মঙ্গলবার, ১৫ মার্চ, ২০২২

বেঙ্গলি কালচার

বেঙ্গলি কালচার
 
✍️ডা: অরুণিমা দাস



বাঙালি সংস্কৃতি বলতে সাধারণত বোঝানো হয় বিশেষ সমাজের সাহিত্য, সংগীত, ললিত কলা, ক্রিড়া, মানবিকতা, জ্ঞানের উৎকর্ষ ও আরো অনেক শান্তি ও সৌন্দর্যের সমাহার। এর পরও ব্যাপক দৃষ্টিতে দেখলে সংস্কৃতি হলো মানুষের জ্ঞান, আচার-আচরণ, বিশ্বাস, রীতিনীতি, নীতিবোধ, চিরাচরিত প্রথা, সমষ্টিগত মনোভাব, সামাজিক প্রতিষ্ঠান এবং অর্জিত কীর্তিসমূহ। নৃতাত্ত্বিক দিক দিয়ে সংস্কৃতি আবার ভিন্ন ধরনের একটি জটিল ধারণা। যেহেতু সব সংস্কৃতিই উৎস, বিকাশ, মূল্যবোধ এবং সংগঠনের দিক দিয়ে বিশিষ্ট, তাই বাহ্যিক রূপরেখা, তার বিবিধ প্রকাশ এবং নির্যাসে এক সংস্কৃতি অন্য সংস্কৃতি থেকে যথেষ্ঠ পৃথক। হাজার হাজার বছর ধরে নানা নৃতাত্ত্বিক এবং ধর্মীয় গোষ্ঠী ও শাখা-গোষ্ঠী, নানা শ্রেণির মিলন, পারস্পরিক প্রভাব এবং সমন্বয়ের ফলে গড়ে উঠেছে বঙ্গীয় সংস্কৃতি। বহু শতাব্দী ধরে সংস্কৃতির বিভিন্ন, এমনকি, পরস্পর-বিরোধী উপাদানের সহাবস্থান এবং সমন্বয়ের ফলে বঙ্গীয় অঞ্চলে বাঙালিত্বের এমন এক বৈশিষ্ট্য গড়ে উঠেছে যাকে বলা যায় বঙ্গীয় সংস্কৃতি এবং এক কথায় বলা যায় বঙ্গদেশ ও বাংলাভাষীদের সংস্কৃতি।
বাঙালি সংস্কৃতির ভিত্তি  বঙ্গীয় সংস্কৃতি যেহেতু বাংলাদেশ এবং বাংলাভাষীদের সংস্কৃতি, সে কারণে ‘বাঙ্গালা’ নামে একটি স্বতন্ত্র অঞ্চল গড়ে ওঠার আগে অথবা বাংলা ভাষা পুরোপুরি বঙ্গীয় বৈশিষ্ট্য লাভ করার আগেকার আঞ্চলিক সংস্কৃতিকে বাঙালি সংস্কৃতি বলে অন্তত তত্ত্বগতভাবে আখ্যায়িত করা যায় না। আবার এও স্বীকার্য যে,সুলতানি আমলের বাঙ্গালা রাজ্য অথবা বাংলা ভাষা গড়ে ওঠার মুহূর্ত থেকে বাঙালি সংস্কৃতির জন্ম হয়নি। বঙ্গীয় সংস্কৃতির ভিত্তি গড়ে উঠেছিলো আরো অনেক আগে থেকে।
বাঙ্গালা নামে পরিচিত এই বিরাট এলাকায় ছিলো অনেকগুলি রাজ্য-গৌড়, রাঢ়, দক্ষিণ রাঢ়, সুহ্ম, বরেন্দ্রী,সমতট এবং বঙ্গ। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে আরও ছোটোখাটো রাজ্য ছিল। ১৩৫০-এর দশকে গৌড়ের সুলতান শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ সোনারগাঁ জয় করে ‘শাহ-ই বাঙালিয়ান’ অর্থাৎ বাঙালিদের শাহ উপাধি গ্রহণ করেন। বৃহত্তর ‘বাঙ্গালা’র জন্ম তার আগে হয়নি। অন্য দিকে, বাংলা ভাষাও আবার মোটামুটি ওই সময়েই নিজের বৈশিষ্ট্য অর্জন করে স্বতন্ত্র ভাষার রূপ লাভ করে। দুদিক থেকেই বিবেচনা করলে বঙ্গীয় সংস্কৃতির বয়স তাই আটশো অথবা বড় জোর এক হাজার বছর। এর চেয়ে একে পুরানো বলে গণ্য করা যায় না। কিন্তু এই সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল এই অঞ্চলের হাজার হাজার বছরের পুরানো সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ওপর ভিত্তি করে। একটা দৃষ্টান্ত দিয়ে বলা যায় যে, খাদ্যাভ্যাসের কারণে বাঙালিদের নাম ‘ভেতো’ বাঙালি। আর্য অথবা মুসলমানরা এ দেশে ধান আনেননি, ধানের চাষ এ অঞ্চলে আরম্ভ হয়েছিল অন্তত পাঁচ হাজার বছর আগে। পরে কখনো আর্য, কখনো সেন, কখনো তুর্কি, কখনো আফগান, কখনো মোগল এবং সবশেষে ইংরেজরা বঙ্গভূমি দখল করেছেন, তবু বাঙালিদের ভাত খাওয়ার অভ্যাসে পরিবর্তন হয়নি। ভাত বাঙ্গালীর একটি সাংস্কৃতিক ভিত্তি।
বঙ্গীয় সংস্কৃতির স্বাতন্ত্র্যের কারণ ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যান্য সংস্কৃতির সঙ্গে যথেষ্ট মিল থাকলেও,বঙ্গভূমির ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য এবং বিবিধ নৃতাত্ত্বিক সংমিশ্রণের ফলে এর সংস্কৃতি নিজস্বতা লাভ করেছে। এর অবস্থান দীর্ঘদিনের শাসনকেন্দ্র দিল্লি থেকে শত শত মাইল দূরে ভারতীয় উপমহাদেশের একেবারে এক প্রান্তে। ধর্ম, দর্শন ও ধারণা, সাংস্কৃতিক ধারা ও শাসনকাঠামো - যা কিছু এই প্রান্তিক ভূখন্ডে এসে পৌঁছেছে, তা-ই অল্পকালের মধ্যে বঙ্গীয় চরিত্র দিয়ে প্রভাবিত হয়েছে। তদুপরি জালের মতো বিস্তৃত নদী-শাখা নদী এবং বনভূমি-পরিপূর্ণ বঙ্গদেশ আবার বহু ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে, ফলে এসব অঞ্চলেও সংস্কৃতি খানিকটা স্বাতন্ত্র্য লাভ করেছেন। এসব উপ-সংস্কৃতিও জাতি, ধর্ম, বর্ণ, এবং বহু উপভাষার কারণে বৈশিষ্ট্যমন্ডিত।
বৈদিক,বৌদ্ধ, জৈন এবং ইসলাম ধর্মের মতো প্রধান প্রধান ধর্মের উৎপত্তি-স্থান থেকে বঙ্গভূমি বহু দূরে অবস্থিত,সে কারণে এই সব ধর্মের কোনোটাই তার আদি এবং অকৃত্রিম রূপে এ অঞ্চলে পৌঁছায়নি। তদুপরি, এসব বহিরাগত ধর্মের সঙ্গে স্থানীয় ধর্মীয় বিশ্বাস এবং আচারের সমন্বয় ঘটেছে। এভাবে বঙ্গদেশের হিন্দু, বৌদ্ধ,জৈন এবং ইসলাম ধর্ম যেমন বঙ্গীয় বৈশিষ্ট্যপূর্ণ তেমনি বিভিন্ন ধর্মের অনুসারীদের মধ্যেও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান এবং সামাজিক রীতিনীতির কিছু মিল লক্ষ করা যায়। সপ্তম শতাব্দীতে চীনা পর্যটক হিউয়েন সাং লিখেছেন যে,তিনি বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী স্থানীয় লোকদের ধর্মীয় দর্শন,আচার-আচরণ এবং সামাজিক রীতিনীতিতে অনেক সাদৃশ্য দেখেছেন। তিনি আরও লক্ষ করেন যে,বঙ্গীয় বৌদ্ধধর্ম মূল বৌদ্ধধর্ম থেকে অনেকটাই আলাদা।
বসতি এবং নৃতত্ত্ব পশ্চিম, উত্তর এবং মধ্যবঙ্গের তুলনামূকভাবে উঁচু এলাকা ছাড়া প্রাচীন বঙ্গভূমির অন্যান্য এলাকায় লোকবসতি ছিল খুব কম। মনে হয়,এখন যেমন জনবসতির একক হিসেবে হাজার হাজার গ্রাম গড়ে উঠেছে, সুলতানি আমলের আগে তা তেমন সংখ্যায় গড়ে ওঠেনি। দশম শতাব্দী থেকে রচিত বাংলা ভাষার আদি নিদর্শন চর্যাপদে গ্রামের কোনো উল্লেখ নেই। নিরাপত্তা এবং উৎপাদনের জন্যে লোকেরা তখন বোধ হয় ‘পুরী’ এবং ‘নগরে’ বাস করতেন। বসতির এই বৈশিষ্ট্য উপ-নাগরিক সামন্ততান্ত্রিক সংস্কৃতি গড়ে ওঠার সম্ভবত প্রধান কারণ ছিল। আর নৃতাত্ত্বিক দিক দিয়ে বেশির ভাগ বাঙালিই অস্ট্রো-এশিয়াটিক, কিন্তু দ্রাবিড় গোষ্ঠীও এর মধ্যে মিশিছে। এই দুটি প্রধান নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী ছাড়া, বাঙালিদের মধ্যে তিববতী-চীনা এবং সেমেটিক রক্তেরও সংমিশ্রণ ঘটেছে।
সামাজিক গঠন বাঙালি সমাজ আগাগোড়াই পিতৃতান্ত্রিক এবং সোপানভিত্তিক। আর্যরা বঙ্গদেশে আসার আগে পর্যন্ত সামাজিক কাঠামো ঠিক কেমন ছিলো তা জানা না-গেলেও প্রাক-আর্যযুগে জাতিভেদ প্রথা ছিলো বলে মনে হয় না। অপর পক্ষে, আর্যরা যে বৈদিক ধর্ম নিয়ে এসেছিলেন, তাতে জাতিভেদ এবং বর্ণভেদ অনুযায়ী গোটা সমাজ চারটি স্তরে বিন্যস্ত ছিলো। এগুলো হলো ব্রাহ্মণ,ক্ষত্রিয়, বৈশ্য এবং শূদ্র। ব্রাহ্মণদের সংখ্যা কম হলেও, তাঁরাই ছিলেন সমাজে সবচেয়ে শ্রদ্ধেয় এবং প্রভাবশালী আর সমাজের বিরাট সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ।শূদ্ররা ছিলেন সবচেয়ে নিচের তলায় অবস্থিত এবং সবচেয়ে অবহেলিত ও শোষিত। দারুণ বৈষম্যকারী এই বর্ণভেদ প্রথা কেবল ধর্মের দিক দিয়েই বৈষম্য সৃষ্টি করেনি, বরং এ ছিল সামাজিক এবং অর্থনৈতিক বৈষম্যের ধর্মের বিধিবদ্ধ স্থায়ী ব্যবস্থা। বর্ণভেদ প্রথা কার্যত শ্রেণিভেদ প্রথা ছাড়া অন্য কিছু নয়। তা সত্ত্বেও জাতিভেদ-প্রথা সমাজের নিচের তলার লোকেরা নিজেদের মধ্যে কঠোরভাবে পালন করতেন না।
জাতিভেদ প্রথা বর্ণভেদেরই বহিঃপ্রকাশ। এই প্রথা অনুযায়ী শূদ্ররা অস্পৃশ্য। ক্ষত্রিয়দের সংখ্যা বঙ্গদেশে খুব কম ছিল। বৈশ্য এবং অন্য কোনো কোনো গোষ্ঠীর হিন্দুদের দিয়ে পরে তৈরি হয় কায়স্থ সম্প্রদায়। এ ছাড়া বৈদ্য সম্প্রদায় হলেন চিকিৎসা পেশার সঙ্গে জড়িত। তত্ত্বগতভাবে বৌদ্ধ এবং মুসলমানদের মধ্যে কোনো জাতিভেদ প্রথা থাকার কথা নয়, কিন্তু বঙ্গদেশে এসে তাঁরাও এই প্রথা দিয়ে প্রভাবিত হন এবং এক ধরনের জাতিভেদ প্রথার মধ্যে পড়ে যান। 
 মুসলমানরা আসার পর বর্ণহিন্দুরা সাধারণ মুসলমানদেরও গণ্য করতেন শূদ্রদের মতো। মুসলমানরা নিজেরা তাঁদের সমাজকে বিভক্ত করেন আশরাফ এবং আতরাফ এই দুই ভাগে। আতরাফ ছিলেন প্রধানত দেশীয় এবং নিম্নশ্রেণির মুসলমানরা। এই শ্রেণিভেদ প্রথা দিয়ে মুসলমানরা এতোটাই প্রভাবিত হয়েছিলেন যে,তাঁরা মসজিদেও এটা বজায় রাখেন সেখানে সুলতান এবং তাঁর ঘনিষ্ঠজনদের জন্যে থাকতো উঁচু আসন। এ ছাড়া
আশরাফ এবং আতরাফদের মধ্যে বিবাহ হতো না, অথবা তাঁরা একত্রে ভোজনও করতেন না। বঙ্গসমাজের শতকরা আশি ভাগ অথবা তারও বেশি শূদ্র এবং গ্রামের মুসলমান। তাঁরাই ছিলেন উৎপাদন ব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি জড়িত - চাষী, শ্রমিক এবং নাপিত,জেলে, ছুতোর এবং জোলাদের মতো পেশাদার দক্ষ শ্রমিক।
মধ্যযুগে পরিবারগুলো একক পরিবার ছিল না, যদিও পরিবারের আয়তন ছিলো ছোট। উনিশ শতকের গোড়া থেকে হিন্দুদের মধ্যে একান্নবর্তী পরিবার গড়ে উঠতে থাকে বিশেষ করে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত এবং ছোট-বড় জমিদার পরিবারে। জমির মালিকদের মধ্যে এই প্রথা সম্ভবত গড়ে উঠেছিল ১৭৯৩ সালে প্রণীত চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের অন্যতম ফলাফল হিসেবে।
ধর্ম এবং বিশ্বাস খ্রিস্টের জন্মের কয়েক শতাব্দী আগে মোটামুটি একই সময়ে বৈদিক এবং বৌদ্ধধর্ম বঙ্গদেশে পৌছেছিল। তারপর এই দুই ধর্ম স্থানীয় ধর্ম ও বিশ্বাসসমূহকে প্রভাবিত করে। চন্দ্রকেতুগড়ের প্রত্নতাত্ত্বিক ভগ্নাবশেষ থেকে মনে হয় হিন্দু রাজারা দক্ষিণ-পশ্চিম বঙ্গ অর্থাৎ দক্ষিণ রাঢ়ে খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয়/দ্বিতীয় শতাব্দীর মধ্যে নিজেদের বেশ শক্ত ভিত্তির ওপর স্থাপিত করেন। অপরপক্ষে,আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দী থেকে গড়ে ওঠা মহাস্থানগড়ের ভগ্নাবশেষ দেখে মনে হয় বৌদ্ধরা তখনই পুন্ড্রবর্ধন অর্থাৎ উত্তরবঙ্গে বেশ বড়ো রকমের বসতি স্থাপন করেছিলেন। এই দুই ধর্ম এতো প্রবল ছিল যে, এদের প্রভাবে স্থানীয় ধর্মগুলো ধীরে ধীরে প্রায় লোপ পায়। তবে এই দুই ধর্মকেও স্থানীয় ধর্ম এবং আচার-আচারণ যথেষ্ট প্রভাবিত করে। যেমন বৈদিক ধর্মে স্থানীয় অনেক দেবদেবী ঢুকে পড়েন, যাঁদের অস্তিত্ব মূল বৈদিক ধর্মে ছিল না।
বঙ্গদেশের সবচেয়ে পুরানো যে রাজার কথা নিশ্চিতভাবে জানা যায়, তাঁর নাম শশাঙ্ক। সপ্তম শতাব্দীর এই রাজা ছিলেন হিন্দু। অপর পক্ষে, বৌদ্ধ পাল-রাজাদের রাজত্ব আরম্ভ হয় পরের শতাব্দীতে।শশাঙ্ক কেবল হিন্দুধর্মের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন না,তিনি বৌদ্ধদের ওপর নির্যাতন চালিয়েছিলেন। পাল রাজারা কয়েক শতাব্দী ধরে বৌদ্ধধর্মের পৃষ্ঠপোষণা করলেও, হিন্দুদের ওপর নিপীড়ন করেছিলেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায় না। পালদের পর যে সেন বংশ ক্ষমতায় বসেন, তাঁরা ছিলেন হিন্দুধর্মের উৎসাহী পৃষ্ঠপোষক। বৌদ্ধরা তাঁদের আমলে নির্যাতিত হয়েছিলেন বলে প্রমাণ রয়েছে। তাঁদের শাসনকালে বৌদ্ধ ধর্ম তার গৌরব হারায় এবং বৌদ্ধদের সংখ্যা দ্রুত হ্রাস পায়। সেনরা, তদুপরি, বর্ণভেদ প্রথাকে কঠোরভাবে প্রচলিত করেন এবং সংস্কৃত শাস্ত্র ও সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষণা করেন।
১২০৪ সালে লক্ষ্মণসেনকে পরাজিত করে বখতিয়ার খলজী মুসলিম শাসন প্রবর্তন করলে পরিবর্তনের আরও একটা ঢেউ আসে। খলজীর পরপর বঙ্গভূমিতে এসেছিলেন অনেক মুসলমান ধর্মপ্রচারক। অংশত সুলতানের সহায়তা নিয়ে তাঁরা স্থানীয় লোকদের ইসলাম ধর্মে দীক্ষা দেওয়ার কাজ উৎসাহের সঙ্গে আরম্ভ করেন। প্রথম দুইশত বছরে ইসলামে দীক্ষা দেওয়ার কাজ কতোটা সাফল্য লাভ করেছিল, তা পরিষ্কার জানা না গেলেও এ সময়ে বৌদ্ধদের সংখ্যা খুবই হ্রাস পায় এবং হিন্দুদের মন্দির নির্মাণের কাজ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। সেনরা যে বর্ণভেদ প্রথা জোরালোভাবে চালু করেছিলেন, তার অত্যাচার থেকে রক্ষা পাওয়ার উদ্দেশে বৌদ্ধরা একযোগে ইসলামে দীক্ষা নিয়েছিলেন কিনা, তা অনুমানের বিষয়। তাছাড়া, নিম্নবর্ণের হিন্দুরাও ব্যাপক সংখ্যায় ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন বলে মনে হয়। শক্তি প্রয়োগ করে ইসলাম ধর্মে দীক্ষা দেওয়ার বহু প্রমাণ থাকলেও, অন্তত তত্ত্বগতভাবে ইসলাম ধর্মে যে-সামাজিক সাম্যের কথা বলা হয়েছে, তা বহু সংখ্যক দীক্ষার কারণ হতে পারে।
এর পরবর্তী কয়েক শতাব্দীতে বঙ্গভূমিতে ইসলাম ধর্মের যথেষ্ট বিবর্তন হয়। পারস্য থেকে আসা পীর/দরবেশরা যে-ভক্তিবাদী ইসলাম ধর্ম প্রচার করেছিলেন, স্থানীয় লোকেরা তা দিয়ে আকৃষ্ট হয়েছিলেন। অপরপক্ষে, আরব ধর্মপ্রচারকরা নিয়ে এসেছিলেন মৌলবাদী ইসলাম, যা স্থানীয় লোকেদের আকৃষ্ট করেনি। সতেরো শতক নাগাদ বঙ্গীয় ইসলাম আগেকার বৌদ্ধ এবং হিন্দু ধর্মের মতোই একটা স্থানীয় সমন্বয়ী ধর্মের রূপ লাভ করে এবং সমাজের নিচের তলার লোকেরা এই বঙ্গীয় ইসলাম দিয়েই প্রভাবিত হন।
ইসলাম ধর্মের এই আক্রমণের মুখে হিন্দু ধর্মের মধ্যেও সংস্কার চলতে থাকে। যেমন, দেবীবর ঘটক হিন্দু ধর্মের পবিত্রতা রক্ষার উদ্দেশে বর্ণপ্রথার নিয়মগুলো আরও দৃঢ়ভাবে চালু করতে চেষ্টা করেন। কিন্তু সময়ের ধারা বইছিলো উল্টো খাতে। এই পরিস্থিতিতে ষোলো শতকের গোড়ায় চৈতন্যদেব (১৪৮৬-১৫৩৩) ভক্তি এবং প্রেমের আদর্শের ওপর স্থাপিত বৈষ্ণব ধর্ম প্রচার করেন। যে জাতিভেদ প্রথা সমাজকে স্থায়ী শ্রেণীতে বিভক্ত করেছিলো এবং যা ছিলো সামাজিক নির্যাতনের প্রধান হাতিয়ার, চৈতন্যদেব তাকে পুরোপুরি অস্বীকার করেন। এই ধর্ম কেবল হিন্দু ধর্মকে ইসলামের আক্রমণ থেকে রক্ষা করেনি, বরং পরবর্তী দু শতাব্দী ধরে বৈষ্ণব ও সামগ্রিকভাবে হিন্দু ধর্মচর্চায় নতুন জোয়ার এনেছিল। তাছাড়া এর প্রভাবে সহজিয়া,বাউল এবং কর্তা-ভজার মতো ভক্তিবাদী সম্প্রদায়ও জন্ম দেয়। এসব সম্প্রদায় প্রথমেই জাতিভেদকে অস্বীকার করে। তদুপরি এরা বিধিবদ্ধ ধর্মের চেয়ে গুরুভক্তি এবং নামহীন এক দেবতার ভজনাকে গুরুত্ব দেয়। বঙ্গভূমির বিচিত্র ধর্মগুলোর মধ্যে যদি কোনো মিল থেকে থাকে, তা হলো এই গোঁড়ামিবর্জিত নমনীয়তা এবং সমন্বয়ধর্মী ভক্তিবাদ।

