বৃহস্পতিবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২২

কথোপকথন

চিত্রালোচনা
✍️ ডা: অরুণিমা দাস

চিত্র ১

ইমন : আসিস না আমার কাছে, বন্দী করেছি নিজেকে যে ঘরে।

অর্না: কি এমন হয়েছে তোর যে এরকম বলছিস! আমি আছি সর্বদা তোর তরে।

ইমন: দুরারোগ্য ব্যাধি যে, মাস্ক পরা মাস্ট, ইমিউনো কম্প্রোমাইসড আমি, হয়েছে যে ক্যান্সার 

অর্না: হারতে তোকে দেবো না আমি, লড়াই করবো একসাথে, তবেই ক্যান্সার পাবে যোগ্য অ্যানসার।

ইমন: তোর এই কথাগুলোই বাড়িয়ে দেয় মনের জোর, বাড়ে লড়াই করার ইছেশক্তি।

অর্না: হাত ধরার শপথ যখন করেছি ছাড়বোনা তোকে, আমার হাত থেকে নেই তোর কোনোদিন মুক্তি।


 চিত্র ২:

বেঞ্চ: একাকী যে আছি বসে নেই তো কেউ কথা বলার।

আকাশ: হেসে বলে বলতে পারো আমায় মনের কথা তোমার।

বেঞ্চ: স্থবির আমি,জড় পদার্থ,নেই কোনো প্রাণের অস্তিত্ব। মাটিতে ছড়ানো লাল ফুল সব,পারিনা দিতে উপহার তোমায়

আকাশ: নও তুমি জড়, রয়েছে মন তোমার এক আকাশ সমান। ছুতে পারিনা যে তোমারে, আমি বড়ো অসহায়।

বেঞ্চ: রোজ দেখি সাদা পালকের মত মেঘ ভেসে চলে, কখনো বৃষ্টি যদি নামে মনে হয় তোমার ভালোবাসা ঝরছে মুক্তো হয়ে।

আকাশ: দমকা হাওয়ায় গাছ থেকে ঝরে পড়া ফুল দিলাম তোমায় উপহার,গ্রহণ করো হৃদয় দিয়ে।

বেঞ্চ: প্রকৃতির কোলে পেয়েছি ঠাই সাথে রয়েছে সবুজের সমারোহ

আকাশ: খুশি থাকো ওদের সাথে, আমি না হয় সয়ে নেবো বিরহ। 

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

আলো আঁধারের খেলা ✍️ডা: অরুণিমা দাস

আলো আঁধারের খেলা
 ✍️ডা: অরুণিমা দাস

জীবন মানে আলো আঁধারির মিশেল। আলো আর আঁধার একটা কয়েনের এপিঠ ওপিঠ। যখন কোনো মানুষ অন্ধ হয়, দুনিয়ার রূপ,রস আস্বাদন করতে সে অক্ষম হয় কিন্তু তাই বলে আলো কিন্তু অন্ধকারে পরিণত হয়না তার জন্য। প্রকৃতির নিয়মে সূর্য চন্দ্র ওঠে,আলোকিত থাকে চারিপাশ। শুধু অন্ধকারের নাগপাশে আবদ্ধ থাকে সেই অন্ধ মানুষের জীবন। কোনো কিছুর বিনিময়ে আলো যেমন অন্ধকারে পরিণত হয় না তেমনি অবস্থার বিপাকে পড়ে কারোরই নৈতিক জ্ঞান, বুদ্ধি বিসর্জন দেওয়ার কোনো প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে হয় না। জ্ঞানচক্ষু উন্মীলিত হোক সকলের, আঁধারে নিজেকে ডুবিয়ে না রেখে আলোর দিশায় এগিয়ে নিয়ে যান সকলে। অন্ধত্ব একটা প্রতিবন্ধকতা মাত্র, তার জন্য আলো কখনোই অন্ধকার হয়ে যাবে না। 
প্রতিটি মানুষের জীবনে ব্যর্থতা রয়েছে। যখন মানুষ ব্যর্থ হয়ে নিজের জীবনের প্রতি আর আস্থা রাখে না, এমনকি জীবনের সমস্ত আশা আকাঙ্ক্ষার কথা ভুলে শেষ দিনের আশায় প্রহর গুনতে থাকেন। তখন এই উক্তি বা বাণী মানুষকে হতাশার মুখ থেকে বার করে নতুন করে বাঁচার পথ দেখায়। 
 
থেকো না অন্ধকারে,দিচ্ছে আলো হাতছানি দেখো দিয়ে মন
আলো আঁধারের খেলা চলছে আর চলবে যে সারাজীবন।

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

শনিবার, ২৭ আগস্ট, ২০২২

আগামীকালের বিজ্ঞান আলোচনার বিষয় বিজ্ঞানীদের কেন সাহিত্য ও অন্যান্য বিষয় পড়া উচিৎ! সৌজন্যে রজত ও জিৎ

বিজ্ঞান ও সাহিত্যের মেলবন্ধন

 ✍️ ডা: অরুণিমা দাস

বিজ্ঞান কথার অর্থ বিশেষ ভাবে জ্ঞান অর্জন করা। তো এই জ্ঞান অর্জনের সাথে হাতে হাত ধরে যদি সাহিত্যচর্চাকে সঙ্গী করা হয় সেই মেলবন্ধন অন্য মাত্রা পায়। আমাদের শিক্ষাক্ষেত্রেই দশম শ্রেণীর পর একাদশ শ্রেণী থেকে বিজ্ঞান বিভাগ আর কলা বিভাগ এই দুটো বিভাগ আলাদা করে দেওয়া হয়। কিন্তু বিজ্ঞান বিভাগ নিয়ে যারা পড়ে তারা কিন্তু সাহিত্যের ইতিহাসও পড়ে। বিজ্ঞানের কিছু কঠিন তথ্য যদি সুন্দর ও সহজ বাংলা ভাষায় বুঝিয়ে দেওয়া যায় তাহলে সাধারণ মানুষের কাছে বিজ্ঞান বিষয়টা সহজ আর বোধগম্য হয়ে থাকে। এই জন্য বিজ্ঞান জানার সাথে সাথে সাহিত্যও জানার প্রয়োজন পড়ে। আর বিজ্ঞান কিছুটা হলেও ইতিহাস ভিত্তিক। পুরনোকে না জানলে নতুন কিছু আবিষ্কার করা সম্ভব নয়। তাই বিজ্ঞান জানার সাথে সাথে সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্বন্ধেও জ্ঞান থাকা আবশ্যিক। সাহিত্যের জগতে লেখক ও সাহিত্যিক রাজশেখর বসু যিনি পরশুরাম নামে আমাদের কাছে পরিচিত তিনি কিন্তু আসলে কেমিস্ট্রির স্টুডেন্ট ছিলেন। আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের প্রতিষ্ঠিত বেঙ্গল কেমিক্যালে উচ্চপদেই তিনি কাজ করে গেছেন চিরকাল। তিনি শুধু বিজ্ঞান চর্চাতেই নিজের জ্ঞান কে সীমাবদ্ধ রাখেন নি, পাশাপাশি সাহিত্য চর্চা করে সেই জগতেও নিজের অনন্য সৃষ্টির নিদর্শন রেখেছেন। ইংরেজদের রাজত্বে যেটুকু বিজ্ঞান চর্চা হতো তা কেবল ইংরেজি আর জার্মান ভাষায়। তার ফলে বাঙালিদের পক্ষে বিজ্ঞান বোঝা বেশ দুরূহ হয়ে উঠেছিল। কিন্তু সেই দুর্গমতাকে অতিক্রম করে বাঙালির কাছে বিজ্ঞানকে সহজ ভাবে তুলে ধরেছিলেন আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়, আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু, পরশুরাম প্রমুখ বিজ্ঞানীরা। তাদের উদ্যোগেই বিজ্ঞান চর্চা বাংলা ভাষায় চালু হয়। বাঙালিদের কাছে বোধগম্য হয়ে ওঠে বিজ্ঞান। এ তো গেল কিছু্জনের উদাহরণ আরও এরকম অনেকেই আছেন যারা সমান দক্ষতায় বিজ্ঞান ও সাহিত্যচর্চায় তাঁদের অসামান্য অবদান রেখেছেন।
ফিজিক্স এর কঠিন হিসেব,কেমিস্ট্রির বিক্রিয়া আর ম্যাথস,বায়োলজির দুর্দান্ত কঠিন কম্বিনেশনে মাঝে মাঝে সকলেরই সাহিত্যচর্চা করা দরকার। সাহিত্যের রস আস্বাদন করতে করতে বিজ্ঞানকে গ্রহণ করা উচিত বলে আমার মনে হয়। একটা সেতু গড়ে তোলা উচিত বিজ্ঞান আর সাহিত্যের মাঝে।

"শুধু বিজ্ঞানে জ্ঞানার্জন কেনো,সাথে চর্চা হোক সাহিত্যের 
সমৃদ্ধ হোক সকলেই এই দুই বিষয়ে সমন্বয়ের।"

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস



বুধবার, ২৪ আগস্ট, ২০২২

শিরোনাম- গিভিং স্ট্রেস অন স্ট্রেস হরমোন✍️ ডা: অরুণিমা দাস

শব্দালোচনা
 শিরোনাম- গিভিং স্ট্রেস অন স্ট্রেস হরমোন
✍️ ডা: অরুণিমা দাস

অন্ত:ক্ষরণ শব্দটির মানে হয়তো অন্তরের ক্ষরণ। এই শব্দটির সঙ্গে মিল রেখেই হয়তো অন্ত:ক্ষরা গ্রন্থির নাম এসেছে। আর এই গ্রন্থি হলো আমাদের শরীরে হরমোনের উৎসস্থল। আজ শব্দালোচনার দিনে একটু না হয় এন্ডোক্রিন গ্ল্যান্ড বা অন্ত:ক্ষরা গ্রন্থির কাজ কর্ম নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা যাক। স্ট্রেস মানুষের জীবনে অঙ্গাঙ্গী ভাবে জড়িয়ে আছে, তাই আজ স্ট্রেস হরমোন নিয়ে দু চার কথা বলা যাক।

হরমোন  হচ্ছে এক প্রকার রাসায়নিক তরল যা শরীরের কোনো কোষ বা গ্রন্থি বিশেষতঃ অন্ত: ক্ষরা গ্রন্থি থেকে শরীরের একটি নির্দিষ্ট অংশে নিঃসৃত হয়। হরমোনের মাধ্যমে শরীরের অন্যান্য অংশের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে পরিবর্তনের সংকেত পাঠানো হয়। যেমন বিপাকক্রিয়ার পরিবর্তনের জন্য অল্প একটু হরমোনই যথেষ্ট। এটি একটি রাসায়নিক বার্তাবাহক হিসেবে কাজ করে যা এক কোষ থেকে অপর কোষে বার্তা বহন করে। প্রায় সকল বহুকোষীয় জীবই হরমোন নিঃসরণ করে। গাছের হরমোনকে ফাইটোহরমোন বলে। প্রাণীর ক্ষেত্রে বেশির ভাগ হরমোনই রক্তের মাধ্যমে পরিবাহিত হয়। কোষ হরমোনের সংস্পর্শে প্রতিক্রিয়া করে যখন সেগুলোর ঐ হরমোনের জন্য স্পেসিফিক রিসেপ্টর রয়েছে । হরমোন হচ্ছে একধরনের রাসায়নিক পদার্থ যা এন্ডোক্রাইন গ্ল্যান্ড হতে নিঃসৃত হয়ে বিভিন্ন শারীরিক ক্রিয়া,বৃদ্ধি, রক্ত চাপ নিয়ন্ত্রন, ব্রেস্ট মিল্ক তৈরী, পিউবার্টি  ইত্যাদি ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখে৷ সাধারণ ভাষায় হরমোন বলতে আমরা বুঝি মানুষ বা অন্য যে কোনো বহুকোষী প্রাণীর কোষগুলোর মধ্যে একটা ব্যালান্স তৈরি করা,কর্মকাণ্ডের একটা ক্রোনোলজি পূরণ করার একটা কন্ট্রোলিং সিস্টেম। হরমোন সমুহ নিঃসরণ হয় যে সব গ্রন্থি বা গ্ল্যান্ড থেকে সেগুলো নিয়ে একটু জেনে নেওয়া যাক। অন্ত: মানে অভ্যন্তরীণ আর ক্ষরন মানে হচ্ছে নিসঃরন করা। আমাদের শরীরে অনেক প্রকারের গ্রন্থি রয়েছে, সে জন্য ক্ষরন এর উপর ভিত্তি করে গ্রন্থি দু প্রকার। এক্সোক্রাইন বা বহিঃক্ষরা গন্থি ও এন্ডোক্রাইন বা অন্ত ক্ষরা গ্রন্থি।অন্ত:ক্ষরা মানে যেসব গ্রন্থি নালি বিহিন এবং নিঃসৃত রস রক্তে ক্ষরিত হয়ে কাজের জায়গায় পৌছায় এবং রক্তের মাধ্যমে পরিবাহিত হয়ে নির্দিষ্ট স্থানে গিয়ে তার নির্দিষ্ট কাজ করে – যেমন পিটুইটারি, থাইরয়েড এবং অ্যাড্রেনাল গ্রন্থি – এরাই হরমোন নি:সরন করে। বহি:ক্ষরা গ্রন্থি – এই গ্রন্থি নালি যুক্ত এবং নালির মাধ্যমে তার উৎপাদিত রস নিকটের কোন ক্রিয়া স্থলে যায় – যেমন লালা , যকৃৎ এবং ঘাম গন্থি এবং এরা মুলত এনজাইম নি:সরনের কাজ করে । (যকৃৎ থেকে পিত্ত রস, লালা গ্রন্থি থেকে লালা রস নামে অভিহিত )আবার কিছু গ্রন্থি আছে এনজাইম ও হরমোন দুটি এক সাথে নি:সরন করে এদেরকে মিক্সড বা মিশ্রগ্রন্থি বলে যেমন- অগ্নাশয়(প্যানক্রিয়াস), ডিম্বাশয় (ওভারি) এবং শুক্রাশয়(টেস্টিস)। অন্যদিকে যে গ্রন্থি থেকে হরমোনগুলো তৈরী হয় সেই গ্রন্থির নামানুসারে হরমোনগুলোর নাম দেওয়া হয়েছে। যেমন থায়রয়েড গ্রন্থির নাম অনুসারে থাইরয়েড হরমোন , অ্যাড্রিনাল হরমোন, পিটুইটারি হরমোন ইত্যাদি। তেমনি হরমোনকে তার কাজের ভিত্তিতে চার ভাগে বিভক্ত করা যায় – যেমন দেহ বৃদ্ধি করতে সহায়ক হরমোনকে গ্রোথ এবং ডেভলপমেন্ট হরমোন, সেই ভাবে দেহের সামগ্রিক শক্তি উৎপাদন বা শক্তির ব্যবহারে সাহায্যকারী হরমোন,শরীরের ভেতরে যে জল আছে, ইলেকট্রোলাইট মেনটেন করার হরমোন এবং রিপ্রোডাকশন বা সেক্স হরমোন। বিশেষ করে রিপ্রোডাকশন হরমোন নিয়ে ভাল ভাবে জানলে একেবারে নিশ্চিত হয়ে বলতে পারি,দাম্পত্য জীবন বা অন্যান্য কুসংস্কার জাতীয় কিছু ভুল শিক্ষা আছে তা থেকে দূরে থাকতে পারা যাবে, অনেক অজানাকে জানা হবে আর সেই সাথে সদ্য আবিষ্কৃত নতুন নতুন কিছু হরমোনের তথ্যও জানা যাবে। এবারে জেনে নেওয়া যাক মানুষের শরীরের গুরুত্বপূর্ণ কিছু গ্রন্থি ও তার নিঃসরণ সম্পর্কে।
পিটুইটারি গ্ল্যান্ড:  পিটুইটারি গ্রন্থিই যেহেতু হরমোন নিঃসরণ সব চেয়ে বেশী করে তাই এ বিষয়ে জানলেই মনে হয়  অনেক কিছু বোঝা সহজ হবে, সে জন্য একটু বিস্তারিত আলোচনার দরকার । হরমোন নিঃসরনের প্রধান গ্রন্থি হলো পিটুইটারী যা মানুষের মস্তিষ্কের নীচের দিকে হাইপোথ্যালামাস নামক জায়গা হতে ঝুলে থাকে৷ হাইপোথ্যালামাসে যে হরমোন প্রস্তুত হয় তা পিটুইটারী গ্রন্থিকে সংকেত দেয় হরমোন নিঃসরন করার জন্য এবং শারীরিক বিভিন্ন কাজে পিটুইটারী গ্রন্থি হরমোন নিঃসৃত করে৷ সেজন্য পিটুইটারী গ্রন্থিকে মাস্টার গ্ল্যান্ড বা প্রভু গ্রন্থিও বলা হয়৷ ওজন মাত্র পাঁচশো মিলিগ্রাম। পিটুইটারী গ্রন্থি দুই ভাগে বিভক্ত, সামনের দিকে পিটুইটারী গ্রন্থি (অ্যান্টেরিওর) এবং এবং পিছনের দিকে পিটুইটারী গ্রন্থি (পস্টেরিওর)। সম্মুখভাগের পিটুইটারি গ্রন্থি নিঃসৃত হরমোনগুলি হল  অ্যাড্রেনোকর্টিকো ট্রপিক হরমোন, গ্রোথ হরমোন, থাইরয়েড স্টিমুলেটিং হরমোন -থাইরয়েড গ্রন্থির কার্যকারিতা নিয়ন্ত্রক, গোনাডোট্রোপিক হরমোন - জনন গ্রন্থির (শুক্রাশয় ও ডিম্বাশয়) বৃদ্ধি ও কার্যকারিতা নিয়ন্ত্রক। অ্যাডরিনো কর্টিকোট্রফিক হরমোন :- এই হরমোন পিটুইটারি গ্রন্থি থেকে নিঃসৃত হয়। এই হরমোন ঘাটতির কারনে সাধারন ভাবে যে সব সমস্যা দেখা দিতে পারে সেগুলি হলো পেশী দুর্বলতা, মাথা ঘোরা, ওজন কমে যাওয়া, পেটের বিভিন্ন ধরণের ব্যথা, নিম্ন রক্তচাপ ও নিম্ন লেভেলের সেরাম সোডিয়াম অথবা মারাত্মক ইনফেকশন বা সার্জারির কারনেও দেখা দিতে পারে,শেষ পর্যন্ত কোমাও হতে দেখা যায়। গঠনগত দিক দিয়ে,অ্যাডরিনাল গ্রন্থির কর্টেক্স অঞ্চলের স্বাভাবিক বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করে । অ্যাডরিনাল গ্রন্থির কর্টেক্স অঞ্চলকে উদ্দীপিত করে তার ক্ষরণ নিয়ন্ত্রণ করে কিন্তু যদি অ্যাডরিনাল কর্টেক্সের ক্ষরণ বেড়ে যায় তা হলে কুশিং সিনড্রোম হতে পারে। কুশিং সিন্ড্রোম - রক্তে কর্টিসলের মাত্রার এই অস্বাভাবিকতা আবিষ্কার হয় ১৯৩২ সালে। হার্ভে কুশিং এই অস্বাভাবিকতা আবিষ্কার করেন বলে তার নাম অনুযায়ী একে কুশিং সিনড্রোম বলে। এটি কেবল যে মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ তা নয়, এই রোগ ঘোড়া, গৃহপালিত কুকুর, বিড়ালের মধ্যেও দেখা যায়। কর্টিসল হরমোনের নিয়ন্ত্রণহীন বৃদ্ধির ফলে সকল সমস্যা দেখা দেয়। উচ্চমাত্রায় গ্লুকোকর্টিকয়েড ড্রাগ গ্রহণ কিংবা অতিরিক্ত কর্টিসল, অ্যাড্রেনোকর্টিকোট্রপিক হরমোনের কারণেও হতে পারে। পিটুইটারি গ্রন্থিতে টিউমার হলে অতিরিক্ত ACTH ক্ষরণ হয় যা অ্যাড্রেনাল গ্রন্থিকে কর্টিসল তৈরিতে উদ্বুদ্ধ করে। কর্টিসল হল একটি হরমোন যাকে অনেকে স্ট্রেস হরমোন বলে থাকেন। গ্লুকোকর্টিকয়েড হরমোন- এর কাজ হল দেহের শর্করা, ফ্যাট জাতীয় খাদ্যের বিপাক ঘটানো। রক্তে কর্টিসল বেশি থাকলে - হাত পায়ের মানশ পেশীতে টান ধরা, মুখের মধ্যে চাপ চাপ ভাব বা দেখতে বৃত্তাকার মনে হওয়া(মুন ফেস), বাতের ব্যাথার মত ব্যাথা হওয়া,ত্বকে পিম্পল, রক্তবর্ণ লম্বা দাগ দেখা দেওয়া, পেশী দুর্বলতা – দুশ্চিন্তা,বিষণ্নতা বা বিরক্ত হিসাবে দেখতে লাগা। জলতেষ্টা বৃদ্ধি এবং ইউরিন ফ্রিকোয়েন্সি বেশি হওয়া। দীর্ঘ দিন কর্টিসল হরমোন বেশি নিঃসরণ হলে যৌনক্ষমতা হ্রাস পাওয়া, মহিলাদের বিভিন্ন শারীরিক অসুবিধা বা ইত্যাদি সহ পুরুষ মহিলা উভয়ের ক্ষেত্রে সাময়িক বন্ধ্যাত্ব দেখা দিতে পারে । সেই সাথে হতে পারে উচ্চরক্তচাপ,ডায়াবেটিস,মাইগ্রেনের মত মাথা ব্যাথা ইত্যাদি আরও অনেক জঠিল সমস্যা। সবসময় ক্লান্ত, অবসন্ন,নিদ্রাহীনতা ইত্যাদি হতে দেখা যায় । এই জন্য বিজ্ঞানিরা দেখিয়েছেন  , মানুষ যে মুহূর্তে খুব খুশি থাকে এবং মানসিক ভাবে সুন্দর অনুভূতিগুলো জাগ্রত হয় তখন কর্টিসল নামের স্ট্রেস হরমোন কম নিঃসৃত হয়। আর এই হরমোন নিয়ন্ত্রণে রাখা গেলে দীর্ঘায়ু লাভ করা যায়। শুধু মানসিক সুখই নয়, যাদের কর্টিসেল হরমোনের প্রভাব কম থাকবে তাদের রোগ সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করার ক্ষমতা বেশি থাকে বা স্বাভাবিক কোন ধরনের সমস্যায় তেমন ভয় হয় না বা চিন্তামুক্ত মানুষ বলা হয়। এমনিতেই যে যত বেশি মানসিক দুশ্চিন্তা করবে তার কর্টিসল হরমোনের মাত্রা বৃদ্ধি পাবে। তাই কর্টিসল হরমোন থেকে মুক্ত থাকতে হলে যতটা সম্ভব চিন্তামুক্ত বা যে কোন মানসিক চাপ মুক্ত থাকতে হবে । সে জন্য হাই প্রেসার, ডায়াবেটিস ইত্যাদি যেকোন রোগীকে মানসিক চিন্তা মুক্ত থাকতে বলা হয়। রক্তে স্বাভাবিক মাত্রা ৬- ২৩ মাইকোগ্রাম/ডেসিলিটার হচ্ছে নর্মাল ভ্যালু । স্ট্রেস হরমোন হলো তিনটি। কর্টিসোল (একে স্ট্রেস হরমোনও বলে), এপিনেফ্রিন (অ্যাড্রিনালিন নামেও পরিচিত) এবং ডোপাক, একটি ডোপামিন ক্যাটবলাইট (মস্তিষ্কের এই রাসায়নিক এপিনেফ্রিন তৈরিতে সহায়ক) । প্রমান স্বরূপ দেখানো হয়েছে মানুষের এই হরমোন সমুহ হ্রাস করে ৩৯ -৭০% দুশ্চিন্তা মুক্ত করে রাখা সম্ভব। প্রতিরোধ হিসাবে হাসি মজায় থাকলে এই তিনটি স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা কমে আসে ৩০-৪০%।  (মেডিক্যাল ইনফো টেক এন্ড স্ট্রেস রিলিভ মেথড) তাই যাদের রক্তের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে কর্টিসল হরমোনের মাত্রা বেশি থাকে তাদের কুশিং সিনড্রোম হয় । যদিও অনেক সময় পিটুইটারী গ্ল্যান্ডের টিউমারের কারণেও বাড়তে দেখা যায় অর্থাৎ যেকোনো ধরনের শারীরিক বা মানসিক চাপ শরীরে কর্টিসল হরমোনের নিঃসরণ বাড়ায় এবং ক্রমে তা কুশিং সিনড্রোম অসুখে পরিণত হয়। (করটিসল গ্রন্থি রস স্থায়ীভাবে নিঃসরণে অভ্যাস হয়ে গেলে বা স্ট্রেস স্থায়ী ভাবে হয়ে গেলে ২০- ৫০ বয়সের যে কোনো মানুষের মধ্যে ক্রনিক স্ট্রেস দেখা দেয়। রক্ত পরীক্ষায় যদি প্রতি লিটারে পঞ্চাশ ন্যানো মোল -এর চেয়ে এর মাত্রা কম কম থাকে তা হলে মনে করা হয় তা কুশিং সিনড্রোম নয় বা বা ইউরিন পরীক্ষায় যদি চব্বিশ ঘণ্টার ইউরিন নমুনায় কর্টিসোলের মাত্রা ২৫০ হয় তাহলে কুশিং সিনড্রোম নয়। সাধারণত এক মিলিগ্রাম ডেক্সামিথাসোন ট্যাবলেট মুখে খাইয়ে দিয়ে আবার কর্টিসোলের রক্ত-মান নিরূপন করার কথা বলা হয়ে থাকে বা ৪৮ ঘণ্টার ডেক্সামিথাসোন সাপ্রেশান টেস্ট এবং কর্টিসোল নিঃসরণের সারকাডিয়ান ছন্দ অনুমান করে কুশিং সিনড্রোম শনাক্ত করণ করা হয়ে থাকে । তবে অ্যাড্রেনাল গ্রন্থির টিউমারের বেলায় (এন্ডোজেনাস কুশিং সিনড্রোম) প্রয়োজনে সার্জারির প্রয়োজন হয় অনেকের।  যারা অনেক দিন এই জাতীয় অসুখে আক্রান্ত তারা চিকিৎসা বা মন মেজাজের পরিবর্তন না ঘটালে হাড় ভেঙ্গে যাওয়ার মত অসুখ (অস্টিওপোরোসিস ) উচ্চ রক্ত চাপ, ডায়াবেটিস, ঘন ঘন বা অস্বাভাবিক সংক্রমণ – পেশী পাতলা বা শক্তি ক্ষয় ও যৌন ক্ষমতা স্থায়ী ভাবে হ্রাস সহ যে কোন মারাত্মক অসুখে ভুগতে পারেন
প্রিভেনশন - মোটা হওয়ার জন্য অনেকেই স্টেরয়েড খেতে চান – এটা খুব মারাত্মক কারণ দীর্ঘদিন স্টেরয়েড খাওয়ার ফলে মারাত্মক কুশিং সিনড্রোমে আক্রান্ত হতে হয়। যারা অ্যাস্থমা বা অন্যান্য অসুখের কারনে স্টেরয়েড খেয়ে থাকেন তাদের  চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া একটা ট্যাবলেটও না খাওয়া ভালো। 

