সোমবার, ২৫ জানুয়ারি, ২০২১

সায়াহ্নে রামধনু রং



গল্প:সায়াহ্নে রামধনু রং

             

একপ্রকার না বলেই বাড়ি ছেড়েছি,অপর্না চলে যাবার পর থেকেই বাড়িটা কেমন যেন অচেনা লাগতে শুরু করেছিল।বৌমা মুখে কিছু না বললেও আমি বুঝতে পারছিলাম দিন দিন আমি একটা বোঝা হয়ে উঠছিলাম।নাতিটাকে নিয়ে বাকি জীবন কাটিয়ে দেব ভেবেছিলাম ভবিষ্যতে নামি একজন মানুষ বানানোর উদ্দেশ্যে ,ওকেও হোস্টেলে রেখে এল।প্রায় প্রতিরাতে সদর দরজা খুলে দেবার সময় ওদের মুখের তীব্র সভ্য সমাজের কটু গন্ধ আর ছেলের এই বয়েসে বাল্য কালের টলমল পায়ে চলা আমার ভালো লাগছিলো না।নিজের পেনশনের টাকা আর কিছু জমানো টাকা নিয়ে বেরিয়ে পড়েছি।কোথায় যাব জানিনা কালকা অব্দি টিকিট করেছি।যেখানে ভালো লাগবে নেমে যাব,সেখানেই বাকি জীবনের আস্তানা খুঁজে নেব।

      গাড়ি আসানসোল ছেড়ে বেরিয়েছে।আজকে ট্রেনটা এখন অব্দি বেশ ফাঁকা,আমার  লোয়ার বার্থ,ওপরে দুজন ব্যবসায়ী ট্রেনে উঠেই শুয়ে পড়েছে এখন রীতিমতো নাক ডাকছে,আমার ঠিক মাঝের বার্থে এক বাবাজী গোছের মানুষ বুকের উপর জপমালা নিয়ে চোখ বন্ধ করে মালা জপছে।সাইড সিটে দুই নব দম্পতি নিজেদের মধ্যে খুনসুটি করে চলেছে, বোধহয় হানিমুন কাপল, ওদের দেখে নিজের ফেলে আসা দিনটা খুব মনে পড়ছিল।আমরা সেবার হানিমুনে পুরী গিয়েছিলাম,ট্রেনে সারা রাত জেগে অপর্ণা আর আমি গল্প করে কাটিয়েছিলাম।আমার চিন্তায় ছেদ পড়ে দরজার কাছে চেকারের উচ্চস্বরে কথাবার্তা কানে আসে,কোনো এক মহিলাকে উনি বলছিলেন

দেখুন এটা AC কোচ এখানে উঠেছেন কেনো আপনার টিকিট তো জেনারেল,তাও আবার এক্সপ্রেস নয়।আমি আপনাকে ফাইন করতে পারি ,শুধু আপনার বয়েস কে সম্মান জানিয়ে বলছি সামনের স্টেশনে নেবে যান ,এই কোচে আপনাকে এলাউ করব না।

মহিলা কাকুতি মিনতি করে বলতে থাকে বাবা তুমি আমার ছেলের বয়সী এই অন্ধকার স্টেশনে আমায় নামিয়ে দিওনা বাবা।আমার একটু শ্বাসকষ্ট আছে ।আমি জেনারেলে উঠেছিলাম ওখানে গরম আর ভিড়ে বড্ড কষ্ট হচ্ছিল।আমি এই বাথরুমের পাশটিতে বসে থাকব কারো অসুবিধা করব না।সোনা আমার আমায় নামিয়ে দিও না।

চেকার শোনার পাত্র নয় সে তার ডিউটি যাত্রী নিরাপত্তা জাতীয় কথা বলতে থাকে।আমি এগিয়ে যাই।মহিলাকে দেখে চমকে উঠি মুনু তুমি।মহিলা চকিতে আমার দিকে তাকিয়ে চমকে ওঠে একবার,তাড়াতাড়ি ব্যাগ নিয়ে চেকার কে বলে "ঠিক আছে বাবা আমি সামনের স্টেশনে নেমে যাচ্ছি।"আমি বলে উঠি মুনু তুমি আমায় চিনতে পারছ না আমি টুকু।চেকারের দিকে তাকিয়ে বললাম ওনাকে কোথাও নামতে হবে না।আপনি একটা এখানেই টিকিট করিয়ে দিন,গাড়ি ফাঁকাই ছিল আমার সামনের সিটে মুনুর রিজার্ভেশন হয়ে যায়।

