শুক্রবার, ২৫ নভেম্বর, ২০২২

গ্রন্থালোচনা✍️ডা: অরুণিমা দাস

গ্রন্থালোচনা
✍️ডা: অরুণিমা দাস

আজ গ্রন্থালোচনার বিষয় হিসেবে তুলে ধরা যাক অন্যরকম স্বাদের একটি বইকে। ইতিহাস পড়তে বেশ ভালই লাগে আমার আর যখন কোনো উপেক্ষিত চরিত্রকে নিয়ে লেখা হয় সেটা তখন  আকর্ষনের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। সেরকম একজনের আত্মজীবনী আর সাথে লেখকের কল্পনা এই দুইয়ের মিশেলে সৃষ্ট চরিত্র আর তার ওপর লেখা বইয়ের পাঠ প্রতিক্রিয়া দেওয়ার চেষ্টা করলাম।

বইয়ের নাম - লাডলী বেগম
লেখক - নারায়ণ সান্যাল

লাডলী বেগম এই নামটি বিশাল মোগল সাম্রাজ্যের বিবেচনায় খুবই অপরিচিত একটা নাম৷ আসলে তিনি মোগল ইতিহাসের অংশও হতেননা যদি না তিনি স্বয়ং নূরজাহানের কন্যা হতেন৷ নূরজাহানের প্রথম ঘরের কন্যা তিনি,অর্থাৎ যখন কিনা নূরজাহান ছিলেন মেহেরুন্নিসা নামে, ছিলেন শের ই আফগান আলি কুলি ইস্তাজুল এর স্ত্রী। মোগল রক্ত ছিলো না তার শরীরে, তাই মোগল হারেমের অংশ কিংবা মোগল আমলের সবচেয়ে জনপ্রিয় সম্রাজ্ঞীর কন্যা হওয়া সত্ত্বেও তার নাম মোটামুটি অন্ধকারেই থেকে গেছে। স্বার্থান্বেষী মায়ের ক্ষমতার বলি হয়েছিলেন লাডলী। বিয়ে হয়েছিলো মোগল ইতিহাসের সবচেয়ে অথর্ব শাহজাদা - মির্জা শাহরিয়ারের সাথে। তা সত্ত্বেও খুব একটা আলোয় আসতে পারেননি।নারায়ণ সান্যাল বেশ গবেষণা করেই লিখেছেন বইটা। ইতিহাস আশ্রিত উপন্যাস হলেও, যেখানে ইতিহাসের ওপর সংশয় জেগেছে সেখানে নিজের যুক্তি উপস্থাপন করতে ভুলেননি। বেশ সুপাঠ্য একটা বই।

বইয়ের একটা লাইন অসম্ভব ভালো লেগেছে। 'রূপ কী থাকে রূপসীর দেহে? যুগে যুগে তার আধখানা গচ্ছিত থাকে রূপদর্শীর চোখের তারায়।'

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

বৃহস্পতিবার, ২৪ নভেম্বর, ২০২২

শিরোনাম - গানোলজি✍️ ডা: অরুণিমা দাস

 শিরোনাম - গানোলজি
✍️ ডা: অরুণিমা দাস

সেদিন নিজের রুম গোছাতে গোছাতে হাতে পেলাম কিছু সার্টিফিকেট, বেশ অনেকদিন আগেকার। খুলে দেখতে দেখতে পুরনো দিনে ফিরে গেলাম, বেশ কিছু বছর আগের ঘটনায়। তখন সেকেন্ড ইয়ারে উঠেছি সবে, একদিন ফোন এলো বায়োকেমিস্ট্রি ম্যাডামের। বললেন শোন না কলেজে নতুন ব্যাচ আসছে এমবিবিএস এর ফাস্ট ইয়ারে। ওদের জন্য একটা নবীন বরণ উৎসব আয়োজন করবো ভাবছি। তুই একটু গান চয়েস করে রাখ আর গেয়ে দিস একটু অনুষ্ঠানে। মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ার মতন অবস্থা আমার। কোনরকমে সামলে নিয়ে বললাম কবে অনুষ্ঠান ম্যাম? উনি বললেন আগামী বুধবার। মোবাইলে দেখলাম সেদিন শুক্রবার, মানে হাতে চারদিন মাত্র সময়। বললাম এত কম দিন ম্যাম! ম্যাম বললেন এটা অনেক সময়, তুই রেডী কর গান। কোরাস হলে ভালো হয়। আমি আর কি করি! বললাম ওকে ম্যাম। হোস্টেল ফিরে বন্ধুদের বললাম সব ব্যাপার। কোনরকমে আর তিনজন জোগাড় করা গেলো। তারপর গান চয়েস করলাম "আমরা মেডিক্যাল কলেজে পড়ি" এই গানটা। ঠিক হলো ভোরবেলায় পাঁচটা থেকে রেওয়াজ হবে, হোস্টেলের ছাদে। সেই কথা মত রাতে একবার সঙ্গত করে পরের দিন ভোরে ছাদে গেলাম রেওয়াজ করার জন্য। সকালের ঠান্ডা হাওয়ায়, ঘুমের আবেশে গান শুরু করলাম, সাথে মোবাইলে ক্যারাওকে চলছে। হঠাৎ একটা শব্দ এলো কিচ কিচ! পাত্তা না দিয়ে সবাই চোখ বন্ধ করে গাইছি। হঠাৎ এক বন্ধু চিৎকার করে উঠে বললো রিমো তোর পেছনে দেখ ওটা কে! ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি একটা হনুমান বসে আছে দাঁত বের করে। গানের দফারফা শেষ তখন, ঊর্ধ্বশ্বাসে সিড়ি বেয়ে নিচে নামতে লাগলাম সবাই। আর সাথে হনুমান টাও নামছিল। দিগবিদিক শূন্য হয়ে ছুটতে ছুটতে দুজন গেলাম বাথরুমে লুকোতে। আর দুজন অন্য এখন বন্ধুর রুমে ঢুকলাম। বন্ধুটি সব শুনে নীচে সিকিউরিটি কে ফোন করলো। সিকিউরিটি এসে হনুমানটাকে কমন রুম থেকে বের করে তাড়িয়ে দিলো। তারপর একে একে সবাই জড়ো হলাম যে যেখানে লুকিয়ে ছিলাম সেখান থেকে বেরিয়ে এলাম। ম্যাম কে সব বলার পর কি হাসি ওনার! পরে অবশ্য অডিটোরিয়ামে আমাদের প্রাকটিস করার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। বাকি তিনদিন রিহার্সাল করে মোটামোটি গান গেয়ে উতরে দিয়েছিলাম সবাই। সেই ঘটনা আজও মনে পড়লে বন্ধু মহলে হাসির ফোয়ারা ছোটে। গানটার কয়েকটা লাইন দিলাম। মনে রাখার মত গান সত্যি। 

আমরা মেডিকেল কলেজে পড়ি
এনাটমি,প্যাথলজি,সার্জারি, মেডিসিন 
আরও কত নাম ঝুরি ঝুরি।।
কার্ডিওলজি, হেমাটোলজি আরও কত লজি, কিছু তার বুঝি আর কিছু নাহি বুঝি ... 
আমরা মেডিকেল কলেজে পড়ি।। 

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

বুধবার, ২৩ নভেম্বর, ২০২২

মনের খবর ✍️ডা: অরুণিমা দাস

  মনের খবর
 ✍️ডা: অরুণিমা দাস

কালো মেঘ জমেছে মনের কোণে 
তাকে আগলে যে রাখি সঙ্গোপনে।

মনের খবর রাখার সময় কোথায়?
ব্যস্ত সবাই,নিজের কাজে ধায়।

যখন কেউ পারেনা করতে নালিশ
অশ্রুভেজা বালিশ রাখে মনের হদিশ।

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

মঙ্গলবার, ২২ নভেম্বর, ২০২২

শিরোনাম - প্রয়াস✍️ডা: অরুণিমা দাস

  শিরোনাম - প্রয়াস
✍️ডা: অরুণিমা দাস

এলোমেলো ভাবনা সকল খাচ্ছে মাথায় ঘুরপাক
চলছে কলম,খাতা সব আজ লেখায় পূর্ণ হোক।

সেরিব্রাম থেকে সেরেবেলাম,হচ্ছে বিকাশ উদ্ভাবনী শক্তির 
ছন্দ মেলানোর চেষ্টা,অক্ষর সব অপেক্ষা করছে মুক্তির।

ব্যর্থ না হোক এই লেখা খানি,চিন্তার সাগরে দিয়েছি ঝাঁপ
উঠছে ভরে সাদা পাতা,মস্তিষ্কের ভাবনা সকল যাচ্ছে রেখে ছাপ।

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

বৃহস্পতিবার, ১৭ নভেম্বর, ২০২২

মনের অন্দরে✍️ ডা: অরুণিমা দাস

 মনের অন্দরে
✍️ ডা: অরুণিমা দাস

নরম কাদা যখন পুড়ে গিয়ে ইট হয়ে যায়, সেটা কিন্তু অপরিবর্তনীয় ঘটনা। কারণ কোনো ভাবেই ইট  কাদা তে রুপান্তর হয়না। কাদা যেমন তাপে চাপে ইটে পরিণত হয় তেমন মানুষের মনও ক্রমাগত কষ্ট আঘাত পেতে পেতে একসময় দৃঢ়তা আর কাঠিন্যে ভরপুর হয়ে ওঠে। কোনোভাবেই তখন টলানো যায় না সেই মানসিক কাঠিন্যকে। কোনো আবেগ, অনুভূতি আর মনকে নাড়া দেয় না সেই সময়। স্বার্থপর দুনিয়াতে কেউ কারো নয় তাই কারোর মনের ওপর একমাত্র নিজের ছাড়া অন্য কোনো কিছুই প্রভাব ফেলে না। দীর্ঘদিন ধরে পাওয়া অপমান যন্ত্রণা সবকিছু মানুষের মনকে  শক্ত ইটের মত একটা খোলস দান করে যা পরে কোনোভাবেই ভেঙে পুরনো মন ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়। আর এভাবে ক্রমাগত নিষ্পেষিত হতে হতে যে মানসিক পরিপক্কতা তৈরি হয় সেই মনের মানুষকে টলানো অসাধ্য হয়ে পড়ে। কারণ সে বুঝে যায় এই পরিবর্তনশীল দুনিয়াতে শুধু মন টাই অপরিবর্তিত রাখলে তবেই দুনিয়া কাঁপানো যাবে। কোনো রকম আবেগ, রিপুর বশবর্তী হয়ে পড়লে মন আগের মত কষ্ট পাবে। তাই কোনো কিছু যাতে মনকে স্পর্শ করতে না পারে সেইজন্যই শক্ত খোলক থেকে মনকে বের করতে চায় না মানুষ। তখন তাই তার মধ্যে সমস্ত ঝড়ঝাপটা সামলে বিজয়ী হয়ে ওঠার সমস্ত সম্ভাবনা গড়ে ওঠে। 

"পরিবর্তনশীল দুনিয়াতে মনটাই হোক শুধু অবিচল
  আবেগ, অনুভূতি যেনো না করে তাকে শিথিল।"

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

সোমবার, ৭ নভেম্বর, ২০২২

শিরোনাম - আত্মহননের নেপথ্যে✍️ ডা: অরুণিমা দাস

 শিরোনাম - আত্মহননের নেপথ্যে
✍️ ডা: অরুণিমা দাস

আত্মহনন কি তা হয়তো সহজ বাংলায় প্রায় সবাই বলতে পারবো। আত্মহনন হল স্বেচ্ছায় নিজের প্রাণ বিসর্জন দেওয়া। 
অনেক আগে থেকেই আত্মহননকে নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখে সকলে। কিন্তু নেতিবাচক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার পরও আত্মহনন এখনো মানুষের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। এমন কি আমাদের দেশেও আশঙ্কা জনক হারে আত্মহত্যার হার বাড়ছে।
আজকের শব্দ দিনের বিষয় যখন আত্মহনন তখন বিষয়টিকে অন্য নিরিখে মানে মেডিক্যাল সায়েন্সের দৃষ্টিকোণ থেকে তুলে ধরার একটা প্রচেষ্টা করছি মাত্র।
এক গবেষণার রিপোর্ট অনুসারে, আত্মহনন করা মানুষের মধ্যে ৯০ শতাংশ মানুষ মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগতে থাকে। এদিক থেকে বলতে গেলে আত্মহত্যার প্রধান কারণ হিসাবে এটাকে দেখা যায়। আর এ ব্যপারে আমাদের সচেতনতা প্রায় নেই বলতে গেলেই চলে।
শরীর খারাপ হলে যেমন নানা রকম লক্ষণ প্রকাশ পায় তেমনি মানসিক স্বাস্থ্য ভেঙে পড়লে বা মনের অসুখ হলে তারও নানা লক্ষণ দেখা যায় কিন্তু অজ্ঞানতার অভাবে আমরা সেদিকে দৃষ্টিপাত করি না। এটাই হচ্ছে সমস্যা। যদি সবাই নিজের নিজের মানসিক কাঠিন্য বজায় রেখে সব রকম পরিস্থিতির মোকাবিলা করে তাহলে ডিপ্রেশনের মত পরিস্থিতি এড়ানো যায়। কিন্তু মুখে বলা যতটা সহজ ততটা সহজ নয় কাজে করে দেখানো। এটাও মানতে হবে। 
 
মেজর ডিপ্রেসিভ ডিসঅর্ডারের রুগীদের মাঝে সুইসাইডের প্রবণতা অনেকটা বেশী। এমনকি বাইপোলার ডিসঅর্ডার থাকলে অনেক ক্ষেত্রে সুইসাইডের প্রবণতা বাড়ে প্রায় ২০ শতাংশ। এছাড়া স্ক্রিজোফ্রেনিয়া,পারসোনালিটি ডিসঅর্ডার, অবসেসিভ কম্পালসিভ ডিসঅর্ডার(ওসিডি), পোষ্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার (পিটিএসডি) সহ বেশ কিছু মানুষিক রোগে আত্মহত্যার প্রবনতা বাড়ে।
এছাড়া যাদের ফ্যামিলিতে আগে কেউ আত্মহত্যা করেছে,ড্রাগসহ বিভিন্ন নেশা জাতীয় দ্রব্যে আসক্ত, যদি কেও কোন ধরনের ড্রাগ অ্যাবইউজের শিকার হয়ে থাকে তাদের আত্মহত্যার ঝুঁকি বেশী থাকে। আত্মহননের প্রবণতা ঠেকাতে সামাজিক সচেতনতার পাশাপাশি বিপর্যস্ত ব্যক্তিকে মানসিক সহায়তা ও চিকিৎসা জরুরী। এজন্য প্রয়োজনে মানুষিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নেওয়া জরুরী।আমাদের সবারই চোখ-কান খোলা রাখা জরুরী। হয়তো খুব নিকটজনের মনের ভেতর ভাঙনের ঢেউ ঢুকতে শুরু হয়েছে খালি একটু সচেতনতার অভাবে তা চোখে পড়ছেনা। 

এবার দেখা যাক কিভাবে নিউরোট্রান্সমিটার আর হরমোনের তারতম্য মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলে! কিছু কিছু হরমোন আছে যা মানসিক স্বাস্থ্য কে নিয়ন্ত্রণ করে। এগুলো হলো সেরেটোনিন, ডোপামিন আর নর এপিনেফ্রিন। এসব নিউরো ট্রান্সমিটার খুব সুক্ষ্য ভাবে কাজ করে মস্তিষ্কের ওপরে কিন্তু প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি। তাই এগুলো সম্পর্কে একটু জেনে নেওয়া দরকার। ডোপামিন কে পজিটিভ আর সেরোটোনিনকে নেগেটিভ হরমোন বলা হয়ে থাকে। সেই হিসেবে যখন অবসাদ গ্রাস করে,কোনো কাজ করতে ইচ্ছে করে না তখন বলা হয় ডোপামিনের মাত্রা কম হয়েছে  আর সেরোটোনিনের মাত্রা বেড়ে গিয়েছে। শুধু অবসাদই নয় স্লিপ সাইকেল ডিস্টার্ব হয় ইমোশনাল স্ট্যাবিলিটিও বিঘ্নিত হয়। নরএপিনেফ্রিন এর প্রভাব আবার মনের থেকে শরীরে বেশি পড়ে। শারীরিক দুর্বলতা, শরীরে জ্বালা ভাব এসব দেখা যায়। 
এই অবসাদ গ্রস্ততা বা কাজে অনীহা এগুলো যদি সপ্তাহ দুয়েকের বেশি স্থায়ী হয় তাহলে ধরে নেওয়া হয় সেই ব্যক্তি মানসিক অসুখে আক্রান্ত।
টিনএজার দের মধ্যে আবেগ প্রবণতা বেশি দেখা যায়। ভূত ভবিষ্যত না ভেবে সিদ্ধান্ত নেয় তারা। ডোপামিন এই জন্যও দায়ী। আবার বয়:সন্ধি অতিক্রম করে নিলে তখন চিন্তা শক্তির বিকাশ ঘটে কিন্তু রিস্ক নেওয়ার প্রবণতা কমে। অনেকে আবার নিকোটিন, কেউ আবার নার্ভ স্টিমুলেটিং ড্রাগ ব্যবহার করে মস্তিষ্ক কে চাঙ্গা রাখতে। ইউফোরিক স্টেটে আসতে অনেকে এসব ব্যবহার করতে করতে এসবের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ে। আর ড্রাগ ডিপেন্ডেন্সি আত্মহননের অন্যতম একটি কারণ।
বয়স কালে আবার একাকীত্ব গ্রাস করে অনেকক্ষেত্রে। তখন নিঃসঙ্গ জীবন থেকে মুক্তি পেতে অনেকেই আত্মহননের পথ বেছে নেন। কিন্তু এটাও সঠিক পথ নয়। 

এগুলোকে চেপে রাখার কোনো দরকার দেখি না। শরীর খারাপ হলে যেমন ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া হয় সেরকম মনের হাল খারাপ হলেও অবশ্যই মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেওয়া উচিত। 
 'এক হাত বাড়িয়ে সাহায্য চাও, দশ পা এগিয়ে আসবো সাহায্য করার জন্য।'
সাইকিয়াট্রিস্টরা বলছেন কোনো রকম উদ্বেগ, অ্যাংজাইটি,অবসাদ দেখা গেলে আর সেটা ক্ষণস্থায়ী না হলে আসুন আমাদের কাছে। আমরা খেয়াল রাখবো আপনার। 

রোগ যখন আছে,দাওয়াইও আছে তার। প্রাথমিক ভাবে লাইফ স্টাইল চেঞ্জ, খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন এগুলো অনেক ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। ডোপামিন লেভেল বাড়ানোর জন্য কাজুবাদাম, আমন্ড খাওয়া যেতে পারে। এছাড়া প্রাণিজ প্রোটিন, সবুজ শাকসবজি,ফল,ডার্ক চকোলেট, কফি এগুলোতে টাইরোসিন নামক অ্যামিনো অ্যাসিড থাকে যা ডোপামিন প্রোডাকশনে সাহায্য করে। 
এটা গেলো প্রাথমিক চিকিৎসা। এতে যদি কাজ না হয় তাহলে এবার মেডিসিনের সাহায্য নেওয়ার দরকার পড়ে। মেডিসিন দেওয়ার আগে কিছু পরীক্ষার দরকার হয়ে থাকে। 
এখন অনেক উন্নত মানের ইমেজিং টেকনিক এসে গেছে। ব্রেন ম্যাপিং করে ব্রেনের মধ্যে কি চলছে জানা যায়। নিউরো ইমেজিং টেকনিক এর সাহায্যে মস্তিষ্কের বিভিন্ন লোবের অবস্থা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হওয়া যায়। আর রক্তে ডোপামিন সেরেটোনিন নর এপিনেফ্রাইন এর লেভেল ও চেক করা যায়। 
রোগের লক্ষণ দেখে প্রথম সারির মেডিসিন হিসেবে
সিলেকটিভ সেরোটোনিন রিসেপটর ইনহিবিটর চালু করা যেতে পারে যা অ্যান্টি ডিপ্রেসেন্ট হিসেবে কাজ করে। এছাড়া অ্যান্টি অ্যাংজাইটি ড্রাগ ও লাইট সিডেটিভ ড্রাগ ব্যবহার করা যেতে পারে। 
ওষুধ খেয়ে কোনো সাইড এফেক্ট হলেও ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত। 
মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন (WHO) ১০ ই সেপ্টেম্বর দিনটিকে বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা দিবস হিসেবে অভিহিত করেছে। 
সবাই যখন সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য তৈরি আছেন তখন মনখারাপ হলে তাদের সাহায্য নিন। মনের জটিলতা বাড়তে দেবেন না। আত্মহনন করে ঈশ্বর প্রদত্ত জীবনকে স্বেচ্ছায় নষ্ট করবেন  না এটুকুই অনুরোধ সর্বসাধারণের কাছে।

