অন্য নেতাজী
সুদেষ্ণা দত্ত
১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দের ১৮ই আগস্ট শত্রুপক্ষের চোখে ধুলো দিয়ে বিমানে যাওয়ার সময় দুর্ঘটনাকবলিত হয়ে যে ব্যক্তির মৃত্যু সংবাদ ভারত তথা বিশ্ববাসীর সামনে প্রকাশিত হয়েছিল,তিনি আর পাঁচটা মানুষের মত অতি সাধারণ নন।সেই কারণেই এত তদন্ত কমিশন গঠিত হয়েছে তাঁর মৃত্যু রহস্য উদ্ঘাটনের জন্য।এই বিখ্যাত ব্যক্তি আজাদ হিন্দ বাহিনীর সর্বাধিনায়ক—নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু।তাঁর উদাত্ত কন্ঠস্বর হাজার হাজার মানুষকে ভাবাবিষ্ট করে তুলেছিল।তাঁর কথা,”ঈশ্বর তুমি আমাদের আশীর্ব্বাদ কর।আমরা যেন মাথা উঁচু রেখে মৃত্যু বরণের শৌর্য থেকে বঞ্চিত না হই”।এহেন দৃঢ়চেতা নেতাজী মহিলাদের প্রতি ছিলেন অত্যন্ত আড়ষ্ট এবং তাঁদের সঙ্গে মুক্ত মেলামেশা তাঁর অন্তরে প্রতিবন্ধকতা তৈরী করত।সেই কারণেই ইংল্যান্ডের প্রবাস জীবনে তাঁর পরিচিত হওয়া এক ইংরেজ মহিলা শ্রীমতী ধর্মবীরের সঙ্গে কিছু ঘটনা নেতাজীর বন্ধু দিলীপ কুমারের কাছ থেকে জানা যায়।দিলীপ কুমারের কথায়,”মেয়েদের সঙ্গে মেলামেশার ব্যাপারে.....আড়ষ্ট ও অপ্রস্তুত বোধ করতেন”।তাই ল্যাংকাশায়ারে শ্রীমতী ধর্মবীরের আতিথ্যে এবং মধুর ব্যবহারে তিনি অভিভূত হলেও অন্তরঙ্গভাবে মিশতে পারেননি।এর পিছনে আরো একটি কারণ ছিল শ্রীমতী ধর্মবীর ছিলেন ইংরেজ মহিলা-তাঁর জন্ম রাশিয়াতে এবং বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন পাঞ্জাবের ডাক্তার এন.আর.ধর্মবীরের সঙ্গে।নেতাজী ব্রিটিশের প্রতি অপ্রসন্ন ছিলেন।শ্রীমতী ধর্মবীরের বাড়ী থেকে চলে আসার দিন ট্রেন ছেড়ে চলে যাচ্ছে,প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে আছেন ধর্মবীর দম্পতি।কামরার ভিতর দুই বন্ধুর(নেতাজী ও দিলীপ কুমার)কোলে দুটি প্যাকেট ছুঁড়ে দিলেন শ্রীমতী ধর্মবীর।তাতে ছিল শুকনো ফল আর চকোলেট।প্যাকেট হাতে নেতাজীর চোখে জল এসেছিল।দিলীপ কুমারের দিকে ফিরে বলেছিলেন,”Women will always be women”.
এরপর যখন নেতাজী জাহাজে বসে চিঠি লিখেছিলেন,শ্রীমতী ধর্মবীরকে ‘দিদি’ সম্বোধন করেছিলেন।সেই অল্পদিনের পরিচয় এবং তাঁর সঙ্গে কাটান দিনগুলি নেতাজীর কাছে ইংল্যান্ডে ব্যতিক্রমী বাস ছিল।কারণ ইংল্যান্ডে বসবাস তাঁর কাছে ছিল পীড়াদায়ক।
নেতাজীর আধ্যাত্মিকতার প্রতি অনুরাগ ছিল শৈশবকাল থেকেই।তিনি একাধারে ছিলেন লাজুক,মিতভাষী এবং অন্যদের অনাবশ্যক সংসর্গ এড়িয়ে চলতেন।তিনি তাঁর আত্মজীবনী The Indian Struggle এ লিখেছেন,”একেবারে শৈশবের যে কথা আমার মনে পড়ে তা হল এই যে নিজেকে নিতান্তই এক তুচ্ছ জীব বলে মনে হত”।কারণ ছেলেবেলায় পিতা-মাতার ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্য পাওয়ার চেষ্টা করলেও তিনি তা থেকে বঞ্চিত হয়েছিলেন।কারণ একদিকে বৃহৎ পরিবার,অন্যদিকে পিতা-মাতার ব্যক্তিত্ব।তাই তাঁর বয়সী শিশুরা যখন খেলাধুলায় মেতে থাকত,তখন তাঁর আগ্রহ ছিল সমাজসেবায় এবং প্রায়ই ভস্ম মাখা সাধুদের পিছনে ঘুরে বেড়াতেন তিনি।তাঁর জীবনের উপর শ্রীরামকৃষ্ণ ও স্বামী বিবেকানন্দের প্রভাব ছিল সর্বাধিক।মাত্র ১৫ বছর বয়সের মধ্যেই তাঁদের জীবনী এবং উপদেশাবলী আত্মস্থ করে ফেলেছিলেন।মাত্র ২৩ বছর বয়সে তিনি রাজনীতিতে নিমগ্ন হওয়া সত্ত্বেও আধ্যাত্মিকতা বোধ তাঁর অন্তর থেকে বিলীন হয়ে যায়নি।তাই রাত্রে ঘুমোতে যাওয়ার আগে তিনি গীতাপাঠ করতেন।কারণ গীতার মধ্যেই তিনি পেয়েছিলেন মনের সান্ত্বনা এবং শক্তি।জাগরণকালে তিনি গীতার নির্দেশ অনুযায়ী চলার চেষ্টা করতেন।রাজনীতির প্রয়োজনে তিনি জনতার মধ্যে কাটাতেন,সভায় দাঁড়িয়ে দীর্ঘ বক্তৃতা দিতেন।কিন্তু তারপরেই বেরিয়ে পড়তেন একাকিত্বের সন্ধানে।ভাগবত চিন্তার জন্য তাঁর প্রয়োজন ছিল নৈঃশব্দ্য।এমনও হয়েছে যে,নৈশভোজের পর কোন সঙ্গীকে ডেকে পাঠিয়েছেন।একসঙ্গে বসে ঘন্টার পর ঘন্টা কেটে গেলেও হয়ত তিনি একটি বা দুটি কথা বলেছেন।শ্রীরামকৃষ্ণ এবং বিবেকানন্দের আদর্শবোধ ও তাঁর অন্তরের আধ্যাত্মিকতাবোধ মানুষের প্রতি নিবিড় ভালবাসা তৈরী করেছিল,যে ভালবাসা সমগ্র দেশবাসীর প্রতি সঞ্চারিত হয়েছিল।যা পরাধীনতার গ্লানি থেকে মুক্ত করার জন্য তাঁকে ঝাঁপিয়ে পড়তে উদ্বুদ্ধ করেছিল।
©কপিরাইট রিজার্ভড ফর সুদেষ্ণা দত্ত।

অপূর্ব।। জয় হিন্দ।
উত্তরমুছুনধন্যবাদ দিদি
উত্তরমুছুনবাহ্! অপূর্ব! ধন্যবাদ। 👍👍👌👌❤❤❤
উত্তরমুছুনধন্যবাদ দাদা
উত্তরমুছুন