংক্স, নেপোলিয়ন আর আলেকজান্ডারের মিশর আক্রমণ, আলেকজেন্দ্রিয়ার বিখ্যাত লাইব্রেরি আর লাইটহাউস, বিখ্যাত সব আর্কিওলজিস্ট আর তাদের আবিষ্কারের দুর্দান্ত কাহিনি, আখনাতেন, রামেসিস, তুতানখামেন, অনিন্দ্য সুন্দরী নেফারতিতি, ইতিহাসের প্রথম মহিলা ফারাও হাতশেপশুত, ক্লিওপেট্রা কি নেই এই এখানে। সাথে ক্লাসিক সব ছবি আর দুর্দান্ত সব ইলাস্ট্রেশন। পুরো বইটি ভীষণরকম উপভোগ্য। হায়রোগ্লিফের দেশে আপনার যাত্রা শুভ হোক। 

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

মঙ্গলবার, ২২ মার্চ, ২০২২

ধরো হাল শক্ত হাতে


  ধরো হাল শক্ত হাতে
 ✍️ডা: অরুণিমা দাস
    

 গল্প ১ :
প্রথম গল্প অরিনকে নিয়ে। আমাদের কলেজে শিশু বিভাগে ঠাই এখন ওর। বয়স ছয় বছর। যখন জন্মেছিল তখন থেকেই বোঝা গেছিলো নানান শারীরিক ত্রুটি আছে ওর। জন্মের ৭ দিন পর মা ওকে ছেড়ে পালিয়ে যায়। জীবন যুদ্ধে অসুস্থ ছেলে কে নিয়ে লড়াই করার শক্তি ছিল না ওর মায়ের, তাই পালিয়ে বেঁচেছিল। রেখে গেছিলো একটা চিঠি শুধু। কিন্তু হার মানেনি ওয়ার্ডের চিকিৎসক আর নার্স রা। নিয়মিত চিকিৎসা, প্রপার স্পিচ থেরাপি, ফিজিওথেরাপি আর অরিনের প্রতি তাদের ভালোবাসায় অরিন আজ পুরোপুরি হাঁটতে না পারলেও ক্রাচের সাহায্যে হেঁটে চলে নিজের কাজ টুকু করতে পারে। চোখের কিছু ত্রুটির কারণে দেখতে সমস্যা হলেও আগের চেয়ে অনেক কম। কদিন আগেই পায়ে কাঁচ ফুটিয়ে একটা বড়ো ঘা তৈরি করেছিল পায়ে। আমার কাছে প্রি আনেস্থেটিক চেক আপের জন্য যখন আসে, ওকে বলি ভয় পাস না। ওই টুকু বাচ্চা উত্তর দিল "এখন আর ভয় পাই না দিদি, আমি লোহাও হজম করে নিতে পারি।" জন্মের সাতদিন পর থেকে যার জীবন যুদ্ধে লড়াই চলছে তার কাছে এটা তো খুবই সামান্য ব্যাপার। এখন ওর ওটি হয়ে গেছে। সুস্থ আছে ও। ওটি ঢোকার আগে কোনদিন দেখা হলে গুড মর্নিং বলে ছোট্ট একটা হাসি দেয়। এই হাসি হার না মানার হাসি বুঝতে পারি। ওই ছোট্ট শিশু আমার কাছে বিরাট অনুপ্রেরণা।