ভাষা বাংলা ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা গোষ্ঠীর অন্যতম ভাষা। এ ভাষা বঙ্গভূমির আদি ভাষা ছিল না। তখন বিভিন্ন অঞ্চলের আদিবাসীদের মধ্যে বিভিন্ন ভাষা প্রচলিত ছিলো। আর্যরা সঙ্গে নিয়ে আসেন পূর্বাঞ্চলের প্রাকৃত ভাষা। বৌদ্ধরা এনেছিলেন পালি ভাষা, যা প্রাকৃতের মতো সংস্কৃত ভাষারই একটি মৌখিক রূপ। বহু শতাব্দী ধরে উচ্চারণ ও ব্যাকরণগত বিবর্তনের মধ্য দিয়ে এই প্রাকৃত থেকে বাংলা ভাষা স্বতন্ত্র রূপ লাভ করে। এই ভাষার আদি রূপ খানিকটা পাওয়া যায় দশম শতাব্দী থেকে রচিত চর্যাপদে। তবে বাংলা ভাষা তখনও একেবারে আলাদা ভাষা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেনি, মিশে ছিলো অহমিয়া এবং ওড়িয়া ভাষার সঙ্গে। তাই সঠিকভাবে বললে বলতে হয়, চর্যাপদে যে-বাংলা দেখা যায়, তা প্রাক্-বাংলা। আনুমানিক পনেরো শতকে রচিত শ্রীকৃষ্ণকীর্তন খাঁটি বাংলা ভাষার আদিতম নিদর্শন। মধ্যযুগের অন্যান্য কাব্য থেকেও সেকালের ভাষার আভাস পাওয়া যায় - যদিও এসব কাব্যের আদি পাঠ পাওয়া যায় না। এসব কাব্যের যে পান্ডুলিপি এ পর্যন্ত পাওয়া গেছে, সেগুলো মূল কাব্য রচিত হওয়ার অনেককাল পরের প্রতিলিপি। অপরপক্ষে, সেকালের গদ্যের কোনো নমুনাই বলতে গেলে পাওয়া যায় না।
বাংলা ভাষা যেহেতু সংস্কৃত ভাষার মৌখিক রূপ প্রাকৃত থেকে উৎপন্ন, সে কারণে এ ভাষার শব্দাবলীর প্রধান ভাগই হয় সংস্কৃত, নয়তো সংস্কৃত শব্দের বিবর্তিত রূপ (যেমন চন্দ্র থেকে চাঁদ)। তবে এ অঞ্চলের আদি ভাষাগুলোর কিছু শব্দও বাংলায় রয়ে গেছে (যেমন চাউল, ঢেঁকি)। স্থানীয় ভাষার কিছু বৈশিষ্ট্যও বহিরাগত বাংলাকে প্রভাবিত করেছে (যেমন, কোনো কোনো ক্রিয়া-বিভক্তিতে)। মুসলিম শাসন বাংলা ভাষাকে প্রভাবিত করেছিলো দুভাবে। প্রথমত, এ সময়ে বাংলা ভাষায় হাজার হাজার আরবি-ফারসি শব্দ ঢুকে পড়ে। দ্বিতীয়ত, যে বাংলাকে সেনরা অবহেলা করেছেন এবং ব্রাহ্মণরা ঘৃণা করেছেন, সুলতানরা পনেরো শতক থেকে তারই পৃষ্ঠপোষণা করতে আরম্ভ করেন। সতেরো/আঠারো শতকে কিছু পর্তুগিজ শব্দও বাংলা ভাষায় এসে যায় (যেমন  আনানাস)। বিদেশী ভাষার ঢেউ আর একবার বাংলা ভাষায় লাগে ব্রিটিশ রাজত্ব স্থাপিত হওয়ার পর। সেই সুবাদে এখন বাংলায় কয়েক হাজার ইংরেজি শব্দ প্রতিদিনের শব্দে পরিণত হয়েছে। বাক্য-গঠনে এবং যতিচিহ্নেও (যেমন কমা, সেমিকোলোন, আশ্চর্যবোধক চিহ্ন) ইংরেজির প্রভাব রয়েছে। এ ছাড়া, স্থানীয় ভাষা বাংলার চর্চা বাড়িয়ে আইন-আদালতের ভাষা ফারসিকে সরিয়ে দেওয়া যায় কিনা, তারও চেষ্টা ইংরেজ প্রশাসন করেছিল আঠারো শতকের শেষ কয়েক দশক ধরে। বাঙালি সংস্কৃতির অন্যান্য দিকের মতো বাংলা ভাষাও নমনীয় এবং সমন্বয়ধর্মী। ছাপাখানা প্রবর্তিত হওয়ার পর এবং নতুন ধরনের লেখ্য সংস্কৃতির প্রভাবে আঠারো শতকের দ্বিতীয় ভাগ থেকে বাংলা গদ্যচর্চা আগের তুলনায় অনেকটাই বৃদ্ধি পায়।
সাহিত্য চর্যাপদকে বাংলার নিদর্শন হিসেবে গণ্য করলে বাংলা সাহিত্যের ঐশ্বর্যমন্ডিত ঐতিহ্য প্রায় হাজার বছরের। অন্যান্য ভাষার সাহিত্যের মতো বাংলাও তার যাত্রা শুরু করেছিল ধর্মীয় কাব্য দিয়ে, আরও সঠিক করে বললে, ভক্তিবাদী গান দিয়ে। চর্যাপদ থেকে আরম্ভ করে মধ্যযুগের বিশাল সাহিত্যভান্ডার- এর প্রায় সবটাই হলো ঈশ্বরমুখী এবং এর মধ্যে ছিলো বৌদ্ধ, হিন্দু এবং মুসলমানদের ধর্মীয় সাহিত্য। ব্যতিক্রম দেখা যায় শাহ মুহাম্মদ সগীর,দৌলত কাজী এবং আলাওলের কিছু রোমান্টিক কাব্যে। হিন্দু কবিরা তাঁদের রোমান্টিক অনুভূতি, আবেগ এবং অভিজ্ঞতা প্রকাশ করেছিলেন রূপকের মাধ্যমে কেবল রাধাকৃষ্ণের প্রেমের কাহিনী নিয়ে রচিত বৈষ্ণব সাহিত্য। বস্তুতঃ উনিশ শতকের আগে পর্যন্ত বাঙালি কবিরা তাঁদের নিজেদের ‘মনের কথা’ বলতে গেলে প্রকাশই করেননি।
মধ্যযুগে সুফিবাদের মতো ভক্তিবাদী দর্শনের উদ্ভব এবং বৈষ্ণব, সহজিয়া, বাউল, কর্তাভজা ও সখীভাবকের মতো ধর্মীয় সম্প্রদায় আত্মপ্রকাশ করার পর সত্যপীর/সত্যনারায়ণ এবং দক্ষিণ রায়/বড় খান গাজীর মতো লৌকিক দেবতার দেখা মেলে। এবং সাহিত্যেও একটা সমন্বয়বাদী ধারার সৃষ্টি হয়। এই সাহিত্য ছিল বাঙালিত্বের ধারণাপুষ্ট। এ রকম এক অর্থে ধর্মনিরপেক্ষ ধর্ম এর আগে কখনও বঙ্গীয় সমাজে ছিল না। এই ক্রান্তিলগ্নে দেব-দেবীরাও মানুষের বেশে দেখা দিতে আরম্ভ করেন।
এরপর উনিশ শতকে ইংরেজি সাহিত্যের প্রভাবে বাঙালি কবি এবং লেখকরা মানবতা এবং নিজেদের ব্যক্তিগত আবেগ ও অনুভূতিকে তাঁদের লেখার মাধ্যমে প্রকাশ করতে আরম্ভ করেন। এই নতুন সাহিত্য ঈশ্বরমুখী নয়, মানবমুখী। সাহিত্যের বিষয়বস্ত্ত এবং মূল ভাবধারাই এ সময়ে বদলে যায়। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এটা একটা যুগান্তর। প্রকৃত পক্ষে, এই মানববাদী নতুন সাহিত্য দিয়েই বঙ্গীয় রেনেসাঁর সূচনা হয়। এতে বিরাট অবদান রেখেছেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, মাইকেল মধুসূুদন দত্ত, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। হিন্দু পুরাণভিত্তিক সাহিত্য নতুন করে লেখার সময়ে প্রথম দুজন তাদের পুনর্ব্যাখ্যা দান করেন এবং এই পুরাণের দেবদেবীকে মানুষে পরিণত করেন আর শেষের দুজন একই কাজ করেন, তবে একটু ভিন্ন রীতিতে।
আনুষ্ঠানিক শিক্ষা-ব্যবস্থার বিকাশ এবং ছাপাখানার প্রতিষ্ঠার ফলে বাংলা সাহিত্যে সৃজনশীলতার এমন স্ফূরণ ঘটে যে, যা এর আগে কখনো এমন ব্যাপকভাবে ঘটেনি। তবে এও সত্য যে, এই মুদ্রিত সাহিত্যের বিকাশ ঘটার ফলে মধ্যযুগে যে লোকসাহিত্য এবং মৌখিক সাহিত্যের শ্রীবৃদ্ধি হয়েছিলো, সেই ধারা দ্রুত শুকিয়ে আসে। তদুপরি, হিন্দু এবং মুসলমানদের মধ্যে নাগরিক সাহিত্যের বিকাশ ঘটে অসমানভাবে, কারণ মুসলমানরা হিন্দুদের তুলনায় ইংরেজি এবং বাংলা - উভয় শিক্ষায় অনেকটাই পিছিয়ে ছিলেন। তবে উনিশ শতকের শেষ দিক থেকে এই দু্ই সম্প্রদায়ের মধ্যে ব্যবধান ক্রমশ কমে আসতে আরম্ভ করে কারণ তখন থেকে আরম্ভ করে বিশ শতকের প্রথম কয়েক দশকের মধ্যে অনেক মুসলমান সাহিত্যিক আত্মপ্রকাশ করেন। এঁদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিলেন মীর মোশরাররফ হোসেন, নজরুল ইসলাম এবং জসীমউদ্দীন।
সাহিত্যে আরেকটি ঐতিহাসিক বিকাশ লক্ষ করা যায় তার আঙ্গিকের ক্ষেত্রে। মধ্যযুগে রচিত হয়েছিল কেবল আখ্যানমূলক কাব্য, কিন্তু উনিশ শতকে ইংরেজি সাহিত্য থেকে নতুন আঙ্গিক নিয়ে লেখা হয় মহাকাব্য,পত্রকাব্য,সনেট, খন্ড কবিতা, নাটক, উপন্যাস, ছোটগল্প এবং প্রবন্ধ। আর বিশ শতকে এসে বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথের হাতে আরও উন্নতমানের সাহিত্য রচিত হয় এবং তা বিশ্বমানের মর্যাদা লাভ করে।
নগরায়ণ এবং নাগরিক সাহিত্য বিকাশ লাভ করায়, লোকসাহিত্য একদিকে যেমন ক্ষয়িষ্ণুতার দিকে এগিয়ে যায়, তেমনি রবীন্দ্রনাথ, দীনেশচন্দ্র সেন এবং অন্যান্য উৎসাহী গবেষকদের সম্মিলিত চেষ্টার ফলে তা আবার লিখিত আকারে সংগৃহীত হয় এবং ব্যাপকতর পাঠকদের কাছে পৌঁছে যায়। ফলে লোকসাহিত্য ও লোকসঙ্গীত কতোটা ঐশ্বর্যমন্ডিত এবং সুন্দর, শহরের শিক্ষিত পাঠকরা ও শ্রোতারা তা অনুভব করেন।
বঙ্গীয় সমাজ প্রধানত গ্রামীণ বলে উপনিবেশিক আমলের মাঝামাঝি কাল পর্যন্ত বাংলা সাহিত্য খানিকটা সংস্কৃত এবং ফারসি সাহিত্য দিয়ে প্রভাবিত হলেও তা ছিল মূলত লৌকিক। ইংরেজি শিক্ষা এবং সাহিত্যই একে নাগরিক চরিত্র দান করে। তা সত্ত্বেও লোকসাহিত্যের প্রভাব একটু দুর্বলভাবে হলেও উনিশ ও বিশ শতকেও অব্যাহত থাকে। নাগরিক সম্প্রদায়ের শিকড়ও গভীরভাবে গ্রামে প্রোথিত হওয়ায়, বাংলা সাহিত্যে গ্রামের দিকে ফিরে তাকানোর একটা প্রবণতা লক্ষ করা যায়। যেমন জীবনানন্দ দাশ এবং বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় অথবা জসীমউদ্দীন এবং আল-মাহমুদের রচনায় বারবার গ্রাম ফিরে আসে নানা রূপে। এখনকার অসংখ্য উপন্যাস এবং নাটকেও গ্রামের দিকে ফিরে তাকানোর এই প্রবণতা লক্ষ করা যায়।
সঙ্গীত,নাটক,সিনেমা সাহিত্যের মতো বাংলা সঙ্গীতের উত্তরাধিকারও ঐশ্বর্যমন্ডিত। চর্যাপদ এবং মধ্যযুগের সাহিত্যের অনেকটাই ছিল আসলে গান। কোন রাগ এবং তালে গাইতে হবে প্রতিটি চর্যার (শ্রীকৃষ্ণকীর্তনেরও) শুরুতেই তা উল্লিখিত হয়েছে। গৌড় ও বঙ্গাল এবং আরও পরে ভাটিয়ালির মতো রাগসমূহের নাম থেকে বোঝা যায় যে বঙ্গভূমিতে সুবদ্ধ এবং লোকসঙ্গীতের নিজস্ব ধারা সেকালেই গড়ে উঠেছিল। বৈষ্ণব সঙ্গীতজ্ঞরা মধ্যযুগেই রাগ এবং লোকসঙ্গীতের সমন্বয় ঘটিয়ে বঙ্গের নিজস্ব ভক্তিবাদী কীর্তন গানের ধারা প্রবর্তন করেছিলেন এবং তাকে প্রামাণ্য রূপ দিয়েছিলেন। বঙ্গের আর আর-একটি বিশিষ্ট ভক্তিবাদী সঙ্গীতের ধারা হলো বাউল গান। এই বিশেষ শ্রেণির গানের একজন শ্রেষ্ঠ রচয়িতা এবং সুরকার ছিলেন লালন ফকির (১৭৭৪-১৮৯০)। বাউল গান তার সরলতা এবং সৌন্দর্যের জন্যে বিখ্যাত এবং এখন একুশ শতকের গোড়াতেও তার আবেদন হারিয়ে ফেলেনি। বাংলা সঙ্গীতের অন্যান্য ধারার মধ্যে আছে ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া, কবিগান, জারিগান ইত্যাদি। প্রথম দু ধরনের গান শহর এবং গ্রাম উভয় জায়গায় জনপ্রিয় আর শেষ দু ধারার গান গ্রামে খুবই জনপ্রিয়।
উনিশ শতকের গোড়ায় বঙ্গদেশে দু ধরনের সুবদ্ধ সঙ্গীতের সূচনা এবং বিকাশ লক্ষ করা যায়- টপ্পা ও আখড়াই এবং বাংলা ধ্রুপদ। তাছাড়া, এ সময়ে বাংলা সঙ্গীতের জগতে ইউরোপীয় বাদ্যযন্ত্র আসতে আরম্ভ করে, বিশেষ করে বেহালা এবং মাউথ অর্গান,যার সংক্ষিপ্ত রূপ হলো হারমোনিয়াম। বাংলা সাহিত্যের মতো বাংলা সঙ্গীতের ক্ষেত্রে উনিশ শতক থেকে আরম্ভ করে বিশ শতকের প্রথম ভাগ পর্যন্ত সৃজনশীলতার একটা স্ফূরণ ঘটে। এই সময়ে নিধু গুপ্ত, গিরিশচন্দ্র ঘোষ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, অতুলপ্রসাদ সেন এবং নজরুল ইসলামের মতো বিখ্যাত গীতিকার ও সুরকারের বিশাল অবদানে বাংলা গানের জগৎ সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে। বাঙালি সংস্কৃতির অন্যান্য শাখার মতো উনিশ শতকে যে গানের ধারা তৈরি হয়, তা ভারতীয় সঙ্গীত থেকে খানিকটা ভিন্ন এবং বঙ্গীয় বৈশিষ্ট্যমন্ডিত।
মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে বাদ্যযন্ত্রের বলতে গেলে কোনো উল্লেখ নেই। কিন্তু উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে বঙ্গদেশে নিজস্ব বাদ্যযন্ত্রীদের আবির্ভাব ঘটে। আর, বিশ শতকে বাদ্যযন্ত্রীদের সংখ্যাই কেবল বৃদ্ধি পায়নি, বরং আলাউদ্দীন খানের নেতৃত্বে আলি আকবর খান এবং রবিশঙ্করের মতো বিশ্বমানের শিল্পীদেরও বিকাশ ঘটে। বিশ শতকে কণ্ঠ শিল্পীরাও ‘রাগপ্রধান গান’ নামে সুবদ্ধ সঙ্গীতের একটি বিশিষ্ট ধারা গড়ে তোলেন। কিন্তু যে ধারার উদ্ভব এবং বিকাশ সবচেয়ে বেশি মাত্রায় ঘটে, তা হলো আধুনিক গান। এ গান আসলে রাগসঙ্গীত, লোকসঙ্গীত এবং পশ্চিমা সঙ্গীতের এক ধরনের সমন্বয়। এর আদি রচয়িতা রবীন্দ্রনাথ। তাঁর এসব গান রবীন্দ্রসঙ্গীত নামে বিখ্যাত এবং জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। নজরুল ইসলাম, পঙ্কজ মল্লিক, সলিল চৌধুরী এবং অন্যরা মিলে এই ধারায় নতুন নতুন বৈশিষ্ট্য নিয়ে আসেন। কিন্তু বেশির ভাগ আধুনিক গানেই রবীন্দ্রনাথ প্রবর্তিত দুটি বৈশিষ্ট্য কমবেশি অনুকরণ কর হয়। এই দুই বৈশিষ্ট্য হলো - গানের চারটি তুক বা সুরের স্তবক এবং কথার প্রাধান্য।
গীতগোবিন্দ এবং শ্রীকৃষ্ণকীর্তন থেকে মনে হয়, আদি-মধ্যযুগেও বঙ্গভূমিতে এক ধরনের সাঙ্গীতিক পালা প্রচলিত ছিলো। এ ছাড়া, সে সময়ে মুক্তমঞ্চ যাত্রাপালাও বিকাশ লাভ করতে থাকে। চৈতন্যদেব এ রকমের একটি পালায় অভিনয় করেছিলেন বলে জানা যায়। তার দু শতাব্দী পরে আঠারো শতকে যখন বাংলা গদ্য বিকাশ লাভ করতে থাকে, তখন যাত্রাপালায় কাহিনী এবং গদ্যসংলাপ বৃদ্ধি পায়। এর ফলে তাতে নাটকীয়তাও বাড়তে থাকে। বাঙালিরা আরও কতো কাল এই যাত্রা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতেন, তা অনুমানের বিষয়। কিন্তু ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি শাসন ভার নেওয়ার আগেই কলকাতায় একটি ইংরেজি থিয়েটার স্থাপিত হয়। কয়েক দশক পরে স্থাপিত হয় আরও বড় এবং আরও উন্নতমানের একটি থিয়েটার। এই দুই থিয়েটার বাঙালিদের জন্যে অনুকরণ করার মতো আদর্শ দান করে। গেরাশিম লেবেদফ নামে কলকাতায় বসবাসকারী একজন রুশ ভদ্রলোক বাঙালিদের উৎসাহ এবং চিন্তাকে আরও উস্কে দেন একটি ইংরেজি নাটক বাংলায় অনুবাদ করে বাঙালি অভিনেতা-অভিনেত্রীদের সাহায্যে ১৭৯৫ সালের শেষে এবং ১৭৯৬ সালের গোড়ার দিকে মঞ্চস্থ করার মাধ্যমে। এর জন্যে তিনি কলকাতায় একটি মঞ্চ নির্মাণ করিয়ে নিয়েছিলেন। ১৮৩০-এর দশকে প্রসন্নকুমার ঠাকুর এবং নবীন বসু যে একাধিক নাটক অথবা যাত্রা পালা নিজেদের মঞ্চে অভিনয় করিয়েছিলেন, লেবেদফের দৃষ্টান্ত তার পেছনে অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করা অসম্ভব নয়।
তবে ১৮৫২ সালের আগে বাংলা ভাষায় কোনো নাটক প্রকাশিত হয়নি। একবার নাটক রচনার ধারা শুরু হবার পরে পরবর্তী কয়েক বছরে আরও অনেকগুলো নাটক প্রকাশিত হয়েছিল। ইতোমধ্যে ১৮৫৭ সাল নাগাদ কলকাতায় ব্যক্তিগত উৎসাহে মঞ্চ নির্মাণ এবং তাতে নাটকের অভিনয় আরম্ভ হয়। প্রথম দিকে প্রধানত সামাজিক ও পৌরাণিক নাটক এবং প্রহসনের অভিনয় জনপ্রিয়তা অর্জন করে। এভাবে একাধিক মঞ্চে বেশ কয়েকটি নাটক ও প্রহসন সাফল্যের সঙ্গে অভিনীত হওয়ার পর শিক্ষিত সমাজ একটি সাধারণ মঞ্চ স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। শেষ পর্যন্ত ন্যাশনাল থিয়েটার নামে সেই মঞ্চ স্থাপিত হয় ১৮৭২ সালের ডিসেম্বর মাসে এবং সেখানে প্রথম অভিনীত হয় নীলচাষীদের ওপর অত্যাচারের কাহিনী নিয়ে রচিত দীনবন্ধু মিত্রের জনপ্রিয় নাটক নীলদর্পণ। তার কয়েক বছরের মধ্যে হিন্দু ন্যাশনাল থিয়েটার, গ্রেট ন্যাশনাল থিয়েটার এবং বেঙ্গল থিয়েটার নামে আরও কয়েকটি থিয়েটার গোষ্ঠী গড়ে ওঠে। সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী থিয়েটার ‘স্টার’ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৮৩ সালে। এর পেছনে সবচেয়ে বড়ো ভূমিকা ছিল সেকালের বিখ্যাত অভিনেতা ও নাট্যকার গিরিশচন্দ্র ঘোষ এবং বিখ্যাত অভিনেত্রী বিনোদিনী দাসীর।
বিশ শতকে আরও কয়েকটি নামকরা থিয়েটার প্রতিষ্ঠিত হয় এবং দেখা দেন শিশির ভাদুড়ী ও অহীন্দ্র চৌধুরীর মতো শক্তিশালী অভিনেতা। আর কিছু পরে যাত্রা শুরু হয় সিনেমা এবং টেলিভিশনের। বাংলা থিয়েটার এখনো বিশ্বমানের না হলেও, বিশেষ করে সত্যজিৎ রায়ের কয়েকটি চলচ্চিত্র সারা পৃথিবীতে খ্যাতি লাভ করেছে। সুযোগ এবং সুযোগ্য অভিনেতা-অভিনেত্রীদের অভাবে বাংলাদেশের সিনেমা-শিল্প অবশ্য অনেকটাই পিছিয়ে আছে। ১৯৪০ এর দশকে বহুরূপী নাট্যগোষ্ঠীর যাত্রা শুরু হওয়ার পর থেকে এবং নবান্ন নাটকের অভিনয় থেকে বাংলা থিয়েটার এবং নাটক উভয়েরই যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে। মুসলমান সমাজের বিরূপ মনোভাবের কারণে বাংলাদেশে নাটকের অভিনয় দীর্ঘকাল কোনো উৎসাহ পায়নি। কিন্তু স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের থিয়েটারে দ্রুত অগ্রগতি হয়েছে।
বহু শতাব্দী ধরে বাঙালি সংস্কৃতি পরিশীলিত এবং বৈদগ্ধ্য লাভ করে তা কেবল নাগরিক বৈশিষ্ট্য অর্জন করেনি, বরং একটা আন্তর্জাতিক চরিত্রও অর্জন করেছে। তা সত্ত্বেও সাধারণ বাঙালিরা মূলত লোক উপাদান দিয়ে মুগ্ধ হন। বাংলার লোকসাহিত্য, লোকসঙ্গীত, লোকনৃত্য, লোকনাট্য ইত্যাদির সঙ্গে ভক্তিবাদ বাঙালি মানসকে যথার্থভাবে প্রতিফলিত করে।
ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসন ও পরিবর্তনের জোয়ার  তেরো থেকে আঠারো শতকের মধ্যভাগ পর্যন্ত মুসলিম শাসনকে এক কথায় বলা যায় শাসকের পরিবর্তন- হিন্দুদের বদলে মুসলমানের। কিন্তু এর ফলে বাঙালি সমাজের সামন্ততান্ত্রিক কাঠামোয় তেমন কোনো মৌলিক পরিবর্তন আসেনি। ব্রিটিশ শাসনের সময়ে সেই সামন্ততন্ত্রের ভিত্তিতে নাড়া লাগে। ১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে প্রজাদের ওপর জমিদারদের পরোক্ষ শাসন বহাল থাকলেও, ব্যবসা-বাণিজ্য, নির্মাণ শিল্প, সেবামূলক শিল্পসহ অর্থনীতির সর্বত্রই দেখা দেয় পুঁজিবাদের প্রকাশ। এ সময়ে যে ব্যবসায়ী, ঋণদাতা এবং চাকুরিজীবী শ্রেণির উদ্ভব ঘটে তাও ঘটেছিল উপনিবেশিক শাসনের প্রয়োজনে।
স্থানীয় জনগণের প্রতি ভালোবাসা থেকে নয়, উপনিবেশিক শাসনের জন্য প্রয়োজনীয় জনবল তৈরি করার উদ্দেশ্যেই স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, টেক্সটবুক সোসাইটি ইত্যাদি প্রতিষ্ঠিত হয়। ফলে আনুষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থার অভূতপূর্ব উন্নতি হয়। বঙ্গীয় সমাজে এ ধরনের শিক্ষা-কাঠামো কখনও ছিল না। বলা যেতে পারে, এই শিক্ষাব্যবস্থা থেকে দেশীয়রা যে লাভবান হন, তা হয়েছিলেন পরোক্ষ ফল হিসেবে। উপনিবেশিক শক্তি যা-কিছু গুরুত্ব দিয়ে শক্ত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করে, তা করেছিল শোষণকে আরও ফলপ্রসূ করার উদ্দেশ্যে। কিন্তু এসব উদ্যোগের ফলে বঙ্গীয় সমাজের ভিত্তিমূলেই প্রবল ধাক্কা লেগেছিলো।
ব্রিটিশ আমলে বঙ্গদেশে একটি মধ্যবিত্ত শ্রেণি গড়ে ওঠে। এই শ্রেণিও গড়ে উঠেছিল উপনিবেশিক কারণে। উপনিবেশ থেকে কেন্দ্রে সম্পদ স্থানান্তরিত করা এবং উপনিবেশিক শাসন ব্যবস্থা সুচারুভাবে চালানোর উদ্দেশে একটা স্থানীয় মধ্যবিত্ত শ্রেণির দরকার ছিল-যার একাংশে থাকবে একটি ভূমি-মালিক শ্রেণি, অন্য অংশে থাকবে শিক্ষিত এবং চাকুরেদের একটি মধ্যবিত্ত শ্রেণি। এই মধ্যবিত্ত শ্রেণিই বঙ্গীয় গ্রামীণ সংস্কৃতিকে এগিয়ে নিয়ে এবং বৈদগ্ধ্য দান করে বর্তমান আকারে পৌঁছে দিয়েছে। ধর্মনিরপেক্ষ শাসন-ব্যবস্থা, আগেকার ধর্মীয় শিক্ষার জায়গায় উদারনৈতিক ইংরেজি শিক্ষার প্রসার এবং উন্নতি, পাশ্চাত্য ধ্যানধারণার প্রভাব, নগরায়ন এবং প্রযুক্তি - সবই আধুনিক বাঙালি মনন গঠনে সাহায্য করেছিল।
এই পরিবেশ দ্বারকানাথ ঠাকুর থেকে রাধাকান্ত দেব থেকে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের পিতার মতো সমাজের সকল ধরনের উদ্যোগী পুরুষের জন্যে বিবিধ সুযোগ-সুবিধার দ্বার খুলে দিয়েছিল। ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায় ১৮১০ সালের দিকে গ্রাম থেকে প্রথম যৌবনেই কলকাতায় এসেছিলেন ভাগ্যের সন্ধানে। প্রথমে এক দোকানে চাকুরি পেয়েছিলেন দু টাকা বেতনের। তিনি কলকাতায় না এলে এবং উপনিবেশিক শাসনের অধীনে নতুন সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি না হলে বাঙালি সমাজ বিদ্যাসাগর বলে কাউকে পেত না। অথবা রাধাকান্ত দেবের মতো একজন শূদ্র কলকাতার ব্রাহ্মণসহ হিন্দু অভিজাত সমাজের দলপতি হতে পারতেন না।
আগেই বলা হয়েছে যে, বর্ণভেদ প্রথা কেবল ধর্মীয় ব্যবস্থা নয়, বরং সমাজ-কাঠামোর ওপরও তা গুরুতর প্রভাব ফেলেছিল। জীবিকার জন্যে একজন ব্যক্তি কী করবে, এই প্রথা স্থায়ীভাবে তা নির্ধারিত করে দিত। এই প্রথা অনুযায়ী জেলের বংশধরেরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম জেলে হবে; একই ভাবে নাপিতের বংশধরেরা নাপিত, জোলার বংশধরেরা জোলা, ঝাড়ুদারের বংশধরেরা ঝাড়ুদার, বৈদ্যের বংশধরেরা বৈদ্য এবং ব্রাহ্মণের বংশধরেরা ধর্মকর্মের কাজ করবে বলে প্রত্যাশা করতো। গ্রামের মুসলমানরাও মোটামুটি এই প্রথাই পালন করতেন। তাই তাঁরা বেশির ভাগ প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে কৃষিকাজে জড়িত ছিলেন। উপনিবেশিক আমলে এই কঠোর প্রথা শিথিল হতে থাকে এবং সমাজে সীমাহীন সচলতা আসে। মুসলমানসহ সমাজের নিচের তলার লোকরা কৌলিক বৃত্তির প্রতি আনুগত্যবশত দীর্ঘকাল ইংরেজি শিক্ষার দিকে এগিয়ে যাননি অথবা সেই সুবাদে নতুন যুগের সুবিধেগুলোর সুযোগ নেননি। ফলে তাঁরা শিক্ষাদীক্ষায় বর্ণহিন্দু এবং উচ্চশ্রেণির হিন্দুদের তুলনায় অনেক পিছিয়ে পড়েন।
উপনিবেশিক আমলে বাঙালি সমাজের অগ্রগতি হয়েছিল অসমানভাবে এবং প্রধানত সমাজের ওপর তলার লোকেরাই এর ফলে উপকৃত হয়েছিলেন। তা সত্ত্বেও উনিশ শতকের সমাজ এবং সংস্কৃতির অনেক দিকেই সৃজনশীলতার একটা অসাধারণ স্ফূরণ ঘটেছিলো। বিশেষ করে ভাষা, সাহিত্য, সঙ্গীত ও নাটকসহ প্রদর্শনমূলক শিল্পকলা, স্থাপত্য, ধর্ম ও সমাজ-সংস্কার, এমন কি, অনেক অর্থনৈতিক কর্মকান্ডেও এই স্ফূরণ লক্ষ করা যায়। রেনেসাঁর কেবল দুটি দিকের কোনো বিকাশ এ সময়ে তেমন দেখা যায় না- চিত্রশিল্প আর ভাস্কর্যের। ছয় শতাব্দীর মুসলিম শাসন এর আংশিক কারণ হতে পারে। স্থাপত্যেরও সেই অর্থে কোনো পুনর্জাগরণ হয়নি, যা হয়েছিল, তা হলো বিশেষ করে কলকাতা নগরীকে কেন্দ্র করে পাশ্চাত্য স্থাপত্যের বিকাশ। রোমান অথবা গ্রিক স্থাপত্যের মতো কোনো আদর্শ বঙ্গদেশে ছিলো না, যার অনুকরণে স্থাপত্যের রেনেসাঁ হতে পারে। বৌদ্ধদের স্থাপত্যরীতি মুসলিম আমলেই বর্জিত হয়েছিল। বৌদ্ধ স্থাপত্যের শ্রীবৃদ্ধি না-ঘটিয়ে তাঁরা নিয়ে এসেছিলেন পারস্য এবং দিল্লির স্থাপত্যের রীতি। কিন্তু ইংরেজরা এনেছিলেন স্থাপত্যের একেবারে নতুন আদর্শ। নতুন শহর কলকাতায় এই স্থাপত্যরীতি অনুকরণ করাও সহজ ছিল, কলকাতা আগে থেকেই নগরীর রূপ নিয়ে থাকলে এটা সম্ভব হতো না।
এই যে সংস্কৃতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে সৃজনশীলতার স্ফূরণ, ঐতিহাসিকরা একে সাধারণত বঙ্গীয় রেনেসাঁ বলে থাকেন। এতে অবদান রেখেছিলেন হিন্দু জমিদার শ্রেণি এবং শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণী। এ ছিলো ঐতিহাসিক এবং নতুন যুগসৃষ্টিকারী। এই রেনেসন্সের প্রভাবে বাঙালিরা ধর্মনিরপেক্ষতা, যুক্তিবাদ, উদারনৈতিকতা, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য, এক কথায় আধুনিকতার ধারণা দিয়ে প্রভাবিত হন। এ থেকে আবার পরের দিকে স্বাজাত্যবোধের জন্ম হয়। তবে বঙ্গীয় রেনেসাঁর প্রকাশ ছিল নিতান্ত আংশিক এবং সীমিত। কারণ রেনেসাঁর প্রধান দুটি ক্ষেত্র - চিত্রকলা এবং স্থাপত্যে এর কোনো প্রকাশ ঘটেনি, বা সমাজের প্রধান ভাগ অর্থাৎ মুসলমান এবং নিম্নবর্ণের হিন্দুরাও এর আলোক থেকে বঞ্চিত হয়েছিলেন। তবে পরে এই প্রক্রিয়া তাঁদেরও ধীরে ধীরে খানিকটা প্রভাবিত করেছিলো।
আধুনিক বাঙালিদের প্রাত্যহিক জীবনযাত্রা এবং বিবাহ ও পরিবারের মতো সামোজিক প্রতিষ্ঠানকেও পশ্চিমা চিন্তাধারা প্রভাবিত করেছিল। উপনিবেশিক আমলের আগে মহিলাদের রাখা হতো অশিক্ষিত এবং অন্তঃপুরে বন্দী করে। আর বিবাহ ছিলো নিতান্তই সন্তান জন্ম দিয়ে পরিবার গড়ে তোলার একটা প্রক্রিয়া। ইংরেজি শিক্ষা এই পুরুষতান্ত্রিক চিন্তাধারাকে পরিবর্তন করে - প্রথমত নাগরিক সমাজে। নগরের শিক্ষিত সমাজে এর ফলে স্ত্রীশিক্ষার প্রচলন হয় এবং পর্দাপ্রথাও ধীরে ধীরে শিথিল হয়। এমনকি মেয়েদের পোশাকেও দ্রুত পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। মোট কথা, উচ্চশ্রেণির নাগরিক সমাজের অনেক মহিলাই যথেষ্ট পরিমাণে আধুনিক হয়ে ওঠেন। রোমান্টিক প্রেমের ধারণাও ক্রমশ দানা বাঁধতে থাকে এবং সমাজও আস্তে আস্তে তা স্বীকার করে নেয়। তবে এখনও তা সামাজিক রীতিতে পরিণত হয়নি। রোমান্টিক প্রেমের উন্মেষের ফলে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক আগের থেকে ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠে এবং পারস্পরিক প্রেমের ওপর গড়ে ওঠে, এভাবে পরিবারে মহিলাদের মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। বস্ত্তত, বাঙালি নারীদের বর্তমান অবস্থা, বিশেষ করে শিক্ষিত নাগরিক সমাজের নারীদের অবস্থান মোটামুটি সন্তোষজনক ও ন্যায্য বলে বিবেচিত হতে পারে। কিন্তু এই অবস্থা থেকে উনিশ শতকের প্রথম দিকে তাঁদের অবস্থা কী শোচনীয় ছিলো, তা অনুমান করা অসম্ভব। পরিবর্তিত পরিবেশে পরিবার, সমাজ এবং অর্থনীতিতে নারীরা বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৪৭ সালের দেশবিভাগ এবং ১৯৫০ সালের দাঙ্গার পরে পূর্ব বাংলা থেকে ব্যাপকহারে শিক্ষিত হিন্দুদের দেশত্যাগ এবং ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মের ফলে নারীদের মর্যাদা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে এবং তাঁরা আগের তুলনায় গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভূমিকা পালন করার সুযোগ পাচ্ছেন।
দেশবিভাগের পর সংস্কৃতির পরিবর্তন দেশ থেকে সম্পদ পাচার করা এবং তার ফলে দেশের অর্থনৈতিক দুর্দশা ঘটানো ছাড়া, উপনিবেশিক শাসনের একটা প্রধান কুফল ছিল হিন্দু-মুসলমানের সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে। তার আগে এই দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে বিবাহ এবং ভোজন চলতো না বটে, কিন্তু গ্রামের মধ্যে তারা মোটামুটি শান্তিতে পাশাপাশি বসবাস করতেন শতাব্দীর পর শতাব্দী। তাঁদের মধ্যে গ্রাম-সম্পর্ক গড়ে ওঠার ফলে তাঁরা ছিলেন একটা বড়ো পরিবারের মতো। কিন্তু ব্রিটিশ শাসনের সময়ে দুই সম্পর্কের মধ্যে বিচ্ছিন্নতাবাদ ক্রমশ জোরদার হতে থাকে। এর প্রধান কারণ দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে অসমান উন্নয়ন। এর ফলে দুই সম্প্রদায়ের পারস্পরিক সম্পর্ক তিক্ত হয়ে ওঠে এবং পরস্পরের প্রতি বৈরিতা জন্ম নেয়। ১৯২৬ সাল থেকে তা সহিংস দাঙ্গার রূপ নেয়। এরই চূড়ান্ত পরিণতি হলো ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে বঙ্গ-বিভাগ, কার্যত যা হয়ে দাঁড়ায় বঙ্গ সংস্কৃতি ও সমাজের স্থায়ী বিভাগ।
মধ্যযুগের সাহিত্য থেকে মনে হয় না যে, উনিশ শতকের আগ পর্যন্ত বাঙালিদের মধ্যে রাজনীতি বা দেশপ্রেমের চেতনা জেগেছিল। মধ্যযুগে যেমন সমাজ-সচেতন কবি মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর চন্ডীমঙ্গল থেকে দেখা যায় দেশের রাজা বা সুলতান কে, তিনি তাও সঠিকভাবে জানতেন না। এমনকি, সুলতান কে তা তিনি পরোয়াও করতেন বলে মনে হয় না। বরং ডিহিদার কে, সেটা তাঁর জন্যে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিলো। গ্রামের লোকদের মধ্যে গ্রামের বাইরের অবস্থা সম্পর্কে তেমন আগ্রহও ছিল না। সাধারণ মানুষরা গোটা জীবন কাটিয়ে দিতেন দু-তিন মাইল ব্যাসার্ধের একটা বৃত্তের মধ্যে। দেশ শাসনে অংশ গ্রহণের সুযোগ উপনিবেশিক শাসন আমলেই সৃষ্টি হয়েছিল, যদিও তারই ফল দেশ-বিভাগ।
দেশবিভাগের দরুণ বঙ্গদেশ স্থায়ীভাবে দু ভাগে বিভক্ত এবং সমাজের প্রধান দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে ভেদ বড়ো করে দেখা দিলেও, পূর্ব পাকিস্তানের মুসলমান সম্প্রদায়ের ওপর এর একটা ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। দেশবিভাগ এবং পরে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ফলে পূর্ব পাকিস্তান থেকে উচ্চশ্রেণির হিন্দুরা ব্যাপকভাবে পশ্চিমবঙ্গে চলে যাওয়ায়, শিক্ষা এবং অর্থনৈতিক কার্যক্রমে যে মুসলমান সম্প্রদায় এ যাবৎ হিন্দুদের তুলনায় পিছিয়ে ছিলেন, তাঁরা রাতারাতি সর্বত্রই বিনা প্রতিযোগিতায় উন্নতির পথে এগিয়ে যাওয়ার সুবর্ণ সুযোগ পেলেন। ফলে শিক্ষিত এবং ছোট ব্যবসায়ীদের একটি মধ্যবিত্ত শ্রেণি তুলনামূলকভাবে কম সময়ের ভেতর মুসলমানদের মধ্যে গড়ে উঠলো।
পাকিস্তান আমলে এক দিকে শিক্ষার বিকাশ এবং অন্য দিকে শোষণ ও বাঙালিদের ওপর ভিন ভাষা আরোপের প্রয়াসের ফলে জন্ম নেয় ভাষা আন্দোলন (১৯৪৮-৫২)। ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুত্থানের আগ পর্যন্ত এই ভাষা আন্দোলন দেশের রাজনীতিকে বিপুলভাবে প্রভাবিত করে। তদুপরি পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে কেবল ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে যে মিলন কৃত্রিমভাবে ঘটানো হয়েছিল, তা থেকে অচিরেই বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে একটা স্বরূপের সংকট দেখা দেয়। তাঁরা বাঙালি ছিলেন কিনা, সে বিষয়ে কোনো কালেই তাঁরা নিশ্চিত ছিলেন না, কিন্তু ভাষা আন্দোলনের পর তাঁরাই ভাষাভিত্তিক ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে শরিক হন। এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বর্ধিত চর্চায়। শেষ পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানের সাহিত্যে প্রামাণ্য বাংলা ভাষা থেকে সামান্য ভিন্ন স্বাদের এক ধরনের বাংলার উন্মেষ লক্ষ করা যায়। তাছাড়া, ইতিবাচক ফল দেখা দেয় হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতি তাঁদের চিরকালের বিতৃষ্ণা, এমনকি, অবিশ্বাস ও ঘৃণা হ্রাস পায়। পশ্চিমবঙ্গেও মুসলমানদের সঙ্গে চাকরি-বাকরির ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা কমে যাওয়ায় দেশ বিভাগের কয়েক দশকের মধ্যে মুসলমানদের প্রতি অবিশ্বাস ও ঘৃণাবোধ হ্রাস পায়; যদিও দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা জন্মেনি।
দেশ-বিভাগ, স্বাধীন বাংলাদেশের উদ্ভব এবং সেই সঙ্গে জীবন রক্ষাকারী উন ঔষুধপত্র ও টিকা আবিষ্কারের ফলে দুই বাংলাতেই জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে, এবং তার ফলও পড়েছে বঙ্গীয় সমাজের ওপর। ফলে একদিকে বেকারত্ব ও দারিদ্র্য বৃদ্ধি পেয়েছে, অন্যদিকে গ্রামের ব্যাপক সংখ্যক লোক কাজের খোঁজে শহরে, এমনকি বিদেশে চলে যাচ্ছেন। উনিশ শতকের শেষ পর্যন্ত কালাপানি পার হয়ে বিদেশে যাওয়াকে লোকাচার অনুযায়ী রীতিমতো নিষিদ্ধ বলে গণ্য করা হতো, কিন্তু এখন যথাসর্বস্বের বিনিময়ে লোকে একবার বিদেশে গিয়ে কোনো কাজ করতে পারলে, তা সে কাজ যতোই তুচ্ছ হোক, জীবনকে ধন্য মনে করে। সেদিন বিগত যখন বাঙালিরা ঘরমুখো ছিলেন এবং বেকার থাকতে ভালোবাসতেন। বাংলাদেশে কর্মসংস্থানের অভাবে দেশের শতকরা প্রায় পাঁচ ভাগ লোক অন্যান্য দেশে কাজ করছেন, বেশির ভাগই সাধারণ শ্রমিক হিসেবে। তবে দক্ষ কিছু পেশাদারও অন্যান্য দেশে কাজ করছেন, এঁরা বেশির ভাগই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, ডাক্তার, আইনজীবী, সরকারী চাকুরে ইত্যাদি। হাজার হাজার বাঙালি বিদেশে সাফল্যের সঙ্গে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং ছোটখাটো শিল্প প্রতিষ্ঠানও গড়ে তুলেছেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর আর-একটা গোষ্ঠী বড়ো শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছেন কারণ একটা দেশ এসব ছাড়া চলতে পারে না। মুসলমান সমাজে এটা অভিনব।
গ্রাম থেকে ক্রমবর্ধমান মাত্রায় লোকজন শহরে চলে যাওয়ার ফলে জাতিভেদ প্রথা প্রায় লোপ পেয়েছে, কিন্তু তার জায়গায় শ্রেণিবৈষম্য দেখা দিয়েছে প্রবল আকারে। যেমন, নগরীতে এখন অত্যন্ত ধনী এবং বস্তিবাসীরা প্রায় পাশাপাশি বাস করেন। তা ছাড়া, ধনী এবং দরিদ্রের মধ্যে ভেদাভেদ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ব্যাপক শিল্পায়ন এবং ট্রেড ইউনিয়নের বিকাশ ঘটার পরে মুনিবদের প্রতি শ্রমিকদের আন্তরিক শ্রদ্ধাবোধ হ্রাস পেয়েছে, তার জায়গায় বৃদ্ধি পেয়েছে ঘৃণা এবং শত্রুতা। গ্রাম-সম্পর্কের মতো কোনো সম্পর্ক নগরীতের গড়ে ওঠে না। শিক্ষার হার দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং নাগরিক জীবনযাত্রা কেবল নগরবাসীদের ওপরই প্রভাব ফেলছে না, বরং তা শহরে বসবাসকারী গ্রামবাসীদের মাধ্যমে গ্রামেও প্রসারিত হচ্ছে। ফলে জীবনযাত্রাসহ গ্রামীণ সংস্কৃতির সব দিকই ক্রমবর্ধমান মাত্রায় নাগরিক সংস্কৃতি দিয়ে প্রভাবিত হচ্ছে।
সিনেমা এবং ইলেক্ট্রনিক মাধ্যমসহ যোগাযোগ ব্যবস্থার অভূতপূর্ব উন্নতি এবং সাম্প্রতিক বিশ্বায়নের প্রক্রিয়া বিভিন্ন বিরোধী সংস্কৃতিকেও কাছাকাছি নিয়ে আসছে এবং বিভিন্ন ধর্মীয় ও আঞ্চলিক সম্প্রদায়গুলো ঐক্যের দিকে যাচ্ছে। ওদিকে, ভাষার কথা চিন্তা করলে বলতে হয়, যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নতির ফলে প্রামাণ্য ভাষা আঞ্চলিক ভাষাগুলো দিয়ে এবং আঞ্চলিক ভাষাগুলো প্রামাণ্য ভাষা দিয়ে প্রভাবিত হচ্ছে। মুসলমানপ্রধান বাংলাদেশের ভাষায় যেমন মুসলিম জীবনের সঙ্গে জড়িত শব্দ বৃদ্ধি পাচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গের বাংলায় তেমনি বহু হিন্দি পরিভাষা ঢুকে পড়ছে। বলিউডের সিনেমা এবং ধারাবাহিক অনুষ্ঠানগুলিও বাঙালি সংস্কৃতির ওপর প্রভাব ফেলছে, বিশেষ করে পোশাক এবং সঙ্গীতে। পোশাকের পরিবর্তন অবশ্য মহিলাদের মধ্যেই সবচেয়ে বেশি লক্ষ করা যাচ্ছে। মহিলারা চিরদিনের শাড়ি বর্জন করে সালওয়ার-কামিজ পরতে আরম্ভ করেছেন। অথচ ছয়শো বছরের মুসলিম শাসন এবং দুশো বছরের ব্রিটিশ শাসনও শাড়িকে বদলাতে পারেনি, যদিও পূর্বোক্ত দুই আমলে পুরুষদের পোশাকে বিরাট পরিবর্তন এসেছিল। খাদ্যাভ্যাসেও এই দুই আমলের প্রভাব পড়েছিল।
খাদ্যাভ্যাস  বাঙালিরা চিরকাল ভেতো বাঙালি বলে পরিচিত হলেও, গত অর্ধশতকে তাঁদের খাদ্যাভ্যাসে বড়ো রকমের পরিবর্তন এসেছে। গরিবরা চালের বদলে শস্তা গমের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন, আর ধনীরা বিদেশী খাবারে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছেন, বিশেষ করে চীনা এবং পাশ্চাত্যের খাদ্যে। হ্যামবার্গার এবং হট ডগের মতো পশ্চিমা খাবার এবং স্থানীয়ভাবে তৈরি চীনা ও থাই খাবার নাগরিক সমাজে এতোই ছড়িয়ে পড়ছে যে, মহিলারা তা বাড়িতেও তৈরি করার কৌশল শিখে ফেলছেন।
অবশ্য এসব পরিবর্তন আসার পরও বাঙালিদের সঙ্গে কতোগুলো খাদ্যকে অভিন্ন করে দেখা হয়। মহিলারা যেমন শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে রান্নায় তাঁদের সৃজনশীলতার পরিচয় দিয়ে নানা রকমের মিষ্টান্ন এবং আচার তৈরি করেছেন, যা উপমহাদেশের অন্য কোথাও তৈরি হয় না। তাঁদের মিষ্টির জন্যে বাঙালিরা এতোই সুপরিচিত যে, গোপাল হালদার এক জায়গায় বাঙালি সংস্কৃতিকে রসিকতা করে রসগোল্লা এবং সন্দেশের সংস্কৃতি বলে বর্ণনা দিয়েছেন। কোনো কোনো খাবার আবার দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে স্বাদে এবং নামে খানিকটা আলাদা।
বাঙালি হিন্দু ও মুসলমানদের এবং ধনী ও দরিদ্রদের খাদ্যাভ্যাসের মধ্যে বিরাট পার্থক্য লক্ষ করা যায়। যেমন, উচ্চশ্রেণির মুসলমানরা মাংসের বিশেষ ভক্ত হলেও, হিন্দুরা সাধারণত মাছ এবং সবজি বেশি পছন্দ করেন। হিন্দুদের মধ্যে শাক্তরা অবশ্য মাংসের ভক্ত। আর, দরিদ্র হিন্দু ও মুসলমানদের খাদ্যাভ্যাস কমবেশি একই রকম, তাঁরা যা জোটাতে পারেন, তাই খান। চর্যাপদের একটি পংক্তি থেকে মনে হয় সেই প্রাচীন কালেও দরিদ্রের মধ্যে ভাতের টানাটানি ছিল, এখনো তাই আছে। দরিদ্রদের প্রধান খাদ্য ভাত আর শাক। মাঝেমধ্যে মাছ এবং ডাল। ডাল এক সময় বঙ্গদেশে ছিল বলে মনে হয় না। কিন্তু এখন ধনী ও গরিব সবাই ডাল পছন্দ করেন।
রান্নার পদ্ধতি হিন্দু এবং মুসলমানদের মধ্যে যথেষ্ট আলাদা। ভিন দেশ থেকে আসা উচ্চশ্রেণির মুসলমানরা স্থানীয় রীতিতে রান্না করা খাবার ভালোবাসতেন না। তাঁরা তাঁদের সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন সেইসব রান্না যা পরে মোগলাই খাবার নামে পরিচিত হয়। সাম্প্রতিক কালের আগ পর্যন্ত অবশ্য তা সাধারণ মুসলমানদের মধ্যেই প্রবেশ করেনি, হিন্দু সমাজে তো নয়ই। পর্তুগিজ এবং ইংরেজরা যখন তাঁদের সঙ্গে নতুন খাদ্য নিয়ে এলেন, তখন তাও ধীরে ধীরে হিন্দু ও মুসলমান উভয় সমাজে প্রবেশ করতে থাকে।
বাঙালিত্ব বিশেষ করে আধুনিক কালে বাঙালিদের সংস্কৃতি বিচিত্র রূপ লাভ করলেও, তার মধ্যে কিছু বৈশিষ্ট্য রয়ে গেছে, যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বাঙালি সমাজে স্থায়ী আসনে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল। যেমন, বাঙালি মহিলাদের এখনো উপমহাদেশের এক দল নারীর মধ্যে সহজেই আলাদা করে চিনে নেওয়া যাবে। ক্রমবর্ধমান ব্যস্ত জীবনযাত্রার মধ্যেও বাঙালিরা ঢিলেঢালা জীবনধারা পছন্দ করেন এবং কয়েকজন মিলে আড্ডা দিতে ভালোবাসেন। তাঁদের অনেকেই হুজুগে, দীর্ঘমেয়াদী ফলাফলের কথা না ভেবে সবাই মিলে লাফিয়ে পড়তে পছন্দ করেন। জীবনের বহু ক্ষেত্রে আধুনিক হয়ে উঠলেও, তাঁদের মধ্যে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের বিকাশ ঘটেছে সামান্যই। তাঁদের মধ্যে আত্মীয়তার বন্ধন খুব জোরালো। কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া,বিবাহের আয়োজন করেন পিতামাতারা, এবং তাঁদের মধ্যে বিবাহপূর্ব ও বিবাহ-বহির্ভুত প্রেম সামান্যই দেখা যায়। গ্রামীণ জনগণের মধ্যে দারিদ্র্য এবং ভূমিহীনতা বৃদ্ধি পেলেও মধ্যবিত্ত এবং ধনীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা এবং নিজেদের জাহির করার একটা সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। বিরাট সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালিরা আগে কৃষিনির্ভর ছিলেন, কিন্তু বিশ শতকে জনসংখ্যার বিস্ফোরণের ফলে অনেক বাঙালিই এখন গ্রামের বদলে শহরে গিয়ে স্বল্প-দক্ষ বা অদক্ষ শ্রমিকে পরিণত হয়েছেন। বাঙালি চরিত্রের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো তাঁরা সাধারণত নমনীয় মধ্যপন্থায় এবং সমন্বয়ধর্মিতায় বিশ্বাসী। সে কারণে তাঁরা যেকোনো উগ্রবাদের পথ সাধারণত এড়িয়ে চলেন। 

