রবিবার, ২৬ ডিসেম্বর, ২০২১

#শরৎ সাহিত্যে নারী -✍️ - মৃদুল কুমার দাস।

শরৎচন্দ্রের সাহিত্যে নারী:-
 শরৎচন্দ্রের (১৮৭৬-১৯৩৮) সাহিত্য-জীবনের তিনটি পর্ব - 
  ১. প্রাক রেঙ্গুন পর্ব ২. রেঙ্গুন পর্ব (১৯০৩ - ১৯১২) ৩. রেঙ্গুনোত্তর পর্ব (১৯১২- ১৯৩৮)। 
  রেঙ্গুন পর্বকে বলা হয় প্রস্তুতি পর্ব। এখানে কোনো সাহিত্য রচনা করেননি। শুধু পাহাড় প্রমান অভিজ্ঞতা অর্জন ছিল। ১৯১৪ থেকে 'বড়দিদি' দিয়ে শুরু হলো কথা সাহিত্যের জয়যাত্রা। শুরু করলেন পুরাতনকে ঘিরে ঘুরে ফিরে দেখা। যত এগিয়েছেন তত চরিত্র চিত্রণে নানা রূপান্তর ঘটিয়েছেন। এই প্রেক্ষাপটে দেখা যাক শরৎ- সাহিত্যে নারীর অবস্থান কেমন ছিল।
 সৃষ্টির প্রথম লগ্নে ভাগলপুরে বয়ঃসন্ধির কাল কেটেছে। এই সময় কোনো নারীকে ঘিরে দেহ-নিরপেক্ষ ভাবেই যৌনজীবন ও প্রেমজীবন গড়ে ওঠে। ১৭/১৮ যখন বয়স তখন ভাগলপুর,আর রেঙ্গুনে যখন তখন বয়স ২৬/২৭। 
 বালবিধবা নিরুপমা দেবীর বৈধব্য দুঃখ নিয়ে এলেন ১৮৯৭ এ ভাগলপুরে। আর তার সেই দুঃখ দেখে নারী চরিত্র পাঠের শরৎচন্দ্রের সূচনা হল। ভাগলপুরের জীবন থেকে একে একে উঠে এলো অনুপমার প্রেম, দেবদাস,কাশীনাথ, বড়দিদি,চন্দ্রনাথ,হরিচরণ,শুভদা প্রভৃতি।
 বিধবা নিরুপমার সঙ্গে ঘণিষ্ঠতা চেয়েও সংস্কারের বেড়াজালে শরৎ চন্দ্র থেকে নিরুপমা বিমুখ ছিলেন। এদের দুঃখ নিয়ে একে একে উঠে এলো 'বড়দিদি' মাধবী,'চন্দ্রনাথ'- এর গৃহত্যাগিনী সুলোচনা, অনুপমা সব একে একে বিধবার দু়ঃখ কথা। নারীর প্রেম যত খন্ডিত তত তাঁর হৃদয় হয়েছে মথিত, কেননা খন্ডিত প্রেমই জীবনকে ব্যথিত করে। তাই শরৎ সাহিত্যে নারীর পরিচয় অত্যন্ত সকরুণ। ১৯১২ থেকে ১৯৩৮ পর্যন্ত মেয়েদের নিয়ে তাই একটানা লিখে গেছেন। শরৎ- সাহিত্যের সকল নারী সাধারণ মেয়ে, মধ্যবিত্ত,নিম্নমধ্যবিত্ত ঘরের সন্তান। কেউ বা নিম্নবর্গের, কিংবা সমাজের দৃষ্টিতে ভ্রষ্টা। পতিতা,বিধবা,বৈষ্ণবী,সতী,অরক্ষনীয়া অথবা বিবাহ বহির্ভূত প্রেম - তা যেমনটাই হোক না কেন শরৎচন্দ্র তাদের প্রেমে অভিভূত হয়ে থাকতেন। তারই ফসল নারী চরিত্র অঙ্কনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত নিঁখুত।
   'বড়দিদি'(১৯১৪) থেকে 'শেষের পরিচয়'(১৯৩৮) - ২৩ খানা উপন্যাসে একের পর এক নারী চরিত্র নির্মানে তিনি ছিলেন অক্লান্ত এক কথা সাহিত্যিক। যেমন সহজ বিষয়, তেমনি কি সহজ ও সুন্দর ভাষা!
   'গৃহদাহ' র অচলা,, অন্যদিকে মৃণাল, 'চরিত্রহীন'এ একদিকে সাবিত্রী, অন্যদিকে কিরণময়ী,'বিন্দুর ছেলে'র বিন্দুবাসিনী,' 'পথের দাবী'র ভারতী, 'মেজদি'র হেমাঙ্গিনী,' 'নিষ্কৃতি'র শৈলজা,'দেবদাস' এর চন্দ্রমুখী,'শুভদা'র কাত্যায়নী' 'আঁধারে আলো'র বিজলীর মতো বারবণিতাকে নিয়ে আখ্যানের  সরলতা, তাদের হৃদয় সৌন্দর্য পাঠককে যুগ যুগ ধরে মুগ্ধ করে আসছে। 
 শরৎচন্দ্রের মতে 'পাপকে ঘৃণা করো পাপীকে নয়',তারই প্রমাণে বহু কুলত্যাগিনী বঙ্গ রমণী পেয়েছিল তাঁর লেখনীতে সহমর্মিতা। তিনি দেখেছিলেন শুধু বিধবারা কুলত্যাগ করেনি, অনেক সধবাও এই পথে এসেছে। অধিকাংশই এসেছে দারিদ্র্য অথবা স্বামীগৃহের অত্যাচার, উৎপীড়নের কারণে। পুরুষ শাসিত সমাজে কেবল নারীদের দোষ দেখানো হয়। তিনি 'নারীর মূল্য' প্রবন্ধে বলেছিলেন - "সমাজ নারীর ভুল ভ্রান্তি এক পাইও ক্ষমা করে না, কিন্তু পুরুষের ষোলো আনাই ক্ষমা করিবে।" প্রচলিত হিন্দু সমাজের রীতি নীতির প্রতি তীব্র অনাস্থা থেকে নারীর প্রতি সহানুভূতিতে তিনি অবিচল ছিলেন।
 পতিতারা তাদের প্রেম, প্রেমের একনিষ্ঠতা ও সেবাপরায়ণতার পরিচয় দিয়েছে। পিয়ারী বাঈ বাল্য প্রণয়ের টানে আজীবন শ্রীকান্তনিষ্ঠ থেকেছে। সাবিত্রী ও সতীশের মধ্যে চলে প্রেমের নানা খেলা,চন্দ্রমুখী অনুরক্ত হয়ে থাকে দেবদাসের প্রতি,বিজলি সত্যেন্দ্রের প্রেমে পড়ে পেশা ছেড়ে বলে - "যে রোগে আলো জ্বাললে আঁধার মরে,সূর্য উঠলে রাত্রি মরে - আজ সেই রোগেই তোমাদের বাঈজী চিরদিনের মতো মরে গেল।"
 বাস্তবে দেখা যায় এই বারবণিতারা ব্যক্তি বিশেষের কাছে আস্থাভাজন হয়, কিন্তু সামাজিক সম্মান অর্জন করেনি। প্রেমের সামাজিক স্বীকৃতি সম্ভব হয়নি বলেই শরৎচন্দ্র লিখলেন - "বড় প্রেম শুধু কাছে টানে না,ইহা দূরেও ঠেলিয়া দেয়।" 
 তাই দেখি সতীশ জীবনসঙ্গিনী হিসেবে সহধর্মিণী গ্রহন করার অধিকার পায়না,কারণ হিন্দুধর্মে বিধবা বিবাহ পাপ। তাই সাবিত্রী প্রত্যাখ্যাতা হয়। এই ভাবে রাজলক্ষ্মী,কমললতা,অন্নদা দিদি সমাজকে অস্বীকার করে ছিটকে আসতে চেয়েছে, কিন্তু সমাজের তুচ্ছ সংস্কারের মোহ ছাড়তে পারেনি। যেমন- 'গৃহদাহ' এর অচলাকে তিনি নৈতিক হিন্দু ধর্মে প্রতিষ্ঠা দিতে পারেননি,কারণ বিবাহোত্তর নারীর প্রেম সমাজ- বিরুদ্ধ কাজ। স্বামীর প্রতি হৃদয়ের একাগ্রতা হারানো অপরাধ। একনিষ্ঠতার অভাব পাপাচার। রুগ্ন মহিমকে একা গাড়িতে ফেলে সুরেশের একা অচলাকে নিয়ে পালিয়ে যাওয়া সমাজ বরদাস্ত করেনি, সমাজের চোখে সুরেশ ঘৃণিত। অচলাও স্বামীর প্রতি সেবাপরায়ণ মনোভাব দেখাতে পারেনি। পারেনি স্বামীর প্রতি দেহ মন প্রাণে পূর্ণাঙ্গরূপে সমর্পিত হতে। আর এর কারণে তার শেষ পরিণতি নিরাশ্রয়তা। সমাজ থেকে বিচ্ছিন্নতা।
 এইভাবে সমগ্র সাহিত্য জুড়ে নারীই যেন শরৎ-সাহিত্যের নানা গতিপ্রকৃতিতে মুখর হয়েছে। নারীর জন্যই যেন কলম ধরতে বাধ্য হয়েছিলেন। আর তারই ফলস্বরূপ দ্রুত নারী জাগরণ যে এসেছে এ আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
          #____#

শুক্রবার, ২৪ ডিসেম্বর, ২০২১

#কপিরাইট ও বৈষম্য -✍️ মৃদুল কুমার দাস।

# নাম- কপিরাইট ও বৈষম্য। 
      (২ফেব্রুয়ারী,২০২১)
    যে কোনও জাতির বুনিয়াদ গড়ায় ভাষা প্রধান হোতা। ভাষা আমরা যত বলি,তার চেয়ে কম লিখি,তারও চেয়ে কম পড়ি। কেউ কেউ আবার বই দিয়ে ড্রইং রুম সাজান। 
    গ্রন্থপাঠক,গ্রন্থগ্রাহক - দু'য়ের যোগফল হল বিশ্বের গ্রন্থগরীমা। আর এই দু'য়ের সংযোগ সেতু গ্রন্থ-কারবারী। এই তিনের গতিপ্রকৃতিতেই বিশ্বে গ্রন্থ-সাম্রাজ্য চালিত হয়। তবে এই সাম্রাজ্যে এই তিনের অভিমুখ তিন রকম। গ্রন্থ-কারবারীদের দ্বারা দেশের পুঁজিবাদী শক্তির একটা অংশ প্রভাবিত হয় নিঃসন্দেহে। প্রমাণ ইউরোপ। ইউরোপে গ্রন্থপাঠকের সংখ্যা সবচেয়ে বেশী। আর ঠিক এই জায়গায় দাঁড়িয়ে কপিরাইট যে অর্থনৈতিক বৈষম্যের মূলে কীভাবে আছে তা জলের মতো পরিষ্কার।ভাষা,সাহিত্য,পাঠক,ক্রেতার চাহিদাকে গ্রন্থ প্রকাশক ও বিক্রেতা যেমন বুঝবেন,তেমনই দেশের অর্থনৈতিক বুনিয়াদের একটা অংশের সুরাহা হয়ে থাকে। প্রমাণ ইউরোপ। ইউরোপে গ্রন্থপাঠকের সংখ্যা সবচেয়ে বেশী। আর ঠিক এই জায়গায় দাঁড়িয়ে কপিরাইট যে অর্থনৈতিক বৈষম্যের মূলে কীভাবে আছে তা জলের মতো পরিষ্কার।
   আন্তর্জাতিক বাজারে কপিরাইটও অর্থনৈতিক বৈষম্যকে আরও দৃষ্টিকটু করেছে। ছোট ছোট দেশ,পিছিয়ে পড়া দেশে ভাষা ও সাহিত্য চর্চা প্রকাশক ও বিক্রেতার মত,বইয়ের কপিরাইট  উঠে গেলে মুনাফা বেশী হবে।
    বাংলা বইয়ের বাজারের এখানেই গন্ডগোল। বাজার সীমিত। ক্রেতার পকেটে টান। আর মুনাফাখোরদের মুনাফার লোভে গ্রন্থ পড়ে যে কোনো মুহূর্তে আসল নকল একাকার হয়ে যায়। একবার ঢাকায় বইমেলায় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় গেছেন আমন্ত্রিত অতিথি হয়ে। একটি স্টলে গিয়ে দেখলেন তাঁর রচিত 'রাধাকৃষ্ণ' বইটি ঝড়ের মতো বিক্রি হচ্ছে। দামে খুব সস্তা। পাঁচ ছ'কপি 'রধাকৃষ্ণ'-তে অটোগ্রাফ দিয়ে স্টল থেকে বেরিয়ে সঙ্গী বাদল বসুকে বললেন- "সব ক'টা বই জাল ছিল।"
   এখানেই দেশভেদে কপিরাইট উঠে যাওয়া আর উঠে না যাওয়া নিয়ে যৌক্তিকতা বিচার্য খুব সেনসিটিভ বিষয়। তার চেয়েও জরুরী এটাই ভাবা উচিত,কোনটা বেশী গুরুত্বপূর্ণ- বেশী মুনাফা,নাকি বেশী মানুষের কাছে বই পৌঁছে দেওয়া?
  ✍ - মৃদুল কুমার দাস। 
  @ কপিরাইট রিজার্ভ ফর মৃদুল কুমার দাস।

#বঙ্গ - পূর্ব ও পশ্চিম - ✍️ -মৃদুল কুমার দাস।

শুভ সান্ধ্য আলোচনা-বাসর।
   #বিষয় - বঙ্গ আমার জননী আমার। 
     # নাম- পূর্ব ও পশ্চিম- বঙ্গ।
      ✍ - মৃদুল কুমার দাস। 

       বঙ্গের আগে পূর্ব ও পশ্চিম নিয়ে বঙ্গের পরিচয় বঙ্গবাসীর এ এক দুর্ভাগ্যের কাহিনী। অখন্ড বঙ্গের একটি পৌরাণিক কাহিনী বলি তাহলে।
    পুরাণে মহর্ষি দীর্ঘতমস ছিলেন জন্মান্ধ। মহর্ষির স্ত্রীর নাম প্রদ্বেষী। কয়েক সন্তানের জননী। কিন্তু মহর্ষির সঙ্গে স্ত্রীর বনিবনা না হওয়ার জন্য দাম্পত্য সঙ্কটে তাদের সুখ দুরস্থ। 
  একদিন প্রদ্বেষী পুত্রদের নির্দেশ দিলেন তাদের বাবা দীর্ঘতমসকে গঙ্গায় ফেলে দিয়ে আসতে। ছেলেরা মায়ের আদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করল। অন্ধ মহর্ষি ভাসতে ভাসতে দৈত্যরাজা বলির আশ্রয়ে এলেন। 
 এদিকে বলিরাজা ও তাঁর স্ত্রী সুদেষ্ণা নিঃসন্তান। মহর্ষির স্পর্শে সুদেষ্ণা পাঁচটি সন্তানের জন্ম দিলেন। এই পাঁচ পুত্র - অঙ্গ,বঙ্গ, কলিঙ্গ, পুন্ড্র ও সুহ্ম। এদের নামে এক একটি দেশ। দেশগুলি সব উত্তর-পূর্ব ভারতের।
   অঙ্গ হল রাজশাহী ও ভাগলপুর। উত্তরে ভাগীরথী থেকে দক্ষিণে গোদাবরী পর্যন্ত কলিঙ্গ,অধুনা উড়িষ্যাকে বলা হয়। অঙ্গ ও কলিঙ্গের  পূর্ব- প্রদেশের নাম বঙ্গ বলে অভিহিত হয়। রাজসাহী বিভাগের পশ্চিমাঞ্চল হলো পুন্ড্র। বর্ধমান ও মেদিনীপুরের পূর্বাংশ বঙ্গ,আর এই বঙ্গের পশ্চিমভাগে সমগ্র বর্ধমান সুহ্ম রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল।  
 বায়ু,বিষ্ণু,মৎস,মার্কেন্ডেয় প্রভৃতি পুরাণে এই পাঁচটি নামের উল্লেখ পাই।
  বঙ্গ নামের নেপথ্যে এই পৌরাণিক কাহিনী বাঙালি এখন প্রায় ভুলতে বসেছে।
  নৃতাত্ত্বিক পরিচয়ে এই বঙ্গ থেকে বাঙালি জাতি অস্ট্রিক-দ্রাবিড়-মঙ্গোলয়েড- আর্যজাতির মিশ্রিত এক জাতি। আবার পরবর্তী সময়ে ইসলাম,বৌদ্ধ, জৈন,বিভিন্ন বহিরাগত রাজবংশ পাল,সেন মিশ্রনে এই মিশ্র জাতি থেকে এল জাতপাত, সম্প্রদায়,শ্রেনি ইত্যাদির বিভাজন। তার মূলে ভৌগলিক সীমা,পরিবেশও পরিচয়কে প্রভাবিত করল। ব্রিটিশ সরকারের সাম্রাজ্য বিস্তারের সুবিধার্থে বঙ্গ-বিভাজন ছিল একটি অসৎ উদ্দেশ্য চরিতার্থ করা।
 ভৌগলিক বিচারে গঙ্গা ও ভাগরথীকে মধ্যস্থ মেনে বঙ্গের আড়াআড়ি বিভাজন সাম্রাজ্যবাদীর অসৎ উদ্দেশ্যে বাঙালি হল প্রশাসনিকগত বলির পাঁঠা। গঙ্গা-ভাগীরথীর এপার ওপার। লোকসংস্কৃতি যার প্রাণের বন্ধন। ভৌগলিক সীমানায় বাহ্যিক পরিচয় বাঙালির দ্বৈত সত্তা- হিন্দু বাঙালি ও মুসলমান বাঙালি। গঙ্গা-ভাগীরথীর পূর্ব দিক পূর্ববঙ্গ। পশ্চিম 
দিক পশ্চিমবঙ্গ। 
 স্বাধীন ভারতের পূর্ব ও পশ্চিম মুছে দিয়ে অখন্ড বঙ্গদেশের তকমা নিয়ে গঙ্গা ভাগীরথীতে অনেক জল গড়িয়েছে। কিন্তু হিন্দু ও মুসলিম বাঙালির তকমায় মেরুকরণ দিয়ে হল পাঞ্জালড়াই। ইতিহাসে রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম,উদ্বাস্তু সমস্যার কি না ঘটেনি। বাঙালি দুই স্বাধীন দেশের দ্বিধাবিভক্ত। গঙ্গা-ভাগীরথী পূর্ব ও পশ্চিম জাতিসত্তায় দ্বিধা বিভক্ত। কিন্তু সাংস্কৃতিক সত্তায় মেরুকরণ অসম্ভব। রাজনীতি তিস্তার জলে সীমাবদ্ধ,মেরুকরণ দুই দেশ। কিন্তু অন্তস্থলে সাংস্কৃতিক সমন্বয়ের ফল্গুস্রোত জাত্যাভিমান মুছে দেয়। এখানেই বাঙালি হিসেবে চির গৌরবের অঙ্গীকার হৃদয় থেকে হৃদয়ান্তরে।
 ধন্যবাদ।  নমস্কার। ❤❤🙏🙏
@ কপিরাইট রিজার্ভ ফর মৃদুল কুমার দাস।