 গল্প ২: গতকালের নাইট ডিউটি নিয়ে একটা গল্প। আমার প্রতিটি নাইট ডিউটি তে কিছু না কিছু ঘাটা কেস হবেই। কাল ও তাই হয়েছে বলার অপেক্ষা রাখে না। মাঝরাতে একটা পেশেন্ট ভর্তি হলো বার্স্ট আবডোমেন নিয়ে। এরকম পেশেন্ট সাধারণত ইলেক্টিভ কেস হিসেবে ভর্তি হয়, ইমার্জেন্সী তে এসেছে মানে খারাপ অবস্থা। জিজ্ঞেস করলাম এতদিন কি করছিলে? বললো দিদি পেটে ব্যান্ডেজ জড়িয়ে থাকতাম, পরীক্ষা ছিল বলে ভর্তি হইনি। আজ বিকেলে পরীক্ষা দিয়ে ফেরার সময় বাকি স্টিচ গুলো খুলে যাওয়ায় এত যন্ত্রণা হচ্ছিলো যে আর থাকতে পারলাম না। তবে পরীক্ষা খুব ভালো দিয়েছি ম্যাম। সত্যিই সফলতা এভাবেই আসে, বুঝলাম। কমফোর্ট জোনের বাইরে বেরিয়ে চড়াই উতরাই পেরিয়ে বোধহয় সফলতাকে ছোঁয়া যায়।
পোস্ট অপ পিরিয়ডে সে এখন ভালোই আছে আশা করি। 