 "সুখী থাকুন আর জীবন উপভোগ করুন
 খেয়াল রাখুন যাতে দূর হটে স্ট্রেস হরমোন।"

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

সোমবার, ২২ আগস্ট, ২০২২

শিরোনাম - সহানুভূতি ✍️ডা: অরুণিমা দাস

শিরোনাম - সহানুভূতি
✍️ডা: অরুণিমা দাস

কি এমন হয়েছিলো যে কপালে এমন ক্ষত হলো? ডা: ঘোষ ব্যান্ডেজ করতে করতে জিজ্ঞেস করলেন মনামিকে। ওই নিজেদের মধ্যে একটু কথা কাটা কাটি, মিসআন্ডারস্ট্যান্ডিং এসব আর কি! আপনাদের তো রিসেন্ট বিয়ে হয়েছে, এর মধ্যেই এতো আন্ডারস্ট্যান্ডিং এর প্রবলেম? মনামি বললো আসলে আমার হাসব্যান্ড সুনন্দ প্রতি মাসের শেষের দিকে কোথাও একটা যায়,বেশ কিছু টাকা উড়িয়ে আসে। আমার এক বন্ধু ওকে দেখেছে খারাপ এলাকায়। আচ্ছা, তাই নাকি? আপনি কোনোদিন ওনার কাছে জানতে চান নি উনি কোথায় যান? কি করেন টাকা নিয়ে? জানতে চাইলেই বলে আমার ওপর ভরসা রাখো,আমি কোনো বাজে কাজ করছি না! গতকাল আমি জোর করে জানতে চাই ওর কাছে, কোথায় যায়? কি করে? কার সাথে সম্পর্ক ওর যে ওই এলাকায় যেতে হয়? এসব শুনেই সুনন্দ রেগে গিয়ে আমাকে ধাক্কা মারে আর টেবিলের কোণে মাথাটা লেগে কপালটা কেটে যায় আমার। অন্যের কথায় স্বামীকে ভুল বুঝলে তুমি? সুনন্দ ডা: ঘোষের চেম্বারে ঢুকতে ঢুকতে বলে। আরে আপনি? আসুন বসুন। ডা: ঘোষ বললেন সুনন্দকে। হ্যা বসছি, আপনি তাহলে পরের মাস থেকে যাচ্ছেন তো ওখানে? হ্যা নিশ্চই যাবো,এতো ভালো কাজের সুযোগ পেয়েছি, আমি অবশ্যই যাবো। মনামি হা করে সুনন্দ আর ডা: ঘোষের কথা শোনে। সুনন্দ কে ডা: ঘোষ বলেন ওনাকে আর অন্ধকারে রেখে লাভ নেই। বলে দিন সব কথা। কি কথা সুনন্দ? মনামি জানতে চায়। সুনন্দ বলতে শুরু করে - আমি একদিন অফিস থেকে ড্রাইভ করে ফিরছিলাম, এক ভদ্রমহিলা আমার গাড়ির সামনে এসে পড়েন আচমকা। আমি ব্রেক কষে গাড়ী থামিয়ে দিই, উনি একটুর জন্য রক্ষা পান। গাড়ি থেকে নেমে যখন ওনার কাছে যাই, ওনার সাজ পোশাক আমার খুব উগ্র মনে হয়েছিলো। কথাবার্তাও লো কোয়ালিটির। আমায় বলছিলো তুই আজ আমার রাতের খদ্দের। আমি চমকে উঠে বলি কি বলছেন এসব? উনি বললেন এই লাইনে অনেকদিন আছি। কারোর অতিরিক্ত লালসার স্বীকার হয়ে দুটো বাচ্চা জন্ম দিয়েছি। আজকাল শুধু বাচ্চা দুটোর জন্য নিজেকে সাজিয়ে পেশ করি খদ্দেরের কাছে। সব শুনে আমার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছিলো তখন। সামলে নিয়ে বললাম উঠুন গাড়িতে, আপনার বাচ্চাদের দেখে আসি চলুন। গিয়ে দেখি ওই নোংরা পরিবেশে বাচ্চা গুলো ভালো নেই। ওনাকে বলি বাচ্চাগুলোকে অন্য জায়গায় রাখুন, ওদের পড়াশোনা থাকার খরচ আমি দেবো প্রতি মাসে। এই অন্ধকার জায়গা থেকে ওদের সরিয়ে নিয়ে যান, নয়তো ওদের জীবন শেষ হয়ে যাবে। আপনি কেনো এত করছেন বাবু ওদের জন্য? কেউ তো হয় না ওরা আপনার। মুখে বললাম সব প্রশ্নের উত্তর হয় না! মনে মনে ভাবলাম আমিও তো অনাথ আশ্রমে মানুষ হয়েছি,আমার মাও এরকম কেউ ছিলেন হয়তো! আমি বুঝি বাচ্চা গুলোর কষ্ট টা, তাই আমি চাই না ওরা এভাবে নোংরা পরিবেশে থাকুক। এতোটা বলে সুনন্দ থামলো। 
মনামির চোখে জল! সুনন্দর হাত ধরে বললো খুব ভুল হয়ে গেছে আমার, আমি তোমায় ভুল বুঝেছিলাম। তুমি অনেক বড়ো মনের মানুষ। তোমাকে স্বামী হিসেবে পেয়ে আমি ধন্য। ডা: ঘোষ চেম্বার ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন, সুনন্দ বললো পরের মাস থেকে আমি যেখানে যাই, ওখানকার মানুষদের চিকিৎসার জন্য আপনি যাচ্ছেন তো? ডা:ঘোষ বললেন নিশ্চয়ই যাবো, ওনারা এই সমাজের অঙ্গ, ওনাদের ভালো থাকাটা দরকার। আমি আছি আপনার পাশে। থ্যাংক ইউ ডা:ঘোষ, সুনন্দ বললো। 
ওই অন্ধকারে কেউ নিজের ইচ্ছেয় নিমজ্জিত হয় না,পরিবেশ পরিস্থিতি বাধ্য করে। মনামি বললো সরি সুনন্দ ভেরি সরি! ইটস ওকে, চলো বাড়ি যাই, আমাদের সম্পর্ক টা রিনিউ করে আবার নতুন করে শুরু করি। মনামি এগিয়ে চলে সুনন্দর হাত ধরে,সব ভুল বোঝাবুঝিকে দূরে সরিয়ে রেখে। 

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

বৃহস্পতিবার, ১১ আগস্ট, ২০২২

হাসির আড়ালে শিরোনাম_ জীবন সংগ্রাম. ✍️ ডা: অরুণিমা দাস


হাসির আড়ালে
শিরোনাম_ জীবন সংগ্রাম
✍️ডা: অরুণিমা দাস

সার্জারীতে ইন্টার্নশিপ চলছে তখন। প্রথম দিনই নাইট ডিউটি পড়েছে। সিনিয়র দের কাছে শুনেছি রাতে বেশির ভাগ খারাপ পেশেন্ট আসে। মাতাল থেকে শুরু করে সব রকমের পেশেন্ট, কারোর মাথা ফাটা তো কারোর হাতে পায়ে স্টিচ লাগবে। আর বেশির ভাগ লোকের হুশ থাকে না, অভব্য ব্যবহার ও করে অনেক লোক। প্রথম দিন, বলা ভালো প্রথম রাতে ডিউটি তে গেছি বেশ ভয় নিয়েই, কো ইন্টার্ন বললো শোন আমার রাতে তিন ঘণ্টা অফ লাগবে। কি রাজকার্য করবি শুনি? বললো আমার নামাজ পড়তে যেতে হবে। মনে মনে বললাম হতচ্ছাড়া। মুখে বললাম যাস,কিন্তু খারাপ পেশেন্ট এলে কী করবো? বললো স্বপন দাকে ডেকে নিস এসে হাসি মুখে সব সামলে দেবে। স্বপন দা কে রে? গ্রুপ ডি দাদা আমাদের ওয়ার্ডের, ভালো মানুষ খুব। কথা বলতে বলতেই ডিউটি রুমের দরজায় কড়া নাড়ল কেউ। খুলে দেখি একজন রোগা মত লোক দাঁড়িয়ে আছে এক মুখ হাসি নিয়ে। বুঝলাম ইনি স্বপনদা। ঢুকে বললো ম্যাডাম স্যার নতুন পেশেন্ট এসেছে। গেলাম ওয়ার্ডে, একটা ছেলে হাত কেটে ফেলেছে কাজ করতে গিয়ে,তাই স্টিচ করাতে এসেছে। স্টিচ করে ড্রেসিং করে ছেড়ে দিলাম ওকে। তারপর ওয়ার্ডে পেন্ডিং কাজ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। সিস্টার দিদিরা নিজেদের মধ্যে গল্প হাসি ঠাট্টা করছিল। কথায় কথায় স্বপনদার প্রসঙ্গ আসাতে একজন সিস্টার বলে উঠলো মানুষটা এত হাসি খুশি থাকে,সবাইকে ভালো রাখতে চেষ্টা করে, রোগীদেরকে ভালোবাসে কিন্তু একবুক কষ্ট ওনার জমে আছে যা কমার নয় কোনোদিন। জিজ্ঞেস করলাম কি হয়েছিল দিদি? বললেন স্বপনদার ছেলে দুটো যখন বেশ ছোটো, তখন ওনার স্ত্রীর ক্যান্সার ধরা পড়ে। অ্যাডভান্সড স্টেজ ছিল, মাস ছয়েক উনি বেঁচে ছিলেন। তারপর ছেলে দুটোকে নিয়ে একার লড়াই শুরু হয় ওনার। শতকষ্টের মধ্যে দিয়ে গেলেও কোনোদিন দ্বিতীয় বিয়ের কথা ভাবেননি যদি নতুন কেউ এসে সংসারে ভাঙন ধরিয়ে দেয়। হাসি মুখে ঘরে বাইরে লড়ে গেছেন। এখন ছেলে গুলো বেশ বড়ো হয়েছে, একজনকে ওষুধের দোকান করে দিয়েছেন আর একজন কলেজে পড়ে। শুনে বেশ খারাপ লাগছিলো, জীবন যে কখন কাকে কোথায় নিয়ে যাবে কেউ জানেনা। এসব গল্প গুজব করতে করতে নেক্সট পেশেন্ট এসে হাজির। সাথে সাথে স্বপনদাও হাজির হাসি মুখে। পেশেন্ট ছিলো মাতাল, বাইক থেকে পড়ে গিয়ে হাত পা কেটেছে, ভুলভাল বকছেও। উঠে গিয়ে আগে পেশেন্টের মাথায় চোট আছে কিনা দেখলাম। সাথে আসা লোক দুটো বলে উঠলো আগে হাত পা দেখ, পরে মাথা দেখিস। আমি কিছু বলার আগেই স্বপন দা বলে উঠলো আগে ঠিক করে কথা বলুন নয়তো আপনার রোগী কে দেখা হবে না। তখন চুপ করলো তারা। একটা সি টি স্ক্যান এডভাইস দিয়ে আর ড্রেসিং করে ডিউটি রুমে এলাম। কো ইন্টার্ন তখন নামাজ পড়ে ফিরে এসেছে। বললাম স্বপন দা মানুষটা বেশ ভালো। মিষ্টি করে হাসে আর সেই হাসির আড়ালে জমে থাকে অনেক না বলা কথা। শুনে ঘাড় নাড়লো কো ইন্টার্ন। দুমাস সার্জারি পোস্টিং বেশ ভালোই কেটেছিল। ভালো খারাপ যেমন পেশেন্টই আসুক না কেনো হাসি মুখে স্বপনদা হাজির হতো। অনেকদিন হয়ে গেছে আর পুরনো কলেজে যাওয়া হয় না, আশা করি ভালোই আছেন স্বপনদা। এসব মানুষের জন্য হেকটিক ইন্টার্নশিপ অনেকটা হালকা হয়ে যেতো। 