#গীতি সত্ত্বায় রবীন্দ্রনাথ ও নরেন্দ্রনাথ - ✍️ মৃদুল কুমার দাস


   # বিষয়- নিবন্ধ।
      # নাম- গায়ক নরেন ও জোড়াসাঁকো।
        ✍ - মৃদুল কুমার দাস। 

    
       নরেন্দ্রনাথের মধ্যেও যে গীতি-সত্তার অলৌকিকতা বিরাজ যে করছে তা রবীন্দ্রনাথের কাছে অল্প স্বল্প খবর ছিল। 
    রবীন্দ্রনাথের কিছু কিছু গান নরেন্দ্রনাথের ভালো লাগত। কন্ঠ্যস্থও ছিল। যেমন, 'তোমাকেই করিয়াছি জীবনের ধ্রুবতারা...' - গানটি বিভোর হয়ে প্রায় গাইতেন নরেন্দ্রনাথ। 
      এক ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী ১৮৮১। জুলাই মাস। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ঋষি রাজনারায়ন বসুর চতুর্থ কন্যা লীলাবতীদেবীর বিয়ে। পাত্র কৃষ্ণ কুমার মিত্র। বিয়ে শ্রাবণের ১৫ তারিখে। অনুষ্ঠানটি হবে সাধারণ ব্রাহ্মসমাজের মন্দিরে। খুব ধুমধাম সহকারে। এই উপলক্ষে রবীন্দ্রনাথ তিনটি গান বাঁধেন। নিজেই সুর দিলেন। 
      প্রথমটি সাহানা ঝাঁপতালে- 'অবশেষে জীবনের মহাযাত্রা ফুরাইলে/তোমারি স্নেহের কোলে যেন গো আশ্রয় মিলে,/দুটি হৃদয়ের সুখ দুটি হৃদয়ের দুখ/দুটি হৃদয়ের আশা মিলায় তোমার পায়।' 
   দ্বিতীয়টি খাম্বাজ একতালে- 'জগতের পুরোহিত তুমি...', 
   তৃতীয়টি বেহাগ তেতালে- 'শুভ দিনে এসেছ দোঁহে...'। 
  সমস্যা হল কাকে দিয়ে গাওয়াবেন। হতে হল বৌঠান কাদম্বরী দেবীর দ্বারস্থ। বৌঠান কাদম্বরী দেবী নরেনকে দিয়ে গান গাওয়াতে বললেন। নতুন বৌঠান কাদম্বরী দেবী নরেনের অনেক পরিচয় দিলেন- 
   "নাম নরেন্দ্রনাথ দত্ত। প্রায়শই আসে বাবা মশায়ের কাছে। বাবা ম'শায়কে গানও শোনায়। বাবা ম'শায় ভারি স্নেহ করেন ওকে।আর বলেন,যেমন গান-বাজনায়, তেমনি লেখা-পড়ায়। তাছাড়া নানা আধ্যাত্মিক সংশয়ের মধ্যে রয়েছে ছেলেটি। কী যেন খুঁজছে সারাক্ষণ।কি ভরাট কন্ঠ্যস্বর! আর কি ব্যক্তিত্ব!" 
রবীন্দ্রনাথের মনে পড়ল নরেন্দ্রনাথের মুখ। প্রায়ই ব্রাহ্মসমাজের অনুষ্ঠানে গায় বটে! নরেনকে পেতে দ্বীপেন্দ্রকে বলা হল বাড়িতে নিয়ে আসতে।   গানের তালিম নিতে হবে যে।
    জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়িতে নরেন্দ্রনাথ হাজির। দক্ষিণের বারান্দায় মুখোমুখি রবীন্দ্রনাথ ও নরেন্দ্রনাথ। রবীন্দ্রনাথ অপূর্ব কন্ঠ্যস্বরে ও রসবাণীর সূক্ষ্ম জ্ঞানে প্রথম গানটি গাইছেন। আর নরেন্দ্রনাথকে নির্দেশ দিচ্ছেন। আশ্বস্থ করছেন দু'একবার প্র্যাকটিস করলেই গানটি উঠে যাবে।
         মুহূর্তে নরেন্দ্রনাথ বললেন তার আর দরকার নেই। শুনে শুনেই গানটি আয়ত্বে এসে গেল। নরেন্দ্রনাথ গানটিকে অপূর্ব কন্ঠ্যস্বরে রবীন্দ্রনাথকেও ছাপিয়ে গাইলেন। রবীন্দ্রনাথতো শুনে থ'। অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন এক বোদ্ধা আরেক বোদ্ধার দিকে।
        ঠাকুর বাড়ির দুটি গানে খুব শান্তি পেতেন নরেন্দ্রনাথ। একটি দ্বীজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা- 
    'অনুপম মহিম পূর্ণ ব্রহ্ম কর ধ্যান।'
    আর অপরটি রবীন্দ্রনাথের। যেমন,
   'মহাসিংহাসনে বসি শুনিছ হে বিশ্ব পিতা/তোমার রচিত ছন্দে মহান বিশ্বের গীত।/মর্ত্যের মৃত্তিকা হয়ে ক্ষুদ্র এই কন্ঠ্য লয়ে।/আমিও দুয়ারে তব হয়েছি হে উপণীত।/কিছু নাহি চাহি দেব, কেবল দর্শন মাগি।/তোমারে শোনাব গীত, এসেছি তাহারি লাগি।...' - এই গান গাইতে গাইতে নরেন্দ্রনাথ খুব কেঁদে উঠতেন। গভীর ধ্যানের সঙ্গে এই গান মিশে যেত। এই গানেই নরেন্দ্রনাথ খুঁজে পেতেন, প্রাচীন ভারতের ঋষি-মন্ত্র। কি প্রত্যয়! কি ভক্তি, প্রেম,ও আত্ম সমর্পণের আকূতি! 
  ব্রাহ্মসমাজ থেকেই তিনি সঙ্গীতবোদ্ধা অচিরেই প্রমাণিত হল। ঠাকুর শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবেরও ব্রাহ্মমমাজে যাতায়াত ছিল। ব্রাহ্মসমাজ মতবিরোধ থেকে ত্রিখন্ডিত হলেও নরেন্দ্রনাথের যাতায়াত ছিল সর্বত্রগামী। উপণিষদের উপাসনা মন্ত্র ছিল নরেন্দ্রনাথের ব্রহ্মোপাসনার একমাত্র উপায়। ব্রাহ্মসমাজ সেই সেঁতু। 
    সেই পথ ধরে নরেন্দ্রনাথ ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের কাছে পৌঁছে গেলেন।এরপর সঙ্গীতময় জীবন ঠাকুরে নিবেদন করে ঈশ্বর লাভের পথে তিনি ভারতীয় আধ্যাত্মিকতার পথিক হবেন।                               
                 ******
  @ কপিরাইট রিজার্ভ ফর মৃদুল কুমার দাস।

রবিবার, ১৯ ডিসেম্বর, ২০২১

# নাম - সতীত্ব ও সহমরণ। ✍️ - মৃদুল কুমার দাস।

শুভ আধ্যাত্মিক আলোচনা-বাসর।
#বিষয় - *আধ্যাত্মিক।*
  #নাম - *সতীত্ব ও সহমরণ।*
   ✍️ - মৃদুল কুমার দাস।

*"আত্তার্ত্তে মোদিতা হৃষ্টে প্রোষিতে মলিনা কৃশ।*
*ত চ ম্রিয়তে পত্যৌ সা স্ত্রী জ্ঞেয়া পতিব্রতা।।"*- যে রমণী স্বামীর দুঃখে দুঃখিতা,স্বামীর সুখে সুখিনী,স্বামী প্রবাসী হলে মলিনা ও কৃশাঙ্গী হন এবং যিনি স্বামীর মরণে সহমৃতা হন,শাস্ত্রে তাঁকে পতিব্রতা রমণী বলে। সতী,সীতা, সাবিত্রী,দময়ন্তী,অরুন্ধতী,বেহুলা সব আদর্শ সতীনারী যাঁরা ব্যবহারিক জীবনের নারীদের মডেল। নারীসমাজ কথাটিতে নারীই একম অদ্বিতীয়ম। সেখানে কেবলমাত্র মেয়েলি আদব কায়দা,লোকাচার, স্ত্রী আচার!  বিপরীতে পুরুষসমাজ,পুরুষের একাধিপত্য। 
 শঙ্করপত্নী *সতী* সতীত্বের পূর্ণপ্রতিভূ। তিনিই সতীত্বের উৎস।   বালিকা থেকে কুমারী হওয়ার জ্ঞাণোদয় হলে সতীর আদর্শে অনুগতা হয়ে অনুশীলনে ব্রতী হয় মেয়েরা। শিবপূজা তার সতীত্বের অনুসঙ্গ। তাই লোকাচার। এই দেবভক্তি থেকে পুণ্য,পবিত্রতা ও ভক্তিমতী ভাব আসে। বারব্রতধারিণী হয়। সংসারের পুণ্যার্থে এক অপূর্ব পবিত্রতার বলয়ে নিজের অবস্থানকে সুরক্ষিত করে। 
 বিবাহকালে সতীত্বের প্রধান বিচার্য বিষয় কতটা ভক্তিমতী। শিক্ষাসংস্কার,সংস্কৃতিমনস্ক,রুচিশীলতা,রন্ধনপটিয়সী,সেবাব্রতিনী একেবারে সবেতেই পরিপূর্ণা হতে হয়। আর হিন্দু সমাজে মেয়েদের মাতৃরূপের প্রাধান্য বলে গৃহবধূ হতে গেলে সতীত্বের সে কত বাছবিচার। মেয়ে হয়ে জন্মালে পরের ধন হয়ে বাপের কাছে,স্বামীগৃহে প্রবেশ কালে সতীত্বের পরীক্ষা একটা লোকাচারে পর্যবসিত হয়েছে।
 গৃহবধূ হলে রূপে লক্ষ্মী ও গুণে সরস্বতী হওয়া চাই। 
   এতসব বাছবিচারের পর ব্যবহারিক জীবনে নারীর স্থানের কথায় আসি এবার।
 কন্যাকে অপরূপা হতে হবে। নম্রা,রুচিশীল, চলনে ভীতা- শঙ্কিতা,কমলমতী,গৃহনিপুনা হতে হবে। তারপর পাকা দেখা। সেই সঙ্গে দানসামগ্রীতে মেয়ের মূল্য নির্ধারিত হয়। অর্থাৎ পণ-এ হল মেয়ের মূল্য নির্ধারিত হয়। 
  সতীত্বে সতী, সীতা, সাবিত্রী, দময়ন্তী চাই। আর পণের সময় সমাছকে নাককাটা নির্লজ্জ মনে হয়। এখন আবার বলে দাবী নেই *যা দেবেন* - যা দেবেনের হাঁ বেশী। বাবা তো খালি হাতে পাঠাতে পারেন না। মেয়ে শ্বশুরবাড়ীতে প্রবেশের পর বধূবরণ উৎসবে যৌতুক নিয়ে কানাকানি ফিসফিসানি দেখলে মনে হবে সতীত্বের সাথে এগুলো হল মেয়েটির ব্যবহারিক মূল্য, যা সতীত্বের মর্যাদা বাড়ায়। কি সমাজ! এই পণ নিয়ে টানাপোড়েন অনেক সময় সতীত্ব বৃথা হয় ,পাকা দেখা থেকে বিয়ে ভেঙে যায়। কখনো বা বিবাহস্থল থেকে বর তুলে নেওয়ার ঘটনা প্রায়শই ঘটত। এখনও। 
  একজন সতী নারীর গুণ নিয়ে শ্বশুরবাড়ীতে প্রবেশ কি লোকাচারের গুমোর! শ্বশুরবাড়ী বলা হয়,শাশুড়ী গৃহকর্তৃ। সংসারের অন্দরে আধিপত্য তাঁর।  আগেই বলেছি মাতৃপ্রধান সংসার,বধূর প্রাধান্য থাকেনা। পাশ্চাত্যে বধূর প্রাধান্য। মেয়ে ও পুরুষে স্বাধীকারের প্রাধান্য। সতীত্বের মাপকাঠি নেই। স্বামী দেবতা,সে দেবত্বগুণ থাকুক বা নাই থাকুক, স্বামীকে দেবতা বলতে হয়। পাশ্চাত্যে ওটি চলবে না। দেবত্বগুণ থাকলে তবেই তুমি স্বামীদেবতা। হিন্দু ধর্মে কেবল এই স্বামী দেবতার কথা আছে। বড়ই গন্ডগোলে ভাব  ছিল। এখনো তাই মনে হয়।
   সতীত্বের কিছু প্রমাণ বাকী থাকে বলে তাই মাতৃত্বের অ্যাসিস্ট্যান্ট হয়ে থাকতে হয়। সংসারের ট্রেনিং চলে শাশুড়ি ট্রেনার। এই শাশুড়ি নামক আইটেমটি আর্থসামাজিক অবস্থার উপর নির্ভর করে ভিন্ন ভিন্ন প্রকৃতির হন। একদিন শাশুড়ি যেদিন গৃহবধূ ছিলেন সেদিন তাকে তাঁর শাশুড়ি যে যে আচার ও নিয়ম মেনে আসতে বাধ্য করতেন ইনিও তাই করবেন। সংসারের ঐতিহ্য বলে একটা মডেল সামনে থাকবে। এখন আধুনিক শিক্ষা দীক্ষায় তার বদল কিছুটা এলেও পুরোপুরি বদলায়নি। চাকরিওয়ালা মাধ্যমে মেয়েদের ঘরে ও বাইরে সামাল দিয়ে খুব একটা স্বস্তি নেই, তবে রোজগারের দিক বলে সবাই মানানোর চেষ্টা করে। খটামটি হামেশাই লেগে থাকে সংসার যাঁতাকলে। এতো গেলো সমাজ সাংসারের ব্যবহারিক দিকের কথা। সতীত্ব অর্থনৈতিক তুল্যমূল্য বিচার্য।
 তারাই সতী নারী যাঁরা স্বামী ভিন্ন পরপুরুষের চিন্তাকে পাপ মনে করে। অসতী বলে চিহ্নিত হয় যদি অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। এখন আইন পর্যন্ত এই পরকিয়া সম্পর্ককে বৈধতা দিতে বাধ্য হয়েছে। আধুনিকতার খাতিরে। জীবনের দাবীতে। এতদিন নারীর সতীত্ব নিয়ে যা ভেবে এসেছি তা ভেক। সতী,সীতা,সাবিত্রী হলে ব্যবহারিক ভোগ,ব্যবহারিক জীবনের আইনী বৈধতাকে অস্বীকার করা থেকে সরিয়ে রাখা মানে অনেককিছু থেকে বঞ্চিত করে রাখা। অর্থাৎ জীবন এখন খুব বৈজ্ঞানিক পথে হাঁটতে চায়। সেখানে সতীত্বের ফাঁকা বুলি অস্বীকার করলে কোনো যায় আসে না। সতীত্বেও এখন আপেক্ষিক গুণাগুণ এসেছে জুটেছে।
 সতীত্ব নিয়ে বিতর্ক এখন মেলা। আর সহমরণের দিন শেষ। সহমরণ কথাটা নিতান্তই ভেক। সহমরণের যুগকে অভিশপ্ত মানে আধুনিক সমাজ। সতীত্ব ও সহমরণ কথাটা নিতান্তই সেকেলে। সেকেলে ধরনে আটকে। বরং আধুনিক জীবনে নারী ও পুরুষের যৌথ সম্পর্কে ও সমানাধিকারে সমাজ কতটা উন্নত হবে তাই ভাবার দিন এখন। মাতৃত্ব ও বধূর মধ্যে যত দূরত্ব কমবে তত সাংসারিক অশান্তি কমবে। বধূনির্যাতন কমবে। নারী স্বাধীনতার নতুন সিলেবাসের অন্তর্ভুক্ত হয়ে আমাদের কাছে সতীত্ব ও সহমরণ নামক ভাববাদ থেকে ক্রমে সরে এসে সমসাময়িক প্রগতিশীল ভাবনার সঙ্গে যত সমবেত হব তত সমাজ ও সংসার নতুনভাবে সজ্জিত হবে।
                 *****
#কপিরাইট রিজার্ভ ফর মৃদুল কুমার দাস।

শনিবার, ২ অক্টোবর, ২০২১

#নাম - লালবাহাদুর শাস্ত্রী। ✍️ - মৃদুল কুমার দাস।

# বিষয় - *ভারতপথিক লালবাহাদুর শাস্ত্রীর জন্মদিন স্মরণে শ্রদ্ধাঞ্জলি*
  #নাম - *লালবাহাদুর শাস্ত্রী।*
✍️ - মৃদুল কুমার দাস।

 ২-অক্টোবর ফিবছর জাতির জনক মহাত্মা গাঁধীর জন্মদিন পালনের এত ঘটা আরেক ভারতমাতার সন্তানের একই দিনে জন্মের কথা প্রায় একপ্রকার উপেক্ষাই থেকে যায়। আড়ালে থেকে যান লালবাহাদুর শাস্ত্রী( ১৯০৪,২-অক্টোবর -১৯৬৬,১১- জানুয়ারি)। জন্ম উত্তরপ্রদেশের মোগলসরাইতে। সক্রিয়তাবাদের অধ্যাপক ছিলেন। স্বাধীন ভারতের দ্বিতীয় প্রধানমন্ত্রীর জীবদ্দশা মাত্র বাষট্টি বছর। ১৯৬৪ এর ৯জুন প্রধানমন্ত্রী হন। জওহর নেহেরুর কন্যা ইন্দিরা গাঁধী প্রধানমন্ত্রী হতে না চাওয়ার জন্য অগত্যা তিনিই প্রধানমন্ত্রী হন। রাষ্ট্রপতি সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণন,আর তিনি প্রধানমন্ত্রী। জওহরলালের শূন্য আসনে তিনি বসে খুব স্বস্তিতে ছিলেন না। চীনের কাছে জওহরলালের ১৯৬২-র যুদ্ধে শোচনীয় পরাজয় ভারতকে লজ্জার মুখে পড়তে হয়েছিল। আর সেই সুযোগে শত্রু দেশ পাকিস্তান উদ্বুদ্ধ হয়েছিল সাম্প্রদায়িকতার জিগির দিয়ে ভারতকে হারিয়ে কাশ্মীর দখল নেবে। সেদিন বাবুজি লালবাহাদুর(বাবুজি নামেই সকলে ডাকতে খুব পছন্দ করতেন) কিভাবে দেশকে যোগ্য নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তা ইতিহাসের পাতা তাঁর কৃতিত্বকে স্বর্ণাক্ষরে মুদ্রিত করতে কোনো কার্পণ্য করেনি। শুধু আফশোস বাপুজি মহাত্মার জন্মদিনের আড়ালে বাবুজি লালবাহাদুর থেকে যান। এ জন্য দোষটা আমাদের,কেননা ত়াঁর জন্মদিন নিয়ে আলোচনা আমাদের কোথাও না কোথাও সদিচ্ছার বড়ই অভাব।
  কেমন ছিলেন বাবুজি লালবাহাদুর! 
  মহাত্মা গাঁধীর দুই বিশ্বস্ত সেনাপতি জওহরলাল ও লালবাহাদুর। তবে বাবুজি জওহরলালের মত অত লাইমলাইটে থাকতে পছন্দ করতেন না। আন্তর্জাতিক নেতৃত্ব হওয়ার কোনো উচ্চাশা পোষন করতেন না। ছিলেন অত্যন্ত সাদামাঠা। ভেতরে সবসময় একটা স্বচ্ছতা বিরাজ করত। আর একনিষ্ঠ দেশভক্ত ছিলেন। এই বলে সকলের খুব বিশ্বাসভাজন ছিলেন। কিন্তু ভেতরে ভেতরে যে কতখানি লৌহমানবের কাঠিন্য ছিল তা অচীরে প্রমাণ পেয়েছিলেন পাকিস্তান-জেনারেল আয়ুব খান। বাইরে থেকে বাবুজিকে দেখে আয়ুব খানের ধারণা হল বড়ই দুর্বল প্রকৃতির। আর আয়ুব খানের ধারণা যে কতখানি ভুল ১৯৬৫ র যুদ্ধে আয়ুব খানকে হাড়ে হাড়ে টের পাইয়ে দিয়েছিলেন। ১৯৬২ র ভারত আর ১৯৬৫ র ভারত প্রতিরক্ষায় যে আকাশ পাতাল পার্থক্য সে খবর আয়ুব খানের কাছে ছিল না। আয়ুব খান ভেবেছিলেন সাম্প্রদায়িকতার জিগির দিয়ে কাশ্মীরের মানুষের মন পাবেন, আর চীন পরোক্ষে সাহায্য করবে - আয়ুব খানের এই ভাবনাকে শাস্ত্রীজী হাড়ে হাড়ে ভুল যে সেই সবক শিখিয়ে দিয়েছিলেন। আয়ুব খানের দেশ যুদ্ধে ল্যাজে গোবরে অবস্থা। না চীনকে পাশে পেল,আর না কাশ্মীরের মানুষকে। আয়ুব খান অচীরে বুঝতে পারলেন - শাস্ত্রী লোকটি মোটেই সহজ নয়। নরম মনের তো নয়ই। দেখতে ওরকম। রুটি সবজি আর একগ্লাস দুধ যাঁর প্রিয় খাদ্য, ধুতি পাঞ্জাবী পরিধানের সারল্যের বাইরে যে মানুষটি এমনভাবে কাজেই বুঝিয়ে দিতে পারেন কীভাবে তা জেনারেল আয়ুব খান অচিরে বুঝতে পেরেছিলেন।
  পাকিস্তান জানত না চীন যুদ্ধ থেকে শিক্ষা নিয়ে প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওয়াই ভি চ্যবন কয়েকবছর ধরে লাগাতার ইউরোপ-রাশিয়া সফর করে অসংখ্য আধুনিক ট্যাঙ্ক,আগ্নেয়াস্ত্র, সাবমেরিন, ফাইটার জেট কিনে ফেলেছেন। সোভিয়েত তো পুরোপুরি বিপুল সমর্থন দিয়ে পাশে ছিল। আর এই অন্য ভারতের খবর আয়ুব খানকে ইন্টেলিজেন্স ব্যূরো দিতে ব্যর্থ।
  একটা যুদ্ধ লোকক্ষয় শুধু কি!অর্থনৈতিক অবস্থাও খুব সঙ্গীন হয়ে পড়ে। পাকিস্তানের অবস্থা তাই হয়েছিল। *জয় জোয়ান জয় কিশান* শ্লোগানের স্রষ্টা বাবু শাস্ত্রীজি পাকিস্তানকে একেবারে ভরাডুবি করে ছেড়ে দিলেন। উভয়পক্ষের ক্ষয়ক্ষতি নেহাত মন্দ ছিল না - পাকিস্তানের ২৫০ ট্যাঙ্ক,৫০ এয়ার ক্র্যাফট,৫০০০ হাজার সৈন্য। ভারতের তার থেকে বেশী ৬০০০ হাজার সৈন্য,৩০০ ট্যাঙ্ক,৫০ এয়ারক্রাফট। তবে ভারত বেশি ক্ষতি দিয়ে পাকিস্তান ভূখণ্ডের ৭০০ বর্গমাইল কব্জা করে ফেলে।  তখন রাষ্ট্র সংঘ নড়ে চড়ে বসে। নিরাপত্তা পরিষদের সেক্রেটারি ইউ থন্ট দিল্লী ও করাচীতে এসে দুপক্ষের মধ্য দৌত করেন। ২২ সেপ্টেম্বর ১৯৬৫  উভয়পক্ষকে যুদ্ধে বিরত হয়েছিল। আর উভয় দেশের মধ্য চুক্তি সাক্ষরের জন্য ক্ষতিপূরণ ও পরস্পরের দখলীকৃত স্থান প্রত্যর্পণ নিয়ে তাসখন্দে সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেই  সভায় আয়ুব খান বাবু লালবাহাদূরকে বলেছিলেন -"প্রধানমন্ত্রীজি কাশ্মীরকে মামলে মে কুছ অ্যায়সা কর দিজিয়ে কী ম্যায়ভি আপনে মুলুক মে মুহ দিখানে কাবিল রহু...।" তখন মুচকি হেসে বাবুজি বলেছিলেন -"সাহাব! ম্যায় বহোত মুয়াফি চাহতা হুঁ কী ইস মামলে মে ম্যায় কোই খিদমত নেহি কর সকতা...।"
   ১৯৬৬ সালের ১০জানুয়ারি বিকেলে সেই ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষর হওয়ার পর সাড়ে ৯টা নাগাদ ফিরে এলেন নিজের ঘরে। খাওয়ার রেডি। খাওয়ার বলতে রাতে রুটি,ডাল,সবজি আর এক গ্লাস দুধ। খাবার এলো সাড়ে দশটায়। খাওয়ার দিয়ে গেলেন জান মহম্মদ। স্পিনাক,আলুভাজা আর সবজি ঝোল। খাওয়ার পর হাঁটার অভ্যাস চিরকাল। তবে সেদিন আর হাঁটার শক্তিই যেন হারিয়ে ফেললেন। তখন বাজে এগারোটা। বললেন - "আমি ঘুমাব এবার।" রামনাথ তাই শুনেই কিচেন থেকে এক গ্লাস দুধ দিয়ে গেলেন। রাত ১১টা ১৫ নাগাদ দুধ খেলেন। পরদিন কাবুল যাওয়ার কথা। তাড়াতাড়ি উঠতে হবে। সেই রাত আর সকাল হয়নি। রাত আড়াইটায় একের পর এক দরজায় ধাক্কা - "জেন্টলম্যান প্লিজ ওপেন দ্য ডোর... জেন্টলম্যান ইটস আর্জেন্ট... জেন্টলম্যান ইওর প্রাইম মিনিস্টার ইজ ডাইং...।" পরিবারের পক্ষে এটাই বিশ্বাস, স্ত্রী ললিতা শাস্ত্রী জোরের সঙ্গেই বলেছিলেন দুধের সঙ্গে বিষ মিশিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। কেউ বলেন হার্ট অ্যাটাক। আসলে তাঁর মৃত্যু যে কী কারণে হয়েছিল আজও কৌতুহল নিরসন হয়নি। অদূর ভবিষ্যতে নিরসন হতে পারে এমন সম্ভাবনাও নেই।
                ******
#কপিরাইট রিজার্ভ ফর মৃদুল কুমার দাস।