   "সুস্থ মনের চাবিকাঠি রয়েছে যে হরমোনে
   প্রকাশ করো মনের কথা,রেখোনা কিছু মনের কোণে।"

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস


 

সোমবার, ৩১ অক্টোবর, ২০২২

শিরোনাম - নীল পূর্বরাগ✍️ ডা: অরুণিমা দাস

শিরোনাম - নীল পূর্বরাগ
✍️ ডা: অরুণিমা দাস


ছেলেকে নিয়ে গ্যাংটক বেড়াতে এসেছে রিনিতা। ছেলেই ওর সব।আজ ছবছর হলো স্বামী প্রতীকের সাথে ডিভোর্স হয়ে গেছে ওর।দিন রাত সংসারে অশান্তি লেগে থাকত রিনিতার চাকরি করা নিয়ে। প্রতীক বলতো," আমার এত ইনকাম,এর পরও তুমি কেনো চাকরি করবে?"না এরপর আর কোনো ঝামেলায় জড়াতে চায়নি রিনিতা।রোজকার অশান্তিতে ছেলেটা ভয়ে কুঁকড়ে থাকতো।ছেলের শৈশবকে নষ্ট হতে দিতে চায়নি রিনি।প্রতীককে মুক্তি দিয়েছিল।এখন তার জীবনের একটাই লক্ষ্য,ছেলে শুভমকে মানুষ করা। 
"মা মা,খুব পেট ব্যথা করছে,বমি বমি লাগছে।",শুভম বললো রিনিতাকে।অতীতের পাতা থেকে চোখ সরিয়ে রিনি চোখ রাখলো ছেলের মুখের দিকে,শুকিয়ে গেছে শুভর চোখ মুখ।গাইড কে জিজ্ঞাসা করলো কাছাকাছি যদি কোনো ওষুধের দোকান পাওয়া যায়।গাইড বললো," না ম্যাডাম,তবে মন্তেসরি আছে,ওখানে আপনি ওকে নিয়ে একটু বসতে পারেন। এই পাহাড়ি রাস্তায় এতটা জার্নি করে এসে ওর শরীরটা খারাপ লাগছে হয়তো।" গাইডের সাথে রিনিতা শুভমকে নিয়ে পৌঁছলো মন্তেসরিতে।রিনিতাকে আসতে দেখে কিছু সন্ন্যাসীরা এগিয়ে এলেন।রিনিতা ছেলের অসুস্থতার কথা বললো।ওনারা ওদের দুজনকে নিয়ে মঠের অধ্যক্ষের ঘরে নিয়ে গিয়ে বসালেন। 
শুভমকে দেখে এক দৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন উনি। অবিকল নিজের ছোটবেলা যে!রিনিতা অধ্যক্ষের দিকে তাকিয়ে চমকে উঠলো!বলে উঠলো,"শুভ তুমি এখানে?" সেই সন্ন্যাসী বললেন,
" আপনার ভুল হচ্ছে ম্যাডাম, আমি এখানকার প্রধান বেদানন্দ মহারাজ।" 
"তুমি এখানে কি করে শুভ?","কে শুভ ম্যাডাম? আমি চিনি না এই নামের কাউকে।"  রিনিতা বললো," আমি সেদিন খুব বড়ো ভুল করেছিলাম তোমায় ছেড়ে চলে এসে।"
" কিসের ভুল ম্যাডাম? তখন যে এই বেদানন্দ ওরফে শুভ বেকার ছিল,আপনি টাকার মাপকাঠি তে বিচার করেছিলেন ভালোবাসাকে,চলে গেছিলেন নিজের বাবা মায়ের পছন্দের ধনী ছেলেকে বিয়ে করে।সেদিন থেকে শুভ নামটা আমি ঘেন্না করি।আর এই মঠে এসে আমি খুব শান্তিতে আছি।" রিনিতা বললো,"জানো শুভ,শুভম তোমারি সন্তান।প্রতীকের সাথে বিয়ের আগেই আমি বুঝতে পেরেছিলাম সন্তান আসার কথা,কিন্তু বাবার ভয়ে কিছু বলতে পারিনি কাউকে।প্রতীক বিয়ের পর থেকে নিজের ব্যাবসা,পার্টি নিয়ে ব্যস্ত থাকতো।ও তাই বুঝতে পারেনি যে শুভম ওর সন্তান নয়। একসময় আমার সব স্বাধীনতা কেড়ে আমায় ঘরে বসিয়ে দিতে চেয়েছিল প্রতীক।তারপর অশান্তি চরমে ওঠে।আমরা এখন আলাদা থাকি ডিভোর্সের পর।" সব শুনে বেদানন্দের খুব ইচ্ছে হলো শুভমকে একবার জড়িয়ে ধরতে।কিন্তু না,সন্ন্যাসীদের পূর্বরাগের কোনো কথা মনে রাখতে নেই।নিজের ফার্স্ট এইড বক্স থেকে বমি কমানোর ওষুধ আর জল এগিয়ে দিলেন শুভমের দিকে।রিনিতাকে বললেন,"এটা খেয়ে ছেলে সুস্থ হলে,ওকে নিয়ে চলে যাবেন এখান থেকে।" বলেই রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন খুব তাড়াতাড়ি,হয়তো চোখের জল লুকোতে চাইছিলেন।রিনিতা অপরাধীর মত মুখ করে বেরিয়ে গেলো ছেলেকে নিয়ে।গাড়িতে উঠে বসলো। গাইড কিছুক্ষন পর এসে বললো," ম্যাডাম এই ওষুধটা আপনার জন্য বেদানন্দজী পাঠিয়েছেন,আর সাথে একটা চিরকুট।" চিরকুটটা খুলে দেখলো লেখা আছে,"গাড়ীর ঝাঁকুনিতে তোমারও তো বমি হয় রিনি,খেয়ে নিও ওষুধটা।"
      রিনিতা দুহাতে মুখ চেপে কাঁদতে লাগলো,শুভম জড়িয়ে ধরলো মাকে।আর গাড়িটা চোখের আড়াল না হওয়া পর্যন্ত এক দৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন বেদানন্দজী।

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

বৃহস্পতিবার, ২৭ অক্টোবর, ২০২২

শিরোনাম - ত্রাতা✍️ ডা: অরুণিমা দাস

শিরোনাম - ত্রাতা
✍️ ডা: অরুণিমা দাস


স্ত্রী সরমা দেবী চলে যাওয়ার পর থেকে রমেশ বাবু একাই থাকেন। একমাত্র ছেলে অনীক কর্মসূত্রে বিদেশে থাকে। বাবাকে অনেক অনুরোধ করেও নিজের কাছে নিয়ে যেতে পারেনি অনীক। সরমা দেবীর স্মৃতি আকড়েই জীবনের বাকি দিন গুলো নিজের হাতে তৈরি বাড়ীতেই কাটাতে চান রমেশ বাবু। সামনে একফালি বাগানও আছে। নিজেদের মনের মত করে বাড়িখানি বানিয়েছিলেন সরমা দেবী আর রমেশবাবু। কিন্তু কদিন ধরেই পাড়ার এক মস্তান ছেলে এসে রমেশ বাবুকে হুমকি দিচ্ছে বাড়িটা প্রোমোটারকে দিয়ে দেওয়ার জন্য। ভালো পজিশন আছে, অনেক দাম পাওয়া যাবে। রমেশ বাবু বলেছেন প্রাণ থাকতে এই বাড়ী কাউকে দেবেন না। মস্তান বলে গেছে ভালো করে ভাবুন, সময় দিলাম তিন দিন। রমেশ বাবু পাত্তা দেননি অত বেশী। সেদিন রাতেই খেয়েদেয়ে ছেলের সাথে ফোনে কথা বলে ঘুমোতে গেলেন রমেশ বাবু। বেশ গুমোট ছিলো, জানলা গুলো খুলে দিলেন উনি। দমকা হাওয়া দিতে শুরু করলো হঠাৎ করেই, গুমোট ভাবটা কিছুটা হলেও কমলো। খানিক পরে ঝমঝম বৃষ্টি নামলো। স্বস্তির নিঃশ্বাস নিলেন রমেশ বাবু। গরমে টেকা দায় হয়ে যাচ্ছিলো। পুরনো আমলের ঘড়িতে তখন ঢং ঢং করে বারোটা বাজার শব্দ হলো। বৃষ্টির তেজ ক্রমশ বাড়তে লাগলো, সহসা লোডশেডিং হয়ে গেলো। হঠাৎ করে বিদ্যুতের ঝলকানি আর কানে চাপা দেওয়ার মতো কড় কড়াত করে আওয়াজ। রমেশবাবু বিছানায় উঠে বসে রইলেন। ঘুম আসছেনা কিছুতেই, আলো টাও নেই। টেবিলে এসে বসলেন, মোমবাতিটা জ্বালিয়ে একটা ম্যাগাজিন খুললেন। পড়তে পড়তে কখন টেবিলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন নিজেও জানেননা। কিছুক্ষন পর দরজায় কড়া নাড়ার আওয়াজে ঘুমটা ভেঙ্গে গেলো ওনার। ভাবলেন এতো রাতে কে এলো রে বাবা! হাওয়ার ধাক্কা ভেবে আবার বইতে মনোনিবেশ করলেন। নাহ এবারে আর কড়া নাড়ার শব্দ নয়, কেউ যেনো জোর ধাক্কা মারছে দরজায় আর চেঁচিয়ে বলছে দরজা খোল বুড়ো! তোর বাড়ি কি করে আগলাস আমিও দেখবো! বেরিয়ে আয় বাইরে। রমেশ বাবু গলা শুনে বুঝলেন সেই মস্তান এসেছে যে হুমকি দিয়ে গেছিলো। বুকে সাহস নিয়ে রমেশ বাবু দরজা খুলে দিলেন। মস্তান তার সঙ্গীদের নিয়ে ঘরে ঢুকলো। রমেশ বাবু কিছু বলার আগেই ওনার গলায় ছুরি ধরে মস্তান একটা কাগজ দেখিয়ে  বললো এই কাগজে সই করে দে চটপট, বাড়িটা আমাদের চাই। একি অন্যায্য দাবী তোমাদের? এসব ঠিক করছোনা তোমরা! ঠিক ভুল পরে শেখাবি আগে সই কর। না প্রাণ থাকতে এই বাড়ী আমি কাউকে দেবো না! তাই নাকি? নে তাহলে মর তুই! ছুরিটা চালাতে যাবে রমেশ বাবুর গলায় এমন সময় ছুরিটা হাত থেকে পড়ে গেলো মস্তানের। মস্তান নীচু হয়ে ছুরিটা তুলতে যাবে, কেউ যেনো ধারালো কিছু রাখলো ওর পিঠের ওপরে। মস্তান ঘাড় ঘুরিয়ে পরে সোজা হয়ে উঠতে যায় কিন্তু পারে না! ঝোড়ো বাতাস বয়ে যায় বাড়ীর মধ্যে দিয়ে, রমেশ বাবু তখন মস্তানের হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে একটু ধাতস্থ হতেই দেখে দশভূজা দেবীর পায়ের তলায় শুয়ে আছে মস্তান, পিঠে ত্রিশূল খোঁচা মারছে ওর। স্ত্রী সরমা যখন পুজো আচ্চা করতেন অতটাও গুরুত্ব দিতেননা রমেশ বাবু। নাস্তিক গোছের মানুষই ছিলেন তিনি। আজ এই দৃশ্য দেখে ভাবেন একি স্বপ্ন না সত্যি! স্ত্রীর ভক্তির জোরেই আজ কি এই অভাবনীয় ঘটনার সাক্ষী হচ্ছেন তিনি? দুটো হাত নিজের অজান্তেই কপালে চলে আসে, প্রণাম জানান তাঁর রক্ষা কারীনিকে। ওদিকে মস্তান তখন ভয়ে চুপ,বাইরে কুকুরের চিৎকার শোনা যাচ্ছে, মনে হচ্ছে তারাও পারলে মস্তানকে ছিড়ে খেয়ে ফেলবে। দশভূজার পায়ের তলা থেকে ফুটবলের মতো গড়িয়ে এসে মস্তান রমেশ বাবুর পায়ের কাছে এসে পড়ে। ক্ষমা চায় ওনার পায়ে ধরে! মুখে ভয়ের ছাপ স্পষ্ট! রমেশ বাবু বলেন আর কোনোদিন এপথে এসো না! সৎ উপায়ে চলার চেষ্টা করো। মস্তান চুপ থেকে খানিক পরে দৌড় লাগায় সেখান থেকে। অদ্ভুত ভাবে তখন দশভূজার মূর্তি মিলিয়ে যায় সেখান থেকে। রমেশ বাবু তখনো ঘোরের মধ্যে ছিলেন। দিনের আলো ফুটলে,পাখির ডাকে ওনার সম্বিত ফেরে। নাকে আসে শিউলির সুবাস,মাটির দিকে তাকিয়ে দেখেন কে যেনএকগুচ্ছ শিউলি রেখে গেছে ঘরের মধ্যে। দূর থেকে কানে ভেসে আসে "আশ্বিনের শারদ প্রাতে...।" বিড়বিড় করে রমেশ বাবু বললেন দেবীপক্ষ শুরু তবে। 

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

ধৈর্য্যের মাস্টার✍️ ডা: অরুণিমা দাস

ধৈর্য্যের মাস্টার
✍️ ডা: অরুণিমা দাস

জীবনের পথে চলতে গিয়ে অনেক ঘটনার সম্মুখীন হয়ে থাকি আমরা। কোনো কোনো সময় জীবন আমাদের মাস্টার হয় তো কোনো সময় আমরা জীবনের মাস্টার হই। ধৈর্য্য আর সময় এই দুটোর থেকে বড়ো মাস্টার বোধহয় আর কেউ হয়না। প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে চলতে চলতে যখন হতাশার অন্ধকারে ডুবে যাবো মনে হয় তখনই শুরু হয় ধৈর্য্যের পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় পাস করতে পারলে জীবনে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা হয়। আর এরকম অনেকবার পরীক্ষা দিতে দিতে কখন যে ধৈর্য্যের মাস্টার হয়ে যাই বুঝতে পারিনা। উদাহরণ স্বরূপ প্রথম প্রথম দিন গুনতাম কবে এসব ডিউটি প্রেসার শেষ হবে,পড়াশোনা শেষ হবে! এক সময় মনে হতো আর পারবোনা চাপ নিতে। কিন্তু ওই যে ধৈর্য্য সব সময় মনে করিয়ে দিত আমি আছি, পারতে তোমাকে হবেই। থেমে গেলে চলবে না! ব্যাস ওভাবেই অনেক পরীক্ষা দিতে দিতে মাস্টার হবার সুযোগ পেলাম। এখন জুনিয়র দের পরীক্ষা নেবার পালা, ওদেরকে ধৈর্য্যবান করে তোলার চ্যালেঞ্জ এবার শুরু। এখন আর ডিউটিকে চাপ মনে হয় না, বরং বাড়ীতে বসে থাকতে বোর লাগে। ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি ধৈর্য্যের হাত ধরে যাতে সুপার স্পেশালিটি টা উতরে যাই, যদিও সে এক লম্বা যুদ্ধের প্রস্তুতি তবুও দেখা যাক কী হয়!

যেদিন মানুষ অভ্যাসের দাস হয়ে ওঠে সেদিন থেকে তার ধৈর্য্যচ্যুতি হবার সম্ভাবনা অনেক কমে যায়। মাথা উচু করে চলতে শেখে, কোনো কিছুই তাকে আর দমিয়ে রাখতে পারেনা। জীবনের চড়াই উতরাই পার হয়ে যায় নিমেষেই। অন্ধকারে চলতে চলতে অভ্যাস হয়ে যায় আর একদিন আলোর দেখা ঠিক ই মিলে। ধৈর্য্য আর সময় এই দুটো হাতিয়ারই জিতিয়ে দেয় তাকে।

"জীবনে পরীক্ষা দিতে দিতে ছাত্র থেকে যখন হবে ধৈর্য্যের মাস্টার
বুঝবে কোনো পরিস্থিতিই টলাতে পারবেনা তোমায়, পাবে না ভয় আর!"

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

শিরোনাম - কথোপকথন✍️ ডা: অরুণিমা দাস

শিরোনাম - কথোপকথন
✍️ ডা: অরুণিমা দাস

ধরাধামে আসার পূর্বে কথোপকথনে ব্যস্ত কর্তা গিন্নী।
কইগো রেডী হলে নাকি? হ্যা আরেকটু মেকআপ বাকি করে নিই, দাড়াও একটু। স্বামী শিবকে উত্তর দিলেন কালী মাতা।
- আরে এতো মেক আপ করে হবেটা কি শুনি?
- আমার কালো রং যে, একটু সাজগোজ না করলে চলে বলো?
- দূর ওসব বাহ্যিক গো গিন্নী। মন তো তোমার কালো নয়,ভক্তদের জন্য সর্বদা আকুল। এতেই হবে গো!
-বরং এই দুনিয়ার যত কালিমা আছে, সেসব দুর করে নিজের কালো রং আরো উজ্জ্বল করো। আমি কালো বউকে নিয়েই খুশি। 
- আহা! ঢং দেখে আর পারি না। যাও রেস্ট করে নাও একটু।
- রেস্ট করেছি, কয়েকটা ডনবৈঠক ও দিয়েছি। দুদিন এখন আমার খাটাখাটনি যাবে, ওজন তো বেশ ভালোই তোমার। 
- হ্যা জানি খুব কষ্ট হয় তোমার! কি আর করবো বলো! আমার খুব লজ্জা লাগে। 
- আহা লজ্জা কিসের গিন্নী! তুমি তো সব গৃহিণীর অনুপ্রেরণা। তোমায় দেখেই তো তারা ঘরের কর্তা দের ওপর জোরজুলুম করে। 
- তা করে। আর সে তো ভালো! স্বামীদের একটু দমিয়ে রাখা দরকার। এখন আমার কুচিটা একটু ধরে দাও দেখি। দেরী হয়ে যাবে যেতে নইলে। 
- সে ধরে দিচ্ছি। তার আগে নাও এই গয়নার সেটটা এনেছি তোমার জন্য,পরে নাও। 
- আরে এসব আবার কেনো? জানো তো আমার এসবের প্রতি মায়া নেই। 
- জানি গো! কিন্তু আমারও ইচ্ছে করে তোমায় কিছু দিতে। আবার ধনতেরাস চলছে এখন। তুমি পরে দেখো,ভালো লাগবে। 
- সে তুমি ফুলের মালা দিলেও আমার ভালো লাগবে গো। তোমার দেওয়া সামান্য জিনিসও আমার কাছে অনেক মূল্যবান। 
- নাও কুচি ধরে দিলাম, এবার চলো। 
হ্যা চলো,তোমার ডমরুটা নাও মনে করে। ভক্তরা সারাদিন না খেয়ে অপেক্ষা করছে,চলো এবার যাওয়া যাক। 
-হ্যা চলো গিন্নী। তোমার আশীষ যেনো সবাই পায়। দুনিয়ার সব কালো মুছে যাক তোমার আগমনে। আলোয় ভরে উঠুক চারিদিক। 

আলোকমালায় সেজে উঠেছে প্যান্ডেল সব। ঢাক বাজছে। শুরু হবে এক রাতের কালীপুজো। সব দুঃখ ভুলে সকলে মেতে উঠুক শ্যামা মায়ের আরাধনায়। 