সত্য ঘটনা অবলম্বনে

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

মঙ্গলবার, ৯ আগস্ট, ২০২২

রক্তের টান✍️ডা: অরুণিমা দাস

রক্তের টান
✍️ডা: অরুণিমা দাস

সন্ধ্যে ছটা বাজে প্রায়। গাইনি ওটির বাইরে অস্থির ভাবে পায়চারী করছে অনিল আর ওর মা বাবা। ওটির মধ্যে অনিলের স্ত্রী রিক্তার সিজার চলছে। সবার মুখে চিন্তার ছাপ। প্রায় আধঘন্টা পরে সিস্টার তোয়ালে মোড়া জ্যান্ত পুতুল এনে তুলে দিল অনিলের হাতে। ওর মা বাবা ছুটে এলেন, বললেন কী হয়েছে সিস্টার! ছেলে না মেয়ে? সিস্টার কিছুক্ষন চুপ করে রইলো, তারপর বললো স্যার এসে আপনাদের জানাবেন সবটা। অনিলের মা বললো ছেলে না মেয়ে সেটা স্যার জানাবেন? কেনো আপনি বলতে পারছেন না? সিস্টার চুপ করে বাচ্চাটাকে অনিলের হাত থেকে নিয়ে চলে গেলো। কিছুসময় পরে ডা: ঘোষ ওটি থেকে বেরিয়ে এসে বললেন আপনারা আমার চেম্বারে আসুন,কিছু কথা আছে। অনিল আর ওর মা বাবা গেলো ডা ঘোষের চেম্বারে। ডা: ঘোষ জানালেন যে বাচ্চা জন্মেছে, অ্যাম্বিগুয়াস জেনিটালিয়া নিয়ে মানে ছেলের মত দেখতে হলেও ভেতরকার অঙ্গ গুলো মেয়ের মতো। একটা সেক্স চেঞ্জ অপারেশন করে হয়তো জিনিসটা ঠিক করা যাবে। অনিলের মা হঠাৎ করে বলে উঠলেন আচ্ছা বুঝেছি, তৃতীয় লিঙ্গের জন্ম দিয়েছে রিক্তা। আমি মেনে নেবো না এই সন্তানকে, সাফ জানিয়ে দিলাম তোমাদের। অনিল কিছু বলতে যাচ্ছিলো! ওর মা বললো নয় ওই বাড়িতে আমি থাকবো নাহলে ওই পাপ থাকবে। এবার তুই ঠিক কর কি করবি খোকা? অনিল বুকের ওপর পাথর চাপা দিয়ে মায়ের আদেশ মেনে নিল। নিজের মাকেই আজ তার কেমন যেন অচেনা লাগছে। কি করে এরকম করতে পারে ওর মা? নিজের ছেলের অংশকে এভাবে অস্বীকার করতে পারছে মা? যেটা কোনোদিন মায়ের কাছে আশা করেনি কোনোদিন সে। কিন্তু মায়ের কাছে তখন মনুষ্যত্বের চেয়ে বংশ মর্যাদা বেশী বড়ো হয়ে উঠেছিল। রিক্তাকে জ্ঞান ফেরার পর জানানো হলো সব। শ্বাশুড়ী মায়ের পায়ে ধরেও নিজের সন্তানকে নিজের কাছে রাখতে পারেনি সে। 
এরপর মাঝে বছর পনেরো কেটে গেছে। অনিল আর রিক্তার কোল আলো করে ছেলে এসেছে। অনিলের মায়েরও বেশ বয়স হয়েছে। একদিন রাস্তা পার হবার সময় পাথরে হোচট খেয়ে পড়ে যান উনি। একটা গাড়ী এসে আচমকা ধাক্কা মারে। মাথা ফেটে বেশ রক্ত ক্ষরণ হয়। রাস্তার লোকেরা জড়ো হয় কিন্তু কেউ ওনাকে হাসপাতালে নিয়ে যায় না পুলিশ কেস হবে এই ভয়ে। ভিড় ঠেলে এগিয়ে আসে এক মহানুভব, বলে আপনারা সরুন এখান থেকে আমি ওনাকে হাসপাতালে নিয়ে যাবো। হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে জানতে পারে বেশ গুরুতর চোট ওনার মাথায়, স্টিচ দিতে হবে আর এক ইউনিট রক্তও দিতে লাগবে। অনিল বাবু রিক্তা তখন এসে হাজির কিন্তু রক্তের গ্রুপ মেলে না। সেই মহানুভব এগিয়ে এসে বলে আমার গ্রুপের সাথে মিলে গেলে আমি রক্ত দিয়ে দেবো। অনিল বাবু বললেন আপনার নাম? বললো নীলাভ, আমি কিন্তু স্বাভাবিক মানুষ নই, তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ। অনিল বাবু এক মুহূর্ত না ভেবেই নীলাভ র রক্ত মাকে দেওয়ার জন্য রাজী হলো। পরে যখন জ্ঞান ফিরলো অনিল বাবুর মায়ের,তখন জানতে পারলেন এক তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তি তাকে রক্ত দিয়েছে! শুনে দু চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল আর হয়তো বছর পনেরোর আগের দিনটি মনে পড়ছিল যেদিন তিনি অস্বীকার করেছিলেন তার বংশপ্রদীপকে। আর ঈশ্বর ছাড়া কেউ জানলো না যে এই নীলাভই সেই সন্তান। কিছু কিছু সম্পর্কের সমীকরণ ওলট পালট হয়ে গিয়েও শেষ অব্দি সিড়িভাঙা অঙ্কের মত মিলে যায়,হয়তো আমাদের অজান্তেই। 

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

জীবন শুধুই গতিময় ✍️ ডা: অরুণিমা দাস

জীবন শুধুই গতিময় 
✍️ ডা: অরুণিমা দাস

এই জগৎ স্থিতিশীল নয়। অনন্তকাল ধরে এটি চলবে মহাকালের গতি যেদিন থেমে যাবে সেদিন ঘটবে মহাপ্রলয়। এই যাত্রা পথে আমাদের জীবনও তাই এবং ভবিষ্যতেও গতিশীল। গতিশীলতার মধ্যেই ফুটে ওঠে জীবনের লক্ষণ। সংগ্রাম পূর্ণ আমাদের জীবন। জীবনে বেঁচে থাকতে হলে কাজের প্রয়োজন। কর্মই মানুষকে গতিশীল রাখে। অলস মানুষেরা সমাজে জীবন্মৃত অবস্থায় পড়ে থাকে। স্রোতস্বিনী নদীর জলের বয়ে চলার জন্য সেখানে শেওলা জমাতে পারে না। কিন্তু স্রোতহীন নদী শেওলায় ভরে যায় এবং এতে জল নষ্ট হয়ে ব্যহারের অযোগ্য হয়। তেমনি কর্মময় জীবনই হচ্ছে জীবন। কর্মহীন জীবন মৃত্যুর নামান্তর। এ পৃথিবী হচ্ছে এক বিরাট রণক্ষেত্র। সংগ্রাম করে,যুদ্ধ করে এখানে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হয়। ডারউইন বলেছেন, "প্রকৃতির জগতে যে অধিকতর যোগ্য সেই টিকে থাকবে।" অথাৎ পৃথিবীতে বাঁচতে হলে, টিকে থাকতে হলে সংগ্রাম করেই টিকে থাকতে হবে। দৃষ্টি রাখতে হবে সামনের দিকে, পেছনের দিকে নয়। চিন্তা,চেতনায় যারা অগ্রসর তারাই এগিয়ে যায় প্রগতির পথে আর তারাই আনে বিবর্তন, সৃষ্টি করে নতুন সভ্যতা। মানুষের কল্যাণের জন্য তারাই আবিষ্কার করে নতুন নতুন উপাদন। আর যারা কর্মহীন তারা জড় পদার্থের মত অচল। এরা কোন উপকারেই তো আসেই না বরং অপরের চলার গতিকে ব্যাহত করে। তাই এরা যেমন উপেক্ষিত তেমনি অবাঞ্চিত।
কর্মহীন জীবন কোন মানুষেরই কাম্য হতে পারে না। এতে করে মানুষ অচল ও অসাড় হয়ে পড়ে। কাজই মানুষের জীবনে আনবে গতি। যে গতিতে মানুষ জীবনের অর্থ খুঁজে পাবে। এগিয়ে চলাই জীবন, থেমে যাওয়া যে মরণ। 
ছোট্ট একটা গল্প দিয়ে শেষ করবো। এক মেয়ের গল্প যে ফার্স্ট ইয়ার এমবিবিএস এ এনাটমি বায়োকেমিস্ট্রি আর ফিজিওলজি দেখে ঘাবড়ে গেছিলো, ভেবেছিল মেডিক্যাল পড়া ছেড়েই দেবে। ভয়ে কোনো ক্লাসে যেত না। ফল স্বরূপ ফাইনাল এক্সাম এনাটমি, বায়োকেমিস্ট্রিতে সাপ্লি পেলো। বন্ধুরা দূরে সরে গেলো। ম্যাডাম দেখা হলে বলতো এই যে দুটো সাবজেক্টে ফেল করলি পোস্ট গ্রাজুয়েট এন্ট্রান্স এক্সাম দিতে অসুবিধে হবে। ফাইনাল ইয়ারে চারটে সাবজেক্ট। কি করে পাস করবি? মুখে ক্রুর হাসি। চুপ করে সব কথা হজম করেছিল মেয়েটি সেদিন। বন্ধুরা সব সেকেন্ড ইয়ারে উঠে গেছে। প্যাথলজি, মাইক্রোবায়োলজি, ফার্মাকোলজি পড়া শুরু করেছে আর সে! তখনি এনাটমি আর বায়োকেমিস্ট্রির মাঝে স্যান্ডউইচ হচ্ছে প্রতিদিন। তিনমাস পর সাপ্লি এক্সামের ডেট এলো। পরীক্ষা দিয়ে এলো কোনো রকমে। দুটো সাবজেক্টের ম্যাডাম গম্ভীর ভাবে পরীক্ষা নিলো। পাস না ফেল কিছু বোঝা গেলো না। যাইহোক কোনো রকমে পাস হলো সে সাপ্লি এক্সামে। এদিকে সেকেন্ড ইয়ারে তিনমাসে তখন ক্লাস অনেক এগিয়ে গেছে। কেউ কেউ কোলকাতা গিয়ে কোচিং নিচ্ছে। মেয়েটি কলেজেরই এক স্যারের কাছে প্যাথলজি কোচিং নিতে ভর্তি হলো। বাকি সাবজেক্ট নিজেই পড়তো। হাল ছেড়ে দেয়নি কোনোদিন সে। মোটামুটি যখন প্যাথলজিটা আয়ত্ত করেছে স্যার বললেন এক্সট্রা নোটস দেবো, পড়তে পারবি? কোনোকিছু না ভেবেই হ্যা বলে দিলো মেয়েটি। প্যাথলজি প্রাকটিক্যাল খাতায় যে স্লাইড গুলো  আঁকতো মেয়েটি স্যাররা ভেরি গুড বলতেন। সাইন করে গুড লিখেও দিতেন। দিন এমন এলো যে একটা সাপ্লি পাওয়া মেয়ের কাছে বেশি মার্কস নিয়ে পাস করা বন্ধুরা আসতো স্লাইডের ছবি কারেক্ট করাতে। সেকেন্ড ইয়ারে ওই ল্যাগ যাওয়া তিনমাসের পড়া পড়ে পাস করতে কোনো কষ্ট হয়নি সেরকম। কারণ মেয়েটি কোনোদিন থেমে থাকেনি। বায়োকেমিস্ট্রি ম্যাম আবার খোজ নিয়েছিলেন মেয়েটি ফার্মাকোলজিতে পাস করেছে কিনা! কারণ ওনার ধারণা ছিল বায়োকেমিস্ট্রি তে ফেল করলে ফার্মাকোলজি তে ফেল অবধারিত। এরকম সব টিচার হলে কী আর বলা যায়!
যাইহোক এরপর আর কোনো সাপ্লি জোটেনি মেয়েটির ভাগ্যে। প্রতি ইয়ারে ফাইনাল এক্সামে স্যার ম্যাম সবাই জিজ্ঞেস করতেন মেয়েটিকে, "তোকে সাপ্লি কে দিয়েছিলো রে?" মেয়েটি হাসি মুখে এড়িয়ে যেতো সেই প্রশ্ন। ফাইনাল ইয়ার পাস করে ইন্টার্নশিপ শেষে যখন গাইনি তে হাউসস্টাফশিপ করতে ঢুকলো মেয়েটি,গাইনির স্যার বলেছিলেন একি কাজ পারবে? মনে হয় না খুব ভালো কাজ পারবে! এরপর একবছর হাউস স্টাফ শিপ শেষে সেই স্যারই বলেছিলেন আরো তিনটে মাস রিনিউ করে এই ইউনিটে থেকে যা না! মেয়েটি নাকচ করেছিল পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন এক্সামের প্রিপারেশন নেবে বলে! তারপর লড়াই করে পোস্ট গ্রাজুয়েশন এন্ট্রান্স এক্সাম ক্লিয়ার করার পর একদিন কলেজে আন্ডার গ্রাজুয়েট ডিগ্রী সার্টিফিকেট আনতে গিয়ে সেই বায়োকেমিস্ট্রি ম্যামের সাথে দেখা। ম্যাম রেজাল্ট জেনেছিলেন কোথাও থেকে। চলে যাচ্ছিলেন মুখ লুকিয়ে। মেয়েটি গিয়ে প্রণাম করে বলেছিল "ভালো আছেন ম্যাম?" ম্যাম বললো হ্যা রে! তোর এমডি ক্লাস কবে থেকে শুরু হবে? কোন কলেজ হলো জানাস। সেদিন আর ক্রুর হাসি নেই ম্যামের মুখে। অনুতাপের ছোঁয়া লেগেছিল মুখে। সেদিন ম্যামকে ক্যান্টিনে নিয়ে গিয়ে মিষ্টি খাইয়েছিল মেয়েটি। আজও ম্যাম ফোন করলে হাসি মুখে কথা বলে মেয়েটি,এটাই যে ভদ্রতা। যে ম্যাম একদিন সাপ্লি নিয়ে হেসেছিল সে আজ বলেন বাবু এরপর সুপার স্পেশালিটিটা করতে হবে! তুই পারবি। লড়াই চালিয়ে যাবি, হাল ছেড়ে দিবি না কিন্তু। মেয়েটি বলে চেষ্টা করবো ম্যাম,জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত লড়াই করে যাবো,বিশ্রাম নেবার জন্য স্থির সময় তো ভগবান ঠিক করে রেখেছেনই! ম্যাম চুপ করে শোনেন সে কথা। 
"চলুক লড়াই জীবনে প্রতিপদে এগিয়ে যাওয়ার
বিশ্রামের জন্য মাটির নিচে জায়গা করা আছে সবার।"

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

বিষয় - চিত্রালোচনা



 চিত্র ১

দুই পাখির (ডোডো আর জুডো) কথোপকথন
✍️ ডা: অরুণিমা দাস

ডোডো: বেশ তো বসেছিস ফুলের কোলে, মধু সব নিলি নাকি
জুডো: এরকম ভাবলি কি করে, তোকে কি কোনোদিন দিয়েছি ফাঁকি!

ডোডো : ভুলেই গেছিলাম আমরা যে পাখি, নই রং বদলানো স্বার্থপর মানুষ
জুডো : মানুষ হতে চাই না মোরা,পাখি হয়েই আমাদের দিল খুশ। 

ডোডো : নেই কোনো মারামারি,হিংসা আর হানাহানি
জুডো: আছে এক বড়ো মন আমাদের,তাতেই মোরা খুশি জানি।


 চিত্র ২

 সমুদ্র ও চাঁদের কথোপকথন
✍️ডা: অরুণিমা দাস


সমুদ্র : কি মনে করে চন্দ্রা দেবী আজ এলে মোর তটে নামি
চাঁদ : লাগেনা ভালো আকাশের বুকে থাকতে,মন চায় ছুঁতে ধরা ভূমি!

সমুদ্র: হোক তবে আজ ছোঁয়া ছুয়ির খেলা, আসো আলিঙ্গন করি পরস্পরকে
চাঁদ: তাই করি চলো, তোমার স্পর্শ মুছুক মোর কলঙ্ককে।

সমুদ্র: জোৎস্না রাতে চায় সকলে তোমার আলোয় স্নাত হতে কলঙ্ক সব ভুলে,এ যে  বড়ো পাওনা তোমার
চাঁদ: ভাবিনি তো কখনো এভাবে,তোমার কথা জাগালো আশা,খোঁজ পেলাম নতুন দিশার।

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

বৃহস্পতিবার, ৪ আগস্ট, ২০২২

চাই না খ্যাতি,মানুষ হয়ে বাঁচতে চাই ✍️ ডা: অরুণিমা দাস

চাই না খ্যাতি,মানুষ হয়ে বাঁচতে চাই
✍️ ডা: অরুণিমা দাস

আজকেই ঘটে যাওয়া একটা ঘটনা বলি, হয়তো আজকের বিষয়ের সাথে কিছুটা হলেও মিল পাওয়া যাবে। 
আজকের ওটি তে ঘটা একটা ঘটনা শেয়ার করতে চলেছি। ছোট্ট ছয় বছরের বাচ্চা এসেছে যার নাকের হাড় বাঁকা, আমাদের ভাষায় ডেভিয়েটেড নাসাল সেপটাম বলে যাকে। বাচ্চাটার আস্থমার হিস্ট্রি ছিল। শ্বাসকষ্ট হতো মাঝে মধ্যে। সব জেনেও বর্তমানে অবস্থা স্থিতিশীল থাকার জন্য অজ্ঞান করে অপারেশন শুরু করা হয়। পেশেন্টকে ভেন্টিলেটরে দেওয়া হয়। বেশ কিছুক্ষন ওটি চলার পরে হঠাৎ বাচ্চাটির স্যাচুরেশন কমতে শুরু করে, আর মুখের টিউব দিয়ে গোলাপী রঙের ফেনা বেরোতে থাকে। আমরা সার্জেনদের ওটি বন্ধ করতে বলি সঙ্গে সঙ্গে। আমাদের স্যার এসে আমাকে যা নয় তাই বলে ঝাড়তে শুরু করেন। কাঁদো কাঁদো অবস্থা তখন আমার। সিনিয়ররা কেউ খুব একটা আমার সাপোর্টে কথা বলেনা প্রথমে। এরকম ঘটনা হবার কারণ খুঁজতে গিয়ে দেখা যায় ভেন্টিলেটর মেশিনে সমস্যা, তাই বাচ্চাটির শরীরে অক্সিজেন সরবরাহ কমে গিয়ে সাচুরেশন কমছিল আর তার ফলেই লাং ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ইডিমা ডেভেলপ করে। স্যার পরিষ্কার বলে দিলেন নিজের রেপুটেশন খারাপ করবেন না তাই এর সমস্ত দায় পি জি টি র ঘাড় দিয়েই যাবে। খুব কষ্ট হচ্ছিল তখন শুনে। নিজে বিখ্যাত বলে আজ সব দোষ পি জি টির, যাইহোক কিছু বলার নেই এতে। পি জি টি যখন ঘেমে নেয়ে ক্লান্ত হয়ে সব ম্যানেজমেন্ট করে পেশেন্ট কে স্ট্যাবল করে দিলো তখন স্যারের মুখের কথা চেঞ্জ, কার কাছে ট্রেনিং পাচ্ছিস দেখতে হবে তো! তখনো পি জি টি চুপ, কারণ স্যারের মুখের ওপর কথা বলা স্বভাব নয় তার। স্যার পরে অনেক করে ভালো কথা বললেও পি জি টি স্যারের সাথে আর একটাও কথা বলেনি। কেস খারাপ হলে দায় স্যার নেবেন না। আর ভালো হলে ক্রেডিট স্যারের। এরম ভাবে বিখ্যাত স্যার না হয়ে সাধারণ ভাবে জীবন কাটানো পি জি টির সম্মান অনেক বেশী আমার কাছে। খ্যাতির শীর্ষে উঠবো বলে মানুষকে মানুষ জ্ঞান করবো না, এরকম অমানুষ হয়ে বিখ্যাত হবার কোনো প্রয়োজন নেই আমার। টিম ওয়ার্ক করতে গেলে কোনো ডিসাস্টার হলে দোষ পুরো টীমের, কারোর একার নয়। যাই হোক শেষ অব্দি বাচ্চাটা ভালো আছে, বিকেলে গিয়ে দেখেও আসা হয়েছে। শেষ ভালো যার, সব ভালো তার। 
পরম করুনাময় ঈশ্বরের কাছে অসংখ্য ধন্যবাদ বিপদে পাশে থাকার জন্য আর মুখোশের আড়ালে থাকা মানুষের আসল রূপ গুলো দেখানোর জন্য।

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

মঙ্গলবার, ২৬ জুলাই, ২০২২

চিত্রালোচনা✍️ ডা: অরুণিমা দাস

চিত্রালোচনা
✍️ ডা: অরুণিমা দাস

চিত্র ১

আরশি সমুখে বসে আজ ভাবি আমি একাকী
অতীতের দিনগুলো পড়ছে মনে,স্মৃতিরা তো দেয়নি ফাঁকি।

