সোমবার, ২৫ জানুয়ারি, ২০২১

অন্য সঙ্গী(সুদেষ্ণা দত্ত)

 


অন্য
সঙ্গী(অণু গল্প)

সুদেষ্ণা দত্ত

        

                       

         বছর সাতাশের সাঁঝবাতির বিয়ে হয়েছে বছর চারেক।এখনও পর্যন্ত তার কোন সন্তান নেই।সাঁঝবাতির স্বামী জয়ন্ত বিদ্যুৎ বিভাগে চাকরী করেন।সাঁঝবাতি সপ্তাহে তিনদিন ঘন্টা চারেক ডাটা এন্ট্রির কাজ করে।বাড়ীতে সে আর তার স্বামী থাকে।শ্বশুরবাড়ীর লোকজন কোন এক অজ্ঞাত কারণে নিজেদের দায়িত্ব-কর্তব্য থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছেন।সাঁঝবাতি প্রথম দিকে অনেক চেষ্টা করেছে তাঁদের সঙ্গে মানিয়ে চলার।কিন্তু তার সেই চেষ্টা সাফল্যমন্ডিত হয়নি।দিন-রাত বাপের বাড়ী গিয়ে থাকা সাঁঝবাতির আজন্ম লালিত সংস্কারে কোথায় একটা বাধার সৃষ্টি করে!জয়ন্তর কাজের প্রতি যত নিষ্ঠা,স্ত্রীর প্রতি নয়-সে বোঝে জয়ন্তর কাছে তার গুরুত্ব কমছে।ফলস্বরূপ বাড়তে থাকে দূরত্ব।সাঁঝবাতি ভাবে কাঁহা তক টিভি দেখে আর বই পড়ে কাটান যায়!তার না আছে তেমন বন্ধুবান্ধব,না আছে ফোনে আসক্তি।ধীরে ধীরে একাকীত্ব,অবসাদ তাকে গ্রাস করে।সে মাঝে মাঝেই খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে অন্ধকার ঘরে দু-তিন দিন নিজেকে আটকে রাখে।এতে জয়ন্ত বিরক্ত হয়।সাঁঝবাতিও নিরুপায়।অবধারিত পরিণতি অশান্তি।দু-একবার আত্মহননের পথে এগিয়েও ব্যর্থ হয় সাঁঝবাতি।

            এখন জয়ন্ত বেরিয়ে গেলে সাঁঝবাতি প্রায়ই বেরিয়ে যায়।যে পাড়ার লোক কোনদিন তার একাকীত্বে সহানুভূতির প্রতিষেধকের প্রলেপ লাগাতে চেষ্টা করেনি,আজ তারাই জয়ন্তর কান ভারী করে।কৈফিয়ৎ দাবি করা হয়,শব্দরা ঘর ছেড়ে ছড়িয়ে পড়ে চারিদিকে।কিন্তু সব সহ্য করেও নীরব থাকে সাঁঝবাতি।

          দুজনের সম্পর্কের শক্ত ইট তাদের বাঁধন মজবুত করেনি,তাদের যুগলে বেরোনোর পথে তৈরী করেছে অভেদ্য প্রাচীর।আজ রবিবার।আজ সাঁঝবাতি জয়ন্তকে জোর করে রাজি করিয়েছে তার সঙ্গে বেরোতে।আজ সাঁঝবাতির দারুন আনন্দের দিন।সাঁঝবাতির বুকের জমাট বাঁধা শব্দরা আজ দু’মলাটের মাঝে ভালোবাসায় একে অপরকে জড়িয়ে আছে,সেখানে নেই কোন একাকীত্ব।সাঁঝবাতি আর জয়ন্ত এসেছে কাঁকুরগাছির বইমেলায়।রাঙ্গামাটি প্রকাশনার স্টলটি উদ্বোধন করবে সাঁঝবাতি।এখান থেকেই তার নতুন সৃষ্টি ‘অন্য সঙ্গী’র আত্মপ্রকাশ—তার নতুন পথচলা।এসব দেখে হকচকিয়ে যায় জয়ন্ত।