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

ভাইফোঁটা - ভাইয়ের সুরক্ষা কবচ✍️ ডা:অরুণিমা দাস

ভাইফোঁটা - ভাইয়ের সুরক্ষা কবচ
✍️ ডা:অরুণিমা দাস

অদৃশ্য সুতোর বাঁধনে বাঁধা যে মায়ার বন্ধন
ভালোবাসার সেই সম্পর্কের নাম যে ভাই বোন।

যমের দুয়ারে পড়ুক কাটা,ভাই থাক সুখে শান্তিতে
কপালে দিয়ে চন্দনের ফোঁটা,বোন যে বলে  মনেতে।

কোনো বিপদ যেনো আমার ভাইকে না করে স্পর্শ
ভাই আমার থাক আদরে,মনে থাকুক সদা হর্ষ। 

বছর বছর আসুক ফিরে এই মধুময় শুভক্ষণ
থাকুক ভালো এই পৃথিবীর সকল ভাইবোন।

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

বৃহস্পতিবার, ২০ অক্টোবর, ২০২২

ঝোড়োবার্তার সংবাদ পরিবেশন✍️ ডা: অরুণিমা দাস

ঝোড়োবার্তার সংবাদ পরিবেশন
✍️ ডা: অরুণিমা দাস


ঝোড়োবার্তা চ্যানেলের পক্ষ থেকে আমি মৌসম এসে গেছি আজকের বিশেষ বিশেষ সংবাদ গুলো নিয়ে। পেশ করছি আজকের বিশেষ আটটি গুরুত্বপূর্ণ খবর।

১. শিশুশিক্ষা বিভাগের পরিদর্শক জানিয়েছেন বাচ্চাদের রোজ স্কুলে এক ঘন্টা করে হাসির ক্লাস করাতে হবে। যে টিচার রামগরুড়ের মত না হেসে থাকবে তাদের পরেরদিন বাচ্চাদের হোমওয়ার্ক করে দিতে হবে।

২. যারা চুল পড়ার সমস্যায় ভুগছেন তাদের জন্য স্থায়ী সমাধান দিলেন বামদেব। প্রতিদিন দুবেলা একঘন্টা করে শীর্ষাসন করতে হবে। ভূমির সঙ্গে চুলের সংস্পর্শে মস্তিষ্কের উর্বরতা বাড়বে আর চুল গুলো স্ক্যাল্পে আটকে থাকবে। 

৩. পেট্রোল মন্ত্রী জানিয়েছেন তেলের দাম যে হারে বেড়ে চলেছে তাতে কদিন পর সকলে কোমরে দড়ি বেধে গাড়ীকে টেনে নিয়ে যাওয়া আসা করবে। এতে নিয়মিত হাঁটার অভ্যেস হবে, শরীর চাঙ্গা থাকবে আর গাড়ীগুলোর ইঞ্জিনও বিশ্রাম পাবে।

৪. বিয়ে নিয়ে নতুন আইন পাস হলো। বিয়ের পর স্বামী গিয়ে থাকবে শ্বশুর বাড়ী। মেয়েরা নিজের বাড়িতেই থাকবে আর স্বামীর ওপর কোনো মানসিক চাপ সৃষ্টি করলে স্বামীদের সন্ন্যাস গ্রহণের দীক্ষা দেওয়া হবে। আর স্ত্রীদের মৌনব্রতর মন্ত্রে দীক্ষিত করা হবে।

৫. কারেন্ট বিভ্রাটে বিয়ের আসরে বৌয়ের বদলে শ্বাশুড়ীর গলায় মালা পড়ালো জামাই। জামাইকে খুশি করতে শশুর সুইজারল্যান্ডের টিকিট কেটে দিলো। শ্বাশুড়ির সাথে হানিমুন ভেবে জামাই অজ্ঞান বিয়ের আসরে। জামাইয়ের বাবা বিদ্যুৎ দপ্তরের বিরুদ্ধে "শক খেলাম" ধারায় মামলা দায়ের করেছে। 

৬. রান্না ঘরে গ্যাসের কোনে রাখা ইদুর কিলার খেয়ে বিল্লুর দাঁত ভেঙে যাওয়ায় বিড়াল অ্যাসোসিয়েশন থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে যে 
বাড়ীর মালিককে নতুন বাধানো দাঁতের পাটি বানিয়ে দিতে হবে বিল্লুকে। 

৭.  নট আউট আর নীল হিটের ডিফারেন্ট স্মেল ভালোবাসা জাগালো মিস মশা আর মিস্টার মাছির মধ্যে। বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে চলেছে তারা। বিবাহ বাসর - খাটের তলা। সবাইকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন তারা। 
বি. দ্র : দয়া করিয়া কেউ ওডোমস মেখে বিয়েতে আসবেন না।

৮. আজকাল গোলপোস্টে পোস্টের বদলে একটা করে চিয়ার সাজিয়ে রাখা হচ্ছে।কর্তৃপক্ষের কাছে কারণ জানতে চাওয়ায় সে বলে সারাদেশে যে ভাবে 'খেলা হবে' বাণী ঘুরছে তাতে স্ট্রাইকাররা আজকাল আর গোলপোষ্ট দেখতে পায়না। তাই গোলপোস্টের বদলে চিয়ার দেখলে তবে গোল করতে পারে।

বিশেষ আটটি খবর পেশ করলাম আপনাদের সামনে। নবম আশ্চর্যের জন্য চোখ রাখুন ঝোড়োবার্তা চ্যানেলে। নমস্কার। 

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস।

শিরোনাম - ধনতেরাস✍️ ডা: অরুণিমা দাস

শিরোনাম - ধনতেরাস
✍️ ডা: অরুণিমা দাস

রেডী হলে তুমি? ঘনাদাকে বললো পপি বৌদি।
- না হচ্ছি হচ্ছি। 
- এখনো রেডী হওনি? গোল্ড কেনার শুভ সময় যে পেরিয়ে যাবে, তোমায় নিয়ে আর পারি না!
আড় চোখে বৌদিকে দেখে ঘনা দা রেডী হতে শুরু করলো! ওদিকে বৌদি ঘন ঘন ঘড়ি দেখছে। 
পাঁচ মিনিট পর ঘনাদা রেডী হয়ে এসে বললো চলো বেরোই। অনেক কিছু গোল্ড কেনার আছে। 
বাজারের ব্যাগ নিয়েছ কেনো? বৌদি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো! 
-এতেই তো সব গোল্ড নেবো। 
-মানে? 
- মানে আবার কি? আমূল গোল্ড, টাটা টি গোল্ড, মারী গোল্ড এসব কিনে আনবো। ফেরার পথে তোমায় রেস্টুরেন্টে গোল্ডেন চিকেন ফ্রাই খাওয়াবো। এতো রকম গোল্ড কিনলে আমাদের সংসারের শান্তি বজায় থাকবে আর সারা বছর গোল্ড আসবে। বৌদি বললো তুমি গোল্ড কিনবে না তাহলে? কেনো কিনবো না? গোল্ড ফ্লেক ও কিনবো একটা, ওটা খেয়েই তো বুদ্ধি খোলে আমার। 
আর ওসব সোনাদানা! ওসব মায়া। বরং ওই টাকায় একদিন চলো মন্দিরে গরীবদেরকে খাওয়াই। আশা করি এতে কুবের দেবতা আমাদের ওপর রুষ্ট হবেন না! বরং খুশি হবেন যে আমরা জীবের সেবার মধ্যে দিয়ে ঈশ্বরের সেবা করছি। বৌদি বলে তোমার সাথে কথায় আমি পারবোনা! ঘনাদা গোল্ড ফ্লেকে এক টান দিয়ে মনে মনে হেসে বলে গিন্নি কেমন জব্দ! 

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

রবিবার, ৯ অক্টোবর, ২০২২

শিরোনাম- কার্নিভাল লাইভ✍️ ডা: অরুণিমা দাস

শিরোনাম- কার্নিভাল লাইভ
✍️ ডা: অরুণিমা দাস

কিরে তোরা সব রেডী? উমা চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করলেন। আর দুটো মিনিট ঘুমোতে দাও না মা! কার্তিক বললো। হ্যা রাত জেগে গেম খেলে উনি এখন আর উঠবেন কি করে? তোর জামা কাপড় দেখ ভক্তেরা রেখে গেছে ওখান থেকে পরে নিস পছন্দ মতো। কার্নিভাল বলে কথা,নীল পাঞ্জাবী আর সাদা পাজামা পরিস বাবা! নইলে উনি রাগ করবেন। ওকে মাম্মি,আরেকটু ঘুমিয়ে ফ্রেশ হয়ে রেডী হচ্ছি। কথা না বাড়িয়ে উমা দেবী ছুটলেন বাকি তিনজনকে ডাকতে। সিংহটা আবার সকাল থেকে ফ্যাচ ফ্যাচ করে কাঁদছে,কার্নিভালে গিয়ে ছোট্ট ট্রাকে থাকতে হয় ওনাকে। তাতে আবার বাতের ব্যথা বাড়ে। অসুর তাই অনলাইনে ঝান্ডু বাম অর্ডার দিয়েছে, সে নাকি বিকেলে ডেলিভারি আসবে। কিন্তু তার আগে তো প্যান্ডেল ছাড়তে হবে। কাস্টমার কেয়ারে কল করে অসুর আর্লি ডেলিভারির জন্য রিকোয়েস্ট করছে। উমাদেবী বললেন হ্যাঁ রে মাথামোটা তুই অফলাইনে না কিনে অনলাইন কেনো অর্ডার করলি? আমি মাথা মোটা বলেই তো ত্রিশূলের খোঁচা খাই। আহা ওরম বলে না, তুই ওই খোঁচা ছাড়াও চারদিন কত ফল মিষ্টি খেতে পাস সেটা বল! নে ফোন রেখে রেডী হ! অসুর বললো হুম! 
ওদিকে লক্ষ্মী সরস্বতীর মধ্যে ঝামেলা শাড়ী নিয়ে। উমা দেবী ঢুকতে গিয়ে দেখেন ঝগড়া তুঙ্গে, তাও একটা নীল কাঞ্জিভরম নিয়ে। উনি ওদের থামাতে বললেন লক্ষ্মী তুমি তো কদিন পরে আবার অনেক গিফট পাবে,এই শাড়ী সরো কে দাও। ও আবার পরের বছর জানুয়ারিতে আসবে। আর একটা কথা,গাড়ী চলে আসবে ঘণ্টা তিনেকের মধ্যে, লাগেজ গুছিয়ে রেডী হও। মাসীমনি রাগ করবে টাইমে না পৌঁছলে। 
গণশা এই গনশা! রেডী হতে শুরু কর। হ্যা মাম্মি এই পিৎজাটা এসে গেলে খেয়ে রেডী হচ্ছি। আবার পিৎজা খাবি? এই যে লাড্ডু খেলি এক প্লেট! ওতে পেট ভরেনি গো! আর র‍্যাটস ও আমার লাড্ডু তে ভাগ বসিয়েছে। ইদুরটা এগিয়ে এসে বলে পিৎজা টা কতদূর গো গণেশ দা? 
উফফ! তোদের জ্বালায় আর পারিনে। কার্নিভালে খেতে পাবি তো! আর তোদের বাবা তো নন্দী ভৃঙ্গী কে বলে খাবার সব বানিয়ে রাখছে। ও কৈলাস যেতে অনেক দেরী হবে মাম্মি। খিদে পেয়ে যাবে। তাড়াতাড়ি কর তোরা রেডী হ! 
সব্বাইকে সামলে সুমলে উমা দেবী নিজে রেডী হলেন, মাস্ক নিতে বললেন সবাইকে। গাড়ী এসে গেলো, ভাইবোনেরা একটা গাড়ীতে আর অসুর, সিংহ সহ উমা দেবী একটা গাড়ীতে উঠলেন। বেশ সন্ধ্যে হয়ে এসেছে, রাস্তায় আলো জ্বলছে। কার্নিভালে ঢুকছে গাড়ী, মাসীমণি মঞ্চ থেকে হাই হ্যালো করছেন। সাথে আবার চ্যালাচামুন্ডারাও আছে। কিছুক্ষন পর দেখা গেলো লক্ষ্মীর সাথে হিসেবপত্র নিয়ে আলোচনা করতে গাড়িতে উঠে গেছেন মাসীমণি আবার। লক্ষ্মী ঘাড় নেড়ে বলছে হিসেবে গরমিল আছে মাসীমণি। সরস্বতী ওকে থামিয়ে কানে কানে বলছে মাসী কোনো ভুল করতেই পারে না,চল কার্নিভালে কনসেনট্রেট কর। এখানে বেফাঁস কিছু বললে বাড়ী ফিরতে পারবিনা। মাসী হিসেবের খাতা নিয়ে ব্যস্ত,মনে মনে ভাবছেন জল মেশানো কি ধরা পড়ে গেলো! সরস্বতী বললো আপনার কাজ নিখুঁত মাসীমণি, লক্ষ্মী কদিন ঘুমোয়নি, তাই মাথা কাজ করছেনা ওর। আমি ফিরে গিয়েই হাজার খানেক ল্যাপটপ পাঠিয়ে দেবো আপনাকে,শুনছি আজকাল আপনি ছাত্র ছাত্রী দের ল্যাপটপ দিচ্ছেন। ভালো উদ্যোগ, পড়াশুনো করুক সকলে। অশিক্ষার অন্ধকার দূর হোক। আপনি গাড়ী থেকে নেমে পড়ুন মাসীমণি, লোকজন দেখছে। যান মঞ্চে যান। মাসীকে ভুলিয়ে ভালিয়ে মঞ্চে পাঠানো হলো।
আরেকটা গাড়িতে উমা দেবীর সাথে অসুর আর সিংহ যাচ্ছে। সিংহটা চশমা পরে চারপাশের আলোর মেলা আর লোকজনের ভিড় দেখছে। বাম লাগিয়ে দিয়েছে অসুর,কোমর সিধে আছে সিংহের। 
অসুরকে উমাদেবী বললেন ভালোই হচ্ছে কার্নিভাল,গাড়িতে ঘুরছিস! কাজ করতে হচ্ছে না। কাল থেকে তো আবার দৌড়বি কাজে ৩৮১ দিনের প্রকল্পে, আজ মজা করে নে! হ্যা এই কদিন ভালোই কাটলো, তোমার সাথে আমিও সেবাযত্ন পেলাম। 
কথা বলতে বলতে কার্নিভালের শেষ হয়ে এলো প্রায়। ইউনেস্কোর লোকেদের সাথে সেলফি তুলে উমা দেবী চললেন তার সাঙ্গোপাঙ্গো দের নিয়ে স্বামীর ঘরে। যাওয়ার আগে মনভরে ভক্তদের আশীর্বাদ করে গেলেন। 

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

শুক্রবার, ৭ অক্টোবর, ২০২২

শিরোনাম - চোদ্দো শাকের কথকথা✍️ ডা: অরুণিমা দাস

শিরোনাম - চোদ্দো শাকের কথকথা
✍️ ডা: অরুণিমা দাস

 "ওলংকেমুকবাস্তূকং, সার্ষপং নিম্বং জয়াং।             শালিঞ্চীং হিলমোচিকাঞ্চ পটুকং শেলুকং গুড়ূচীন্তথা।ভণ্টাকীং সুনিষন্নকং শিবদিনে খাদন্তি যে মানবাঃ,প্রেতত্বং ন চ যান্তি কার্ত্তিকদিনে কৃষ্ণে চ ভূতে তিথৌ।"

অর্থাৎ চোদ্দো শাক হল ওল, কেঁউ, বেথো, কালকাসুন্দা, সরষে, নিম, জয়ন্তি, শালিঞ্চা, হিংচে,পলতা, শুলকা, গুলঞ্চ, ঘেঁটু ও শুষনি। এই সব শাক শুভদিনে যে মানুষ খায় কার্তিক মাসের অমাবস্যা তিথির ভূত চতুর্দশীতে তার কাছে প্রেত ঘেঁষতে পারে না। এখানে প্রেত বলতে যদি রোগজীবানুদের বোঝানো হয় তবেই তা তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ ভূত আর জীবানু উভয়কেই তো চোখে দেখা যায় না! এবার আলোচনায় আসা যাক চোদ্দো শাকের কি কি ভেষজ গুণ আছে!

ওলঃ ওল গাছ প্রায় সবাই চেনে। মাটির নিচে থাকা কন্দ থেকেই পাতা জন্মায়। ওলের কন্দে ক্যালসিয়াম অক্সালেটের কেলাস বেশি থাকলে খাওয়ার সময় গলা চুলকোয়।

ভেষজ গুণাবলীঃ ওলের শুকনো কন্দের গুঁড়ো অর্শ, হাঁপানি, টিউমার, স্প্লীনের বৃদ্ধি ও রক্ত আমাশার ঔষধ হিসেবে প্রাচীনকাল থেকে ভারতে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। টাটকা মূল ব্যবহৃত হয় কফনাশক ও বাতের চিকিৎসায়। 

কেঁউঃ এটা হল আদার এক জাতি। রাস্তার ধারে, পতিত জমিতে বা অরণ্যের নিচু জায়গায় কেঁউ যথেষ্ট দেখা যায়। মাটির নিচে এর কন্দ জন্মায়। তবে পাখিরা এর বীজসহ ফল খেয়ে দূরে মলত্যাগ করলে মলের সাথে বেরনো বীজ থেকে চারাগাছ জন্মায়। এভাবে কেঁউ দূরে ছড়িয়ে পড়ে ও বংশ বিস্তার করে।

ভেষজ গুণাবলীঃ কেঁউ পাতার রস ভালো হজম করায়, খিদে বাড়ায়। জ্বর, আমাশা, ডায়েরিয়া, কফ, কাটা-ছেঁড়া, ক্ষত, চর্মরোগ, জন্ডিস, আরথ্রাইটিস, কোষ্ঠকাঠিন্য, কুষ্ঠ, হাঁপানি, ব্রঙ্কাইটিস, রক্তাল্পতা, কৃমি, চুলকানি, বমিভাব ইত্যাদি রোগের ঔষধ ও সাপে কাটার প্রতিষেধক হিসেবে কেঁউ পাতার নির্যাস প্রাচীনকাল থেকে ভারতীয় সমাজে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

বেথুয়াঃ 
গ্রাম বাংলার খুব পরিচিত শাক হল বেথুয়া বা বেথো। মাঠে-বাগানে আপনা-আপনি জন্মায় আগাছার মতো, কেউ চাষ করে না। বেথুয়া শাকে প্রচুর ভিটামিন–এ, ভিটামিন–সি, লোহা, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, পটাশিয়াম, ফসফরাস ও জিঙ্ক এবং গুরুত্বপূর্ণ ৮ টি অ্যামাইনো অ্যাসিড থাকে।

ভেষজ গুণাবলীঃ কোষ্ঠবদ্ধতা, রক্তাল্পতা, অম্বল, কৃমি, কিডনি স্টোন, মুখে ঘা, পায়েরিয়া, চর্ম রোগ, বাত ও অর্শ প্রতিরোধে বেথুয়া শাক খুব উপকারী। গর্ভরোধক হিসেবে এর ব্যবহার রয়েছে।

কালকাসুন্দাঃ রাস্তার দুধারে, পতিত জমিতে, জঙ্গলে সব জায়গায় দেখা যায়। 

ভেষজ গুণাবলীঃ অ্যালার্জি, কোষ্ঠবদ্ধতা, হুপিং কাশি, কফ, জ্বর,  ম্যালেরিয়া, কনজাংটিভাইটিস ও ক্ষত নিরাময়ে কালকাসুন্দার পাতার রস খাওয়া হয়। মৃগি রোগীদের চিকিৎসায় গোটা উদ্ভিদের রস ব্যবহার হয়। রজঃস্রাবের সময় যন্ত্রণা হলে মূলের রস ভালো কাজ দেয়। আবার ডায়াবেটিস রোগের চিকিৎসায় কালকাসুন্দার ছাল ভেজানো জল খেলে উপকার হয়।