সোমবার, ৭ মার্চ, ২০২২

চিত্রাঙ্গদা

চিত্রাঙ্গদা

✍️ ডা: অরুণিমা দাস


আমি চিত্রাঙ্গদা, রাজেন্দ্রনন্দিনী,নহি দেবী, নহি সামান্যা নারী।

চিত্রাঙ্গদা মহাভারত মহাকাব্যের একটি চরিত্র। তিনি রাজা চিত্রবাহনের কন্যা ও অর্জুনের তৃতীয়া স্ত্রী।

জন্ম
মণিপুরের রাজকন্যা চিত্রাঙ্গদা। মণিপুর রাজের ভক্তিতে তুষ্ট হয়ে শিব বর দিয়েছিলেন যে তাঁর বংশে কেবল পুত্রই জন্মাবে। কিন্তু তারপরও যখন রাজকূলে চিত্রাঙ্গদার জন্ম হল রাজা তাকে পুত্ররূপেই বড়ো করলেন।
রাজকন্যা অভ্যাস করলেন ধনুর্বিদ্যা, শিক্ষা করলেন যুদ্ধবিদ্যা, রাজদণ্ডনীতি।

বিবাহ, সন্তান ও অন্যান্য
পরবর্তী জীবন

মণিপুররাজ সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে তার কন্যার সাথে কেবলমাত্র মহাবীর অর্জুনের বিয়ে দেবেন। ওইদিকে ইন্দ্রপ্রস্থে সহবাসরত যুধিষ্ঠির ও পাঞ্চালিকে দেখে ফেলায় অর্জুনের বারো বছর বনবাস হয়। অর্জুন বারো বছর ব্যাপী ব্রহ্মচর্য ব্রত পালনের সময় ভ্রমণ করতে করতে এলেন মণিপুর রাজ্যে। সেই সময়ে অর্জুন চিত্রাঙ্গদার প্রেমে পড়েন। তার ও চিত্রাঙ্গদার বিবাহ হল। তাঁদের মিলনের ফলে অর্জুনের ঔরসে চিত্রাঙ্গদার গর্ভে সন্তান জন্মায়। তাদের সেই পুত্রের নাম বভ্রূবাহন। অর্জুন বভ্রূবাহনকে মণিপুরের রাজা বানিয়ে দেন ও নিজের রাজ্যে ফিরে যান।

যুধিষ্ঠিরের অশ্বমেধ-যজ্ঞের অশ্বকে নিয়ে যুদ্ধার্থী অর্জুন যখন মণিপুরে এসে পৌঁছলেন, তখন পুত্র বভ্রুবাহন যুদ্ধ না করে ভক্তি সহকারে পিতা অর্জুনকে অভ্যর্থনা জানালেন। অর্জুন পুত্রের এই কাপুরুষতা দেখে যখন ধিক্কার দিচ্ছেন, তখন অর্জুনের দ্বিতীয় স্ত্রী উলুপী ভূমিতল থেকে উঠে এসে নিজেকে বভ্রুবাহনের বিমাতা বলে পরিচয় দিয়ে পুত্রকে বললেন যুদ্ধ করতে। বিমাতার আদেশে তিনি যুদ্ধ শুরু করলেন এবং তাঁর বাণে অর্জুন ভূমিশয্যা নিলেন। বভ্রূবাহনের দ্বারা যুদ্ধে নিহত হওয়ার পরে উলুপী অর্জুনকে পুনজীবিত করে তাকে বসুদের অভিশাপ থেকে মুক্ত করেছিলেন। উলুপী সঞ্জীবন-মণি এনে অর্জুনকে সুস্থ করে বসুগণের শাপের কথা সবাইকে বললেন। অশ্বমেধ যজ্ঞে অর্জুনের আমন্ত্রণে চিত্রাঙ্গদা ও বভ্রূবাহনের সঙ্গে উলুপীও এসেছিলেন এবং পাণ্ডবদের মহাপ্রস্থানে যাওয়া পর্যন্ত পাণ্ডবদের সঙ্গেই ছিলেন। পাণ্ডবরা চলে গেলে তিনি আবার নিজ রাজ্যে ফিরে যান।

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস


বৃহস্পতিবার, ৩ মার্চ, ২০২২

বিষয় - গ্রন্থালোচনা

বিষয় - গ্রন্থালোচনা
✍️ডা: অরুণিমা দাস 

বইমেলা থেকে সদ্য কেনা বইটি পড়ে বেশ ভালো লাগলো। মানুষ যখন বৃদ্ধ হয় তার মূল্য কমে যায়, কিন্তু বৃদ্ধ যদি প্রভূত সম্পত্তির মালিক হন তাহলে তো কোনো কথাই নেই।এরকমই এক অকৃতদার মানুষের সম্পত্তি আত্মসাৎ করার জন্য নানান কৌশল অবলম্বন করেন রিস্তেদারেরা। সেই কৌশল গুলোকেই ফুটিয়ে  তুলেছেন নারায়ণ সান্যাল তাঁর কাঁটা সিরিজের অন্যতম গল্প 
"রিস্তেদারের কাঁটা "তে। 
এই গল্পেরই কিছু লাইন তুলে নিজের পাঠ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করার চেষ্টা করছি। 

বাসু বললেন, “শোন টুকু, তোমার বয়স কম, অভিজ্ঞতাও অল্প। যে ঘটনা তোমাদের বাড়িতে ঘটেছে তার ছকটা অতি পরিচিত। যুগে যুগে, দেশে দেশে,এই নাটকটা অভিনীত হয়ে গেছে।
পরিকল্পনার ছকটা সব ক্ষেত্রেই এক রকম। অগাধ সম্পত্তির মালিক বৃদ্ধ বয়সে অসুস্থ হয়ে পড়েন-হয়তো তখন তিনি বিপত্নীক, নিঃসন্তান। সম্পত্তির লোভে দূর-সম্পর্কের আত্মীয়েরা এসে জোটে। যারা এতদিন বৃদ্ধের দেখ্‌ভাল করছিল, নানা ছুতোয় তাদের দূরে সরিয়ে দেওয়া হয়। পাড়া প্রতিবেশী শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেলে। নৌকার হালটা কব্জা করার পরেই রিস্তেদারেরা দাবী করে,বৃদ্ধ মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছেন! নিজের সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষমতা আর তাঁর নেই। আদালত ওদেরই একজনকে সম্পত্তির অছি নিযুক্ত করে। একাহ্নে নাটকের প্রথম অঙ্কের সমাপ্তি ঘটে। দ্বিতীয় অঙ্কে বৃদ্ধকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় কোনও আরোগ্য-নিকেতনে, নার্সিংহোমে, কখনো বা মানসিক উন্মাদাগারে। সেই বিখ্যাত আরবীয় উটের ক্লাসিকাল কাহিনীটি পুনরাভিনীত হয়।রিস্তেদারেরা স্থায়ীভাবে সম্পত্তির দখল নেয় – আর উট নিজের তাঁবু ছেড়ে বাইরে এসে হয়ে যায় ‘অবন –ঠাকুরের’ উট!

বিষদে জানতে হলে অবশ্যই পড়তে হবে গল্প বইটি। 

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

শুক্রবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২২

গ্রন্থালোচনা - আর্টিমিসিয়া

গ্রন্থালোচনা
✍️ ডা: অরুণিমা দাস

সম্প্রতি নারায়ণ সান্যালের লেখা একটি গল্প পড়লাম,আর্টিমিসিয়া। হয়ত এই বছর অনেক গল্প বই পাঠ করবো,মুগ্ধ হবো, পাঠ প্রতিক্রিয়া দেবো। কিন্তু বছরের শুরুতে 'নিউটাউন বইমেলা ২০২২' থেকে সংগ্রহ করা এই বইটি আমার কাছে অন্যতম শ্রেষ্ঠ একটি বই। কেন! বলছি। বলার আগে আমার এই প্রচ্ছদের ছবিটা একবার দেখে নেওয়া উচিত। ছবির স্রষ্টা আর্টিমিসিয়া জেন্টেলেসচি,যাকে নিয়ে এই গ্রন্থ। আমি আঁকার বিষয়ে অনেক কিছু বুঝতাম না। কিন্তু এই গ্রন্থ আমাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে। আঁকারও ব্যাকরণ আছে, জ্যামিতি আছে,দর্শন আছে,দৃষ্টিকোণ আছে। এছাড়াও এই গ্রন্থের রচয়িতা নারায়ণ সান্যাল রেনেসাঁ যুগে রোমে আর ফ্লোরেন্সে মহিলাদের সামাজিক অবস্থাগত পার্থক্য লেখার মধ্যে দিয়ে অঙ্কন করেছেন। 

আর্টিমিসিয়া জেন্টিলেসচি রেনেসাঁ যুগের একমাত্র মহিলা-শিল্পী যিনি সার্থকতার গৌরীশৃঙ্গে উপনীত হয়েছিলেন। ফ্লোরেন্স আকাডেমিয়ার প্রথম ও একমাত্র সদস্যা। অন্যান্যরা : বত্তিচেল্লি, বেলিনী, লেঅনার্দো, মিকেলাঞ্জেলো, কারজ্জিত্ত, গ্যালিলেও! ফ্লোরেন্সের উফিজি সংগ্রহশালায় মহিলাশিল্পীর আঁকা একটি মাত্র চিত্রই তখন স্থান পেয়েছিল - বলা বাহুল্য সেটি ছিল আর্টিমিসিয়ার আঁকা।

এই গ্রন্থকে উপন্যাস বলা যায় না। এই গ্রন্থ লেখক  এক অবহেলিত শিল্পীর জীবন সম্পর্কে তাঁর করা পর্যবেক্ষণ গল্পের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন। অবহেলার কারণ তিনি ছিলেন একজন মহিলা - আর্টিমিসিয়া জেন্টিলেসচি। যার নামের মধ্যেই "আর্ট" (ব্যক্তিগত মনভাব)! আর তাঁর জীবন যুদ্ধ যেমন লেখক একনাগারে কোন পর্ব, অনুচ্ছেদে বিরতি না দিয়ে মসৃণ ভাবে বর্ণনা করেছেন, এই বই পড়ার সময়ও বিরতি প্রয়োজন বলে আমার ব্যক্তিগত ভাবে মনে হয়নি। কিন্তু সময় অকুলান বলে বিরতি নিতে হয়েছে। বেশি কিছু আর বলবো না। শুধু বলব, এই গ্রন্থ ও এই গ্রন্থের নায়িকা মনে এক গভীর দাগ কেটে দিয়েছেন। যে দাগ শক্তি যোগায়, প্রেরণা দেয়। আমার মনে হয় এই গ্রন্থ সবার পড়া উচিত আর এর মাধ্যমেই আর্টিমিশিয়াকে ওঁর যোগ্য সম্মান দেওয়া হবে হয়তো। 

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

বুধবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২২

মাইথোলজি অফ মিশর

মাইথলজি অফ মিশর
✍️ ডা: অরুণিমা দাস


মাইথলজি মানে পুরাণ বিষয়ক আলোচনা। ভারতীয় পুরাণ ছেড়ে আজ একটু অন্য দেশের পুরাণে চোখ রাখা যাক। একটু অন্যরকম ভাবে উপস্থাপন করলাম আজকের বিষয়টিকে।

 *প্রাচীন মিশরের দেব-দেবীদের ইতিকথা* 

প্রাচীন পৃথিবী সম্পর্কে আমাদের জানার আগ্রহের কোনো শেষ নেই। তারা কী করতো, কীভাবে চলাফেরা করতো,তারা কি খেত,নানা রোগের চিকিৎসাপদ্ধতি কেমন ছিলো ইত্যাদি নানান বিষয় প্রায় সময়ই আমাদের মাথায় ঘোরাফেরা করে।  আদি যুগের মানুষেরা কোন রুপে তাদের কল্পনা করতো, কোন কাজে কোন দেব-দেবীর আরাধনা করতো, আর সেই সাথে কেমনই বা ছিলো সেই দেব-দেবীর নিজেদের গল্প সেই বিষয়গুলোই তুলে ধরার চেষ্টা করলাম আজকের লেখায়।

 ন্যুট 
 
ইনি ছিলেন আকাশ ও তারাদের দেবী। তার বিশাল দেহ ভূ-পৃষ্ঠের উপরে একটি প্রতিরক্ষামূলক স্তর তৈরি করে মানবজাতিকে রক্ষা করে বলে বিশ্বাস করতো প্রাচীন মিশরীয়রা। প্রতিদিন রাতে তিনি সৌর দেবতা রা-কে খেয়ে ফেলতেন এবং প্রতিদিন সকালে তাকে আবার নতুন করে তিনি জন্ম দিতেন!

 শুশু

ইনি ছিলেন শুষ্ক বাতাসের দেবতা। তাকে সাধারণত মাথায় পালক শোভিত একটি মুকুটসহ দেখা যায়। তার কাজ ছিলো মূলত ন্যুটের দেহকে উপরে তুলে রেখে আকাশ ও মাটিকে পৃথক রাখা!


 গেব

ছিলেন পৃথিবীর দেবতা। তিনি ছিলেন একইসাথে আকাশের দেবী ন্যুটের ভাই ও স্বামী। প্রাচীনকালে মিশরীয়রা মনে করতো যে, পৃথিবীতে যতো ভূমিকম্প হয়, সেগুলো আসলে গেবের হাসির কারণে হয়ে থাকে!