#নাম - মহাত্মা গাঁধীজি।✍️ - মৃদুল কুমার দাস।

#বিষয় - *জাতির জনক মহাত্মাজীর স্মরণে জন্মদিনে শ্রদ্ধাঞ্জলি।*
   # নাম - *মহাত্মা গাঁধী।*
✍️ - মৃদুল কুমার দাস।
আজ(২-অক্টোবর) জাতির জনক,ভারতাত্মা গাঁধীজীর জন্ম দিন। দেশে ও বিদেশে গাঁধী-স্মরণ ঘুরে দাঁড়ানোর অঙ্গীকার নিয়ে প্রতি বছর জন্মদিন পালিত হয়।
     গান্ধীজীর পরিবার ছিল জৈন ধর্মাবলম্বী। মহাত্মা আবার রাজনৈতিক ভাবাদর্শে বৌদ্ধধর্মের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন, কেননা বুদ্ধদেবের 'মা হিংসি' অবলম্বনে অহিংস নীতির উদার ভাববাদের প্রয়োগ তারই প্রমাণ। তাহলে তাঁর বিলেত যাত্রা দিয়ে শুরু করা যাক।
     ১৮৮৮,৪-সেপ্টেম্বর ব্যরিস্টারি পাঠ নিতে ইউনিভার্সিটি অব্ কলেজ, লন্ডনে যান। যাওয়ার সময় জৈন সন্ন্যাসি বেচার্জির কাছে মা শপথ করিয়ে নেন লন্ডনে থেকে কোনোপ্রকার মাছ-মাংস তথা আমিষ ভোজন চলবে না। মদ স্পর্শ তো নয়ই। উচ্ছৃঙ্খল জীবন নৈব নৈব চ। হিন্দুত্বের আদর্শে নিষ্ঠাবান থাকতে হবে। মায়ের সামনে শপথ তো না হয় হল। কিন্তু জায়গাটা যে লন্ডন। ইংরেজ আদব কায়দায় রপ্ত না হতে পারলে একা হয়ে পড়তে হবে যে। গুজরাটের পোরবন্দরে নেওয়া শপথ যতটা পারা যায় রক্ষা করার আপ্রাণ চেষ্টা করছিলেন। পরীক্ষামূলকভাবে 
নাচের তালিম নিলেও বাড়িওয়াালির দেওয়া ভেড়ার মাংস,বাঁধাকপি ছুঁ'তেন না।
থাকতেন নিরামিশাষি পাড়ায়। একটি বাঁধা দোকানে নিয়মিত খেতেন। এই সূত্রে তিনি নিরামিশাষি সংঘে যোগদান করেন। অচিরে সংঘের কার্যকরী কমিটির সদস্য হন। এমনকি একটি স্থানীয় শাখা গড়ে তোলার দায়িত্ব পান। এই সংঘই তাঁর জীবনে সংঘবদ্ধ শক্তির নেতৃত্ব দেওয়ার প্রস্তুতি এনে দেয়। আবার এখানকার থিওসফিক্যাল সোসাইটির( ১৮৭৫ ) কিছু সদস্যকে সংঘে পান। তাঁরাই গান্ধীজীকে বৌদ্ধ-হিন্দু-ব্রাহ্মণ্য সাহিত্য পাঠের সুযোগ করে দেন।গীতা পাঠে উৎসাহিত করতেন তাঁরা। ধর্ম সম্পর্কে প্রথম প্রথম আগ্রহ ততটা না থাকলেও এই বইগুলি পাঠে ক্রমেই ধর্মীয় ভাবের নিজস্ব জগৎ গড়ে তোলেন। ব্রিটেনের থিওসফিক্যাল সোসাইটির পরিবেশ তাঁকে অনেকটাই গড়ে দেয়,ভবিষ্যতের দিশা খুুুঁজে পান,নিজেকে কোথায় কতটুকু উজাড় করে দিতে পারবেন।
          ভারতবর্ষের পশ্চিমাংশ (গুজরাট, মহারাষ্ট্র...) থেকে ভাল সংখ্যক আফ্রিকায় পাড়ি জমাত বাণিজ্যের লক্ষে। তাঁরা ক্রমেই বংশ পরম্পায় স্থায়ী বাসিন্দাও অনেকেই হয়ে যান। আফ্রিকার ব্রিটিশ উপনিবেশে কৃষ্ণাঙ্গদের সঙ্গে এই ভারতীয়দেরও নিপীড়িত হতে হত। এদেরই হয়ে আইনী লড়াই করতে গাঁধীজীর ডাক পড়ত। সেই সূত্রে ডারবানে গুজরাটি ব্যবসায়ী দাদা আবদুল্লার অফিসে কাজ দিয়ে শুরু ব্যারিস্টারি পেশা। ১৮৯৩ দিয়ে শুরু আফ্রিকা পর্ব।
        শেতাঙ্গদের বর্বরোচিত বর্ণবিদ্বেষ গান্ধীজীকেও রেহাই দেয়নি। পদে পদে হেনস্থা ছিল নিত্যনৈমিত্তিক। যেমন উল্লাখযোগ্য দু'চারটি হল___
     ১। ডারবান আদালতে একদিন ম্যাজিস্ট্রেট মাথার পাগড়ি খুলে রাখতে বললেন। এই অপমান সহ্য করতে না পেরে আদালত কক্ষ ত্যাগ করেছিলেন।
      ২। একদিন প্রথম শ্রেণীর টিকিট কেটে পিটার ম্যারিজবার্গের ট্রেনে উঠেছেন। কিন্তু তাঁকে বাধ্য করা হয় তৃতীয় শ্রেণীর কামরায় যেতে। কেননা তিনি যে কৃষ্ণাঙ্গ। সেজন্য মারধরও খেতে হয়েছিল। সঙ্গের লটবহর কামরার বাইরে ছুঁড়ে ফেলা পর্যন্ত হয়েছিল।
       ৩। স্টেজ কোচে ভ্রমণের সময় একজন চালক তাঁকে প্রহার করেন,কেননা তিনি এক ইউরোপীয় যাত্রীকে জায়গা করে দিয়ে ফুট বোর্ডে চড়তে রাজী হননি বলে। আরো কত কত! বর্ণবৈষম্য-কুসংস্কার-অত্যাচার-অবিচারের শিকার যেভাবে নির্বিচারে চলত গান্ধীজী এদের পাশে না থাকলে আরো এরা অসহায় হবে,এই ভেবে কঠিন কর্তব্যে বাঁধা পড়লেন। সেজন্য তিনি ১৮৯৪ খ্রীঃ নাটাল ইন্ডিয়া কংগ্রেস স্থাপন করলেন পেশা ও রাজনীতিতে ক্রমেই পসার জমতে লাগল। মাতৃভূমি তাঁকে আরো বেশি করে টানে। কিন্তু নিরুপায়।মাতৃভূমির টানে প্রায়ই যান। সবে ডারবানে ভারতবর্ষ থেকে ফিরেছেন, ১৮৯৭-জানুয়ারীতে এক মব তাঁকে প্রাণে মারার চেষ্টা করেন। কিন্তু গা়ধীজী ঐ মবের বিরুদ্ধ কোনো অভিযোগ আনলেন না এই ভেবে, একের দোষে পুরো দলের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়া ঠিক হবে না। তাঁর এই দৃঢ় মানসিকতায় প্রতিপক্ষ সেদিন পিছু হঠেছিল। এই সাফল্য পরবর্তী সত্যাগ্রহ আন্দোলনে কাজে লাগালেন। 
         ১৯০৬ খ্রীঃ। ট্রান্সভাল সরকার ভারতীয়দের ভোটাধিকারের বদলে বহিস্কারের আইন আনতে চলেছে। তখন তিনি ১১-সেপ্টেম্বরে জোহানেসবার্গে এক সংগঠিত গণপ্রতিরোধ গড়ে তোলেন। আইন বর্জনের জন্য। এই প্রথম আইন অমান্য আন্দোলন। সংগঠিত জমায়েতে শপথ নিলেন এই আইন অমান্যের জন্য
যত অত্যাচার নেমে আসুক না কেন পিছু হঠবেন না। এই আন্দোলনের জন্য অনেককে
আহত,নিহত ও বন্দী হতে হয়েছিল। তথাপি আন্দোলন শান্তিপূর্ণ দেখে,কৃষ্ণাঙ্গদেরও
স্বতঃস্ফূর্ত যোগদান করতে দেখা গেল। আন্দোলন দীর্ঘ সাত বছর ধরে চলল। শেষে জেনারেল ইয়ান ক্রিশ্চিয়ান স্মুট গান্ধীজীর সঙ্গে
সমঝোতায় আসতে বাধ্য হন। এরই মাধ্যমে আফ্রিকায় গাঁধীজীর সত্যাগ্রহ আন্দোলনের প্রথম সাফল্য,যা মাতৃভূমির
জন্যও তুলে রাখলেন। 
   আফ্রিকা তাঁকে চিনিয়ে দিয়েছিল ধর্ম ও রাজনীতির সম্পূর্ণ আলাদা দুটি সত্ত্বার কথা। আফ্রিকায় তাঁর লড়াই ছিল ব্রিটিশ শক্তির বিরুদ্ধে, মাতৃভূমিতেও তাই। মাতৃভূমিতে বাড়তি সুবিধা পেলেন অহিংসার পূণ্যভূমি বলে। আর অবশ্যই হিন্দু ধর্মের সহনশীলতা। স্বামী বিবেকানন্দের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে ভারতবর্ষকে আবিস্কার করলেন নতুন করে। হিন্দ্ স্বরাজ দিয়ে অহিংসার বীজ বপন করলেন। আফ্রিকা থেকে ইসলাম ধর্মকে আপন ধর্মের সঙ্গে পিঠোপিঠি ভাবতেন। ইসলামকে কোনোদিন বৈরীতা দিয়ে দেখলেন না, কেননা শিল্প-সংস্কৃতিতে উভয় সম্প্রদায় যে পরস্পরের পরিপূরক। যত নষ্টের গোড়া ছিল সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ, রাজনীতির স্বার্থে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে যে বিভেদ সৃষ্টি করেছিল তাকে গাঁধী কোনো দিন মেলাতে পারেননি। তাই তাঁকে অনেকেই ব্যর্থ নায়ক বলেছেন। ব্যর্থতা এজন্য উগ্র হিন্দুরা তাঁকে দাগিয়ে দিয়েছিল তিনি হিন্দু বিদ্বেষী। সেই সস্তা রাজনীতির মাশুল হিসেবে চড়া খেসারদ দিতে হয়েছিল দ্বিখণ্ডিত স্বাধীনতা নিয়ে। গান্ধীজী তা মানতে পারেননি বলে স্বাধীনতা উদযাপনের আনন্দ থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রেখে ছিলেন। কলকাতায় নিজেকে নির্বাসনে পাঠিয়ে।
  বর্তমান সেই রাজনীতির গলিঘুঁজিতে আমরা আজও যখন খেই হারিয়ে ফেলি,বাপুজিকে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চাই। মনে হয় বাপুজি থেকে যত দূরে যাচ্ছি বাপুজীকে তত কাছে পাওয়ার প্রবল আকুলতা আমাদের কি ব্যাকুলই না করছে! তাই গান্ধী আদর্শের স্থান বইয়ের পাতা ছেড়ে অন্তরে উঠে এসেছে, কেননা গাঁধী  যে আমাদের বর্তমান দুঃসময়ের সাথি। মহাত্মা ছাড়া গত্যন্তর নেই। বর্তমান যে বড়ই হিংসায় রক্তাক্ত। গা়ধীজীর ভাব আন্দোলন বড়ই দরকার।
               *******
#কপিরাইট রিজার্ভ ফর মৃদুল কুমার দাস।

বুধবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২১

#নাম-হাতে হাত।✍️ - মৃদুল কুমার দাস।


  
  # নাম - *হাতে হাত।*
 ✍️ - মৃদুল কুমার দাস।

     মাথায় হাত দিয়ে বসা অর্থে সর্বহারা,কেউ মাথায় হাত বোলাল মানে বোকা বানাল,মাথায় হাত দিয়ে কিছু জটিল মীমাংসার মনোসংযোগ,মাথায় হাত দিয়ে আশীর্বাদ...- এসব ব্যবহারিক জীবনকে অর্থবহ করতে হাত ও মাথার বিভিন্ন উপসর্গ।
   হাত পায়ে গেলে পায়ে ধরা তথা দয়া ভিক্ষা করা,পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করা...এও জীবনের এক দশা। 
 আর হাতে হাত মেলালে করমর্দন  এক শিষ্ট আচার,হাতে হাত অর্থে দৃঢ় বন্ধন,হাতে হাত রাখা ভরসা দান,আর বন্ধুত্বে হাতে হাত রেখে চলা,বর কনের হাত ধরলে এক কথায় বলে পাণিগ্রহণ বা বিবাহ। শিশুর হাত আর তুলো এক। মেয়েদের হাত বড় সুন্দর,ছেলেদের কাছে খুব প্রিয় - জৈবিক আকর্ষণ পরুষালী হাত ও মেয়েলি হাত। আর লম্বা হাত মানে  ক্ষমতার প্রকাশ করে - এই কাজের পেছনে কারো লম্বা হাত না থাকলে হতে পারে না। বাঁ হাতের খেলা বলতে কাজটা সহজ,হাতের মধ্যমা ও বৃদ্ধাঙ্গুলী ঘর্ষণ দিয়ে একটা শব্দ সৃষ্টি করাতে নিজেকে জাহির করতে লাগে। তর্জনী দিয়ে দূরবর্তী দিক নির্দেশ ও কাউকে দোষারোপ করতে,তর্জনী হেলনে কি করতে আর বাকি থাকে। হাত মুঠো করে কড়ে আঙুল উঁচু করে একটা কাজ যে করবে তারই মূদ্রা সকলের জানা। আনন্দের প্রকাশ হাততালি, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে কাউকে উৎসাহ দান হাততালি,একার দোষ হতেই পারে না;একহাতে তালি কি বাজে? নিশ্চয় নয়। হাতাহাতি বলতে মারপিট। যার হাত সমানভাবে চলে সে হয় সব্যসাচী। হাত ও পা থাকতে থাকতে যেন বিদায় নিই,মানে মৃত্যু হয় যেন। হাতের রেখায় থাকে ভাগ্য। হাতে খড়ি দিয়ে বিদ্যা লাভে যাত্রা হবে শুরু।
হাতই জীবনের মুখ্য ধারক ও বাহক। ছোট্টবেলায় সেই ছবি আজও সাথী,চিরসাথী - হারকিউলিস। পেশীবহূল পায়ে দাঁড়িয়ে, মাথার উপর বিশ্বকে পেশীবহূল দুই বাহু দিয়ে ধারণ,সেই তো জীবনের মহাভাষ্য।
   পরিশেষে বলি ভরসার হাত যে কোনো দুর্বলতাকে প্রতিহত করার হাত। জীবন মানে সুখ ও দুঃখময়। সুখে হাত ধরা এক,আর দুঃখে হাত ধরা আরেক। বন্ধুত্বের হাত ধরা,প্রণয়ের হাত ধরা,জৈবিক চাহিদা পূরণের হাত ধরা - এই তিন প্রকার হাত ধারণের কোনটি মহৎ। জীবনকে অর্থবহ করতে সহায়ক। হাত ধরার ধরণটাই বলে দেয় কে মহৎগুণে সিদ্ধ। এও এক আপেক্ষিকতাবাদে সিদ্ধ। ক্ষেত্রবিশেষে তার ফল নানা। এই যে হাতের এত রকম কার্যকারিতার কথা বললাম সব নিয়ে জীবনানুরাগ। জীবনশৈলী।
              ******
#কপিরাইট রিজার্ভ ফর মৃদুল কুমার দাস।