চিত্র ২
নিশ্চিন্তে মাথা রাখি তোমার কাঁধে,এ যে ঠিকানা আমার ভরসার
জনম জনমের সুখ দুঃখের সাথী যে তুমি আমার।

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

রবিবার, ২৪ জুলাই, ২০২২

লাইফটাইম এক্সপেরিয়েন্স✍️ ডা: অরুণিমা দাস

লাইফটাইম এক্সপেরিয়েন্স
✍️ ডা: অরুণিমা দাস

আজ গাইনি ওটিতে বারোঘণ্টা ডিউটি । সকাল সকাল ফ্রেশ হয়ে ব্রেকফাস্ট করে হাজির হলাম ডিউটি রুমে। সাড়ে আটটা হবে হয়তো, ভাবলাম একটু রেস্ট নিয়ে নেই কখন ডাক আসবে কেস উঠছে বলে! ঘণ্টা খানেক শুয়েছি গাইনির আর এম ও স্যার এসে হাজির হলেন। বললেন একটা ঘাটা কেস উঠবে রে! বললাম হ্যা বলুন স্যার কি কেস? বললেন অ্যাবর্শন করাতে গিয়ে পেশেন্টের জরায়ু ফুটো হয়ে গেছে। সেখান দিয়ে ইন্টেস্টাইনাল পার্ট ঢুকে গিয়ে পেটে ইনফেকশন ছড়িয়ে গেছে। হাই ফিভার পেশেন্টের আর সেপসিস ডেভেলপ করেছে। বললাম ঠিক আছে, পেশেন্ট রেডী করুন,আমি হাই ডেফিনেশন এ গিয়ে পেশেন্ট দেখে নিচ্ছি আগে। এইচ ডি ইউ তে গেলাম, দেখি পেশেন্ট মাঝ বয়সী মহিলা, আগে দুটো সিজার হয়েছে। বললাম কেমন আছো এখন? বললে পেটে খুব ব্যথা। ইন্টার্ন কে বললাম জেলকো করেছিস? দু হাতে চ্যানেল করে রাখিস! বললো দিদি চ্যানেল করা যাচ্ছে না! রেগে বললাম আগে বলিসনি কেন? এখন পেশেন্ট কে ওটি তে তোলার আগে বলছিস? সিরিয়াস কবে হবি? প্রি লোড করার দরকার ছিল। চুপ করে রইলো। বললাম ওটি তে তোল, সেন্ট্রাল লাইন করবো। তারপর কেস আন্ডার করবো। পেশেন্ট টেবিলে উঠলো। সেন্ট্রাল লাইন করলাম সাবক্লাভিয়ান ভেইন এ। সেই লাইন পেটেন্ট হতে ড্রাগ আর ফ্লুইড দিয়ে পেশেন্ট আন্ডার করলাম। কেস শুরু হলো। ইনট্রা অপারেটিভ পিরিয়ডে পেশেন্ট ভালোই ছিল। ঠিক মতো করে এক্সটিউবেট করে পেশেন্ট রিভার্স করছি এমন সময় পাশের টেবিলে জুনিয়র স্পাইনাল দিয়ে পোস্ট সিজার পেশেন্ট কে আন্ডার করছিল। বললাম দেখে দিস ড্রাগ। পাশের টেবিলে পেশেন্ট আন্ডার হয়ে শুয়ে পড়েছে তখন, আমার টেবিলে পেশেন্ট রিভার্স হয়ে গেছে। হঠাৎ চোখ গেলো পাশের টেবিলের মনিটরে, রোগীর স্যাচুরেশন ৮৯%। জুনিয়রকে বললাম প্রোব লাগা ঠিক করে, প্রোব লাগানোর পরও স্যাচুরেশন বাড়লো না, বরং আরও কমতে লাগলো। আমার টেবিল ছেড়ে ছুটলাম আমি পাশের টেবিলে। গিয়ে পেশেন্টের মুখ থেকে অক্সিজেন মাস্ক সরিয়ে বেইন সার্কিট ধরে ব্যাগ মাস্ক কন্টিনিউ করা শুরু করলাম, তখন স্যাচুরেশন জিরো। পেশেন্টের তখন কোনো রেসপন্স নেই। পালস পাচ্ছি না, সি পি আর দিতে বললাম। ইন্টার্ন সি পি আর দেওয়া শুরু করলো। আর দেখি আমার জুনিয়র খেয়াল করেনি জেলকো এক্সট্রা হয়েছে। ফ্লুইড ঠিক মত না পাওয়ায় পেশেন্টের হাইপো টেনশন হয়েছে প্লাস টেবিলের মাথার দিক এতটা নীচু করেছে যে হাই স্পাইনাল হয়ে রেসপিরেটরি মাসল এফেক্ট হয়ে অ্যাপনিক হয়ে গেছে পেশেন্ট। কন্টিনিউয়াস সি পি আর এবং ব্যাগ মাস্ক করে পেশেন্টের স্যাচুরেশন ১০০ তে ওঠালাম। অ্যাট্রোপিন আর অ্যাড্রেনালিন দিলাম এক অ্যাম্পুল করে। হার্ট রেট বেশ খানিক বেড়েছিল। পেশেন্ট একটু স্টেবল হতেই গাইনি পি জি টি কে বললাম সিজার শুরু করো,নয়তো বাচ্চা খারাপ হবে। সিজার শুরু হলো,ঈশ্বরের কৃপায় বাচ্চা সুস্থ ভাবে পৃথিবীর আলো দেখলো। ততক্ষনে পেশেন্ট ও চোখ মেলে তাকিয়েছে, নাম জিজ্ঞেস করলাম! হেসে বললো বীথি। বললাম কেমন আছো? বললো ভালো আছি। গলার স্বর স্বাভাবিক হয়েছে দেখলাম। বললাম বাচ্চা ভালো আছে, তুমি চিন্তা করো না। জুনিয়রের দিকে তাকিয়ে বললাম সিরিয়াস হও। জেলকা এক্সট্রা এটা মেজর মিসটেক। সিনিয়র হও, বুঝবে কত চাপ! চুপ করে রইলো ও। পরে অবশ্য ওকে ভালো করে বুঝিয়েছিলাম কি ভুল থেকে কি কি ক্ষতি হতে পারে পেশেন্টের! বললো খেয়াল রাখবো। এরপর আর কি! ডিউটি থেকে ফেরার সময়ে এইচ ডি ইউ তে গিয়ে পেশেন্ট দুটোকে দেখে এলাম। দিব্যি আছে দেখলাম। মনে মনে ঈশ্বর কে ধন্যবাদ দিলাম। কোথা দিয়ে বারো ঘণ্টা কেটে গেছে খেয়ালই নেই। হোস্টেলের পথে পা বাড়ালাম, গিয়ে ঘুম দিতে হবে ভালো করে। 
                      I treat,he cures!
                  Thanks to almighty🙏

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

বৃহস্পতিবার, ২১ জুলাই, ২০২২

শিরোনাম- অবিজিত ✍️ডা: অরুণিমা দাস

শিরোনাম- অবিজিত
✍️ডা: অরুণিমা দাস



"অবজ্ঞা অবহেলা হাসিঠাট্টা তোমায় নিয়ে যে যতই করুক  
তোমায় কখনো যেনো থামাতে না পারে সেইসকল নিন্দুক।"

যারা কাজ করে ভুল তাদেরই হয়। আর যারা সেই ভুল নিয়ে হাসি তামাশা করে তাদের মত নীচু মানসিকতার লোকেরা এই দুনিয়ার কলঙ্ক। এসব হাসি মজা মাথায় রেখে সেগুলোকে পজিটিভ ওয়ে তে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার নাম ই চ্যালেঞ্জ। তাই লাইফ কে কখনোই বলা উচিত নয় "হোয়াই মি"! বলা উচিত "অলওয়েজ ট্রাই মি"!

আজ একজন এমন ব্যক্তির কথা বলতে চলেছি যার মস্তিষ্কের বিকাশ তার সমসাময়িক বাচ্চাদের মত ছিল না। কিছুটা ধীর গতিতে হচ্ছিলো। তার জন্য তাঁকে স্কুলে স্যার সহপাঠী দের উপহাসের পাত্র হতে হয়েছিলো। কিন্তু তাদের এই উপহাস তাঁকে আটকে রাখতে পারেনি কোনো গণ্ডিতে। একদিন ঠিক তার প্রতিভার বিকাশ ঘটেছিল আর সেই প্রতিভার জোরেই তিনি একদিন বিশ্ব বিখ্যাত বিজ্ঞানী হিসেবে পরিচিত হয়েছিলেন। 

অনেক বড় বিজ্ঞানী ছিলেন তিনি। জন্ম হয়েছিল ১৮৭৯ সালে জার্মানির মিউনিখ শহরে। অথচ এই বিজ্ঞানীর ছেলেবেলা ছিল একেবারেই সাদাসিধে এবং সম্ভাবনাহীন। কেউ তখন ভাবতেও পারেনি এই ছাপোষা ছেলেটিই বড় হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হবেন। এমনকি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় যে পুরস্কার, নোবেল প্রাইজ সেটাও তিনি পাবেন বিজ্ঞানের একটি থিওরি আবিষ্কার করে। এই ব্যাক্তি সর্বপ্রথম আলোচনায় আসেন একটি নিবন্ধ লিখে। নিবন্ধের বিষয় আপেক্ষিকতাবাদ। অথচ ভেবে দেখলে বোঝা যায় আত্মভোলা,বেখেয়ালি এই বিজ্ঞানির বয়স তখন মাত্র কুড়ি। সেই জন্মের পর থেকেই কিন্তু তিনি আত্মমগ্ন থাকতে ভালোবাসতেন। অহেতুক কিছু বলা একেবারেই ছিল স্বভাববিরুদ্ধ। একটা ঘটনা বলা যাক - ওনার সম্পর্কে বলা হয়ে থাকে,তিনি কথা বলতে শুরু করেন দেরিতে, চার বছর বয়সে। পড়তে শেখেন আরও পরে,সাত বছর বয়সে। ডিলেড ডেভেলপমেন্টাল মাইলস্টোন ছিল তার। তিন পেরিয়ে চারে এসেও তিনি যখন কথা বলছিলেন না তখন বাবা-মা খুব চিন্তায় পড়ে গেলেন। এক রাতে তাদের দুশ্চিন্তার অবসান ঘটল। খাবার টেবিলে তিনি হঠাৎ বলে উঠলেন, স্যুপটা খুব গরম! তাঁর মুখে কথা শুনে সবাই খুব অবাক হয়ে জানতে চাইলেন, এতদিন তুমি কথা বলোনি কেন? তিনি উত্তর দিলেন,এতদিন তো সব ঠিকমতই চলছিল।সেই ছেলেবেলাতেই কতটা ভাবুক প্রকৃতির ছিলেন তিনি অথচ তার এই স্বভাবটিকেই মানুষ অন্য চোখে দেখত। একবার তো ক্লাসটিচার তার বিরুদ্ধে মন্তব্যই করে ফেললেন, এ বোকা ছেলেকে দিয়ে কিছু হবে না। আসলে ঘটনা হয়েছিল যে ছেলেবেলায় খুব শান্ত স্বভাবের ছিলেন। ক্লাসে স্যার কিছু জানতে চাইলে অনেক ভেবে উত্তর দিতেন। চট করে কিছু বলতে পারতেন না। ভাবতে গিয়ে দেরী তো হতোই,উপরন্তু তোতলামির কারণে কথা আটকে যেত। ফলে সহপাঠী, শিক্ষকদের কাছে তিনি প্রায়ই হাসির পাত্র হতেন। এসব কারণে ক্লাসটিচার একদিন বলেই ফেললেন,ছেলেটি আস্ত বোকা! ওকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না।কিন্তু ছেলেটির মা এসব কথা মোটেই বিশ্বাস করতেন না। বরং সবাইকে শুনিয়ে বলতেন, তোমরা দেখে নিও ও বড় হলে অধ্যাপক হবে। অনেক নাম করবে। পরে মায়ের কথাই সত্য প্রমাণিত হয়েছিল। ছেলেটি বড় হয়ে অধ্যাপক তো বটেই, অনেক বড় বিজ্ঞানী হয়েছিলেন।  ভাগ্যিস মা তখন ছেলেটির পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। আসলে মায়েরা তো এমনই হয়, তাই না! ছেলে একটু ভাবুক তাতে কী! সে বন্ধুদের সঙ্গে মারামারি তো দূরের কথা দুষ্টুমি পর্যন্ত করত না। সে থাকত তার মতো। তাই দেখে সবাই তাকে অন্যরকম বোকা ভাবত। কিন্তু তিনি মোটেও বোকা ছিলেন না। তিনি ছেলেবেলা থেকেই ছিলেন কৌতূহলী।  হেরম্যান ছিলেন ছেলেটির বাবা। তিনি একবার ছেলেকে উপহার হিসেবে একটা কম্পাস কিনে দিলেন। কম্পাস পেয়ে ছেলেটি সারাক্ষণ শুধু সেটা নিয়েই মেতে থাকেন। হঠাৎ তিনি লক্ষ্য করলেন, আরে! কম্পাসের কাটা কেবল একদিকেই ঘুরে যাচ্ছে, কোনো অবস্থাতেই কাটা অন্যদিকে ফেরানো যাচ্ছে না কেন? তখন বাবার কাছে এর কারণ জানতে চাইলেন। বাবা ছেলের কৌতূহলী মনের পরিচয় পেয়ে খুব খুশি হলেন। তিনি ছেলেটিকে এর কারণ ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে বললেন। ছোটবেলার এই কৌতূহলই ছেলেটিকে বিজ্ঞানী করে গড়ে তুলেছিল। তাই তো হওয়ার কথা। তুমি যদি কোনো কিছু দেখে মনে প্রশ্ন না আসে সে তাহলে শিখবে কীভাবে? সে জন্যই তো বড়দের কাছে প্রশ্ন করে জেনে নিতে হয়। ছোটবেলায় ছেলেটির ইচ্ছা ছিল আলোর রথে চড়বেন। আলো নিয়ে তিনি সব সময় ভাবতেন। ক্লাসে বসে সূর্যের আলো, বাড়িতে বৈদ্যুতিক আলো নিয়ে ভাবতে গিয়ে অনেকবার বড়দের বকুনিও তাকে শুনতে হয়েছে। ১৪ বছর বয়সে আলোর রথে চড়ার বৈজ্ঞানিক পন্থা নিয়ে তিনি ভাবতে শুরু করেন। আপেক্ষিক তত্ত্ব তৈরির সময় এই ভাবনাই তাকে সবচেয়ে বেশি আলোড়িত করেছে। অনেক বড় হয়েও কিন্তু তার মাথা থেকে আলোর রথে চড়ার এই ভূত যায়নি। তো একদিন হয়েছে কী! ছেলেটির স্কুল একেবারেও ভালো লাগত না। কিন্তু কী আর করা! মায়ের আদেশ স্কুলে যেতেই হবে। তাই বাধ্য হয়ে স্কুলে যাওয়া। মা বলেছে, বড় হয়ে অধ্যাপক হতে হবে, তাই অনিচ্ছা সত্ত্বেও পড়াশোনা করা। কিন্তু করলে কী হবে, ক্লাসে গিয়ে শেষ বেঞ্চে দেয়ালের কোণে চুপচাপ বসে থাকতেন। একদিন সূর্যের আলো জানালার কাঁচ ভেদ করে কীভাবে ক্লাসের ভেতর আসছে একমনে এ নিয়ে ভাবছিলেন। হঠাৎ স্যার তাকে দাঁড় করিয়ে পড়া জিজ্ঞেস করলেন। অমনোযোগী থাকায় তিনি উত্তর দিতে পারলেন না। স্যার তাকে শাস্তিস্বরূপ হল রুমে পাঠিয়ে দিলেন। হল রুম ছিল বেশ বড় এবং ঠাণ্ডা। ছেলেটির কিন্তু জায়গাটা বেশ পছন্দ হলো। ক্লাস থেকে বের করে দেয়ায় তিনি বরং খুশিই হলেন। কারণ সেখানে বসে তিনি অন্তত নিরিবিলি নিজের মতো করে ভাবতে পারবেন।ক্লাস, স্যারের তিরস্কার, সহপাঠীদের বিদ্রুপ- সব ভুলে ছেলেটি সেই ঠাণ্ডা হল রুমে বসে সূর্যের আলো নিয়ে ভাবতে ভাবতেই ক্লাসের সময়টুকু পার করে দিলেন। এই ভাবনাটাই ছিল তার গবেষণা। আর এই গবেষণা করেই তিনি আবিষ্কার করেছিলেন আপেক্ষিক তত্ত্ব E=mc^2।বড় হয়ে আমরা এসব নিয়ে পড়াশোনা করেছি ফিজিক্স এ। তাই কথা কম,কাজ বেশী এই মনোভাব নিয়ে চললে লোকের কথা আর গায়ে এসে লাগে না। জীবনে সঠিক পথে এগিয়ে যাওয়ার দিশা দেখিয়ে দেয় লোকজনের এই হাসি,ঠাট্টা অবহেলা গুলো।

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

বুধবার, ১৩ জুলাই, ২০২২

নক আউট ✍️ ডা: অরুণিমা দাস

পরিত্রাণ
✍️ ডা: অরুণিমা দাস

কুয়াশা ঘেরা পাহাড়টা নন্দিনীদের হোটেলের 
বারান্দা থেকেই দেখা যাচ্ছিল। চাদরটা গায়ে জড়িয়ে বারান্দায় এসে বসেছিল নন্দিনী। একদৃষ্টে তাকিয়েছিলো বাইরের দিকে। বাড়ীর কথা খুব মনে পড়ছিলো ওর। মায়ের ওষুধ, ভাইয়ের পড়াশোনা সব কিছু চালাতে ও মেনে নিয়েছিল জামাইবাবুর কথা। বিউটি পার্লারে কাজ জোগাড় করে দেওয়ার নাম করে জামাইবাবু ওকে নিজের এক ক্লায়েন্টের হাতে তুলে দিয়েছিল,সেই থেকে শুরু ওর এসকর্ট জীবনের। বাড়ীতে কেউ কিছু জানতে পারলোই না। ইদানিং কয়েকদিন হলো জামাইবাবু ওকে বেশ কিছু টাকা চেয়ে ব্ল্যাকমেল করা শুরু করেছে। হুমকি দিয়েছে টাকা না দিলে বাড়ীতে জানিয়ে দেবে সব, তখন কোথায় থাকবে ওর মা ভাইয়ের সম্মান? ভাই আর স্কুলেও যেতে পারবেনা, মুখ দেখাতে ও পারবে না। প্রথম প্রথম কিছু টাকা দিলেও পরের দিকে জামাইবাবুর ডিমান্ড খুব বেড়ে যাচ্ছিল, আর পারছিলো না নন্দিনী। অনেক প্ল্যান করে জামাইবাবুর সাথে দার্জিলিং আসে নন্দিনী। এসব ভাবছিল বসে বসে,পাশের চেয়ারে এসে বসলো অমিত,ওর জামাইবাবু। নন্দিনীর দিকে তাকিয়ে বললো এককাপ চা হলে মন্দ হয় না বলো! নন্দিনী বললো নিশ্চয়ই! খুব ভালো হবে। তুমি বসো, আসছি কিছুক্ষনের মধ্যে চা বানিয়ে নিয়ে। অমিত নন্দিনীর কোমরে হাত রেখে বলল তোমার এই উষ্ণতা মাথা স্পর্শ যে আরো বেশি রিফ্রেশিং। নন্দিনী বললো আমি আসছি একটু ভেতর থেকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই চা নিয়ে এসে হাজির হলো নন্দিনী। 
এক কাপ চা তুলে মুখের সামনে ধরলো অমিতের।
অমিত চা নিয়ে খেতে শুরু করলো। খাওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই মনে হলো কিছুই যেনো মনে পড়ছে না, চোখ গুলো বন্ধ হয়ে আসছে। পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যাচ্ছে। কেমন একটা অডিটরী আর ভিসুয়াল হ্যালুসিনেশন হচ্ছে, কেউ যেনো দাড়িয়ে আছে সামনের কুয়াশা ঘেরা পাহাড়টায়। সে যেনো হাত বাড়িয়ে ডাকছে ওকে। নন্দিনীর দিকে তাকিয়ে কিছু বলার চেষ্টা করে, পারে না! চেয়ার ছেড়ে দাড়িয়ে পড়ে অমিত, বারান্দা দিয়ে গিয়ে সামনের রাস্তায় নেমে পড়ে, এগোতে থাকে পাহাড়ি রাস্তার দিকে। নন্দিনী এগিয়ে যায় পেছন পেছন,একটা চাদর জড়িয়ে দেয় অমিতের গায়ে। হিস হিস করে বলে চলো জামাইবাবু, অনেকটা রাস্তা বাকি। হাঁটতে হাঁটতে খাদের কিনারায় পৌঁছে যায় অমিত। বুঝতেও পারে না কি অপেক্ষা করছে ওর জন্য! একটা ধাক্কা পেছন থেকে আর পাথরে পা পিছলে গিয়ে খাদের গভীরে হারিয়ে যায় অমিত। উফফ কি শান্তি! বুক ভরে মুক্তির স্বাদ নেয় নন্দিনী। ভাগ্যিস প্ল্যান করে চায়ের মধ্যে স্টুপিফায়িং এজেন্ট ধাতুরা স্ট্রামোমনিয়াম এর রুট ক্রাশ করে মিশিয়ে দিয়েছিলো। চা টা খাওয়ার পর আর নিজের মধ্যে ছিলো না অমিত। কনফিউশন আর হ্যালুসিনেশনের জন্য মনে হচ্ছিল কেউ ডাকছে ওকে আর সেই ডাক উপেক্ষা করতে না পেরে তলিয়ে গেলো অতল গহ্বরে। চুপচাপ হোটেলে ফিরে এলো নন্দিনী,সব কিছু গুছিয়ে নিলো। প্রমাণ সব লোপাট করে দিলো,এবার ফেরার পালা! আর কেউ ওকে ব্ল্যাকমেল করতে পারবে না। নিজের শহরে ফিরে আবার কাজগুলো শুরু করবে মা ভাইয়ের মুখের দিকে চেয়ে,কিন্তু কিছুতেই ওদের ওপর এই অন্ধকার জগতের ছায়া পড়তে দেবে না। যে ওকে টেনে নিয়ে এসেছিল অন্ধকার জগতে, তাকেই সে পাঠিয়ে দিলো অন্ধকারের ঠিকানায়। মন শান্ত করে স্টেশনের দিকে রওয়ানা দিলো নন্দিনী,নিজের শহর তিলোত্তমার জন্য মন যে তার টানছে খুব। 

