শনিবার, ৯ জানুয়ারি, ২০২১

যদি এমন হতো। কলমে --(-পারমিতা মন্ডল ।)

যদি এমন হতো,,,,,.

পারমিতা মন্ডল ।

শ্রীচরনেষু মা ,
             আজ অনেক দিন পর আবার তোমাকে  লিখতে  বসলাম মা।  ফোনের যুগে চিঠি লেখা কেন এটা মনে হতেই পারে ।  আসলে মনের কথা মনে হয় একমাত্র চিঠিতেই ভালো ভাবে প্রকাশ করা যায় ।জানি তুমি আমার নিজের মা না । আমার শাশুড়ি মা ।  তাও আবার প্রাক্তন । কিন্তু তোমার সাথে তো আমার সেই তথা কথিত শাশুড়ি বৌয়ের সম্পর্ক ছিল না । আমরা তো মা মেয়ের মতো ছিলাম  । তুমি যে আমাকে এতো ভালো বাসতে তা , তোমার কাছে যখন ছিলাম  তখন বুঝতে পারিনি ।আজ মনে  হয় সব শাশুড়ি মা যদি তোমার মতো হতো  তাহলে অনেক মেয়ে বধূ  নির্যাতনের হাত থেকে রক্ষা পেত ।  আমার মতো ঘুরে দাঁড়াতে পারতো ।আসলে আমরা মেয়েরাই ,নিজেরা নিজেদের শত্রু ।

   তোমার ছেলের সৌম্যর সাথে আমার পরিচয় হয়েছিল সেই কলেজ লাইফে । প্রথম দিকে আমরা খুব ভালো বন্ধু ছিলাম । তারপর আস্তে আস্তে আমাদের প্রেম হয় ।  আমি শুনেছি  তুমি নাকি আমাদের সম্পর্কটা  মেনে নিতে চাওনি । আসলে সৌম্য তোমার একমাত্র ছেলে ছিল তো । তুমি হয়তো ওর জন্য রূপে লক্ষ্মী, গুনে স্বরস্বতী চেয়েছিলে । কিন্তু আমি তো তা ছিলাম না ।  পড়াশোনায় ভালো ছিলাম ঠিকই  ,কিন্তু রূপ ?  সেটা তো  আমার একদম ই  ছিল না ।ছোট বেলায় আমার   একটা দুর্ঘটনা ঘটেছিল  ।  কালিপুজোর  দিন   বাজি পোড়াতে গিয়ে  গায়ে আগুন  লেগে গিয়েছিল । ।তখন  আমার মুখের অনেকটা অংশ পুড়ে  যায় । সেই দাগ যে আজও আমার  সারা মুখে আছে । তাই প্রথমেই  তুমি আমাকে রিজেক্ট  করে দিয়েছিলে । কিন্তু ছেলের জেদাজেদিতে  শেষ পর্যন্ত রাজি হয়েছিলে । তোমার ছেলে যে আমাকে ভালো বেসেছিল । 

         কিন্তু ভালো বাসলেই তো হলো না । সেই সম্পর্কটাকে তো টিকিয়ে রাখতে হবে । ঝোঁকের মাথায় মুখপোড়া মেয়েকে ভালো বেসেছিল ।  সমাজে একটা দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে চেয়েছিল হয়তো । তাই বিয়ে করেছিল । তারপর আস্তে আস্তে মোহ কেটে  যায় । নিত্য অশান্তি আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অঙ্গ হয়ে ওঠে। তুমি সবই  বুঝতে পারতে । সেদিন আমি লুকিয়ে শুনেছিলাম তুমি ছেলেকে শাসন করছিলে । বকাঝকা করছিলে  আমার সাথে খারাপ ব‍্যাবহার করেছে  বলে । কিন্তু সেকথা আমাকে বুঝতে দাওনি । আমিও মা ছেলের মধ্যে ঢুকিনি ।
      
  কিন্তু অত‍্যাচারের মাত্রা দিন দিন বেড়েই চলেছিল ।  শুনেছিলাম অফিসের  একটি মেয়ের সাথে সৌম্য সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছে। । সে ছিল বসের মেয়ে । তাকে হাত করতে পারলে অনেক উচু  পোস্টে ওঠা যাবে ।তাই হয়তো সৌম্যর এই পরিবর্তন । আসলে ঝোঁকের মাথায় বিয়ে করেছিল তো । পরে  মুখ পোড়া মেয়েকে আর ভালো লাগতো না হয়তো ।  সেখানে  বসের মেয়ে খুব সুন্দরী ছিল । তুমিও ওর এই অধ‌ঃপতন মেনে নিতে পারছিলে না । তাই তোমার সাথেও ওর ঝামেলা  লেগে যাচ্ছিল ।
 