নিমঃ নিমের উৎপত্তি হল ভারতীয় উপমহাদেশ। এর নরম পাতা অনেকেই চিবিয়ে খায়। খুব তেতো স্বাদ।  বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু) নিমকে ‘একুশ শতকের বৃক্ষ’ নামে অভিহিত করেছেন।

ভেষজ গুণাবলীঃ নিম পাতা বা পাতার রস কুষ্ঠ, চর্মরোগ, বহুমুত্র, জন্ডিস, একজিমার ভালো ঔষধ। ব্লাড সুগারের রোগীরা প্রতিদিন সকালে ১০-১২টা করে নিমপাতা চিবিয়ে খেলে সুগার কমে। নিম তেলের শুক্রানুনাশক ক্ষমতা থাকায় এটি জন্মনিয়ন্ত্রক হিসেবেও ব্যবহার করা যায়। নিমের ছাল ভিজিয়ে জল খেলে অজীর্ণ রোগ সারে।

সরষেঃ সরষে  ফুল থেকে জন্মায় সুন্দর ছোটো ছোটো শুঁটি। শুঁটির ভেতরে থাকে হালকা হলুদ বা বাদামি রঙের বীজ। বীজ থেকে প্রাপ্ত তেল ভারতে রান্নার কাজে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হলেও এর শাকের জনপ্রিয়তাও কম নয়। গ্রিন স্যালাড হিসেবেও সরষে শাক কাঁচা খাওয়া হয়। আর মশলা হিসেবে সরষের ব্যবহার তো সারা ভারতেই প্রচলিত।

ভেষজ গুণাবলীঃ স্কিন, লিভার ও চোখের পক্ষে সরষে শাক খুব উপকারি। ভিটামিন K, C ও E এবং ক্যালশিয়াম, পটাশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম ও লোহার সমৃদ্ধ উৎস হল এই শাক। এই শাক খেলে ক্যানসার, হৃদরোগ ও অ্যাথেরোস্ক্লেরোসিস হবার সম্ভাবনা কমে। এছাড়া আর্থ্রাইটিস, অস্টিওপোরোসিস ও রক্তাল্পতা রোগের নিরাময়ে সরষে শাক যথেষ্ট উপকারি।

শালিঞ্চাঃ যে কোনও জলাশয়ের ধারে এই বীরুৎ জাতীয় লতানে গাছটিকে দেখা যায়।  এর আরেক নাম Joyweed। 

ভেষজ গুণাবলীঃ চোখ, চুল ও চামড়ার জন্য শালিঞ্চা শাক খুব উপকারী। ডায়েরিয়া, অজীর্ন, হাঁপানি, কফ, জ্বর, রাতকানা, খোসপাঁচড়া, একজিমা, অর্শ ও অন্ত্রে ঘায়ের চিকিৎসায় এই শাক খেলে উপকার হয়। এই শাক খেলে মায়ের স্তনদুগ্ধের পরিমাণ বাড়ে। প্রতিদিন ৭৫ গ্রাম করে শালিঞ্চা শাক খেলে ডায়াবেটিস রোগীর রক্তে সুগারের পরিমাণ কমে। চোখে জল পড়া, কনজাংক্টিভাইটিস, মায়োপিয়া ও ক্যাটারাক্ট চিকিৎসায় মূলের রস ব্যবহৃত হয়। 

জয়ন্তীঃ জয়ন্তী গাছ হল শিম পরিবারের শাখা-প্রশাখাযুক্ত উদ্ভিদ। 

ভেষজ গুণাবলীঃ উদরাময়, বহুমূত্র, আলবিনিসম, এপিলেপসি, মানসিক সমস্যা, জ্বর, টিউবারকুলোসিস, কিডনির সংক্রমণ, গনোরিয়া ইত্যাদি রোগের চিকিৎসায় ও কৃমিনাশকের কাজ করে। সদ্য প্রসূতিদের জন্য এই শাক খুব উপকারি। মেধা ও স্মৃতিশক্তি বাড়াতেও জয়ন্তী পাতার রস খাওয়ানো হয়।

গুলঞ্চঃগুলঞ্চ বর্তমানে বিলুপ্তপ্রায় ও সংরক্ষিত উদ্ভিদ।

ভেষজ গুণাবলীঃ গুলঞ্চকে স্বর্গীয় উদ্ভিদ বলে গণ্য করা হয় এর ভেষজ গুণের জন্য। ডায়াবেটিস, উচ্চ কোলেস্টেরল, অ্যালার্জিক রাইনাইটিস, লিম্ফোমা সহ অন্যান্য ক্যানসার, কুষ্ঠ, যক্ষ্মা, কোষ্ঠকাঠিন্য, বাত, রিউম্যাটয়েড আর্থ্রাইটিস, হেপাটাইটিস, পেপটিক আলসার, গনোরিয়া, সিফিলিস, জ্বর ইত্যদি নানা রোগের আয়ুর্বেদিক চিকিৎসায় গুলঞ্চ ব্যবহৃত হয়। গুলঞ্চ শাক খেলে ইমিউনিটি বাড়ে। গুলঞ্চের রস নিয়মিত খেলে রক্তে ইউরিয়ার মাত্রা সঠিক থাকে।

পলতা বা পটল পাতাঃ  ভারতে পুরো গ্রীষ্ম, বর্ষা ও শরৎকাল জুড়ে পটলই অন্যতম প্রধান সবজি।

ভেষজ গুণাবলীঃ শ্বাসতন্ত্রঘটিত যে কোনও রোগ সারাতে পটল পাতা উপকারি। রক্তবর্ধক ও রক্তশোধক হিসেবে এবং লিভার ও চর্ম রোগ সারাতে পটল পাতা খুব কার্যকর। ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের রক্তে শর্করার পরিমাণ কমাতে এবং রক্তে ব্যাড কোলেস্টেরল কমাতে পটল পাতার কার্যকরী ভূমিকা বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেছেন। পটল পাতা নিয়মিত খেলে কোষ্ঠকাঠিন্য ও মানসিক অস্থিরতা দূর হয়। পটল পাতা ক্ষিদে ও হজমশক্তি বাড়ায়। জন্ডিস, কফ, জ্বর, পিত্তজ্বর, টাইফয়েড, অর্শ, কৃমি, ডায়েরিয়া ইত্যাদি রোগে পটল পাতা খেলে কাজ দেয়।

ভাঁট বা ঘেঁটুঃ ঘেঁটু হল অসাধারণ ভেষজগুণসম্পন্ন উদ্ভিদ। 

ভেষজ গুণাবলীঃ ঘেঁটুতে প্রচুর ফ্ল্যাভোনয়েড (ভিটামিন বি ২)  থাকায় এটি ক্যানসার প্রতিরোধে সক্ষম। এছাড়া চুলপড়া, হাঁপানি, কফ, বাত, জ্বর, চর্মরোগ, লিভারের রোগ, মাথার যন্ত্রণা, কৃমি, কোলেস্টেরল, ব্লাড সুগার ইত্যদি রোগ প্রতিরোধে ঘেঁটু পাতা খুব কার্যকর। 

হেলেঞ্চা বা হিংচেঃ হেলেঞ্চা বা হিংচে হল জলজ লতানে গাছ। 

ভেষজ গুণাবলীঃ আয়ুর্বেদে হেলেঞ্চাকে রক্তশোধক, পিত্তনাশক, ক্ষুধাবর্ধক, ব্যথানাশক, জীবানুনাশক ও জ্বরনাশক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই শাক নিয়মিত খেলে রক্তে হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ বাড়ে। কোষ্ঠকাঠিন্য, হাঁপানি, ডায়েরিয়া ও স্নায়ুরোগের ভেষজ চিকিৎসায় হেলেঞ্চা ব্যবহৃত হয়। হেলেঞ্চা শাকে যথেষ্ট অ্যান্টি-অক্সিড্যান্ট থাকায় এর ক্যানসার প্রতিরোধী ভূমিকা রয়েছে। মাথার যন্ত্রণায় মাথায় এই শাক বেটে লাগালে যন্ত্রণা কমে। হেলেঞ্চা শাক নিয়মিত খেলে ব্লাড সুগার কমে।

শুষনিঃ নরম কান্ডের এই লতানে উদ্ভিদটি জলাশয়ের পাড়ে বা ভেজা জায়গায় জন্মায়। 

ভেষজ গুণাবলীঃ জনশ্রুতি রয়েছে যে শুষনি শাক খেলে ঘুম পায়। তাই ইনসোমনিয়াতে যাঁরা ভোগেন তাঁদের নিয়মিত শুষনি শাক খেলে কাজ দেয়। এ ছাড়া নিয়মিত শুষনি শাক খেলে মাথার যন্ত্রণা, তীব্র মানসিক চাপ, উচ্চ রক্তচাপ, হাঁপানি, শ্বাসকষ্ট, গায়ে ব্যথা,পায়ের পেশির অনিয়ন্ত্রিত সংকোচন, বাত, জিভে ও মুখে ক্ষত, চর্মরোগ ইত্যদি দূর হয়। শুষনির কাশি ও কফ নিরাময়কারী ভূমিকা বিজ্ঞানীদের দ্বারা প্রমাণিত। চোখের রোগ, ডায়াবেটিস ও ডায়েরিয়া নিরাময়ে শুষনি পাতার রস কার্যকর। সন্তান প্রসবের পর মায়েরা শুষনি শাক খেলে দুগ্ধক্ষরণ বাড়ে। সাপের কামড়ে শুষনি পাতার রস দিয়ে চিকিৎসা করার প্রচলিত রীতি রয়েছে।

শেলুকা বা শুলফাঃ মশলা উৎপাদক উদ্ভিদ হিসেবে শুলফা পরিচিত। 

ভেষজ গুণাবলীঃ মাতৃদুগ্ধের পরিমাণ বাড়াতে ও বাচ্চাদের পেটের রোগ সারাতে শুলফা শাক খুব উপকারী। বাচ্চাদের গ্রাইপ ওয়াটারের একটা উপাদান এই শুলফা শাক থেকে আসে। চোখের রোগ, চোখে ঘা, পুরানো ক্ষত, জ্বর, স্নায়ু রোগ, জরায়ুর ফাইব্রয়েড ইত্যদি রোগের নিরাময়ে শুলফা খুবই কার্যকর। বাচ্চাদের পেট ফাঁপায় শুলফা বীজ জলে ভিজিয়ে সেই জল খেলে দারুণ কাজ দেয়। শুলফা বীজ থেকে প্রাপ্ত তেল সায়াটিকা বাত, রিউম্যাটয়েড আর্থ্রাইটিস, স্পন্ডাইলোসিস, হাঁপানি, ব্রংকাইটিস, কফ ইত্যাদি রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়।

এই চোদ্দো শাকের সবগুলো আজকাল সব জায়গায় পাওয়া যায় না। তাই বাঙালি ভূত চতুর্দশীতে চোদ্দো শাক খাওয়ার রীতি বজায় রাখতে গিয়ে শাকের তালিকাকে অনেকটা পরিবর্তন করে ফেলেছে। এখন শহুরে এলাকায় যে চোদ্দো শাক বেশি প্রচলিত সেগুলো এই সব শাকের মধ্যে থেকেই নির্বাচিত – পালং, মুলো, লাল শাক, কলমি, শুষনি, সরষে, পাট, নটে, ধনে, মেথি, পুঁই, লাউ, কুমড়ো, হিংচে ও গিমে। অবশ্য গ্রামের দিকে চোদ্দো শাকের তালিকায় পুনর্ণবা, কুলেখাড়া, বন নটে, কাঁটা নটে, তেলাকুচো, চিকনি, থানকুনি, শতমূলি, আমরুল, নুনিয়া ইত্যদিও যোগ হয়েছে। বলাবাহুল্য এইসব শাকের ভেষজ ও পুষ্টিগত গুণও অসাধারণ।
স্থানভেদে ও শাকভেদে নানা শাকের রেসিপি নানারকম। তবে বেশিরভাগ বাঙালি এই সব শাকের ভাজা বা চচ্চড়ি খেতে পছন্দ করে। শাকের তালিকা লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে পুরোনো তালিকার বেশিরভাগ শাকই ছিল প্রকৃতির স্বাভাবিক শাক। নয়া তালিকার অনেক শাকও স্বাভাবিক শাক। এদের আমরা চাষ করি না। এগুলো মাঠে-ঘাটে আপনিই জন্মায়। এই শাকে না আছে কোনও কীটনাশক, না আছে কোনও রাসায়নিক সার। ফলে এই সব শাকের পুষ্টিগুণ অসাধারণ। পালং, নটে, মুলো, পুঁই ইত্যদি শাক চাষে ব্যাপক কীটনাশক ও রাসায়নিক সার ব্যবহার করা হয়। তাই আমরা যদি মাঠে-ঘাটে জন্মানো শাকগুলি বেশি বেশি খেতে পারি তবে আমাদের স্বাস্থ্য রক্ষা করা অনেক সহজ হবে। এ জন্য এইসব দেশীয় শাককে চিনতে হবে। মোবাইল আর ল্যাপটপের দুনিয়ায় সারাদিন ঘোরাঘুরি করলে তো আর এই সব শাক চেনা সম্ভব নয়। পাশাপাশি জানতে হবে এই সব শাক রান্নার পদ্ধতিও। যাঁরা রেসিপি জানতেন, সেই সব মানুষ বর্তমানে নেইও। বর্তমান প্রজন্ম ফাস্ট ফুডের চক্করে পড়ে এসব শাকের থেকে অনেক দূরে সরিয়ে নিয়েছে নিজেদের। কিন্তু ফাস্ট লাইফে ফাস্ট ছুটতে হলে এসব শাকের ভূমিকা যথেষ্ট রয়েছে আর শুধু কালীপুজোর আগের দিনই নয়,বছরে মাঝে মধ্যে এইসব শাক খেয়ে মুখের স্বাদ বদল করা উচিত। 

"যতই খাও বার্গার,পিৎজা প্যাটিস আর মোমো চাইনিজ
শাক ও খেয়ো মাঝে মাঝে,তবেই প্রিভেন্ট হবে  ডিজিস"।

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

শনিবার, ১ অক্টোবর, ২০২২

পুজোর স্মৃতি✍️ ডা: অরুণিমা দাস

বিষয় - অণুগল্প
পুজোর স্মৃতি
✍️ ডা: অরুণিমা দাস

পুজো মানেই কাশফুল, শিউলি আর শরতের
আকাশে মেঘের আনাগোনা। ছোটবেলায় স্কুলে পুজোর ছুটি পড়ার আগে তিন দিন ধরে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হতো। তখন বোধহয় ক্লাস নাইনে পড়ি, নাটকের মহড়া চলছে একদিন, সবাই যে যার পাঠ মুখস্থ করতে ব্যস্ত। কিন্তু আমার এক বন্ধু পিউ ওর কিছুতেই পাঠ আর মনে থাকছে না। নাটকের নাম ছিলো 'চোখে আঙুল দাদা' আর ওর চরিত্র ছিলো চোখে আঙুল দাদার অভিনয়। খুব চিন্তায় পড়ে গেছে সবাই এমন সময় আমাদের ক্লাসের মাতব্বর থুড়ি মনিটর ডোনা বললো চাপ নিস না,আমি স্টেজের পিছন থেকে প্রম্পট করবো তুই খালি স্মার্টলি পাঠ গুলো বলে যাবি। পিউ এসব শুনে শান্ত হলো কিছুক্ষন। তারপর হঠাৎ করে বললো যদি টেনশনে শুনতে না পাই! উফফ থাম তো! সব পাবি, ডোনা বললো। 
এরপর নির্ধারিত দিনে স্টেজে নাটকের জন্য সবাই রেডী, ড্রেস পরে ঘুরে বেড়াচ্ছে এদিক ওদিক। নাচ গান কবিতা এসব হবার পর ম্যাম নাটকের জন্য ঘোষণা করলেন। সবাই স্টেজের দিকে তাকিয়ে। পিউ কে আমরা ভরসা দিলাম সকলে, ডোনা এসে পিঠ চাপড়ে বললো যা চিন্তা করিস না, ম্যায় হুঁনা! পিউ মানে চোখে আঙুল দাদা স্টেজে উঠলো, প্রধান চরিত্র ওর। প্রথম কিছুক্ষন ভালোই চলছিল, ডোনা মাঝে প্রম্পট করতে গিয়ে চোখে আঙুল দাদার জায়গায় ওর তৈরী দানবের যে ডায়ালগ সেটা বলতে লাগলো। পিউ ও সেগুলো বলতে থাকলো, স্টেজের বাইরে চাপা গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে, ম্যাম বলছেন কি সব বলছো পিউ? এটা তো দানবের ডায়ালগ! পিউ ভয়ে কেঁদে ফেললো। আর দানব টা মাটি থেকে উঠে ওর গলা টিপে বললো এই আমার ডায়ালগ বলছিস কেন তুই? তুই তো চোখে আঙুল দাদার পাঠ করছিস! পিউ বললো সুমনা (দানবের ভূমিকায় ছিলো) তুই এরকম করছিস কেনো? ভুলে গেছি আমি সব পাঠ, আর ডোনা পর্দার আড়াল থেকে আমাকে এটাই বলছিলো। যাইহোক পরিস্থিতি সামাল দিতে ম্যাম স্টেজে উঠে ওদের দুজন কে শান্ত করলেন। ডোনা কে ডেকে খুব বকলেন, বললেন তোমাদের এসব অসুবিধে আমায় বললে আরো বেশি করে রিহার্সাল করাতাম তোমাদের। বড়ো হয়ে গেছো বলে ছেড়ে দিয়েছিলাম তোমাদের নিজের মতো করে। আমার ভরসাটা তোমরা রাখলে না। এরপর নাটকটা আর হয়নি, নাটকের সবাই নিজের মতন করে নাচ গান করেছিল যে যেটা পারে। এসব ঘটনা গুলো মনে পড়লে আজও হাসি পায়। ম্যাডামের সাথে দেখা হলে উনিও হাসেন এসব মনে করে। বলেন এগুলোও তো স্কুলের স্মৃতি রে! এগুলো আকড়ে বেঁচে থাকার দিন এখন। সত্যিই দিনগুলো খুব ভালো ছিল, পুজোর আগে এসব অনুষ্ঠান এখন আর হয়না, তাই স্মৃতি হাতড়ে এই লেখাটা লিখে ফেললাম।

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

দশভূজা কেবল নারী নয়,পুরুষও ✍️ ডা: অরুণিমা দাস

দশভূজা কেবল নারী নয়,পুরুষও
✍️ ডা: অরুণিমা দাস

আজকাল কার দিনে সবকিছুতেই নারী পুরুষের সমান অধিকার বলে দাবী জানানো হয়। তাই দশভুজা তকমা টা শুধু নারীর কেনো! পুরুষেরও দশভূজ তকমা জোটা উচিত। নারী যেমন ঘর আর বাইর সমান দক্ষতায় সামলাচ্ছে পুরুষেরাও তেমনি অফিস আর বাড়ি সমান ভাবে সামলাতে সক্ষম। একজন বাচ্চার জীবনে মা বাবা দুজনের ভূমিকাই উল্লেখ্যযোগ্য, সেই হিসেবে দেখতে গেলে সকালে যেমন মা রেডী করিয়ে স্কুলে পাঠাচ্ছেন তেমনি সন্ধ্যে টিউশন পড়ে ফেরার পর বাবা মুখের সামনে সান্ধ্য জলখাবার তুলে ধরছেন। জীবনে আজ সবাই যেভাবে যান্ত্রিক হয়ে উঠেছে সেক্ষেত্রে পুরুষকে দশভূজ হয়ে উঠতেই হবে। নারী যেমন রান্নাঘর সামলে অফিসে পেন ধরতে বা গাড়ির স্টিয়ারিং ধরতে পিছপা হচ্ছে না,পুরুষেরাও অফিসের মিটিং সেরে রান্নাঘরের কোন তাকে চিনি আর কফি আছে খুঁজে বের করতে পারছে খুব সহজেই। সংসারে শান্তি বজায় রাখতে দুজনকেই দশহাত দিয়ে দশ দিক সামলাতে হচ্ছে। তবেই না বলতে পারবে -

"দশহাত দিয়ে,কাধে কাধ মিলিয়ে যাই করিনা কেনো
জীবন যুদ্ধে তুফান এলেও পিছপা হই না কখনো।"

