বুধবার, ৬ জানুয়ারি, ২০২১

কল্পলোক(প্রথম পর্ব)

 



   কল্পলোক, কল্পবিজ্ঞান এগুলো শুধুই কল্পনার উপর নির্ভরশীল ভাবলে একটু ভুল হয়।মানুষের চিন্তা শক্তির বেগ আলোক শক্তির থেকেও বেশি ,তাইতো নিমিষে আমরা আমাদের চিন্তা শক্তির দ্বার বিদেশে ঘুরে আসার কোনো স্মৃতি বার বার মনে করে সেখানে মনকে নিয়ে ঘুরে আসতে পারি।কল্পবিজ্ঞান টা অনেকটা সেইরকম এটাও সেই বিজ্ঞান ,কোনো চিন্তা যা আজ অসম্ভব হলেও হয়তো কোন দিন সম্ভব হবে।যে চিন্তায় ভর করে আজকের প্লেন ,রকেট,ডুবো জাহাজ ,টিক টক, হোয়াটস আপ জন্ম নিয়েছে।মহাভারতের সঞ্জয়ের দিব্য দৃষ্টি ধৃতরাষ্ট্র কে যে যুদ্ধের বর্ননা ঘরে বসেই ছবির মত জানিয়েছিলেন,  আজকের টেলিভিশন তাই নয়কি😊😊

   না কল্পবিজ্ঞান আর বিজ্ঞানের মিল লেখা আজ আমার উদ্দেশ্য নয়।আজ আমি সেই গল্প বলবো যে গল্প কল্পবিজ্ঞান না অন্য কিছু আপনারাই বিচার করবেন।

    বিজ্ঞানী ভূপেন বসু অশীতিপর বৃদ্ধ,এককালের নাম করা বিজ্ঞানী সারাজীবন ধরে বিজ্ঞানের সেই সাধনায় লিপ্ত যার চিন্তা মানুষ সর্বসময় করে চলেছে,বার্ধক্য জয় করা।এই সাধনায় তার সঙ্গে রয়েছেন তার স্ত্রী ৮০ বছরের প্রতিমা দেবী,গুণী স্বামীর এই খ্যাপাটে ব্রতের নিজেও যে কখন সামিল হয়ে পড়েছেন নিজেও জানেন না।এই ভাবেই যৌবন ছেড়ে আজ বৃদ্ধা বয়েসে উপনীত,শখ আহ্লাদ চার দেওয়ালে কখন বন্ধী হয়ে দম হারিয়েছে নিজেও জানে না।শহরের শেষ প্রান্তে জনমানবহীন একটা জায়গায় ভূপেন বাবুর বাড়ী কাম ল্যাব।এদিকে মানুষজন সচরাচর আসে না।ল্যাবের ভিতরে পশু পাখির চিৎকার আর নানা রকমের অদ্ভুত ধোঁয়া মানুষের মনে ভীতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই বার্ধক্য রোধের ওষুধ তৈরী কাজটা একটু গোপনেই রেখেছেন।প্রলয় ভূপেন বাবুর একমাত্র সহকারী ,বছর ২৫ শের ছোখরা ওর এক প্রীয় ছাত্রের ছেলে। মাস্টারমশাইয়ের সঙ্গে থেকে কিছু শিখুক এই বাসনায় প্রলয়কে এখানে পাঠানো।

   ভূপেন বাবু দীর্ঘ গবেষণায় এটা জেনেছেন,মানব শরীরের বয়েস বাড়ে না।আসলে কিছু মাংস পেশী এবং শরীরের কিছু মলিকিউল সময়ের সাথে সাথে তার কার্যক্ষমতা হারায়।আর তখনি মানব শরীরের পেশী সংকুচিত হয়ে বার্ধক্য আসে। কিন্তু পশু দের ক্ষেত্রে অন্য রকম তাদের ক্ষেত্রে আবার শরীরের পেশী এবং রক্তের মলিকিউল গুলো নষ্ট হবার সাথে সাথে তারা মৃত্যুর  দিকে ঢলে পড়ে।তাই হয়তো কোনো কুকর,বিড়াল বা বৃদ্ধ হনুমান আমরা দেখি না। অনেক সাধনার পর একদিন ভূপেন বাবু সেই অসাধ্য সাধন করে বসলেন,যে বয়সের পর থেকে মানব শরীরের পেশী সংকুচিত এবং রক্ত মলিকিউল তার কার্যক্ষমতা শিথিল করা শুরু করে সেই বয়সেই তাকে আটকে দিয়ে বয়েস বেঁধে রাখার ফর্মুলা আবিষ্কার করে ফেললেন। গিনিপিগ,বেবুন,বানরের উপর পরীক্ষা করে কিছু সফলতা পেলেও মানুষের উপর প্রয়োগ করা হয়নি।আসলে সেরকম কাউকে পাননি এখনো।নিজের উপর প্রয়োগ করলে সেখানে একটা মুশকিল আছে এর সাইড এফেক্ট যদি কিছু থাকে তার নিরাময় করার মতো লোক নেই।এসব হাজারো চিন্তা মাথায় নিয়ে সেদিন বিছানায় শুয়ে ছটপট করছিলেন ভূপেন বাবু।প্রতিমা এসে মাথায় হাত দিলো"কি চিন্তা করছো, এই বয়েসে চিন্তা করে রাতের ঘুম নষ্ট করলে,শরীর খারাপ করবে না।কি হয়েছে তোমার।"