#নাম - ভীমরতি। ✍️- মৃদুল কুমার দাস।


  # বিষয়- *শব্দ।*
     # নাম।- *ভীমরতি।*
✍️ - মৃদুল কুমার দাস।

     ভীম মানে ভয়ংকর আর রতি অর্থ অনুরাগ,কাম,রমন,আকৃষ্ট ইত্যাদি। মনের এক ভাব - রতিভাব। কামের দেবতা মদন ও মদনের স্ত্রীর নাম রতি। পার্বতী নিজেকে মোহময়ী করতে কামদেব মদনের স্মরণপন্ন হলেন, পার্বতীর এই মোহময়ী রূপের পেছনে মদনের সাহায্য যে আছে তা শিব যোগবলে দেখে খুব রেগে গেলেন। আর বাবা রেগে গেলে যা হয় আরকি - মদনকে ভস্মীভূত করলেন। মদন ভস্মীভূত হওয়ায় এবার মদনের স্ত্রী রতির কী হবে? তাই নিয়ে রতির বিরহান্তিক হাহাকার। 
   শরীরে এই কাম ও রমন না থাকলে জীবনের কোনো অর্থ নেই। কালিদাসের 'অভিজ্ঞাণ শকুন্তলম'-এর দুষ্মন্ত-শকুন্তলার কাম ও রতি কাব্যকলা বা 'মেঘদূত' এর যক্ষ ও যক্ষ পত্নীকে নিয়ে রচিত কাব্যও তো কাম ও রতির কথা। এর সঙ্গে ভীমরতির সম্পর্ক ঠিক স্পষ্ট হল না।
  মহাভারতে পাই- পঞ্চপান্ডব বনবাসকালে, ভীম হিমালয়ে আপন গরজে রোজ দেহ চর্চা করেন। সেই স্থানে ঘুরতে ঘুরতে মদনের স্ত্রী রতি এসে পড়লেন। আর ভীমের বলিষ্ঠ বপু দেখে রতি ভীমের সঙ্গে কাম কলায় লিপ্ত হন। এদিকে মদন স্ত্রীকে খুঁজতে খুঁজতে ঐ স্থানে দেখতে পেয়ে এক ভয়ংকর শব্দ তথা ভীম শব্দে রতি উচ্চারণ করেন। তা থেকে ভীমরতি শব্দের নাকি সৃষ্টি। 
   আরেকভাবে অর্থ এরকম- ভীমরতি =ভীম + রতি,অর্থাৎ ভীম মানে ভীষণ,আর রতি মানে রাত্রি। ভীষণ রাত্রির অন্ধকারে কামকলা বিলাসের কামনা তথা উত্তেজনা এক প্রকার ভীমরতি। বয়স্ক পুরুষদের একটা সময় জৈবিক কামনা বৃদ্ধি পায়। বার্ধক্য উত্তেজনা থেকে রুচিবিকৃতি ঘটে। কেউ কেউ দমন করে রাখেন,কেউ কেউ তা পারেন না। তাদের এই স্বভাবকে ভ্রষ্টামী ও নষ্টামীর নামান্তর ভাবা হয়। এই স্বভাবকে প্রবল কটাক্ষ করতে ভীমরতি কথা দিয়ে বিদ্ধ করা হয়। মধুসূদন দত্ত লিখেছিলেন 'বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ' নামে একটি প্রহসন। বইটিতে পাই এক বৃদ্ধ বিয়ে পাগল। বৃদ্ধের বিয়ে পাগলামি দেখে ছেলের দল পথের ধুলো গায়ে ছুঁড়ে,নানা নিন্দা মন্দ শোনায়। তবুও বুড়োর ভয়ঙ্কর রতিভাব দূর হয় না। এই ভীমরতি ভাব থেকে চারিত্রিক অসংঙ্গতিকে তীব্র কটাক্ষ করতে,সামাজিক অবক্ষয় চোখে আঙুল দিয়ে দেখাতে এ হেন নাটক মধুসুদন লিখেছিলেন। অর্থাৎ বৃদ্ধ বয়সে কামনা ও রমনের এক ভীষণরকম দশা হল ভীমরতি।
  আরো কিছু কথা আছে বাকি। ভীমরতি বুদ্ধি নাশকে বোঝায়। অসতের পাল্লায় পড়লে অনুশোচনামূলক খেদোক্তি - "কি ভীমরতি হয়েছিল রে বাবা ও পাল্লায় পড়লাম!" 
  বার্ধক্যে পতিকে পত্নী বলেন- "এই বয়সে ভীমরতি রোগে ধরল নাকি!" কথাটার ধরণে পতি হাসেন, কারণ গিন্নির আজকাল কথাটা বলার অভ্যেস হয়ে গেছে।যদি বৃদ্ধ হয় এই কথাটা সংসার সামলাতে না পারলে শোনার অভ্যেস করতে হবে- আ মরণ ও  ভীমরতি - এই দুটি কথা। এও সুখি দাম্পত্যের লক্ষণ।
   সুতরাং ভীমরতি একটি বিশেষ ভাব যা কাম ও রমন,আচরনের অসংগতি স্বভাব,ব্যবহারিক জীবনের এক জীবনরসরসিকতা,এক স্থায়ী রসলাপ থেকে কুস্বভাবের ভর্ৎসনা কি নেই! বর্তমান শব্দটির মার্কেটিং দর দেখে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত স্যারেন্ডার করে বসে আছে। 
জয় বাবা ভীমরতি। তুমি রসেবসে থাকো। কারো পৌষমাস,কারো সর্বনাশ দিয়ে তোমার নিন্দায় তুমি তোমার মত,আবার বন্দনায় মদত সে কি আর বলতে! আবার বলি তোমার জয় হোক।
                ******
#কপিরাইট রিজার্ভ ফর মৃদুল কুমার দাস।

বৃহস্পতিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২১

#নাম- জ্ঞাণ - দর্শণ ও বিজ্ঞান। ✍- মৃদুল কুমার দাস।

সন্ধ্যার আলোচনা-বাসর।
#বিষয় - *দর্শন ও জ্ঞানের মধ্যে কি কোনো বিরোধ  আছে?*
  # নাম - *বিজ্ঞান ও দর্শন।*
  ✍ - মৃদুল কুমার দাস। 

   জ্ঞানের দুই জমজ- দর্শন ও বিজ্ঞান। বিশেষরূপে জ্ঞাণ বিজ্ঞান। আর দর্শন বা ফিলসফি শব্দের অর্থ  হল কোনো স্থিরতা নেই। কখনো অর্থ  আধ্যাত্মিক তত্ত্ব, কখনো প্রাকৃতিক জ্ঞাণতত্ত্ব, কখনও অর্থনীতি,ধর্মনীতি,কখনও বা বিচারবিদ্যা। ফিলসফির উদ্দেশ্য হল জ্ঞাণ। এই জ্ঞানের  উদ্দেশ্য  আলাদা। এর  উদ্দেশ্য নির্মাণ, মুক্তি, পারলৌকিক অবস্থা। দর্শন জ্ঞান হল সাধনার জ্ঞাণ। সে সাধনার গতি বিচিত্রগামী। আদি দৈবিক,আদি ভৌতিক, কখনও নৈতিক বা সামাজিক জ্ঞান। এসবই সংসারের সুখ, দুঃখ,আনন্দ থেকে আসে। জীবনের  নানা বৈচিত্র্যপূর্ণ গতির মূল্যায়নের নাম দর্শন। তাই সে নানা মতবাদভিত্তিক - হিন্দু,ইসলাম, খ্রিস্টান ধর্মীয় মতবাদের পরিচয় হল দর্শন। দর্শনের নানা মত - *যত মত তত পথ।* জন্মান্তরবাদ একটি দার্শনিক মতবাদ। সাংখ্যদর্শণ,বেদ,বেদান্তের পরিচয় দর্শনে - হিন্দুদর্শণ। মার্কসীয় দর্শন যেখানে তত্ত্ব সেখানে দর্শন, আর যেখানে দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ সেখানে জ্ঞানের বিশেষরূপ তখন বিজ্ঞান। জ্ঞান কখনো দর্শন, আবার কখনো বিজ্ঞান। জ্ঞানের বিশেষ রূপ বিজ্ঞান। 
  তাহলে জ্ঞান হল নিজেকে জানার সোপান। যদি বলি *আকাশ কুসুম* তাহলে মুহূর্তে বুঝতে পারি আকাশ কী আর কুসুম কী। এই অর্থও শেষ  কথা হল না। অর্থের আরেক  উদ্ঘাটন আছে - অলীক কল্পনা। যদি বলি *অরণ্যে রোদন* অরণ্যে গিয়ে কোনো কান্না নয়,প্রান্তিক অর্থ হল- নিষ্ফল আবেদন। *দেশের  লজ্জা* বললে দেশের মানুষগুলোর লজ্জা। আবার যদি বলি গাছেরও খাব তলারও কুড়াব - এ হল ব্যবহারিক জীবনের দর্শন। আর গাছটি কেন এক্ষেত্রে এলো তাই জানাটাই হলো জ্ঞাণ।এইভাবেই জীবনদর্শণ জ্ঞানের  সীমায় ধরা দেয়। জীবনদর্শণ মানেই জীবনের যথার্থ সত্যের সন্ধানে থাকা। সেই সন্ধান মানেই যতদিন বাঁচি ততদিন শিখি। যত ভুল তত শিক্ষা। জীবনের যেমন দর্শন আছে,মৃত্যুরও তেমনি দর্শন আছে। কী সেই দর্শন-মৃত্যুর পাত্র  থেকে জীবন উঠে আসে। জীবন  সরিয়ে নিলে মৃত্যু পড়ে থাকে। জীবন রক্ষা করে চলতে হয়,মৃত্যুকে রক্ষা করতে হয় না। এই রক্ষার জন্যই মৃত্যুকে এতো ভয় হয়। ভয় কারা করে? না অন্নপায়ী থেকে জীবন রক্ষা করতে হয় বলে,তা থেকে বাঁচার  আনন্দ আসে বলে তাই মৃত্যুকে সবাই ভয় পায়। ভয় তখন হয় না যখন মৃত্যুকে জয় করতে পারা যায়। রবীন্দ্রনাথ সেই মৃত্যুকে জয়ের  কথা দিয়ে রবীন্দ্রনাথ মৃত্যুদর্শণের কথা বলেছেন। তাই  একপ্রকার জ্ঞানের  কথা।
  উপদেশ একপ্রকার জ্ঞাণ। উপদেশ দিলে বলে বেশী জ্ঞাণ দিও না।
  আর জ্ঞাণের আরেক দিক বিজ্ঞান। আপেল নীচের  দিকে পড়া থেকে মাধ্যাকর্ষণ বল এলো। নিউটন যা বললেন বিশ্ব তাই মানল। জগদীশ চন্দ্র বসু উদ্ভিদের  প্রাণ আছে প্রমাণ দিলেন। এখন নিউটন যা বললেন তা যদি জগদীশ চন্দ্র বসু বলেছিলেন বলি,আর জগদীশ চন্দ্র বসু যা বলেছিলেন তা যদি বলি নিউটন বলেছিলেন, তাহলে জ্ঞাণ লাভ ভুল হয়ে গেল। এই বিশেষ জ্ঞাণ লাভটাই হল বিজ্ঞান। দুই বিজ্ঞানীর গবেষণার বিষয় নিয়ে জানাই হলো বিশেষ জ্ঞাণ তথা বিজ্ঞান। 
  এই জ্ঞাণ থেকে উদ্ভূত বিজ্ঞানের জন্য পাশ্চাত্যকে প্রাচ্য খুব  সমীহ  করে,আর প্রাচ্যের জ্ঞান থেকে উদ্ভূত দর্শণের জন্য পাশ্চাত্য প্রাচ্যকে খুব সমীহ করল। জ্ঞাণের বস্তুতান্ত্রিকতায় পাশ্চাত্য ভরকেন্দ্র,আর প্রাচ্যের ভরকেন্দ্র ভাববাদী দর্শণে। 
  সুতরাং বিরোধ কথাটি একদম আসেনা। দর্শণ ও জ্ঞাণ বিরোধ ভাবা নিরর্থক। জ্ঞাণই জগত ও জগতের সার। তার দুই অপত্য দর্শন ও বিজ্ঞান। 
                ********
#কপিরাইট রিজার্ভ ফর মৃদুল কুমার দাস।

বুধবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২১

#গল্প-বেকার জীবন #কলমে -সোমা দে।

বিষয় -গন্ধ
শিরোনাম-বেকার জীবন। 
কলমে -সোমা দে। 
তারিখ -22/9/2021

অভি ঘোষ। পাড়ায় সবথেকে ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট। মাধ্যমিক থেকে শুরু করে এম. এসসিতে তাঁর রেজাল্ট দারুণ। পাড়ার সব কাজে এক নম্বর। কিন্তু অভির যে একটাই দুঃখ, অভির বয়সী পাড়ার সকলেই যে চাকরী করে। এখানেই যে অভি সবার থেকে পিছিয়ে। যেখানেই ইন্টারভিউ দিতে যায় সেখানেই সবার এক কথা, "তুমি তো এতো শিক্ষিত। তোমার  তো আরো ভালো নামকরা কোম্পানিতে কাজ করা উচিৎ। " সব জায়গায় সবাই অভির প্রশংসায় পঞ্চমুখ কিন্তু কাজটি দেওয়ার বেলায় শুণ্য। সকলকে এত করে কাজ দেওয়ার কথা বলাতে পাড়ার সকলে অভিকে একটি কাজ দিয়েছে বটে।লোকের বাড়ি পরিস্কারের কাজ। এতে তাঁর কোনরকমে দিন চলে যায়। কিন্তু অভির বাবা -মা এতে নয় যে সন্তুষ্ট। তাই তাঁরা থাকে না অভির কাছে। তাঁরা থাকে অভির বড় ভাইয়ের কাছে। ছোট ভাইয়ের দায়িত্ব নিতে তারা পারবেনা। অভির বাবা -মা রাখেনা যে তাঁর কোন খোঁজ। ছোট ছেলে যে বেকার। সে যে লোকের বাড়ি পরিষ্কারের কাজ করে। 

একদিন অভি রাতে নিজের ঘরে শুধু সাদা ভাতখানি রান্না করে সামনে নুন লঙ্কা নিয়ে বসেছে।খাবে বলে। কারন কিছুদিন ধরেই বাড়ি পরিস্কারের কাজটি ঠিক পাচ্ছিলনা। তাই আগে যা টাকা আয় করে ছিল তা দিয়ে এখন ঐ সেদ্ধ ভাতই জোটে। সেদিনকে অভির পাশের বাড়িতে ছিল বিয়ে। বেশ রকমারি খাবারের গন্ধ চারিদিকে ছড়িয়ে গেছে। সেইসময় অভি সাদা ভাত নিয়ে বসেছে খাবে বলে। এমন সময় নাকে সেই রকমারী খাবারের গন্ধ পেয়ে তাঁরও খুব ইচ্ছে করছিল তাঁর সেই সাদা ভাতখানির সঙ্গে একটু মাছ, মাংস খাবার। চোখে জল চলে এল অভির। পরমুহুর্তেই  চোখের জল মুছে অভি দীর্ঘনিশ্বাসের মাধ্যমে সেই রকমারি খাবারের গন্ধ নিয়ে তাড়াতাড়ি সেই সাদা ভাতখানি আনন্দের সঙ্গে খেয়ে নিল। খাওয়া শেষ করে সে মনে মনে ভাবল, এইরকম খাবারের গন্ধ যদি রোজ তাঁর খাবার সময় ভেসে আসে তাহলে খাওয়াটা বেশ পরিপূর্ণ হয়। 

পরবর্তী কালে অভি কষ্টের ফল হিসেবে কেষ্টকে পেয়েছে। অর্থাৎ যোগ্যতাবলে একটা ভালো কোম্পানিতে কাজ পেয়েছে। এখন যে তাঁর নেই কোন অর্থের অভাব, নেই কোন খাদ্যের অভাব। এখন সে যে বাবা-মা, দাদার কাছে খুব প্রিয় একজন মানুষ। এখন সবাই কতো খোঁজ নেয়। কিন্তু অভি যে ভোলেনি সেই দিনের কথা। 

@কপিরাইট রিজার্ভ ফর সোমা দে। 

শনিবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২১

MAY I COME IN , MA'AM

ঠান্ডা কনকনে হওয়া , আজ সারাদিন বৃষ্টি পড়েছে । জানলাটা খুলে চাদর গায়ে দিয়ে শুয়ে পরলাম । পা দুটো অবশ লাগছে , সবদিনই পরিশ্রম হয় কিন্তু আজ যেনো একটু বাড়াবাড়ি করে ফেলেছি । আমার এই জোরজবরদস্তির খাটুনিতে সবার আপত্তি কিন্তু কাউকে বোঝাই না আসলে বোঝাবার প্রয়োজন বোধ করি না যে .... এই যন্ত্রণাই এখন বেঁচে থাকার রসদ। 

তিন তিনটে বছর হয়ে গেলো। একসাথে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালে বসে সূর্যাস্ত দেখা , ফাঁকা রাস্তায় ক্লান্ত শরীর বয়ে হাঁটা , কিছু নির্জন গলিতে অনুভূতির আনাগোনা ....
সবকিছুর স্মৃতি এখন তোমার কাছে ঝাপসা । 

শুয়ে শুয়ে চোখের কোন দিয়ে মনের আর্তনাদ গুলো নিঃশব্দে গড়িয়ে পরছে । কিছু বছর আগেই যার গভীর ,আকাঙ্খিত, দৃষ্টি দেখে আমার সব কষ্ট দূর হয়ে যেত সেই আজ ... হা হা । তুমি বরাবরই নিজের প্রতিষ্ঠার বিষয়ে সতর্ক ছিলে কিন্তু এতটা , সেটা হয়তো বুঝতে পারিনি সেদিন । 
ভোরের আলো মুখে পড়তে চোখ খুললো । তৈরি হয়ে আবার সেই নিত্য জীবনযুদ্ধে চলে এলাম । 
ও বলা হয়নি , চাকরি পেয়ে দরিদ্র পরিবারের মেয়ের সাথে না থাকতে চাওয়া মানুষটার গম্ভীর গলায় নিজের নাম শুনে ভারী তৃপ্তি হতো , সে এখনো ডাকে পার্থক্য শুধু ..... 

ঠিক সেই সময় , office cabin এর door knock করে গম্ভীর গলায় একজন বলে উঠলো : 
 " MAY I COME IN , MA'AM "
ভিতরে এলো এক গভীর , আকাঙ্খিত দৃষ্টি । 


Picture #collected 

শুক্রবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২১

ভাগ্যিস তুমি প্রেমিক হওনি ।

বরাবরই ভালোবাসার জন্য একজন আদর্শ প্রেমিক চেয়েছি । কিন্তু তুমি প্রেমিক হয়ে উঠতে পারোনি । তুমি বন্ধু হয়ে আমার হাসির কারণ হয়ে উঠেছ , কিন্তু প্রেমিক হয়ে সবার সামনে আমার উৎকট হাসি বন্ধ করে গম্ভীর থাকতে বলোনি ।  তুমি শিক্ষক হয়ে আমাকে নিজের লড়াই নিজেই লড়তে শিখিয়েছ , প্রেমিক হয়ে শুধু প্রতিশ্রুতি দিয়ে থেমে যাও নি । তুমি পাহাড়াদারের মতো আমার সম্মান রক্ষা করেছ , প্রেমিক হয়ে স্পর্শ করতে  চাওনি কখনো । সঙ্গী হয়ে দুঃখের কারণ খুঁজে তার সমাধান করেছ , প্রেমিক এর মতো খালি সান্তনা দাওনি । বটবৃক্ষ হয়ে আমায় প্রখর রোদ থেকে বাঁচিয়ে রেখেছ , প্রেমিক এর মতো আমাকে তপ্ত রোদে কখনো অপেক্ষা করাও নি । তুমি আমার স্বাধীনতা হয়ে আমাকে আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছ , প্রেমিক হয়ে আমার পোশাক পড়ার ধরণ নিয়ে প্রশ্ন তোলোনি । তুমি মুক্ত আকাশ হতে পেরেছ , বদ্ধ সোনার খাঁচা হওনি । এখন মনে হয়, ভাগ্যিস তুমি প্রেমিক হওনি । নাহলে হয়তো বুঝতাম না.... ভালোবাসা কাকে বলে ।।প্রেমিক

শনিবার, ২৮ আগস্ট, ২০২১

বিতর্ক## বিপক্ষে বক্তব্য : শর্মিষ্ঠা ভট্ট

 *আজ এই বিষয়ের বিপক্ষে লিখলাম*



বিষয় টিতে বলা আছে... বৃদ্ধাশ্রম আধুনিক সমাজের অগ্রগতি পথে একটা অন্ধকার দিক।। 

মেনে নিতে পারলাম না। বৃদ্ধাশ্রম এক প্রাচীন প্রথা। যা হয়ত সমাজ ও সময়ের গা ফিলতিতে হারিয়ে গিয়েছিল। আধুনিক সমাজ তা খুঁজে নিয়েছে কিংবা বলা যায় একটা সুস্পষ্ট রূপান্তর ঘটিয়েছে। 

"চতুরাশ্রম " কন্সেপ্ট মেনে নিলে.... সর্বশেষ   বানপ্রস্থ ও সন্ন্যাস। এই বানপ্রস্থ যাকে ইংরেজিতে  রিটায়ার্ড বলা হয়েছে। এই অবস্থায় স্ব পাক ও খাদ্য বস্ত্রের বিলাশ নিবৃত্তির কথা বলা হয়েছে। 