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

শিরোনাম - পরিপক্কতা ✍️ ডা: অরুণিমা দাস

শিরোনাম - পরিপক্কতা
✍️ ডা: অরুণিমা দাস

পরিপক্কতা বলতে আমরা যেটাকে ম্যাচুরিটি বলি আর কি! সেটা শুধু শারীরিক হয় না, মানসিক হয়। আর মানসিক পরিপক্কতা শারীরিক পরিপক্কতার চেয়ে অনেক বেশী সংবেদনশীল। একজন ছেলে বা মেয়ে যখন বয়: সন্ধিকালে প্রবেশ করে তখন হরমোনের জন্য শারীরিক যেসব পরিবর্তন হয়, তেমনি মানসিক অবস্থারও পরিবর্তন ঘটে। একটা উৎফুল্লতা বা ইউফোরিক স্টেজে তারা থাকে, আর অনেক বেশি আবেগপ্রবণ হয়ে থাকে। এইসময় ইমোশনাল ডিসব্যালান্স কে ওভার কাম করে তাদের সঠিক দিশা দেখানোর জন্য তাদের সঙ্গে সব সময় বন্ধুর মতো মেশা উচিত। কোনো কিছুই জোর করে চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয় একদম। সব কিছুর ঘেরাটোপে তাদের জীবন বন্দী করে রাখাও যেমন ঠিক নয় তেমনি অতিরিক্ত স্বাধীনতাও দেওয়া ঠিক নয়। বন্ধু সুলভ আচরণ করে মনের গভীরে গিয়ে মানসিক দোলাচলের কারণ জানা দরকার, কোনো সাহায্যের জন্য হাত সব সময় বাড়িয়ে দেওয়া খুব প্রয়োজন। যাতে এই সময় থেকে তারা ভবিষ্যতের জন্য সঠিক পথ অনুসরণ করতে পারে, সেই দিশা তাদের দেখানো উচিত। প্রয়োজন পড়লে দু চারটে অ্যাডোলেসেনট কাউন্সিল এর সিটিং ও নেওয়া যেতে পারে। জীবনের সব মুহূর্তের মত এই পরিপক্ব হবার মুহূর্ত টাও তারা যাতে সুন্দর ভাবে উপভোগ করতে পারে স্ট্রেস ফ্রী হয়ে সেই চেষ্টাই সর্বদা করা উচিত। 

"বয়: সন্ধিকালে চলে যে নানা হরমোনের খেলা
গুরুত্ব দিও সকলকে,কোরোনা কোনো অবহেলা।"

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

বৃহস্পতিবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২২

কথোপকথন

চিত্রালোচনা
✍️ ডা: অরুণিমা দাস

চিত্র ১

ইমন : আসিস না আমার কাছে, বন্দী করেছি নিজেকে যে ঘরে।

অর্না: কি এমন হয়েছে তোর যে এরকম বলছিস! আমি আছি সর্বদা তোর তরে।

ইমন: দুরারোগ্য ব্যাধি যে, মাস্ক পরা মাস্ট, ইমিউনো কম্প্রোমাইসড আমি, হয়েছে যে ক্যান্সার 

অর্না: হারতে তোকে দেবো না আমি, লড়াই করবো একসাথে, তবেই ক্যান্সার পাবে যোগ্য অ্যানসার।

ইমন: তোর এই কথাগুলোই বাড়িয়ে দেয় মনের জোর, বাড়ে লড়াই করার ইছেশক্তি।

অর্না: হাত ধরার শপথ যখন করেছি ছাড়বোনা তোকে, আমার হাত থেকে নেই তোর কোনোদিন মুক্তি।


 চিত্র ২:

বেঞ্চ: একাকী যে আছি বসে নেই তো কেউ কথা বলার।

আকাশ: হেসে বলে বলতে পারো আমায় মনের কথা তোমার।

বেঞ্চ: স্থবির আমি,জড় পদার্থ,নেই কোনো প্রাণের অস্তিত্ব। মাটিতে ছড়ানো লাল ফুল সব,পারিনা দিতে উপহার তোমায়

আকাশ: নও তুমি জড়, রয়েছে মন তোমার এক আকাশ সমান। ছুতে পারিনা যে তোমারে, আমি বড়ো অসহায়।

বেঞ্চ: রোজ দেখি সাদা পালকের মত মেঘ ভেসে চলে, কখনো বৃষ্টি যদি নামে মনে হয় তোমার ভালোবাসা ঝরছে মুক্তো হয়ে।

আকাশ: দমকা হাওয়ায় গাছ থেকে ঝরে পড়া ফুল দিলাম তোমায় উপহার,গ্রহণ করো হৃদয় দিয়ে।

বেঞ্চ: প্রকৃতির কোলে পেয়েছি ঠাই সাথে রয়েছে সবুজের সমারোহ

আকাশ: খুশি থাকো ওদের সাথে, আমি না হয় সয়ে নেবো বিরহ। 

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

আলো আঁধারের খেলা ✍️ডা: অরুণিমা দাস

আলো আঁধারের খেলা
 ✍️ডা: অরুণিমা দাস

জীবন মানে আলো আঁধারির মিশেল। আলো আর আঁধার একটা কয়েনের এপিঠ ওপিঠ। যখন কোনো মানুষ অন্ধ হয়, দুনিয়ার রূপ,রস আস্বাদন করতে সে অক্ষম হয় কিন্তু তাই বলে আলো কিন্তু অন্ধকারে পরিণত হয়না তার জন্য। প্রকৃতির নিয়মে সূর্য চন্দ্র ওঠে,আলোকিত থাকে চারিপাশ। শুধু অন্ধকারের নাগপাশে আবদ্ধ থাকে সেই অন্ধ মানুষের জীবন। কোনো কিছুর বিনিময়ে আলো যেমন অন্ধকারে পরিণত হয় না তেমনি অবস্থার বিপাকে পড়ে কারোরই নৈতিক জ্ঞান, বুদ্ধি বিসর্জন দেওয়ার কোনো প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে হয় না। জ্ঞানচক্ষু উন্মীলিত হোক সকলের, আঁধারে নিজেকে ডুবিয়ে না রেখে আলোর দিশায় এগিয়ে নিয়ে যান সকলে। অন্ধত্ব একটা প্রতিবন্ধকতা মাত্র, তার জন্য আলো কখনোই অন্ধকার হয়ে যাবে না। 
প্রতিটি মানুষের জীবনে ব্যর্থতা রয়েছে। যখন মানুষ ব্যর্থ হয়ে নিজের জীবনের প্রতি আর আস্থা রাখে না, এমনকি জীবনের সমস্ত আশা আকাঙ্ক্ষার কথা ভুলে শেষ দিনের আশায় প্রহর গুনতে থাকেন। তখন এই উক্তি বা বাণী মানুষকে হতাশার মুখ থেকে বার করে নতুন করে বাঁচার পথ দেখায়। 
 
থেকো না অন্ধকারে,দিচ্ছে আলো হাতছানি দেখো দিয়ে মন
আলো আঁধারের খেলা চলছে আর চলবে যে সারাজীবন।

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

শনিবার, ২৭ আগস্ট, ২০২২

আগামীকালের বিজ্ঞান আলোচনার বিষয় বিজ্ঞানীদের কেন সাহিত্য ও অন্যান্য বিষয় পড়া উচিৎ! সৌজন্যে রজত ও জিৎ

বিজ্ঞান ও সাহিত্যের মেলবন্ধন

 ✍️ ডা: অরুণিমা দাস

বিজ্ঞান কথার অর্থ বিশেষ ভাবে জ্ঞান অর্জন করা। তো এই জ্ঞান অর্জনের সাথে হাতে হাত ধরে যদি সাহিত্যচর্চাকে সঙ্গী করা হয় সেই মেলবন্ধন অন্য মাত্রা পায়। আমাদের শিক্ষাক্ষেত্রেই দশম শ্রেণীর পর একাদশ শ্রেণী থেকে বিজ্ঞান বিভাগ আর কলা বিভাগ এই দুটো বিভাগ আলাদা করে দেওয়া হয়। কিন্তু বিজ্ঞান বিভাগ নিয়ে যারা পড়ে তারা কিন্তু সাহিত্যের ইতিহাসও পড়ে। বিজ্ঞানের কিছু কঠিন তথ্য যদি সুন্দর ও সহজ বাংলা ভাষায় বুঝিয়ে দেওয়া যায় তাহলে সাধারণ মানুষের কাছে বিজ্ঞান বিষয়টা সহজ আর বোধগম্য হয়ে থাকে। এই জন্য বিজ্ঞান জানার সাথে সাথে সাহিত্যও জানার প্রয়োজন পড়ে। আর বিজ্ঞান কিছুটা হলেও ইতিহাস ভিত্তিক। পুরনোকে না জানলে নতুন কিছু আবিষ্কার করা সম্ভব নয়। তাই বিজ্ঞান জানার সাথে সাথে সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্বন্ধেও জ্ঞান থাকা আবশ্যিক। সাহিত্যের জগতে লেখক ও সাহিত্যিক রাজশেখর বসু যিনি পরশুরাম নামে আমাদের কাছে পরিচিত তিনি কিন্তু আসলে কেমিস্ট্রির স্টুডেন্ট ছিলেন। আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের প্রতিষ্ঠিত বেঙ্গল কেমিক্যালে উচ্চপদেই তিনি কাজ করে গেছেন চিরকাল। তিনি শুধু বিজ্ঞান চর্চাতেই নিজের জ্ঞান কে সীমাবদ্ধ রাখেন নি, পাশাপাশি সাহিত্য চর্চা করে সেই জগতেও নিজের অনন্য সৃষ্টির নিদর্শন রেখেছেন। ইংরেজদের রাজত্বে যেটুকু বিজ্ঞান চর্চা হতো তা কেবল ইংরেজি আর জার্মান ভাষায়। তার ফলে বাঙালিদের পক্ষে বিজ্ঞান বোঝা বেশ দুরূহ হয়ে উঠেছিল। কিন্তু সেই দুর্গমতাকে অতিক্রম করে বাঙালির কাছে বিজ্ঞানকে সহজ ভাবে তুলে ধরেছিলেন আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়, আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু, পরশুরাম প্রমুখ বিজ্ঞানীরা। তাদের উদ্যোগেই বিজ্ঞান চর্চা বাংলা ভাষায় চালু হয়। বাঙালিদের কাছে বোধগম্য হয়ে ওঠে বিজ্ঞান। এ তো গেল কিছু্জনের উদাহরণ আরও এরকম অনেকেই আছেন যারা সমান দক্ষতায় বিজ্ঞান ও সাহিত্যচর্চায় তাঁদের অসামান্য অবদান রেখেছেন।
ফিজিক্স এর কঠিন হিসেব,কেমিস্ট্রির বিক্রিয়া আর ম্যাথস,বায়োলজির দুর্দান্ত কঠিন কম্বিনেশনে মাঝে মাঝে সকলেরই সাহিত্যচর্চা করা দরকার। সাহিত্যের রস আস্বাদন করতে করতে বিজ্ঞানকে গ্রহণ করা উচিত বলে আমার মনে হয়। একটা সেতু গড়ে তোলা উচিত বিজ্ঞান আর সাহিত্যের মাঝে।

"শুধু বিজ্ঞানে জ্ঞানার্জন কেনো,সাথে চর্চা হোক সাহিত্যের 
সমৃদ্ধ হোক সকলেই এই দুই বিষয়ে সমন্বয়ের।"

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস



বুধবার, ২৪ আগস্ট, ২০২২

শিরোনাম- গিভিং স্ট্রেস অন স্ট্রেস হরমোন✍️ ডা: অরুণিমা দাস

শব্দালোচনা
 শিরোনাম- গিভিং স্ট্রেস অন স্ট্রেস হরমোন
✍️ ডা: অরুণিমা দাস

অন্ত:ক্ষরণ শব্দটির মানে হয়তো অন্তরের ক্ষরণ। এই শব্দটির সঙ্গে মিল রেখেই হয়তো অন্ত:ক্ষরা গ্রন্থির নাম এসেছে। আর এই গ্রন্থি হলো আমাদের শরীরে হরমোনের উৎসস্থল। আজ শব্দালোচনার দিনে একটু না হয় এন্ডোক্রিন গ্ল্যান্ড বা অন্ত:ক্ষরা গ্রন্থির কাজ কর্ম নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা যাক। স্ট্রেস মানুষের জীবনে অঙ্গাঙ্গী ভাবে জড়িয়ে আছে, তাই আজ স্ট্রেস হরমোন নিয়ে দু চার কথা বলা যাক।