কিন্তু  মা আমরা তো ভালো বেসে বিয়ে করেছিলাম । তোমার ছেলে কেন  এতো তাড়াতাড়ি সব কিছু ভুলে গেল  ?  আমি তো আজও ওকেই ভালোবাসি  ।  তোমার মনে আছে  সেদিন প্রথম বার ও ড্রিংক করে বাড়িতে ফিরেছিল  ?  তুমি  যাতে বুঝতে না পারো তাই তাড়াতাড়ি ওকে টেনে ঘরে নিয়ে গিয়েছিলাম । নীচে আর নামতে দেইনি । উপরেই   খাবার নিয়ে গিয়েছিলাম । তুমি হয়তো বুঝতে পেরেছিলে । কিন্তু আমার সামনে কিছু বলোনি । শত হলেও ও তো তোমার সন্তান । কিন্তু বেশীদিন লুকিয়ে রাখা গেল না ।  এরকম সে প্রায় ই করতে লাগলো । তুমিও এক প্রকার অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলে সৌম্যর  ব‍্যাবহারে । আর ওর চোখে তখন রঙিন দুনিয়ার হাত ছানি ।

        সৌম্যর সাথে রাগারাগি হলে , আমি না খেয়ে থাকতাম । আমার মনে আছে , তুমি এসে ধমকের সুরে বলতে " না খেয়ে থাকলে লড়াই করবে কি করে ?. ঐতো চেহারা !  গায়ে একটুও মাংস নেই ।। তারপর মুখটাও পোড়া ।"  আমি জানতাম আমার মুখে পোড়া দাগ আছে বলে তুমি তোমার ছেলের বৌ হিসাবে কখনোই আমাকে মানতে পারনি মন থেকে । কখনো ভালো করে কথাও বলতে না ।
কিন্তু মনে মনে এতোটা ভালো বাসতে সেটা কখনোই বুঝতে   দাওনি ।  আজ আমি  বুঝতে পারি ।  আসলে তুমিও তো মেয়ে । তাই একজন মেয়েকে অত‍্যাচারিত হতে দেখে তোমার মন কাঁদতো । কিন্তু কিছু বলতে পারতে না । কারণ যে অত‍্যাচার করছে  সে তোমার বড় স্নেহের ধন ।  তোমার অন্ধের জষ্ঠি যে সে ।

   অনেক চেষ্টা করেও  সৌম্যকে  শোধরানো গেলনা ।  এর পর থেকে সৌম্য প্রায় প্রতিদিনই ড্রিংক করে ঘরে ফিরতে লাগলো । সেদিনের কথা তোমার হয়তো মনে  আছে মা । সৌম্য প্রথমবার  আমার গায়ে হাত তুলেছিল । শরীরে যতটা না ব‍্যাথা লেগেছিল তার চেয়ে বেশী ব‍্যাথা লেগেছিল মনে । এই মানুষটাকে আমি ভালো বেসেছিলাম  !! যে আমার জন্য পাগল ছিল । তোমাদের সবার বিরুদ্ধে গিয়ে আমাকে বিয়ে করেছিল ।  আমার বাবা অবশ্য বলেছিল লেখা পড়া শেষ করে আগে নিজের পায়ে দাঁড়াতে ।  তারপর বিয়ে করতে । সেদিন আমিও  অবশ্য বাবার কথা শুনিনি ।  তাহলে আজ  হয়তো আমাকে  এই দিনটি দেখতে হতো না ।

  তোমার ছেলের এই ব‍্যাবহার তোমাকেও  খুব কষ্ট দিয়েছিল । তাই তুমি আমার উপর রাগ দেখিয়ে আমাকে বাড়ি  ছেড়ে চলে যেতে বলেছিলে  ।তোমার আসল উদ্দেশ্য ছিল আমাকে সাহায্য করা । তুমি বুঝতে পেরেছিলে  যে তোমার ছেলে খারাপ সঙ্গে পড়েছে । ওখানে থাকলে  তুমি আমাকে বাঁচাতে পারবে না । সৌম্য তোমার সাথেও খারাপ ব‍্যাবহার করতো ।  কিন্তু তোমার তো ছেড়ে যাওয়ার কোন জায়গা ছিল না । তাই তুমি আমাকে বাঁচাতে চেয়েছিলে ।   তুমি বুঝে গিয়েছিলে সৌম্য আর আমার সাথে থাকতে চায় না । কারণ এরকম অশান্তি ও মাঝে মাঝেই করতো । আর  এটা সে ডিভোর্স এর জন্যই করতো । ওর ইচ্ছা ছিল বসের মেয়েকে বিয়ে করা । তুমি তাতে বাধা দিচ্ছিলে বলে ও তোমাকেও ছাড়তো না । সেদিন তোমাদের যখন কথা কাটাকাটি হচ্ছিল তখন আমি শুনেছিলাম আড়াল থেকে । তুমি ভেবেছিলে আমি হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছি । কিন্তু না আমি লুকিয়ে দেখেছিলাম ।  হঠাৎ  তুমি  উত্তেজিত হয়ে সপাটে  এক চড় কষিয়ে দিয়েছিলে  সৌম্যর  গালে  ।  সৌম্য ও উল্টে তোমার হাত শক্ত করে ধরেছিল । তোমার খুব লাগছিল । কিন্তু ভয়ে আমি সামনে যেতে পারিনি । ও তখন মানুষ ছিল না । তুমি খুব কষ্ট পেয়েছিলে সেদিন । এই ছেলের  জন্যই তো তুমি সারা জীবন এতো কষ্ট করেছো । শশুর  মহাশয় মারা যাওয়ার পর একা হাতে সৌম্যকে মানুষ করেছো ।আমি ওর কাছেই শুনেছি ।  কখনোই তুমি ওকে কষ্ট পেতে দাওনি । কিন্তু আজ কেন সে এরকম হয়ে গেল ??
 