প্রাচীন সমাজে তা মানা হত। এতে ব্যক্তি স্ব ইচ্ছায় নিজেকে তৈরী করত মুক্তি লাভের জন্য। সময় গড়িয়ে গেছে। ভোগ ও বয়সের জ্ঞান কমে গেছে। কিংবা সেই প্র্যাকটিস বা অভ্যাস থেকে ধীরে ধীরে ভারতীয় মানুষ সরে গেছে। কিন্তু সমস্যা রয়ে গেছে। এই বয়সের কর্মহীন মানুষ নিজের ও অন্যের কাজের বাঁধা হয়ে যায়। বিকাশ রোধ হয়। অনেক সময় দেখা যায় পঞ্চাশ বছরের অনেকে ডিসিশন নিতে পারেন না। কারন পূর্বপুরুষদের তার ওপর ছাতা হয়ে থাকা। একটা বয়সের পর নিজেকেই এই ভাবে তৈরী করা উচিৎ.... সংসার থেকে মুক্তি। তাতে একটা সামাজিক ভারসাম্য রক্ষা হয়। জেনারেশন গ্যাপের চিন্তাধারা অনেক পার্থক্য হয়। অনেক সময় এই নিয়ে অশান্তি লেগে থাকে। আমার ব্যক্তিগত মত. ..সামাজিক সুস্থতার কারনে সরকার থেকেই উদ্যোগ নেওয়া উচিত। অনেক অবাঞ্ছিত বৃদ্ধ /বৃদ্ধা ওষুধ খাদ্য বস্ত্র পায় না, সংসারে থেকেও। যদি একটা বয়সের পর এই সব মানুষদের জন্য ফাউন্ডেশন খোলা হয়। ঘরে থেকে রোজ ঝগড়া নাটক কোন সুস্থতার কথা নয়, বাচ্চাদের ওপর তার প্রভাব পড়ে। তার থেকে বৃদ্ধাশ্রম কন্সেপ্ট মাথায় রেখে জীবনের প্রথম থেকে যদি কিছু টাকা সরকারি উদ্যোগে রাখার নিয়ম থাকে, এবং প্রতি সন্তানের আয়ের সামান্য কনা যদি রেগুলার জমা হয়। বৃদ্ধাশ্রমের থেকে ভয় মানুষের মনের ভ্রম, মায়ার বন্ধন। আগে থেকেই মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকলে নিজেকে এবং সন্তানের মুক্ত জীবন দেওয়া যায়। বিদেশে বাবামা বৃদ্ধ বয়সে অনেকে একা থাকেন তাদের এত কাঁদুনি বা হাহাকার নেই। কারন সহজে এ্যাকসেপ্ট করার মানসিকতা তৈরী করতে হবে। আসল কথা অভ্যাস বা প্র্যাকটিস। দিনের পর দিন যদি বৃদ্ধাশ্রম অভ্যাস করা যায় তাহলে পরবর্তী প্রজন্মের ক্ষেত্রে এটি অতি সহজ সামাজিক কালচার বা সংস্কৃতি হয়ে দাঁড়াবে। 

নমস্কার

শুক্রবার, ২৭ আগস্ট, ২০২১

স্বপ্নের গুঞ্জন- জয় ঘোষ / পিছুটান

 

#পিছুটান 🖋️

জানিস তো মামনি,, আমি যখন ছোটো ছিলাম তখন বাড়ি থেকে আমার বাবা কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলেন না যে, তার মেয়ে পাড়ার মঞ্চে গিয়ে নাচ করতে পারে? সেই জন্ম থেকে দেখছি সংসারে দাদারা যে আদর যত্নটা পেয়েছে সেটা আমি কখনো পেলাম না। তা নিয়ে এই বয়সে আর কোনো আক্ষেপ নেই। তবে ওই যে "মা" বলে একজন মানুষ প্রত্যেকটা সংসারে থাকে। যে ছেলে-মেয়ে সকলকে এক চোখেই দেখে নিজের সন্তান হিসেবে। তার জন্যই আমি কখনো মরতে পারলাম না। 

বাবার থেকে, দাদাদের থেকে সব সময়ই এত অপমান আমি পেতাম যে, আর বাঁচতে ইচ্ছা করতো না। কতবার মরার চেষ্টা করেছি জানিস! কিন্তু পারিনি। শুধুমাত্র একটা মানুষের মুখ চেয়ে। 

ভেবেছি আমি যদি মরে যাই তাহলে সে আর বাঁচবে না। তাই মায়ের জন্য আমাকে বাঁচতেই হবে। 

আর দেখ, বিয়ের পরে কপালের ফেরে সেই একি অপমান সহ্য করছি তোর বাবা দাদুর থেকে। কিন্তু মরতে পারছি না। 

এখন তুই প্রশ্ন করতেই পারিস যে, দিদা তো মারা গেছে তাহলে তোমার এখন বাঁধা কিসের?

তখন উত্তরে আমি বলব,, বাঁধা তো তুই রে মা? বিয়ের আগে ভাবতাম মা যদি কখনো মারা যায় তাহলে আমিও আর থাকবো না এই পৃথিবীতে। আর তোর জন্মের পর থেকে ভাবি আমি যদি মারা যাই তাহলে তোর কি হবে? 

আমার মুক্তি কি আর হবে না রে মা?

এই পিছুটান নিয়েই কি আমাকে সারা জীবন চলতে হবে? এটাই কি মেয়েদের জীবনের দুর্বলতা হয়ে থেকে যাবে বংশ-পরম্পরা ধরে? শুধুমাত্র এই একটা শব্দের জন্যই কি আমরা বাঁধন খুলে বেরোতে পারবো না? "পিছুটান"...


© জয়...🍂

শুক্রবার, ২০ আগস্ট, ২০২১

অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর(সুদেষ্ণা দত্ত)


 বিষয়:অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর

সুদেষ্ণা দত্ত

 

জন্ম:৭ই আগস্ট,১৮৭১

মৃত্যু:৫ই ডিসেম্বর,১৯৫১

                  বহু প্রতিভার জন্মস্থান কলকাতার জোড়াসাঁকো ঠাকুর বাড়ী।এই ঠাকুর পরিবারে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ,সত্যেন্দ্রনাথ,দ্বারকানাথ,গগনেন্দ্রনাথ,রবীন্দ্রনাথ প্রমুখ বহু দিকপালের জন্ম হয়।সেই নক্ষত্র গোষ্ঠীর এক অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্র হলেন অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর।অবনীন্দ্রনাথের পিতা ছিলেন দ্বারকানাথের পৌত্র গুণেন্দ্রনাথ।

                 রবীন্দ্রনাথের মতোই অবনীন্দ্রনাথ বিদ্যালয়ের প্রথাগত ধরাবাঁধা শিক্ষায় মনোযোগী ছিলেন না।ঠাকুর বাড়ীর গৃহ শিক্ষকের কাছেই শিক্ষালাভ করেন।অল্প কিছুদিন সংস্কৃত কলেজেও পড়েছিলেন।ইংরেজী,ফরাসী,সংস্কৃত ও বাংলা সাহিত্যে তাঁর দখল ছিল।

        হাতের কাজ ও চিত্রশিল্পের প্রতি ছিল তাঁর সহজাত আকর্ষণ।অল্প কিছুকাল সংস্কৃত কলেজে অধ্যয়ন করার পর প্রথমে ইতালিয়ান শিল্পী সিগনোর গিলহার্ডি এবং ইংরেজ শিল্পী লেডি পামারের কাছে চিত্রাঙ্কন বিদ্যা শিক্ষায় মনোনিবেশ করেন।এই রীতিতে চিত্রাঙ্কন করে তিনি তৃপ্তি পাননি।এরপর শুরু হয় ভারতীয় চিত্রাঙ্কন রীতির পুনরুদ্ধারের সাধনা।প্রাচীন হিন্দু শিল্পকলা ও মুঘল চিত্রকলা চর্চায় মনোনিবেশ করেন।১৯০৫ সালে তিনি গভর্নমেন্ট আর্ট স্কুলের সহাধ্যক্ষ ও পরে অধ্যক্ষ হয়েছিলেন।

        অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর একাধারে সাহিত্যিক,শিল্পী,শিল্প গুরু এবং শিল্পরসিক।তাঁর প্রতিটি সৃষ্টিই আনন্দময় সৃজনের স্বর্ণসম্ভার।অবনীন্দ্রনাথের কালজয়ী প্রতিভার স্পর্শেই লুপ্তপ্রায় ভারতীয় শিল্পকলা সঞ্জীবিত হয়ে উঠেছিল নতুন নতুন সম্ভাবনায়।আবার এই অদ্বিতীয় শিল্প স্রষ্টার মধ্যেই লুকিয়ে ছিল এক কথাশিল্পী মানুষ।সেই ‘ছবি লিখিয়ে’ অবন ঠাকুরের অনন্য অবদান বাগীশ্বরী শিল্প প্রবন্ধাবলী।

           সাহিত্যে তাঁর লাজুক পদসঞ্চার হলেও সহজ-সরল কথপোকথনের ভঙ্গীতে শিশু হৃদয়ে স্থায়ী আসন লাভ করেছেন।তিনি শিশু মনোরাজ্যের খবর রাখতেন।শব্দের সঙ্গীত সৃষ্টিকারী দিকটি তিনি চর্চার দ্বারা উদ্ঘাটিত করেছিলেন।তাঁর শকুন্তলা,রাজকাহিনী,নালক,বুড়ো আংলা,খাজাঞ্চির খাতা,ভূতপরীর দেশ,মারুতির পুঁথি,আলোর ফুলকি মালি,একে তিন তিনে এক,রংবেরং ইত্যাদি গ্রন্থ সহজ সরল ঘরোয়া ভাষায় রচিত অপূর্ব সাহিত্য।আত্মজীবনীমূলক স্মৃতিচিত্র ‘আপন কথা’, ‘জোড়াসাঁকোর ধারে’, ‘ঘরোয়া’ সাহিত্য তাঁর অক্ষয় কীর্তি।

    বিধাতা তাঁর হাতে তুলি ও বর্ণের ভান্ডার দিয়ে পাঠিয়েছিলেন,তাঁর প্রবন্ধ-নিবন্ধেও লেগেছে সেই রঙের ছোঁয়া।শিল্পী অবনীন্দ্রনাথ ভারত শিল্পাকাশে এক উজ্জ্বলতম জ্যোতিষ্ক।কেউ কেউ বলেন প্রতিভা আগুন।সত্যিই প্রতিভার এমন অগ্নিময় স্পর্শে তাঁর প্রত্যেকটা সৃষ্টিই হয়ে উঠেছে সোনা।

©কপিরাইট রিজার্ভড ফর সুদেষ্ণা দত্ত। 

            

            

         

নাম-খাওয়া(সুদেষ্ণা দত্ত)


নাম--খাওয়া(সুদেষ্ণা দত্ত)

 খাদ্য গ্রহণের সময় অনেকেই প্রথম গ্রাস ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে নিবেদন করেন।তাই জগন্নাথ দেবের ছাপান্ন ভোগ দিয়ে শুরু করছি আজকের নিবেদন।পুরাণ মতে যশোদা বালক কৃষ্ণকে আট প্রহর খেতে দিতেন।দেবরাজ ইন্দ্রের রোষে পড়ে যখন একসময় মহাপ্রলয়ের সৃষ্টি হয়েছিল তখন শ্রীকৃষ্ণ জীব জগৎকে রক্ষা করতে কনিষ্ঠ আঙুলে গোবর্ধন পাহাড় তুলে নিয়ে সাতদিন ছিলেন নির্জলা উপবাসে।যে ছেলে দিনে আটবার খায় তাকে সাতদিন উপবাসে দেখে যশোদার মাতৃ হৃদয় ব্যাকুল হয়।তিনি ও ব্রজবাসীরা মিলে সাতদিনের আটপ্রহর হিসেবে ছাপ্পান্নটি পদ কৃষ্ণকে নিবেদন করেছিলেন।নারায়ণের সেই ছাপ্পান্ন ভোগই রূপভেদে মহাপ্রভুর ছাপ্পান্ন ভোগ।

ভিতরে মরিচ গুঁড়ো বাহিরে জুড়ায় সুতা।

তৈলে পাক করিয়া রান্ধে চিংড়ির মাথা।।

এই সুস্বাদু ব্যঞ্জনটি বরিশাল জেলার গন্ধ বহন করে আনে।স্থান,কাল ভেদে খাবারও নানা রকম হয়।ভাল রাঁধুনি কলমি শাকের গন্ধ নিয়ে পুকুর চেনে।যে কচু গাছের ছড়ার মত পাতা বেরিয়েছে,ফুলের মত হয়ে আছে গাছ--সেই গাছই গর্ভবতী বলে বুঝতেন পাকা রাঁধুনি।তারমধ্যে টইটম্বুর দুধ।ঠাকুমা—দিদিমাদের হাতের আচার,বড়ি, আমসত্ত্ব আজও কত নাতি—নাতনীর জিহ্বার লালা ক্ষরণ ঘটায়।

ইংরেজ আমলে বাংলাদেশে দুর্ভিক্ষ হয়েছিল প্রায় আঠারো বার।তবে মেছো বাঙালী কিন্তু ইংরেজ বা ডেনদের সঙ্গে মাছ খাওয়ায় পংক্তিভোজনে আসতেই পারবে না।ঈশ্বর গুপ্তের লেখনী থেকে জানা যায় ইংরেজদের সঙ্গে ভেটকি,চিংড়ি,ইলিশের প্রতিযোগিতার বাজার ছেড়ে বাঙালী কুচো চিংড়ি আর চুনো পুটিকেই  অবলম্বন করে বাড়ায় তাদের স্বাদের আস্বাদ।আর বিদেশীরা বেছে নেয় দেশী তপসে।অষ্টাদশ,উনবিংশ শতকের গোড়ার দিকে এই তপসে মাছ ছিল কলকাতার ইংরেজদের আরাধনা।তপসে মাছ ইংরেজদের এত প্রিয় ছিল যে এক ডিস তপসে মাছ খাওয়ার জন্য বিলেত থেকে সমুদ্র যাত্রার ধকল নিতেও তারা প্রস্তুত ছিল।আমের মরসুমে তপসের আবির্ভাব বলে ঈশ্বর গুপ্তের মতে, 

‘ এমন অমৃত ফল ফুলিয়াছে জলে।

সাহেবরা সুখে তাই ম্যাঙ্গো ফিশ বলে’।।

স্থাপত্যকে খাবারের সঙ্গে যুক্ত করে অযোধ্যার নবাবরা মাছকে প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেছেন।নবাব বংশের প্রতিষ্ঠাতা সাদাত আলি পুরোনো লখনৌয়ের কেল্লার নাম রাখেন মচ্ছিভবন।এই মাছের প্রতীকের আদি হিসেবে দুটি তত্ত্বের উল্লেখ আছে।প্রথমত,এই মাছ এক মান্য ধর্মীয় পুরুষ খাজা খিজিরের প্রতীক।তাঁর তত্ত্বাবধানেই ছিল পুরাণের সেই অমরত্বের কূপ।তিনি তার পবিত্র জল পান করেছিলেন।দ্বিতীয়ত,ইসলাম পূর্ব আমলে শেখ আব্দুল রহিম নামে বিজনৌরের এক ভাগ্যান্বেষী পারস্যে শাহী জায়গীর লাভ করেছিলেন।শেখ রহিম শাহী দরবার থেকে মৎস্য ধ্বজা দ্বারা সম্মানিত হয়েছিলেন।তাঁর কেল্লার একটা বাড়ীতে ছাব্বিশটা খিলান ছিল।তার প্রত্যেকটিতে দুটো-দুটো করে মোট বাহান্নটা মাছ খোদাই করা ছিল।তাই কেল্লাটির নাম হয়ে যায় মচ্ছিভবন।

কথিত আছে তৈমুর লঙের হাত ধরে ভারত ভূমির মাটি স্পর্শ করে প্রায় সকল মানুষের কাঙ্খিত বিরিয়ানি।আর কলকাতা বিরিয়ানি—যাতে আলু যুক্ত হয় তা আসে অযোধ্যার নবাব ওয়াজেদ আলি শাহের হাত ধরে।নবাব মেটিয়া বুরুজকে ছোটখাটো লখনৌতে পরিণত করেছিলেন।তাঁর শিরা—ধমনীর শোনিত ধারায় ছিল নবাবিয়ানা।সেই বিলাস—ব্যসনে নবাবী কোষাগারে টান পড়ে।আলুর দাম যদিও তখন কম ছিল না।কিন্তু মাংসের থেকে তো কম।তাই পর্তুগিজদের হাত ধরে আলু আসার পরেই পরিমাণ বাড়াতে সমস্ত নবাবী কর্মচারী ও সেনাবাহিনীর জন্য তৈরি হয় এই নতুন বিরিয়ানি।

সেই কবে মহাভারতের বনপর্বে যুধিষ্ঠির বলে গিয়েছিলেন, “সাধুগনের গৃহে তৃণ,ভূমি,জল ও সুনৃত এই চারি দ্রব্যের কোনকালেই অপ্রতুল থাকে না।গৃহস্থ ব্যক্তি পীড়িত ব্যক্তিকে শয্যা, শ্রান্ত ব্যক্তিকে আসন,তৃষিত ব্যক্তিকে পানীয়,ক্ষুধার্ত ব্যক্তিকে ভোজন ও অভ্যাগত ব্যক্তির প্রতি নয়ন,মন ও প্রিয় বচন প্রয়োগ ও উত্থান পূর্বক আসন প্রদান করবে।ইহাই সনাতন ধর্ম”।ভারতবাসী আজও এই ধারা বয়ে নিয়ে চলার চেষ্টা করছে।


 ©কপিরাইট রিজার্ভড ফর সুদেষ্ণা দত্ত।

ঋনস্বীকার:শ্রীপান্থর বিভিন্ন লেখনী,কল্লোল লাহিড়ীর রচনা,অন্তর্জাল।

ছবি সৌজন্য:গুগুল

 

        

 

 

মঙ্গলবার, ১৭ আগস্ট, ২০২১

শিরোনাম--চাঁদের হাসি ,।(কলমে-- পারমিতা মন্ডল)

বিষয়--- ছবি দেখে লেখা ।
শিরোনাম-- চাঁদের হাসি।
কলমে -- পারমিতা মন্ডল।
 
পৃথিবীর সবচেয়ে চির নতুন একটি শব্দ হলো মা । যা বহু ব‍্যবহারেও কোনদিন পুরনো হবে না। 

পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় হলো মা, এই মা নামক ছাদটি একমাত্র মৃত্যু ছাড়া কেউ কেড়ে নিতে পারে না।

পৃথিবীতে সবচেয়ে মিষ্টি মুখ হলো মায়ের মুখ। সে মা গরীব হোক বা বড়লোক।
আর পৃথিবীতে সবচেয়ে পবিত্র হাসি হলো শিশুর হাসি। সে শিশু হোক না কোন বড়লোকের বা পথ শিশুর।

আজকের চিত্রে আমারা দেখতে পাই, রাস্তার মধ্যে মৃত মায়ের পাশে একটি শিশু নিশ্চিন্তে খেলে যাচ্ছে।  সে জানেও না , তার জীবনের শ্রেষ্ঠ ও নিরাপদ আশ্রয়টা এই মুহূর্তে আর নেই। তবুও মৃত মায়ের গন্ধ গায়ে মেখে পরম নিশ্চিন্তে খোলা আকাশের নীচে,  পাখিদের উড়ে যাওয়া দেখে খিলখিলিয়ে হেসে উঠেছে।ঊষার রবির ছটায় ,তার চোখে মুখে ফুঁটে উঠেছে এক তেজস্ক্রিয় দীপ্তি।সেও যেন সূর্যের মত উজ্জ্বল হতে চায়। পাখিদের মত আকাশে উড়তে চায়। ফুটতে চায় ফুলের মত।  কিন্তু তার জীবনে দীপ জ্বালানোর সূর্য যে কিছুক্ষন আগে অস্ত গেছে। অবুঝ শিশু তা বোঝে না। এরপর এক সময়  দিনের সূর্যও অস্ত যাবে। আকাশে উঠবে পূর্ণিমার চাঁদ।  সেই আকাশের চাঁদের সাথে পাল্লা দিয়ে এই মাটির চাঁদও, জ‍্যোৎস্না ছড়াবে চারিদিকে। হয়তো আকাশের চাঁদ হার মেনে নেবে এই ক্ষুদে চাঁদের সৌন্দর্যের কাছে। তবুও মাটির চাঁদ হেরে যাবে, হারিয়ে যাবে একদিন গহন অন্ধকারে। কারণ তাকে সামলে রাখার মানুষটি আর নেই।

আকাশের চাঁদের নিরাপদ আশ্রয় তার অনন্ত আকাশ। তার সমস্ত কলঙ্ককে আড়াল করে, জ‍্যোৎস্নাটাকে ছড়িয়ে দেয় পৃথিবীতে। কিন্তু এই মাটির চাঁদ ? আজ যে তার আশ্রয় হারালো । এরপর একদিন সে হাজার কলঙ্কে একটু একটু করে ডুবে যাবে। একদিন হারিয়ে যাবে অন্ধকারের চোরাগলিতে। আশ্রয় হবে কোন দুস্কৃতি নারী পাচারকারী দলের কাছে। অথবা কোন পতিতালয়ে।

পৃথিবীর সমস্ত বিপদ থেকে তার সন্তানকে রক্ষা করতে পারে একমাত্র তার মা। আজ সেই ছাদটাই হারিয়ে গেল শিশুটির মাথার উপর থেকে। বড় নিষ্ঠুর এই পৃথিবী।

All rights are reserved by paramita.