হরমোন  হচ্ছে এক প্রকার রাসায়নিক তরল যা শরীরের কোনো কোষ বা গ্রন্থি বিশেষতঃ অন্ত: ক্ষরা গ্রন্থি থেকে শরীরের একটি নির্দিষ্ট অংশে নিঃসৃত হয়। হরমোনের মাধ্যমে শরীরের অন্যান্য অংশের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে পরিবর্তনের সংকেত পাঠানো হয়। যেমন বিপাকক্রিয়ার পরিবর্তনের জন্য অল্প একটু হরমোনই যথেষ্ট। এটি একটি রাসায়নিক বার্তাবাহক হিসেবে কাজ করে যা এক কোষ থেকে অপর কোষে বার্তা বহন করে। প্রায় সকল বহুকোষীয় জীবই হরমোন নিঃসরণ করে। গাছের হরমোনকে ফাইটোহরমোন বলে। প্রাণীর ক্ষেত্রে বেশির ভাগ হরমোনই রক্তের মাধ্যমে পরিবাহিত হয়। কোষ হরমোনের সংস্পর্শে প্রতিক্রিয়া করে যখন সেগুলোর ঐ হরমোনের জন্য স্পেসিফিক রিসেপ্টর রয়েছে । হরমোন হচ্ছে একধরনের রাসায়নিক পদার্থ যা এন্ডোক্রাইন গ্ল্যান্ড হতে নিঃসৃত হয়ে বিভিন্ন শারীরিক ক্রিয়া,বৃদ্ধি, রক্ত চাপ নিয়ন্ত্রন, ব্রেস্ট মিল্ক তৈরী, পিউবার্টি  ইত্যাদি ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখে৷ সাধারণ ভাষায় হরমোন বলতে আমরা বুঝি মানুষ বা অন্য যে কোনো বহুকোষী প্রাণীর কোষগুলোর মধ্যে একটা ব্যালান্স তৈরি করা,কর্মকাণ্ডের একটা ক্রোনোলজি পূরণ করার একটা কন্ট্রোলিং সিস্টেম। হরমোন সমুহ নিঃসরণ হয় যে সব গ্রন্থি বা গ্ল্যান্ড থেকে সেগুলো নিয়ে একটু জেনে নেওয়া যাক। অন্ত: মানে অভ্যন্তরীণ আর ক্ষরন মানে হচ্ছে নিসঃরন করা। আমাদের শরীরে অনেক প্রকারের গ্রন্থি রয়েছে, সে জন্য ক্ষরন এর উপর ভিত্তি করে গ্রন্থি দু প্রকার। এক্সোক্রাইন বা বহিঃক্ষরা গন্থি ও এন্ডোক্রাইন বা অন্ত ক্ষরা গ্রন্থি।অন্ত:ক্ষরা মানে যেসব গ্রন্থি নালি বিহিন এবং নিঃসৃত রস রক্তে ক্ষরিত হয়ে কাজের জায়গায় পৌছায় এবং রক্তের মাধ্যমে পরিবাহিত হয়ে নির্দিষ্ট স্থানে গিয়ে তার নির্দিষ্ট কাজ করে – যেমন পিটুইটারি, থাইরয়েড এবং অ্যাড্রেনাল গ্রন্থি – এরাই হরমোন নি:সরন করে। বহি:ক্ষরা গ্রন্থি – এই গ্রন্থি নালি যুক্ত এবং নালির মাধ্যমে তার উৎপাদিত রস নিকটের কোন ক্রিয়া স্থলে যায় – যেমন লালা , যকৃৎ এবং ঘাম গন্থি এবং এরা মুলত এনজাইম নি:সরনের কাজ করে । (যকৃৎ থেকে পিত্ত রস, লালা গ্রন্থি থেকে লালা রস নামে অভিহিত )আবার কিছু গ্রন্থি আছে এনজাইম ও হরমোন দুটি এক সাথে নি:সরন করে এদেরকে মিক্সড বা মিশ্রগ্রন্থি বলে যেমন- অগ্নাশয়(প্যানক্রিয়াস), ডিম্বাশয় (ওভারি) এবং শুক্রাশয়(টেস্টিস)। অন্যদিকে যে গ্রন্থি থেকে হরমোনগুলো তৈরী হয় সেই গ্রন্থির নামানুসারে হরমোনগুলোর নাম দেওয়া হয়েছে। যেমন থায়রয়েড গ্রন্থির নাম অনুসারে থাইরয়েড হরমোন , অ্যাড্রিনাল হরমোন, পিটুইটারি হরমোন ইত্যাদি। তেমনি হরমোনকে তার কাজের ভিত্তিতে চার ভাগে বিভক্ত করা যায় – যেমন দেহ বৃদ্ধি করতে সহায়ক হরমোনকে গ্রোথ এবং ডেভলপমেন্ট হরমোন, সেই ভাবে দেহের সামগ্রিক শক্তি উৎপাদন বা শক্তির ব্যবহারে সাহায্যকারী হরমোন,শরীরের ভেতরে যে জল আছে, ইলেকট্রোলাইট মেনটেন করার হরমোন এবং রিপ্রোডাকশন বা সেক্স হরমোন। বিশেষ করে রিপ্রোডাকশন হরমোন নিয়ে ভাল ভাবে জানলে একেবারে নিশ্চিত হয়ে বলতে পারি,দাম্পত্য জীবন বা অন্যান্য কুসংস্কার জাতীয় কিছু ভুল শিক্ষা আছে তা থেকে দূরে থাকতে পারা যাবে, অনেক অজানাকে জানা হবে আর সেই সাথে সদ্য আবিষ্কৃত নতুন নতুন কিছু হরমোনের তথ্যও জানা যাবে। এবারে জেনে নেওয়া যাক মানুষের শরীরের গুরুত্বপূর্ণ কিছু গ্রন্থি ও তার নিঃসরণ সম্পর্কে।
পিটুইটারি গ্ল্যান্ড:  পিটুইটারি গ্রন্থিই যেহেতু হরমোন নিঃসরণ সব চেয়ে বেশী করে তাই এ বিষয়ে জানলেই মনে হয়  অনেক কিছু বোঝা সহজ হবে, সে জন্য একটু বিস্তারিত আলোচনার দরকার । হরমোন নিঃসরনের প্রধান গ্রন্থি হলো পিটুইটারী যা মানুষের মস্তিষ্কের নীচের দিকে হাইপোথ্যালামাস নামক জায়গা হতে ঝুলে থাকে৷ হাইপোথ্যালামাসে যে হরমোন প্রস্তুত হয় তা পিটুইটারী গ্রন্থিকে সংকেত দেয় হরমোন নিঃসরন করার জন্য এবং শারীরিক বিভিন্ন কাজে পিটুইটারী গ্রন্থি হরমোন নিঃসৃত করে৷ সেজন্য পিটুইটারী গ্রন্থিকে মাস্টার গ্ল্যান্ড বা প্রভু গ্রন্থিও বলা হয়৷ ওজন মাত্র পাঁচশো মিলিগ্রাম। পিটুইটারী গ্রন্থি দুই ভাগে বিভক্ত, সামনের দিকে পিটুইটারী গ্রন্থি (অ্যান্টেরিওর) এবং এবং পিছনের দিকে পিটুইটারী গ্রন্থি (পস্টেরিওর)। সম্মুখভাগের পিটুইটারি গ্রন্থি নিঃসৃত হরমোনগুলি হল  অ্যাড্রেনোকর্টিকো ট্রপিক হরমোন, গ্রোথ হরমোন, থাইরয়েড স্টিমুলেটিং হরমোন -থাইরয়েড গ্রন্থির কার্যকারিতা নিয়ন্ত্রক, গোনাডোট্রোপিক হরমোন - জনন গ্রন্থির (শুক্রাশয় ও ডিম্বাশয়) বৃদ্ধি ও কার্যকারিতা নিয়ন্ত্রক। অ্যাডরিনো কর্টিকোট্রফিক হরমোন :- এই হরমোন পিটুইটারি গ্রন্থি থেকে নিঃসৃত হয়। এই হরমোন ঘাটতির কারনে সাধারন ভাবে যে সব সমস্যা দেখা দিতে পারে সেগুলি হলো পেশী দুর্বলতা, মাথা ঘোরা, ওজন কমে যাওয়া, পেটের বিভিন্ন ধরণের ব্যথা, নিম্ন রক্তচাপ ও নিম্ন লেভেলের সেরাম সোডিয়াম অথবা মারাত্মক ইনফেকশন বা সার্জারির কারনেও দেখা দিতে পারে,শেষ পর্যন্ত কোমাও হতে দেখা যায়। গঠনগত দিক দিয়ে,অ্যাডরিনাল গ্রন্থির কর্টেক্স অঞ্চলের স্বাভাবিক বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করে । অ্যাডরিনাল গ্রন্থির কর্টেক্স অঞ্চলকে উদ্দীপিত করে তার ক্ষরণ নিয়ন্ত্রণ করে কিন্তু যদি অ্যাডরিনাল কর্টেক্সের ক্ষরণ বেড়ে যায় তা হলে কুশিং সিনড্রোম হতে পারে। কুশিং সিন্ড্রোম - রক্তে কর্টিসলের মাত্রার এই অস্বাভাবিকতা আবিষ্কার হয় ১৯৩২ সালে। হার্ভে কুশিং এই অস্বাভাবিকতা আবিষ্কার করেন বলে তার নাম অনুযায়ী একে কুশিং সিনড্রোম বলে। এটি কেবল যে মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ তা নয়, এই রোগ ঘোড়া, গৃহপালিত কুকুর, বিড়ালের মধ্যেও দেখা যায়। কর্টিসল হরমোনের নিয়ন্ত্রণহীন বৃদ্ধির ফলে সকল সমস্যা দেখা দেয়। উচ্চমাত্রায় গ্লুকোকর্টিকয়েড ড্রাগ গ্রহণ কিংবা অতিরিক্ত কর্টিসল, অ্যাড্রেনোকর্টিকোট্রপিক হরমোনের কারণেও হতে পারে। পিটুইটারি গ্রন্থিতে টিউমার হলে অতিরিক্ত ACTH ক্ষরণ হয় যা অ্যাড্রেনাল গ্রন্থিকে কর্টিসল তৈরিতে উদ্বুদ্ধ করে। কর্টিসল হল একটি হরমোন যাকে অনেকে স্ট্রেস হরমোন বলে থাকেন। গ্লুকোকর্টিকয়েড হরমোন- এর কাজ হল দেহের শর্করা, ফ্যাট জাতীয় খাদ্যের বিপাক ঘটানো। রক্তে কর্টিসল বেশি থাকলে - হাত পায়ের মানশ পেশীতে টান ধরা, মুখের মধ্যে চাপ চাপ ভাব বা দেখতে বৃত্তাকার মনে হওয়া(মুন ফেস), বাতের ব্যাথার মত ব্যাথা হওয়া,ত্বকে পিম্পল, রক্তবর্ণ লম্বা দাগ দেখা দেওয়া, পেশী দুর্বলতা – দুশ্চিন্তা,বিষণ্নতা বা বিরক্ত হিসাবে দেখতে লাগা। জলতেষ্টা বৃদ্ধি এবং ইউরিন ফ্রিকোয়েন্সি বেশি হওয়া। দীর্ঘ দিন কর্টিসল হরমোন বেশি নিঃসরণ হলে যৌনক্ষমতা হ্রাস পাওয়া, মহিলাদের বিভিন্ন শারীরিক অসুবিধা বা ইত্যাদি সহ পুরুষ মহিলা উভয়ের ক্ষেত্রে সাময়িক বন্ধ্যাত্ব দেখা দিতে পারে । সেই সাথে হতে পারে উচ্চরক্তচাপ,ডায়াবেটিস,মাইগ্রেনের মত মাথা ব্যাথা ইত্যাদি আরও অনেক জঠিল সমস্যা। সবসময় ক্লান্ত, অবসন্ন,নিদ্রাহীনতা ইত্যাদি হতে দেখা যায় । এই জন্য বিজ্ঞানিরা দেখিয়েছেন  , মানুষ যে মুহূর্তে খুব খুশি থাকে এবং মানসিক ভাবে সুন্দর অনুভূতিগুলো জাগ্রত হয় তখন কর্টিসল নামের স্ট্রেস হরমোন কম নিঃসৃত হয়। আর এই হরমোন নিয়ন্ত্রণে রাখা গেলে দীর্ঘায়ু লাভ করা যায়। শুধু মানসিক সুখই নয়, যাদের কর্টিসেল হরমোনের প্রভাব কম থাকবে তাদের রোগ সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করার ক্ষমতা বেশি থাকে বা স্বাভাবিক কোন ধরনের সমস্যায় তেমন ভয় হয় না বা চিন্তামুক্ত মানুষ বলা হয়। এমনিতেই যে যত বেশি মানসিক দুশ্চিন্তা করবে তার কর্টিসল হরমোনের মাত্রা বৃদ্ধি পাবে। তাই কর্টিসল হরমোন থেকে মুক্ত থাকতে হলে যতটা সম্ভব চিন্তামুক্ত বা যে কোন মানসিক চাপ মুক্ত থাকতে হবে । সে জন্য হাই প্রেসার, ডায়াবেটিস ইত্যাদি যেকোন রোগীকে মানসিক চিন্তা মুক্ত থাকতে বলা হয়। রক্তে স্বাভাবিক মাত্রা ৬- ২৩ মাইকোগ্রাম/ডেসিলিটার হচ্ছে নর্মাল ভ্যালু । স্ট্রেস হরমোন হলো তিনটি। কর্টিসোল (একে স্ট্রেস হরমোনও বলে), এপিনেফ্রিন (অ্যাড্রিনালিন নামেও পরিচিত) এবং ডোপাক, একটি ডোপামিন ক্যাটবলাইট (মস্তিষ্কের এই রাসায়নিক এপিনেফ্রিন তৈরিতে সহায়ক) । প্রমান স্বরূপ দেখানো হয়েছে মানুষের এই হরমোন সমুহ হ্রাস করে ৩৯ -৭০% দুশ্চিন্তা মুক্ত করে রাখা সম্ভব। প্রতিরোধ হিসাবে হাসি মজায় থাকলে এই তিনটি স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা কমে আসে ৩০-৪০%।  (মেডিক্যাল ইনফো টেক এন্ড স্ট্রেস রিলিভ মেথড) তাই যাদের রক্তের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে কর্টিসল হরমোনের মাত্রা বেশি থাকে তাদের কুশিং সিনড্রোম হয় । যদিও অনেক সময় পিটুইটারী গ্ল্যান্ডের টিউমারের কারণেও বাড়তে দেখা যায় অর্থাৎ যেকোনো ধরনের শারীরিক বা মানসিক চাপ শরীরে কর্টিসল হরমোনের নিঃসরণ বাড়ায় এবং ক্রমে তা কুশিং সিনড্রোম অসুখে পরিণত হয়। (করটিসল গ্রন্থি রস স্থায়ীভাবে নিঃসরণে অভ্যাস হয়ে গেলে বা স্ট্রেস স্থায়ী ভাবে হয়ে গেলে ২০- ৫০ বয়সের যে কোনো মানুষের মধ্যে ক্রনিক স্ট্রেস দেখা দেয়। রক্ত পরীক্ষায় যদি প্রতি লিটারে পঞ্চাশ ন্যানো মোল -এর চেয়ে এর মাত্রা কম কম থাকে তা হলে মনে করা হয় তা কুশিং সিনড্রোম নয় বা বা ইউরিন পরীক্ষায় যদি চব্বিশ ঘণ্টার ইউরিন নমুনায় কর্টিসোলের মাত্রা ২৫০ হয় তাহলে কুশিং সিনড্রোম নয়। সাধারণত এক মিলিগ্রাম ডেক্সামিথাসোন ট্যাবলেট মুখে খাইয়ে দিয়ে আবার কর্টিসোলের রক্ত-মান নিরূপন করার কথা বলা হয়ে থাকে বা ৪৮ ঘণ্টার ডেক্সামিথাসোন সাপ্রেশান টেস্ট এবং কর্টিসোল নিঃসরণের সারকাডিয়ান ছন্দ অনুমান করে কুশিং সিনড্রোম শনাক্ত করণ করা হয়ে থাকে । তবে অ্যাড্রেনাল গ্রন্থির টিউমারের বেলায় (এন্ডোজেনাস কুশিং সিনড্রোম) প্রয়োজনে সার্জারির প্রয়োজন হয় অনেকের।  যারা অনেক দিন এই জাতীয় অসুখে আক্রান্ত তারা চিকিৎসা বা মন মেজাজের পরিবর্তন না ঘটালে হাড় ভেঙ্গে যাওয়ার মত অসুখ (অস্টিওপোরোসিস ) উচ্চ রক্ত চাপ, ডায়াবেটিস, ঘন ঘন বা অস্বাভাবিক সংক্রমণ – পেশী পাতলা বা শক্তি ক্ষয় ও যৌন ক্ষমতা স্থায়ী ভাবে হ্রাস সহ যে কোন মারাত্মক অসুখে ভুগতে পারেন
প্রিভেনশন - মোটা হওয়ার জন্য অনেকেই স্টেরয়েড খেতে চান – এটা খুব মারাত্মক কারণ দীর্ঘদিন স্টেরয়েড খাওয়ার ফলে মারাত্মক কুশিং সিনড্রোমে আক্রান্ত হতে হয়। যারা অ্যাস্থমা বা অন্যান্য অসুখের কারনে স্টেরয়েড খেয়ে থাকেন তাদের  চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া একটা ট্যাবলেটও না খাওয়া ভালো। 

 "সুখী থাকুন আর জীবন উপভোগ করুন
 খেয়াল রাখুন যাতে দূর হটে স্ট্রেস হরমোন।"

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

সোমবার, ২২ আগস্ট, ২০২২

শিরোনাম - সহানুভূতি ✍️ডা: অরুণিমা দাস

শিরোনাম - সহানুভূতি
✍️ডা: অরুণিমা দাস

কি এমন হয়েছিলো যে কপালে এমন ক্ষত হলো? ডা: ঘোষ ব্যান্ডেজ করতে করতে জিজ্ঞেস করলেন মনামিকে। ওই নিজেদের মধ্যে একটু কথা কাটা কাটি, মিসআন্ডারস্ট্যান্ডিং এসব আর কি! আপনাদের তো রিসেন্ট বিয়ে হয়েছে, এর মধ্যেই এতো আন্ডারস্ট্যান্ডিং এর প্রবলেম? মনামি বললো আসলে আমার হাসব্যান্ড সুনন্দ প্রতি মাসের শেষের দিকে কোথাও একটা যায়,বেশ কিছু টাকা উড়িয়ে আসে। আমার এক বন্ধু ওকে দেখেছে খারাপ এলাকায়। আচ্ছা, তাই নাকি? আপনি কোনোদিন ওনার কাছে জানতে চান নি উনি কোথায় যান? কি করেন টাকা নিয়ে? জানতে চাইলেই বলে আমার ওপর ভরসা রাখো,আমি কোনো বাজে কাজ করছি না! গতকাল আমি জোর করে জানতে চাই ওর কাছে, কোথায় যায়? কি করে? কার সাথে সম্পর্ক ওর যে ওই এলাকায় যেতে হয়? এসব শুনেই সুনন্দ রেগে গিয়ে আমাকে ধাক্কা মারে আর টেবিলের কোণে মাথাটা লেগে কপালটা কেটে যায় আমার। অন্যের কথায় স্বামীকে ভুল বুঝলে তুমি? সুনন্দ ডা: ঘোষের চেম্বারে ঢুকতে ঢুকতে বলে। আরে আপনি? আসুন বসুন। ডা: ঘোষ বললেন সুনন্দকে। হ্যা বসছি, আপনি তাহলে পরের মাস থেকে যাচ্ছেন তো ওখানে? হ্যা নিশ্চই যাবো,এতো ভালো কাজের সুযোগ পেয়েছি, আমি অবশ্যই যাবো। মনামি হা করে সুনন্দ আর ডা: ঘোষের কথা শোনে। সুনন্দ কে ডা: ঘোষ বলেন ওনাকে আর অন্ধকারে রেখে লাভ নেই। বলে দিন সব কথা। কি কথা সুনন্দ? মনামি জানতে চায়। সুনন্দ বলতে শুরু করে - আমি একদিন অফিস থেকে ড্রাইভ করে ফিরছিলাম, এক ভদ্রমহিলা আমার গাড়ির সামনে এসে পড়েন আচমকা। আমি ব্রেক কষে গাড়ী থামিয়ে দিই, উনি একটুর জন্য রক্ষা পান। গাড়ি থেকে নেমে যখন ওনার কাছে যাই, ওনার সাজ পোশাক আমার খুব উগ্র মনে হয়েছিলো। কথাবার্তাও লো কোয়ালিটির। আমায় বলছিলো তুই আজ আমার রাতের খদ্দের। আমি চমকে উঠে বলি কি বলছেন এসব? উনি বললেন এই লাইনে অনেকদিন আছি। কারোর অতিরিক্ত লালসার স্বীকার হয়ে দুটো বাচ্চা জন্ম দিয়েছি। আজকাল শুধু বাচ্চা দুটোর জন্য নিজেকে সাজিয়ে পেশ করি খদ্দেরের কাছে। সব শুনে আমার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছিলো তখন। সামলে নিয়ে বললাম উঠুন গাড়িতে, আপনার বাচ্চাদের দেখে আসি চলুন। গিয়ে দেখি ওই নোংরা পরিবেশে বাচ্চা গুলো ভালো নেই। ওনাকে বলি বাচ্চাগুলোকে অন্য জায়গায় রাখুন, ওদের পড়াশোনা থাকার খরচ আমি দেবো প্রতি মাসে। এই অন্ধকার জায়গা থেকে ওদের সরিয়ে নিয়ে যান, নয়তো ওদের জীবন শেষ হয়ে যাবে। আপনি কেনো এত করছেন বাবু ওদের জন্য? কেউ তো হয় না ওরা আপনার। মুখে বললাম সব প্রশ্নের উত্তর হয় না! মনে মনে ভাবলাম আমিও তো অনাথ আশ্রমে মানুষ হয়েছি,আমার মাও এরকম কেউ ছিলেন হয়তো! আমি বুঝি বাচ্চা গুলোর কষ্ট টা, তাই আমি চাই না ওরা এভাবে নোংরা পরিবেশে থাকুক। এতোটা বলে সুনন্দ থামলো। 
মনামির চোখে জল! সুনন্দর হাত ধরে বললো খুব ভুল হয়ে গেছে আমার, আমি তোমায় ভুল বুঝেছিলাম। তুমি অনেক বড়ো মনের মানুষ। তোমাকে স্বামী হিসেবে পেয়ে আমি ধন্য। ডা: ঘোষ চেম্বার ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন, সুনন্দ বললো পরের মাস থেকে আমি যেখানে যাই, ওখানকার মানুষদের চিকিৎসার জন্য আপনি যাচ্ছেন তো? ডা:ঘোষ বললেন নিশ্চয়ই যাবো, ওনারা এই সমাজের অঙ্গ, ওনাদের ভালো থাকাটা দরকার। আমি আছি আপনার পাশে। থ্যাংক ইউ ডা:ঘোষ, সুনন্দ বললো। 
ওই অন্ধকারে কেউ নিজের ইচ্ছেয় নিমজ্জিত হয় না,পরিবেশ পরিস্থিতি বাধ্য করে। মনামি বললো সরি সুনন্দ ভেরি সরি! ইটস ওকে, চলো বাড়ি যাই, আমাদের সম্পর্ক টা রিনিউ করে আবার নতুন করে শুরু করি। মনামি এগিয়ে চলে সুনন্দর হাত ধরে,সব ভুল বোঝাবুঝিকে দূরে সরিয়ে রেখে। 

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

বৃহস্পতিবার, ১১ আগস্ট, ২০২২

হাসির আড়ালে শিরোনাম_ জীবন সংগ্রাম. ✍️ ডা: অরুণিমা দাস


হাসির আড়ালে
শিরোনাম_ জীবন সংগ্রাম
✍️ডা: অরুণিমা দাস

সার্জারীতে ইন্টার্নশিপ চলছে তখন। প্রথম দিনই নাইট ডিউটি পড়েছে। সিনিয়র দের কাছে শুনেছি রাতে বেশির ভাগ খারাপ পেশেন্ট আসে। মাতাল থেকে শুরু করে সব রকমের পেশেন্ট, কারোর মাথা ফাটা তো কারোর হাতে পায়ে স্টিচ লাগবে। আর বেশির ভাগ লোকের হুশ থাকে না, অভব্য ব্যবহার ও করে অনেক লোক। প্রথম দিন, বলা ভালো প্রথম রাতে ডিউটি তে গেছি বেশ ভয় নিয়েই, কো ইন্টার্ন বললো শোন আমার রাতে তিন ঘণ্টা অফ লাগবে। কি রাজকার্য করবি শুনি? বললো আমার নামাজ পড়তে যেতে হবে। মনে মনে বললাম হতচ্ছাড়া। মুখে বললাম যাস,কিন্তু খারাপ পেশেন্ট এলে কী করবো? বললো স্বপন দাকে ডেকে নিস এসে হাসি মুখে সব সামলে দেবে। স্বপন দা কে রে? গ্রুপ ডি দাদা আমাদের ওয়ার্ডের, ভালো মানুষ খুব। কথা বলতে বলতেই ডিউটি রুমের দরজায় কড়া নাড়ল কেউ। খুলে দেখি একজন রোগা মত লোক দাঁড়িয়ে আছে এক মুখ হাসি নিয়ে। বুঝলাম ইনি স্বপনদা। ঢুকে বললো ম্যাডাম স্যার নতুন পেশেন্ট এসেছে। গেলাম ওয়ার্ডে, একটা ছেলে হাত কেটে ফেলেছে কাজ করতে গিয়ে,তাই স্টিচ করাতে এসেছে। স্টিচ করে ড্রেসিং করে ছেড়ে দিলাম ওকে। তারপর ওয়ার্ডে পেন্ডিং কাজ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। সিস্টার দিদিরা নিজেদের মধ্যে গল্প হাসি ঠাট্টা করছিল। কথায় কথায় স্বপনদার প্রসঙ্গ আসাতে একজন সিস্টার বলে উঠলো মানুষটা এত হাসি খুশি থাকে,সবাইকে ভালো রাখতে চেষ্টা করে, রোগীদেরকে ভালোবাসে কিন্তু একবুক কষ্ট ওনার জমে আছে যা কমার নয় কোনোদিন। জিজ্ঞেস করলাম কি হয়েছিল দিদি? বললেন স্বপনদার ছেলে দুটো যখন বেশ ছোটো, তখন ওনার স্ত্রীর ক্যান্সার ধরা পড়ে। অ্যাডভান্সড স্টেজ ছিল, মাস ছয়েক উনি বেঁচে ছিলেন। তারপর ছেলে দুটোকে নিয়ে একার লড়াই শুরু হয় ওনার। শতকষ্টের মধ্যে দিয়ে গেলেও কোনোদিন দ্বিতীয় বিয়ের কথা ভাবেননি যদি নতুন কেউ এসে সংসারে ভাঙন ধরিয়ে দেয়। হাসি মুখে ঘরে বাইরে লড়ে গেছেন। এখন ছেলে গুলো বেশ বড়ো হয়েছে, একজনকে ওষুধের দোকান করে দিয়েছেন আর একজন কলেজে পড়ে। শুনে বেশ খারাপ লাগছিলো, জীবন যে কখন কাকে কোথায় নিয়ে যাবে কেউ জানেনা। এসব গল্প গুজব করতে করতে নেক্সট পেশেন্ট এসে হাজির। সাথে সাথে স্বপনদাও হাজির হাসি মুখে। পেশেন্ট ছিলো মাতাল, বাইক থেকে পড়ে গিয়ে হাত পা কেটেছে, ভুলভাল বকছেও। উঠে গিয়ে আগে পেশেন্টের মাথায় চোট আছে কিনা দেখলাম। সাথে আসা লোক দুটো বলে উঠলো আগে হাত পা দেখ, পরে মাথা দেখিস। আমি কিছু বলার আগেই স্বপন দা বলে উঠলো আগে ঠিক করে কথা বলুন নয়তো আপনার রোগী কে দেখা হবে না। তখন চুপ করলো তারা। একটা সি টি স্ক্যান এডভাইস দিয়ে আর ড্রেসিং করে ডিউটি রুমে এলাম। কো ইন্টার্ন তখন নামাজ পড়ে ফিরে এসেছে। বললাম স্বপন দা মানুষটা বেশ ভালো। মিষ্টি করে হাসে আর সেই হাসির আড়ালে জমে থাকে অনেক না বলা কথা। শুনে ঘাড় নাড়লো কো ইন্টার্ন। দুমাস সার্জারি পোস্টিং বেশ ভালোই কেটেছিল। ভালো খারাপ যেমন পেশেন্টই আসুক না কেনো হাসি মুখে স্বপনদা হাজির হতো। অনেকদিন হয়ে গেছে আর পুরনো কলেজে যাওয়া হয় না, আশা করি ভালোই আছেন স্বপনদা। এসব মানুষের জন্য হেকটিক ইন্টার্নশিপ অনেকটা হালকা হয়ে যেতো। 