      আমার আজও মনে আছে সেদিন তুমি আমার সাথেও খুব অশান্তি করেছিলে । বেরিয়ে যেতে বলেছিলে বাড়ি থেকে । আসলে তুমি চেয়েছিলে ঐ পরিবেশে থেকে , আমি যেন আমার জীবনটাকে নষ্ট না করি । ছেলেকে  ফেরানোর আর কোন রাস্তা না  পেয়ে  তুমি অন্তত  আমাকে বাঁচাতে চেয়েছিলে ।   আমার জীবনটাকে নষ্ট হতে দিতে চাওনি  তুমি  ।  আমাকে তাড়িয়ে দিয়েছিলে । কারণ তুমি জানতে তাড়িয়ে না দিলে আমি যাবো না । তুমি গোপনে আমার বাবাকে ফোন করে সব জানিয়ে ছিলে । নিজের ছেলের সমস্ত অপকর্মের কথা স্বিকার করে বাবাকে আমার পাশে দাঁড়ানোর অনুরোধ করেছিলে ।  ভালোবেসে বিয়ে করেছিলাম বলে আমিও কখনো বাবা  মাকে এসব কথা বলতে পারতাম না । এখানে অনেকেই হয়তো বলবে এমন আবার হয় নাকি ?  ছেলের থেকে ছেলের বৌ আপন বেশী ?  কিন্তু এটা কেউ বুঝবে না যে তুমি একটা মেয়েকে অত‍্যাচারের হাত থেকে বাঁচাতে চেয়েছিলে ।

 
     তারপর কেটে গেছে আরো সাত সাতটা বছর ।  তোমাদের বাড়ি থেকে চলে আসার পর তোমার ছেলে ডিভোর্সের ফাইল করে ।  এক বছরের মধ্যে আমাদের ডিভোর্স হয়ে যায় । আমি আবার নতুন করে পড়াশোনা শুরু করি । আমার বাবার তেমন আর্থিক সামর্থ ছিল না । আমাকে চাকরির প্রশিক্ষন দেওয়ার মতো । তুমি গোপনে বাবাকে টাকা পাঠাতে ।  এখন আমি সব জানি ।  আসলে তোমার ছেলের অপরাধ  তুমি কিছুটা কমাতে চেয়েছিলে ।  আর নিজের অজান্তে আমাকে ভালো বেসে ফেলেছিলে ।

      আজ আমি চাকরি করি মা । তোমার ছেলের থেকেও অনেক উঁচু পোস্টে ।  আমাকে কোন বস ধরতে হয়নি । নিজের চেষ্টায় আর তোমাদের সহযোগিতায় আমি এই চাকরি পেয়েছি । এখন কি তুমি আমার কাছে এসে থাকতে পারোনা মা ??  শুনেছি তোমার ছেলে বসের মেয়েকে বিয়ে করেছে ।  কিন্তু ওরা তোমার সাথে একটুও ভালো ব‍্যাবহার করে না ।  তাই বলছি তুমি আমার কাছে চলে এসো মা । আমি তো একাই থাকি ।  বাকি জীবনটা না হয়  মা মেয়েতে এক সাথে   কাটিয়ে দেব ।  তুমি  আসবে তো মা ??  তোমার উত্তরের প্রতিক্ষায়   রইলাম ।  ভালো থেক মা ।

                ইতি ------
                    তোমার মেয়ে  সাথীলেখা ।
                          ( প্রাক্তন  পুত্রবধূ )
   ( পৃথিবীর সব শাশুড়ি বৌমার সম্পর্ক গুলো যেন এমনই হয় , এই প্রার্থনা করি ।)


৩টি মন্তব্য:

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল✍️ ডা: অরুণিমা দাস

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল ✍️ ডা: অরুণিমা দাস বর্তমানে অতিরিক্ত কর্মব্যস্ততার কারণে একটু বেশি সময় কাজে দেওয়ার জন্য হয়তো একের প্রতি অন্য...