          সাঁঝবাতিকে প্রকাশনা সংস্থা দু চার কথা বলতে বললে সে জানায় তার একাকীত্বের গল্প।কত মানুষ এর পিছনে আঁশটে গন্ধ খোঁজার চেষ্টা করেছে।জয়ন্ত বেরিয়ে গেলে দিনের পর দিন সে শিয়ালদা স্টেশনে গিয়ে বসে থাকত।প্রায় নিত্য স্টেশনে আসার সুবাদে আর.পি.এফদের নজরে পড়ে যায় সাঁঝবাতি।পড়তে হয় অনেক কৈফিয়তের মুখে।ঘরে--বাইরে কৈফিয়তের গাঁথনি তার মনের ভিতকে মজবুত করতে সাহায্য করেছিল।সে স্টেশনে গিয়ে দেখত ভিন্ন পেশা,ভিন্ন সামাজিক অবস্থানের মানুষদের।মন দিয়ে শুনত তাদের কথা।তারই ফসল মানুষের লড়াই করে বাঁচার গল্প, 'অন্য সঙ্গী’। একাকীত্বের কলম দিয়েই গেঁথেছে শব্দের উৎসব।খুব কঠিন ছিল এই পথ চলা।কিন্তু আজ সাঁঝবাতি চায় এই একাকীত্ব—যা তাকে শব্দের ডানা মেলে আকাশে উড়তে শিখিয়েছে,শিখিয়েছে নিজেকে এক আত্মবিশ্বাসী মানুষ হিসেবে চিনতে।

কথার মেঘে জমাট বুক,

দু’নয়নে কষ্টের জল,

এটাই দিয়েছে সৃষ্টিসুখ,

এটাই আমার একাকীত্বের ফল।

©কপিরাইট রিজার্ভড ফর সুদেষ্ণা দত্ত  

২৫টি মন্তব্য:

  1. "মানুষের দিনলিপি" ~ অসাধারণ অনুভূতি দিয়ে লেখা সুন্দর গল্প।❤️💕

    উত্তরমুছুন
  2. অনুভূতি যখন ভাষার রূপ নেয়.... অসাধারণ একটি গল্প .... অনেক অনেক ধন্যবাদ আপনাকে সুন্দরভাবে সমাজের একটা জ্বলন্ত সমস্যার প্রতি সহানুভূতির সাথে উপস্থাপন করে পাঠক মননে স্থান করে নেওয়ার জন্য। আশাকরি এরকম আরো কিছু সৃষ্টির উপস্থাপন করবেন। 💕❤️😊

    উত্তরমুছুন
  3. খুরধার কলম চলতে থাকুক। আর উঠে আসুক এরকম আরও গল্প । যা আমাদের জীবনের সাথে মিশে আছে।

    উত্তরমুছুন
  4. Ami piyasha panja
    Asadharon golpo.satti ai onyo sangir khub darkar hoye pore akakitte.khub bhalo likhechis.

    উত্তরমুছুন
  5. কি অসাধারণ গল্পটা লিখেছ দিদিভাই। সত্যি একাকীত্ব মানুষকে কি না করায়।সাঁজবাতি যে আত্মহননের পথ তাকেই বেছে না নিয়ে নতুনভাবে জীবনটা কে ভালোবেসেছে সেটা সত্যি একটা ইনস্পিরেশন।

    উত্তরমুছুন
    উত্তরগুলি
    1. সবাই যদি এথেকে অনুপ্রাণিত হতে পারে তবেই লেখা সার্থক।

      মুছুন
  6. এই মন্তব্যটি লেখক দ্বারা সরানো হয়েছে।

    উত্তরমুছুন
  7. খুব সুন্দর... একাকিত্বও কখনো কখনো নিজেকে নতুন করে চিনতে শেখায়..

    উত্তরমুছুন
  8. সাঁঝবাতির এই গল্পটার সাথে অনেক জায়গায় আমার দিদির জীবনের গল্পের খুব মিল খুঁজে পেলাম।

    উত্তরমুছুন

শিরোনাম - অপ্রকাশিত অনুভূতি✍️ ডা: অরুণিমা দাস

শিরোনাম - অপ্রকাশিত অনুভূতি ✍️ ডা: অরুণিমা দাস কিছু অনুভূতি মনের গভীরে থাকাই শ্রেয়। সেটা হয়তো প্রকাশ করলে সমস্যা হতে পারে,তাই প্রকাশ না কর...