সত্য ঘটনা অবলম্বনে

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

মঙ্গলবার, ৯ আগস্ট, ২০২২

রক্তের টান✍️ডা: অরুণিমা দাস

রক্তের টান
✍️ডা: অরুণিমা দাস

সন্ধ্যে ছটা বাজে প্রায়। গাইনি ওটির বাইরে অস্থির ভাবে পায়চারী করছে অনিল আর ওর মা বাবা। ওটির মধ্যে অনিলের স্ত্রী রিক্তার সিজার চলছে। সবার মুখে চিন্তার ছাপ। প্রায় আধঘন্টা পরে সিস্টার তোয়ালে মোড়া জ্যান্ত পুতুল এনে তুলে দিল অনিলের হাতে। ওর মা বাবা ছুটে এলেন, বললেন কী হয়েছে সিস্টার! ছেলে না মেয়ে? সিস্টার কিছুক্ষন চুপ করে রইলো, তারপর বললো স্যার এসে আপনাদের জানাবেন সবটা। অনিলের মা বললো ছেলে না মেয়ে সেটা স্যার জানাবেন? কেনো আপনি বলতে পারছেন না? সিস্টার চুপ করে বাচ্চাটাকে অনিলের হাত থেকে নিয়ে চলে গেলো। কিছুসময় পরে ডা: ঘোষ ওটি থেকে বেরিয়ে এসে বললেন আপনারা আমার চেম্বারে আসুন,কিছু কথা আছে। অনিল আর ওর মা বাবা গেলো ডা ঘোষের চেম্বারে। ডা: ঘোষ জানালেন যে বাচ্চা জন্মেছে, অ্যাম্বিগুয়াস জেনিটালিয়া নিয়ে মানে ছেলের মত দেখতে হলেও ভেতরকার অঙ্গ গুলো মেয়ের মতো। একটা সেক্স চেঞ্জ অপারেশন করে হয়তো জিনিসটা ঠিক করা যাবে। অনিলের মা হঠাৎ করে বলে উঠলেন আচ্ছা বুঝেছি, তৃতীয় লিঙ্গের জন্ম দিয়েছে রিক্তা। আমি মেনে নেবো না এই সন্তানকে, সাফ জানিয়ে দিলাম তোমাদের। অনিল কিছু বলতে যাচ্ছিলো! ওর মা বললো নয় ওই বাড়িতে আমি থাকবো নাহলে ওই পাপ থাকবে। এবার তুই ঠিক কর কি করবি খোকা? অনিল বুকের ওপর পাথর চাপা দিয়ে মায়ের আদেশ মেনে নিল। নিজের মাকেই আজ তার কেমন যেন অচেনা লাগছে। কি করে এরকম করতে পারে ওর মা? নিজের ছেলের অংশকে এভাবে অস্বীকার করতে পারছে মা? যেটা কোনোদিন মায়ের কাছে আশা করেনি কোনোদিন সে। কিন্তু মায়ের কাছে তখন মনুষ্যত্বের চেয়ে বংশ মর্যাদা বেশী বড়ো হয়ে উঠেছিল। রিক্তাকে জ্ঞান ফেরার পর জানানো হলো সব। শ্বাশুড়ী মায়ের পায়ে ধরেও নিজের সন্তানকে নিজের কাছে রাখতে পারেনি সে। 
এরপর মাঝে বছর পনেরো কেটে গেছে। অনিল আর রিক্তার কোল আলো করে ছেলে এসেছে। অনিলের মায়েরও বেশ বয়স হয়েছে। একদিন রাস্তা পার হবার সময় পাথরে হোচট খেয়ে পড়ে যান উনি। একটা গাড়ী এসে আচমকা ধাক্কা মারে। মাথা ফেটে বেশ রক্ত ক্ষরণ হয়। রাস্তার লোকেরা জড়ো হয় কিন্তু কেউ ওনাকে হাসপাতালে নিয়ে যায় না পুলিশ কেস হবে এই ভয়ে। ভিড় ঠেলে এগিয়ে আসে এক মহানুভব, বলে আপনারা সরুন এখান থেকে আমি ওনাকে হাসপাতালে নিয়ে যাবো। হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে জানতে পারে বেশ গুরুতর চোট ওনার মাথায়, স্টিচ দিতে হবে আর এক ইউনিট রক্তও দিতে লাগবে। অনিল বাবু রিক্তা তখন এসে হাজির কিন্তু রক্তের গ্রুপ মেলে না। সেই মহানুভব এগিয়ে এসে বলে আমার গ্রুপের সাথে মিলে গেলে আমি রক্ত দিয়ে দেবো। অনিল বাবু বললেন আপনার নাম? বললো নীলাভ, আমি কিন্তু স্বাভাবিক মানুষ নই, তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ। অনিল বাবু এক মুহূর্ত না ভেবেই নীলাভ র রক্ত মাকে দেওয়ার জন্য রাজী হলো। পরে যখন জ্ঞান ফিরলো অনিল বাবুর মায়ের,তখন জানতে পারলেন এক তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তি তাকে রক্ত দিয়েছে! শুনে দু চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল আর হয়তো বছর পনেরোর আগের দিনটি মনে পড়ছিল যেদিন তিনি অস্বীকার করেছিলেন তার বংশপ্রদীপকে। আর ঈশ্বর ছাড়া কেউ জানলো না যে এই নীলাভই সেই সন্তান। কিছু কিছু সম্পর্কের সমীকরণ ওলট পালট হয়ে গিয়েও শেষ অব্দি সিড়িভাঙা অঙ্কের মত মিলে যায়,হয়তো আমাদের অজান্তেই। 

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

জীবন শুধুই গতিময় ✍️ ডা: অরুণিমা দাস

জীবন শুধুই গতিময় 
✍️ ডা: অরুণিমা দাস

এই জগৎ স্থিতিশীল নয়। অনন্তকাল ধরে এটি চলবে মহাকালের গতি যেদিন থেমে যাবে সেদিন ঘটবে মহাপ্রলয়। এই যাত্রা পথে আমাদের জীবনও তাই এবং ভবিষ্যতেও গতিশীল। গতিশীলতার মধ্যেই ফুটে ওঠে জীবনের লক্ষণ। সংগ্রাম পূর্ণ আমাদের জীবন। জীবনে বেঁচে থাকতে হলে কাজের প্রয়োজন। কর্মই মানুষকে গতিশীল রাখে। অলস মানুষেরা সমাজে জীবন্মৃত অবস্থায় পড়ে থাকে। স্রোতস্বিনী নদীর জলের বয়ে চলার জন্য সেখানে শেওলা জমাতে পারে না। কিন্তু স্রোতহীন নদী শেওলায় ভরে যায় এবং এতে জল নষ্ট হয়ে ব্যহারের অযোগ্য হয়। তেমনি কর্মময় জীবনই হচ্ছে জীবন। কর্মহীন জীবন মৃত্যুর নামান্তর। এ পৃথিবী হচ্ছে এক বিরাট রণক্ষেত্র। সংগ্রাম করে,যুদ্ধ করে এখানে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হয়। ডারউইন বলেছেন, "প্রকৃতির জগতে যে অধিকতর যোগ্য সেই টিকে থাকবে।" অথাৎ পৃথিবীতে বাঁচতে হলে, টিকে থাকতে হলে সংগ্রাম করেই টিকে থাকতে হবে। দৃষ্টি রাখতে হবে সামনের দিকে, পেছনের দিকে নয়। চিন্তা,চেতনায় যারা অগ্রসর তারাই এগিয়ে যায় প্রগতির পথে আর তারাই আনে বিবর্তন, সৃষ্টি করে নতুন সভ্যতা। মানুষের কল্যাণের জন্য তারাই আবিষ্কার করে নতুন নতুন উপাদন। আর যারা কর্মহীন তারা জড় পদার্থের মত অচল। এরা কোন উপকারেই তো আসেই না বরং অপরের চলার গতিকে ব্যাহত করে। তাই এরা যেমন উপেক্ষিত তেমনি অবাঞ্চিত।
কর্মহীন জীবন কোন মানুষেরই কাম্য হতে পারে না। এতে করে মানুষ অচল ও অসাড় হয়ে পড়ে। কাজই মানুষের জীবনে আনবে গতি। যে গতিতে মানুষ জীবনের অর্থ খুঁজে পাবে। এগিয়ে চলাই জীবন, থেমে যাওয়া যে মরণ। 
ছোট্ট একটা গল্প দিয়ে শেষ করবো। এক মেয়ের গল্প যে ফার্স্ট ইয়ার এমবিবিএস এ এনাটমি বায়োকেমিস্ট্রি আর ফিজিওলজি দেখে ঘাবড়ে গেছিলো, ভেবেছিল মেডিক্যাল পড়া ছেড়েই দেবে। ভয়ে কোনো ক্লাসে যেত না। ফল স্বরূপ ফাইনাল এক্সাম এনাটমি, বায়োকেমিস্ট্রিতে সাপ্লি পেলো। বন্ধুরা দূরে সরে গেলো। ম্যাডাম দেখা হলে বলতো এই যে দুটো সাবজেক্টে ফেল করলি পোস্ট গ্রাজুয়েট এন্ট্রান্স এক্সাম দিতে অসুবিধে হবে। ফাইনাল ইয়ারে চারটে সাবজেক্ট। কি করে পাস করবি? মুখে ক্রুর হাসি। চুপ করে সব কথা হজম করেছিল মেয়েটি সেদিন। বন্ধুরা সব সেকেন্ড ইয়ারে উঠে গেছে। প্যাথলজি, মাইক্রোবায়োলজি, ফার্মাকোলজি পড়া শুরু করেছে আর সে! তখনি এনাটমি আর বায়োকেমিস্ট্রির মাঝে স্যান্ডউইচ হচ্ছে প্রতিদিন। তিনমাস পর সাপ্লি এক্সামের ডেট এলো। পরীক্ষা দিয়ে এলো কোনো রকমে। দুটো সাবজেক্টের ম্যাডাম গম্ভীর ভাবে পরীক্ষা নিলো। পাস না ফেল কিছু বোঝা গেলো না। যাইহোক কোনো রকমে পাস হলো সে সাপ্লি এক্সামে। এদিকে সেকেন্ড ইয়ারে তিনমাসে তখন ক্লাস অনেক এগিয়ে গেছে। কেউ কেউ কোলকাতা গিয়ে কোচিং নিচ্ছে। মেয়েটি কলেজেরই এক স্যারের কাছে প্যাথলজি কোচিং নিতে ভর্তি হলো। বাকি সাবজেক্ট নিজেই পড়তো। হাল ছেড়ে দেয়নি কোনোদিন সে। মোটামুটি যখন প্যাথলজিটা আয়ত্ত করেছে স্যার বললেন এক্সট্রা নোটস দেবো, পড়তে পারবি? কোনোকিছু না ভেবেই হ্যা বলে দিলো মেয়েটি। প্যাথলজি প্রাকটিক্যাল খাতায় যে স্লাইড গুলো  আঁকতো মেয়েটি স্যাররা ভেরি গুড বলতেন। সাইন করে গুড লিখেও দিতেন। দিন এমন এলো যে একটা সাপ্লি পাওয়া মেয়ের কাছে বেশি মার্কস নিয়ে পাস করা বন্ধুরা আসতো স্লাইডের ছবি কারেক্ট করাতে। সেকেন্ড ইয়ারে ওই ল্যাগ যাওয়া তিনমাসের পড়া পড়ে পাস করতে কোনো কষ্ট হয়নি সেরকম। কারণ মেয়েটি কোনোদিন থেমে থাকেনি। বায়োকেমিস্ট্রি ম্যাম আবার খোজ নিয়েছিলেন মেয়েটি ফার্মাকোলজিতে পাস করেছে কিনা! কারণ ওনার ধারণা ছিল বায়োকেমিস্ট্রি তে ফেল করলে ফার্মাকোলজি তে ফেল অবধারিত। এরকম সব টিচার হলে কী আর বলা যায়!
যাইহোক এরপর আর কোনো সাপ্লি জোটেনি মেয়েটির ভাগ্যে। প্রতি ইয়ারে ফাইনাল এক্সামে স্যার ম্যাম সবাই জিজ্ঞেস করতেন মেয়েটিকে, "তোকে সাপ্লি কে দিয়েছিলো রে?" মেয়েটি হাসি মুখে এড়িয়ে যেতো সেই প্রশ্ন। ফাইনাল ইয়ার পাস করে ইন্টার্নশিপ শেষে যখন গাইনি তে হাউসস্টাফশিপ করতে ঢুকলো মেয়েটি,গাইনির স্যার বলেছিলেন একি কাজ পারবে? মনে হয় না খুব ভালো কাজ পারবে! এরপর একবছর হাউস স্টাফ শিপ শেষে সেই স্যারই বলেছিলেন আরো তিনটে মাস রিনিউ করে এই ইউনিটে থেকে যা না! মেয়েটি নাকচ করেছিল পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন এক্সামের প্রিপারেশন নেবে বলে! তারপর লড়াই করে পোস্ট গ্রাজুয়েশন এন্ট্রান্স এক্সাম ক্লিয়ার করার পর একদিন কলেজে আন্ডার গ্রাজুয়েট ডিগ্রী সার্টিফিকেট আনতে গিয়ে সেই বায়োকেমিস্ট্রি ম্যামের সাথে দেখা। ম্যাম রেজাল্ট জেনেছিলেন কোথাও থেকে। চলে যাচ্ছিলেন মুখ লুকিয়ে। মেয়েটি গিয়ে প্রণাম করে বলেছিল "ভালো আছেন ম্যাম?" ম্যাম বললো হ্যা রে! তোর এমডি ক্লাস কবে থেকে শুরু হবে? কোন কলেজ হলো জানাস। সেদিন আর ক্রুর হাসি নেই ম্যামের মুখে। অনুতাপের ছোঁয়া লেগেছিল মুখে। সেদিন ম্যামকে ক্যান্টিনে নিয়ে গিয়ে মিষ্টি খাইয়েছিল মেয়েটি। আজও ম্যাম ফোন করলে হাসি মুখে কথা বলে মেয়েটি,এটাই যে ভদ্রতা। যে ম্যাম একদিন সাপ্লি নিয়ে হেসেছিল সে আজ বলেন বাবু এরপর সুপার স্পেশালিটিটা করতে হবে! তুই পারবি। লড়াই চালিয়ে যাবি, হাল ছেড়ে দিবি না কিন্তু। মেয়েটি বলে চেষ্টা করবো ম্যাম,জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত লড়াই করে যাবো,বিশ্রাম নেবার জন্য স্থির সময় তো ভগবান ঠিক করে রেখেছেনই! ম্যাম চুপ করে শোনেন সে কথা। 
"চলুক লড়াই জীবনে প্রতিপদে এগিয়ে যাওয়ার
বিশ্রামের জন্য মাটির নিচে জায়গা করা আছে সবার।"

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

বিষয় - চিত্রালোচনা



 চিত্র ১

দুই পাখির (ডোডো আর জুডো) কথোপকথন
✍️ ডা: অরুণিমা দাস

ডোডো: বেশ তো বসেছিস ফুলের কোলে, মধু সব নিলি নাকি
জুডো: এরকম ভাবলি কি করে, তোকে কি কোনোদিন দিয়েছি ফাঁকি!

ডোডো : ভুলেই গেছিলাম আমরা যে পাখি, নই রং বদলানো স্বার্থপর মানুষ
জুডো : মানুষ হতে চাই না মোরা,পাখি হয়েই আমাদের দিল খুশ। 

ডোডো : নেই কোনো মারামারি,হিংসা আর হানাহানি
জুডো: আছে এক বড়ো মন আমাদের,তাতেই মোরা খুশি জানি।


 চিত্র ২

 সমুদ্র ও চাঁদের কথোপকথন
✍️ডা: অরুণিমা দাস


সমুদ্র : কি মনে করে চন্দ্রা দেবী আজ এলে মোর তটে নামি
চাঁদ : লাগেনা ভালো আকাশের বুকে থাকতে,মন চায় ছুঁতে ধরা ভূমি!