      এখন মাঝরাত গাড়ি প্রচন্ড গতিতে ছুটে চলেছে।নববিবাহিত দম্পতি দুজন দুজনকে ধরে একই সিটে ঘুমিয়ে আছে।মুনু আবার বলতে শুরু করে, বাবা স্বপনের সঙ্গে আমার বিয়ে দেবার পর স্বপনকে ব্যবসায় অনেক সাহায্য করে,আমি একমাত্র মেয়ে বলে আমাদের বাড়িটা বাবা আমার নামেই করে দিয়েছিলো।প্রথম দু বছর ভালই কাটে কিন্তু পরে আমি জানতে পারি আমি সন্তান ধারণে অক্ষম,ইতিমধ্যে বাবার মৃত্যু হয়েছিল ব্যবসার প্রয়োজনে টাকার দরকার,আমার নামে বাড়ি সেটা বন্ধক দিয়ে টাকা পাওয়া সম্ভব নয় জেনে বাড়িটা স্বপনের নামে করে দিই।কিন্তু বাচ্চার অভাবে স্বপন আর আগের মতো আমায় ভালোবাসতে পারে না।একদিন ও আবার বিয়ে করল,আমার কষ্ট হলো কিন্তু মনে মনে ভাবলাম সত্যি তো ওর ও তো বংশধর দরকার।শুধু নিজের স্বার্থ দেখলে হয়।দ্বিতীয় পক্ষে এক ছেলে এক মেয়েকে আমি বুকে টেনে নিলাম।নিজের অতৃপ্ত মাতৃত্ব দিয়ে ওদের বড় করে তুলতে থাকি।যদিও সংসারে আমাকে ব্রাত্য হয়েই থাকতে হত।ছেলের বিয়ে হলো আমার পরিচয় ওদের কাছে অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।আমার স্বামীর কাছেও আমার পরিচয় একটা লজ্জার কারণ হয়ে উঠছিলো।তাই একদিন স্বপন আমার হাতে কিছু টাকা দিয়ে আমার বাবার বাড়ি থেকে আমায় তাড়িয়ে দিলো।ওটা তখন তার বাড়ি।এখানে ওখানে ঘুরে বেড়িয়ে একটা আশ্রয় খুঁজতে গিয়ে সেই স্বল্প টাকাও শেষ হয়ে গেলো।কপর্দকশূন্য অবস্থায় যেটুকু টাকা ছিল তাই দিয়ে এই টিকিট কেটে ট্রেনে চড়ে বসলাম।জানো টুকু আজ দুদিন আমি কিছু খেতে পায়নি।মুনু কান্নায় ভেঙে পড়ে।আমি ওর দুটো কাঁধ চেপে ধরি।এই সেই মুনু সুন্দরী তরুণী কলেজের সবথেকে চঞ্চল মেয়েটা,যাকে দেখে আমি পাগল হয়েছিলাম।ভালোবাসার হাত বাড়িয়ে ছিলাম,ও প্রত্যাখ্যান করেনি,কিন্তু আদরের দুলালী বড়লোকের একমাত্র মেয়ের যোগ্য আমি সেদিন হয়ে উঠতে পারিনি।আমার প্রেম একদিন আমার থেকে দূরে চলে গিয়েছিল।আমার নিঃসঙ্গ জীবন শুধু হাহাকার করে কেঁদে ছিলো।আজ আবার আমার নিঃসঙ্গতা র সঙ্গী হয়ে এসে দাঁড়িয়েছে সেদিনের সেই খাঁচা থেকে উড়ে যাওয়া আমার প্রেমের চন্দনা।আমি বলি মুনু আজ তুমিও একা আমি ও একা দুজনেই নিরুদ্দেশের পথিক। আমরা আবার দুজনে দুজনের সঙ্গী হয়ে উঠতে পারিনা।জীবনের সব চাওয়া পাওয়ার পথের শেষে আর একবার বাঁচতে পারিনা।মুনু ছলছল চোখে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে।

      ভোরবেলায় ট্রেন থেমেছে কোন এক অচেনা অজানা স্টেশনে।লালমাটির সরু রাস্তা ধরে এগিয়ে চলে দুই প্রেমী শেষের পথে যাদের চলার শুরু।গাড়ি সিটি দিয়ে স্টেশন ছেড়ে রওনা দেয় নতুন গন্তব্যের পথে।পিছন ভুলে তার তো সর্বদাই নতুনকে খুঁজে ফেরা।

                 ------- সমাপ্ত------

কপিরাইট@রিজার্ভ ফর সৌগত মুখোপাধ্যায়।

1 টি মন্তব্য:

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল✍️ ডা: অরুণিমা দাস

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল ✍️ ডা: অরুণিমা দাস বর্তমানে অতিরিক্ত কর্মব্যস্ততার কারণে একটু বেশি সময় কাজে দেওয়ার জন্য হয়তো একের প্রতি অন্য...