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

মঙ্গলবার, ১২ জুলাই, ২০২২

রুবাই


 চিত্র ১
✍️ ডা: অরুণিমা দাস

অস্তরাগের আলো,মন করে দিক ভালো
আসবে নতুন দিন!ঘুচুক সকল কালো।
অপেক্ষারত গাছেরা গোধূলি বেলায়
মৃদুমন্দ সমীরণে জলাশয়ের জল টলোমলো।


 চিত্র ২

অভিমানী মেঘ জমেছে মন মাঝারে যেথা
বুকের মাঝে যে অব্যক্ত কত ব্যথা।
দুঃখগুলো সব ঝরে পড়ে বারি বিন্দু হয়ে
অশ্রু সজল চোখ বলে কত কথা।


©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

বৃহস্পতিবার, ৭ জুলাই, ২০২২

জীবনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গী ✍️ডা: অরুণিমা দাস

জীবনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গী
✍️ডা: অরুণিমা দাস

"যারা নতুন কিছু খোঁজে না,একদিন তাদেরও কেউ খুঁজবে না!" - উক্তিটি বিখ্যাত লেখক জে আর আর টলকিন এর। 
এই কয়েকটি কথা একজন মানুষের জীবনে আমূল পরিবর্তন এনে দিতে পারে। একঘেঁয়ে জীবনে সবাই সচেষ্ট থাকে নতুন কিছু করার,দরকার থাকে শুধু মোটিভেশনের। কিন্তু অনেকেই সমাজের ভয়ে, লোক কি বলবে! এসব ভেবে কুঁকড়ে থাকে। খোলস ছেড়ে বেরিয়ে এসে নতুনত্বের আস্বাদ গ্রহণ করতে হবে,জীবনের চেনা পরিচিত গন্ডী থেকে বেড়িয়ে এসে নিজেকে এক নতুন রূপে প্রকাশ করতে হবে। তবেই সমাজ যথাযথ করে তুলে ধরার চেষ্টা করে,ইনোভেটিভ ওয়ে অনুসরণ করেছেন। আর এসবের মধ্যে দিয়েই সবার মধ্যে জায়গা করে নিয়েছেন,পেয়েছেন বিখ্যাত মানুষের তকমা। 

কে এফ সি এর প্রতিষ্ঠাতা কলোনেল স্যান্ডলার কে এফ সি শুরু করার আগে তিনি আইনজীবী ছিলেন। কিন্তু মনে সব সময় চিন্তা থাকতো নতুন কিছু করার। তিনি অনেক ছোট ছোট ব্যাবসা ও চাকরি এবং বিভিন্ন জায়গাতে কাজ করেছেন। কিন্তু এগুলোতে তার প্যাশন ছিলো না, তাও এভাবেই কেটে যায় তার ৪০ টা বছর! ৪০ বছর পরে সে অনুভব করলেন তার মনের ইচ্ছে হলো মানুষকে খাবার খাওয়ানো। আর এই ইচ্ছে তার মধ্যে ছিলো যখন ৭ বছর বয়স থেকে সে তার ভাইবোনকে খাবার বানিয়ে খাওয়াতেন। তার নতুন প্যাশন খুজে পাওয়ার পরে তিনি সারাটা জীবন সেটাই করে গিয়েছেন। তিনি এমন সফলতা পেলেন তার মৃত্যুর পরেও সেটা কমেনি বরং সারা বিশ্ব জুড়ে তার নাম ছড়িয়ে রয়েছে। 


মার্ক জুকারবার্গ ফেসবুক এর প্রতিষ্ঠাতা তিনি ফেসবুক তৈরি করার আগে কখনই এটা নিয়ে ভাবেনি। প্রথমে সে কিছু ছোট ছোট টুলস তৈরি করেন এবং পরে সব গুলো একসাথে করে ফেসবুক বানিয়ে নেয়। এটা ছিল তার একটি কলেজ প্রোজেক্ট যখন ফেসবুক সফল হলো তখন মার্ক নতুনত্বের মাঝে খুঁজে পেলেন নিজেকে আর আমরা পেলাম বহুদিন আগে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া মানুষের সন্ধান,দূরে থেকেও মনে হয় তারা যেনো পাশেই আছে। 

আমাজন আজ পৃথিবীর সবথেকে বড় দোকান যা শুরু হয়েছিলো শুধু মাত্র বই বিক্রি দিয়ে। আমাজন  এর প্রতিষ্ঠাতা ভেবেছিলেন শুধু বই নয়, আরো অনেক কিছুই দরকার যা বাড়িতে বসেই মানুষ পেতে চাইবে। তার এই চিন্তা ভাবনা বাস্তবে রূপ দিতে হয়ে তিনি আজ সবথেকে বড় অনলাইন শপিং সাইটের প্রতিষ্ঠাতা। 

গুগল এর প্রতিষ্ঠাতা যে কোন দিন ভাবেওনি তাদের ছোট একটি কলেজ প্রোজেক্ট আজকে পৃথিবীর সবথেকে বড় কোম্পানিতে পরিনত হবে। কিন্তু নতুন কিছু করার স্বপ্ন নিয়েই প্রজেক্ট টা শুরু করেছিলেন তিনি। আজ গুগলের সাহায্য প্রতিপদে আমাদের দরকার হচ্ছে, তাঁর অভিনব চিন্তা আমাদের জীবনকে অনেকটা ধাপ এগিয়ে নিয়ে গেছে। 
তাই নিজের মধ্যে প্রচ্ছন্ন থাকা নতুন কিছু করার প্যাশনকে জাগিয়ে তুলতে হবে, সমাজও ঠিক চিনে নেবে একদিনের অনামী ব্যক্তিকে। নতুন চিন্তা ভাবনা,নতুন নতুন কাজ করার ইচ্ছেই অজানা অচেনার ভিড়ে অন্যরূপে নিজেকে প্রস্ফুটিত করে তুলবে। 

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

বুধবার, ৬ জুলাই, ২০২২

শিরোনাম - স্থায়ী ঠিকানা✍️ ডা: অরুণিমা দাস


শিরোনাম - স্থায়ী ঠিকানা
✍️ ডা: অরুণিমা দাস


যখন গাইনি ওয়ার্ডের পাশ দিয়ে ওটি রুমে যাই, একটা করিডোরের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। রোজ দেখি করিডোরের এক পাশে এক ভদ্রমহিলা জানলার পাশে বসে বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকেন। চোখে চোখ পড়লে বুঝতে পারি একরাশ শূন্যতা ওনার চোখে, হয়তো কারোর জন্য অপেক্ষা করতে করতে ধৈর্য্য হারিয়ে ফেলেছেন। সমস্ত রোগীদের খাবার আমাদের হসপিটাল ক্যান্টিন থেকে আসে। যে দাদা খাবার দিতে আসে উনি দেখি এই ভদ্রমহিলাকেও খাবার দেন। একদিন কৌতুহল বশত ওয়ার্ডে সিস্টারকে জিজ্ঞাসা করলাম কে এই ভদ্রমহিলা? সিস্টার বললেন সে একটা ইতিহাস বলতে পারেন। আমি ছোট করেই বলছি। 
ভদ্রমহিলার নাম মিনতি। উনি জরায়ু ক্যান্সার নিয়ে ভর্তি হয়েছিলেন গাইনি ওয়ার্ডে। ওনার একটা পাস্ট কনভালসন এর হিস্ট্রি ছিলো। তো সমস্ত কিছু প্রি অপারেটিভ চেক আপ করিয়েই ওনাকে অ্যাডমিশন করানো হয় আর হিস্টেরেক্টমি করার প্ল্যান করা হয়। হিস্টেরেক্টমি করার সময় অন টেবিল দু বার খিচুনি হয়েছিল। অপারেশন সাকসেসফুল হলেও পোস্ট অপারেটিভ পিরিয়ড এ ওনার মেমোরি পাওয়ার ধীরে ধীরে কমতে থাকে। নিউরো মেডিসিন থেকে ডক্টর দেখে যান এসে ওনাকে। ফাইনালি ডায়াগনসিস হয় উনি আলজাইমার্স রোগে আক্রান্ত। বাড়ীর লোক দের চিনতেও পারেন না। ধীরে ধীরে বাড়ীর লোক ওনাকে দেখতে আসা কমিয়ে দেয়। একদিন তো ওনার বাড়ির একজন বলেই দেয় এসব বোঝা বাড়ীতে নিয়ে যাওয়ার দরকার নেই। পুলিশ দিয়ে পেশেন্ট পার্টি নট ফাউন্ড বলে কমপ্লেইন ও লজ করা হয়,কিন্তু কোনো লাভ হয় না। ব্যাপারটা আমাদের হসপিটাল সুপার জানার পর এই ওয়ার্ডের একটা বেড ওনার জন্য বরাদ্দ করে দেন, আর রেগুলার মিল ও ওনার জন্য ডায়েট প্ল্যানে রাখেন। তারপর বছর ছয়েক হয়ে গেলো উনি এখানেই থাকেন, বাড়ির ঠিকানা ভুলে গিয়ে এই ঠিকানাই এখন ওনার নিশ্চিত আশ্রয় হয়ে গেছে। নিজের মতো থাকেন, মাসীরা স্নান টান করিয়ে দেয় মাঝে মাঝে। আমাদের সাথে এসে মাঝে মাঝে ইশারায় কথা বলেন। কিন্তু কোনোদিন কোনো প্রবলেম করেননি আমাদের কোনো কাজে। এরম মানুষ যদি বাড়ীতেই থাকতো নিজের লোকেদের সাথে হয়তো সহানুভূতি, মায়া মমতা পেয়ে ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠতো কিন্তু যা বাড়ীর লোক ওনার কিছুই বলার নেই ওনাদের এই ব্যবহারে। 
সব শুনে খুব খারাপ লাগলো। বয়স হয়ে গেলে কি সত্যিই মানুষ বাড়ীর লোকের বোঝা হয়ে যায়? শেষ বয়সে কি স্থায়ী ঠিকানা ভুলে অস্থায়ী ঠিকানার খোঁজ করতে হবে সকলকে? এর উত্তর জানা নেই আমার। সত্যিই কি শিক্ষিত সমাজে বাস করার যোগ্য আমরা? কিছু মানুষের অদ্ভুত আচরণ আমাকে প্রশ্নচিহ্ন এর মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়।। 
ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি মিনতি দেবী ভালো থাকুন, ওনার স্মৃতি শক্তি যেনো না ফেরে,নিষ্ঠুর দুনিয়ায় ওনার কেউ নেই সেটা যেনো উপলব্ধি করতে না হয় ওনাকে কোনোদিন। যেরকম আছেন এখানে,এরকম ভাবেই থাকুন আর সুস্থ থাকুন।

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

মঙ্গলবার, ৫ জুলাই, ২০২২

বিষয় - আট লাইনে ছবি কথা


 শিরোনাম - তত্ত্ব কথা
✍️ডা: অরুণিমা দাস


তোড়জোড় চলছে বাড়িতে, বাজছে বিয়ের সানাই
তত্ত্বে এলো বাটা হলুদ,মাখবে যে কনে তাই।

হলুদে রাঙার বেলা এলো,তৈরী কনে হলুদ শাড়ি পরে
মেতে উঠেছে সকলে উলু আর শঙ্খধ্বনির সুরে।

মন দিয়ে দেখে সব,তত্ত্বে আসা মাছ দুইখানি
ভাবে খালি আজ নেই আর ম্যারিনেশনের হয়রানি। 
সেজেছে রুই দুখানি,শাড়ী আর পাঞ্জাবীতে লাগছে তারা অনন্য
শুভ অনুষ্ঠানের প্রতীক হিসেবে থাকতে পেরে  জীবন যে তাদের ধন্য।

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

বৃহস্পতিবার, ২৩ জুন, ২০২২

শিরোনাম - লড়াকু ✍️ ডা: অরুণিমা দাস


শিরোনাম - লড়াকু
✍️ ডা: অরুণিমা দাস

রাশিয়ার ভেলাচিনকোভা শহর, একটি প্রাইমারী স্কুলে পেরেন্ট টিচার মিটিং চলছে। মিটিংয়ের মধ্যমণি এলেনা মাথা নিচু করে চুপ হয়ে বসে আছে। স্কুলে আর আসতে চায় না ও, বাড়িতে জানিয়েছে সেটা। মিডটার্ম পরীক্ষায় রেজাল্ট খুবই বাজে হয়েছে ওর। ফ্রেন্ডস কেউ ভালো করে কথা বলে না। আরও বেশি যেনো কুকড়ে গেছে মেয়েটা। ওর বাবা মাকে হেড মিস্ট্রেস বলছেন 'ভেরি পুওর পারফরম্যান্স,সি হ্যাস ডাল ব্রেন টোটালি'! নো নীড টু সেন্ড হার স্কুল এনিমোর। এলেনার মা মারিয়া আর থাকতে না পেরে বলে ওঠে ইউ ক্যান্ট ডু লাইক দিস ম্যাম, হার ব্রেন ইস নট ডাল। আই চ্যালেঞ্জ ইউ সি ক্যান ডু বেটার রেজাল্ট ইন দ্য ফাইনাল এক্সাম। এটা বলে এলেনা কে নিয়ে বেরিয়ে যায় মারিয়া,পিছন পিছন আসতে থাকে জেমস,এলেনার বাবা। মারিয়া কে বলে ইউ হ্যাভ ডান রং। এভাবে ওকে নিয়ে চলে এলে, এটা ঠিক নয়। মারিয়া বলে যা করেছি ঠিক করেছি। বাড়ি গিয়ে এলেনা কে ভালো করে জিজ্ঞেস করতেই কেঁদে ফেলে এলিনা, জানায় নিজের সমস্যার কথা। ওয়ার্ড চিনতে ওর প্রবলেম হয়, মনে হয় যেনো ওয়ার্ড গুলো ড্যান্স করছে। আর ম্যাথস ক্যালকুলেশন করতেও প্রবলেম হয়। মারিয়া জেমস কে বললো এই যে প্রবলেম গুলো হচ্ছে ওর টিচাররা বুঝতে পারছে না নয়তো বুঝতে চাইছে না। 
জেমস বললো আমাদের কী করা উচিত? মারিয়া বললো চলো ডক্টর দেখাই ওকে। ইচ্ছে করে তো ও আর এরকম করছে না। প্রথমে ফ্যামিলি ফিজিশিয়ান কে দেখানো হলো এলেনা কে। উনি সব শুনে বললেন নিউরো মেডিসিন কাউকে দেখানো হোক। জেমস হাল ছেড়ে দিচ্ছিল, বললো ব্যর্থ হবো মারিয়া, এলেনা কে সুস্থ কী করা যাবে? মারিয়া বললো চেষ্টা তো করে দেখি। নিউরো ডক্টর এলেনার সিম্পটম দেখে কতো গুলো টেস্ট করতে দিলেন। ফাইনালি ডায়াগনসিস হলো ডিসলেক্সিয়া উইথ ডিসগ্রফিয়া অ্যান্ড ডিসক্যালকুলিয়া। বয়স যত বাড়ে তত এই প্রবলেম গুলো বাড়ে। ছোটবেলায় বোঝা যায় না যে প্রবলেম গুলো কতটা সিভিয়ার! নিউরো ডক্টর এলেনাকে 'সেন্টার ফর অ্যাসিসট্যান্স ফর চিলড্রেন উইথ লার্নিং ডিফিকাল্টিসের' বৈজ্ঞানিক পরিচালক ও রাশিয়ান ডিসলেক্সিয়া অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য ডরোথির সাথে যোগাযোগ করতে বলেন। মেডিসিনের থেকেও বেশি ওর স্পীচ থেরাপি আর রাইটিং  ইমপ্রুভমেন্ট এর দরকার ওর। ডরোথির সাথে এলেনা কন্ট্যাক্ট করে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেয় রেগুলার থেরাপি চলতে থাকে এলেনার। মাস তিনেক পর বেশ ভালো উন্নতি হয় ওর অবস্থার। স্কুল টিচাররা ওর অবস্থা বুঝতে পারার পর এখন আর তাড়িয়ে দেওয়ার কথা বলে না। ফ্রেন্ডস দের মত এলেনাও সব ওয়ার্ড চিনতে পারে,তবে ধীরে ধীরে। শুধু মাত্র মারিয়া হাল ছেড়ে দেয়নি বলেই এলেনার জীবন ব্যর্থতার আঁধারে পর্যুবসিত হয়ে যায়নি। নতুন করে জীবনে চলার শক্তি পেয়েছে এলেনা। এভাবেই  এগিয়ে যাক ও নিজের উদ্দেশ্য সফল করার লক্ষ্যে আরও একধাপ। 

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

শিরোনাম - শুভযাত্রা। ✍️ডা: অরুণিমা দাস


 শিরোনাম - শুভযাত্রা
✍️ডা: অরুণিমা দাস

হোক মায়াবী চাঁদের রাত বা আনন্দের বরসাত
বাঁচবো মোরা আনন্দেতে রেখে হাতে হাত।

কলাপাতাই হবে যে আমাদের আমরেলা
খুশির স্রোতে মোরা ভাসাবো মোদের ভেলা। 

দুঃখ যে নেই বিন্দুমাত্র,ডুব দিয়েছি সুখ সাগরে
ভরসার হাত পেয়ে ধন্য জীবন,পৌঁছে ঠিকই যাবো পারে।