   এই ৬০বছরের বৈবাহিক জীবনে ভূপেন বাবু নিজের স্ত্রীর কাছে কোনোদিন কোনো কিছু গোপন করেন নি।আজো করলেন না,তার এই এতো বছরের সাধনা সাফল্যের দোরগোড়ায় এসে কি জন্য থেমে গেছে সেটা প্রতিমার কাছে গোপন করে না।

  প্রতিমা সব শুনে খুব হাসে,তারপর বলে ও এই ব্যাপার তোমার একটা বুড়ো শরীর চাই।তা আমি তো আছি।আমার এই শরীরটা তো তোমার।আজ তোমার এই মহান কাজে আমি লাগবো না তো কে লাগবে।এমনিতে এই বয়সের ভারে বাতের জ্বালায় একদিন তো শেষ হয়ে যাবোই।নিজের বলতে তুমি ছাড়া আমার কেউ নেই।যদি ভালো মন্দ কিছু ঘটে সেও না হয় তোমার হাতেই হবে।কোনো চিন্তা কোরো না ওই ওষুধ তুমি আমার উপর প্রয়োগ কোরো।এখন চিন্তামুক্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়।

   দ্বিধাগ্রস্ত ভূপেন বাবু অবশেষে নিজের স্ত্রী প্রতিমার উপর এক্সপেরিমেন্ট করবে এটাই ঠিক করলো।প্লান মাফিক প্রলয়কে বললো তিনি সস্ত্রীকে তীর্থে যাবে তাই তার মাস দুইয়েকের ছুটি।প্রলয় ফ্যাল ফ্যাল করে বুড়োর দিকে তাকিয়ে থাকে,বলে কি এ যাবে বেড়াতে কোনোদিন যাকে কেউ বাড়ি থেকে বেরোতে দেখেনি সে হটাৎ বেড়াতে তাও আগে থেকে কোনো পরিকল্পনা ছাড়া।যাইহোক মনে সংশয় নিয়ে ঘাড় নেড়ে চলে যায়।

   ভূপেন বাবু প্রতিমাকে বলে আরো একবার ভাবতে পারতে।ওই এক্সপেরিমেন্ট চলা কালীন অনেক কিছু ঘটতে পারে।প্রথমত তোমার আজকের স্মৃতি কিছুই মনে থাকবে না সেই সময়,দ্বিতীয়ত যদি সফল না হই তোমার প্রাণ সংশয় হতে পারে।প্রতিমা হেঁসে বলে যাই হোক তোমার সামনে ঘটবে,আমি সারাজীবন এটাই তো চেয়েছি তোমার কোলে মাথা রেখে মরবো।

   যৌবন ফেরানোর ট্যাবলেট প্রতিমার হাতে দিয়ে বলে আমার এই ল্যাব আর এই বোতল মনে রাখার চেষ্টা করবে,যদি আমার কিছু হয়।এই সবুজ ট্যাবলেট খেয়ে নেবে তুমি আবার আগের অবস্থায় ফিরে আসবে।শুধু এই ল্যাব আর এই সবুজ ক্যাপসুল তুমি মাথার মধ্যে নিয়ে নাও।

   আজ দুদিন প্রতিমা নিথর হয়ে ল্যাবে শুয়ে দেহের কোনো পরিবর্তন নেই।ভূপেন বাবুর স্থির চোখ প্রতিমার দিকে।হটাৎ তার লক্ষ্য যায় প্রতিমার হাতের দিকে।আরে প্রতিমার হাতের ঝোলা মাংস চামড়া গুলো আর নেই হাতের পরিবর্তন ঘটেছে।ভূপেন বাবু আনন্দে আত্মহারা হয়ে ওঠেন হয়েছে তার সাধনা সফল হবার পথে।