সোমবার, ১৬ আগস্ট, ২০২১

# নাম - অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ✍️ - মৃদুল কুমার দাস।

শুভ সান্ধ্যকালীন সাহিত্য আলোচনা-বাসর।
 #বিষয় - *চিত্রশিল্প।*
#নাম - 
    *অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর।*
✍️ - মৃদুল কুমার দাস।

    সৃষ্টির জন্য শ্রষ্টা হন মহৎ,যদি সৃষ্টি হয় সর্বোত্তম। জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়ি বঙ্গীয় শিল্প সংস্কৃতিতে নবজাগরণের একটি বিশেষ ঘরাণা ছিল। ঠাকুর বাড়ির এক একজন জ্যোতিষ্ক - সত্যেন্দ্রনাথ,জ্যোতিরীন্দ্রনাথ,রবীন্দ্রনাথ, গুণীন্দ্রনাথ,গগনেন্দ্রনাথ,সমরেন্দ্রনাথ,অবনীন্দ্রনাথ পরিমন্ডলে ঠাকুর বাড়ি শুধু কি,সমগ্র বাংলা আলোকপ্রাপ্তিতে ভাস্বরতা লাভ করেছিল। তাঁদের হাত ধরে এসেছিল ড্রামাটিক ক্লাব, পত্রপত্রিকা, শিশুপত্রিকা,খামখেয়ালিসভা- এ সবের মধ্যয দিয়ে সৃষ্টির এক একরকম উন্মাদনা বলতে উন্মাদনা! এই ধারায় দু'জন ছিলেন সেরার সেরা - একজন রবীন্দ্রনাথ ও অন্যজন অবনীন্দ্রনাথ। অবনীন্দ্রনাথ পিতা গুণীন্দ্রনাথকে অকালে হারিয়ে পিতৃব্য রবীন্দ্রনাথ তাঁর জীবনের প্রধান সহায় হয়ে উঠলেন। কবিরও অবনীন্দ্রনাথকে খুব দরকার পড়েছিল। যেভাবে খামখেয়ালী সভার দায়িত্ব পালনে এক মহীরুহ হয়ে উঠছেন, কবির না ভাল লেগে পারে। ধুরন্ধর এক প্রতিভার সার্থক গাইড হলেন রবীন্দ্রনাথ। অবনীন্দ্রনাথ ভাল গল্প বলতে পারেন, আর তাকে লেখায় প্রতিষ্ঠা ঠিকঠাক দিলেই কবির লক্ষ্যপূরণ ব্যর্থ হওয়ার নয়। কবির হাত ধরে চলল লেখিয়ে হওয়ার প্রবল তৎপরতা। 
  কবি অবনীন্দ্রনাথকে পেলেন তেপান্তরের মাঠে নিরুদ্দেশে যাত্রার গল্প বলার আবেশে,পেলেন কথকতার সুরে,আর চিত্ররচনার আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপ যেন হাতে নিয়ে ঠাকুর বাড়ির দক্ষিণের বারান্দার জগৎ ছিল তাঁর একান্ত নিজের। বিরল প্রতিভার অধিকারী মুখের ভাষাকে অনবদ্য চিত্ররূপ দেওয়ার অনায়াস দক্ষতা ছিল। আর অসাধারণ বাগ্মীগুণ তো ছিলই। অবনীন্দ্রনাথের শিল্পকীর্তিতে মুগ্ধ কবি একসময় রাণি চন্দকে রসিকতা করে অবন ঠাকুরের রচিত 'ঘরোয়া' প্রসঙ্গে বলেছিলেন- "সত্যিই অবনের সৃজনীশক্তি অদ্ভুত। তবে ওর চেয়ে আমার একটা জায়গায় শ্রেষ্ঠতা বেশি,তা হচ্ছে আমার গান। অবন আর যাই করুক গান গাইতে পারে না। সেখানে ওকে হার মানতেই হবে।" এই বলে কবি হাসতে লাগলেন। কবি নিজের সঙ্গে তুলনা করার এই সহজ রসিকতায় অবন নিয়ে কত আন্তরিক ছিলেন, তা আর বলার অবকাশ রাখে না। 
  অবনীন্দ্রনাথ তাঁর 'বুড়ো আংলা'য় লিখছেন - "কার বাড়ি? ঠাকুরবাড়ি,কোন ঠাকুর? ওবিন ঠাকুর - ছবি লেখে।" যে কারো বিস্ময়ের প্রশ্ন -  ছবি আবার লেখা যায় নাকি? যায়। অবনীন্দ্রনাথ সেই ঘরাণার অগ্রদূত। সে কথাই ছবি ও লেখা দিয়ে প্রমাণ করে গিয়েছিলেন।
  চিত্রশিল্পী হিসেবে তাঁর আঁকা একে একে পাই যেমন- ওমর খৈয়াম(জাপানী রীতিতে আঁকা),শহজাহাদপুরের দৃশ্যাবলী,আরোব্যোপন্যাসের গল্প,কবিকঙ্কন চন্ডী,সাজাহান, কৃষ্ণলীলিবিষয়ক চিত্রাবলী,বজ্রমুকুট,ঋতুসংহার,বুদ্ধ,সুজাতা। আর রচিত গ্রন্থাবলীর শুরু 'শকুন্তলা'(১৮৯৫) দিয়ে শুরু। একে একে রচিত গ্রন্থ, যেমন- 'ক্ষীরের পুতুল'(১৮৯৬),'রাজকাহিনী'(১৯০৯), 'ভারতশিল্প'(১৯০৯),বাংলার ব্রত (১৯১৯),খাজাঞ্চির খাতা(১৯২১),বাগেশ্বরী শিল্প প্রবন্ধাবলী(১৯২৯), 'বুড়ো আংলা'(১৯৪১),আর শেষ প্রকাশ 'রং বেরং'(১৯৫৮) দিয়ে,অবনীন্দ্রনাথ যখন আর নেই - ১৯৫১এর ৫ ডিসেম্বর আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। সবেতেই ছবিই যেন লেখা। লেখা ও ছবি চলছে হাতধরাধরি করে। 
   স্বয়ং কবি বলেছিলেন - "ছোটদের পড়বার মত বই বাংলা ভাষায় বিশেষ নেই। এ অভাব আমাদের ঘোচাতে হবে। তুমি লেখ।" আর সত্যিই সুকুমার রায়ের মতো দিনকে দিন হয়ে উঠতে লাগলেন - 'শকুন্তলা', 'ক্ষীরের পুতুল' - আর 'বাগীশ্বরী শিল্প প্রবন্ধাবলী'র অমরত্ব চিরকালীন এক রসবেত্তা সন্ধান পাই বলে। সুকুমার রায়ের 'আবোল তাবল'এর খেয়ালখোলা ভোলার সার্থক প্রতিমূর্তি। আবার কবির সৃষ্ট 'ঠাকুর্দা' চরিত্রের মূর্ত বিগ্রহ। ঠিক যেন অবনকে দেখে কবির ঠাকুর্দা চরিত্রটি যেন সৃষ্টি।
   'কাটুম-কুটুম' নিয়ে মেতে ওঠার প্রসঙ্গে পরিচারিকার বলছে - "আপনি ওসব কী করছেন,সব ফেলে দিন,লোকে বলবে ভীমরতি ধরেছে।" তখন খেয়াল রাজা অবনীন্দ্রনাথ সহাস্যে বলেছেন -"নারে লোকে বলবে বাহাত্তুরে ধরছে।" - এই কথা রাণি চন্দ এর কাছে কবি শুনে কবিও সহাস্যে বলেছিলেন - "অবন একটা চিরকালের পাগল।" 
   সুকুমার রায়ের 'হ জ ব র ল' আর অবনীন্দ্রনাথের 'বুড়ো আংলা' পরস্পরের পরিপূরক। তবে পার্থক্য 'বুড়ো আংলা' কল্পরাজ্যের সাতরঙা ছবির আলোকবাহার আছে। যেন 'বুড়ো আংলা' Alice-এর বই হয়ে উঠেছে,কারণ অবনীন্দ্রনাথের রচনাও ছবি ও কথা যেন ডানা মেলেছে। যেন Alice-এর প্রেরণায় রচিত বুড়ো আংলা। ছবিই যে কোনো রচনাকে প্রাণবন্ত করে। আর ছোটদের তো আরো বেশী করে চাই। অবনীন্দ্রনাথ সেই চাহিদা পূরণের ভগীরথ।  অবনীন্দ্রনাথ আজ আরো সমানে প্রাসঙ্গিক, এখন যে কোনো সৃষ্টিকে আমরা কথার সঙ্গে ছবি দিয়ে কথাকে আরো আকর্ষণীয় করে তুলি। তিনি যথার্থই রূপশিল্পী,চিত্রশিল্পী,কথাশিল্পী,গভীর ভাব ও ভাবনার শিল্পী,শিক্ষাগুরু অবনীন্দ্রনাথ রঙ,রূপ ও রসের ধারায় বাংলাসাহিত্যে চিরস্মরণীয়।
                     ******
#কপিরাইট রিজার্ভ ফর মৃদুল কুমার দাস।

শনিবার, ১৪ আগস্ট, ২০২১

##সঠিক মানচিত্র ## শর্মিষ্ঠা ভট্ট

 

সঠিক মানচিত্র


আর কিছু সময় পর থেকে স্বাধীনতা দিবস ৭৫ তমের সাক্ষী হব আমরা। কত মানুষের হাত ছেড়ে দিতে হল, তারা আর পঁচাত্তরের স্বাধীনতা দেখতে পেলো না। কি হবে দেখে! অনেকেই হতাশায় বলেন, আবেগহীনতা বাড়ছে। স্বাধীনতা দিবস নিয়ে সেই আবেগহীনতা বাড়ছে। বাড়ছে অসুরক্ষিত হতাশা । 


কেন এই স্বাধীনতা? কি দিল এই স্বাধীনতা? কত প্রশ্ন। শয়ে শয়ে লেখা দেখি কি পাইনির হিসেব সাজিয়ে সুন্দর করে পরিবেশিত হয়। না পাওয়া ব্যাথা আগাছার মতো বড়ো হতে হতে কখন যেন ঢেকে দিয়েছে সেই কষ্টে পাওয়া দিনের আন্তরিকতাকে। সেই টিভি খুলে প্যারেড দেখার বিস্ময়, এখনের শিশুদের চোখে বিস্ময় নেই। রুটিনে আবদ্ধ এও একটা দিন। হয় পতাকা ওড়ানো, কিন্তু যেন মন মরা, রোজ দেখে একঘেয়ে হয়ে যাওয়া দৃশ্য। তার ওপর আকাল। সমস্যা দরজায় টোকা দিয়েছে। 


দেশের মাটি, যাতে মাথা আপনাআপনি নুয়ে আসে সেই যে দেশে ভায়ের মায়ের স্নেহ, কোথাও পাওয়া যাবে না ....কবি নিশ্চিত ছিলেন। সেই সুজলাং সু ফলনাং শস্য শ্যামলং মাটি ....তাকে আপনার ভাবার ধরন পাল্টে গেছে। এখন এই দিনটি ছুটির দিন উৎসব মাত্র। আমাদের মত নির্বিবাদে মানুষ গান কবিতা নাচে দিনটাকে খুঁজে নেবার চেষ্টা করি। কিন্তু সত্যিই কি আমরা চিনি এই দেশের মাটিকে? কতটুকু মাটি আমাদের দেশ!! মানচিত্রে অবশ্য পাওয়া যাবে এর উত্তর। কিন্তু মনে কি সত্যিই আমরা মানি! 


আমরা " বসুন্ধরা কুটুম্বকম্" আইডিওলজি নিয়ে ব্যস্ত আছি। উদার মনোভাব নিয়ে রবীন্দ্রনাথের শেখানো পথে বিশ্বায়নের পথে হাঁটি। কিন্তু আমার দেশের মাটি ভাষার ছোট্ট পরিধির মাঝে আবদ্ধ। কাঁটাতার টোপকে ছুটি গলা জড়াতে কিন্তু অন্য রাজ্যকে বলতে পারি না ... আমি তো তোমাদের লোক। আমাদের স্বাধীনতা দেশের মাটিকে এক ত্রিশঙ্কু অবস্থায় রেখে দিয়েছে। ধর্ম না ভাষা! প্রশ্ন চিহ্ন তুলে তিরঙ্গাকে সর্বদা চ্যালেঞ্জ দিচ্ছে। 


জানি না দেশের মাটি বলতে কতটুকু বুঝি? তবে ক্রিকেট কিংবা অলম্পিকে জিতলে বুকের ভেতর একটা চিন চিনে আবগ কাঁপিয়ে দেয়। এটাই হয়ত দেশপ্রেম। ভারতীয় দেশ ভক্তি। এখানে দেশের মাটির মানচিত্র স্পষ্ট। কিন্তু উন্নাসিকতায় কেউ কাউকে ছেড়ে কথা বলে না। কথায় কথায় শুনি.... বাঙালীরা আত্মকেন্দ্রিক এবং পলিটিক্স বাজ। গা জ্বলে কিনা বলুন? জ্বলে, জ্বলতে পারে। কিন্তু কখনও ভাবি না... ননবেঙ্গলী  মত কেউ "নন" কথাটা কোন প্রদেশে ব্যবহার করে না। সুতরাং তালি দু হাতেই বাজে। তাই তো কখনও যুবা নেতার গলায় শুনি " ভারত টুকরো টুকরো হবে। " কি সেই হতাশা যাতে এমন তেঁতো বক্তব্য উঠে আসে!! দেশের মাটি বলতে আঁকড়ে ধরি প্রাদেশিক জীবন যাত্রাকে। বিশ্ব মানবতার বিশাল আদর্শ তৈরীর আগে তাই প্রাদেশিক রেষারেষি বন্দ করতে হবে। 


ইংরেজি বছরের প্রথম দিন ওনারা সপথ নেন, দেখাদেখি আমরাও শিখে নিয়েছি। কিন্তু ১৫ই আগস্ট, প্রতি বছর যে স্বাধীনতা উপভোগ করছি। কখনও কি ভেবেছি একবছরের জন্য এই দেশের মাটির সপথ নেয়া হোক। কখনও কি প্রয়োজন ছাড়া কোন একটি প্রাদেশিক ভাষা শেখার চেষ্টা করেছি। আমার পরিচিত একজন আমায় লিখেছিলেন " প্লিজ হিন্দি নয়, বাংলা নয়ত ইংরেজি তে এস ও মেস লিখো। অবাক হয়ে ভাবলাম বিদেশী ভাষা জানা এতো কি গর্বের বিষয় হয়ে গেল যে একটু বেঁকা ভাবে বলাই যায় দেশীয় অন্যভাষা শিখতে জানতে লজ্জা কিংবা ঔদাসীন্য বোধ করি। এটা কি ছিল গর্ব ,স্বীকারক্তি, না কটাক্ষ। 


দেশ সম্পর্কে কিছু মানুষ কিছু জানেই না। মানে ইতিহাস ভূগোল অর্থনীতি কিংবা বৈদেশিক নীতি। সাধারণ অনেক মানুষ আছে যারা জানেন না ২৬শে জানুয়ারি কেন হয়? দেশের সীমান্ত গ্রামের মানুষের জীবন কেমন অনেকে তার কোন খবরের প্রত্যাশা না করেই বলে আই লাভ মাই ইন্ডিয়া। 


দেশের মাটির প্রতি মায়া তখন জাগবে যখন একাত্ম হতে পারবো। যখন আঙুল তুলে কেন্দ্র রাজ্য করে চেঁচিয়ে মরবো না। কিছু নেই। রেশন নেই  রাস্তা নেই কারেন্ট নেই বস্তি বেকারত্ব কালোবাজারি কিংবা গুস খোরি আছে বলে দেশের মাটির প্রতি বিতৃষ্ণা ঠিক সমস্যা সমাধান নয়। স্বাধীনতা প্রাপ্তির দিন থেকে আজ ৭৪ টি বছর কাটিয়ে এসে ভারতবাসীর গর্ব করা উচিত। একটা লুটে যাওয়া ছিঁড়ে ফেলা দেশ বিশ্ব আসনে সেরার জায়গা করে নিয়েছে। ভারতের বৈদেশিক নীতি এখান এমন জায়গায়, সেখানে তাকিয়ে বলাই যায়.... তুমি ঘৃনা করো, কিংবা ভালোবাসো, হে বিশ্ব তুমি আমাদের ইগনোর করতে পারবে না। ছটি দশক পেরিয়ে এসে ভারত  অর্থনৈতিক শিক্ষা এবং চিন্তা শক্তিতে অনেক অগ্ৰসর করেছে তা হয়ত বিতর্কিত চোখে দেখলে বোঝা যাবে না। ভারত ও ভারতবাসীর গড় জীবন যাপনের ধরন  বলে দেবে হিসেব। হলফ করে বলা যায় পৃথিবীর পশ্চিমে ছোটা অনেকে স্বীকার করবে এই দেশে শান্তি অনেক বেশি। অনেক বিষয়ে নিশ্চিন্ত বিশ্লেষণ প্রতিবাদ কিংবা স্বাধীন চলাফেরার সুযোগ আছে। যারা এই দেশের মাটির দিকে আঙুল তুলে বলে " আতঙ্কিত " তাদের কাছে প্রশ্ন তবে এখনও এই দেশ ছাড়তে পারলেন না কেন?  এই দেশ সেই জায়গা যেখানে কেবল নিজেদের নাগরিক নয়, বিদেশী শরনাগতদের দীর্ঘ বছর সুরক্ষা দিয়ে এসেছে। তসলিমা ও লামা তার নিদর্শন। সুরক্ষা আছে বলেই, যারা নিজেদের অসুরক্ষিত ভাবে, তারাও মিটিং মিছিল এমনকি সাংসদে বসার জায়গা পায়। এই দেশের মাটি, সব পেয়েছির দেশ। পৃথিবীর যে কোন দেশে ঘুরে এসে দেখবেন ভারতীয় আন্তরিকতা ও আবেগ অবশ্যই আলাদা স্পর্শ দেবেই। 

রাগ করে অনেকেই বলবেন, তা হলে তো হয়েই গেলো, সব পেয়েছো দারিদ্র্য ধর্ম নিয়ে লাঠালাঠি অর্থনৈতিক ঘোটালা সামলাও। না সব জিনিস কয়েকটি বছরে পাল্টে যেতে পারে না। তিনশো বছর ইংরেজ শাসন ও শোষণের পর, মুখ থুবড়ে পড়ে যাইনি। পায়ে পা মিলিয়ে এগিয়ে তো গেছে দেশ। যা হয়নি তার জন্য আমরা, এই সাধারণ জনগণ কি দায়ী নয়!!আমরা সামান্য না পাওয়ায় ভাঙচুর করি। আন্দলন করে সাংসদের চেয়ার টেবিল ভাঙি  মন্দির মজিদ ভাঙি, রেলের লাইন উবড়ে দি। একবারও ভাবি না রাষ্ট্রের সম্পত্তি বা ঐতিহাসিক ঐতিহ্য নষ্ট করা মানে নিজের পায়ে নিজেই কুড়ুল  মারছি। দেশের মাটির পক্ষে সারা রাত কথা বলে যেতে পারি। অশিক্ষা কু শিক্ষার জন্য শিক্ষিত আমরা চায়ের দোকান ক্লাব ঘরে চেঁচিয়ে মরি। সামনে এসে একটিও খাতা কি কখনও কিনে দিয়েছি। কখনও কি পথ ঘটের গাড্ডা দেখে নিজে এগিয়ে গেছি? কখনও কি বলেছি বিভদ কি সে? কখনও কি দেশের মাটির জন্য  এগিয়ে গেছি রাজনৈতিক অসৎ শক্তির বিরুদ্ধে! সাধারণ মানুষ চাইতে পারি, দিতে গেলে হিসেব করি। মলে বিনা বাক্যে জিনিস কিনি, আর সব্জি দোকানের বুড়ির সাথে পাঁচ টাকার দরাদরি করি। সরকারি নিয়ম ভাঙবো  বলে ঘুষ দিয়ে তৈরি করি আর একটি অসৎ জনগণ। শত শত ভুলে আমরাই নিজেদের পিছিয়ে রাখি। স্বাধীনতার দায় ভার কেবল সরকারের নয়। জনগণ কখনও ভেবেছে এই বিপুল জনস্ফিতি কত ভয়ঙ্কর রূপ নিতে পারে! জন্মনিয়ন্ত্রণ আইন করলে মানতে পারবে কয়জন?  দেশের মাটি ভাঁড় মে যাক, সবাই আখের গোছাই। আর দূর দেশের দিকে তাকিয়ে হাপিত্তেস করি। হয়নি আর পাইনি। রোজগারের পয়সা কেউ কি রোজকার কোন একটি গরীবের ঘর চালানোর কিছু কিনে দিতে চাইবে কেউ! দিনের পর দিন বিনা স্বার্থে? অথচ যদি নিম্নতম গরীবের সরকারি নির্দেশে লাইগেশন করানো হয়, মানবাধিকার বলে হায় হায় উঠবে। সরকারি প্রধানমন্ত্রী আবাসনে আসল আবাসিক নেই, বেচে দিয়ে আবার নতুন বস্তি হচ্ছে। দেখবে কে? বলবে কে? হায় দেশের মাটি। কেবল দোষারোপ নয়। এবার কিছু সপথের সময় এসেছে। আঙুল ওই দিকে নয় নিজের দিকে উঠুক। আসুন না ছোটো একটা সপথ করি কাল থেকে প্রাদেশিকতা ভুলবো। একটু নিজের দেশকে নিজের ভাববো। 

শুভ রাত্রি, জয় হিন্দ। 


নতুন স্বপ্ন দেখবো না, পুরনো স্বপ্ন সফল করবো। শিশুকে সঠিক মানচিত্র শেখাবো । ঠিক দেশের মাটি কতটা।। 