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

রবিবার, ১৯ জুন, ২০২২

টেলোমিয়ার উইল টেল দ্য স্টোরি ✍️ডা: অরুণিমা দাস

টেলোমিয়ার উইল টেল দ্য স্টোরি
✍️ডা: অরুণিমা দাস

বুড়ো হতে আমরা কেউ চাই না কিন্তু স্বাভাবিক নিয়মে বার্ধক্য আসে। বার্ধক্যের কারণ কী,এই সত্য জানতে উঁকি দিতে হবে আমাদের শরীরের ভেতরে। 
একটা বছর কাটিয়ে আমরা নতুন বছরে পা দিয়েছি। বাড়ছে বছরের সংখ্যা,সঙ্গে বয়স বাড়ছে। একটু একটু করে বড় হচ্ছি আমরা বা বলা ভাল বুড়ো হচ্ছি আমরা। মানুষের জীবনে বৃদ্ধি ও বিকাশের পাঁচটি দশার মধ্যে সর্বশেষ দশা হল বার্ধক্য। কিন্তু মজার কথা হল এই দশায় কেউই আমরা পৌঁছতে চাই না। এই বার্ধক্যে না যেতে চাওয়ার কারণই হল আমরা বার্ধক্যজনিত রোগকে ভয় পাই এবং শুধু তাই নয়, বার্ধক্য আমাদের কাছ থেকে আমাদের কাজের শক্তি কেড়ে নেয় আর একাকীত্বও বাড়িয়ে দেয়।
এককথায় বার্ধক্য হল এমন এক দশা যেখানে শারীরিক ক্ষমতা হারাতে থাকে,বিভিন্ন রোগ শরীরে বাসা বাঁধতে থাকে,মানুষ পরনির্ভরশীল হয়ে পড়ে। ২০১৫ সালে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী সমগ্র পৃথিবীতে ৬০ বছর বয়সি বৃদ্ধের সংখ্যা ছিল ১২ শতাংশ, যা বেড়ে ২০৫০ সালে প্রায় ২২ শতাংশ হবে বলে ধারণা বিজ্ঞানীদের। কিন্তু শুধুই কি কালের নিয়মে বয়সবৃদ্ধির সঙ্গে আমাদের ত্বক কুঁচকে যায়, দৃষ্টিশক্তি কমে যায়, কর্মক্ষমতা হারায় আর বিভিন্ন রোগ দেখা যায় নাকি তার পেছনে রয়েছে কোনও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা? এরই হদিশ পেতে চেষ্টা করা যাক।

আমরা কেন বুড়ো হই,এই সহজ সত্যিটাকে বুঝতে গেলে সবার প্রথমে আমাদের দেহের কোষের দিকে একবার উঁকি দিতে হবে। কারণ সব রহস্য যে ওখানেই লুকিয়ে রয়েছে। আমাদের দেহের গঠনগত ও কার্যগত একক কোষের মধ্যে থাকা দুটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কোষ অঙ্গাণু নিউক্লিয়াস ও মাইটোকনড্রিয়া বা আরও নিখুঁতভাবে বলতে গেলে এই দুই কোষ অঙ্গাণুর মধ্যে থাকা ডি এন এ এই কাজের মূল হোতা। ডি এন এ এর ক্ষতি ও তার মেরামতির ভুল,আমরা প্রায় সকলেই এই সত্যিটার সঙ্গে পরিচিত যে আমাদের দেহের গঠন থেকে শুরু করে সমস্ত কার্যকারিতার পেছনে রয়েছে নির্দিষ্ট ডি এন এ। তাই ডি এন এ এর এই গুরুত্বের কথা মাথায় রেখেই আমাদের কোষের মধ্যেই থাকে ডি এন এ এর ত্রুটি মেরামতির যন্ত্রপাতি। কোষীয় কোনও রাসায়নিক বিক্রিয়ার কারণে বা ইউভি রশ্মির কারণে যদি ডি এন এ এর কোনও ক্ষতি হয় তাহলে কোষের মধ্যে থাকা সেসব যন্ত্রপাতি দ্রুত  ডি এন এ এর সেই অংশটি মেরামত করে দেয় এবং এই ঘটনা কোষে প্রায় অবিরাম চলতেই থাকে। কারণ ডি এন এ এর প্রতিলিপিকরণের (রেপ্লিকেশন) সময় অনিচ্ছাকৃত হওয়া ক্ষতি,কোষের মধ্যে তৈরি হওয়া ROS (Reactive Oxygen Species) অর্থাৎ সুপার অক্সাইড, পারক্সাইড ইত্যাদি খুব দ্রুত ডি এন এ এর ক্রোমোজোম বিন্যাসে পরিবর্তন ঘটায় ফলে ডি এন এ তার স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা হারিয়ে অস্বাভাবিক হয়ে ওঠে আর এই অস্বাভাবিকতাকে রুখতেই ডি এন এ এর ত্রুটি মেরামতির যন্ত্রপাতি কাজ করে এর স্বাভাবিক ক্রিয়াশীলতা বজার রাখার চেষ্টা করে। কিন্তু মুশকিল হল এইসব তীব্র অক্সিডেজের বিরুদ্ধে কাজ করতে করতে অনেক সময় ডি এন এ এর ত্রুটি মেরামতির যন্ত্রপাতিও নিজের কার্যক্ষমতা হারিয়ে ফেলে তখন কোষে এই ত্রুটিপূর্ণ ডি এন এ এর আধিক্য বাড়তে থাকে। ফলস্বরূপ কোষও তার কার্যকারিতা হারায় ও ধীরে ধীরে কোষ বার্ধক্য দশায় প্রবেশ করে। এভাবেই ডি এন এ এর ত্রুটি মেরামতির যন্ত্রপাতির ত্রুটিজনিত কারণে এক এক করে দেহের বিভিন্ন কোষগুলি বার্ধক্যের দশায় উপনীত হয়। এখানে একটি কথা না বললেই নয়, সেটি হল কৃত্রিম ও প্রক্রিয়াজাত খাবার গ্রহণ, যথেচ্ছ ধূমপান ইত্যাদি দেহকোষে এই ROS (রিয়াকটিভ অক্সিজেন স্পিসিস) এর পরিমাণ বৃদ্ধি করার পেছনে বহুলাংশে দায়ী। এ ছাড়া UV রশ্মি, দূষণ ইত্যাদি তো রয়েছেই।

টেলোমিয়ারের দৈর্ঘ্যের সংক্ষিপ্তকরণ - বার্ধক্যের এটা হলো মূল কারণ। 
যে-কোনও ক্রোমোজোমের শেষ প্রান্তে থাকা অংশটিকে টেলোমিয়ার বলা হয়। এই টেলোমিয়ার অংশটি কিন্তু রিপিটেটিভ কিছু ডি এন এ সিকোয়েন্স দ্বারাই তৈরি অর্থাৎ এই অংশে একই ডি এন এ সিকোয়েন্সের বারংবার পুনরাবৃত্তি ঘটে। তবে এই টেলোমিয়ার ক্রোমোজোমের শেষপ্রান্তকে যেকোনও ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে। সাধারণত ডি এন এ প্রতিলিপিকরণের (রেপ্লিকেশন) সময় প্রত্যেকবার প্রতিলিপিজনিত ত্রুটির কারণে একটু একটু করে এই টেলোমিয়ার অংশটি বাদ পড়তে থাকে। এভাবে টেলোমিয়ার অংশটি বাদ পড়তে থাকার ফলে ওই নির্দিষ্ট কোষটির ডি এন এ তার প্রতিলিপিকরণের ক্ষমতা হারায় ফলে ওই কোষও তার বিভাজন ক্ষমতা হারিয়ে ধীরে ধীরে অ্যাপোপটোসিস (প্রোগ্রামড সেল ডেথ) পদ্ধতির মাধ্যমে ধ্বংস হয়ে যায় এবং এভাবে কোষের মৃত্যু ঘটার ফলে বার্ধক্যের সূচনা হয়। সাধারণত যেকোনও সুস্থ স্বাভাবিক কোষ তার জীবনকালে চল্লিশ থেকে ষাট বার বিভাজিত হতে পারে তারপর সে তার বিভাজন ক্ষমতা হারায়। কোষের বিভাজনের এই সীমাবদ্ধতাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলে হেফ্লিক লিমিট। পেনসিলভেনিয়ার উইস্টার ইন্সটিটিউটের লিওনার্ড হেফ্লিকের নাম অনুসারে এর নামকরণ করা হয়েছে। কোষের এই বার্ধক্যই কিন্তু গোটা একটি জীবকে বার্ধক্য দশার দিকে ধীরে ধীরে ঠেলে দেয়। বার্ধক্যদশায় দেখা-যাওয়া সমস্ত ধরনের অক্ষমতার পেছনে আসল কারণ কিন্তু এগুলোই।

মাইটোকনড্রিয়ায় থাকা ডি এন এ এর ত্রুটিআমরা হয়তো অনেকেই জানি না যে নিউক্লিয়াস ছাড়াও আমাদের মাইটোকনড্রিয়ার মধ্যেও থাকে DNA। সাধারণত ৩৭ টির মতো জিন সমন্বিত এই অঙ্গাণুটি আমাদের কোষের শক্তিঘর (পাওয়ার হাউস) হিসেবেই পরিচিতি পেয়ে এসেছে। আমাদের ক্ষেত্রে যদিও এই DNA কোনও প্রকার বৈশিষ্ট্যের জন্য দায়ী নয়,কিন্তু সমস্যা হল আমাদের ক্ষেত্রে এর কোনও উপকারিতা না থাকলেও এর যে-কোনও ত্রুটি আমাদের সমগ্র কোষের কার্যকারিতাকে ব্যর্থ করতে যথেষ্ট। আগেই বলা হয়েছে যে এই মাইটোকনড্রিয়া আমাদের কোষের শক্তিঘর হিসেবে কাজ করে আর এই কার্য সম্পাদনের জন্য যে প্রক্রিয়াটি সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ সেটি হল ইলেকট্রন ট্রান্সপোর্ট চেইন বা ETC যার মাধ্যমেই আমাদের তথাকথিত শক্তি ATP বা অ্যাডিনোসিন ট্রাই ফসফেট উৎপন্ন হয় ও কোষের বিভিন্নপ্রকারের ক্রিয়া সম্পাদন করে। এই ইলেকট্রন ট্রান্সপোর্ট চেনের মধ্যে দিয়ে তীব্র অক্সিডাইসড ইলেকট্রন যাতায়াত করার সময় ভুলবশত যদি তারা সেই পথ থেকে বিচ্যুত হয় তা হলেই সেখানে মুক্ত মূলক তৈরি হয় যা তাদের তীব্র অক্সিডেজ ক্রিয়ার দ্বারা অঙ্গাণুটির ক্ষতি করে আর সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে তার ডি এন এ এর। যেহেতু ইলেকট্রন ট্রান্সপোর্ট চেনের মাধ্যমে ATP তৈরি হওয়ার সময় উপজাত হিসেবে অক্সিজেনও তৈরি হয় তাই এই মুক্ত মূলকগুলি সাধারণত সুপার অক্সাইড,পারক্সাইড ইত্যাদি হয়ে থাকে আর এগুলিই হল ROS (Reactive Oxygen Species) যা শুধু মাইটোকনড্রিয়ার নয়, সমগ্র কোষের তথা নিউক্লিয়াসে থাকা ডি এন এ এরও ক্ষতি করে। মাইটোকনড্রিয়াকে শক্তিঘর-এর পাশাপাশি ROS উৎপাদনের প্রধান কেন্দ্র হিসেবেও দেখা হয়ে থাকে। সাধারণত একটি কোষে একশোটিরও বেশি মাইটোকনড্রিয়া থাকে। তাই এখানে সৃষ্ট ROS সমগ্র কোষের ক্ষতি করতে সমর্থ। এই ROS এর ফলে মাইটোকনড্রিয়ার ডি এন এ এর সজ্জাক্রমের পরিবর্তন ঘটে সেখানে মিউটেশন দেখা যায়, ফলে ইলেকট্রন ট্রান্সপোর্ট চেনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রোটিন সংশ্লেষণে সে ব্যর্থ হয়,ফলস্বরূপ এ টি পি উৎপাদন ব্যাহত হয় আর তার পাশাপাশি সমগ্র কোষের ক্রিয়াও শক্তির অভাবে প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। শুধু তাই নয়,বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন রোগ যেমন, অ্যালজাইমার,পারকিনসন প্রভৃতি রোগের কারণও এই মুক্ত মূলক। ১৯৫৬ সালে হারম্যান,বার্ধক্যের অন্যতম কারণ হিসেবে মুক্ত মূলকের এই তত্ত্বটি সবার সামনে তুলে ধরেন।

এতো গেলো বয়স বাড়ার কারণ, এরপর দেখা যাক বয়স বাড়ার সাথে সাথে কি কি মানসিক পরিবর্তন ঘটে। এমনিতেই বয়স বাড়লে স্মৃতিশক্তি ক্ষীণ হয়, কাছের মানুষরা অনেকটা দূরে ঠেলে দেওয়ায় একাকীত্ব বোধ হয়,নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ে মানুষ। এসব দুর করার জন্য নিজেকে সবসময় কিছু না কিছু কাজে এনগেজ রাখা উচিত। এতে অ্যালজাইমার ও অন্যান্য স্নায়ুরোগ প্রতিহত হয়।

আবার প্রোজেরিয়া নামক রোগে আক্রান্ত হলে কমবয়সীদের বয়স্কদের মতন দেখতে হয়। 

আচ্ছা আমরা কি কখনও ভেবে দেখেছি যে কিছু মানুষ অল্প বয়সেই প্রায় বার্ধক্যদশা যাপন করে আর কিছু মানুষ আশি বছর বয়সেও একদম সুস্থ সবল ও রোগমুক্ত জীবন কাটায়। এর পেছনে কারণ জানতে গেলে সবার আগে আঙুল উঠবে আমাদের জীবনযাত্রার মানের দিকে। নিয়মিত শরীরচর্চার অভাব, প্রসেসড খাবার খাওয়া, অসময়ে ঘুম,খাওয়া ও সর্বোপরি অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন আমাদের অল্প বয়সেই কর্মক্ষমতা হারিয়ে যাওয়ার মূল কারণ। এবার আসা যাক বিখ্যাত বডিবিল্ডার মনোহর আইচের কথায় যিনি ছোটবেলায় একবার কালাজ্বরে আক্রান্ত হন এবং ফলস্বরূপ তাঁর শরীর-স্বাস্থ্য ভেঙে যায়। পরে কঠিন পরিশ্রম ও নিয়মিত শরীরচর্চার মাধ্যমে তিনি সম্পূর্ণরূপে সুস্থ জীবনযাপন করেন,তাঁর শারীরিক গঠন ছিল দেখার মতো। এমনকী তিনি ১০৪ বছর পর্যন্ত অর্থাৎ মৃত্যুর আগে পর্যন্তও কোনও রোগে ভুগেছিলেন বলেও জানা যায় না। তাই কমবয়সী থাকতে গেলে কোনও বাহ্যিক ক্রিম,বোটক্স ইত্যাদির দরকার পড়ে না। শুধু প্রয়োজন পড়ে সঠিক জীবনযাত্রার মানের, যার দ্বারা আমরা একশো বছর না হোক অন্তত ৬০ বা ৮০ পর্যন্ত সুস্থ স্বাভাবিক রোগমুক্ত জীবন কাটাতে পারি বা তথাকথিত যুবক যুবতী থাকতে পারি।

পরিসংখ্যান সূত্র : গুগল

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

শনিবার, ১৮ জুন, ২০২২

ন্যানোমেডিসিন-চিকিৎসা বিজ্ঞানে আলোর দিশা ✍️ডা: অরুণিমা দাস

বিজ্ঞান ভিত্তিক আলোচনা
 বিষয় - উন্মুক্ত 

ন্যানোমেডিসিন-চিকিৎসা বিজ্ঞানে আলোর দিশা
✍️ডা: অরুণিমা দাস

ন্যানোপ্রযুক্তি দিয়ে চিকিৎসা বিজ্ঞানে কিভাবে উন্নয়ন করা যায় তা নিয়ে বিজ্ঞানীরা কাজ করছেন অনেক বছর ধরে। বিশেষ করে ডিএনএ নিয়ে বিজ্ঞানীদের আগ্রহ অনেক বেশী। বিজ্ঞানের নতুন এই ক্ষেত্রটিকে বলা হল ন্যানো-মেডিসিন। 
মহাশূন্যে ভেসে বেড়াচ্ছে মানুষের তৈরি রোবট। চাঁদ কিংবা মঙ্গল গ্রহে রোবট পাঠাচ্ছে মানুষ। এবার বিজ্ঞানীরা রোবট পাঠাবে আপনার শরীরের ভেতর! নিশ্চয় বিশ্বাস হচ্ছে না! অবিশ্বাস্য এ ঘটনাই হয়তো কিছুদিন পর হবে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ। এখন যেভাবে ট্যাবলেট গিলে খাচ্ছি, ভবিষ্যতে হয়তো কোনো ক্যামেরা গিলে খেতে হবে। এন্ডোস্কোপি আর কোলোনস্কপিতে ক্যামেরার সাহায্যেই আভ্যন্তরীন জিনিস দেখা হয়। কোনোদিন হয়তো শরীরে ইনজেকশন দিয়ে ঢুকিয়ে দেওয়া হবে রোবট!
এসব রোবট হবে আকারে খুবই ছোট। ১০০ ন্যানোমিটারের মতো। ১ ন্যানোমিটার হলো ১ মিটারের ১০০ কোটি ভাগের ১ ভাগ! এদের ন্যানোরোবট না বলে ন্যানোমেডিসিন বলাই ভালো। এরা সহজেই রক্তের সঙ্গে মিশে যেতে পারে। এরা সাধারণত গোলাকার হবে। গোলাকার পার্টিকেলের মধ্যে মেডিসিন ভরে দেওয়া থাকবে। এই ন্যানোমেডিসিন মানুষের দেহকোষ বা ব্যাকটেরিয়ার কোষের থেকে ছোট, কিন্তু এক অণু ওষুধ থেকে আকারে বড়। যেহেতু সাধারণ ওষুধ অণু থেকে বড়, তাই রক্তে এরা দীর্ঘক্ষণ কার্যকর থাকবে। আকার অণু থেকে বড় হলেও এরা রক্তনালিকায় জমাট বাঁধবে না। ন্যানোমেডিসিনের বাইরের অংশে অনেক সময় বিজ্ঞানীরা জৈব অণু যুক্ত করে দেন। এই অণুগুলোর কাজ হলো সঠিক জায়গায় মেডিসিনকে কাজ করতে সাহায্য করা। যেমন বাইরে যুক্ত এসব অণু টিউমার কোষকে চিনতে পারে। তাই ন্যানোমেডিসিন কোনো সুস্থ কোষকে আক্রান্ত না করে শুধু টিউমার কোষের বিরুদ্ধেই কাজ করতে পারবে। সেক্ষেত্রে ক্যান্সার টিউমার গুলোর চিকিৎসা অনেক সহজ হয়ে যাবে। ন্যানোমেডিসিন আবার মেশিনের মতো কাজ করতে পারে। তারা কোষপ্রাচীরে গর্তও তৈরি করতে পারে। 