সমুদ্র: হোক তবে আজ ছোঁয়া ছুয়ির খেলা, আসো আলিঙ্গন করি পরস্পরকে
চাঁদ: তাই করি চলো, তোমার স্পর্শ মুছুক মোর কলঙ্ককে।

সমুদ্র: জোৎস্না রাতে চায় সকলে তোমার আলোয় স্নাত হতে কলঙ্ক সব ভুলে,এ যে  বড়ো পাওনা তোমার
চাঁদ: ভাবিনি তো কখনো এভাবে,তোমার কথা জাগালো আশা,খোঁজ পেলাম নতুন দিশার।

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

বৃহস্পতিবার, ৪ আগস্ট, ২০২২

চাই না খ্যাতি,মানুষ হয়ে বাঁচতে চাই ✍️ ডা: অরুণিমা দাস

চাই না খ্যাতি,মানুষ হয়ে বাঁচতে চাই
✍️ ডা: অরুণিমা দাস

আজকেই ঘটে যাওয়া একটা ঘটনা বলি, হয়তো আজকের বিষয়ের সাথে কিছুটা হলেও মিল পাওয়া যাবে। 
আজকের ওটি তে ঘটা একটা ঘটনা শেয়ার করতে চলেছি। ছোট্ট ছয় বছরের বাচ্চা এসেছে যার নাকের হাড় বাঁকা, আমাদের ভাষায় ডেভিয়েটেড নাসাল সেপটাম বলে যাকে। বাচ্চাটার আস্থমার হিস্ট্রি ছিল। শ্বাসকষ্ট হতো মাঝে মধ্যে। সব জেনেও বর্তমানে অবস্থা স্থিতিশীল থাকার জন্য অজ্ঞান করে অপারেশন শুরু করা হয়। পেশেন্টকে ভেন্টিলেটরে দেওয়া হয়। বেশ কিছুক্ষন ওটি চলার পরে হঠাৎ বাচ্চাটির স্যাচুরেশন কমতে শুরু করে, আর মুখের টিউব দিয়ে গোলাপী রঙের ফেনা বেরোতে থাকে। আমরা সার্জেনদের ওটি বন্ধ করতে বলি সঙ্গে সঙ্গে। আমাদের স্যার এসে আমাকে যা নয় তাই বলে ঝাড়তে শুরু করেন। কাঁদো কাঁদো অবস্থা তখন আমার। সিনিয়ররা কেউ খুব একটা আমার সাপোর্টে কথা বলেনা প্রথমে। এরকম ঘটনা হবার কারণ খুঁজতে গিয়ে দেখা যায় ভেন্টিলেটর মেশিনে সমস্যা, তাই বাচ্চাটির শরীরে অক্সিজেন সরবরাহ কমে গিয়ে সাচুরেশন কমছিল আর তার ফলেই লাং ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ইডিমা ডেভেলপ করে। স্যার পরিষ্কার বলে দিলেন নিজের রেপুটেশন খারাপ করবেন না তাই এর সমস্ত দায় পি জি টি র ঘাড় দিয়েই যাবে। খুব কষ্ট হচ্ছিল তখন শুনে। নিজে বিখ্যাত বলে আজ সব দোষ পি জি টির, যাইহোক কিছু বলার নেই এতে। পি জি টি যখন ঘেমে নেয়ে ক্লান্ত হয়ে সব ম্যানেজমেন্ট করে পেশেন্ট কে স্ট্যাবল করে দিলো তখন স্যারের মুখের কথা চেঞ্জ, কার কাছে ট্রেনিং পাচ্ছিস দেখতে হবে তো! তখনো পি জি টি চুপ, কারণ স্যারের মুখের ওপর কথা বলা স্বভাব নয় তার। স্যার পরে অনেক করে ভালো কথা বললেও পি জি টি স্যারের সাথে আর একটাও কথা বলেনি। কেস খারাপ হলে দায় স্যার নেবেন না। আর ভালো হলে ক্রেডিট স্যারের। এরম ভাবে বিখ্যাত স্যার না হয়ে সাধারণ ভাবে জীবন কাটানো পি জি টির সম্মান অনেক বেশী আমার কাছে। খ্যাতির শীর্ষে উঠবো বলে মানুষকে মানুষ জ্ঞান করবো না, এরকম অমানুষ হয়ে বিখ্যাত হবার কোনো প্রয়োজন নেই আমার। টিম ওয়ার্ক করতে গেলে কোনো ডিসাস্টার হলে দোষ পুরো টীমের, কারোর একার নয়। যাই হোক শেষ অব্দি বাচ্চাটা ভালো আছে, বিকেলে গিয়ে দেখেও আসা হয়েছে। শেষ ভালো যার, সব ভালো তার। 
পরম করুনাময় ঈশ্বরের কাছে অসংখ্য ধন্যবাদ বিপদে পাশে থাকার জন্য আর মুখোশের আড়ালে থাকা মানুষের আসল রূপ গুলো দেখানোর জন্য।

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

মঙ্গলবার, ২৬ জুলাই, ২০২২

চিত্রালোচনা✍️ ডা: অরুণিমা দাস

চিত্রালোচনা
✍️ ডা: অরুণিমা দাস

চিত্র ১

আরশি সমুখে বসে আজ ভাবি আমি একাকী
অতীতের দিনগুলো পড়ছে মনে,স্মৃতিরা তো দেয়নি ফাঁকি।

চিত্র ২
নিশ্চিন্তে মাথা রাখি তোমার কাঁধে,এ যে ঠিকানা আমার ভরসার
জনম জনমের সুখ দুঃখের সাথী যে তুমি আমার।

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

রবিবার, ২৪ জুলাই, ২০২২

লাইফটাইম এক্সপেরিয়েন্স✍️ ডা: অরুণিমা দাস

লাইফটাইম এক্সপেরিয়েন্স
✍️ ডা: অরুণিমা দাস

আজ গাইনি ওটিতে বারোঘণ্টা ডিউটি । সকাল সকাল ফ্রেশ হয়ে ব্রেকফাস্ট করে হাজির হলাম ডিউটি রুমে। সাড়ে আটটা হবে হয়তো, ভাবলাম একটু রেস্ট নিয়ে নেই কখন ডাক আসবে কেস উঠছে বলে! ঘণ্টা খানেক শুয়েছি গাইনির আর এম ও স্যার এসে হাজির হলেন। বললেন একটা ঘাটা কেস উঠবে রে! বললাম হ্যা বলুন স্যার কি কেস? বললেন অ্যাবর্শন করাতে গিয়ে পেশেন্টের জরায়ু ফুটো হয়ে গেছে। সেখান দিয়ে ইন্টেস্টাইনাল পার্ট ঢুকে গিয়ে পেটে ইনফেকশন ছড়িয়ে গেছে। হাই ফিভার পেশেন্টের আর সেপসিস ডেভেলপ করেছে। বললাম ঠিক আছে, পেশেন্ট রেডী করুন,আমি হাই ডেফিনেশন এ গিয়ে পেশেন্ট দেখে নিচ্ছি আগে। এইচ ডি ইউ তে গেলাম, দেখি পেশেন্ট মাঝ বয়সী মহিলা, আগে দুটো সিজার হয়েছে। বললাম কেমন আছো এখন? বললে পেটে খুব ব্যথা। ইন্টার্ন কে বললাম জেলকো করেছিস? দু হাতে চ্যানেল করে রাখিস! বললো দিদি চ্যানেল করা যাচ্ছে না! রেগে বললাম আগে বলিসনি কেন? এখন পেশেন্ট কে ওটি তে তোলার আগে বলছিস? সিরিয়াস কবে হবি? প্রি লোড করার দরকার ছিল। চুপ করে রইলো। বললাম ওটি তে তোল, সেন্ট্রাল লাইন করবো। তারপর কেস আন্ডার করবো। পেশেন্ট টেবিলে উঠলো। সেন্ট্রাল লাইন করলাম সাবক্লাভিয়ান ভেইন এ। সেই লাইন পেটেন্ট হতে ড্রাগ আর ফ্লুইড দিয়ে পেশেন্ট আন্ডার করলাম। কেস শুরু হলো। ইনট্রা অপারেটিভ পিরিয়ডে পেশেন্ট ভালোই ছিল। ঠিক মতো করে এক্সটিউবেট করে পেশেন্ট রিভার্স করছি এমন সময় পাশের টেবিলে জুনিয়র স্পাইনাল দিয়ে পোস্ট সিজার পেশেন্ট কে আন্ডার করছিল। বললাম দেখে দিস ড্রাগ। পাশের টেবিলে পেশেন্ট আন্ডার হয়ে শুয়ে পড়েছে তখন, আমার টেবিলে পেশেন্ট রিভার্স হয়ে গেছে। হঠাৎ চোখ গেলো পাশের টেবিলের মনিটরে, রোগীর স্যাচুরেশন ৮৯%। জুনিয়রকে বললাম প্রোব লাগা ঠিক করে, প্রোব লাগানোর পরও স্যাচুরেশন বাড়লো না, বরং আরও কমতে লাগলো। আমার টেবিল ছেড়ে ছুটলাম আমি পাশের টেবিলে। গিয়ে পেশেন্টের মুখ থেকে অক্সিজেন মাস্ক সরিয়ে বেইন সার্কিট ধরে ব্যাগ মাস্ক কন্টিনিউ করা শুরু করলাম, তখন স্যাচুরেশন জিরো। পেশেন্টের তখন কোনো রেসপন্স নেই। পালস পাচ্ছি না, সি পি আর দিতে বললাম। ইন্টার্ন সি পি আর দেওয়া শুরু করলো। আর দেখি আমার জুনিয়র খেয়াল করেনি জেলকো এক্সট্রা হয়েছে। ফ্লুইড ঠিক মত না পাওয়ায় পেশেন্টের হাইপো টেনশন হয়েছে প্লাস টেবিলের মাথার দিক এতটা নীচু করেছে যে হাই স্পাইনাল হয়ে রেসপিরেটরি মাসল এফেক্ট হয়ে অ্যাপনিক হয়ে গেছে পেশেন্ট। কন্টিনিউয়াস সি পি আর এবং ব্যাগ মাস্ক করে পেশেন্টের স্যাচুরেশন ১০০ তে ওঠালাম। অ্যাট্রোপিন আর অ্যাড্রেনালিন দিলাম এক অ্যাম্পুল করে। হার্ট রেট বেশ খানিক বেড়েছিল। পেশেন্ট একটু স্টেবল হতেই গাইনি পি জি টি কে বললাম সিজার শুরু করো,নয়তো বাচ্চা খারাপ হবে। সিজার শুরু হলো,ঈশ্বরের কৃপায় বাচ্চা সুস্থ ভাবে পৃথিবীর আলো দেখলো। ততক্ষনে পেশেন্ট ও চোখ মেলে তাকিয়েছে, নাম জিজ্ঞেস করলাম! হেসে বললো বীথি। বললাম কেমন আছো? বললো ভালো আছি। গলার স্বর স্বাভাবিক হয়েছে দেখলাম। বললাম বাচ্চা ভালো আছে, তুমি চিন্তা করো না। জুনিয়রের দিকে তাকিয়ে বললাম সিরিয়াস হও। জেলকা এক্সট্রা এটা মেজর মিসটেক। সিনিয়র হও, বুঝবে কত চাপ! চুপ করে রইলো ও। পরে অবশ্য ওকে ভালো করে বুঝিয়েছিলাম কি ভুল থেকে কি কি ক্ষতি হতে পারে পেশেন্টের! বললো খেয়াল রাখবো। এরপর আর কি! ডিউটি থেকে ফেরার সময়ে এইচ ডি ইউ তে গিয়ে পেশেন্ট দুটোকে দেখে এলাম। দিব্যি আছে দেখলাম। মনে মনে ঈশ্বর কে ধন্যবাদ দিলাম। কোথা দিয়ে বারো ঘণ্টা কেটে গেছে খেয়ালই নেই। হোস্টেলের পথে পা বাড়ালাম, গিয়ে ঘুম দিতে হবে ভালো করে। 
                      I treat,he cures!
                  Thanks to almighty🙏

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

বৃহস্পতিবার, ২১ জুলাই, ২০২২

শিরোনাম- অবিজিত ✍️ডা: অরুণিমা দাস

শিরোনাম- অবিজিত
✍️ডা: অরুণিমা দাস



"অবজ্ঞা অবহেলা হাসিঠাট্টা তোমায় নিয়ে যে যতই করুক  
তোমায় কখনো যেনো থামাতে না পারে সেইসকল নিন্দুক।"

যারা কাজ করে ভুল তাদেরই হয়। আর যারা সেই ভুল নিয়ে হাসি তামাশা করে তাদের মত নীচু মানসিকতার লোকেরা এই দুনিয়ার কলঙ্ক। এসব হাসি মজা মাথায় রেখে সেগুলোকে পজিটিভ ওয়ে তে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার নাম ই চ্যালেঞ্জ। তাই লাইফ কে কখনোই বলা উচিত নয় "হোয়াই মি"! বলা উচিত "অলওয়েজ ট্রাই মি"!

আজ একজন এমন ব্যক্তির কথা বলতে চলেছি যার মস্তিষ্কের বিকাশ তার সমসাময়িক বাচ্চাদের মত ছিল না। কিছুটা ধীর গতিতে হচ্ছিলো। তার জন্য তাঁকে স্কুলে স্যার সহপাঠী দের উপহাসের পাত্র হতে হয়েছিলো। কিন্তু তাদের এই উপহাস তাঁকে আটকে রাখতে পারেনি কোনো গণ্ডিতে। একদিন ঠিক তার প্রতিভার বিকাশ ঘটেছিল আর সেই প্রতিভার জোরেই তিনি একদিন বিশ্ব বিখ্যাত বিজ্ঞানী হিসেবে পরিচিত হয়েছিলেন। 

অনেক বড় বিজ্ঞানী ছিলেন তিনি। জন্ম হয়েছিল ১৮৭৯ সালে জার্মানির মিউনিখ শহরে। অথচ এই বিজ্ঞানীর ছেলেবেলা ছিল একেবারেই সাদাসিধে এবং সম্ভাবনাহীন। কেউ তখন ভাবতেও পারেনি এই ছাপোষা ছেলেটিই বড় হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হবেন। এমনকি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় যে পুরস্কার, নোবেল প্রাইজ সেটাও তিনি পাবেন বিজ্ঞানের একটি থিওরি আবিষ্কার করে। এই ব্যাক্তি সর্বপ্রথম আলোচনায় আসেন একটি নিবন্ধ লিখে। নিবন্ধের বিষয় আপেক্ষিকতাবাদ। অথচ ভেবে দেখলে বোঝা যায় আত্মভোলা,বেখেয়ালি এই বিজ্ঞানির বয়স তখন মাত্র কুড়ি। সেই জন্মের পর থেকেই কিন্তু তিনি আত্মমগ্ন থাকতে ভালোবাসতেন। অহেতুক কিছু বলা একেবারেই ছিল স্বভাববিরুদ্ধ। একটা ঘটনা বলা যাক - ওনার সম্পর্কে বলা হয়ে থাকে,তিনি কথা বলতে শুরু করেন দেরিতে, চার বছর বয়সে। পড়তে শেখেন আরও পরে,সাত বছর বয়সে। ডিলেড ডেভেলপমেন্টাল মাইলস্টোন ছিল তার। তিন পেরিয়ে চারে এসেও তিনি যখন কথা বলছিলেন না তখন বাবা-মা খুব চিন্তায় পড়ে গেলেন। এক রাতে তাদের দুশ্চিন্তার অবসান ঘটল। খাবার টেবিলে তিনি হঠাৎ বলে উঠলেন, স্যুপটা খুব গরম! তাঁর মুখে কথা শুনে সবাই খুব অবাক হয়ে জানতে চাইলেন, এতদিন তুমি কথা বলোনি কেন? তিনি উত্তর দিলেন,এতদিন তো সব ঠিকমতই চলছিল।সেই ছেলেবেলাতেই কতটা ভাবুক প্রকৃতির ছিলেন তিনি অথচ তার এই স্বভাবটিকেই মানুষ অন্য চোখে দেখত। একবার তো ক্লাসটিচার তার বিরুদ্ধে মন্তব্যই করে ফেললেন, এ বোকা ছেলেকে দিয়ে কিছু হবে না। আসলে ঘটনা হয়েছিল যে ছেলেবেলায় খুব শান্ত স্বভাবের ছিলেন। ক্লাসে স্যার কিছু জানতে চাইলে অনেক ভেবে উত্তর দিতেন। চট করে কিছু বলতে পারতেন না। ভাবতে গিয়ে দেরী তো হতোই,উপরন্তু তোতলামির কারণে কথা আটকে যেত। ফলে সহপাঠী, শিক্ষকদের কাছে তিনি প্রায়ই হাসির পাত্র হতেন। এসব কারণে ক্লাসটিচার একদিন বলেই ফেললেন,ছেলেটি আস্ত বোকা! ওকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না।কিন্তু ছেলেটির মা এসব কথা মোটেই বিশ্বাস করতেন না। বরং সবাইকে শুনিয়ে বলতেন, তোমরা দেখে নিও ও বড় হলে অধ্যাপক হবে। অনেক নাম করবে। পরে মায়ের কথাই সত্য প্রমাণিত হয়েছিল। ছেলেটি বড় হয়ে অধ্যাপক তো বটেই, অনেক বড় বিজ্ঞানী হয়েছিলেন।  ভাগ্যিস মা তখন ছেলেটির পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। আসলে মায়েরা তো এমনই হয়, তাই না! ছেলে একটু ভাবুক তাতে কী! সে বন্ধুদের সঙ্গে মারামারি তো দূরের কথা দুষ্টুমি পর্যন্ত করত না। সে থাকত তার মতো। তাই দেখে সবাই তাকে অন্যরকম বোকা ভাবত। কিন্তু তিনি মোটেও বোকা ছিলেন না। তিনি ছেলেবেলা থেকেই ছিলেন কৌতূহলী।  হেরম্যান ছিলেন ছেলেটির বাবা। তিনি একবার ছেলেকে উপহার হিসেবে একটা কম্পাস কিনে দিলেন। কম্পাস পেয়ে ছেলেটি সারাক্ষণ শুধু সেটা নিয়েই মেতে থাকেন। হঠাৎ তিনি লক্ষ্য করলেন, আরে! কম্পাসের কাটা কেবল একদিকেই ঘুরে যাচ্ছে, কোনো অবস্থাতেই কাটা অন্যদিকে ফেরানো যাচ্ছে না কেন? তখন বাবার কাছে এর কারণ জানতে চাইলেন। বাবা ছেলের কৌতূহলী মনের পরিচয় পেয়ে খুব খুশি হলেন। তিনি ছেলেটিকে এর কারণ ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে বললেন। ছোটবেলার এই কৌতূহলই ছেলেটিকে বিজ্ঞানী করে গড়ে তুলেছিল। তাই তো হওয়ার কথা। তুমি যদি কোনো কিছু দেখে মনে প্রশ্ন না আসে সে তাহলে শিখবে কীভাবে? সে জন্যই তো বড়দের কাছে প্রশ্ন করে জেনে নিতে হয়। ছোটবেলায় ছেলেটির ইচ্ছা ছিল আলোর রথে চড়বেন। আলো নিয়ে তিনি সব সময় ভাবতেন। ক্লাসে বসে সূর্যের আলো, বাড়িতে বৈদ্যুতিক আলো নিয়ে ভাবতে গিয়ে অনেকবার বড়দের বকুনিও তাকে শুনতে হয়েছে। ১৪ বছর বয়সে আলোর রথে চড়ার বৈজ্ঞানিক পন্থা নিয়ে তিনি ভাবতে শুরু করেন। আপেক্ষিক তত্ত্ব তৈরির সময় এই ভাবনাই তাকে সবচেয়ে বেশি আলোড়িত করেছে। অনেক বড় হয়েও কিন্তু তার মাথা থেকে আলোর রথে চড়ার এই ভূত যায়নি। তো একদিন হয়েছে কী! ছেলেটির স্কুল একেবারেও ভালো লাগত না। কিন্তু কী আর করা! মায়ের আদেশ স্কুলে যেতেই হবে। তাই বাধ্য হয়ে স্কুলে যাওয়া। মা বলেছে, বড় হয়ে অধ্যাপক হতে হবে, তাই অনিচ্ছা সত্ত্বেও পড়াশোনা করা। কিন্তু করলে কী হবে, ক্লাসে গিয়ে শেষ বেঞ্চে দেয়ালের কোণে চুপচাপ বসে থাকতেন। একদিন সূর্যের আলো জানালার কাঁচ ভেদ করে কীভাবে ক্লাসের ভেতর আসছে একমনে এ নিয়ে ভাবছিলেন। হঠাৎ স্যার তাকে দাঁড় করিয়ে পড়া জিজ্ঞেস করলেন। অমনোযোগী থাকায় তিনি উত্তর দিতে পারলেন না। স্যার তাকে শাস্তিস্বরূপ হল রুমে পাঠিয়ে দিলেন। হল রুম ছিল বেশ বড় এবং ঠাণ্ডা। ছেলেটির কিন্তু জায়গাটা বেশ পছন্দ হলো। ক্লাস থেকে বের করে দেয়ায় তিনি বরং খুশিই হলেন। কারণ সেখানে বসে তিনি অন্তত নিরিবিলি নিজের মতো করে ভাবতে পারবেন।ক্লাস, স্যারের তিরস্কার, সহপাঠীদের বিদ্রুপ- সব ভুলে ছেলেটি সেই ঠাণ্ডা হল রুমে বসে সূর্যের আলো নিয়ে ভাবতে ভাবতেই ক্লাসের সময়টুকু পার করে দিলেন। এই ভাবনাটাই ছিল তার গবেষণা। আর এই গবেষণা করেই তিনি আবিষ্কার করেছিলেন আপেক্ষিক তত্ত্ব E=mc^2।বড় হয়ে আমরা এসব নিয়ে পড়াশোনা করেছি ফিজিক্স এ। তাই কথা কম,কাজ বেশী এই মনোভাব নিয়ে চললে লোকের কথা আর গায়ে এসে লাগে না। জীবনে সঠিক পথে এগিয়ে যাওয়ার দিশা দেখিয়ে দেয় লোকজনের এই হাসি,ঠাট্টা অবহেলা গুলো।

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

শিরোনাম - দুরত্ব✍️ ডা: অরুণিমা দাস

 শিরোনাম - দুরত্ব ✍️ ডা: অরুণিমা দাস আধুনিকতা মানেই অন্যরকম একটা ব্যাপার, উন্নতির পথে এগিয়ে যাবার সিড়ি তৈরি করে দেয় আধুনিকতা। আজকাল কেউ আ...