স্বাধীনতা র শুভকামনা সবাইকে

অতিরিক্ত নারী স্বাধীনতার সুফল ও কুফল।( কলমে--- পারমিতা মন্ডল।)

অতিরিক্ত নারী স্বাধীনতার সুফল ওট কুফল।ট
কলমে---পারমিতা মন্ডল।


আজকের বাক‍্যটার সাথে কোন মতেই এক মত হওয়া সম্ভব নয়--

1)নারী আজ মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে ,আত্মস্বনির্ভর হয়েছে । তাই পুরুষের এতো গায়ে জ্বালা । ঘোমটা দিয়ে ঘরে বসে মার না খেয়ে উল্টে মার দিতে শিখেছে ।এটাই পুরুষের কাছে নারীর অতিরিক্ত স্বাধীনতা বলে মনে হয়েছে।। এতোদিন স্বাধীনতা শুধু পুরুষের এক চেটিয়া ছিল। তাই বলে  ডিভোর্স ও পরকীয়া কিন্তু কম ছিল না। ওটা শুধু পুরুষের দখলে ছিল। এখন নারী তাতে ভাগ বসিয়েছে। তাই সব দোষ নারী স্বাধীনতার।

2)  আগের দিনে মেয়েদের বোঝানো হতো পতি পরম গুরু। দেবতা। তার কথা শুনে চলতে হবে। কখনোই অমান্য করা চলবে না। সে যদি চুল্লু খেয়ে এসে পেটায়ও তাহলে পিঠ পেতে দিতে হবে মার খাওয়ার জন্য। প্রতিবাদ করা যাবে না। বাইরে পুরুষের দশটা মেয়ের সাথে সম্পর্ক থাকতে পারে। ওটা স্বাভাবিক। সেতো পুরুষ। তুমি যেন ভুলেও কোন পুরুষের দিকে না তাকাও।  কিন্তু নারী সেই অন্তঃপুর থেকে বেরিয়ে, অত‍্যাচারিত হতে হতে যখন তার প্রকৃত ভালোবাসা খুঁজে পেয়েছে, তখন তাকে  পুরুষ বলছে পরকীয়া। স্বেচ্ছাচারিতা। এতোদিন পরকীয়া শুধু পুরুষের একার দখলে ছিল। 

3) পুরুষ ডিভোর্স দিয়ে দশটা বিয়ে করলেও সমাজ তার দিকে আঙুল তোলে না। কিন্তু কোন মেয়ের যদি বিয়ে ভেঙে যায় তবে সবাই একেবারে গেল গেল রব তোলে। যেন পৃথিবী রসাতলে গেল। যাদের অর্থের জোর আছে, বা স্বনির্ভর সেই সব মেয়েরা আর পড়ে পড়ে অন‍্যায় সহ‍্য না করে ডিভোর্সের পথ ধরে। সুস্থভাবে বাঁচার অধিকার তো তার ও আছে। অথচ মানুষ তাকে বলছে অতিরিক্ত নারী স্বাধীনতা। 

3) ভালোবাসা বা নির্ভরতা আগেও কম ছিল।  প্রকাশ পেত না। কারণ মেয়েদের মতামতের কোন গুরুত্ব ছিল না। তখন ডিভোর্স বা পরকীয়া ছিল ছেলেদের একচেটিয়া অধিকার। মেয়েরা তাদের অন্ধের মতো ভালোবাসতো। আর দিনের পর দিন ঠকে যেত।  তখন হয়তো "ডিভোর্স"এই গালভরা নামটা ছিল না। তার পরিবর্তে শোনা যেত "স্বামী পরিত্যক্তা নারী।" এটা কি মেয়েদের কাছে অপমানের ছিল না ? দিনের পর দিন বাপের বাড়িতে পড়ে থেকে কোন মেয়ে যদি পরকীয়া করতো তবে সেটা ছিল মারাত্মক অপরাধ।  এখন সেই পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে।  নিজের মত করে মেয়েরা বাঁচতে শিখেছে।  তাই বলা হচ্ছে এটা অতিরিক্ত স্বাধীনতার ফল।


4) আজ মেয়েরা পুরুষের অত‍্যাচার নীরবে সহ‍্য না করে বাইরে বেরিয়ে নিজের মত জীবন যাপন করছে।  তাদের আর উঠতে বললে উঠেছে না বা বসতে বললে বসছে না।  তাই সমাজের চোখে এটা অতিরিক্ত স্বাধীনতা বলে মনে হয়ে।  আর তাই ডিভোর্স বা পরকীয়ার দায় সেই আবার মেয়েদের ঘাড়েই চাপিয়ে দিতে চাইছে।


একটি সংসারকে সুন্দর করে গড়ে তুলতে গেলে নারী পুরুষের সমান অবদান দরকার।  যে মেয়েটি গৃহবধূ তার কোন কাজ নেই, ।"আমার পয়সায় খায়, তাই তাকে সব কথা শুনতে হবে"-- এই মানষিকতা যদি পুরুষ দূর না করে , তবে পরকীয়া , ডিভোর্স আরো বাড়বে। তার জন্য মেয়েরা নয় , পুরুষ দায়ী।  দিনের পর দিন অত‍্যাচারিত হয়ে আজ তারা ঘুরে দাঁড়িয়েছে । এটা পুরুষের ইগোতে লাগছে। তাই ঘুরিয়ে নারী স্বাধীনতাকে ছোট করার জন্য, আর নিজেদের দায় এড়ানোর জন্য সব দোষ সেই নারীর ঘাড়েই চাপাতে চাইছে।

এটা মানবো না মানছি না।

all rights are reserved by paramita.


পক্ষে----

কলমে----পারমিতা মন্ডল

1) অতিরিক্ত নারী স্বাধীনতা নারীকে বিপথগামী করেছে । এটা আংশিক সত্য। কারণ চার দেওয়ালের বাইরে বেরিয়ে এসে নারী যখন জগত দেখেছে, তখন তার মাথা ঘুরে গেছে। পুরুষ- নারী বন্ধুত্বের মত মিসতে গিয়ে সে নিজেই পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়েছে।  তার না পাওয়ার যন্ত্রণা, অতিরিক্ত কেয়ার যেটা সে স্বামীর কাছে আসা করেছিল, সেটা অন্য কারো কাছে পেয়ে নিজেকে সামলাতে পারেনি। এটা নারী স্বাধীনতার কুফল।

2) নারী আজ স্বনির্ভর । তাই সে কারো দাসত্ব করতে চায়না। কিন্তু ভালোবাসা আর দাসত্বের মধ‍্যে সুক্ষ্ম পার্থক্য অনেক সময় বুঝতে পারে না মেয়েরা। স্বামীর সেবা তো ভালোবেসেও করা যায়। সেখানে অহংকারের জায়গা নেই। কিন্তু আত্মাভিমানী নারী মনে করে, আমি স্বাধীন। কেন তোমার সেবা করতে যাবো ?আমার ইগোতে লাগছে। এর থেকেই শুরু হয় অশান্তি।

3) কোন মেয়ের যদি বাবার বাড়ির জোর বেশী থাকে, আর ছেলেটির যদি অর্থ কম থাকে , তাহলে দেখা যায় পুরুষ স্বাধীনতা থমকে যায়। সেই পুরুষের ঠিক মতো ভাত ও জোটে না। নারী তার উপর বিভিন্ন রকম মানষিক নির্যাতন করে। এবং এক সময় ডিভোর্স অবসম্ভাবি হয়ে পড়ে। এটা নারী স্বাধীনতার একটি কলঙ্কিত অধ‍্যায়।

4) আজকাল অনেকক্ষেত্রে দেখা যায় আইনের অপব‍্যবহার করে , পুরুষকে হেনস্থা করছে নারী। সব সময় সেই পুরুষটি হয়তো দোষী থাকে না । মেয়েটির স্বার্থ সিদ্ধির জন্য  ডিভোর্স দিতে বাধ্য করে ছেলেটিকে। তারপর একটি মোটা অংকের খোরপোষ দাবী করে। সারাজীবন বসে খাওয়ার জন্য। এটাও অতিরিক্ত নারী স্বাধীনতার ফল।

5) পরকীয়ার জন্য মেয়েরা খুন করতেও পিছু পা হয়না । যেমন--- মনুয়া, বা সুদীপা ।  কিন্তু নারী যখন চার দেওয়ালের মধ্যে ছিল তখন এমন জঘন্য কাজ করার কথা ভাবতেও পারতো না। অতিরিক্ত স্বাধীনতা তাদের বেপরোয়া করে তুলেছে । 

অত‍্যাচারিত যেমন নারী হয় তেমনি পুরুষ ও হয়। তবে নারীরা হয়তো সংখ্যায় বেশী। বিশ্বাস, ভরসা রক্ষা করার দায়িত্ব দুই পক্ষের। 
একহাতে তো তালি বাজে না । তাই দোষ উভয়েরই  আছে। 


all rights are reserved by paramita 

 

শুক্রবার, ১৩ আগস্ট, ২০২১

নারী নারীর চরম শত্রু। ( কলমে-- পারমিতা মন্ডল)

বিষয় ----*শুভ শনিবার*
*আজ বিতর্ক সভার দিন*
*আজকের বিষয়*
*নারী নারীর চরম শত্রু*
*কারন একে অপরকে প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করে*

কলমে--- পারমিতা মন্ডল।


নারী নারীর চরম শত্রু কথাটা আংশিক সত্য । একজন পুরুষ ও কিন্তু নারীর চরম শত্রু হতে পারে । কিন্তু প্রবাদ হিসেবে আদি অনন্তকাল ধরে চলে এসেছে " নারী নারীর শত্রু।"  তাই আমরাও বিশ্বাস করতে অভ‍্যস্ত হয়ে পড়েছি ।  একবার ভেবে দেখুন তো মা ও মেয়ে , দুজনেই নারী । এখানে কে কার শত্রু ? মা তো আপ্রাণ চেষ্টা করবে তার মেয়েকে আগলে রাখতে । আসলে এটা পুরুষতান্ত্রিক সমাজের একটি সুক্ষ্ম চাল। নারীতে নারীতে লড়িয়ে দিয়ে নিজে সেভ থাকা। আর আমরা সেটা না বুঝেই লড়ে যাই।

শুধু মা মেয়ে নয় , আমার অনেক বান্ধবী আছে যারা অসময় আমার পাশে ছিল। আবার যখন সুসময় এসেছে , মানে চাকরি পেয়েছি তখনো কিন্তু আমাকে হিংসা করেনি। এখনো ওদের সাথে ভালো সম্পর্ক আছে।  এছাড়া আমাদের এই ভার্চুয়াল পরিবারেও অনেক বান্ধবী আছে। ছোট ছোট বোনেরা সবাই ভালোবাসে। মনে তো হয়না হিংসা করে বলে। সবচেয়ে বেশী সাহায্য পাই পিউ এর কাছ থেকে। অনি, সুদেষ্ণা, চুন্নি, তিথি এরাও খোঁজ নেয় নিয়মিত। শত্রুতা করে বলে তো কখনোই মন হয়নি।

তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে অবশ্যই এটা হয়ে থাকে।  যেমন-- শাশুড়ি- বৌমা । এখানে মানিয়ে নেওয়ার ও মেনে নেওয়ার ক্ষমতা থেকে ঝগড়াটা হয়ে থাকে। শত্রুতা থেকে হয়তো নয়। বেশিরভাগ হয় অধিকারের লড়াই। আর তার কেন্দ্রবিন্দু কিন্তু পুরুষ।

এবার আসি অন্য কথায়।  নারী নারীর চরম শত্রু একথা না বলে বলা যেতে পারে মানুষ ,মানুষের চরম শত্রু কিছু কিছু ক্ষেত্রে। এটা নারী পুরুষ নির্বিশেষে হতে পারে।  যখন কোন পুরুষ পরকীয়ায় জড়িয়ে বৌকে খুন করতে যায় তখন কে কার শত্রু হয় ? যখন কোন অফিসের বস হয় কোন মহিলা ,তখন পুরুষের ইগোতে লাগে। সে তখন চায় যে কোনভাবে তাকে নীচে নামাতে। বলতে পারেন এখানে কে কার শত্রু? এমন উদাহরণ অনেক আছে । তাই বলি অযথা নারীর দোষ না খুঁজে একটু তাকিয়ে দেখুন , শত্রুর কোন লিঙ্কভেদ হয়না। 

তবে এখনো  সব মেয়েরা পুরোপুরি শিক্ষার আলোকে আসতে পারেনি, তাই তাদের একে অপরের পিছনে লড়িয়ে দেওয়া  খুব সহজ হচ্ছে । কিন্তু এটা বেশিদিন আর চলবে না। নারী, নারীর শত্রু না হয়ে বন্ধু হবে।  সে দিন আর বেশী দূরে নেই।

All rights aer reserved by paramita.

বৃহস্পতিবার, ১২ আগস্ট, ২০২১

# নাম- খাওয়ার। ✍️ - মৃদুল কুমার দাস।

শুভ বাক্য আলোচনা বাসর।
 # বিষয় - *বাঁচার জন্য খাওয়া,খাওয়ার জন্য বাঁচা নয়।*
   # নাম - *খাওয়া।*
   ✍️ - মৃদুল কুমার দাস।

      জীবনের অস্তিত্বের মূলে ভিত্তি খাওয়া,পরা ও মাখা। সবার যে যার বৈশিষ্টে স্বাতন্ত্রবহ। আহার বা খাওয়ার নিয়ে আলোচনায় আসতে গিয়ে প্রথমেই বলি- মানুষ সর্বভুক। হেন জিনিস নেই যা সে খায় না। এই খাওয়ারের যে খায় সে কর্তা। যাকে খাওয়া হয় সে কর্ম। অর্থাৎ যে গ্রহণ করে সে *অন্নাদ*। যাকে গ্রহণ করা হয় সে রূপান্তরিত ভোগ্য বা অনুভবের বিষয়,বলে তাকে বলে *অদ্যতে* বা *ভুক্ত*।
     অন্ন বা যে কোনো খাওয়ারের রস ছ'রকম - অন্ন থেকে রক্ত,রক্ত থেকে মাংস, মাংস থেকে চর্বি,চর্বি থেকে হাড়,হাড় থেকে মজ্জা,মজ্জা থেকে পুরুষের শুক্র ও নারীর ডিম্বানু তৈরী হয়। সবই আহারের নির্যাস,যার থেকে ফল পাওয়া যায়। ফলের নাম পুষ্টি। এই পুষ্টি শক্তি দেয় - মন,ইন্দ্রিয়,স্মৃতি, মেধা,বুদ্ধি ইত্যাদি। আহার স্থুল শরীরের জন্য নানা রূপান্তরের অনুগামী। ভুক্ত অন্নের রূপান্তর থেকে সবচেয়ে স্থূল অংশ মল,যা বেরিয়ে যায়। মধ্যম অংশের রূপান্তরে মাংসপেশী। সূক্ষ্ম অংশে চিত্ত। এই যে এতো রূপান্তরের দিক আছে,আহার গ্রহণে একটা ঔচিত্যবিচার থেকে আহারের গুণ প্রকাশিত হয়। খাওয়ারের সঙ্গে জীনের সম্পর্ক একটা আছে বলে পরুষের আহার,নারীর আহারের মধ্যে একটা পরিমাণগত বৈষম্য থাকে। অপরপক্ষে আহারের ধরণেও রূপান্তর যেমন- কাঁচা সবজি খাওয়া, আর তাকে ভাজা পড়া করে খাওয়া পৃথক পৃথক ফল। 
   কী খাওয়া উচিৎ, কীভাবে খাওয়া উচিৎ,কখন কী খাওয়ার খেতে হয়, এ নিয়ে আয়ুর্বেদ, আধুনিক পুষ্টি বিজ্ঞান, ডাক্তার, হোমিওপ্যাথ,যোগ শিক্ষক আমাদের সারাক্ষণ খাওয়ার নিয়ে নানান উপদেশ দিয়ে যাচ্ছেন। এই নিয়ে আহার স্বর্বস্ব জীবনের হজবরল ইতিকথায় আহার গ্রহণের কর্তব্য ও কর্তব্যহীনের বাছবিচার কেউ কেউ করে তো,আবার কেউ কেউ একদম করেই না। আমিষ ও নিরামিষ আহার নিয়ে বাছবিচার একটা রীতিমত ঘটা। 
  আহার নিয়ে ঘটনার জীবন রসরসিকতার কয়েকটি দিক যেখানে মনে,সাংস্কৃতিক বোধের এক এক ধরণের পরিচয়, যেমন-
  **প্রাণ ধারণের জন্য পশুরা  যন্ত্রবৎ খায়। কিন্তু মানুষের খাওয়া দাওয়া রীতিমত রুচিশীল।
   ** খাওয়ার ধরন থেকে মানুষ চেনা একটা ধরন।
   **একটা নতুন রান্নার পদ উদ্ভাবন করতে পারলে মনের সে কি অনাবিল আনন্দ।
   ** খাওয়ার টেবিলে নেমতন্ন করে খাওয়ার দেওয়ার যত্নের ধরন থেকে মানুষ চেনা যায়। সযত্ন আত্তির কোনো খামতি রাখে না।
  ** নিমন্ত্রণ বাড়িতে খাওয়ার নিয়ে নিন্দা করতে নেই, সে যতই খাওয়ার মন্দ হোক।
   ** অন্নদানের নিরিখে বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে উঠে। অন্নদান মানে জীবন দান। যে অন্নদান করেনা সে কোনোদিন বন্ধু নয়। সে কৃপণ। কৃপণের একা একা খাওয়া মানে মৃত্যুর সমান। খাদ্য নিয়ে মজুতদারী,চোরাবাজারী করার চেয়ে বড় পাপ আর নেই।
  ** শঙ্করাচার্য বলেছিলেন- অন্নের প্রথম গ্রাসটায় সকলের অধিকার আছে,কারণ যে গ্রাসটা প্রথম তুলি তার প্রতি ক্ষুধার্তের প্রথম গ্রাস। তাই গৃহস্থের কুকুর, বিড়াল,পিঁপড়েটাও পর্যন্ত প্রথম গ্রাসের অংশীদার। প্রথম গ্রাসে তোমার অধিকার থাকলে আমারও অধিকার আছে। গ্রাস তোলা মানে,না দিয়ে গ্রহণটাই পাপ। তার গ্রাস তোলার আগে প্রণাম ও ভূমিতে নিবেদন করে গ্রহণ করতে হয়।
  ** আহারের নৃশংসতা হল - ভক্ষ্য,পেয়,লেহ্য অতীব সুন্দর সুন্দর খাওয়ার নিজে ভক্ষণ করে,অভুক্তের দিকে ফিরেও তাকায় না, অপরপক্ষে দেখিয়ে দেখিয়ে না দিয়ে খায় তার মত নৃশংস আর হয় না।
  আহার নিয়ে খুব প্রচলিত কথা - "বাঁচার জন্য খাওয়া,খাওয়ার জন্য বাঁচা নয়"- কথাটির একটা আহার গ্রহণের ধরণের কথা বোঝাচ্ছে। 
  না খেতে পেলে মরে যাবে- এই ভাবনা,আর না খেয়ে মরে না,বরং খেয়ে মরে - কথাগুলো বেশ অনুধাবনযোগ্য। কীরকম?
  বলাই আছে প্রয়োজনের অতিরিক্ত খেও না। আকন্ঠ খেলে কোনো উপকার তো হয়ই না,বরং হীতে বিপরীত হয়। শরীর খারাপ করে। তাই বাঁচার জন্য খাওয়া,খাওয়ার জন্য বাঁচা নয়। বিয়ে বাড়ির খাওয়ার সহ্য হবে না,আবার খাওয়ার লোভও ছাড়া যাচ্ছে না। রসনা উত্তেজিত হয়। বলাই আছে যত উৎসব বাড়ী খাবে তত আয়ু কমবে। যত আমিষভোজী হবে আয়ু তত কমবে। ওসব চুলোর ছাই প়াঁশ ভাবনা মাথায় ঢোকালে খাওয়া আর হলো না। আয়ু আর কতদিন। যদি মরি খেয়েই মরা ভাল। জীবনটাকে তো ভোগ করা গেল। আহারের অভ্যাস জলবায়ুর উপর নির্ভর করে। চীনের আহারপ্রিয়তা,ভারতীয় আহারপ্রিয়তা আলাদা। ভারতের দক্ষিণের রাজ্যগুলির সঙ্গে উত্তরের রাজ্যগুলির খাদ্যাভ্যাস আলাদা জলবায়ুর উপর ভর করে। 
  আহারের ধরণ কী হওয়া উচিৎ, তা থেকে আহারে রুচিশীলতা আসে। 
  বেশী খাওয়া থেকে পেটের রোগ আসে। পরিমিত আহার ও জলপান নির্দিষ্ট পরিমান, সুস্থ শরীরের শর্ত। চাহিদার অতিরিক্ত আহার,আহারের নিয়ম না মানার অর্থ (অবেলায় খাওয়া, বেশি রাতে খাওয়া এসব আহারের উপর নির্রভ করে) আয়ু কমতে থাকে। 
  তাই পরিমিত আহার মানে পরিমিত জীবন। আহারের জন্য জীবন মানলে এক ফল,আর জীবনের জন্য আহার মানলে আরেক ফল।
           *****
 # কপিরাইট রিজার্ভ মৃদুল কুমার দাস। 
   