ন্যানোর আলোকে ইনসুলিন:
হাতের ওপর টর্চের আলো পড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরে ঢুকে গেল মেডিসিন। পুরো কাজটা হলো চোখের পলকে আর কোনো সুচের খোঁচা ছাড়াই! ইনজেকশন যাঁরা ভয় পান নিঃসন্দেহে এ রকম টর্চ তাঁদের খুবই প্রয়োজন। এমন জাদুকরী টর্চ কিন্তু আর কল্পবিজ্ঞানে সীমাবদ্ধ নেই। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা ইনসুলিন গ্রহণের ক্ষেত্রে একে বাস্তবে রূপ দিয়েছেন। তাঁরা গোলাকৃতি ন্যানোপার্টিকেল তৈরি করেছেন, সেগুলো ত্বকের ওপর রেখে অতিবেগুনি রশ্মি ফেললেই ইনসুলিন শরীরে প্রবেশ করবে। ডায়াবেটিস ছাড়াও ক্যানসার চিকিৎসায় 'ন্যানোজেনারেটর' নামে আরেক ধরনের অতি ক্ষুদ্র ওষুধ সরবরাহকারী পার্টিকেল গবেষকেরা তৈরি করেছেন। ইঁদুরের ওপর গবেষণা চালিয়ে দেখা গেছে, বিশেষভাবে তৈরি এই ন্যানোজেনারেটর শুধু ক্যানসার কোষগুলোতেই উচ্চমাত্রায় ওষুধ সরবরাহ করে। তাই ক্যানসার কোষের আশপাশের সুস্থ কোষগুলোর কোনো ক্ষতি হয় না। ন্যানোমেডিসিনের কাজ শুধু ওষুধ সরবরাহতেই সীমাবদ্ধ নেই। ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের প্রফেসর কস্টাস কস্টারেলস ন্যানো–আকৃতির সুই তৈরি করেছেন। সার্জারিতে এর বিশেষ ভূমিকা আছে। ছোট আকৃতির কোষে সিরিঞ্জ বা স্কালপেল দিয়ে কাজ করা যায় না। ন্যানোসুই সেসব জায়গায় সহজেই ঢুকে পড়ে আর কোষে প্রয়োজনমতো পরিবর্তন আনে। যে কোষে সার্জারি করতে হবে তাকে চেনার জন্য সুচের আগায় নির্দিষ্ট কোনো পদার্থ যুক্ত থাকে। তাই আশপাশের কোষের ক্ষতি না করে শুধু টার্গেট কোষেই ন্যানোসুই সার্জারি করতে পারে।
'কোয়ান্টাম ডটস' নামের আরেক ধরনের ন্যানোপার্টিকেল রোগ নির্ণয়ে সাহায্য করে। এর ভেতরের দিকটা ধাতব আর বাইরের দিকটা বিশেষ খোলসে আবৃত। এই বিশেষ ধরনের গঠনের জন্য শরীরে কোনো নির্দিষ্ট রোগ দেখলেই কোয়ান্টাম ডটস ফ্লুরোসেন্ট আলো নিঃসরণ করে। স্ক্যানারের সাহায্যে সেই আলোর উপস্থিতি দেখে কোনো রোগ আছে কি না,সে সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়।

কম্পোনেন্ট অফ ন্যানোমেডিসিন:
ন্যানোমেডিসিনকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। হার্ড ন্যানোমেডিসিন ও সফট ন্যানোমেডিসিন। হার্ড ন্যানোমেডিসিন সাধারণত গ্রাফিন দিয়ে তৈরি করা হয়। গ্রাফিনকে খুব পাতলা শিটে পরিণত করা যায়। এই শিট দিয়ে ফাঁপা নল বা গোলকের মতো গঠন তৈরি করা যায়। হার্ড ন্যানোমেডিসিনে ধাতব পদার্থও থাকতে পারে। কিন্তু বিজ্ঞানীদের ঝোঁক সফট ন্যানোমেডিসিনের দিকেই বেশি। দেহের ভেতর স্বাভাবিকভাবেই বিভিন্ন জটিল জৈব পদার্থ তৈরি হয়, সফট ন্যানোমেডিসিন শারীরিক এই প্রক্রিয়ার দ্বারাই অণুপ্রাণিত হয়ে তৈরি। প্রোটিন, ফ্যাট বা ডিএনএর মতো জৈব অণু দিয়ে সফট ন্যানোমেডিসিনগুলো তৈরি। এদের প্রাকৃতিক ন্যানোমেশিনও বলা হয়। এ ক্ষেত্রে ডিএনএ অণুর বিশেষ কদর আছে বিজ্ঞানীদের কাছে। পছন্দমতো ক্ষারকের অণুক্রম সাজিয়ে বিভিন্ন দৈর্ঘ্যের 
ডি এন এ তৈরি করা যায়। ডিএনএ অণুগুলো নিজেরা বিভিন্নভাবে ভাঁজ হয়ে ক্ষুদ্র ত্রিমাত্রিক আকার ধারণ করে। এভাবে বিজ্ঞানীরা পছন্দমতো আকার দিতে পারেন ডিএনএকে।
অরিগ্যামি শিল্পীরা যেমন কাগজকে ভাঁজে ভাঁজে সাজিয়ে ফুল-পাখির মতো জটিল সব আকৃতি দিতে পারেন তেমন বিজ্ঞানীরাও ল্যাবে ডি এন এ কে এমনভাবে আকার দিতে পারেন। বিভিন্ন আকারের 
ডি এন এ দেহের বিভিন্ন জায়গায় ওষুধ পরিবহনের কাজ করে। কাজ শেষে কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছাড়া নিজেরাই ধ্বংস হয়ে যায়। ডি এন এ অণুর মতো আর কোনো পদার্থ এত নির্ভুল আর স্বকীয়ভাবে কাজ করতে পারে না। ল্যাবে বেস অণুগুলো যেভাবে সাজিয়ে দেওয়া হয়, ডিএনএ শরীরের ভেতর ঠিক তেমনভাবেই ভাঁজ হয়ে যায়। বলা যেতে পারে, বিজ্ঞানীদের কাছে ডি এন এ ই হলো সবচেয়ে বিশ্বস্ত অণু, এটা দেহের ভেতরেও বিজ্ঞানীদের আদেশ অক্ষরে অক্ষরে মেনে ঠিকমতো নিজের কাজ করতে পারে।
অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটি এবং চাইনিজ অ্যাকাডেমি অব সাইন্সেসের গবেষকেরা ক্যানসার কোষ ধ্বংস করার জন্য ডিএনএ ন্যানোরোবট তৈরি করেছেন। মাত্র ৬০-৯০ ন্যানোমিটার আকারের ন্যানোবট গুলো তৈরি করা হয় চ্যাপ্টা আয়তাকার ডিএনএ শিট দিয়ে। ন্যানোবটের গায়ে থ্রোম্বিন নামের এনজাইম যুক্ত থাকে। ন্যানোবট টিউমার বা ক্যানসার কোষের কাছাকাছি পৌঁছে গেলে থ্রোম্বিন কাজ করা শুরু করে। যে রক্তনালিকা ক্যানসার কোষকে রক্ত সরবরাহ করত থ্রোম্বিন তার রক্ত জমাট বাঁধিয়ে দেয়, যাতে কোষে আর রক্ত যেতে না পারে। এতে কোষগুলো মারা যায়। কিন্তু ন্যানোবট সুস্থ কোষের মধ্যে কীভাবে চিনতে পারে ক্যানসার কোষকে? এখানে ন্যানোবটকে সাহায্য করে ডিএনএ অ্যাপ্টামার। ন্যানোবট যদি কোনো ক্যানসার কোষের কাছাকাছি চলে আসে তখন ডিএনএ অ্যাপ্টামারগুলো ক্যানসার কোষের নিউক্লিওলিনের সঙ্গে যুক্ত হয়। নিউক্লিওলিন একধরনের বিশেষ প্রোটিন যা কেবল ক্যানসার কোষেই প্রকাশ পায়। সুস্থ কোষে এদের দেখা যায় না। ল্যাবরেটরিতে ইঁদুরের ওপর পরীক্ষা চালিয়ে দেখা গেছে যে এ ধরনের ন্যানোবট ক্যানসার কোষের ওপর মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যেই কাজ শুরু করে দিতে পারে।
ভাইরাসকে প্রাকৃতিক ন্যানোমেশিন বলে মনে করা হয়। ভাইরাস শরীরের ভেতর ঢুকে মানুষের দেহকোষে গর্ত তৈরি করে নিজেদের ডিএনএ কোষের ভেতরে ঢুকিয়ে দেয়। এভাবেই ভাইরাস দেহে রোগ তৈরি করতে পারে। বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন অক্ষতিকর ভাইরাসকে ন্যানোমেশিন হিসেবে ব্যবহার করেন। এ ক্ষেত্রে ভাইরাসের বাইরে এমন একটা কৃত্রিম আবরণ তৈরি করে দেওয়া হয় যাতে এদের দেখতে শরীরের নিজস্ব কোষের মতো দেখায়। তাই আমাদের ইমিউন সিস্টেম তাকে আর চিনতে পারে না।
দক্ষিণ কোরিয়ার বিজ্ঞানীদের একটি দল ন্যানোব্যান্ডেজ নামের বিশেষ একধরনের ব্যান্ডেজ তৈরি করেছে, যা রোগীর মাংসপেশির সংকোচন-প্রসারণ বা ত্বকের অস্বাভাবিক অবস্থা বুঝতে পেরে ডাক্তারকে রোগীর জন্য সঠিক মেডিসিন বাছাইয়ে সাহায্য করে।

ন্যানোমেডিসিনের ভবিষ্যৎ:
ডিএনএ ন্যানোমেডিসিন যে চিকিৎসাবিজ্ঞানের এক নতুন চমক, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এখন এই চমককে চমকপ্রদভাবে হাতে–কলমে কাজে লাগানোর চেষ্টায় ব্যস্ত গবেষকেরা। ন্যানোমেডিসিনকে নির্ভরযোগ্য ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াহীন ভাবে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কাজ চলছে। ধাতব পদার্থ ব্যবহার করতে হয় বলে কিছু কিছু ক্ষেত্রে এখনো এটি সামান্য ক্ষতি করতে পারে। তবে সব প্রতিকূলতা পার করতে পারলে ন্যানোমেডিসিন আমাদের দিতে পারে স্মার্ট চিকিৎসাসেবা। রে ক্রুজওয়েলের মতো ভবিষ্যতবাণী দেওয়া আশাবাদীরা অবশ্য আরও এক ধাপ এগিয়ে ভবিষ্যতবাণী করেছেন। আগামী শতাব্দীতে এই ন্যানোবট নাকি মরণশীল মানুষকে দিতে পারবে অমরত্বের স্বাদ,এইরকম টাই আশা করা যাচ্ছে।

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

শুক্রবার, ১৭ জুন, ২০২২

শিরোনাম - ইচ্ছেপূরণ ✍️ ডা: অরুণিমা দাস


শিরোনাম - ইচ্ছেপূরণ
✍️ ডা: অরুণিমা দাস

আকাশের বুকে জমেছে কালোমেঘ নিয়ে কতো অভিমান
ব্রিজ চায় তাকে ছুঁতে,অন্তর করে আনচান।

ব্যস্ত মহানগরের রাস্তায় ছুটে চলে গাড়ীর দল
গগনচুম্বী ইচ্ছে তাদের মনে জাগায় কোলাহল।

সময় নেই কারোর হাতে ছুটছে সকলে গন্তব্যস্থলে
আকাশ আছে সাক্ষী যে তার, মেঘপিওন যে তাই বলে।

সফল হোক এই ছুটে চলা ইচ্ছেপূরণ হোক সবার
অভিমানী মেঘ সরে রোদ উঠুক,জয় আসুক অনিবার।

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

বৃহস্পতিবার, ১৬ জুন, ২০২২

অন্তর্দৃষ্টি ✍️ ডা: অরুণিমা দাস

অন্তর্দৃষ্টি
✍️ ডা: অরুণিমা দাস

বছর তিনেক আগের ঘটনা এটা, চণ্ডীগড় গিয়েছি  পোস্ট গ্রাজুয়েট এন্ট্রান্স এক্সাম দেওয়ার জন্য। ইচ্ছে ছিল এক্সাম দিয়ে দু একটা দেখার মত জায়গায় ঘুরে নেবো। পরীক্ষা দিয়ে এসে প্ল্যান মত পরের দিন বেরোলাম ঘুরতে। রক গার্ডেন, রোজ গার্ডেন এগুলোর খুব নাম শুনেছিলাম হোটেল মালিকের কাছে। প্রথমে গেলাম রোজ গার্ডেন এর দিকে। নানা রঙের গোলাপের সমারোহ, দিল তো পুরো গার্ডেন গার্ডেন হয়ে গেছিলো। বেশ খানিকটা সময় রোজ গার্ডেনে কাটিয়ে রওয়ানা হলাম রক গার্ডেনের দিকে। রক গার্ডেনে পাথরের তৈরি নানা জিনিস দেখতে লাগলাম, অপূর্ব কারুকার্য করা সব। ঘুরতে ঘুরতে একটা জলাশয়ের কাছে এসে পৌঁছলাম। পাথরের ধাপ বেয়ে জল গড়িয়ে এসে পড়ছে সেই জলাশয়ে, নয়নাভিরাম দৃশ্য সব। জলাশয় টা পেছনে রেখে এগিয়ে যাচ্ছি একটা জায়গায় দেখি বেশ কিছু লোকের জটলা, কাছে গিয়ে দেখলাম একজন ভদ্রলোক বসে পোট্রেট আঁকছেন আর পাশে রাখা রয়েছে ওনার কর্মকাণ্ডের সব নজির। কেউ কেউ কিনেও নিচ্ছে এক দুটো পোট্রেট। এক সময় ভিড় কমতে দেখলাম যিনি পোট্রেট গুলো আঁকছেন তার চোখে একটা কালো চশমা। ওনার পাশে থাকা ভদ্রলোককে জিজ্ঞেস করলাম, চশমা পরে উনি ছবি আঁকেন? তিনি বললেন হ্যাঁ, আসলে ওর দৃষ্টি শক্তি খুব ক্ষীণ। অপটিক নিউরাইটিস রোগে আক্রান্ত ও, রড কোষ শুকিয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। ও ওই ক্ষীণ দৃষ্টি দিয়েই প্রকৃতির চিত্র রূপ মানসপটে কল্পনা করে রং তুলি দিয়ে পোট্রেট এঁকে ফেলে। শুনে খুব অবাক হলাম আর মনে মনে শিল্পীকে কুর্নিশ জানালাম। এরা সব জন্মগত প্রতিভা,ঈশ্বরের আশীর্বাদ ধন্য। মাঝে মাঝেই ছেলেটি হিন্দিতে বলছিল "মেরা আঁখো কি রশনি চলা যা রহে হ্যায় তো কেয়া হুয়া,মন মে উজালা লেকে  বৈঠা হু! কিসিকা তাকত নেহি হ্যায় উস রশনি কো মুঝসে ছিন সাকতে হ্যায়!" এরকম মন ভালো করা কথা শুনে ভীষন ভালো লাগছিলো। মনের জোর থাকলে কোনোকিছুই অসম্ভব নয় এই দুনিয়ায়। দুটো পোট্রেট কিনেছিলাম ওই ছেলেটির কাছ থেকে। হাসি মাখা মুখটা আজও মনে পড়ে আর বাকী দিন গুলো ভালোই ঘুরেছিলাম চণ্ডীগড়। এসব মানুষ গুলোর না হেরে যাওয়ার কাহিনী গুলোই কারোর কারোর জীবনে ঘুরে দাঁড়ানোর অনুপ্রেরণা হয়ে যায় একটা সময়। ভালো থাকুক জীবনযুদ্ধে পরাজিত না হওয়া এসব মানুষেরা। 

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

রবিবার, ৫ জুন, ২০২২

শিরোনাম - আধুনিকতা বর্জিত ✍️ ডা: অরুণিমা দাস

শব্দ-দিন
শিরোনাম - আধুনিকতা বর্জিত
✍️ডা: অরুণিমা দাস

বর্তমান যুগে আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে সবকিছুতেই। কিন্তু এখনো কিছু মানুষ আছেন যাদের স্পর্শ করতে পারেনি আধুনিকতা, কোনো না কোনো ভাবে তারা অনাড়ম্বর জীবন যাপনে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। আজ জেনে নেওয়া যাক সেরকম কিছু মানুষের কথা। আজ চোখ রাখা যাক ইন্দোনেশিয়ার এক অনামী গ্রাম যেখানে বাস করে তাংতু রা।
বেশ কিছু বছর আগে ইন্দোনেশিয়ার সরকার তাংতুদের গ্রামে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেন। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে তাংতুরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে সরকারের এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করে। এর ফলে আজও পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলি বিদ্যুতের আলোয় আলোকিত থাকলেও তাংতুরা আলোকমেলা থেকে স্বেচ্ছায় নিজেদের বঞ্চিত করে রেখেছে।
সভ্যতার ধর্ম সময় যত এগোবে ততই নিত্য নতুন প্রযুক্তি এসে হাজির হবে। অবশ্যই তা গ্রহণ করার বাছবিচার থাকবে মানুষের কাছে। বিজ্ঞানের কাজ ই হলো কেবলমাত্র সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া। কিন্তু এই সময়ে দাঁড়িয়ে তথাকথিত সভ্য হয়েও এশিয়া মহাদেশে এমন একটি জনগোষ্ঠী আছে যারা যাবতীয় আধুনিক প্রযুক্তি বর্জন করে চলে। এমনকি আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়া এড়িয়ে চলবে বলে এই জনগোষ্ঠীর সদস্যরা আজ পর্যন্ত কোন‌ও গাড়িতে ওঠেনি! এই বিশেষ জনগোষ্ঠী বাদুই নামে পরিচিত। এই জনগোষ্ঠীর মধ্যে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ভাগ আছে আর তারা সকলেই যে আধুনিক প্রযুক্তি এড়িয়ে চলে তা নয়। কেবলমাত্র অতি রক্ষণশীল তাংতু বাদুইরা এই কঠোর সংযমের সঙ্গে আজও জীবন যাপন করে চলেছে।
ইন্দোনেশিয়ার বানতেন প্রদেশের লিবাক রিজেন্সিতে বাদুই আদিবাসী গোষ্ঠী বাস করে। বাইরের দুনিয়ায় এদের বাদুই নামে ডেকে থাকলেও এরা নিজেদের কেনিকিস নামে পরিচয় দেয়। এদের মূল তিনটি ভাগ হলো তাংতু,পানামপিং এবং ডাংকা। এরমধ্যে তাংতু গোষ্ঠীটি লিবাক রিজেন্সির জঙ্গলের একেবারে মধ্যস্থলে বসবাস করে। এরা কাঠের তৈরি বাড়িতে থাকে এবং মূলত সাদা ও নীল রঙের পোশাক পড়ে এবং মাথায় সাদা রঙের পাগড়ি বাঁধে।
পানামপিং বাদুইরা তুলনায় অনেকটা কম রক্ষণশীল। তারা তাংতুদের আশেপাশের গ্রামগুলিতে থাকে। এদেরকে অতি রক্ষণশীল তাংতুরা অনেক সময় বাদুই বলে মনে করতে চায় না। তবে অতীতে নিষিদ্ধ থাকলেও বর্তমানে তাংতু ও পানামপিংদের মধ্যে বিবাহের প্রচলন ঘটেছে। ডাংকা বাদুইরা আসলে বাদুই নয়। তারা অন্য আদিবাসী গোষ্ঠী। কিন্তু এই অঞ্চলে এসে দীর্ঘদিন যাবৎ তাংতু ও পানামপিংদের সংস্পর্শে থাকার ফলে বাদুই সংস্কৃতির সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। ডাংকারা নিজেদের বাদুই বলে পরিচয় দিলেও তাংতু ও পানামপিংরা তাদেরকে বাদুই বলে মনে করে না।
স্বেচ্ছায় অন্ধকারে থাকতে ভালবাসেন বাদুই জনগোষ্ঠীর মানুষ। এই আদিবাসী গোষ্ঠীর সর্বোচ্চ নেতাকে 'পুন' বলে সম্বোধন করা হয়। তাকে তিন গোষ্ঠীর বাদুইরাই মান্য করে চলে। মূলত তাংতু বাদুইদের থেকেই 'পুন' নির্বাচিত হন। বাদুইদের ধর্মের নাম 'সুন্দা উইউইটান'। তাদের মতে, প্রাচীনকালে এক দেবতা তাঁর নিজের জীবন দিয়ে তাদেরকে রক্ষা করেছিল। তাই সমস্তরকম ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানের আগে তারা ওই দেবতাকে স্মরণ করে থাকেন। তাংতু বাদুইরা মনে করেন, সেই দেবতা নিজের হাতে তাদের এই বাসস্থান গড়ে তুলেছিলেন, তাই তারা জঙ্গলের মধ্যবর্তী অঞ্চল ছেড়ে অন্য কোথাও যেতে চায় না। এই আদিবাসী গোষ্ঠীটি মনে করে জীবিতকালে যা কিছু ঘটছে সব‌ই পূর্বনির্ধারিত। তাদের ধারণা প্রকৃতির কোন‌ও কিছুই পরিবর্তন করা হল অনৈতিক কাজ। সেই জন্যই তারা বিদ্যুৎ,আধুনিক ইন্টারনেট, যানবাহন এগুলির কিছুই ব্যবহার করে না।
কিন্তু পানামপিংরা বিদ্যুৎ এর পাশাপাশি মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট, টেলিভিশন সব‌ই ব্যবহার করে। এমনকি অনেক পানামপিং বর্তমানে পুরানো লোকায়ত ধর্ম ছেড়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করছে।