 আমুন

এককালে মিশরীয়দের কাছে বেশ ক্ষমতাশালী দেবতা বলে পরিচিত ছিলেন আমুন। এমনকি মিশরের ইতিহাস থেকে জানা যায় যে, এককালে তাকে ‘দেবতাদের রাজা’ বলেও মনে করা হতো। কখনো কখনো সূর্য দেবতা রা’র সাথে মিলিত হয়ে তিনি ‘আমুন-রা’ নাম ধারণ করতেন।

আনুবিস

মানুষের মতো দেহ ও শেয়ালের মতো মাথাবিশিষ্ট আনুবিসকে ভাবা হতো মৃত্যুর দেবতা। প্রাচীন মিশরে প্রায়ই শেয়ালদের দেখা যেত কবরস্থান থেকে মৃতদেহ তুলে খাচ্ছে। এখান থেকেই আনুবিসের শেয়ালের মতো মাথার ধারণাটি এসেছে বলে ধারণা করা হয়। প্রাচীন মিশরীয় রাজাদের দেহ মমিকরণের সাথে যুক্ত পুরোহিতরাও আনুবিসের অনুকরণে মুখোশ পরতেন।

বাস্টেট

বাস্ট, বাস্টেট, উবাস্টি ও পাস্‌খ নামে পরিচিত ছিলেন এ দেবী। তাকে বিভিন্ন জিনিসের সংরক্ষক মনে করা হতো দেখে তার রুপও ছিলো বিভিন্ন। প্রথমদিকে বাস্টেটকে ভাবা হতো মিশরের নিচু এলাকা গুলোর রক্ষাকর্ত্রী দেবী। এজন্য তখন তাকে সিংহীর রুপে দেখা যেত। পরবর্তীতে তাকে নিরাপত্তা ও আশীর্বাদের দেবী এবং নারী-শিশু- বিড়ালের রক্ষাকর্ত্রী মনে করা হতো। সেই সাথে সূর্যোদয়, সঙ্গীত, নৃত্য, আনন্দ, পরিবার, উর্বরতা ও জন্মের দেবীও ধরা হতো তাকে। কখনো কখনো বাস্টেটকে বিড়াল রুপেও দেখা গিয়েছে।

 বেস 

গর্ভবতী নারী, সদ্য জন্ম নেয়া শিশু ও পরিবারের রক্ষক হিসেবে দেখা হতো কিম্ভূতকিমাকার বামন এ দেবতাকে। তিনি গায়ে সিংহের চামড়া জড়িয়ে রাখতেন। কোনো শিশুর জন্মের সময় তিনি সারা ঘরে ঝুমঝুমি বাজিয়ে নেচে নেচে অশুভ আত্মাকে দূরে রাখতেন বলে বিশ্বাস করতো প্রাচীন মিশরীয়রা। আর যখন কোনো বাচ্চাকে কোনো কারণ ছাড়াই হাসতে দেখা যেতো, তখন তারা ভাবতো যে রুমের কোথাও বসে বেস হয়তো বাচ্চাটিকে ভেংচি কাটছে!


 হাপি

নীলনদের সৃষ্ট বার্ষিক প্লাবনের দেবতা হিসেবে দেখা হতো হাপিকে। বিশালাকার পেট ও স্তনবিশিষ্ট এ দেবতার মাথায় থাকতো বিভিন্ন জলজ উদ্ভিদ।

হাথর 

সৌরদেবতা রা এর কন্যা হাথরকে দেখা হতো নারী, সৌন্দর্য, ভালোবাসা, আনন্দ ও সঙ্গীতের পৃষ্ঠপোষক দেবী হিসেবে। গরু, নারীদেহ কিন্তু কানটি গরুর কিংবা নারীদেহ কিন্তু গরুর শিং মাথায় জড়িয়ে রাখা- এ তিন রুপেই দেখা যেত হাথরকে।

 হোরাস

ওসাইরিস ও আইসিসের পুত্র হোরাসকে দেখা যেত বাজপাখি কিংবা মানুষের দেহ ও বাজপাখির মাথার সংমিশ্রিত এক রুপে। হোরাসকে আকাশের দেবতা ভাবতো প্রাচীন মিশরীয়রা।


 আইসিস

প্রাচীন মিশরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক দেবী ছিলেন আইসিস। তাকে সর্বশ্রেষ্ঠ জাদুকর মনে করতো মিশরীয়রা। তাই জাদুর দেবী হিসেবে তিনি পরিচিত ছিলেন সর্বত্র। জীবন দানকারী, আরোগ্য প্রদানকারী এবং রাজাদের প্রতিরক্ষক হিসেবে দেখা হতো আইসিসকে। কখনো নিজের মাথায় একটি সিংহাসন নিয়ে, আবার কখনো পুত্র হোরাসকে স্তন্যদানরত অবস্থায় দেখা যেতো আইসিসকে।

 খেপ্রে 

খেপ্রে, খেপ্রি, খেপ্রা, খেপেরা ইত্যাদি নানা নামে পরিচিত এ দেবতাকে মিশরীয়রা গুবরে পোকাদের দেবতা বলে ভাবতো। গুবরে পোকাদের বিভিন্ন প্রাণীর মল গড়িয়ে নিয়ে যেতে দেখে প্রাচীন মিশরীয়রা ভাবতো যে, খেপ্রে হয়তো সূর্যকে তার কক্ষপথে স্থাপন করে এসেছেন!

খ্‌নুম 

ভেড়ার মাথাওয়ালা খ্‌নুম বা খ্‌নেমু নামে পরিচিত এ দেবতাকে মিশরীয়রা নীল নদের উৎসের দেবতার মর্যাদা দিয়েছিলো। একই সাথে তাকে জলপ্রপাত, উর্বরতা ও সৃষ্টির দেবতা ভাবা হতো। তার কাছে থাকা কুমোরের চাকাতেই তিনি নীলনদের তীরের মাটি থেকে প্রথম মানুষ তৈরি করেছিলেন বলে এককালে বিশ্বাস করতো মিশরীয়রা।


খোন্সু

আমুন ও মুতের ছেলে খোন্সুকে খোন্স, খেন্সু, খুন্স ইত্যাদি বিভিন্ন নামেও ডাকা হতো। প্রাচীন মিশরে তাকে চাঁদ, চাঁদের আলো ও সময়ের দেবতা হিসেবে গণ্য করা হতো।

মা’আত

আইন-কানুন, নীতি-নৈতিকতা ও বিচার ব্যবস্থার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদির দেবী হিসেবে ভাবা হতো মা’আতকে। উটপাখির পালক মাথায় জড়ানো অবস্থাতেই তাকে চিত্রায়িত হতে দেখা গেছে।

ম্যুট 

সৌরদেবতা রা’র কন্যা ম্যুটকে শকুনদের দেবী হিসেবে কল্পনা করতো প্রাচীন মিশরীয়রা। দীর্ঘাকায় এ দেবীর পরনে থাকতো উজ্জ্বল রঙয়ের পোষাক, মুকুটে শোভা পেত শকুন।

নেফিথিস

অনেক ক্ষমতার অধিকারী দেবীকে নেফিথিসকে প্রাচীন মিশরীয়রা ‘চমৎকার দেবী’ বলেও সম্বোধন করতো। তবে সময়ে সময়ে চমৎকার এ দেবী ভয়ংকরও হয়ে উঠতে পারতেন। রাজার শত্রুদেরকে তিনি তার নিঃশ্বাস দিয়ে শেষ করে দিতে পারেন বলে বিশ্বাস করতো মিশরীয়রা। তাই তাকে রাজাদের প্রতিরক্ষক বলা হতো। মৃত্যু, ক্ষয় ও অন্ধকারের এ দেবীর জাদুবিদ্যায় ছিলো অসাধারণ পারদর্শীতা ও অদ্ভুত আরোগ্য প্রদানের ক্ষমতা।

ওসাইরিস

প্রাচীন মিশরের দেবতাদের মাঝে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থান দখল করে আছেন ওসাইরিস। মিশরের প্রথম রাজা হিসেবে চিত্রায়িত এ দেবতাকে তারা ভাবতো শস্যের দেবতা হিসেবে। ফারাওয়ের ক্ষমতা দখলের লড়াই নিয়ে নিজ ভাই সেথের কাছে খুন হন ওসাইরিস। পরে অবশ্য ওসাইরিসের ছেলে হোরাস সেথকে পরাজিত করে ফারাও হয়েছিলেন। মিশরীয়রা বিশ্বাস করতো যে,স্ত্রী আইসিস তাকে পুনরায় জীবিত করেছিলেন। এরপর তিনি পাতালপুরিতে চলে যান শাসক হিসেবে এবং মৃতদের বিচার করতে!


 প্‌তাহ
প্‌তাহকে স্থাপত্যশিল্পের দেবতা হিসেবে কল্পনা করতো মিশরীয়রা। তারা ভাবতো যে, নিজের কল্পনা ও মুখ নিঃসৃত শব্দের সাহায্যেই বিশ্ব সৃষ্টি করেছেন প্‌তাহ! মমিবেশী এ দেবতার হাত দুটো বের হয়ে থাকতো ব্যান্ডেজের ভেতর থেকে। সেই হাত দিয়ে ধরা থাকতো একটি লাঠি।

রা
রারা,রে ইত্যাদি নানা নামে পরিচিত এ দেবতা ছিলেন মিশরীয় মিথলজির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এক দেবতা। মূলত সৌরদেবতা থাকলেও তার ক্ষমতা ছিলো অনেক। মানুষের মতো দেহ ও বাজপাখির মতো মাথাধারী রা’র মাথায় থাকতো সৌর চাকতি।
প্রতিদিন সকালে পূর্বদিকে তার জন্ম হতো ও রাতে পশ্চিমে ঘটতো মৃত্যু। দিনের বেলায় সৌর নৌকায় চড়ে তিনি ঘুরে বেড়াতেন পুরো আকাশ জুড়ে। আর রাতের বেলায় পাতালপুরিতে গিয়ে শায়েস্তা করে আসতেন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের। অন্যান্য দেবতাদের উপর তার ক্ষমতা এতটাই বিস্তৃত ছিলো যে,তিনি মাঝে মাঝেই তাদের ক্ষমতা আত্মীকরণ করতে পারতেন। এভাবেই আমুন-রা (আমুন ও রা), মন্টু-রা (মন্টু ও রা), রা-হোরাখ্‌তি (রা ও হোরাস) নামগুলো এসেছিলো রা’র জন্য।

সবেক
কুমিরের মতো মাথা ও বাকিটুকু মানবদেহের অধিকারী সবেককে কুমিরদের দেবতা মনে করা হতো এককালে।

 সেথ 
গেব ও ন্যুটের ছেলে সেথকে সেত, সেতেখ, সুতি ও সুতেখ নামেও ডাকতো প্রাচীন মিশরীয়রা। মরুভূমি, বজ্রপাত ও অকল্যাণের দেবতা হিসেবে ভাবা হতো সেথকে। তার মাথায় থাকা পশুটি আসলে কী সে সম্পর্কে জানা যায় নি। কখনো কখনো আবার জলহস্তী, শূকর কিংবা গাধার রুপেও দেখানো হয়েছে সেথকে।


টেফনাট
সিংহীর মাথা ও মানুষের শরীরধারী টেফনাট ছিলেন শু-এর স্ত্রী। তাকে পানি ও উর্বরতার দেবী হিসেবে ভাবা হতো।

 ঠথ
লেখালেখি কিংবা গণনায় ব্যস্ত হিসেবে চিত্রায়িত ঠথ ছিলেন জ্ঞানের দেবতা। মানবদেহ ও আইবিস পাখির মাথাবিশিষ্ট ঠথের হাতে লেখালেখির জন্য সবসময় কলম ও বোর্ড থাকতোই!
ওয়াজ-ওয়েরআংশিক পুরুষ ও আংশিক নারী হিসেবে চিত্রায়িত এ দেবতাকে উর্বরতার দেবতা বলে ভাবতো মিশরীয়রা। কখনো কখনো তাকে গর্ভবতী হিসেবেও দেখানো হয়েছে!

তাওয়ারেত
দেবী তাওয়ারেত ছিলেন জলহস্তীর মতো দেখতে। যেহেতু মা জলহস্তী তার বাচ্চাদের রক্ষা করতে আক্রমণাত্মক হয়ে উঠে (এটা তো দুনিয়ার যেকোনো মা-ই করবে!), তাই গর্ভবতী মায়েরা নিজেদের গর্ভের সন্তানকে রক্ষার জন্য তাওয়ারেতের মন্ত্রপূত কবচ পরতেন।
ওয়াজেতগোখরা সাপের মতো করে চিত্রায়িৎ এ দেবীকে মিশরের নিচু অঞ্চলের প্রতিরক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত বলে এককালে মনে করতো মিশরের অধিবাসীরা।

সপদু

তিনি ছিলেন একজন যুদ্ধের দেবতা।
সেশাতকখনো ঠথের কন্যা আবার কখনো ঠথের স্ত্রী হিসেবে দেখানো হতো দেবী সেশাতকে! তাকে লেখালেখি, গণিত, জ্যোতির্বিদ্যা ও স্থাপত্যবিদ্যার দেবী মনে করা হতো।
ক্বেতেশসিরিয়া থেকে মিশরীয় মিথলজিতে ঢুকে পড়া দেবী ক্বেতেশকে দেখা হতো উর্বরতার প্রতীক হিসেবে।

সার্কেত
সার্কেতকে এককালে মিশরের অধিবাসীরা ভাবতো বিচ্ছুদের দেবী হিসেবে। তিনি যেমন খারাপ লোকদের গায়ে বিচ্ছুর হুল ফুটিয়ে দিতেন, তেমনি ভালো লোকেরা বিচ্ছু বা সাপের বিষে আক্রান্ত হলে তাদের রক্ষার ব্যবস্থাও করতেন!
রায়েত-তাওয়িতাকে বলা যেতে পারে সৌরদেবতা রা-এর সঙ্গিনী।
সেকারসেকারকে বলা হতো বাজপাখিদের দেবতা।


ক্বেবুইউত্তর দিক থেকে প্রবাহিত বাতাস নিয়ন্ত্রণকারী দেবতা ছিলেন ক্বেবুই!

 সেখমেত

আগুন ও যুদ্ধের দেবী বলে পরিচিত সেখমেতের মাথাটি ছিলো সিংহীর এবং দেহটি ছিলো একজন নারীর। তার নিঃশ্বাসের ফলেই মরুভূমি সৃষ্টি হয়েছে বলে বিশ্বাস করতো মিশরের লোকজন!

 পাখেত

পাখেত নামে এ দেবীর মাঝে একই সাথে স্নেহ ও আক্রোশকে খুঁজে পেত মিশরের অধিবাসীরা। কারণ তিনি ছিলেন একইসাথে মায়ের মতো স্নেহময়ী ও যুদ্ধের মতো ধ্বংসাত্মক বিষয় দুটোর দেবী।
নেখবেতশকুনের মতো দেখতে এ দেবী ছিলেন মিশরের উঁচু এলাকা, শিশুর নিরাপদ জন্ম ও ফারাওদের রক্ষার কাজে নিয়োজিত।
মেন্‌হিতসিংহ ও যুদ্ধের দেবী ছিলেন মেন্‌হিত।
কুকনারী ও পুরুষ উভয়ের বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন কুককে দেখা হতো অন্ধকার জগতের সাথে সম্পৃক্ত এক সত্ত্বা হিসেবে। তাকে কেক, কেকু প্রভৃতি নামেও ডাকা হতো।
মাফদেতমিশরীয় উপকথার একেবারে শুরুর দিকে খোঁজ মিলে মাফদেতের। বিড়াল বা বেজির ন্যায় চিত্রায়িত এ দেবী সাপ ও বিচ্ছুদের হাত থেকে তাদের রক্ষা করবে বলে বিশ্বাস করতো মিশরীয়রা।
কেবেচেতদেবতা আনুবিসের কন্যা কেবেচেতকে প্রাচীন মিশরীয়রা ক্বেবেহেত, কেবহুত, কেবেহুত, ক্বেবেহুত ও কাবেচেত নামেও ডাকতো। তিনি ছিলেন সজীবতা ও বিশুদ্ধতার দেবী।
মাহেসসিংহের ন্যায় মস্তকধারী মাহেস ছিলেন প্‌তাহের ছেলে। তাকে যুদ্ধের দেবতা হিসেবে মান্য করতো লোকজন।
হেকেতব্যাঙের আকৃতিধারী দেবী হেকেত ছিলেন জীবন ও উর্বরতার প্রতীক।
গেঞ্জেন ওয়েররাজহাসের মতো দেখতে এ দেবতাকে আসলে কোন কাজ নিয়ন্ত্রণের ভার দিয়েছিলো তার অনুসারীরা তা জানা যায় নি! তবে প্রাচীন মিশরের বিভিন্ন চিত্রকর্মে প্রায়ই দেখা মেলে তার।


 বাবি
বাবি বাবিবাবা, বাবি প্রভৃতি নামে পরিচিত এই স্বত্ত্বা ছিলেন বেবুনদের দেবতা। বেবুনদের সাথে মানুষের চারিত্রিক কিছু বিষয়ের মিল দেখে তখন মানুষ ভাবতো যে, বেবুনেরা বুঝি তাদের মৃত পূর্বপুরুষ!
আপেপ সাপের মতো দেখতে এ দেবতা আপেপ, আপেপি, অ্যাপোফিস ইত্যাদি নামে পরিচিত। তাকে অন্ধকার জগত ও বিশৃঙ্খলার সাথে সম্পৃক্ত বলে মনে করতো মিশরীয়রা।
আমুনেত দেবতাদের রাজা হিসেবে খ্যাত আমুনের স্ত্রীর নাম ছিলো আমুনেত। অন্যান্য আরো দেবীর মতো তাকেও সৃষ্টির দেবী বলে বিশ্বাস করতো প্রাচীন মিশরীয়রা।
আন্‌হুর‘আন্‌হুর’ শব্দের অর্থ ‘আকাশ বহনকারী’। নাম শুনেই তার কাজের ধরণ সম্পর্কে অনুমান করা যায়। আন্‌হুর ছিলেন একইসাথে আকাশ ও যুদ্ধের দেবতা।

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস


গুগল থেকে কিছু তথ্য নেওয়া আর হায়ারোগ্লিফের দেশে বইটি থেকেও কিছু তথ্য পেয়েছি।




 

সোমবার, ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২২

ভাষা দিবস নিয়ে কিছু কথা

ভাষা দিবস নিয়ে কিছু কথা
✍️ ডা: অরুণিমা দাস


"ইংরেজীটা দাদা বড্ড কঠিন
 হিন্দী টাও ঠিকঠাক আসেনা,
 বাংলা ছাড়া এই মুখেতে,
 আর কিচ্ছু যে রটে না"।

 ভূমিকাঃ
বাঙালির ইতিহাস সরলরৈখিক না হলেও তাদের ইতিহাসে অসংখ্য উজ্জ্বল চিহ্ন আছে যা অর্জনের সমৃদ্ধতায় সমুজ্জ্বল। এমনই একটি চিহ্ন নিঃসন্দেহে ১৭ নভেম্বর, ১৯৯৯। ইউনেস্কোর সিদ্ধান্তে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে একুশে ফেব্রুয়ারিকে স্বীকৃতি বাঙালির জন্য এ উজ্জ্বল বাক্যের সূচক। বাঙালি জাতি হিসেবে আমাদের গর্ব অহংকার বাংলা ভাষা "মাদার ল্যাঙ্গুয়েজ অফ দি ওয়ার্ল্ড” আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পেল। বিশ্বের মানুষ এখন থেকে প্রতিবছর একুশে ফেব্রুয়ারীতে বাঙালি জাতির মাতৃভাষা ভালোবাসার গাঁথা শুনবে এবং নিজেরাও উদ্বুদ্ধ হবে এবং একই সঙ্গে ছোট-বড় সকল জাতিগোষ্ঠীর মাতৃভাষাই মর্যাদার সঙ্গে অবস্থান করবে।

 ভাষা আন্দোলনের আদি কথাঃ 
পাকিস্তান সৃষ্টির অব্যবহিত পূর্বে আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য ড. জিয়াউদ্দিন উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব উপস্থাপন করেন। পূর্ববঙ্গ থেকে ডঃ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ এ প্রস্তাবের ঘোর বিরোধিতা করেন এবং বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি উত্থাপন করেন। এভাবে পাকিস্তান জন্মের আগেই ভাষা আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে।

বিশ্বসভায় বাংলাদেশের ও বাঙালি জাতির মহা বিজয়ঃ
"আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস" ঘোষনা বিশ শতকের অন্যতম ঘটনা। যা ছিলো এদিন বাংলাদেশের জাতির ইতিহাসের অন্যতম মাইলফলক। আজ তা বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে স্মরণীয় একটি দিবস হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করাতে দলমত নির্বিশেষে সকল বাংলাদেশী নাগরিক গর্বিত ও আনন্দিত। দেশের মানুষ নানাভাবে নানা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে স্মরণ করবে আমাদের এই যুগান্তকারী অর্জনকে। বাঙালি জাতির রক্তস্নাত ভাষা আন্দোলন একুশে ফেব্রুয়ারি আজ ইতিহাসের গণ্ডি অতিক্রম করে সমগ্র বিশ্বে সম্পদে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের জন্য এটি একটি অনন্য অর্জন। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস সারা বিশ্বের মানুষের জন্য এক ধরনের প্রতীকী আত্মপ্রসাদের জন্ম দিয়েছে। বাঙালি আত্মপ্রসাদের মূর্ত রুপ বাংলা একাডেমি। কারণ অমর একুশের ভাষা শহীদদের রক্তের শব্দ ভিতের উপর দাঁড়িয়ে আছে এ প্রতিষ্ঠান। ইউনেস্কো একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নিয়ে শুধু মাতৃভাষার জন্য আমাদের সংগ্রাম এবং আত্মদানকেই স্বীকৃতি দেয়নি, অমর একুশের শহীদের আত্মদান থেকে উৎসারিত স্বাধীনতা আন্দোলন স্বাধীনতা অর্জন কেউ মর্যাদা দিয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রতিবছর বাংলাদেশের শহীদ দিবস একুশে ফেব্রুয়ারি যখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে মর্যাদা সঙ্গে পালিত হবে তখন আমাদের একবুক অনাবিল আনন্দ ও অতুলনীয় গর্ববোধে ভরে উঠবে। মহান মে দিবস এখন শুধু শিকাগো শহরে সীমাবদ্ধ থাকছে না পৃথিবীর সকল দেশে পালিত হচ্ছে, তেমনি একুশে ফেব্রুয়ারি ঢাকার শহীদ মিনারে নয়, বরং পৃথিবীজুড়ে মর্যাদার সঙ্গে পালিত হবে। সেসব দেশের জনগণ নতুন করে জানতে পারবে কিভাবে সালাম,বরকত,রফিক,জব্বার নিজেদের অমূল্য প্রাণের বিনিময়ে মাতৃভাষাকে রক্ষা করেছেন।
মাতৃভাষা হিসেবে বাংলার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র
ব্রিটিশ আমল থেকে পাকিস্তানি আমল পর্যন্ত মাতৃভাষা হিসেবে বাংলার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র অব্যাহত ছিল। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পূর্ব থেকেই বাংলাভাষাকে লড়াইয়ে নামতে হয় উর্দুর প্রতিপক্ষ হিসেবে।পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পূর্বে রাষ্ট্রভাষা বিতর্কে উর্দুর দাবিদারদের যারা বাংলা ভাষার স্বপক্ষে কলম যুদ্ধের সূচনা করেন,তাদের মধ্যে ডঃ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর পরেই উল্লেখ করতে হয় কবি ফখরুল আহমদ ও প্রাবন্ধিক আব্দুল হকের নাম। ডঃ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ দৈনিক আজাদে এক প্রবন্ধে বলেন,"অধিকাংশ জনসংখ্যার ভাষা হিসেবে বাংলায় পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হওয়া উচিত, যদি দ্বিতীয় রাষ্ট্রভাষা করার প্রয়োজন হয় তখন উর্দুর কথা বিবেচনা করা যেতে পারে"।
কিন্তু পাকিস্তানের তৎকালীন উচ্চমহল,শাসক এবং প্রশাসক যারা মোহাজের হয়ে ভারত থেকে পাকিস্তান এসেছিলেন তারাই উর্দুকে অন্যান্য মাতৃভাষার উপর চাপিয়ে দিতে চেষ্টা করতে থাকলেন। পাকিস্তানের অন্যান্য অঞ্চলে তা মেনে নিলেও বাংলা ভাষা তাঁর সেই প্রাচীন সংগ্রামী ঐতিহ্যের কারণে মেনে নিলোনা। পৃথিবীর মাতৃভাষা গুলোর মধ্য বাংলা ভাষার সম্ভবত একমাত্র ব্যতিক্রম যে, এ ভাষাটিকে তার প্রাচীন রূপ থেকেই মর্যাদা ও অধিকারের প্রশ্নে লড়াই করে আসতে হয়েছে। বাংলার প্রাচীন কালে সেন শাসন আমলে বাংলা ভাষার চর্চার বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞা জারি করে বলা হয়েছিল,বাংলা ভাষার চর্চা করলে রৌরব নামক নরকে যাবে।

 জাতিসংঘ থেকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষার মর্যাদা ও স্বীকৃতিঃ
মাতৃভাষার জন্য বাঙালি জাতির আত্মদান বৃথা যায়নি,ইউনেস্কো কর্তৃক আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতির মধ্য দিয়ে আবারও সরব হয়ে উঠেছে।ইউনেস্কো কর্তৃক এ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বিশ্বের আড়াই হাজারের উপর ভাষাকে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে।এসেছে শুধু ভাষার স্বীকৃতিই নয় বরং আরো ব্যাপক স্বীকৃতির দ্যোতক। একুশের মধ্য বাঙালির ভাষাভিত্তিক ভবিষ্যতের বীজ। অমর একুশকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার মধ্য দিয়ে বাঙালি প্রতীকি বিজয় নির্দেশিত হয়েছে। ভাষা শহীদের আত্মদানের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি মিলেছে। একুশে ফেব্রুয়ারি চেতনা এখন শুধু মাতৃভাষার পরিধি অতিক্রম করে সকল পর্যায়ে মানবাধিকার বাস্তবায়ন করার একটি শক্তিশালী মাধ্যমে পরিণত হয়েছে।

 উপসংহারঃ
বিদায়ী সহস্রাব্দ শেষ হবার আগেই আমাদের মাতৃভাষার দাবিতে আত্মহুতি দানকারী শহীদদের মিলেছে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। অবশ্য এর আগে এমন অনেক আত্মত্যাগের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি মিলেছে। কারণ সেগুলো ছিল উন্নত দেশগুলোর ঘটনা। আর মাতৃভাষার জন্য আমাদের সংগ্রাম ত্যাগ এসবের স্বীকৃতি মিলতে মিলতে পার হয়ে গেল ৪৮ বছরেরও বেশি সময়। হোক তবুও আমরা তা পেয়েছি। সর্বোচ্চ অঙ্গীকার ও নিরলস সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আমরা আমাদের মাতৃভাষাকে রক্ষা করেছি। স্বাধীনতা অর্জন করেছি এবং সর্বশেষ আমরা আমাদের মাতৃভাষা ও তার জন্য যে আত্মোৎসর্গ তার স্বীকৃতি পেয়েছি।

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

রবিবার, ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০২২

অমর একুশ(সুদেষ্ণা দত্ত)



অমর একুশ

সুদেষ্ণা দত্ত

 

পাহাড়ের ভাষা মৌনমুখরতা,

তিতলির ভাষা ডানার চপলতা,

আকাশের বুকে ভাষা রচে মেঘ উড়ে উড়ে--

নদীর জলের ভাষা নেয় না তো কেউ কেড়ে!

তবে কেন এত সংগ্রাম আমার মায়ের ভাষার জন্য!