 গল্প ৩: এটা হলো অন্য এক লড়াইয়ের গল্প যে লড়াইতে না জিতলে হয়তো আজ প্রথম দুটো গল্প লেখার মত অবস্থায় আসতাম না। এমবিবিএস পাস করার পর ইন্টার্নশিপ তো মন দিয়েই করেছিলাম, পেরিফেরি কলেজ মানেই কাজের খুব চাপ। ওই এক বছরে বই থেকে অনেক দূরে চলে গেছিলাম। ফাইনাল ইয়ারের পড়ার চাপ থেকে মুক্তি পেয়েছিলাম বলে আর বই পত্র ছুঁয়েও দেখতাম না। ডবল ডিউটি, নার্সিং হোম, হাউস স্টাফ শিপ করছি। প্রচুর পয়সার মুখ দেখছি কিন্তু পরে বুঝলাম নামের পাশে স্পেশালিটি ডিগ্রী না থাকলে এসব উপার্জন বেকার। সব বন্ধুরা দেখতাম পোস্ট গ্রাজুয়েট এন্ট্রান্স এক্সামের জন্য পড়ছে। বই পত্র কিনলেও পড়তে ইচ্ছে করতো না। ডিউটি আর ঘুম এভাবেই চলছিল। হাউসস্টাফশিপ করে আরো এক বছর নষ্ট করলাম। তখন কিছু বন্ধুরা চান্স পেয়ে গেছে এম ডি তে। সেই বছরটা মন দিয়ে পড়ার চেষ্টা করলাম। পড়ার বইগুলোতে মনোনিবেশ করতে বেশ কষ্ট হচ্ছে, খালি ঘুম পেয়ে যাচ্ছে। চব্বিশ খানা সাবজেক্টের একদিনে এক্সাম আর তিনশোটা কোয়েশ্চন আর হলের সাড়ে তিন ঘণ্টা আমার ভাগ্য নির্ধারণ করবে ভেবেই আতঙ্কিত হতাম। যাইহোক এভাবে এক বছর গেলো, পরীক্ষা দিলাম। রেজাল্ট হলো না কিছুই, নো র‍্যাঙ্ক এলো। ভাবলাম আরেকটা বার ট্রাই নিয়ে দেখি। আরো একটা বছর কোনো রকম ইনকাম নেই সেই অবস্থায় পড়তে বসা। কোনো আত্মীয়দের সাথে কথা বলতাম না ভয়ে। কারণ কথা হলেই জিজ্ঞেস করতো " কি রে এমবিবিএস পাস করে করলি টা কি! পোস্ট গ্রাজুয়েট এন্ট্রান্স ক্র্যাক করতে না পারলে কি করবি?" এই কথা গুলো মনের ওপর এত প্রভাব ফেলতে লাগলো যে পড়ায় মন বসাতে পারতাম না। তারপর নিজেকে পুরোপুরি আলাদা করে নিলাম বাইরের জগৎ থেকে। বুঝলাম নিজের  মোটিভেটার নিজেকেই হতে হবে। পড়তে সবসময় ভালো লাগতো না। মাঝে মাঝে ইউ টিউব সন্দীপ মাহেস্বরী র ভিডিও দেখতাম। যথাসময়ে পরীক্ষা এসে গেলো। এক বছর পড়ার পড়েও রেজাল্ট কোনো রকম হলো। যা স্কোর হলো তাতে বড়জোর এনাটমি, বায়োকেমিস্ট্রি আসবে। কিন্তু এই সাবজেক্ট গুলোর সাথে অতটা হৃদ্যতা ছিল না। সবাই বললো দুবার হলো এবার জি ডি এম ও শিপ জয়েন করে গ্রামে চলে যা। কিন্তু কোনোদিন নিজের মন ছাড়া কারোর কথা শুনিনি। বাড়িতে সবাইকে বুঝিয়ে নিজের কলেজ প্যাথলজিতে হাউস স্টাফ শিপ নিলাম কারণ ক্লাস করার আর বই কেনার খরচটা উঠে যাবে এতে। ছ মাস মত ডিউটি করলাম। কিছুটা টাকা জমিয়ে বাড়িতে বসলাম শেষ তিন মাস পরে পরীক্ষা দেবো বলে। সব বন্ধুরা পেয়ে গেছে ততদিনে চান্স। কেউ ফার্স্ট ইয়ার, কেউ বা সেকেন্ড ইয়ার। ওদের দেখলে কষ্ট হতো খুব, কিন্তু ভেঙে পড়লে চলবে না জানতাম। তাই শেষ তিনমাস আদা জল খেয়ে লাগলাম। এটাই শেষ চান্স। আর কোনো চান্স পাবো না আমি কারণ সিলেবাসে আমূল পরিবর্তন আসছে পরের বছর। রাতে তিন চার ঘণ্টা ঘুম আর বাকি সব সময় পড়া, রিভিশন দিতে লাগলাম। সোশ্যাল মিডিয়া থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে নিলাম। পরীক্ষা এসে গেলো জানুয়ারি তে। এক রাতের কালীপূজার মত একটা পরীক্ষা জীবনের পরবর্তী গন্তব্য নির্ধারণ করবে। পরীক্ষা দিলাম হলো আগের দুবারের চেয়ে ভালোই। রেজাল্ট যেদিন বেরোলো স্কোর দেখে বুঝলাম না আর গ্রামে যেতে হবে না। আমার লড়াই বিফলে যায়নি।
 কাউন্সেলিংয়ের ধাপ উত্তীর্ণ হয়ে শেষে নিজের মনোমত কলেজে পছন্দমত সাবজেক্ট নিয়ে ভর্তি হলাম। দেখা যাক এর পর কি হয়! সুপার স্পেশালিটি নিয়ে পড়তে পারি কিনা!! একটা কথা সব সময় মাথায় রাখি, কঠোর পরিশ্রমের কোনো বিকল্প নেই। দেরিতে হলেও সাকসেস আসতে বাধ্য। 
         "এই জীবনের পথ সোজা নয় যেন,
                  বড়ো আঁকাবাঁকা বন্ধুর।।"
এই কথা গুলো মাথায় রেখে চলার চেষ্টা করি। স্বপ্ন দেখি হয়তো কোনো একদিন কোনো স্টেজ দাড়িয়ে আমিও কাউকে অনুপ্রেরণা মূলক কথা বলবো, লড়াইতে জেতার আদর্শ পথের দিশা হয়তো বা দেখাতে পারবো।

সত্য ঘটনা অবলম্বনে

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

শিরোনাম - দুরত্ব✍️ ডা: অরুণিমা দাস

 শিরোনাম - দুরত্ব ✍️ ডা: অরুণিমা দাস আধুনিকতা মানেই অন্যরকম একটা ব্যাপার, উন্নতির পথে এগিয়ে যাবার সিড়ি তৈরি করে দেয় আধুনিকতা। আজকাল কেউ আ...