এরকম ভাবেই সহজ সরল জীবন যাপনে অভ্যস্ত থাকুক এসব গোষ্ঠীর মানুষেরা। থাক সরলতার ছোঁয়া, আধুনিকতার মোড়ক দিয়ে নিজেদের আচ্ছাদিত না করে যদি এনারা ভালো থাকতে পারেন থাকুন। সত্যিই শিক্ষণীয় এনাদের জীবন যাত্রা। 
বিলাসবহুল জীবনের প্রতি নেই তাদের কোনো লোভ
আধুনিকতায় অভ্যস্ত মানুষেরা বিলাসিতা না পেলে দেখায় শুধু ক্ষোভ।

চেষ্টা করে দেখাই যাক না সরল অনাড়ম্বর জীবনে সাধারণ মানুষ ফিরতে পারে কিনা! ক্ষতি তো কিছুই নেই, আখেরে লাভই আছে এতে। 

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস
ছবি সৌজন্যে : গুগল

মঙ্গলবার, ২৪ মে, ২০২২

ডোয়ার্ফি ✍️ডা: অরুণিমা দাস

 ডোয়ার্ফি
✍️ডা: অরুণিমা দাস

উহহু! কপালের বাঁদিকটা চিনচিন করে উঠলো ব্যথায়। উঠে বসতে গেলো বরফি,কিন্তু পারলোনা। শরীরটা বড্ড দুর্বল লাগছে ওর। পাশের বেডে থাকা এক বয়স্ক দাদু বললেন আহা উঠো না বাছা! অনেকটা কেটে গেছিলো তোমার, রক্তও বেরিয়েছিল অনেক। তাই এখন একটু দুর্বল লাগবে। সিস্টার মেডিসিন রেডী করছিল,ওদের কথা শুনে বরফির বেডের পাশে এসে বললো এখন একদম রেস্ট তোমার। কতগুলো সেলাই পড়েছে জানো! আমার আবার রেস্ট! হাসালে দিদি। সার্কাস দেখাতে দেখাতে জীবনটাই একটা সার্কাস হয়ে গেছে। এরম বোলোনা বরফি। সেদিন তুমি না থাকলে ওই বাচ্চাটাকে বাঁচানো যেত কি! সেদিনটা আর মনে করতে চাইনা দিদি। বাচ্চাটা রাস্তা পার করতে গিয়ে একটু হলেই ট্রাকের তলায় পড়ছিল। আমি খালি দৌড়ে গিয়ে ওকে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিয়েছিলাম। আর নিজে টাল সামলাতে না পেরে পাথরের ওপর মাথাটা ঠোক্কর খেয়ে গেছিলো। তারপর আর মনে নেই কিছু। তারপরেরটা আমি বলছি! বলতে বলতে ঘরে ঢুকলেন ডা: পল্লব। আরে আপনি স্যার? হ্যা বরফি আমি! আর শুধু আমিই নই সেদিন যে বাচ্চাটাকে বাঁচিয়ে ছিলে তার মা বাবা আর সে তিনজনেই এসেছে তোমার সাথে দেখা করবে বলে। তাই! আমার সাথে?চোখে মুখে বিস্ময় ফুটে উঠে বরফির। কেমন আছো আঙ্কেল? জিজ্ঞেস করে সেদিনের সেই বাচ্চাটা যাকে বরফি বাঁচিয়েছিল। বরফির চোখ দিয়ে অজান্তেই দু ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ে, এত সম্মান কেউ দেয়নি তাকে আজ পর্যন্ত। সার্কাসে সবাই ওই দেড় ফুট,কালার বয় এসব বলেই ডাকতো। ভালো আছি বাবু, তুমি কেমন আছো? আমিও ভালো আছি আঙ্কেল। আচ্ছা আঙ্কেল তোমার সেদিনকার জামা আর ওসব রঙিন চুল, টমেটোর মত লাল নাক ওগুলো কোথায় গো? ওহ ওগুলো! ওসবতো আমি সার্কাসে খেলা দেখানোর সময় পরিগো। এখন তো হাসপাতালে আছি,তাই ওসব পরিনি। বাবুর বাবা মা এগিয়ে এসে বললো কি বলে যে আপনাকে ধন্যবাদ দেবো বরফি আমরা জানিনা। সেদিন আপনি তুতুনকে না বাঁচালে আমাদের জীবনে আঁধার নেমে আসতো আজ। আপনার কাছে আমাদের কৃতজ্ঞতার শেষ নেই আর। না না এসব বলবেন না আপনারা,বরফি বললো। ছোটবেলা থেকে মা বাবা ছাড়া আছি তো,জানি কষ্টটা। আজ যদি আমি বামন না হয়ে সাধারণ মানুষের মতো চেহারার অধিকারী হতাম কেউ আর ঘেন্না করতো না আমায়। এরম বোলো না বরফি। তোমার এই রঙিন পোশাকের নিচে আছে একটা রঙিন মন যেটা দিয়ে তুমি সবাইকে আনন্দ দান করো, ডা: পল্লব বললেন। আচ্ছা শোনো বরফি এনারা কি বলছেন? তুতুনের বাবা বরফির হাত ধরে বললেন আমি তো বাড়ীর জন্য বেশী সময় দিতে পারি না, বাচ্চাটা একা একাই থাকে। ওর মাও তো নানান কাজে ব্যস্ত থাকে। তুমি ওর সর্বক্ষণের সঙ্গী হবে? আমাদের বাড়িতে থাকবে ওর গভর্নেস হয়ে? কিন্তু আমার সার্কাসের কাজ? আমার ওখানকার বন্ধুরা? ওদের ছেড়ে আমি কি করে থাকবো? বরফি বলে। অনেক আশা নিয়ে এসেছি গো আমরা,বরফি। মাফ করবেন আমায়, আমি আমার সার্কাস ছেড়ে কোথাও যাবো না,মন টিকবে না। এটাই এখন আমার ঘর বাড়ী সব হয়ে গেছে। কিরে ডোয়ার্ফি! আছিস কেমন? শুনলাম একদম হিরোর মত একটা বাচ্চার জীবন বাঁচিয়েছিস! মালিক আপনি? সার্কাসের মালিককে দেখে বরফি খুব অবাক হয়। দেখ কারা এসেছে! বলতে বলতে মালিকের পেছনে আরো তিন চারজন বেঁটে মানুষ ঢোকে। বরফি কে বলে তুই কি আমাদের ছেড়ে চলে যাবি রে? না না আমি তুতুনের বাবাকে বলে দিলাম আমার সার্কাস আর বন্ধুদের ছেড়ে গিয়ে কোথাও শান্তি পাবো না আমি। ডোয়ার্ফি, কাল তোর ছুটি হবে হাসপাতাল থেকে, আমরা এসে নিয়ে যাবো তোকে। এরপর একসপ্তাহ রেস্ট তোর, খেলা দেখাতে হবে না। পুরো সুস্থ হয়ে খেলা দেখাস না হয় আবার। মালিকের কথা শুনে বরফির বেশ ভালো লাগে,এদের ছেড়ে কিছুতেই সে শান্তি পাবে না অন্য জায়গায় গিয়ে। তুতুন মুখ ঝুলিয়ে বসেছিল, বরফি বললো কি হলো? কথা বলবেনা আমার সাথে? না আঙ্কেল তুমি তো আমার বাড়ী গেলে না! যাবো বাবু, তোমার ঠিকানা নিয়ে রাখলাম। যখন এখানে আসবো সার্কাস দলের সাথে ঠিক তোমার সাথে দেখা করে যাবো। আর এখন যতদিন সার্কাস থাকবে এখানে তুমি এসো মাঝে মাঝে,দেখা হবে,প্রমিস! কোনো মায়ায় আর জড়াতে চায়না বরফি, সেই বাঁধন ছিঁড়ে গেলে কষ্ট অনেক বেশি তাতে। তার চেয়ে ডোয়ার্ফি হয়ে রঙিন পোশাকে মানুষকে আনন্দ দেওয়ার কাজটাই বরং ভালো। মনের মাঝে বেজে উঠলো 
"জিনা ইহা, মরনা ইহা ইসকে ইসিভা জানা কাহান!
 জী চাহে জব হামকো আওয়াজ দো,হাম হ্যায় বহি, হাম থে যাহা।"

 ©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

বৃহস্পতিবার, ১৯ মে, ২০২২

গল্পঃ শীতোষ্ণতা। ✍️ নন্দিনী তিথি


এককালে এক অজ্ঞাত মরুভূমির এককোণে একটা বসতি গড়ে উঠেছিলো। একে অন্যকে ভালোবেসে নিজ নিজ বাড়ি ছেড়েছিল দু'জন তরুণ-তরুণী। তখন এই অজানা মরুভূমিই তাঁদের আশ্রয় দিয়েছিল। এরপরে এখানে থেকেই একে অন্যের হাত ধরে শুরু হয় তাঁদের পথ চলা। প্রতিদিন ভোর হতেই দু'জনে চলে যেতো কাজে আর বাড়ি ফিরতো সন্ধ্যে নামার আগে কোনো কোনো দিন সন্ধ্যে ঘোরও হয়ে যেতো। তাঁদের এই নিরলস পরিশ্রমের কারণ ছিলো দু'টো- ১. পেটের চাহিদা মেটানো এবং  ২. সাথে দু'টো টাকা জমানো।

এইভাবেই ওদের জীবন শুরু হলো, এবং চলতে লাগলো। ঋতু পরিবর্তনে ওদের প্রায়শই সমস্যায় পরতে হতো। সবথেকে যে সমস্যাটা বেশি হতো- গ্রীষ্মকালে ওদের মরুভূমির পাশে থাকাটা খুব কষ্টকর হয়ে যেতো। বিশেষ করে তরুণী আশার। কিন্তু তরুণ সুভাষ কিছুতেই গরমের কাছে হার মানতো না। ছোটবেলা থেকেই প্রতিনিয়ত মেডিটেশন ছিলো ওর সঙ্গী। এইসময় আশাকে সঙ্গে নিয়ে যতক্ষণ পারতো মেডিটেশনে বসতো আর চলে যেতো "মনের বাড়িতে"। মনের বাড়িতে তাদের বাড়িটি হতো তুষারের তৈরি, রোদ্রের তাপকে বানিয়ে নিতো বরফের শীতলতা। চারিপাশে থাকতো বৃষ্টির মুখরতা, মনের বাড়িতে গিয়ে রোদ্রের দুপুরকে বানিয়ে নিতো শীতের দুপুর, এবং সোয়েটার খুলে নদীতে নামতো শীতে কাঁপতে কাঁপতে। মেডিটেশনে মনের বাড়িতে গিয়ে ওরা গ্রীষ্মকালকে বর্ষাকাল, বসন্তের চিরিচিরি হাওয়া মাখানো দিন, এবং মাঝেমধ্যে শীতকালের কনকন শীতার্ত মানুষ বানিয়ে নিতো নিজেদেরকে। আর এই মেডিটেশন করার পর প্রতিবেলা তরুণ সুভাষবাবু তরুণী আশাকে বলতো আমাদের মেয়ে সন্তান হলে না আমরা ওর নাম রাখবো 'শীতষ্ণতা' ঠিকাছে আশা! আশা ওর কথা শুনে প্রত্যেকবারই একখানা মিঠামাখা হাসি দিয়ে বলতো- হুম। প্রথমে প্রায় ছ'মাস ওরা অন্যান্য কোনো বসতির সাথেই আলাপী তথা পরিচিত হয়ে উঠতে পারেনি। কারণ ওদের লক্ষ্য ছিলো নিজেদের পায়ে দাঁড়ানো মানে স্বচ্ছলতা। পরে ওদের একটু উঠে দাঁড়ানোর পরে আস্তে আস্তে ওদের পরিচিতি বাড়লো, সবাই ওদের ভালো জানতে শুরু করলো। তরুণ সুভাষকে সবাই একটু অন্যরকম ভালোবাসত। কোনো দরকারি কাজ বা কোনো আচার- অনুষ্ঠানের মিটিং, কোনো বড় দায়িত্ব নেয়ার ব্যাপারে, কোনো‌‌ কাজের যুক্তিসংহত পরামর্শ যেন তাঁকে ছাড়া হতোই না।

এইভাবে ওদের জীবন অতিবাহিত হতে লাগলো। এরই মাঝে চলে এলো ওদের ভালোবাসার প্রথম সন্তান। আনন্দে ওরা দিশেহারা, ফুটফুটে উজ্জ্বল শ্যামলা বর্ণের একটা ফুল যেন ওদের ঘরে এসে আলোকিত করলো, পরিপূর্ণতা আনলো জীবনের। নাম রাখলো চড়ুই। দুষ্টমিতে একশো'তে একশো ছিলো তাঁদের চড়ুই, কিন্তু ছোটবেলা থেকেই ওর মধ্যে একটা ব্যক্তিতের স্পর্শ লক্ষ্য করা গিয়েছিল। ধীরে ধীরে ওদের আরো দু'টো সন্তান এলো প্রথমে মেয়ে পরে আবারও একটা ছেলে। ওদের নাম রাখলো- পূর্ণতা আর নিপুণ। ওদের পরিবার এবার একদম পরিপূর্ণ। সবগুলোই বেশ মেধাবী ছিলো। লেখাপড়া ছাড়া অন্য কোনোকিছুতে নিপুণের মন নেই। সবথেকে শান্ত স্বভাবের ছেলে, একদম মায়ের স্বভাব পেয়েছে। পূর্ণতা! লেখাপড়ায় ভালো, কথাবার্তায় সে স্পষ্টবাদী,  স্বাধীনচেতা মনোভাবের। কিন্তু একটু বেশি একগুঁয়েমি স্বভাবের। আর চড়ুইয়ের কথা বলতে! সে যেমন দুষ্টুমিতে হাফেজ তেমন লেখাপড়ায় তেমনি বুদ্ধিমত্তায়, সামাজিকতায়। মানুষ কথায় বলে প্রথম তথা বড় সন্তান একটু হ্যাবলা স্বভাবের হয় কারণ তাঁরা সবার থেকে একটু বেশিই আদর পায়। আর উচ্ছন্নে যায়। কিন্তু চড়ুইয়ের ক্ষেত্রে পুরো উল্টো ব্যাপার।

সবথেকে মেধাবী ছিলো চড়ুই। ওকে নিয়ে ওদের অনেক আশা। কিন্তু দিন দিন ওরা বড় হতে লাগলো, খরচ ডাবল থেকে ডাবল হচ্ছিল। তিনটা ছেলেমেয়ের খরচ চালাতে গিয়ে ওদের সংসার টানাপোড়েনের মধ্যে দিয়ে চলতে লাগলো। আর পেরে উঠছিলো না ওরা, কোথা দিয়ে ওদের লেখাপড়ার খরচ চালাবে! চড়ুই মেডিক্যালে, পূর্ণতা মেট্রিকে গ্লোল্ডেন পেয়ে সদ্য ইন্টারে ভর্তি হলো। ভর্তি হতে অনেক খরচ, আবার বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী, প্রাইভেট না পড়লেই নয়। আর ছোটটা নিপুণ সে কেবল দশম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হয়েছে। এত্তো খরচ কোথা দিয়ে চালাবে, এই নিয়ে বাবু সুভাষের দিন রাত্রি ঘুম নেই চোখে। লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যাওয়ার পথে প্রায়। সবে গড়ে ওঠা স্বপ্নগুলো যেন ভূমিকম্প লেগে শেষ হয়ে যাওয়ার পথে। এমতাবস্থায় চিন্তায় দিশেহারা হয়ে বাবু সুভাষ এই অবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়ার কোনো উপায় খুঁজে না পেয়ে অবশেষে ঠিক করলো চড়ুইকে বিয়ে দেবে, এই চিন্তা মাথায় চাপালো। বাবার অবস্থা দেখে চড়ুইও মুখ বুঝে বাবার সিদ্ধান্তে মত দিলো। অনেক প্রস্তাব ভেঙ্গে যাওয়ার পর অবশেষে রায় বংশের একমাত্র মেয়ে একতার সঙ্গে  চড়ুইয়ের বিয়ে ঠিক হলো। দিন ঠিক করে ভালোভাবে বিয়ে কার্য সম্পন্ন হলো। সৃষ্টিকর্তা নিজেই বোধহয় এমন মর্যাদাশালী পরিবারের সঙ্গে বাবু সুভাষের পরিবারকে মিলিয়ে দিয়েছেন। এমন মেয়ে যেন পৃথিবীতে লাখে একটা। তার স্বভাবের পরিচয় দিতে গেলে তা বরফের মতো শান্ত, আচরণ তার বিজ্ঞ বিচারকের মত নৈপুণ্য, কথাবার্তায় যেন সে মায়া আর ভালোবাসার মন ভুলানো অধিকারী, হাঁটাচলায় মায়াবতী লক্ষ্মী, হাত পায়ের গঠন তা ঈশ্বর বোধহয় একটু বেশিই স্বযত্নে বানিয়েছেন। এখন আর তার গুনের বর্ণনায় না গিয়ে এবারে ক্ষ্যান্ত হই। কিন্তু একতার চেহারার গঠন ভালো হলেও অতটা সুন্দরী ছিলো না। বাবু সুভাষ যেন আজ ঈশ্বরের কাছ থেকে সেই মেয়েকে পেয়েছেন, যেখানে প্রতিদিন মেডিটেশনের পরে স্ত্রী আশাকে বলতো আমাদের মেয়ে হলে তাঁর নাম রাখবো 'শীতোষ্ণতা'। সেই শীতোষ্ণতাকে। আনন্দের অশ্রু ঝরিয়ে বরণ ডালা সাজিয়ে দু'জনে মিলে একতার হাতে চুমু খেয়ে বললো- "আয় মা শীতোষ্ণতা, তুই আমাদের সেই স্বপ্নের বাড়ির মেয়ে যার নাম কত বছর আগে ঠিক করে রেখেছিলাম। আজ এতো দিন ‌পরে  ঈশ্বর পাঠালো, কাছে পেলাম তোকে আমরা। 

আনন্দের জোয়ারে ভেসে যাচ্ছিলো সুভাষ আর আশার পরিবার। সবার চোখে বৃষ্টির মতো অশ্রু ঝরেছিলো সেদিন। সবাই আজ প্রতিষ্ঠিত, চড়ুই ডাক্তার হয়ে সে দুঃস্থ অসহায়দের পাশে দাঁড়িয়েছে, পূর্ণতা একজন ভার্সিটির আদর্শবান শিক্ষিকা হয়ে ভালোবাসার মানুষকে বিয়ে করে সুখে সংসার করছে, ভদ্র ছেলে নিপুণ সদ্য ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে বেরিয়েছে। আর সবার আদরের রায় বংশের মেয়ে শীতোষ্ণতা(একতা) আজ ব্যাংকার এবং আশা সুভাষের কাছে থেকে তাদেরকে নাতিশীতোষ্ণতার মহিমায় ভরিয়ে রাখছে। 

বিশ্বেতে শান্তির পরিবার আজ আশা-সুভাষের পরিবার। আর বিরাজমান রবে চিরকাল।

Copyright © All Rights reserved Nandini Tithi.

শিরোনাম - দুরত্ব✍️ ডা: অরুণিমা দাস

 শিরোনাম - দুরত্ব ✍️ ডা: অরুণিমা দাস আধুনিকতা মানেই অন্যরকম একটা ব্যাপার, উন্নতির পথে এগিয়ে যাবার সিড়ি তৈরি করে দেয় আধুনিকতা। আজকাল কেউ আ...