বাংলা ভাষায় ‘মা’ বলে হয়েছি মোরা ধন্য।

গঙ্গা--পদ্মার শোনিত ধারা আমাদের বুকেও বয়,

কত মায়ের খোকা শহীদ মিনারে আজও শুয়ে রয়-

ভাষার অধিকার ছিনিয়ে আনতে শহীদ জব্বার-বরকত,রফিক-

মায়ের ভাষা থাকবে মুখে পুলিশ যতই প্রাণ নিক।

আপন থাক আপন ভাষা,রাজনীতি থাক দূরে--

সেই ভাষাতেই একতা আসবে সুরে সুরে।

একুশ তারিখ আর চাই না,একুশ থাকুক অমর,

চাই না আর হিংসা,দ্বেষ,রক্ত ঝরা সমর।

 

©কপিরাইট রিজার্ভড ফর সুদেষ্ণা দত্ত।

 ছবি সৌজন্য:গুগুল।

 

 

Acharya Jagadish Chandra Bose - Some known and unknown facts

Acharya Jagadish Chandra Bose - Some known and unknown facts
✍️ ডা: অরুণিমা দাস

আজ সারা বিশ্ব বেতার টেলিগ্রাফের আবিষ্কারক হিসেবে গুলিয়েলমো মার্কোনিকে স্মরণ করে। কিন্তু এক বাঙালী বিজ্ঞানীও যে সেই সময় অনুরূপ গবেষণার জন্য বেতারের আবিষ্কারক হতে পারতেন। বাঙালী বিজ্ঞানী আচার্য জগদীশ চন্দ্র বসুর কথা বলছি যিনি গোটাকয়েক যন্ত্রের আবিষ্কার করেন,এমনকি রেডিও সিগনাল শনাক্তকরণে সেমিকন্ডাক্টরের ব্যবহার বিষয়ে তাঁর করা গবেষণাপত্র তিনি উন্মুক্ত করে দেন যেন অন্যান্য বিজ্ঞানীগণ এটি নিয়ে গবেষণা করতে পারেন। না হলে আজ গোটাকয়েক পেটেন্টের অধিকারী হতে পারতেন এই মহাত্মা। সহকর্মীদের অনেক অনুরোধের পর মাত্র একটি পেটেন্ট সই করেন তিনি। তাঁর সম্পর্কে খুঁজতে গিয়ে বহু তথ্য পেলাম, যা অনেক বাঙালীর কাছেই অজানা।
ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে যে কয়েকজন বৈজ্ঞানিকের কথা জানা যায়, আচার্য জগদীশ চন্দ্র বসু ছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম (যিনি ব্রিটিশ বিজ্ঞানীদের কাছে এ.জে. সি. বোস নামে পরিচিত)। তিনি তাঁর সময়ে বাঙালী বিজ্ঞানীদের মধ্যে পরীক্ষাভিত্তিক বিজ্ঞান চর্চায় ছিলেন অগ্রগণ্য। তিনিই প্রথম প্রমাণ করেন যে প্রাণী ও উদ্ভিদের মধ্যে অনেক সাদৃশ্য রয়েছে। চলুন এই বাঙালী বিজ্ঞানী, তাঁর জীবন ও আবিষ্কার নিয়ে জানা যাক।

জন্ম ও শিক্ষাজীবন

তৎকালীন ব্রিটিশ শাসন আমলে বাংলা প্রেসিডেন্সির (বর্তমানে বাংলাদেশ) মুন্সীগঞ্জে ১৮৫৮ সালের ৩০ নভেম্বর জগদীশ চন্দ্র বসুর জন্ম। পিতা ভগবান চন্দ্র বসু ছিলেন ব্রাহ্ম সমাজের একজন বিশিষ্ট সদস্য। চাকরি করতেন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটের এবং একই সাথে ছিলেন ফরিদপুর, বর্ধমানসহ কয়েকটি এলাকার সহকারী কমিশনার হিসেবে।
ব্রিটিশ আমলে জন্ম নিয়েও জগদীশ চন্দ্রের শিক্ষা জীবন শুরু হয় স্বদেশী ভাষায় অর্থাৎ বাংলা ভাষায়। সেই সময়ে অভিভাবকেরা নিজের সন্তানকে ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত করতে ছিলেন সবসময় তৎপর। জগদীশ চন্দ্রের এই পারিপার্শ্বের থেকে উল্টো স্রোতে গা ভাসানোতে এবং বাংলা ভাষায় শিক্ষাজীবন শুরু করতে তাঁর পিতার ভূমিকাই ছিলো বেশি। পিতা ভগবান চন্দ্র বসু বিশ্বাস করতেন যে, শিক্ষাগ্রহণের জন্য সর্বপ্রথম চাই নিজের মাতৃভাষাকে ভালোভাবে রপ্ত করা এবং দেশপ্রেমকে অন্তরে ধারণ করা। তারপর না হয় বিদেশী ভাষা শেখা যাবে। সেই যুগে এমন চিন্তা-ভাবনার কথা কেবল কোনো স্বদেশপ্রেমিকের মুখেই মানাতো।
১৯১৫ সালে বিক্রমপুরে কনফারেন্সে বসু তাঁর বক্তৃতায় বলেছিলেন,
“আমাদের সময়ে সন্তানদের ইংরেজী স্কুলে ভর্তি করানো ছিলো আভিজাত্যের প্রতীক। যে স্বদেশী স্কুলে আমাকে ভর্তি করে দেয়া হয়েছিলো, সেই স্কুলে আমার ডানপাশে বসতো আমার পিতার মুসলিম পরিচারকের ছেলে এবং আমার বামপাশে বসতো একজন জেলের ছেলে। তারাই ছিলো আমার খেলার সাথী। আমি সম্মোহিতের মতো শুনতাম তাদের বলে যাওয়া পশুপাখির গল্প, জলজ প্রাণীদের গল্প। হয়তো এই গল্পগুলোই আমাকে প্রকৃতির কর্মকাণ্ড নিয়ে গবেষণা করতে উদ্বুদ্ধ করেছিলো। যখন আমরা ক্লাস শেষে বাড়ি ফিরে আসতাম, আমার মা আমাদের একসাথেই খাবার খেতে দিতেন। আমার মা স্বধর্মপরায়ণ এবং প্রথাসম্মত গৃহিণী ছিলেন। কিন্তু ধর্ম নিয়ে গোঁড়ামি করা তার স্বভাব ছিলো না। তাই তিনি তাঁর ছেলের সঙ্গী অস্পৃশ্য বালকদের প্রতি ছিলেন যথেষ্ট মমতাশীল।”
পরবর্তী কালে ১৮৬৯ সালে জগদীশ চন্দ্র কলকাতা হেয়ার স্কুলে ভর্তি হন এবং এরপর ভর্তি হন সেইন্ট জেভিয়ার্স স্কুলে। পরবর্তীতে ১৮৭৫ সালে তৎকালীন প্রবেশিকা (বর্তমানে মাধ্যমিক পরীক্ষা) পাশ করে ভর্তি হলেন সেইন্ট জেভিয়ার্স কলেজে এবং এরপর সুযোগ পেলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার। সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজের খ্রিষ্টান যাজক বা ফাদার ইউজিন ল্যাফোন্টের নিবিড় সান্নিধ্য লাভ করেন তিনি এবং তাঁর প্রকৃতির প্রতি অনুসন্ধান করার মানসিকতা তৈরী হয় এই ফাদারের প্রভাবেই।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে বেরিয়ে বোস চেয়েছিলেন ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসে যোগ দিতে। কিন্তু বাঁধ সাধলেন তার বাবা। যদিও তার বাবা নিজেই ছিলেন একজন সরকারি কর্মচারী। কিন্তু তিনি (জগদীশ চন্দ্রের বাবা) চেয়েছিলেন তাঁর ছেলে এমন কিছু করুক যেন কারো অধীনে না থেকে স্বাধীনভাবে নিজের কাজ করতে পারে। সেই সুবাদে বোস চলে গেলেন ইংল্যান্ডে এবং লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে মেডিসিন বিভাগে ভর্তি হলেন। কিন্তু বেশিদিন পড়তে পারলেন না। মেডিসিন পড়াকালীন অবস্থায় প্রায়ই অসুস্থ হয়ে পড়তেন তিনি। লাশঘরের লাশ ও ওষুধের তীব্র দুর্গন্ধ তাঁর এই অসুখকে আরো বৃদ্ধি করেছিলো। ফলে শেষটায় ছেড়েই দিলেন।
পরবর্তীতে তৎকালীন ভারতের বিশিষ্ট বিতার্কিক ও জগদীশ চন্দ্রের বোনের স্বামী আনন্দমোহন বসুর সুপারিশক্রমে কেমব্রিজের ক্রাইস্টস কলেজে ভর্তি হলেন। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ন্যাচারাল সায়েন্সে লাভ করলেন বিএসসি ডিগ্রী, ১৮৮৪ সালে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএসসি ডিগ্রী এবং তারপর ১৮৯৬ সালে ডিএসসি ডিগ্রী (উল্লেখ্য ন্যাচারাল সায়েন্স বলতে বিজ্ঞানের সেই শাখাকে বোঝায় যা পৃথিবীর বাহ্যিক প্রকৃতি নিয়ে জ্ঞান দান করে। মূলত পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, ভূতত্ত্ব ও জীববিজ্ঞানের সমন্বিতরূপেই ন্যাচারাল সায়েন্সের পরিধি)।
কেমব্রিজের ছাত্রাবস্থায় বোস শিক্ষক হিসেবে পেয়েছিলেন নোবেল বিজয়ী লর্ড র‍্যালে, মাইকেল ফস্টার, জেমস ডিউয়ার, ফ্রান্সিস ডারঊইন, ফ্রান্সিস ব্যালফার এবং সিডনি ভাইন্সসহ প্রমুখ উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিবর্গকে। যখন বোস কেমব্রিজের ছাত্র ছিলেন, ঠিক সেই সময়ে বাংলার আরেক কিংবদন্তি, রসায়নবিদ আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় এডিনবার্গের ছাত্র ছিলেন। লন্ডনে থাকাকালীন তাদের দুই জনের পরিচয় ও ঘনিষ্টতার সূত্রপাত। বোস পরবর্তীতে বিশিষ্ট নারী আন্দোলনের প্রবক্তা ও সমাজকর্মী অবলা বোসের সাথে পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হন।
কর্মজীবন১৮৮৫ সালে তিনি লেখাপড়া শেষে ভারতে ফিরে আসেন। সেই সময়ে লর্ড রিপনের অনুরোধে তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজে পদার্থবিজ্ঞানের ভারপ্রাপ্ত অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। চাকরিতে ঢুকেই তিনি কলেজের অন্যান্য শিক্ষকদের মধ্যে তীব্র সাম্প্রদায়িকতা অনুভব করেন। কারণ ব্রিটিশ অধ্যাপকেরা যে বেতন পেত সেই তুলনায় তাঁর বেতন ছিলো বেশ নগণ্য। এই ব্যবস্থা তিনি মেনে নিতে পারেন নি। তাই প্রতিবাদ স্বরূপ তিনি প্রায় তিন বছর কোনো বেতন গ্রহণ করেননি, কিন্তু অধ্যাপকের কাজ থেকেও বিচ্যুত হননি। এই তিন বছর তিনি শিক্ষার্থীদের পড়িয়ে গিয়েছেন বেতন ছাড়াই। পরে পাব্লিক ইন্সট্রাকশন ও প্রেসিডেন্সি কলেজের অধ্যক্ষের চেষ্টায় তাঁকে স্থায়ীভাবে অধ্যাপক হিসেবে নিয়ে নেয়া হয় এবং তাঁর তিন বছরের পুরো বেতন দিয়ে দেয়া হয়। এমনই ছিলেন আমাদের জগদীশ চন্দ্র বোস।
সেই সময়ে প্রেসিডেন্সি কলেজের আরো কিছু স্বল্পতা ছিলো। সেখানে ছিলো না কোনো ভালো মানের ল্যাবরেটরি, না ছিলো মৌলিক গবেষণা করার সুযোগ। কিন্তু বোস কলেজের সহায়তার আশায় বসে থাকেন নি। তিনি নিজেই গবেষণার জন্য নিজের টাকায় ফান্ড তৈরী করে নেন। ১৯৯৪ সালে তিনি হার্জিয়ান তরঙ্গ নিয়ে গবেষণা করে আবিষ্কার করেন মিলিমিটার তরঙ্গের।
প্রফেসর হিসেবেও তাঁর কীর্তি কম নয়। তাঁর স্নেহধন্য ছাত্রদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন সত্যেন্দ্র নাথ বসু, মেঘনাদ সাহা, জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ, প্রশান্ত চন্দ্র মহলানবিশ সহ আরো অনেক। পরবর্তীতে এঁরা সবাই বিজ্ঞানের বিভিন্ন ক্ষেত্রে কম বেশী অবদান রেখেছেন।

বিজ্ঞানে অবদানঃ 
রেডিও গবেষণায় স্কটিশ তাত্ত্বিক পদার্থবিদ ম্যাক্সওয়েল বিভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্যের তাড়িৎচৌম্বক বিকিরণ তরঙ্গের অস্তিত্ব গাণিতিকভাবে প্রমাণ করতে পেরেছিলেন। কিন্তু সেই তত্ত্ব পরীক্ষামূলকভাবে প্রমাণ হওয়ার আগেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন। পরবর্তীতে ১৮৮৬ থেকে ১৮৮৮ সালের মধ্যে জার্মান পদার্থবিদ হেনরিক হার্জ তড়িৎচৌম্বক তরঙ্গের উপর করা তাঁর পরীক্ষার গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন এবং শূন্য স্থানে তাড়িতচৌম্বক তরঙ্গের অস্ত্বিত্ব প্রমাণ করেন। হার্জের মৃত্যুর পরে ব্রিটিশ পদার্থবিদ অলিভার লজ তাড়িতচৌম্বক নিয়ে আরো গবেষণা করেন এবং হার্জিয়ান তরঙ্গের আপাত-আলোক প্রকৃতির (Quasi-optical nature) কথা তুলে ধরেন। তিনি আরো বলেন এই তরঙ্গ দৃশ্যমান আলোর মতোই প্রতিফলন, প্রতিসরণের মতো বৈশিষ্ট্য সমন্বিত। সেই সময়ে তাঁর এই গবেষণা বোস সহ আরো অনেক বিজ্ঞানীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলো।
জগদীশ চন্দ্র লজের এই গবেষণাকে আরো উন্নত করলেন। তিনি দেখলেন তরঙ্গের আলোক প্রকৃতি ব্যাখ্যায় বৃহৎ দৈর্ঘ্যের তরঙ্গ খুবই অনগ্রসর। তাই তিনি তরঙ্গকে মিলিমিটার পর্যন্ত হ্রাস করলেন (প্রায় ৫ মি.মি.)। ১৮৯৪ এর কোনো এক নভেম্বরে বোস তার মিলিমিটার তরঙ্গদৈর্ঘ্যের তরঙ্গ দিয়ে কলকাতা টাউন হলে গানপাউডার প্রজ্জ্বলিত করেন এবং টাউন হল থেকে ৭৫ ফুট দূরে অবস্থিত একটি ঘন্টা বাঁজাতে সক্ষম হন। বলা বাহুল্য যে ঘন্টা বাজানোর জন্য এই তরঙ্গকে একটি দেয়াল টপকাতে হয়েছিলো। এই ক্ষুদ্রতরঙ্গের উপরে লেখা তাঁর ‘অদৃশ্য আলোক’ (Invisible Light) বইটিতে তিনি লিখেছেন যে অদৃশ্য আলো (অর্থাৎ ক্ষুদ্রতরঙ্গ) সহজেই ইটের দেয়াল এমনকি দালান ভেদ করে বেরিয়ে যেতে পারে। ফলে এর সাহায্যে সহজেই তার ছাড়াই যেকোনো বার্তা একস্থান থেকে অন্যস্থানে প্রেরণ করা যেতে পারে।


রেডিও তরঙ্গ ও স্পন্দন তত্ত্ব সম্পর্কে বোসের সিদ্ধান্ত:
লজের গবেষণাপত্র প্রকাশের প্রায় একবছরের মধ্যেই ১৮৯৫ সালের মে মাসে বোস তাঁর প্রথম গবেষণা পত্র “On polarization of electric rays by double-refracting crystals” প্রকাশ করেন। একই বছর অক্টোবর মাসে তাঁর দ্বিতীয় গবেষণাপত্রটি লর্ড র‍্যালের হাত দিয়ে পৌছায় লন্ডনের রয়্যাল সোসাইটিতে। ১৮৯৫ সালে ডিসেম্বরে লন্ডনের ‘Electrician’ নামক জার্নালে তার রচিত ‘On a new electro-polariscope’ প্রকাশ হওয়ার পর ‘Electrician’ মন্তব্য করেছিলোঃ
“Should Professor Bose succeed on perfecting and patenting his 'Coherer', we may in time see the whole system of coast lighting throughout the navigable world revolutionized by a Bengali Scientist working single handed in our Presidency College Laboratory.”
হ্যাঁ, জগদীশ চন্দ্র বসু তাঁর গবেষণাটি যথাযথ করতে পেরেছিলেন। কিন্তু পেটেন্ট করতে পারেন নি। খুব ভালোভাবে বলতে গেলে পেটেন্ট করতে চান নি।
এরপর লন্ডনে গিয়ে তাঁর পরিচয় হয় বিজ্ঞানী মার্কোনির সাথে। মার্কোনি অনেকদিন থেকেই বেতার টেলিগ্রাফি নিয়ে কাজ করছিলেন। এই টেলিগ্রাফ তিনি ব্রিটিশ পোস্ট সার্ভিসের জন্য উন্নত করতে চেয়েছিলেন অনেকটা ব্যবসায়িকভাবে। সেখানে বোস বাণিজ্যিক টেলিগ্রাফির প্রতি তাঁর অনীহা প্রকাশ করেন। তাঁর মতে বিজ্ঞান শিক্ষা বা গবেষণাকে ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করা উচিৎ নয়। তিনি অন্যদের তারঁ গবেষণাপত্র নিয়ে কাজ করতেও পরামর্শ দেন। অথচ একবারও নিজের গবেষণার স্বত্বাধিকার নিয়ে ভাবেন নি। পরে ১৮৯৯ সালে রয়্যাল সোসাইটির একটি পেপারে তিনি তাঁর ‘Iron-Mercury-Iron Coherer with Telephone Detector’ নামক গবেষণাপত্রটি প্রকাশ করেন।
রেডিও উন্নয়নে তাঁর অবদানবোসের কাজ ছিলো মূলত রেডিও মাইক্রোওয়েব অপটিক্স এর তাত্ত্বিক দিক নিয়ে। অর্থাৎ তিনি তাঁর গবেষণায় এই তরঙ্গের প্রকৃতি ও প্রণালী ব্যাখ্যা করতে সক্ষম হয়েছিলেন। কিন্তু তিনি তাঁর গবেষণার দ্বারা যোগাযোগের উদ্দেশ্যে বেতার যন্ত্রের উন্নয়নের দিকে কোনো ইচ্ছা বা পদক্ষেপ গ্রহণ করেননি। মজার ব্যাপার হচ্ছে তিনি যখন একদিকে বেতার তরঙ্গ নিয়ে গবেষণা করে যাচ্ছেন,অন্যদিকে তখন মার্কোনিও গবেষণা করে যাচ্ছেন একই বিষয়ে। শুধু পার্থক্য হচ্ছে বোস করছেন তাত্ত্বিক গবেষণা, তিনি যন্ত্রের উন্নয়ন নিয়ে চিন্তিত না। কিন্তু মার্কোনি বেতার যন্ত্র উন্নত করে রীতিমত হুলস্থূল করে ফেলছেন এবং বেতার টেলিগ্রাফের উন্নয়নে অনেক দূর অগ্রসরও হয়েছেন।
সমসাময়িক সময়ে অন্যান্য বিজ্ঞানীরাও রেডিও তরঙ্গের ব্যবহার নিয়ে কাজ শুরু করেছিলেন। যেমন রাশিয়ান বিজ্ঞানী আলেক্সান্ডার স্টেপানোভিচ পপোভ রেডিও তরঙ্গ ব্যবহার করে বজ্রপাত ডিটেক্টর (lightning detector) তৈরীর চেষ্টা করছিলেন। বোসের রেডিও যন্ত্র উন্নয়নের প্রতি কোনো আকর্ষণ ছিলো না। এমনকি তিনি নিজের গবেষণাপত্র অন্যান্য বিজ্ঞানীদের সুবিধার্থে উন্মুক্ত করে দিতেন। পেটেন্ট এর প্রতি ছিলো তাঁর তীব্র অনুরাগ। এরই ধারাবাহিকতায় তিনি তাঁর আবিষ্কৃত গ্যালেনা ক্রিস্টাল ডিটেক্টরের কার্যপ্রণালী নিজের লেকচারেই বিবৃত করেন। তাঁর একজন আমেরিকান বন্ধু এই যন্ত্রটির জন্য তাকে পেটেন্ট নিতে বলেছিলেন কিন্তু তিনি সেটা করেন নি।
রেডিও গবেষণায় তাঁর উল্লেখযোগ্য অবদান হচ্ছে তিনিই সর্বপ্রথম রেডিও তরঙ্গ শনাক্ত করতে সেমিকন্ডাক্টর জাংশন ব্যবহার করেন। এখনকার সময়ে ব্যবহৃত অনেক মাইক্রোওয়েভ যন্ত্রাংশের আবিষ্কর্তাও তিনি। তাঁর গবেষণা থেকেই ১৯৫৪ সালে পিয়ার্সন ও ব্রাটেইন রেডিও তরঙ্গ শনাক্তকরণের জন্য সেমিকন্ডাক্টর ক্রিস্টাল ব্যবহার করেন।
 জগদীশ চন্দ্র একবার কলকাতায় মিলিমিটার তরঙ্গ ব্যবহার করে দূরে একটি ঘণ্টা বাজিয়েছিলেন। ১৮৯৭ সালে লন্ডনের রয়্যাল ইনস্টিটিউটিশনে তিনি তাঁর এই কাজের ব্যখ্যা করেন। সে সময় তিনি ওয়েভ গাইড (Wave guide), হর্ণ এন্টেনা, ডাই-ইলেক্ট্রিক লেন্স, পোলারাইজার এবং সেমিকন্ডাক্টর ব্যবহার করেছিলেন যাদের দ্বারা তৈরী তরঙ্গের কম্পাংক ছিলো প্রায় ৬০ গিগাহার্জের মতো। তাঁর তখনকার আবিষ্কৃত বেশ কয়েকটি যন্ত্র এখনো বোস ইনস্টিটিউটে সংরক্ষিত আছে। জেনে অবাক হতে হয় যে তাঁর সেই গবেষণা থেকেই তৈরী করা ১.৩ মিলিমিটার মাল্টি বিম রিসিভার যা এখন আমেরিকার এরিজোনায় অবস্থিত NRAO 12 Meter Telescope-এ ব্যবহৃত হচ্ছে।
NRAO 12 Meter Telescope
বোসের সম্পর্কে বলতে গিয়ে নোবেল বিজয়ী স্যার নেভিল মট বলেন, “জে. সি. বোস তাঁর নিজের সময় থেকেও আরো ৬০ বছর পরের চিন্তাভাবনা করেছিলেন। প্রকৃতপক্ষে তিনি আজকের P-Type ও N-type সেমিকন্ডাক্টরের দূরদর্শন করতে পেরেছিলেন সেই সময়ে।” স্যার নেভিল মট ১৯৭৭ সালে সলিড-স্টেট ইলেক্ট্রোনিক্স-এ অবদানের জন্য নোবেল পুরস্কার লাভ করেছিলেন। তাঁর এই গবেষণার পেছনে বোসের গবেষণার বেশ প্রভাব ছিলো।
উদ্ভিদ শারীরতত্ত্বঃ স্পন্দন তত্ত্বের প্রবর্তনবিজ্ঞানে বোসের অবদানের মধ্যে এক বিরাট অংশ জুড়ে আছে জৈবপদার্থবিদ্যা বা বায়োফিজিক্স। তিনি গবেষণা করে দেখিয়েছিলেন যে উদ্ভিদের উপর বিভিন্ন প্রকার বাহ্যিক প্রভাবকের প্রভাবে ইলেক্ট্রন প্রবাহের ঘটনা ঘটতে পারে। একে এক সময় রাসায়নিক ক্রিয়া হিসেবে বর্ণনা করা হত। বোস এই ধারণাকে পরবর্তীতে পরীক্ষা দ্বারা প্রমাণ করে দেখিয়েছিলেন। এছাড়াও তিনিই ছিলেন প্রথম ব্যক্তি যিনি উদ্ভিদের টিস্যুর উপর মাইক্রোওয়েভের প্রভাব এবং এর ফলে কোষ মেমব্রেনের বিভব (cell membrane potential) পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করেন। কোষ মেমব্রেনের বিভব বলতে বোঝায় কোষের অন্তঃত্বক ও বহিঃত্বকের ভেতর ঘটিত তড়িৎ বিভবের পার্থক্য (সাধারণত -৪০ মিলিভোল্ট থেকে -৮০ মিলিভোল্ট পর্যন্ত)।
১৯০১ সালে বোস বিভিন্নভাবে, বিভিন্ন অবস্থায় এবং বিভিন্ন সময়ে কোষ মেমব্রেন বিভবের পর্যবেক্ষণ করে অনুমিত করেন যে উদ্ভিদও প্রাণীর মতো বাহ্যিক প্রভাবকের প্রভাবে সাড়া দিতে সক্ষম, অর্থাৎ তাদের ভেতর কিছু সাদৃশ্যপূর্ণ বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। তারা ব্যথা অনুভব করতে সক্ষম, আনন্দ অনুভব করতে সক্ষম, এমনকি স্নেহ অনুভব করতেও সক্ষম। তিনি আরো প্রমাণ করেন যে উদ্ভিদের একটি সঠিক জীবন চক্র এবং প্রজনন তন্ত্র রয়েছে যা প্রাণীর অনুরূপ। তাঁর এই গবেষণাপত্র তখন লন্ডনের রয়্যাল সোসাইটিতে স্থান করে নিয়েছিলো।
উদ্ভিদও যে তাপ, শীত, আলো, শব্দ ও অন্যান্য অনেক বাহ্যিক উদ্দীপনায় সাড়া প্রদান করতে পারে সেই কথা বোস প্রমাণ করে দেখিয়েছেন। আর এই প্রমাণের জন্য নিজেই তৈরী করেছিলেন ক্রিস্কোগ্রাফ (Crescograph) নামক বিশেষ যন্ত্রের। এই যন্ত্রের বিশেষত্ব হলো বাহ্যিক প্রভাবকের প্রভাবে উদ্ভিদে উৎপন্ন উদ্দীপনাকে এটি রেকর্ড করতে সক্ষম। এটি উদ্ভিদ কোষকে এদের সাধারণ আকার থেকে প্রায় ১০,০০০ গুণ বিবর্ধিত করে দেখাতে সক্ষম ছিলো যার দ্বারা সহজেই উদ্ভিদ কোষের উপর বাহ্যিক প্রভাবকের প্রভাবে সৃষ্ট স্পন্দন বা গতিকে প্রত্যক্ষ করা যেত। এর দ্বারাই তিনি দেখেন যে উদ্ভিদ কোষ ও প্রাণী কোষের মধ্যে বেশ কয়েকটি সাদৃশ্য আছে।
ক্রিস্কোগ্রাফ যন্ত্রটি মূলত কয়েক সিরিজ গিয়ার এবং ঘষা কাচের প্লেট দিয়ে তৈরী। এই কাচের প্লেটটি উদ্ভিদের গতিবিধি বা নাড়াচাড়াকে রেকর্ড করতে সক্ষম। আগেই বলা হয়েছে এর বিবর্ধন ক্ষমতা প্রায় ১০,০০০ গুণ। ফলে উদ্ভিদ হতে প্রতিফলিত আলো যখন এই কাচ প্লেটের উপর আপতিত হয়, তখন প্লেটে সেই অনুযায়ী দৃশ্য ফুটে ওঠে। প্লেটটি উদ্ভিদ কোষের গতিবিধি ও উত্তেজনার প্রতিফলন ধারণ করে এবং তদানুরূপ পরিবর্তিত হয়। বাহ্যিক উত্তেজকের প্রভাবে উদ্ভিদের এই স্পন্দন আলোক-বিন্দু আকারে প্লেটে প্রতিভাত হয় এবং নড়াচাড়া করে। উদ্ভিদের এই স্পদন তত্ত্ব বোসই প্রথম দেন।
লন্ডনের রয়েল সোসাইটির সেন্ট্রাল হলে অন্যান্য বিশিষ্ট বিজ্ঞানীগণের উপস্থিতিতে তিনি এই পরীক্ষা করে দেখিয়েছিলেন। অন্যান্য বিজ্ঞানীগণ অত্যন্ত আগ্রহের সাথে তাঁর এই কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করেন। বোস প্রথমে উদ্ভিদের একটি শাখা বা ডাটা নিয়ে সেটাকে ব্রোমাইড দ্রবণে ডুবিয়ে নেন। উল্লেখ্য হাইড্রোব্রোমিক এসিডের লবণ সাধারণত বিষাক্ত হয়। এরপর তিনি ক্রিস্কোগ্রাফ যন্ত্রটিকে চালু করলেন এবং পর্যবেক্ষণ করতে লাগলেন। বিষের প্রভাবে উদ্ভিদকোষের স্পন্দনের কারণে প্রতিফলিত আলোক-বিন্দুটি প্লেটের উপর ইতস্তত নাড়াচাড়া করতে লাগলো,অনেকটা পেন্ডুলামের মতো। সময়ের সাথে সাথে এই স্পন্দন আরো বাড়তে লাগলো,প্রচন্ড হতে লাগলো এবং একসময় আকস্মিকভাবে এই স্পন্দন বন্ধ হয়ে গেলো। ঠিক যেমন বিষ প্রয়োগকৃত ইঁদুর বিষের প্রভাবে উত্তেজিত হয়ে একসময় নিস্তেজ হয়ে যায়, উদ্ভিদও তেমন নিস্তেজ হয়ে গেলো। ব্রোমাইডের প্রভাবে উদ্ভিদের মৃত্যু হলো।
এই পরীক্ষা সবার কাছে প্রশংসার সাথে গৃহীত হলো। যদিও কিছু উদ্ভিদ শারীরতাত্ত্বিক এতে সন্তুষ্ট হলেন না এবং তাঁকে উদ্ভিদবিজ্ঞানে অনধিকার প্রবেশকারী হিসেবে মন্তব্য করলেন। তথাপি জগদীশ চন্দ্র হাল ছাড়লেন না। ক্রিস্কোগ্রাফের সাহায্যে তিনি এরপর আরো পরীক্ষা চালালেন। পর্যবেক্ষণ করলেন অন্যান্য বাহ্যিক উদ্দীপক যেমন সার, আলোকরশ্মি, বেতারতরঙ্গ, তড়িৎ, রাসায়নিক দ্রব্য ইত্যাদির প্রতি উদ্ভিদের প্রতিক্রিয়া কিরূপ হতে পারে। আধুনিক যন্ত্র দ্বারা পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর অনেক শারীরতাত্ত্বিক তার এই তত্ত্ব সমর্থন করেছিলেন। তিনিই বিজ্ঞানভিত্তিকভাবে প্রমাণ করেন যে উদ্ভিদ ও প্রাণীকোষ সাদৃশ্যপূর্ণ।