    আরো দুই বিনিদ্র রজনী পেরিয়ে গেলো।নিজের আবিষ্কার তিলতিল করে পাওয়ার আনন্দ ছুঁতে লাগলো।প্রতিমার দেহে ব্যাপক পরিবর্তন শুরু হতে আরম্ভ করছে প্রতি ক্ষণে তার দেহের বয়সের ছাপ একটু একটু করে কমতে লাগছে।হারানো লাবণ্য তার শরীরে ফিরে আসছে।ভূপেন বাবু কখন যে একটু ঘুমিয়ে পড়েছিলেন বুঝতে পারেন নি।হটাৎ একটা সুরেলা কণ্ঠের ফোঁপানি কান্নায় তার ঘুম ভেঙে যায়।বাইরে তখন সবে ভোরের আলো ফুটছে। এক্সপেরিমেন্ট টেবিল ফাঁকা ,হতচকিত ভূপেন বাবু তাকিয়ে দেখে ল্যাবের কোনে দাঁড়িয়ে এক বছর বাইসের তরুণী,ভূপেন বাবুর মনে পড়ে যায় সব কিছু।প্রতিমার জ্ঞান ফিরেছে,অবাক বিস্ময়ে প্রতিমার দিকে তাকিয়ে থাকে।এতটা সাকসেস পাবে ভূপেন বাবু নিজেও ভাবতে পারে নি। প্রতিমার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে ভূপেন বাবুর ফেলে আসা দিনটা মনে পড়ে যায় যেদিন গ্রামের বাড়িতে পুজোর সময় প্রথম প্রতিমাকে দেখে মায়ের পছন্দ হয়ে যায়।কালবিলম্ব না করে বাড়ির বৌমা করে আনে।

  ভূপেন বাবু এগিয়ে যেতেই প্রতিমা লাফিয়ে ওঠে খবরদার আর এক পা। এগোবেন না।কেনো আমাকে আপনি এখানে ধরে এনেছেন।আপনি আমার দাদুর বয়সী কি চান আপনি।ভূপেন বাবু বুঝতে পারেন প্রতিমার কিছু মনে নেই।এই অবস্থায় যদি ও চেঁচামেচি শুরু করে মহামুস্কিল হয়ে যায়।এই বয়েস কমানোর কথা কেউ বিশ্বাস করবে না।অথচ প্রতিমাকে এখনই শান্ত করতে হবে,কি বলবে নিজের বউ তাকে দাদু সম্মধন করছে ,এখন কি উপায়।ভূপেন বাবু পরিস্থিতি সামাল দিতে বলে উত্তেজিত হয়েও না মা বলে ওঠেন।মা বলার সময় জিভ আড়ষ্ট হয়ে ওঠে ঠিকই তবু সামলে নেন।ভূপেন বাবুর মুখে মা ডাক শুনে প্রতিমা খানিক্ষনের জন্য থমকে যায় বটে।পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে বলে।আমি কোথায় রয়েছি, এখানে কি করে এলাম,আমি কে কিছুই কেনো মনে পড়ছে না।

  ভূপেন বাবু পরিস্থিতি সামাল দেন।আসলে মা তুমি কোথায় থাকো সেটা আমায় অনুসন্ধান করতে হবে।একটা দুর্ঘটনায় তোমাকে আমি রাস্তা থেকে তুলে আনি একটা ছেড়া মতো আই কার্ডে তোমার নাম দেখি সৃষ্টি ওটা তোমার নামই হবে।তারপর এই কদিন তুমি বেহুশ ছিলে, আজই তোমার জ্ঞান ফিরেছে।আমাকে তোমার কোনো ভয় করতে হবে না,আমি একজন বিজ্ঞানী,আমি তোমায় কথা দিচ্ছি তোমার পরিচয় আমি ফিরিয়ে দেবো ।এখন একটু তোমার বিশ্রামের প্রয়োজন তুমি আমার উপরের ঘরে এসো ওখানে বিশ্রাম নাও।একটু ভয় একটু দ্বিধা নিয়ে সৃষ্টি না চাইতেও সম্মত হয়।

   ঘরের আলোর সামনে এসে নিজের পরনের লাল পাড় শাড়ী দেখে প্রশ্ন করে আমি এই পোশাক পড়েছিলাম?

