# বদলে যাওয়া
****************
গির্জার ঘণ্টার ডং ডং ভারী আওয়াজে, সম্বিত ফিরে আসে। চমকে উঠে ঘড়ির দিকে তাকায় আমি। কয়েক বছরের পুরনো অভ্যাস, মাঝের এই কটা মাস অবশ্য বন্ধ ছিল অতিমারির কারণে। তারপরও তো অভ্যাসই! ভুল হতেই পারেনা। ঘড়ির কাঁটার সাথে নিজের অভিজ্ঞতা মিলিয়ে নিই আরেকবার। হ্যাঁ,, আরো আধা ঘণ্টা আছে ছুটির! "কি করবে এখন অরিত্র?!? সে কি ফিরবে!? না কি ফিরবে না?!"
ভাবতে থাকি। উফ্ফ! শেষটা যে কি হবে?! কিছুতেই যেনো মিলতে চাইছে না আজ!
স্কুল কম্পাউন্ডের একটু দূরে,পিডিবির ওয়াল ঘেঁষে বসানো বেঞ্চে বসে প্রাণপণ চেষ্টা করছি, কবিতার শেষ লাইনের ছন্দ মেলাতে আর অনেক দিন আগের লিখে ফেলে রাখা গল্পের নায়কের চরিত্রের ভাগ্য নির্ধারণ করতে! এ দুটোর মতো আমার ভবিষ্যত ভাগ্য ও যেন পেন্ডুলামের সুতোর উপরে দুলছে! সামনে দিয়ে পরিচিত যারাই আসা যাওয়া করছে, সবার সাথেই হাই - হ্যালো করতে হচ্ছে আমায়! যে উদ্দেশ্য নিয়ে এতো দূরে এসে বসা, সেটাই যেনো পূরণ হচ্ছেনা!
হায়রে! আমার লক ডাউনের প্রেম! আমার গল্প আর কবিতা!? কি হবে কে জানে!?
অতিমারির কারণে, দীর্ঘদিন ধরে চলা এই লক ডাউন, আমার মতো আরো অনেকেরই জীবনে 'আরব বসন্তের' মতো এসেছিল, যাঁদের জীবনে প্রকৃত বসন্ত যেনো শুধুই প্রকৃতির নিয়ম মেনেই আসে আর যায়! কর্মব্যস্ত জীবন যে হঠাৎ এরকম থমকে যাবে, কেউ কি জানতো আগে থেকে!? ভাবতে ভাবতেই, কবিতার শেষ লাইনটা মেলানোর চেষ্টা করি! পাতা ঝরার মৌসুমে, পিডিবি কলোনির সীমানা প্রাচীর ঘেঁষে থাকা বড় বড় দেবদারু গাছের ঝরে পড়া পাতারা মাঝে মধ্যেই এসে গায়ে টোকা দিচ্ছে। খানিকটা পাহাড়ী এই এলাকা, এই সময় মোটামুটি ফাঁকা থাকে। পাশের কিছু বেঞ্চে জোড়া শালিকেরা নিজেদের মতো করে টাইম পাস করছে। ঝিমিয়ে থাকা এই পাড়া সন্ধ্যা নেমে এলেই জেগে উঠবে নিজস্ব স্বকীয়তায়! জেগে থাকবে অনেক রাত অবধি। নিশাচরের মতো! সব কিছুই ধীরে ধীরে আবার আগের নিয়মে ফিরে যাচ্ছে। শুধু আমার এতোদিনের সাজানো গোছানো জীবনটাই কেমন যেনো এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে!
পার্সের ভেতরে রাখা মোবাইলের গোঙানির শব্দে বের করে দেখি, ছেলের ক্লাস ফ্রেন্ডের মা! নিশ্চয়ই স্কুলে আসেনি! আরে বাবা!! স্কুল তো ছুটি হোক আগে! নাহ্! তার আগেই জেনে নিতে হবে কি পড়ালো আজ!? আমি কি সবজান্তা নাকি যে, ছুটি হওয়ার আগেই জেনে ফেলি কি টাস্ক দিলো? মনে মনে গজগজ করে ফোনটা কানে লাগাই। হ্যালো বলতেই, অপর প্রান্ত থেকে শুরু হয়ে যায় সাতকাহন! হু! হু করে সায় দিয়ে একবার হাত ঘড়ির দিকে তাকায়। নাহ্ আজও হলো না গল্প আর কবিতার সমাপ্তির! ফোনটা রেখে হিসেব করতে থাকি, এ মাসের ছুটির দিনের সম্ভাব্য লিস্টের! ভেবেছিলাম, বদলে যাওয়া সময়ে, ছুটির দিন গুলোতে নিজের জন্য বড় একটা সময় রিজার্ভ রেখে দেবো! কিন্তু সামাজিকতার যে লম্বা লিস্ট এ মাসে আছে, তাতে সাহিত্যে চর্চার 'ক' ও আদৌ হবে কিনা সন্দেহ! সামনের মাসেই ছেলের ক্লাস টেস্ট শুরু হবে। সঙ্গে কোচিং! আর কোচিং মানেই, সেই সকাল সাতটা থেকে বিকেল পাঁচটা অবধি ছেলেকে নিয়ে শুধুই দৌঁড় ভাগের খেলা! ক্লান্ত শরীরে বাড়ি ফিরে,খানিক বিরতি নিয়ে আবার শুরু নতুন উদ্যমে পড়াশোনা, হোম ওয়ার্ক, কোচিং টেস্টের পড়া রেডি করা সাথে নিজের চাকরি! সবকিছুই সমান্তরালে চলতে থাকে যেনো ঠিক রেল লাইনের ফাঁদে পাতা জীবন!