সায়েন্স ফিকশনিস্ট জগদীশ চন্দ্রের সাথে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের বন্ধুত্ব ছিলো গভীর। কবিগুরু সাহিত্যরসে প্রগাড় হলেও বিজ্ঞানের বিষয়ে তিনি নিতান্ত জ্ঞান শুন্য, অন্যদিকে বোস বিজ্ঞানে নিপুণ হলেও সাহিত্যজ্ঞানে ছিলেন তুচ্ছ। সেদিক থেকে তাঁদের বন্ধুত্বের ফলে একদিকে রবীন্দ্রনাথ বোসের কাছ থেকে বিজ্ঞানের ব্যাপারে জানতেন এবং বোস রবীন্দ্রনাথের থেকে সাহিত্য সম্পর্কে জানতেন। বোসকে রবীন্দ্রনাথ বেশ প্রভাবিত করতে পেরেছিলেন। কারণ ১৮৯৬ সালে বোস ‘নিরুদ্দেশের কাহিনী’ (The Story of the Missing One) গল্পটি লিখে ফেলেন। পরে অবশ্য একে আরো বিস্তৃত করে ‘অব্যক্ত’ নামক রচনাসমগ্রে ‘পলাতক তুফান’ নামে সংকলিত করা হয়। বাংলা ভাষায় এটিই প্রথম সায়েন্স ফিকশন। অর্থাৎ বাংলা সায়েন্স ফিকশনও তাঁর হাত ধরে এসেছে।


সম্মান: 
যদিও জগদীশ চন্দ্র তাঁর নিজের করা গবেষণা বা আবিষ্কারের জন্য জীবদ্দশায় কোনো পেটেন্ট গ্রহণ করেননি, কিন্তু বর্তমান বিজ্ঞানী সমাজ রেডিও তরঙ্গের ক্ষেত্রে তাঁর অবদান স্বীকার করেন অম্লানবদনে। তাকে আখ্যা দেয়া হয় বেতার যোগাযোগের জনক হিসেবে। মিলিমিটার তরঙ্গ আবিষ্কার করে তিনি বেতার যোগাযোগের ক্ষেত্রে একজন অগ্রপথিক হিসেবে আজ গণ্য হন। তাঁর আবিষ্কৃত অনেক যন্ত্র আজও ব্যবহার হয়ে আসছে যাদের মধ্যে বিভিন্ন প্রকার এন্টেনা, পোলারাইজার এবং ওয়েভগাইড উল্লেখযোগ্য। যদিও এখন এদের আধুনিকায়ন করা হয়েছে।
অগাধ জ্ঞান সমৃদ্ধ এই বিজ্ঞানী ২৩ নভেম্বর, ১৯৩৭ সালে ৭৮ বছর বয়সে মারা যান। তাঁর স্মরণে চাঁদের একটি আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখের নামকরণ করা হয়েছে ‘বোস ক্রাটার’ (Bose Crater) নামে।

তাঁর জন্ম শতবার্ষিকীকে স্মরণীয় করে রাখতে ১৯৫৮ সালে পশ্চিম বাংলায় বৃত্তি ব্যবস্থা চালু করা হয়। একই বছর ভারত সরকার তাঁর স্মরণে তাঁর ছবি সম্বলিত ডাকটিকেট প্রচলন করে। ২০১২ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর তাঁর মিলিমিটার তরঙ্গের গবেষণাকে IEEE এর ইলেক্ট্রিক্যাল ও কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং এর মাইলস্টোন হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়।

ইন্ডিয়ান বোটানিক্যাল গার্ডেনকে তাঁর স্মরণে ‘আচার্য জগদীশ চন্দ্র বোস ইন্ডিয়ান বোটানিক্যাল গার্ডেন’ নামকরণ করা হয়। এছাড়াও জীবদ্দশায় তিনি ভূষিত হয়েছেন নানা উপাধিতে, যেমন নাইট ব্যাচেলর উপাধি। রয়্যাল সোসাইটির ফেলো নির্বাচিত হয়েছেন, ভিয়েনা একাডেমী অব সায়েন্সের সদস্য হয়েছেন। মৃত্যুর কিছুকাল আগে জগদীশ চন্দ্র বসু ১৯৩৭ সালে কলকাতায় বসু বিজ্ঞান মন্দির (Bose Institute) প্রতিষ্ঠা করেন।


বোসের রচিত গবেষণাধর্মী বইগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য-
Response in the Living and Non-living
Plant response as a means of physiological investigation
Comparative Electro-physiology: A Physico-physiological Study
Researches on Irritability of Plants
Life Movements in Plants (Volume I)
Life Movements in Plants, (Volume II)
Physiology of the Ascent of Sap
The physiology of photosynthesis
The Nervous Mechanisms of Plants
Plant Autographs and Their Revelations
Growth and tropic movements of plants
Motor mechanism of plants

তথ্য সূত্র - গুগল ও উইকিপিডিয়া আর ছোটবেলায় পড়া বিজ্ঞানীদের জীবনী বই থেকে।

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

শনিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২২

মিথ্রিডেটিস



আজকে আমার পড়া আরও একটি প্রিয় বই মিথ্রিডেটিস সম্পর্কে কিছু কথা বলতে চলেছি।

বইটির নামের প্রতি এক অমোঘ আকর্ষণের দরুণ কিনেই ফেলি বইটি। প্রচ্ছদের উপর জ্বলজ্বল করতে থাকা নামটি পাঠকের শুধু দৃষ্টি নয়, মস্তিষ্কে যেন সাময়িক আলোড়ন তোলে,“কি এর মানে! কি আছে এ দু মলাটের ভিতরের পাতা জুড়ে?”ষষ্ঠ মিথ্রিডেটিস ছিলেন প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্য পন্তুস এর রাজা। তার বাবার মৃত্যু হয়েছিল বিষ প্রয়োগে। মা কে বিষদায়িণী হিসেবে সন্দেহে, আত্মরক্ষার এক অভিনব পদ্ধতি অবলম্বন করলেন রাজা মিথ্রিডেটিস। শরীরে গড়ে তুললেন এক অদ্ভুত প্রতিরোধ শক্তি। তিনি নিজেই সহনীয় মাত্রায় (লেস দ্যান লিথাল ডোজ) অল্প অল্প করে বিষ নিতে শুরু করলেন।ফল স্বরূপ শরীরে তৈরি হল বিষ প্রতিরোধী ইমিউন সিস্টেম।ফলে তিনি হয়ে গেলেন পয়জন রেসিস্ট্যান্ট। সাধারণ বিষক্রিয়ায় মৃত্যু হওয়া সম্ভব নয়। মিথ্রিডেটিস এর নাম অনুসারে এ পদ্ধতির নাম মিথ্রিডেটিজম।

গল্পের ব্যবচ্ছেদ:
"মিথ্রিডেটিস" শব্দটির অর্থ হলো *পয়জন প্রুফ* ।করণ ডিস্যুজা,কলকাতার একজন নামকরা গ্যাংস্টার,যাকে পুলিশ হন্যে হয়ে খুঁজছে। সেই করণ ছোটবেলা থেকে নিজের অজান্তেই তার বাবা উইলিয়াম ডিস্যুজার দেওয়া বিষের মিশ্রণ খেতে খেতে হয়ে উঠেছিল মিথ্রিডেটিস। অর্থাৎ সাধারণ কোনো বিষ শরীরে ঢুকলেও কোনো ক্ষতি তার হবে না।অপরদিকে স্টারলাইন নামক কলকাতার এক বিখ্যাত নার্সিংহোমে লোকচক্ষুর আড়ালে হয়ে চলেছে "ইললিগাল মেডিক্যাল ট্রায়াল"। ফুটপাথবাসী বুভুক্ষু মানুষদের খাবারের লোভ দেখিয়ে তাদের সামান্য কিছু রোগ নিরাময়ের জন্য তুলে নিয়ে যাচ্ছে সেই নার্সিংহোমে কিছু তথাকথিত এজেন্টরা। যে মানুষগুলোর কাছে দু বেলা দু মুঠো খেতে পাওয়াই অনেক বড় ব্যাপার। তারপর টিবি, লেপ্রোসি,এইচ আই ভি নামক ভয়ঙ্কর রোগের স্টেইন তাদের শরীরে প্রবেশ করিয়ে দেখা হচ্ছে সেই ড্রাগ রোগকে নিরাময় করতে পারে কিনা। কিন্তু ফল হচ্ছে হিতে বিপরীত,অধিকাংশ মানুষ সেই ড্রাগের প্রভাব নিতে না পেরে মারা যাচ্ছে কিংবা শরীরে দেখা দিচ্ছে সেপটিসেমিয়া... ভয়ঙ্কর ঘা তে ভরে যাচ্ছে সারা শরীর।নিরুপায় ডাক্তার, সিস্টাররা কেউই ড্রাগের ডোজ কমাতে পারছেন না কারণ অথরিটির আদেশ। এর মাধ্যমে লেখিকা তুলে ধরেছেন এক নৃশংসতা,ইললিগাল মেডিক্যাল ট্রায়াল যা এক অনেক বড় ক্রাইম।এই সময়ই নার্সিংহোমে নিয়ে আসা হয় মিথ্রিডেটিস করণ কে। যার উপর দেওয়া হয় সেই ড্রাগের ডোজ এবং ফলস্বরূপ দেখা যায় সে অবিচল। বিষাক্ত ড্রাগের কোনো প্রভাবই তার উপর পড়ে না। এখানেই করণ খুঁজে পায় সিস্টার ডরোথিকে, যার সঙ্গে গড়ে ওঠে তার সুমধুর প্রেমের সম্পর্ক।শেষপর্যন্ত কেন্দ্রীয় চরিত্র করণ পারে এই নৃশংসতা বন্ধ করতে এবং সমস্ত রোগীরাই ফিরে আসে মৃত্যু মুখ থেকে। সর্বোপরি করণ-ডরোথি র সম্পর্কও পূর্ণতা পায়। "মিথ্রিডেটিস"মেডিক্যাল সায়েন্সের বিভিন্ন খটমট নামসহ সব ঘটনার বর্ণনা লেখিকা এক অসাধারণ দক্ষতায় ফুটিয়ে তুলেছেন এই বইতে।
মেডিক্যাল থ্রিলারের ওপর লেখা এই বইটি আমার প্রিয় বইগুলির মধ্যে অন্যতম একটি বই। 

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

শুক্রবার, ১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২২

#নাম -' আফ্রিকা' - রবীন্দ্রনাথ। ✍️– মৃদুল কুমার দাস।


  #বিষয় – কবিতা আলোচনা।
 #নাম-   'আফ্রিকা'- রবীন্দ্রনাথ।  
         ✍️ ― মৃদুল কুমার দাস।

      আজ রবীন্দ্রনাথের 'পত্রপুট' কাব্যের ১৬ সংখ্যক  'আফ্রিকা' কবিতাটির অন্দরমহলের খবর দেওয়ার চেষ্টা করব। কবিতাটির রচনার মূলে প্রেক্ষাপট কি ছিল, প্রসঙ্গক্রমে আফ্রিকা মহাদেশটির স্বরূপ নিয়ে  আলোচনার সুযোগ নেব। সর্বোপরি সাম্রাজ্যবাদী শক্তির হিংস্র উত্থান, উপনিবেশ দখল, মানবিকতার যথেচ্ছ অবমাননা এই কবিতাটির মধ্যে বিশ্বকবি কি সুনিপুণ বিন্যাস ঘটিয়েছেন। কবিতাটিতে কবির দীর্ঘ তিন দশকের অভিজ্ঞতা নিহিত আছে। কবি বিশ্বের নানা দেশ মহাদেশ পরিক্রমা করলেও আফ্রিকা কোনদিন যাননি। কিন্তু সেই আফ্রিকা সাম্রাজ্যবাদী নিষ্ঠুর শক্তির কাছ ছিনিবিনি খেলার পাত্র হয়েছিল যখন তাই নিয়ে এক মানবতার পূজারী কবির মথিত হৃদয়ের কান্না নিয়ে কবিতাটি রচিত হয়েছিল। কবিতাটির রচনাকাল - ১৯৩৭ এর ৮ ফেব্রুয়ারি। ১৯৩৫ এ ইতালির মুসোলিনি জোর করে আফ্রিকার আবিসিনিয়া দখল করেন। রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকে এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ আসে। তখন কবি শান্তিনিকেতনে। তরুণ কবি অমিয় চক্রবর্তীর অনুরোধে কবিতাটি লিখেছিলেন বিশ্বকবি। কবিতাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৩৯ এ 'প্রবাসী' পত্রিকায়। এই কবিতা রচনার আগে কবির মানসিক যন্ত্রনার কথা 'শেষ সপ্তক' এ প্রকাশিত হয়েছিল। সেই সঙ্গে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আভাস বা আসন্ন বলে ভবিষ্যৎ বাণী করতে দ্বিধা করেননি।
  এই আফ্রিকা নিয়ে জানার কৌতূহল একটু নিরসন হলে মন্দ হয় না।
   আফ্রিকা ও প্রাচ্যভূমি ভারতবর্ষ একটা সময় এক ছিল। সেই সময়কার কথা বলছি যখন পৃথিবীর সমগ্র স্থলভাগ ছিল একটাই ভূখণ্ড। জার্মান অধ্যাপক আলফ্রেড ওয়েগনারের 'মহীসঞ্চরণ' মতবাদের মূল কথাই ছিল - চৌত্রিশ কোটি বছর আগে কার্বনিফেরাস যুগে পৃথিবীতে ছিল একটিই স্থলভূমি। তার নাম প্যানজিয়া। আর সমগ্র জলভাগের নাম ছিল 'প্যান্থালাসা'।
  পৃথিবী ঘুরছে বলে পৃথিবী তার উপরিভাগকে কেন্দ্রাতিগ বল প্রয়োগ করছে। তারই প্রভাবে বাইশ কোটি বছর আগে মেসোজয়িক যুগের শুরুতে প্যানজিয়া অর্থাৎ একটাই ভূখণ্ড প্রবল আলোড়নের ফলে একাধিক ভূখণ্ড তৈরি হয়। গড়ে ওঠে এক একটা মহাদেশ।
  এই কেন্দ্রাতিগ বলের জন্যই পৃথিবী পৃষ্ঠের উপরিতলের জলভাগ ও স্থলভাগ নিয়ে বৈচিত্র্য একটা নিরন্তর প্রক্রিয়ার অন্তর্গত হয়। তদনুসারে অনেকের মতের প্রমাণিত সত্যতা হলো কেন্দ্রাতিগ বলের জন্যই হিমালয় পর্বতের উচ্চতা বাড়ছে। প্রশান্ত মহাসাগর শুকিয়ে যাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা। অবশ্য তা কোটি বছর লাগলেও লাগতে পারে।
ওয়েগনার আরো প্রমাণ দিয়েছেন সকল খন্ডিত ভূখন্ডের অসম বা খাঁজ কাটা প্রান্তসীমা তথা তটরেখাকে যদি একটার সঙ্গে আরেকটার জোড়া লাগানো যায়,তবে সকল দেশ ও মহাদেশ একে অপরের সাথে সুন্দর ভাবে খাপ খেয়ে যায়। পৃথিবীকে তখন একটা ভূখণ্ড মনে হবে।
  শুধু তাই নয় একের তটরেখা সংলগ্ন মানুষের জীবন জীবিকার সঙ্গে অপর ভূখন্ডের তটরেখার জীবন জীবিকার বৈশিষ্ট্যগত সাদৃশ্য লক্ষ্যে পড়বে। সেই সঙ্গে ভাষাগত সাদৃশ্য, ভৌগলিক পরিবেশগত সাদৃশ্য অবশ্যই লক্ষ্যে পড়বে। যেমন ভারতবর্ষ থেকে বঙ্গোপসাগর অস্ট্রেলিয়াকে ছিনিয়ে নিয়ে গেছে। প্রমাণ অস্ট্রেলিয়ার তটরেখাকে টেনে এনে যদি ভারতের তটরেখার সঙ্গে মিলাতে চাই আমরা অবশ্যই দেখতে পাব আমাদের সে মনের সাধ পূরণে বৃথা হবে না। আবার আফ্রিকা মহাদেশের পশ্চিম তটরেখাকে আমেরিকার পূর্ব তটরেখাকে টেনে এনে যোগ করলে মিলে যাবে। আমেরিকার পূর্বতটের জীবনের সঙ্গে আফ্রিকার পশ্চিমতটের জীবনাচরণের মিল অবশ্যই লক্ষণীয়। আমেরিকার আদিম অধিবাসী ও আফ্রিকার আদিম অধিবাসীর সাদৃশ্যের স্বপক্ষে যুক্তি হলো উভয় দেশের আদিম মানব - 'এপ'। 'এপ'-এর নৃতাত্ত্বিক পরিচয় তাই প্রমাণ দেয়।
১৮৭৫ খ্রীষ্টাব্দে লুথিয়ান গ্রীন তাঁর 'চতুস্তলক' মতবাদে বলেছেন পৃথিবীর চারটি তল। যথা আর্টিক, আটলান্টিক,পেসিফিক ও ইন্ডিয়ান ওসিয়ান। আর তিনটি উন্নত কোণের একটি হচ্ছে আফ্রিকা মহাদেশ। এবং প্যানজিয়ার দক্ষিনাংশ হতে বিচ্ছিন্ন ভূখণ্ডই হলো আফ্রিকা মহাদেশ। ভারতের পশ্চিম উপকূলের মানুষের জীবন জীবিকার সঙ্গে আফ্রিকার মানুষের জীবন জীবিকায় বহুলাংশে মিল দেখা যায়। জাতিগত ঐক্যের সূত্রে গুজরাট, মহারাষ্ট্র,মাদ্রাজের উপকূলবর্তী এলাকার মানুষেরা দলে দলে আফ্রিকায় শ্রমিক হিসেবে যাতায়াত করতো অনবরত। বিশেষ করে গুজরাটিরা, তার মধ্যে আবার প্যাটেল সম্প্রদায় আরব সাগর ডিঙিয়ে কাঠের ব্যবসায় খুব দক্ষ হয়ে উঠেছিল।
   আবার নৃতাত্ত্বিক পরিচয় বিশ্লেষণ করলে ভারত ও অস্ট্রেলিয়ার আন্তঃযোগাযোগও সঠিক ভাবে প্রমাণিত হয়। দুই দেশের আদিম প্রজাতি প্রোটো অস্ট্রলয়েডের ভাষা ও জীবনযাপনের সাদৃশ্য থেকেও এই সত্যে পৌঁছতে পারি।
এইভাবে প্যানজিয়া বা একটিমাত্র ভূখন্ডকে পৌরাণিক ভাবলোক দিয়ে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর 'আফ্রিকা' কবিতায় বললেন -
"তাঁর সেই অধৈর্যে ঘন ঘন মাথা
               নাড়ার দিনে
             রুদ্র সমুদ্রের বাহু
  প্রাচী ধরিত্রীর বুকের থেকে
ছিনিয়ে নিয়ে গেল তোমাকে আফ্রিকা"
  সেই আফ্রিকা কোটি কোটি বছর ধরে এক দুর্গমের রহস্য দিয়ে আবৃত হতে শুরু করে। পরিচয় অন্ধকারময় দেশ―
  "হায় ছায়াবৃতা/ কালো ঘোমটার নীচে অপরিচিত ছিল তোমার মানবরূপ/ উপেক্ষার আবিল দৃষ্টিতে।" 
অর্থাৎ কবি কাব্যিক ভাষায় বুঝিয়েছেন বাসুকি নাগ তার মাথায় ধরিত্রীকে যেন ধারণ করে ছিল। স্রষ্টার যেন ইচ্ছে হলো বাসুকির মাথা নাড়িয়ে দিয়ে অখন্ড ধরিত্রী থেকে আফ্রিকাকে ছিনিয়ে নিয়ে যাওয়া যাক। স্রষ্টার হঠাৎ এই সখ থেকে নাকি ভারতবর্ষ থেকে বেরিয়ে গেল আফ্রিকা। অর্থাৎ আরবসাগর ও লোহিত সাগরের বাহুই যেন প্রাচী অর্থাৎ প্রাচ্য ভারতবর্ষ থেকে আফ্রিকাকে ছিনিয়ে নিয়ে গেল। একেবারে চিরতরে বিচ্ছিন্ন হলো। 
     সে কোটি কোটি বছর আগে। আফ্রিকা সৃষ্টির সময় ছিল এক অন্ধকারময় দেশ। পাহাড় পর্বত,আর ঘণ জঙ্গলের দেশ। কোটি কোটি বছর অন্ধকারে ডুবেছিল। তারপর এল হিংস্র জীবজন্তু, তারপর আদিম মানব এপ। আফ্রিকার উপাধি হিসেবে গণ্য আজও বিশ্বের অন্ধকারময় মহাদেশ। বর্তমানে যতই আধুনিক সভ্যতার দেশ বলে গণ্য করা হোক না কেন, আফ্রিকাকে প্রকৃতপক্ষে খুঁজে পেতে হলে ঐ অন্ধকার যুগের সময়ে গেলে আফ্রিকাকে চেনা সবচেয়ে সহজ।    যখন সভ্যতার আলো ধীরে ধীরে পৌঁছনোর সময় হলো এই আফ্রিকাকে কেমন করে পেলাম সেই কথায় আসি এবার। 
   শুরু করি ভাস্কোডাগামার সময় থেকে। সে ১৪৯৭ থেকে ১৪৯৯ খ্রীষ্টাব্দ। তার পাঁচবছর আগে ইতালির নাবিক কলম্বাস আটলান্টিক পেরিয়ে ভারতবর্ষ আবিস্কার করবেন কি, আবিস্কার করে ফেলেছেন আমেরিকা। আনুমানিক ১৪৯৪ খ্রীষ্টাব্দে। আর পর্তুগাল নাবিক ভাস্কোডাগামা ভারতের কালিকট বন্দরে পৌঁছন ১৪৯৯।
     আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ছিল পর্তুগীজদের উপনিবেশ। আর ভাস্কোডাগামা একেবারে দক্ষিণে কেপটাউন হয়ে কিনিয়াতে পৌঁছান ১৪৯৭ খ্রীষ্টাব্দে। আর সেখানে  আহমেদ ইবন মাজিদ নামে এক ব্যবসায়ীর সাহায্য নিয়ে ভাস্কোদাগামা ভারতে পদার্পণ করেন। এর পেছনে কত জাহাজ ডুবি,লোকক্ষয়ের গল্প আছে যা শুনলে লোম খাড়া হয়ে ওঠে।
  তাহলে দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউনে এসে পর্তুগীজরা প্রথম ঘাঁটি গাড়েন। তাঁরাই প্রথম বৈদেশিক শক্তি হয়ে আদিবাসিন্দাদের উপর আধিপত্য বিস্তার করে আধুনিক আফ্রিকা গঠনের কাজে হাত লাগান।
  কেপটাউনের আদিবাসিন্দা হলেন 'খোসা' উপজাতি। তাদের কাছে পর্তুগীজরা ছিলেন বিদেশি হানাদার। তাঁদের প্রতিহত করতে খোসাদের সঙ্গে বাধল প্রবল লড়াই। কিন্তু পর্তুগীজ তথা ডাচেদের বন্দুকের সামনে খোসারা তীর ধনুক নিয়ে লড়াইয়ে এঁটে উঠতে পারেননি। ফলে পর্তুগীজ তথা ডাচেরা খোসাদের সহজেই দাস বানিয়ে ফেললেন। গরু ভেড়ার চেয়েও অধম ভাবতো তাঁরা খোসাদের। এমনকি এই ডাচ শ্বেতাঙ্গদের কাছে বাঘ সিংহ শিকারের বিলাসিতার নামান্তর হতো খোসারা। প্রবল বর্ণবৈষম্যের শিকার হতেন খোসারা। এদের শিকার করতে বন্দুকের লাইসেন্স প্রথার প্রচলন ছিল। নেলসন ম্যান্ডেলা এই খোসা সম্প্রদায়ের লোক ছিলেন।
  ডাচদের মতো ক্রমে ফরাসি, জার্মানরা উপনিবেশ স্থাপনে উদ্যোগী হলেন। উপনিবেশ দখলের লড়াই শুরু হয়। সেই সঙ্গে ইংরেজরাও উপনিবেশিক শক্তি হয়ে আবির্ভূত হন।  ইউরোপে ১৮১৫ খ্রীষ্টাব্দে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের মধ্যে বাধল যুদ্ধ। সেই যুদ্ধে ডাচরা ফ্রান্সের নেপোলিয়ন বোনাপার্টকে আপরাজেয় শক্তি মনে করতেন। ফলে নেপোলিয়নকে ডাচরা সমর্থন করেন। নেপোলিয়নের শেষে ওয়াটার লুর প্রান্তে ঘোরোতর পরাজয় ঘটে। ফ্রান্সকে এভাবে ডাচদের সমর্থন  ইংরেজরা ভালো চোখে নিলেন না। সেই আক্রোশ গিয়ে পড়ল কেপটাউনে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে। বাঁধল লড়াই। ১৮৩৩ খ্রীষ্টাব্দে ইংরেজরা ডাচদের সব কলোনি থেকে বিতাড়িত করে কলোনিগুলি থেকে দাসপ্রথার বিনাশ ঘটালেন।
   তখন ডাচরা বাধ্য হয়ে লটবহর ও খোসা দাসদের নিয়ে নতুন বাসস্থানের খোঁজে আফ্রিকার উত্তরদিকে পাহাড় জঙ্গল অধ্যুসিত এলাকায় সরে যেতে বাধ্য হলেন। ইতিহাসে এর নাম হল 'গ্রেট ট্রেক'। অর্থাৎ 'ট্যু ট্রাভেল' বলা হয় যাকে। তাই ট্রাভেল একটি ডাচ শব্দ।
এই উত্তরদিকটি ছিল জলু উপজাতি অধ্যুসিত এলাকা। ডাচদের আক্রমণের মুখে পড়ে জুলু উপজাতিও ডাচেদের দাসত্ব স্বীকার করলেন। এইভাবে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত হলো ব্রিটিশদের,আর উত্তরপ্রান্ত ডাচদের। তবে এই ভাগ বাটোয়ারা মৌখিক ছিল।
কিন্তু ব্রিটিশরা ক্রমে সাম্রাজ্য বিস্তারের লোভে উত্তরদিকে এগোতে থাকলেন। হীরা, সোনার লোভ তাঁকে পেয়ে বসেছে। ইজিপ্ট পর্যন্ত পৌঁছনো তাঁর চাই। ইজিপ্ট পর্যন্ত রেললাইন পেতে, কেপটাউন থেকে ইজিপ্ট পর্যন্ত একাধিপত্য বিস্তারে উঠে পড়ে লাগলেন। ফলে ডাচদের সঙ্গে আবার লড়াই বাধল। প্রথমবার ডাচরা যুদ্ধে জিতলেও দ্বিতীয় বারের যুদ্ধে ডাচরা পুরোপুরি পর্যুদস্ত হলেন। এবং ডাচরা অবশেষে ১৯০২ খ্রীষ্টাব্দে বাধ্য হলেন ব্রিটিশদের সঙ্গে সন্ধির প্রস্তাব এনে শান্তি স্থাপন করতে। সন্ধির শর্তাবলী অনুসারে উভয়েই মিলেমিশে একসঙ্গে রাজত্ব চালাবে ঠিক হয়। দুই শ্বেতাঙ্গ শ্রেণীর শাসনে কৃষ্ণাঙ্গদের অবস্থা যে তিমিরে ছিল সেই তিমিরেই রইল। বরং  আরো শোচনীয় হয়ে উঠেছিল যে তা বলতে দ্বিধা নেই।
  সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বার বার আফ্রিকার বুকে হানাদার হয়ে কিভাবে নৈরাজ্য ও অরাজকতা সৃষ্টি করেছিল, সে ইতিহাস সুখের যে নয়, সুখের হতে পারে না- কেমন সে শোষিত আফ্রিকার কাহিনি? আফ্রিকার বুকে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি তার লোহার কাঁটা লাগানো বুটের তলা দিয়ে ভয়ঙ্কর শোষনের চির চিহ্ন এঁকে দিচ্ছিল। এই দুর্দিনের কথাকে কবিতার প্রতি স্তবকে মর্মস্পর্শী ভাষায় কবি তুলে ধরেছেন।
  ইতালির মুসোলিনি এক সাম্রাজ্যলোভী শাসক। জার্মানির হয় টলার তাঁর দোসর। এক স্বাধীন দেশকে বলপূর্বক দখলের বিরুদ্ধে বিশ্বের সমাজসচেতন মানুষ সেদিন নীরব দর্শক ছিলেন। প্রতিবাদ দিকে দিকে ধ্বনিত হলেও সে কেবল প্রতিবাদেই ছিল। এই নির্মম অত্যাচার ও উপনিবেশ দখলের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের কোনো সুরাহা হয়নি। রবীন্দ্রনাথ গ়াঁধীজীকে বলে ছিলেন কিছু একটা করতে। গাঁধীজী বলেছিলেন এর বিরুদ্ধে আবিসিনিয়ার মানুষকে সঙ্গে নিয়ে আন্দোলনে সামিল হতে হবে। আর রবীন্দ্রনাথ সেদিন নিরুপায় হয়ে বলেছিলেন আমিও তো উপনিবেশিক দেশের বাসিন্দা। কতটাই বা ক্ষমতা। তবে ক্ষমতা বলতে লেখনী। সেই তীক্ষ ধারালো লেখনীতে প্রতিবাদ ধ্বণিত হল -
  "এল ওরা লোহার হাতকড়ি নিয়ে/ নখ যাদের তীক্ষ্ণ তোমার নেকড়ের চেয়ে/ এল ওরা মানুষ ধরার দল।... দস্যু-পায়ের কাঁটা-মারা জুতোর তলায় / বীভৎস কাদার পিন্ড..." ― আফ্রিকাকে পদদলিত করে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির উত্থান কবির কাছে ছিল বেদনাদায়ক। সকলে যখন ধর্মীয় সাধনায় ব্যাপৃত ― 
  "সমূদ্রপারে সেই মুহুর্তেই তাদের পাড়ায় পাড়ায়/ মন্দিরে বাজছিল পূজার ঘন্টা/ সকালে সন্ধ্যায় দয়াময় দেবতার নামে;/ শিশুরা খেলছিল মায়ের কোলে।"― এমন আবেগঘন মুহূর্তের মধ্যে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির ক়াটামারা জুতোর তলায় অসহায় মানুষের পদদলিত পিষ্ট হওয়া অবস্থা দেখে
 নিরুপায় কবির ভাষায় সেদিন নিষ্ঠুর সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে কবিতাটি ছিল চিরকালের মত তাৎপর্যপূর্ণ। বিশ্বকবির কালজয়ী সৃষ্টি। কবিতার শেষে এক নিরুপায় কবির করুণ বেদনায় কবির কন্ঠ রুদ্ধ। কবি সেই রুদ্ধশ্বাসে কবিতাটির মর্মস্পর্শী সমাপ্তি ― 
    "এসো যুগান্তের কবি,/আসন্ন সন্ধ্যার শেষ রশ্মিপাতে/ দাঁড়াও ওই মানহারা মানবীর দ্বারে;/ বলো 'ক্ষমা করো' ― / হিংস্র প্রলাপের মধ্যে/ সেই হোক তোমার সভ্যতার শেষ পুণ্যবাণী।।"
  আদিম আফ্রিকার স্বরূপকে সেদিন সাম্রাজ্যবাদী শক্তির নিষ্ঠুরতা ছাড়িয়ে গিয়েছিল তাই কবিতার মনের কাছে মর্মস্পর্শী আবেদন এক চিরন্তন সত্যের সাক্ষী হয়ে রয়েছে।
             ******
#কপিরাইট রিজার্ভ ফর মৃদুল কুমার দাস।
    

মঙ্গলবার, ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২২

আকাশের অস্তরাগে(সুদেষ্ণা দত্ত)



 আকাশের অস্তরাগে

সুদেষ্ণা দত্ত

 

শিউলিতে আসা,পলাশ পথে ফেরা--

‘ঘুম ঘুম চাঁদ,ঝিকিমিকি তারা’

‘কিছুক্ষণ আরও না হয় রহিতে কাছে’

জেগেও জাগলে না সাড়া দিতে হয় পাছে!