  ভূপেন বাবু দেখে এতো মহাবিপদ,ওর তো মাথায় ছিলো না প্রতিমা লাল পেড়ে শাড়ী পড়েছিল।এখন কি বলবে ,শাড়ী পাল্টে দিয়েছে তাহলে যদি অন্য কিছু ভেবে কিছু করে বসে।কিন্তু কারণ তো বলতেই হবে।ভূপেন বাবু আমতা আমতা করে বলে,আসলে তোমার পোশাকটা নষ্ট হয়ে গিয়েছিল তাই আমার স্ত্রী র শাড়ী তোমাকে পড়ানো হয়েছে।সৃষ্টি র মুখটা কেমন যেন সন্দেহ মতো করে কিছু একটা বলতে যায় ,সেটা ভূপেন বাবু আঁচ করতে পেরে বলে ওঠে না না তোমার পোশাক আমার স্ত্রী পাল্টে দিয়ে গেছেন।এই কদিন ওই তো তোমার দেখা শোনা করছিলেন।কাল ওর এক ভাইয়ের খুব শরীর খারাপ তাই ভাইয়ের বাড়ি গেছে ,ওখানে হয়তো মাস খানেক থাকতে হতে পারে। বলে তো দিলেন কিন্তু পূর্ব শরীর ফেরানোর ডোজ দিতে অন্তত দুমাস সময় দিতে হবে,এই দুমাস ওকে কিভাবে বোঝাবেন তা তিনি এখনো জানেন না।কিন্তু এটা জানেন এখনি মেয়েটার উপযুক্ত পোশাক দরকার।এদিকে সবাই জানে উনি নেই তীর্থে গেছেন এখন যদি কেউ বাজারে কোনো প্রশ্ন তোলে।এতো সব কথা আগে মাথায় আসেনি।যাই হোক একটা ব্যবস্থা করতেই হবে।সৃষ্টির দিকে তাকিয়ে বলে চিন্তা কোরো না একটু বেলা। হলে আমি বাজার থেকে তোমার পোশাক কিনে এনে দেবো, তখন ওটা চেঞ্জ করে নিও।

    বাজারে গিয়ে আর এক উপদ্রব লোকচক্ষু আড়াল করা গেলেও পৃথিবীর সব চক্ষু আড়াল করার ক্ষমতা কোনো মানুষেরই পক্ষে সম্ভব নয় হলোও তাই।কিছু পরিচিত চোখের সামনে অনর্গল মিথ্যা জীবনে প্রথমবার বলে নিজেকে বড্ডো ছোটো লাগছিলো ভূপেন বাবুর।এদিকে ২০/২২ বছরের মেয়েরা ঠিক কি পোশাক পছন্দ করে তার সমখ্য জ্ঞান ভূপেন বাবুর ছিলো না।দোকানে তার বিব্রত অবস্থা কাটাতে দেবদুতের মতো ওই বয়সী মেয়ে এসে সাহায্যের  হাত বাড়িয়ে দিলো।সে নানা ধরণের ছেঁড়া ফাটা জামা কাপড় বিস্তর দামে কিনে কেটে দিয়ে হাঁসি মুখে বলে গেলো"দাদু ফাটাফাটি ড্রেস কিনে দিলাম,দেখবেন আপনার নাতনি খুব আনন্দ করবে।ভালোবেসে আপনাকে না বিয়ে করতে চায়।"বলে খল খল করে হেঁসে চলে যায়।সাজুগুজু, আধুনিক খাবার দাবার কিনে ক্লান্ত ভূপেন বাবু একটা রিষ্কা ধরে বাড়ির দিকে রওনা দেয়।

     এদিকে প্রলয় এই কদিন কিছুতেই হিসাব মেলাতে পারছে না।ওই ঘর বন্দী বুড়ো হটাৎ তীর্থে মতি ব্যাপারটা সুবিধে ঠেকছে না।দু চারদিন বাড়ির সামনে ঘুরেছে,জানলা দরজা বন্ধ,সদর দরজায় ঢাউস একটা তালা।তবে কি বুড়ো সত্যি বেড়াতে গেছে।এই সব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে গরম চায়ের ভাঁড়ে আনমনে চুমুক মারতেই জিভটা পুড়ে যায়।হাপুস হাপুস করতে করতে দূরে আসা রিক্সটা দেখে ওর সমস্ত জ্বালা ভুলে যায়।এটা কি দেখছে ঠিক দেখছে তো ভূপেন জ্যাঠা!!তবে যে বললো মাস তিনেক বাদে ফিরবে!!উহঃ ব্যাপারটা গোলমেলে অনুসন্ধান করতেই হচ্ছে।প্রলয় নিঃসারে রিকশা টাকে অনুসরণ করতে থাকে।

                 চলবে----

   পরবর্তী অংশ দ্বিতীয় পর্বে








1 টি মন্তব্য:

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল✍️ ডা: অরুণিমা দাস

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল ✍️ ডা: অরুণিমা দাস বর্তমানে অতিরিক্ত কর্মব্যস্ততার কারণে একটু বেশি সময় কাজে দেওয়ার জন্য হয়তো একের প্রতি অন্য...