পৌষের বিকেলে, পাহাড়ি এরিয়া হওয়াতেই বোধকরি, খুব দ্রুত কুয়াশার দল তাঁদের ঝাঁপি খুলে বসে আছে। চারটা বাজতেই আশেপাশে কেমন যেন ঝাঁপসা একটা ভাব! প্রকৃতির রূপ আর নিজের ভবিষ্যত ভাগ্যর বদলে যাওয়া ঝাঁপসা ছবি দেখে, ভেতরে ভেতরে কুঁকড়ে যাই আমি! লক ডাউনের আগ পর্যন্তও যে আমি সময়কে নিয়মের বেড়াজালে বেঁধে সকাল থেকে প্রায় ভোর অবধি জেগে নিজের সব কাজ সু সম্পন্ন করেছি, সেই 'আমি' র আজ এতোই কি সময়ের অভাব হলো যে, ভেবে ভেবেও কোন কুল পাইনা?? চুলোই যাক সব! আর পারবো না অনুরোধের যতসব বিকলাঙ্গ ঘানি টানতে! সময় হয়েছে নিজের দিকে ফিরে তাকানোর! নিজেকে সময় দেয়ার! অসমাপ্ত যত গল্পের বই ফেলে রেখেছি আজ বহু মাস ধরে, তার সব কটাই শেষ করবো পড়ে! ভ্রমণ কাহিনী লিখবো বলে নতুন কেনা ডায়েরির উপর জমা ধুলোর আস্তরণ সরিয়ে আবার ওটাকে নতুন করে সাজাবো! খালি সাদা পৃষ্ঠা গুলোতে কলমের ছোঁয়ায় ভরিয়ে তুলবো! ওই বুড়োকে ও জানিয়ে দেবো যে, রাত জেগে কাজ করা আর সম্ভব নয়। এবার যাতে নিজের সাম্রাজ্য ঘোচানোর কাজে মনোযোগ দেয়! আর গল্প, কবিতা?!? তাঁরাও থাকবে! ঠিক আগের মতো স্বপ্নের ফেরিওয়ালা হয়ে!!
কলোনির গেটের দুপাশে লাগানো হাসনা হেনা আর শিউলির মন মাতানো সুগন্ধে,আমার নিজেকে কেমন যেনো পাগল পাগল মনে হতে থাকে। রাস্তার দু ধারের আইল্যান্ড ঘেঁষে করা বিউটিফিকেশনের এলোমেলো বুনো লতা আর মৌসুমী ফুলের দিকে তাকিয়ে ভাবি,, অনেক হয়েছে! পাগল পনা! বুনো লতা কিংবা পাহাড়ি ফুল মনে করে শুধুই আগাছার জন্ম দিয়েছি! আজ সময় হয়েছে সব কিছু উপড়ে ফেলে আবার নতুন করে শুরু করার! বদলে যাওয়ার দিনে কিংবা সময়ে, কোন পিছুটান রাখতে নেই! এবার আমি বদলাবোই! কোন অনুরোধ, উপরোধের ঢেকি হজম না করে, আমি আমার মতোই সামনের দিকে এগিয়ে যাবো! আগের মতোই বদলে যাওয়া দিন আর সময়কে আবার নিজের নিয়মে বেঁধে রাখবো!
বদলে যাওয়া দিন আর সময়ের উপযুক্ত করে নিজেকে গড়ে তোলার সংকল্প করে আস্তে ধীরে এগিয়ে যাই স্কুলের দিকে। আর পাঁচ মিনিট আছে স্কুল ছুটি হতে! ছুটি হওয়ার সাথে সাথেই ছেলের ওর মাকে দেখা চাই! তড়িঘড়ি পা চালাতে চালাতে ভাবতে থাকি..আহা!! এই পাঁচ মিনিটে যদি ফেলা আসা গত কয়েক মাসের সুখের খন্ড চিত্র গুলোই আরেক বার চোখ বোলানো যেতো! নাহ্ থাক সে সব আজ স্মৃতি সুধায় ভরা! আমি আর পিছু ফিরে চাইবো না!!
||সমাপ্ত||
Copyright©️ All rights reserved for Pallabi Barua

অসাধারণ পোলো👌👌
উত্তরমুছুনখুব সাধারণ কথার মধ্যেই সুন্দর বর্ণনা দিলে বদলে যাওয়ার।
🍫🍫🍫🍫
উত্তরমুছুনঅ-সাধারণ,,,,,বেশ ভালো লেখো তুমি সিম্পলের ওপরেও নিখাদ😊😊😊😊🍫🍫🍫❤❤
উত্তরমুছুনঅসাধারণ লিখেছিস। অপূর্ব লাগল।ধন্যবাদ। 👍👍👌👌❤❤❤💯💯💯
উত্তরমুছুনদারুণ ।💐💐💐
উত্তরমুছুনঅপূর্ব লিখেছ দি 🤗👌👌💐💐💐
উত্তরমুছুনদারুণ বলেছ বন্ধু। খুব ভাল লাগলো❤❤
উত্তরমুছুনস্বপের ফেরিওয়ালার ঝুড়ি সুখ স্মৃতিতেই ভরা থাক।অসাধারন লেখা।
উত্তরমুছুন