‘কে তুমি আমারে ডাক’

কেন মিছে দাঁড়ায়ে রাখ!

‘আর ডেকো না’ যেতে দাও

আমার সুর-স্বর আপন করে নাও।

‘চন্দন পালঙ্কে শুয়ে’ চললাম আজ--

শেষ হল ‘গানের দিন’,সাঙ্গ হল কাজ।

নিভে গেল সন্ধ্যা প্রদীপ ‘চম্পা,চামেলি,গোলাপেরই বাগে’

গীতশ্রী পাড়ি দিলেন ‘আকাশের অস্তরাগে’।

 

©কপিরাইট রিজার্ভড ফর সুদেষ্ণা দত্ত।

ছবি--সংগৃহীত

রবিবার, ৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২২

##এটুকুই ।। অনুগল্প।। ## শর্মিষ্ঠা ভট্ট

 *এটুকুই*

©শর্মিষ্ঠা ভট্ট🍁



তোর বারান্দা থেকে আমার বারান্দা লাফিয়ে পার হতে পারতাম। কিন্তু কখনও পেরোতে চায়নি মন। তোর অচীনপুরের রাজকন্যাদের মতো ভঙ্গি, আমার বিস্মিত চোখ উপভোগ করতো। আমার স্বপ্নের গোলাপের পাপড়ি উড়ত তোকে ঘিরে। তোর চুলের সুগন্ধি ভেসে আসত বুঝি বাতাসে, আমি বুক ভরে শ্বাস নিতাম। দীর্ঘ শ্বাস। বুকের ভেতর দিয়ে শরীরের গলি বেয়ে ছোটাছুটি করত তারা। বারান্দা টপকানোর ইচ্ছা হয়নি কখনও। ভরে ছিলাম। 


মনে আছে ইচ্ছা করে যখন বৃষ্টির ফোঁটা হাত বাড়িয়ে ছুঁতিস , ওই তোর জলপাই রঙের বারান্দার বাইরে। আর একটু হাত বাড়ালেই ছুঁতে পারতাম তোর আঙুল। তোকে মনের আনন্দে ভিজতে দিয়ে ঘরে আসতাম চলে। 


ভারী বাজে ছিলে তুমি। বারান্দা এত কাছে ছিল। তবু তোমার বারন্দার বাগান থেকে একটাও গোলাপ ছুঁড়ে দিতে না। যদি কিশোরী সুলভ নিষ্পাপ প্রশ্ন করতাম 

" অভিদা একটা গোলাপ দাও না ।" তুমি গম্ভীর হয়ে বলতে

" ওগুলো এখনও বড়ো হয়নি। "

"তো কি গোলাপই তো দাও না, এই এখানে লাগবো। "

চোখ না তুলে বলতে " কুঁড়ি ছিঁড়তে নেই। "


তোমার গোলাপ যে প্রাপ্ত বয়স হতে হতে মাড়িয়ে গেলো। এই বারান্দার পেছনে যে বিশাল বাড়ী তার খবর তুমি রাখোনি কখনও। কখনও তাকিয়ে দেখোছো আমার চোখ কি বলে? বারান্দা ছিল দুইজনার নীরব বসন্ত কুঞ্জ। হয়ত এমন করেই খুশি থেকে যেতাম, যদি শাঁখা পলা সিঁদুরের বন্ধন না থাকতো। আজও সাদা থানের নিরব শাসন বারান্দার বাইরে আসতে দেবে না। 


মৃন্ময়ী এ বাড়ীর কিশোরী বৌ ছিল, বয়সের উজানে কখন হারিয়েছে সব। এখন বহিঃ দৃশ্য তার পক্ষে নিষিদ্ধ, স্বামী থাকায় তবু এই বারান্দা ছিল, বন্ধ এখন। তবু হলির আনন্দে যখন সবাই ব্যস্ত, অনেক দিন পর দরজা খুলে বারান্দার দুপুরের রোদে দাঁড়িয়ে এসব ভাবছিল। কখনও যা ভেবেছিল মন, কিংবা ভাবেনি হঠাৎ অভি বারান্দা টপকে লাল আবীরের ভরিয়ে দিল তাকে। আচমকা এক উত্তাল ঢেউ বারান্দাটাকে অজনা সমুদ্রে ভাসিয়ে নিয়ে গেলো।। 🌹🌷🌹🌷🌹🌷

বৃহস্পতিবার, ৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২২

#নাম - 'কবিগান ও কবিওয়ালা।'✍️ - মৃদুল কুমার দাস।

শুভ আলোচনা বাসর।
  #বিষয় - *গ্রন্থালোচনা।*
    #নাম - 
  *কবিগান ও কবিওয়ালা।*
      ✍️ – মৃদুল কুমার দাস। 

  বাংলা ও বাঙালির লোকসংস্কৃতির সে সুবর্ণযুগ বলতে গেলে কবিগানের সাম্রাজ্য আর তার গায়েনদের বলা হয় কবিওয়ালা। এই কবিগানের উদ্ভব কিন্তু হঠাৎ করে হয়নি। কবিগানের সূচনা কাল আঠারো শতকের মধ্যভাগে,আর বিকাশ উনিশ শতকজুড়ে। প্রায় দু'শ' বছর আবির্ভাব ও বিকাশ নিয়ে কবিগান বাংলার শহর থেকে মফঃসল পর্যন্ত আকাশ বাতাস মুখরিত করেছিল, ইতিহাস তাই বলে।
এই দু'শ বছরের আবির্ভাব ও বিকাশের মধ্যে কবিগান কিন্তু আটকে নেই। অনেক আগে থেকেই এর প্রস্তুতি ছিল। 
ধর্মীয় বাতাবরণ ও পুরাণ শাস্ত্রালোচনার আড়ালেই ছিল তার এই প্রস্তুতি। সে চর্যাগীতির সময় থেকে। কেননা আদিরসেও চর্যাপদ সমান পুষ্ট। বৌদ্ধধর্মের বিষয় নিয়ে বাঙালির ধর্মপথগামীর আচরণগত শিক্ষায় জোর তদবিরের মাঝে সাধারণ মানুষ কামনা বাসনা,অবৈধ সম্পর্কের আবেদন তলে তলে বেশ ভালই পোষন করত। যেমন দিনের বেলা কাক দেখে, যে ঘরের বউ ভয় পেত সেই কিন্তু অন্ধকার নামলে পা টিপে টিপে পরপুরুষের বাড়ি যেত('... রাতি ভইলে কামরু জাঅ')। চুরি ছিনতাই থেকে সকল প্রকার কৌম জীবনের কথা পাই চর্যার সমাজ ও বাস্তব জীবনে।
এর পরে আসি শ্রীকৃষ্ণকীর্তন নাটগীতির কথায়। নাট্যকাব্যটি কবি একেবারে লোকায়ত করে পরিবেশন করেছেন। মূলে আদিরস। এই নাটগীতির শ্রোতা,দর্শক একেবারে সাধারণ শ্রেণীর মানুষ। কবি বড়ুর শাস্ত্রে অগাধ পান্ডিত্য থাকা সত্ত্বেও কাব্যের ক্ষেত্রে আদিরস যত আলগা করেছেন সাধারণ মানুষ তত এই নাটগীতি উপভোগ করেছেন। কবির এই নাট্যকাব্যটির পরীক্ষা ছিল সাধারণ মানুষের কাছে। ভালোই সাফল্য কবি পেয়েছিলেন। এই নাট্যকাব্যে আবার ভক্তিরসও কেউ পেতে চাইলে বঞ্চিত হতেন না। 
তবে পদাবলী সাহিত্য প্রেম-ভক্তি-দিব্যভাব, রামায়ণের বাঙালিয়ানায় করুন ও ভক্তিগীতি বা মহাভারতের যুদ্ধ যুদ্ধ কাহিনীর মধ্যে বীরত্বের বাঙালিয়ানায় আকর্ষণ থাকলেও সাধারণ মানুষ খুঁজেছে তার দৈনন্দিতার সহজ সুরের গান। আর তারই রসদ লাভে মঙ্গলকাব্যগুলির দিকে ভালই ঝোঁক থাকত। ওখানে আদিরসের সরবরাহ করার সুযোগ সুবিধা কবিগণ সহজেই নিতেন। 
পৌরাণিক দেবদেবীর পাশে লৌকিক দেবদেবী নিয়ে মঙ্গলকাব্যের জনপ্রিয়তা সে বলার অপেক্ষা রাখে না। কেন চন্ডীমঙ্গল কাব্যের নায়ক ব্যাধ পুত্র কালকেতু ও নায়িকা ব্যাধ কন্যা ফুল্লরাকে করার মূলে লোকায়ত জীবনের কাছে কবি তাঁর কাব্যের জনপ্রিয়তা খুঁজেছিলেন। ব্যাধ কালকেতুকে অধিপতিও করলেন। আসলে লোকায়ত জীবন,লোকমুখের ভাষা সবসময় সাহিত্যের নতুন নতুন পথ রচনা করে এসেছে।
আর রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র মঙ্গলকাব্যের লৌকিক ধারার ও আদিরসের শেষ কবি। তিনিও ছিলেন দ্ব্যর্থবোধক ভাব সৃষ্টির অসাধারণ প্রতিভাবান কবি। তাঁর এই ভাবধারা কবিগানে পরিপূর্ণ প্রভাব পড়ল। 
 সাধারণ মানুষ কাব্যের পালাগান শুনতে শুনতে কেউ কেউ পালা রচনায় পারদর্শিতা অর্জন করলেন। যত লঘু বিনোদন ততই তার দর,কারণ সাধারণ মানুষের কাব্য চর্চায় তারাও কম নন বলে স্বতঃপ্রমাণিত হলো। পান্ডিত্য অপেক্ষা লোকায়ত কথা তাদের মধ্যে প্রিয় আস্বাদন হয়ে উঠল। সর্বোপরি সংস্কৃত, আরবি,ফারসি ভাষার প্রভাবকে পেছনে ফেলতে ইংরেজি ভাষা উঠে পড়ে লেগেছে। পাশ্চাত্য শিক্ষার ঢেউ লেগে গেছে। মাতৃভাষায় গদ্যচালও পুরোদমে হাজির, কিন্তু সাহেবি ইংরেজি তার উপর চড়াও - কলকাত্তাই ককনির বেশ ভালই দর। এই আবহের মাঝে এই পাঁচালী ও কবিগান চটুল আদিরসাত্মক হয়ে সাধারণ মানুষের মনের খোরাক জোগানোয় একদম সিদ্ধহস্ত হয়ে উঠল। কবিগানে দ্ব্যর্থবোধক ভাষায় ভক্তির কথা জানতে চাইলে পাওয়া যেত,আবার আদি রস উপভোগ করতে চাইলে বিমুখ হতে হত না। আর লোকসাধারণ মানুষের মধ্য থেকে যখন এক একজন কবিওয়ালা উঠে আসছেন, তাই নিয়ে সাধারণ মানুষের উত্তেজনার ঢেউ ছিল প্রবল। আগ্রহ তুঙ্গে। সেই ঢেউয়ের রেস এতো তীব্র ছিল যে দেড়শ' পেরিয়ে প্রায় দু'শ ছুঁয়ে গিয়েছিল,ঐ আরকি যেমন দৌড়বীর প্রান্ত ছুঁয়েও আরো কিছুটা দৌড়ে নিজেকে ঠিক করে নেন,এও ঠিক সেই রকম।
সুতরাং পাঁচালি,কবিগান - পাঁচালিকার ও কবিওয়ালা এক বিশেষ যুগচেতনার চাহিদা পূরণের জন্য অবতীর্ণ হয়েছিল। 
ঊনবিংশ শতাব্দীর মাটি লোকোসাধারণের জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ হওয়ার পাঁচালি ও কবিগানে ছিল এক অনন্য প্রস্তুতি। সেই হিসেবে এই লোকসংস্কৃতি আজ যতই লুপ্তপ্রায় বলি না কেন, এই ধারায় আমরা আমাদের ঐতিহ্যের স্বাদ বহন করে আত্মবিমোহিত হই।
  কবিগানকে আদৌ বিশুদ্ধ সাহিত্য ও সংস্কৃতির ধারক ও বাহকের পর্যায়ে ফেলা যায় না। তবে এর যেটুকু ঠাটবাট ও মর্যাদা শেষপর্যন্ত পুরাণ,উপপুরাণ রক্ষা করেছে। একটু জাতে তুলে ধরেছে। হরু ঠাকুর,রাম বসু,নিতাই বৈরাগী, ভোলা ময়রা,অ্যান্টনী ফিরিঙ্গি প্রমুখগণ সে অর্থে তথাকথিত শিক্ষিত ছিলেন না। কবিগান চর্চার বলে বলীয়ান হয়ে এঁরা তথাকথিত খ্যাতির শীর্ষে প্রতিষ্ঠিত হন। পুরাণ,উপপুরাণ জ্ঞান দিয়ে লোকায়ত স্থূল জীবনকে অসাধারণ জীবনরসরসিকতায় বলিষ্ঠ প্রত্যয় এনে দিয়েছিলেন। রীতিমত রাগরাগিনীতে কন্ঠের রেওয়াজ, সেই সঙ্গে কুড়ি-বাইশ রকম বাদ্যযন্ত্রের সাহায্যে আসর জমজমাট করে তুলতেন। নিধুবাবু দুটো শখের আখড়া গড়ে তোলেন – একটি বাগবাজারে,আরেকটি শোভাবাজারে। সঙ্গে কিছু ধনাঢ্য ব্যক্তির দল গঠনে সঙ্গত দিয়েছিলেন নিধুবাবুকে। উভয় দলের মধ্যে আবার গানের লড়াই হত। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বাগবাজার জয়ী হত। 
  কবিগানের প্রচার ঘিরে বাঙালি মননে অ্যান্টনী ফিরিঙ্গি(পুরো নাম হেন্সমান অ্যান্টনি) ও বাগবাজারের ভোলাময়রার তরজা বা কবিলড়াই এক স্বর্ণোজ্জ্বল ঘটনা চিরচিহ্নিত। অ্যান্টনি অর্থাভাবে বাজনদার না পেয়ে নিজেই গান বাঁধতে শুরু করে ছিলেন। একটি তথাকথিত কবিগানের আসরে অ্যান্টনি ভোলা ময়রাকে ভগবতীরূপে কল্পনা করে গেয়ে ওঠেন –
      'ভজন পূজন জানি না মা
               জেতেতে ফিরিঙ্গি।
       যদি দয়া কর কৃপা কর
              হে শিবে মাতঙ্গী।'
  তখন ভোলা ময়রা এর জবাবে গেয়ে উঠলেন -
   'তুই জাত ফিরিঙ্গি জবড়জঙ্গী
   আমি পারব নাক তরাতে।
   তোকে পারব নাক তরাতে।
   শোনরে ভ্রষ্ট বলি স্পষ্ট
   তুই রে নষ্ট, মহাদুষ্ট
  তোর কি ইষ্ট কালী কেষ্ট
  ভজগে যা তুই যিশুখৃষ্ট
  শ্রীরামপুরের গির্জাতে।।'
  – এ মুখে মুখে তাৎক্ষণিক ছন্দবদ্ধ অনুপ্রাসে নির্ভুল প্রয়োগ এক কালজয়ী সৃষ্টি। এর উত্তরে অ্যান্টনি তত্ত্বের মোড়কে যা বলছিলেন সে এক অসামান্য রুচিশীলতার পরিচয় কবিগানকে স্বারস্বত সমাজে ঠাঁই করে দেওয়ার মত ছিল –
"সত্য বটে আমি জাতিতে ফিরিঙ্গী
 ঐহিক লোক ভিন্ন ভিন্ন
  অন্তিমে সব একাঙ্গী।'
  লৌকিক দেবদেবী ও লৌকিক জীবন একাকার হয়ে গিয়েছিল কবিগানে – কবিওয়ালাগণ তাই করেছিলেন। শুধু 'ওয়ালা' প্রত্যয় যোগ হওয়ায় সারস্বত কবিসমাজে ঠাঁই হয়নি সত্য কিন্তু সারস্বত সমাজ থেকে তাঁরা কোনো অংশে কম ছিলেন না। 
   সেযুগের লোকসাহিত্যে কবিগান স্থান করে নিয়েছিল।  রবীন্দ্রনাথ এর পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। কেননা তিনি লোকসংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক ছিলেন বলে। তাই কবিগানের প্রতি অকৃত্রিম টান অনুভব করতেন। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরও অন্যতম অনুরাগী ছিলেন। তিনি তাঁর 'জোড়াসাঁকোর ধারে' গ্রন্থে বলেছিলেন ভুবনবাঈ বলে একটি বুড়ি আসতেন তাঁদের বাড়িতে। মা তাঁকে বউদের গান শোনাতে বলতেন। বুড়ী তখন কবিগানের সখীসংবাদ থেকে গান গেয়ে শোনাতেন।
  এই কবিগান আঠারো শতকের মধ্যভাগ থেকে গোটা উনিশ শতক জুড়ে নাগরিক কলকাত্তাই জীবনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছিল স্বচ্ছন্দ বিচরণ। এর পৃষ্ঠপোষকতায় যেমন কিছু ধনাঢ্য ব্যক্তির চরম আগ্রহে জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পেয়েছিল তেমনি তাদের উন্নাসিকতায় নগর কলকাতায় আবার কবিগান পেছন সারিতে চলে যায়। কারণ উঠতি বাবুসমাজের কাছে গালমন্দ সহ্য হচ্ছিল না। পাশ্চাত্য শিক্ষা তাদের নতুন পথে চলতে বলছিল বলে।  
     উনবিংশ শতাব্দীর থিয়েটার শিল্পের জনপ্রিয়তায় কবিগান কলকাতা ছেড়ে বিশ শতক থেকে থেকে পূর্ববঙ্গে আশ্রয় লাভ করেছিল। পশ্চিমবঙ্গ কবিগানের জন্ম হলেও পূর্ববঙ্গে এখন দর বেশী।

              ****
#কপিরাইট রিজার্ভ ফর মৃদুল কুমার দাস।

প্রিয় গ্রন্থ

গ্রন্থালোচনা
✍️ডা: অরুণিমা দাস

গ্রন্থের নাম - শিখণ্ডী
লেখিকার নাম - দেবারতি মুখোপাধ্যায়

সদ্য সদ্য পড়ে শেষ করেছি *শিখণ্ডী* নামক উপন্যাস টি। বেশ ভালো লেগেছে। বইটি কিনেছিলাম, কারণ নামটি বেশ আকৃষ্ট করেছিল মনকে। আরও একটি কারণ ছিল অবশ্য,পুরাণের গল্পের প্রতি একটা টান।কিন্তু বইটি পড়ে বুঝতে পারলাম শুধু পুরাণ নয়,বইটি প্রতিহিংসা, কামনা,সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে সমাজ এবং সবশেষে থ্রিলার এর ওপর নির্ভর করে রচিত হয়েছে।

সারাংশ : মহাভারতের অনেক চরিত্রের কথা আমরা জানি, কিন্তু কিছু কিছু এমন চরিত্রও ছিল যাদের ওপর বিশেষ আলোকপাত করা হয়নি কোনোদিনই। সেরকম একটি উপেক্ষিত চরিত্র ছিল শিখণ্ডী, যে আজও মানুষের মনে কিছুটা হলেও দাগ কাটে ভীষ্মহন্তা বলে। আর এই উপন্যাসে সেই শিখণ্ডী র চরিত্র কে ফুটিয়ে তুলতে মিতু নামক একজনকে আনা হলো, যে কিনা শিখণ্ডী র মত ক্লীব বা আজকের সমাজের চোখে বৃহন্নলা। মিতু ছোটবেলায় একটি আশ্রমে থেকে মানুষ হচ্ছিলো, বড়ো হবার সাথে সাথে বাহ্যিকতায় ওর মধ্যে পুরুষালী গুণাবলী দেখা গেলেও অন্তঃস্থলে নারীর বৈশিষ্ট বিরাজমান ছিল। আশ্রমের অনেকেই ওর সাথে অভব্য আচরণ করেছিল কিন্তু তাও মিতু হেরে যায়নি জীবন যুদ্ধে। অনেক লাঞ্ছনা, গঞ্জনা সহ্য করে নার্সিং ট্রেনিং নেওয়ায় নিজেকে নিয়োজিত করেছিল। শহরে যখন একটি মেসে এসে থাকতে শুরু করেছিল মিতু, পাশে পেয়েছিল সাহানার মতো এক বন্ধুকে যে সবসময় মিতুর ছায়া সঙ্গী হয়ে থাকতো। এই বন্ধুত্বের জন্যই শেষ পর্যন্ত মিতু ধরিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিল আশ্রমের খারাপ লোক গুলো কে। 
একটা সাবলীল ভাষায় দুই সময়ের সমান্তরাল ধারাবাহিকতা অব্যাহত রেখে উপন্যাসের শেষে রয়েছে একটি দারুন সামাজিক বার্তা যা পাঠক মনকে নাড়া দিয়ে যায়। সমাজের সব চেয়ে উপেক্ষিত শ্রেণীকে নিয়ে যে এত ভালো কিছু লেখা যায়, তার জন্য লেখিকা কে কুর্নিশ জানাই। 
সাধারণ মানুষ মহাভারতে পঞ্চপাণ্ডব আর দৌপ্রদীকে যে চোখে দেখে এসেছে সেই দৃষ্টি পুরোদস্তুর ঘুরিয়ে দিয়ে অন্য একটি দিক আবিষ্কার করতে সাহায্য করবে এই যুগের পাঠক সমাজকে। 
মহাভারত না পড়লেও অনেকেই ঠাকুমা বা দিদার কাছে গল্প নিশ্চই শুনেছেন। কিন্তু সেই গল্প গুলো সবসময় একই দৃষ্টিভঙ্গী থেকে দেখা হয়েছে। পঞ্চ পাণ্ডব যেমন সর্বদা শ্রেষ্ঠ,দৌপ্রদী সতী,কৌরবরা খল নায়ক, শিখণ্ডী দুর্ভাগ্যের স্বীকার প্রভৃতি। কিন্তু এই উপন্যাসে লেখিকা মহাভারতের চরিত্র গুলোকে অন্য দৃষ্টিভঙ্গী দিয়ে ব্যাখ্যা করেছেন। 

সবশেষে বলবো পুরাণ আর থ্রিলারের সংমিশ্রণে উপন্যাসটি অন্য এক মাত্রা পেয়েছে আর বইটির প্রতি পরতে পরতে একটা রহস্য লুকিয়ে রয়েছে যেটা সত্যিই প্রশংসার দাবী রাখে।

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

বুধবার, ২ ফেব্রুয়ারি, ২০২২

ব্যারাম কি নৌটাঙ্কি


 ব্যারাম কি নৌটাঙ্কি
✍️ডা: অরুণিমা দাস 

অনিতা দেবীর জীবনের অনেক পুরনো সমস্যাটা আবার নতুন করে দেখা দিয়েছে। মাঝ বয়স পার হবার পর মাথার চুল গুলো পত্র পাঠ বিদায় নিতে পারলেই বাঁচে,এরম অবস্থা হয়েছিল। একমাত্র ছেলে তার কষ্টটা বুঝেছিল। নেট সার্চ করে,বান্ধবী অর্ঘমার  সাথে কনসালট করে দোকান থেকে দামী অ্যান্টি হেয়ার ফল শ্যাম্পু কিনে দিয়েছিল মাকে। সেটা ব্যবহার করে প্রথম তিন চার মাস ভালোই ফল পেয়েছিলেন অনিতা দেবী। স্বামী সমীর বাবুর কানটাও আরামে ছিল কদিন, গিন্নীর ঘ্যান ঘ্যানানি শুনতে হয়নি কটা দিন। 
কিন্তু দিন কতক হলো রোজ অনিতা দেবী কাদো কাঁদো মুখ করে আয়নার সামনে দাঁড়াচ্ছেন আর নিজের চুল পড়া নিয়ে স্বামীর মাথা খাচ্ছেন। সমীর বাবু বললেন বয়স হচ্ছে, দু একটা চুল না হয় উঠেই গেছে। এতে কি আর এমন সমস্যা হলো!! অনিতা দেবী ঝাঁঝিয়ে উঠে বললেন নিজের তো মাথা পরিষ্কার, তাই খুব করে চাও যাতে আমার চুল গুলো উঠে যাক, তাই না!! বুঝি সব বুঝি, হিংসুটে লোক একটা। আর দু একটা চুল নয়, রোজ পঞ্চাশ টা করে চুল উঠছে। ওয়েটিং ফর সেঞ্চুরী, বললেন সমীর বাবু। কি বললে?? চেঁচিয়ে উঠলেন অনিতা দেবী। না কিছু না, এই ক্রিকেট দেখছি, কোহলির সেঞ্চুরি র কথা বলছিলাম আর কি!! তা ছেলেকে বল, হবু বৌমা অর্ঘমার সাথে কনসাল্ট করে আবার যদি কিছু সাজেস্ট করে। হ্যা আমার ছেলে আর হবু বৌমাই বোঝে আমার কষ্টটা। ওর দেওয়া শাম্পু ইউস করেই অনেকটা চুল পড়া কমেছিল। আবার যে কি হলো!! দেখি আজ মেয়েটাকে কল করবো, যদি নতুন কিছু আইডিয়া দেয়। দেখো ওরা ব্যস্ত মানুষ, সামনে আবার বিয়ে, ওদের এসব নিয়ে এখন বিরক্ত কোরো না গিন্নী। তুমি চাও ছেলের বিয়েতে আমি ফাঁকা মাথায় ঘুরে বেড়াই, তাই তো?? তোমার যা মন চায় করো, এই চুল পড়া ব্যমোর জন্য কিছুদিন পর তোমার ছেলে বৌমাও তোমাকে টা টা বলবে। এসব শুনে কিছুক্ষন ফ্যাচ ফ্যাচ করলেন অনিতা দেবী। 
 দুপুর বেলা লাঞ্চ করে যখন সমীর বাবু ঘুমিয়ে পড়েছেন, সেই সুযোগে হবু বৌমা অর্ঘমা কে ফোন লাগলেন অনিতা দেবী। ওপাশ থেকে মিষ্টি গলা ভেসে এলো, বলো উড বি মাদার ইন ল!! শোনো না তুমি কি ব্যস্ত!! না না এই ডিউটি সেরে বাড়ী ফিরছি, বল না তুমি। নিজের দুঃখের কথা সবিস্তারে বললেন অনিতা দেবী। অর্ঘমা শুনে বললো আমায় তো অভি বললো তোমার চুল এখন অনেক কম পড়ছে। অনিতা দেবী বললেন তোমার দেওয়া শ্যাম্পু আর সেরাম না কি সব! ব্যবহার করে অনেক কমেছিল চুল পড়া, কিন্তু জানো দিন ছয়েক হলো আবার সমস্যাটা বেড়েছে। ওই শ্যাম্পু ইউস করেও কিছু হচ্ছেনা আর। আর অভির বাবা কান দিচ্ছে না আমার কথায়। তুমি আর অভি ছাড়া কেউ বোঝে না আমার কষ্ট। আচ্ছা কেঁদো না তুমি, আমি একটু ফ্রেন্ডস দের সাথে কথা বলে নিই তারপর তোমায় জানাচ্ছি। আচ্ছা, বলে ফোন রেখে দিলেন অনিতা দেবী। যাক আসল জায়গায় সমস্যা বলে দিয়েছি, এবার সমাধান নিশ্চই দেবে অর্ঘমা। 
এদিকে অর্ঘমা বন্ধুদের সাথে কথা বলে জানতে পারলো যে প্রথম প্রথম শ্যাম্পু ভালো কাজ করলেও কিছুদিন পর রেজিস্ট্যানসের জন্য আবার পুরোনো অসুখ ফিরে আসে। ওর বন্ধু এবার ওকে দামী হারবাল শ্যাম্পু আর স্পেশাল হেয়ার কন্ডিশনার সাজেস্ট করে। অর্ঘমা সব নোট করে নেয় আর ফোন লাগায় হবু মাদার ইন ল কে। অনিতা দেবী ফোন ধরতেই অর্ঘমা বলে রেডী হয়ে নাও, আমি আধঘন্টার মধ্যে আসছি, তোমায় নিয়ে শপিং যাবো। আর তোমার সমস্যার জন্য নিউ সলিউশন পেয়েছি, রাস্তায় যেতে যেতে সব বলবো। আধ ঘন্টার মধ্যে গাড়ি নিয়ে হাজির অর্ঘমা। সমীর বাবুকে না জানিয়ে বেরিয়ে পড়লেন অনিতা দেবী। ডাইনিং টেবিলে রেখে গেলেন একটি চিরকুট। রাস্তায় যেতে যেতে অর্ঘমা অনেক সান্তনা দিল হবু স্বামীর মাকে। তারপর শপিং মলে গিয়ে দেদার কেনা কাটা। স্পেশাল শ্যাম্পু কন্ডিশনার সব কেনা হলো। সাথে নিজের কিছু সাজগোজের জিনিস, হেয়ার কেয়ার প্রোডাক্ট কিনলো অর্ঘমা। তারপর সোজা অনিতা দেবীকে বাড়িতে নামিয়ে দিয়ে জিনিস পত্র পৌঁছে দিয়ে অর্ঘমা চলে গেলো নিজের বাড়ী। বাড়ি ঢুকতেই সমীর বাবুর একগাদা প্রশ্নের সম্মুখীন হলেন অনিতা দেবী। সব খুলে বলার পর সমীর বাবু বললেন সেই মেয়েটাকে বিরক্ত করলে তুমি!! আহা মেয়েটা খুব ভালো গো, আমার কষ্টটা বুঝেছে, এবারে সব অন্য জিনিস কিনে দিয়েছে। বললো এগুলো ইউস করো, চুল পড়ার সমস্যা কমে যাবে। রাতে অভি বাড়ি ফিরতেই অনিতা দেবী সব বললেন। শুনে অভি বললো, বেশ তো!! এবার তোমার বৌমা কে নিয়েই বেরিয়ে পড়তে পারো মাঝে মাঝে।রাতে অভি অর্ঘমাকে মেসেজ করলো আমার মায়ের এত টা খেয়াল করার জন্য অনেক ধন্যবাদ তোমাকে। 
পরদিন সকালে অনিতা দেবী চুলে শ্যাম্পু করে যখন আয়নার সামনে দাঁড়ালেন চুল আঁচড়াতে, চিরুনি বসাতেই গুচ্ছ গুচ্ছ চুল হাতে উঠে এলো। আস্তে আস্তে সব চুল গুলোই ঝড়ে গেলো। ঠিক তখনি তাঁর ফোনে অর্ঘমার নাম্বার ভেসে উঠলো, ফোন ধরে অনিতা দেবী কিছু বলার আগেই অর্ঘমা বললো শোন না মাম্মা,কাল ভুল করে আমার আর তোমার কসমেটিকস আর শ্যাম্পুর ব্যাগ এক্সচেঞ্জ হয়ে গেছিলো। তুমি কিন্তু ওই ব্যাগের কিছু ইউস করো না। অনিতা দেবী চেঁচিয়ে বললেন আগে বলবে তো??শ্যাম্পু করে চুল আঁচড়ানোর সময় আমার বাকি চুলগুলোও পড়ে গেছে সব। অর্ঘমা বললো কি বলছো!! তুমি এত সকালে শ্যাম্পু করেও নিলে!! ওহ গড।পাশ থেকে সমীর বাবু ফোনে বললেন শোনো অর্ঘমা,তোমার মাম্মা উচ্ছাসের সাথে হেয়ার রিমুভাল ক্রিমকে মাথায় লাগিয়েছেন নিউ ব্র্যান্ডেড শ্যাম্পু ভেবে।সব শুনে অর্ঘমা হাসবে না কাঁদবে বুঝতে পারলোনা। সমীর বাবু মুচকি হাসি দিয়ে অনিতা দেবীকে বললেন যে কটা চুল ছিলো,খোয়ালে তো!!এই জন্য বলতাম চুল উঠছে,চুল ঝরছে এই বাতিক গুলো ছাড়ো। যাইহোক এরপরের অবস্থা আরও করুন ছিল। অনিতা দেবী চুলের শোকে নাওয়া খাওয়া ত্যাগ করলেন। অভি অফিস থেকে ফিরে সব জানার পর বললো আচ্ছা আমি অর্ঘমার সাথে কথা বলছি, যতদিন না তোমার চুল গজাচ্ছে....আমাদের বিয়ে টা না হয় মার্চে না হয়ে নভেম্বরেই হবে।রাতে অর্ঘমা ফোন করলো অনিতা দেবীকে,বললো চিন্তা করো না মাম্মা,তোমার চুল গজানো অবদি আমরা অপেক্ষা করবো,অভি বলেছে আমায়। অনিতা দেবী এখন অপেক্ষা করছেন কবে তার মাথায় চুল গুলো গজাবে আর নভেম্বর মাসের জন্য, যখন তার বাড়ির লক্ষী হয়ে চিরদিনের মতো আসবে অর্ঘমা।
 