মন্বন্তর(সুদেষ্ণা দত্ত)

 


*মন্বন্তর*

সুদেষ্ণা দত্ত

 

ইতিহাস বিষয়ের শিক্ষার্থী ও শিক্ষক হওয়ায় মন্বন্তর বলতে বাংলা ১১৭৬ ও ইংরেজি ১৭৭০ এর মন্বন্তরের কথাই প্রথম মনে আসে।যদিও ১৩৫০  বঙ্গাব্দে একটি দুর্ভিক্ষ হয়েছিল যা পঞ্চাশের মন্বন্তর নামে পরিচিত। মন্বন্তরের আক্ষরিক অর্থ দুর্ভিক্ষ।বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় হান্টারের Annals of Rural Bengal এর অনুকরণে তাঁর বিখ্যাত ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসে দক্ষ শিল্পীর তুলিতে এই ১১৭৬ এর দুর্ভিক্ষের করুন চিত্র অঙ্কন করেছেন।

        ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের অন্যতম কারণ যে প্রকৃতির বিরূপতা তা বোধহয় আজ আর কারও অজানা নয়।ইং ১৭৬৮ খ্রিস্টাব্দ থেকে অনাবৃষ্টির ফলে কৃষি উৎপাদন হ্রাস পেতে থাকে।১৭৬৯ খ্রিস্টাব্দেও বৃষ্টি না হওয়ায় দেশে খাদ্যাভাব দেখা দেয়।

        প্রাকৃতিক কারণে দুর্ভিক্ষ দেখা গেলেও সুপ্রকাশ রায় এই দুর্ভিক্ষকে “ইংরেজ সৃষ্ট ছিয়াত্তরের মন্বন্তর” বলে অভিহিত করেছেন।তার পিছনে অবশ্য যথার্থ কারণ ছিল।প্রকৃতির বিরূপতার তীব্রতা ও ভয়াবহতা বৃদ্ধি পেয়েছিল শোষণ,নিপীড়নের ফলে।দ্বৈত শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তন ও কোম্পানীর রাজস্ব নীতি দুর্ভিক্ষের প্রকোপ বৃদ্ধি করেছিল।এরফলে কৃষকদের অবস্থা হয়েছিল শোচনীয়।এই অবস্থায় অজন্মার ফলে খাদ্যাভাব দেখা দেয়।শস্যক্ষেত্রে বিপর্যয়ের ফলে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পায়।তা সত্ত্বেও রাজস্ব আদায়ের কঠোরতা হ্রাস পায়নি।এই দুর্দশা দূর করতে কোম্পানী কোন ত্রাণ ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি।উপরন্তু এই অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে কোম্পানী ও তার কর্মচারীরা একচেটিয়া বাণিজ্যিক অধিকারের সুযোগে পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি করেছিল।এমনকি দুর্ভিক্ষের সময় কম দামে চাল কিনে বেশি দামে বিক্রির জন্য গুদামজাত করে রাখে।অশনি সংকেত চলচ্চিত্রে এর রূপায়ণ আমরা দেখেছি।এই কৃত্রিম চহিদা সৃষ্টির ফলে ভয়াবহতা আরও বৃদ্ধি পায়।এছাড়া কোম্পানীর নিজের সৈন্যবাহিনীর জন্য প্রচুর খাদ্য শস্য ক্রয় করে মজুত করেছিল এবং কোম্পানী বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে খাদ্যশস্যের অবাধ চলাচল নিষিদ্ধ করে দিয়েছিল।

দুর্ভিক্ষের ফলে জনসংখ্যা হ্রাস পাচ্ছিল।রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ সেই অনুপাতে কমেনি।দুর্ভিক্ষের সময় রাজস্ব আদায়ের জন্য ছিল ‘নাজাই প্রথা’-অর্থাৎ যারা পালায়নি বা বেঁচে ছিল তাদের উপর চাপানো হয়েছিল অতিরিক্ত অর্থের বোঝা।

আমরা বর্তমান পরিস্থিতেও দেখছি প্রতিকূল অবস্থায় বেশ কিছু মানুষ অসদুপায় অবলম্বন করছেন।দুর্ভিক্ষের ফলেও চুরি-ডাকাতির সংখ্যা আতঙ্কজনকভাবে বাড়তে থাকে।গ্রামে গ্রামে ডাকাতরা নির্ভয়ে ডাকাতি করে বেড়াত।দিনাজপুরে সন্ন্যাসী বিদ্রোহ শুরু হয়।আগে সমতলভূমির মানুষরা ডাকাতদের গতিবিধির উপর লক্ষ্য রাখত এবং সরকারের পক্ষে তাদের দমন করা সহজ হত।কিন্তু দুর্ভিক্ষের ফলে জমিজমা ছেড়ে চলে যাওয়ায় তাদের উপদ্রব বাড়তে থাকে।

ছিয়াত্তরের মন্বন্তর বাংলার অর্থনীতিকে এক গভীর বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দেয়।অধ্যাপক বিনয় ভূষণ চৌধুরী মন্তব্য করেছিলেন, “The famine affected the economy mainly by causing extensive rural depopulation.” 

বাংলার শিল্পও বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।রেশম ও তাঁত শিল্পে জড়িত শ্রমিকদের মধ্যেই মৃত্যুহার ছিল সবচেয়ে বেশি।অস্বাভাবিকভাবেই দুর্ভিক্ষের পর শিল্প উৎপাদন ব্যাপকভাবে হ্রাস পায়।মাঝিমাল্লা ও গরুর গাড়ির গারোয়ানের মৃত্যুর ফলে যান চলাচল ব্যাহত হয় এবং তার ফলেও ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

 বুদ্ধদেব বসুর,

 “তোমারে স্মরণ করি আজ এই দারুন দুর্দিনে

হে বন্ধু হে প্রিয়তম।সভ্যতার শ্মশান শয্যায়

সংক্রামিত মহামারী মানুষের মর্মে ও মজ্জায় ...”

লোভ-লালসা মানবতার স্খলনে সমাজ সংসার জুড়ে আজ মানব হৃদয়েও জাগ্রত মন্বন্তর।

 

©কপিরাইট রিজার্ভড ফর সুদেষ্ণা দত্ত।

ছবি সৌজন্য:গুগুল।

 

 

বুধবার, ১১ আগস্ট, ২০২১

বাক্য আলোচনা(কলমে পিয়ালী চক্রবর্তী)



বাঁচার জন্য খাওয়া, খাওয়ার জন্য বাঁচা নয়

#কলমে_পিয়ালী_চক্রবর্তী

তারিখ: ১২/০৮/২০২১


আমরা মানুষ, ভোজনরসিক,

যেকোনো খাবার, হোক ঠিক বা বেঠিক,

খেয়ে যাই কব্জি ডুবিয়ে দু'বেলা,

শরীরটাকে নিয়ে করি ছেলেখেলা।


মাছ-মাংস-ডিম-তেলেভাজা বা মিষ্টি,

আহা! কি অপূর্ব খাদ্য'রসসৃষ্টি!

হোক না সে কোলেস্টেরলের ভান্ডার!

খেয়ে যাই সুখে, বাঁচাবে পারের কান্ডার!


আগুনে দিলে যদি হাত, 

পোড়ানোই তার ধর্ম,

ফল পাবে হাতে নাতে,

ঠিক যেমনটি কর্ম!


সুগার, প্রেশার, কোলেস্টেরল, মেদাধিক্য!

হারিয়ে খোঁজে শরীরের চাকচিক্য!

পুঁতেছো অতীতে তুমি যে বিষবৃক্ষ!

অধিক খাইয়া দেবে পাড়ি অন্তরীক্ষ!


●আমরা বেশিরভাগ মানুষই খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারে ওস্তাদ। একদম "দাবিয়ে খাওয়া" যাকে বলে ঠিক তেমনি ঠুসে খাই যখন যা পাই। 


●এক্সারসাইজের ধার দিয়েও যাইনা। আবার কেউ কেউ ভোরবেলা উঠে মাঠে গিয়ে জগিং, মর্নিং ওয়াক ইত্যাদি করে বন্ধুদের সাথে চা-সিঙাড়ার আড্ডা দিয়ে বাড়ি ফেরেন(বলাই বাহুল্য তাতে আরো বেশী ক্ষতি)। 


●সবাই আমরা জ্ঞানপাপী, কিন্তু হেলদি লাইফ লিড করার কয়েকশো মাইলের মধ্যে নেই। কত খাবার চারপাশে! ওহঃ, না খেলে আত্মাকে কষ্ট দেওয়া হয় তো! ওরকম কম কম তেলে-মশলায় খেয়ে বাঁচতে পারবুনি বাপু। খাসির মাংস বলো বা গোল গোল সাদা সাদা রসে টইটুম্বুর রসগোল্লা! ছটা-আটটার কম খেলে ঠাকুর পাপ দেবে গো।


●ঠিক দুর্গাপুজোর এক-দেড় মাস বাকি থাকতে আমাদের স্বাস্থ্য সচেতনতা বেড়ে আকাশছোঁয়া। পুজোর সময় সাজুগুজু করতে হবে, বেশ চটকদার পোশাক পরে স্লিম-ট্রিম দেখাতে হবে তো নাকি! শুরু হয় ডায়েটিং এবং সেই স্বাস্থ্য সচেতনতা শেষ হয় ষষ্ঠীর দিন সকাল থেকেই। আরে, এ কেমন কথা বাপু! পুজো-গন্ডা'র দিন বলে কতা, একটু খাবো-দাবো না নাকি! 


●কারোর বিয়ে-পৈতে-ভাত-জন্মদিন বা যেকোনো অনুষ্ঠানে, বেগানি শাদী মে আব্দুল্লাহ দিওয়ানা হয়ে ততক্ষণ পর্যন্ত খাই, যতক্ষণ না বেশ বমি বমি ভাব করে বা পেট ফুলে ঢোল হয়ে যায়! আরে! গিফ্ট দিয়েছি বস, পয়সা উসুল করতে হবে তো নাকি!


●পায়েস রাঁধার পরে সেই হাঁড়ি বা ডেকচির গায়ে যে ঘন পদার্থটি লেগে থাকে, কি ভীষণ সুস্বাদু! কাজের মাসি ঘষে ঘষে মেজে ধুয়ে সেই অমৃতসম পদার্থটি নালা দিয়ে বইয়ে দেবে, তাই কখনো হয়! লেগে পড়ি হাতা-খুন্তি নিয়ে। চেঁছে চেঁছে লোকের কান-মাথা ঝালাপালা করে মুখে পুরে দিই সেই মহার্ঘ্য বস্তু। আহা! পেট কি আমাদের ডাস্টবিনের চেয়ে কম নাকি ভাই!


খেয়ে খেয়ে জীভ দিন দিন দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়ে ওঠে আমাদের। বুঝতে পারি ভুল করছি, কিন্তু শুধরে নিই না। "অ্যায়সে খায়ে যাতে হ্যায়, জ্যায়সে, কল হো না হো"



। এই অতিরিক্ত খাবার ফলে আমন্ত্রণ দিয়ে ডেকে আনি বিভিন্ন রোগ। খেয়ে খেয়ে বিশ্রী মোটা হয়ে মায়োকার্ডিয়াল ইনফ্র্যাকশন, সেরিব্রো ভাস্কুলার অ্যাকসিডেন্ট বা কোনো মারণ রোগে অকালে পরিবার ছেড়ে চলে যেতে হয় কত মানুষকে। অথবা, শরীরে রোগের বাসা নিয়ে ডাক্তার-ওষুধের পেছনে গাদা গাদা টাকা খরচ করে পরিবারকে অস্বচ্ছলতার মধ্যেও ফেলে দেন অনেকেই। তাদেরকে বোঝালে বোঝে না, তাদের জীবনের মূলমন্ত্র "খাওয়ার জন্যই বাঁচা"। 


একটু স্বাস্থ্য সচেতন হলে, তেল মশলা বা ফ্যাটি খাবার কম খেলে যদি পরিবারের সাথে আরো বেশ কটা বছর বেশী বাঁচা যায়, তবে তাই হোক আমাদের মূলমন্ত্র, "খাওয়ার জন্য বাঁচা নয়, বাঁচার জন্য খাওয়া।"

Copyright © All Rights Reserved to Piyali Chakravorty

#নাম-মন্বন্তর। ✍️ - মৃদুল কুমার দাস।

শুভ শব্দ আলোচনা বাসর।
  #বিষয়- *শব্দ আলোচনা।*  # নাম- *মন্বন্তর*।
  ✍️- মৃদুল কুমার দাস।

   মন্বন্তর একটি অভাবের ভাব বোঝাতে শব্দবন্ধ। মৃত্যু, হাহাকার,ক্ষুধা, শ্মশান, কাফন,দুর্দিন, দুর্যোগ,মারী, মড়ক নরক - কথাগুলো মানব সভ্যতার দুঃখজনক অবস্থা কতখানি সেখানে এক লহমায় হাজির করে। 
  মণ্বন্তর-পীড়িত জীবনের এক মর্মন্তুদ কাহিনির দুটি অধ্যায়ের সময়কাল - একটি ১৭৭০ খ্রিষ্টাব্দের,বাংলা সন ১১৭৬ বঙ্গাব্দ,অপরটি ১৯৪৩ খ্রিষ্টাব্দ বা বাংলা সন ১৩৫০ বঙ্গাব্দ। দুই মন্বন্তর সোনার বাংলা সেদিন শ্মশান বাংলায় পরিণত হয়েছিল। দুই মন্বন্তরের একটি দিয়ে ব্রিটিশ সরকারের পত্তন,পরেরটি দিয়ে পতন। দুই মন্বন্তরের মধ্যবর্তী ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শাসনে আমারা ব্রিটিশ উপনিবেশের অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়েছিলাম। আমরা নিজেদের জন্ম ভূমিতে পরাধীনতার গ্লানি নিয়ে সে মর্মান্তিক বেদনা বয়ে বেড়িয়েছিলাম কীভাবে তারই ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়। ১৭৭০ থেকে ১৯৪৩ - এই একশ'পঁচাত্তর বছরের ইতিহাসে মন্বন্তর ও পরাধীনতা,স্বাধীনতা আন্দোলন,রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম, বিপ্লব,আত্মবলি দান,সব যেন একটা আমাদের বিধিলিপি নির্দিষ্ট দুর্ভাগ্যের ইতিবৃ্ত্ত। এই মন্বন্তর নিয়ে কিছু কথায় আসা যাক। 
  সাহিত্য, চিত্রকলা,চলচ্চিত্র, নাটকে ১৯৪৩ এর মন্তরের কথা কতভাবে যে বোঝানো হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। 
    ১৭৭০ বা ছিয়াত্তরের মন্বন্তর পলাশীর যুদ্ধ(১৭৫৭)-এর পর বনিক ইংরেজের হাতে মানদন্ড রাজদন্ডে পরিণত হতে যেটুকু বাকি ছিল বক্সারের যুদ্ধে মীরকাসিমের পরাজয়ের পর থেকে ব্রিটিশ কোম্পানি পেয়ে গেল আমাদের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করার পূর্ণ অধিকার। ক্লাইভ ও ওয়ারেন হেস্টিংসের দ্বৈতপীড়নে,রাজস্ব আদায়ের রেজা খাঁ ও সিতাব রায়ের নৃসংশ আচরণে বাংলার ভাগ্যাকাশে দুর্ভিক্ষের মাঝে প্রশাসনিক অত্যাচার, রাজস্ব আদায়ের লুঠতরাজের অরাজকতায় সোনার বাংলা শ্মশান বাংলায় পরিণত হওয়ার পরিচয় বঙ্কিমচন্দ্র চট্টপাধ্যায়ের 'আনন্দমঠ' অন্যতম প্রমাণ। 'আনন্দমঠ'-এর সন্তান দল দুর্ভিক্ষের বিরুদ্ধে বিপ্লবী সন্তান দল ছিল। 'দেবী চৌধুরাণী' উপন্যাসের ভবানী পাঠক বঙ্কিমচন্দ্রের সিভালরিক হিরোর(ধনীর ধন ছিনিয়ে দরিদ্রের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়া) একটি দিশাও মন্বন্তরের বিরুদ্ধে একটা বলিষ্ঠ প্রত্যয়ের কথাও পাই। সেদিন পথে প্রান্তে মানুষের মৃত্যুর মিছিল, আকাশে মৃত মানুষকে ঘিরে আকাশে চিল শকুন,আর স্থলভূমিতে নিষ্ঠুর শাসক মানুষ আর সেদিন মানুষের অবস্থায় ছিল না।
  তবে তেতাল্লিশের মন্বন্তর নিয়ে ইতিহাসের পাতা সবচেয়ে বেশী খরচ হতে লক্ষ্য করি। এখানেও ব্রিটিশ সরকারের বিদায় ঘন্টা বেজেছে,দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা,অজন্মা,খরা,খাদ্য নিয়ে মুজুতদারী প্রথা,স্থানে স্থানে কৃত্রিম খাদ্য সঙ্কট ও চোরাবাজার,সরকারের যুদ্ধের জন্য খাদ্যের মজুত সে এক কৃত্রিম খাদ্য সঙ্কট মেড ইন সরকারই দায়ী ছিল। সরকার সেই দুর্ভিক্ষ অনায়াসে মোকাবিলা করতে পারত,করেনি যেহেতু এদেশ ছেড়ে চলে যাবে,তাই ততটা তাদের আর প্রশাসনিক নজরদারি ছিল না। তার ফল  যে অতীব নিদারুণ ছিল দুটি নাটক - মন্মথ রায়ের 'ছেঁড়া তার' ও বিজন ভট্টাচার্যের 'নবান্ন' প্রধান নথি বললে অত্যুক্তি হয় না। সেদিন দিকে দিকে আকাশ বাতাসে ক্রন্দনরোল - ভাতের বদলে ফ্যান হলে চলবে। 
  "মানুষ এবং কুত্তাতে/ আজ সকলে অন্ন চাটি একসাথে/ আজকে মহাদুর্দিনে"( 'ডাস্টবিন'- দীনেশ দাশ) 
   "জঞ্জালের মতো জমে রাস্তায় রাস্তায়,/ উচ্ছিষ্টের আস্তাকুঁড়ে বসে বসে ধোঁকে,/আর ফ্যান চায়।"( 'ফ্যান'- প্রেমেন্দ্র মিত্র)
   একদিন যারা অন্ন যুগিয়েছে তারাই অন্নহীন হয়ে শহরের রাস্তায় রাস্তায় মৃত মানুষের মতো,মৃত্যুর মিছিলে তারা। তৎকালীন ছবি - এক মা সন্তানকে বুকের দুধ অনেক কষ্টে সংগ্রহের জন্য যতক্ষন সময় লাগে, সংগ্রহ করে পেছন ফিরে দেখে সন্তান মরে পড়ে। শেষে নিজেই সেই দুধটুকু পান করে চলতে থাকে। শহরময় এতো মৃত্যুর লাশের পাহাড় সেদিনও নদীর জলে মা ছেলেকে,বাবা মাকে সন্তান ভাসিয়ে ছিল। দাহ তো দূরের কথা। 
 চিত্রকলায় সেই মন্বন্তর নিখুঁতভাবে ধরা দিয়েছিল। দেবীপ্রসাদ রায়চৌধুরী,জয়নুল আবেদিন,চিত্তপ্রসাদদের ছবিতে মন্বন্তর নিখুঁত রূপ পেল। 
 আর বিশ্বযুদ্ধ, মন্বন্তর, স্বাধীনতা নিয়ে চলচ্চিত্রও সমান মুখর ছিল। মৃণাল  সেনের 'আকালের সন্ধানে' একটি কালজয়ী সৃষ্টি। 
  শুধু খাদ্য নয়,বস্ত্র নিয়েও বিখ্যাত গল্প 'দুঃশাসন'এর মতো গল্পও আজও রাজসাক্ষী হয়ে আছে।
   মন্বন্তরের ইতিহাস আমাদের অনেক সাবধানতার শিক্ষা দিয়েছে। আমাদের দেশ খাদ্যে স্বনির্ভর অনেকটাই। কিন্তু মন্বন্তরের ক্ষত কোনোদিন মেটার নয়। মেটাতেও চাই না। কারণ এই শিক্ষা আমাদের আর মন্বন্তরে ধ্বস্ত করবে না। তবে যা চিন্তা মহামারীকে নিয়ে।
            *****
#কপিরাইট রিজার্ভ ফর মৃদুল কুমার দাস।

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল✍️ ডা: অরুণিমা দাস

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল ✍️ ডা: অরুণিমা দাস বর্তমানে অতিরিক্ত কর্মব্যস্ততার কারণে একটু বেশি সময় কাজে দেওয়ার জন্য হয়তো একের প্রতি অন্য...