--- ©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস 🌞🌞🌞

মঙ্গলবার, ১ ফেব্রুয়ারি, ২০২২

#নাম - সাবিত্রী চেতনায় রবীন্দ্রনাথ। ✍️ - মৃদুল কুমার দাস।

 বিষয় -নিবন্ধ।
নাম- 'সাবিত্রী চেতনায় বিশ্বকবি'
  ✍️ - মৃদুল কুমার দাস।

  

  বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'পূরবী' (১৯২৫) কাব্য ও তার 'সাবিত্রী' (১৯২৪ এর ২৬ সেপ্টেম্বর) কবিতা শ্রেষ্ঠ কবিতাগুলোর মধ্যে একটি অন্যতম। কবিতাটি চিরকালীন নিবিড় পাঠের অনুপ্রেরণা হিসেবে গণ্য। কবিতাটির মূল্যায়ণের গুরুত্ব পাঠকের কাছে কোথায়  দাঁড়িয়ে, তাহলে দেখা যাক।
  ১৯২৪ খ্রীস্টাব্দের প্রথম সপ্তাহে শান্তিনিকেতন থেকে এলেন কলকাতায় 'অরূপরতন' নাটকটি অভিনয়ের জন্য। ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস কবির পিছু নিয়েছিল। কিন্তু ততটা সুস্থ না হওয়ার আগেই কবির দক্ষিণ আমেরিকার পেরুর শতবার্ষিক স্বাধীনতা উৎসবের আমন্ত্রণ রক্ষার জন্য পবিত্র কর্তব্যের কাছে শরীর যেন তুচ্ছ জ্ঞাণ হল। এমন ভাব ও শরীর থাকলে খারাপ হবে। তাবলে এমন সুযোগ হাত ছাড়া হলে অনেক ক্ষতি। অসুস্থ শরীর নিয়ে ১৯ সেপ্টেম্বর ১৯২৪ এ জাহাজে উঠলেন। ১১ অক্টোবর ১৯২৪ ফ্রান্সের ভার্সাই বন্দরে পৌঁছনোর এই মধ্যবর্তী সময়ে কবির মানসিকতায় 'সাবিত্রী' কবিতার জন্ম।কলম্বো থেকে কবির পিছু নিল বর্ষার প্রাকৃতিক দুর্যোগ। এই অভিজ্ঞতা থেকে শুরু করলেন 'পশ্চিম যাত্রীর ডায়রী' লেখা। ২৪ সেপ্টেম্বর কবি লিখছেন - "সকাল আটটা। আকাশে ঘন মেঘ। দিগন্ত বৃষ্টিতে ঝাপসা। বাদলার হাওয়া খুঁতখুঁতে ছেলের মতো কিছুতেই শান্ত হতে চাচ্ছে না। বন্দরের সান বাঁধানো বাঁধের ওপারে দুরন্ত সমুদ্র লাফিয়ে লাফিয়ে গর্জে উঠছে, কাকে যেন ঝুঁটি ধরে পেড়ে ফেলতে চায়। নাগাল পায় না।.... বাদলরাজের কালো উর্দিপরা মেঘগুলো দিকে দিকে টহল দিয়ে বেড়াচ্ছে। আচ্ছন্ন সূর্যের আলোয় আমার চৈতন্যের স্রোতোস্বিনীতে যেন ভাঁটা পড়ে গেছে। জোয়ার আসবে রৌদ্রের সঙ্গে সঙ্গে।" এই পরিবেশে কবি ২৬ সেপ্টেম্বরে লিখলেন 'সাবিত্রী' কবিতাটি। বন্ধু সম্বোধনে সূর্যকে আহ্বান করে লিখছেন -
"ঘন অশ্রুবাষ্পে ভরা মেঘের
       দুর্যোগে খড়্গ হানি  
          ফেলো,ফেলো টুটি।
হে সূর্য,হে মোর বন্ধু, জ্যোতির
             কনকপদ্মখানি 
            দেখা দিক ফুটি।"
  কবিতাটি সূর্যেকে নিয়ে অসামান্য আবাহণ সঙ্গীত। এই কথা 'পশ্চিম যাত্রীর ডায়রী'তে উল্লেখ করেছেন -
   "সূর্যের আলোর ধারা তো আমাদের নাড়ীতে নাড়ীতে বইছে। আমাদের প্রাণ-মন, আমাদের রূপ- রস সবই তো উৎসরূপে রয়েছে ঐ মহাজ্যোতিষ্কের মধ্যে। সৌরজগতের ভাবীকাল একদিন তো পরিকীর্ণ হয়েছিল ওরই বহ্নি বাষ্পের মধ্যে। আমার দেহের কোষে কোষে ঐ তেজই তো শরীরী, আমার ভাবনার তরঙ্গে তরঙ্গে ঐ আলোই তো প্রবহমান। বাহিরে ঐ আলোর বর্ণচ্ছটায় মেঘে মেঘে পত্রে,পুষ্পে পৃথিবীর রূপ বিচিত্র; অন্তরে ঐ তেজই মানসভাব ধারণ করে আমাদের চিন্তায় ভাবনায়,বেদনায় রাগে অনুরাগে রঞ্জিত।.... বনস্পতির শাখায় শাখায় স্তব্ধ ওঙ্কারধ্বনির মতো সংহত হয়ে আছে।... আমার পরিচয় তোমার আলোকে আলোকে উদ্ঘাটিত হোক।"
   কবির এই সাবিত্রী ভাবের উৎসটি কী? সূর্য আর সাবিত্রী ভাবের চেতনার অন্বয়সাধনটি হলো - 
    সাবিত্রী হলো সূর্য তথা সূর্যের রশ্মি। সাবিত্রীর অন্য অর্থ গায়ত্রী। বৃহদারণ্যক উপনিষদে বলা হয়েছে - "গায়ত্রীমেব সাবিত্রীমনুব্রুয়াৎ.."- সময়ভেদে এই গায়ত্রীর তিন রূপ - প্রাতঃকালে- গায়ত্রী,মধ্যাহ্নে - সাবিত্রী,সায়াহ্নে - সরস্বতী।
  রবীন্দ্রনাথের পিতৃদেব মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে গায়ত্রী মন্ত্র ছিল উপাসনার মন্ত্র। পিতৃদেবের কাছ থেকে এই অমূল্য রত্ন কবিরও অন্যতম প্রাপ্তি যোগ ঘটেছিল। এর সারমর্ম সম্পর্কে কবি বলতেন - "এই মন্ত্রটিকেই  ভারতবর্ষ তার সমস্ত পবিত্র শাস্ত্রের সারমর্ম বলে গ্রহণ করেছে। কেননা বিশ্বপ্রকৃতি ও মানবচিত্ত এই দুইকে এক করে মিলিয়ে আছেন যিনি তাঁকে এই দুয়েরই মধ্যে এক রূপে জানবার ধ্যানমন্ত্র হল গায়ত্রী।"
  তিনি আরো বলেছেন - "যিনি বিশাল বিশ্বের সমস্ত বৈচিত্রের মধ্যে রূপ-রস-গীত-গন্ধ এর নব নব রহস্যকে নিত্য নিত্য জাগিয়ে তুলে সমস্তকে আচ্ছন্ন করে রয়েছেন তাঁকেই আত্মার অন্তরতম নিভৃতে নিবিড়ভাবে উপলব্ধি করার কত আনন্দ! এই উপলব্ধি করার মন্ত্রই হচ্ছে গায়ত্রী। অন্তরকে এবং বাহিরকে ,বিশ্বকে এবং আত্মাকে একের মধ্যে যোগযুক্ত করে এই জানাই হচ্ছে এই মন্ত্রের সাধনা।"
    এখানে দু'টি কথা খুব স্মরণীয়। আমাদের ঋষি প্রার্থণা করেছেন - 'তমসোঃ মা জ্যোতির্গময়ঃ...', আবার ঈশোপণিষদ বলেছে - "হে পূষণ, তোমার ঢাকা খুলে ফেল,সত্যের মুখ দেখি; আমার মধ্যে যিনি সেই পুরুষ তোমার মধ্যেও..."।
  'পশ্চিম যাত্রীর ডায়রি'-তে সেই একই কথা বলেছেন - "এই বাদলার অন্ধকারে আজ আমার মধ্যে যে ছায়াচ্ছন্ন বিষাদ, সেই ব্যাকুলতারই একটি রূপ। সেও বলছে,হে পূষণ তোমার ঢাকা খুলে ফেলো, তোমার জ্যোতির মধ্যে আমার আত্মাকে উজ্জ্বল দেখি। অবসাদ দূর হোক। আমার চিত্তের বাঁশিতে তোমার আলোকের নিঃশ্বাস পূর্ণ করো - সমস্ত আকাশ আনন্দের গানে জাগ্রত হয়ে উঠুক। আমার প্রাণ যে তোমার আলোকেরই একটি প্রকাশ, আমার দেহও তাই। আমার চিত্তকে তোমার জ্যোতিরঙ্গুলি যখনই স্পর্শ করে তখনই তো 'ভূর্ভুবঃ সঃ' দীপ্যমান হয়ে ওঠে।"
     তাইতো বৈদিক মন্ত্রে সূর্য বন্দনার সাবিত্রী মন্ত্র - "ওম্ ভূর্ভুব স্বহাঃ/ তদসবিতুর বরেণ্যম/ ভর্গোদেবস্য ধিমহী/ ধিয়ো ইয়ো ন প্রচোদয়াৎ।।" 
  ২৬ সেপ্টেম্বরের ডায়রীতে কবি লিখেছেন - "কাল অপরাহ্নে আচ্ছন্ন সূর্যের উদ্দেশ্যে একটা কবিতা শুরু করেছি,আজ সকালে শেষ হল।"

 স্বয়ং কবির জবান বন্দি, তাঁর জন্মকালে প্রথম প্রত্যুষে , এই জাগরণ মন্ত্রেই তিনি দীক্ষিত হয়েছেন-  
     "মোর জন্মকালে/ প্রথম
প্রত্যুষে মম তাহারি চুম্বন দিলে আনি/ আমার কপালে।"- এখানে 'চুম্বন' শব্দটিতে কবি যেন দীক্ষিত,রবিরশ্মির প্রথম আলোর কবির কপালে স্নেহের চুম্বন যেন। এই "চুম্বন মন্ত্রে বক্ষে অজানা ক্রন্দন ওঠে জেগে/ ব্যথায় বিস্মিত।।" কবির সাবিত্রী কবিকে ক্ষণে ক্ষণে চেতনার মন্ত্র দিয়ে যেন জাগিয়ে তুলছে। আর আপনার মাঝে কবিমানস বিশ্বগত হয়ে উঠছে।

  কিন্তু মনে রাখতে হবে কবিতাটি ভক্ত-চিত্তের সাবিত্রী মন্ত্রোচ্চারণ নয়। সূর্য কবির কাছে 'আদি কবি'-
 ।"তমিস্রসুপ্তির কূ যে বংশী বাজাও,আদিকবি/ ধ্বংস করি তম/ সে বংশী আমারি চিত্ত;.... জীবনহিল্লোল।।"
  সৌরলোকে যে জ্যোতির প্রকাশ, আমাদের ধীশক্তিতে তারই প্রতিফলন ঘটে। আর কবি চিত্ত আদি কবির সেই বাঁশি। এই সুর জাগরণের। আর 'জীবনহিল্লোল' বংশীধ্বণিতে রন্ধ্রে রন্ধ্রে গুঞ্জরিত- 'মেঘে মেঘে বর্ণচ্ছটা', 'কুঞ্জে কুঞ্জে মাধবীমঞ্জরী', ' নির্ঝরে কল্লোল'। আর এই বাণী কবি চিত্তে যখন মর্মরিত হয় তখন কবি আদি কবির কাছে ঋণ স্বীকার করে বলে ওঠেন -
      "এ প্রাণ তোমারি এক ছিন্ন তান, সুরের তরণী - / আয়ুস্রোতমুখে/ হাসিয়া ভাসায়ে দিলে লীলাচ্ছলে,কৌতুকে ধরণী/ বেঁধে নিল বুকে।"

 শুরুতে মর্ত্যের কবি আদি কবি সূর্যকে সম্বোধন করেছিলেন  বন্ধু বলে। কবিতার শেষে বন্ধু হয়েছেন প্রিয়তম,অন্তরতম। কবিতার নবম স্তবকে কবির রাগিনী ছিল 'বিবাগিনি', 'একাকিনী', 'আলোর কাঙালি'। আর দশম স্তবকে কবি আদি কবির সঙ্গে মিলনের সঙ্গীত গাইলেন -
"দাও, খুলে দাও দ্বার,ওই তার বেলা হল শেষ- / বুকে লও তারে।/ শান্তি- অভিষেক হোক,ধৌত হোক সকল আবেশ/ অগ্নি- উৎসধারে।.... দিনান্তসঙ্গীতধ্বনি সুগম্ভীর বাজুক সিন্ধুর/ তরঙ্গের তালে।।" - এ যেন সেই 'গীতিমাল্য' কাব্যের একটি গানের সঙ্গে সমভাবাপন্ন - 
"তোমায় আমায় মিলন হবে বলে
     যুগে যুগে বিশ্বভুবনতলে 
পরাণ আমার বধূর বেশে চলে
            চির স্বয়ংবরা।"
 আদি কবি সূর্য বা সাবিত্রীর সঙ্গে পরাণসখা বন্ধু হে আমার, সেই বিরহের মাঝে অপূর্ব এক মিলনের সঙ্গীত। এখানেই সাবিত্রী কবির কাছে আদি কবির জন্য গায়ত্রী মন্ত্রোচ্চারণের মতো এক মহৎ সিদ্ধিতে কবি আদি কবির কাছে ঋণী হয়েছেন।

               ******
#কপিরাইট রিজার্ভ ফর।মৃদুল কুমার দাস।


    

#নাম - 'ক্রিপ্টোকারেন্সি' ✍️ - মৃদুল কুমার দাস।


  বিষয় - অশরীরী মূদ্রা।
  নাম - 'ক্রিপ্টোকারেন্সি'।
✍️ - মৃদুল কুমার দাস।

     নেট দুনিয়ার এক স্তম্ভ হয়ে হাতছানি চোখের সামনে চকচকে মূদ্রা যার পরিচয় অশরীরী মূদ্রা। ডিজিটাল মূদ্রা লেনদেনের বিজ্ঞাপন বিটকয়েন। একপ্রকার এক্সচেঞ্জ সংস্থা এই লেনদেন করে। ০১ বিটকয়েনের দাম ভারতীয় টাকায় প্রায় ৪৮ লক্ষ টাকা। এই মূদ্রার জনপ্রিয়তার কারন এতে লেনদেনকারীর পরিচয় গোপন থাকে। ব্যবহৃত হয় একপ্রকার সংকেতলিপি। অন্য ডিজিটাল লেনদেনে যেমন জানা যায় কার কাছ থেকে কার কাছে এল ও গেল,বিটকয়েনের ক্ষেত্রে তা হয় না। শুধু জানা যায় এক অ্যাকাউন্ট থেকে অন্য অ্যাকাউন্টে গেছে। তবে বিটকয়েন ভাঙিয়ে নগদ টাকা হাতে পেতে চাইলে তখন আর পরিচয় গোপন থাকে না।
  এই অর্থের উপর দেশের নিয়ন্ত্রণ থাকে না। তাই লোকসান হলে অভিযোগ জানানোর কোনো সুযোগ থাকে না। বিটকয়েন ওয়ালেট থেকে এই অর্থ লেনদেন হয়। সবটাই অনলাইনে। একে বলে বিটকয়েন ভল্ট বা লকার। লেনদেন বিটকয়েন টু বিটকয়েন। একবার চুরি গেলে পুলিশেরও সাধ্যি নেই একে খুঁজে বের করার।  বিটকয়েনের মোহে বিপুল সংখ্যক মানুষ তথা বর্তমান তরুন সমাজ প্রলোভিত হচ্ছে কারণ বিপুল মুনাফা। শুধু কি বাজারে বিটকয়েন, এছাড়াও ইথারিয়াম,ম্যাটিকের মত ডিজিটাল মূদ্রাও প্যারালাল জনপ্রিয়।
  কম্পিউটার বিজ্ঞানের বিশেষ শাখা ক্রিপ্টোলজি। এই ক্রিপ্টোলজি ব্যবহৃত হয়ে যে মুদ্রা তৈরি হয় তার নাম ক্রিপ্টোকারেন্সি। এই মূদ্রায় হাতে ছোঁয়ার উপায় নেই। অস্তিত্ব কেবল ভার্চুয়াল দুনিয়ায়। 'ব্লকচেন' নামে এক প্রযুক্তি দুনিয়ার বিভিন্ন প্রান্ত থাকা কম্পিউটারে নিয়ন্ত্রণ করে এই অশরীরী মূদ্রা। প্রতিটি লেনদেন ডিজিটাল ব্লকের মাধ্যমে চিহ্নিত থাকে। সেই ব্লকচেন ভেদ করা প্রযুক্তিগতভাবে ভেদ করা নাকি অসম্ভব, সেই আস্থার পক্ষে সওয়াল করে আসছে এ পর্যন্ত। তাই ভরসা জোগাচ্ছে। 
 এর বিপদ কম্পিউটারে বিশেষ ব্যক্তির মালিকানায় পাসওয়ার্ড সিস্টেমে বন্দী থাকে। যদি ঐ ব্যক্তির কোনো কারনে মৃত্যু হয় যদি পাসওয়ার্ড না জানা থাকে তাহলে সেই মূদ্রা অশরীরী হয়েই থেকে যাবে। তাকে আর কেউ খুঁজে পাবে না। অধূনা ঘটেছেও তাই। কোয়াড্রিগা নামে কানাডার এক আর্থিক সংস্থার বিটকয়েন, লাইটকয়েন ও এথেরিয়াম নামের তিন ধরনের ডিজিটাল মূদ্রার লেনদেনের ব্যবস্থা ছিল। প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন জেরাল্ড কটন। ২০১৯ সালে রাজস্থানের জয়পুরে এক অনাথ আশ্রমে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করতে এসে চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে হোটেলে লাশ হয়ে যান। তাঁর কোম্পানির সমস্ত অ্যাকাউন্টের পাসওয়ার্ড ছিল তাঁর জিম্মায়। আর সেই পাসওয়ার্ড ছিল কানাডায় তাঁর ব্যক্তিগত কম্পিউটারে। তাঁর সংস্থার নথিভুক্ত গ্রাহক তখন ছিল ৩,৬৩,০০০ জন। তার মধ্যে ক্রিপ্টোকারেন্সিতে টাকা রেখেছিলেন প্রায় ১,১৫,০০০ জন। টাকার পরিমান প্রায় ১০০০কোটি টাকা। এবার ঘটনা কি হতে পারে আগেই বলেছি। কানাডার সরকারি ব্যাঙ্কে কোনো নথি না থাকায় সরকার হাত তুলে দিয়েছে। বিপদ যা হওয়ার তাই হয়েছে। অতিলোভীর গলায় দড়ি আরকি।
   মুনাফার হাতছানি সংবরণ না করলে বিপদ আসে এভাবেই। বিটকয়েন ও অন্যান্য ডিজিটাল মূদ্রা যে ভাবে মুনাফার হাতছানি দিয়ে যাচ্ছে লোভ সংবরণ করা সত্যিই দুরুহ। মানুষ বড় লোভী।
                  *****

অনুগল্প


 বৃষ্টি নামার আগে
✍️ডা: অরুণিমা দাস 

বাইরে প্যাচপ্যাচে গরম,জৈষ্ঠ্য মাস চলছে তখন।  বেসরকারি হাসপাতালের লেবার রুমে রাউন্ড দিচ্ছেন নামকরা গাইনি ডক্টর রায়। বিকেলের দিকে আকাশের অবস্থা ভালো নয় দেখে এক প্রসূতি মা কে তার পরিবারের লোকেরা ভর্তি করিয়ে দিলেন ডক্টর রায়ের আন্ডারে। চেক করে ডাক্তার বাবু বললেন এখন তো বাচ্চা হবার সম্ভাবনা দেখছি না, আজ রাতে বা কাল সকালের দিকে হতে পারে। ওনার স্বামী বললেন বাড়িতে দেখার কেউ নেই সেরকম, এখানেই থাকুন উনি। আর প্রথম সন্তান তো, আমিও একটু ভয়ে আছি। ওকে উনি তাহলে আমার অবজারভেশনে থাকুন,বললেন ডা. রায়। সিস্টারকে নির্দেশ দিলেন কিছু ইনজেকশন আর স্যালাইন চালিয়ে দিতে,আর বলে গেলেন আজ রাতেই হয়তো ওনার প্রসব বেদনা উঠবে।আপনি কিন্তু কল করবেন আমায়। সিস্টার বললেন আচ্ছা স্যার। এরপর ওনার স্বামীকে বাড়ি যেতে বলে আশ্বস্ত করলেন ডা রায়। তারপর রাউন্ড দেওয়া শেষ করে ডা রায়ও বেরিয়ে গেলেন।
রাত তখন প্রায় দুটো, আকাশ কালো করে বিশাল মেঘের আনাগোনা চলছে, সাথে বিদ্যুতের ঝলকানি। সেই প্রসূতির তখন অল্প অল্প বেদনা উঠেছে, সিস্টার ফোন করলেন ডা রায় কে। লেবার রুমে নিয়ে যাওয়া হলো প্রসূতি মাকে।বাইরে তখন কালো অন্ধকার,আর টুপটাপ বৃষ্টি শুরু হয়েছে। মেঘের গর্জন তখন তুঙ্গে,লেবার রুমে সেই মহিলা তখন যন্ত্রণায় কাহিল আর মনে মনে ঈশ্বর কে ডাকছেন আর বলছেন, এত আকাশ কালো করা মেঘ আর ঝড় বৃষ্টি কেনো?? তাহলে কি আমার অনাগত সন্তানের জীবনেও এরকম অন্ধকার নেমে আসবে নাকি কোনোদিন?? কমিয়ে দাও এই ঝড় বৃষ্টি।এর মধ্যেই ডা: রায় এসে পৌঁছলেন হসপিটালে। 
সোজা চলে গেলেন লেবার রুমে, পরীক্ষা করে বললেন মা আপনার বাচ্চা হওয়ার দ্বার খুলে গেছে, আর দু তিন ঘন্টার মধ্যে আশা করি আপনার সন্তান ভূমিষ্ঠ হবে। মায়ের চোখের কোনে জল চিক চিক করছে, হয়তো কষ্টের হয়তো বা আনন্দের। সারারাত ঝড় বৃষ্টির তাণ্ডব চলতে লাগলো। ভোর ছটার দিকে সেই প্রসূতির যন্ত্রণা নিবারণ হলো, জন্ম নিল তার প্রথম কন্যা সন্তান। আর বাচ্চা ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর সেই মা দেখলো বাইরে পরিষ্কার আকাশ, সূর্য উঠেছে,পাখিরা ডাকছে। ডা. রায় এসে বললেন ম্যাডাম আপনার মেয়ে হয়েছে। সিস্টার এসে বললো আপনার স্বামীকেও দেখিয়েছি মেয়ের মুখ। মা তখন আলতো হেসে বললেন আচ্ছা। ডা: রায় জিজ্ঞেস করলেন মেয়ের নাম কিছু ঠিক করে রেখেছেন নাকি?? মেয়ের মা বললেন সারারাত আকাশ কালো করা মেঘ আর ঝড়বৃষ্টির পর যখন প্রথম সূর্যকে দেখলাম, তখনি আমার সন্তান পৃথিবীর আলো দেখলো। তাই আমি ওর নাম রাখবো এমন কিছু, যার মানে হয় ভোরের উদিত সূর্যের লাল আভা। ডা রায় হেসে বললেন বেশ জবরদস্ত নাম ভেবেছেন তাহলে। মেয়ের মা বললেন হ্যাঁ ডাক্তারবাবু, নাম ক্রমশ প্রকাশ্য। ডা: রায় হেসে বললেন ভাগ্যিস আপনার স্বামী একদম ঠিক সময়ে আপনাকে এখানে অ্যাডমিট করিয়ে দিয়ে গেছিলেন, নাহলে রাতে যা ঝড় বৃষ্টি হচ্ছিলো, তখন যন্ত্রণা উঠলেও আপনাকে ভর্তি করতে নিয়ে আসাটা খুব চাপের হতো। মেয়ের মা বললেন ঈশ্বর মঙ্গলময়, উনি যা করেন সর্বদা সবার ভালোর জন্যই করেন। দিন সাতেক পর ছুটি হয়ে যায় মা আর মেয়ের এবং সেই দম্পতি হাসি মুখে কন্যা সন্তান কে নিয়ে বাড়ি ফেরেন। 

সত্য ঘটনা অবলম্বনে। 🌞🌞🌞

শিরোনাম- বই সই✍️ ডা: অরুণিমা দাস

 শিরোনাম- বই সই ✍️ ডা: অরুণিমা দাস বই পড়ার উপকারিতা সম্পর্কে লিখতে গিয়ে কোন দিক থেকে শুরু করবো খেই হারিয়ে ফেলেছি। বই পড়লে শুধু জ্ঞানভান্...