যদি এমন হতো,,,,,.
পারমিতা মন্ডল ।
শ্রীচরনেষু মা ,
আজ অনেক দিন পর আবার তোমাকে লিখতে বসলাম মা। ফোনের যুগে চিঠি লেখা কেন এটা মনে হতেই পারে । আসলে মনের কথা মনে হয় একমাত্র চিঠিতেই ভালো ভাবে প্রকাশ করা যায় ।জানি তুমি আমার নিজের মা না । আমার শাশুড়ি মা । তাও আবার প্রাক্তন । কিন্তু তোমার সাথে তো আমার সেই তথা কথিত শাশুড়ি বৌয়ের সম্পর্ক ছিল না । আমরা তো মা মেয়ের মতো ছিলাম । তুমি যে আমাকে এতো ভালো বাসতে তা , তোমার কাছে যখন ছিলাম তখন বুঝতে পারিনি ।আজ মনে হয় সব শাশুড়ি মা যদি তোমার মতো হতো তাহলে অনেক মেয়ে বধূ নির্যাতনের হাত থেকে রক্ষা পেত । আমার মতো ঘুরে দাঁড়াতে পারতো ।আসলে আমরা মেয়েরাই ,নিজেরা নিজেদের শত্রু ।
তোমার ছেলের সৌম্যর সাথে আমার পরিচয় হয়েছিল সেই কলেজ লাইফে । প্রথম দিকে আমরা খুব ভালো বন্ধু ছিলাম । তারপর আস্তে আস্তে আমাদের প্রেম হয় । আমি শুনেছি তুমি নাকি আমাদের সম্পর্কটা মেনে নিতে চাওনি । আসলে সৌম্য তোমার একমাত্র ছেলে ছিল তো । তুমি হয়তো ওর জন্য রূপে লক্ষ্মী, গুনে স্বরস্বতী চেয়েছিলে । কিন্তু আমি তো তা ছিলাম না । পড়াশোনায় ভালো ছিলাম ঠিকই ,কিন্তু রূপ ? সেটা তো আমার একদম ই ছিল না ।ছোট বেলায় আমার একটা দুর্ঘটনা ঘটেছিল । কালিপুজোর দিন বাজি পোড়াতে গিয়ে গায়ে আগুন লেগে গিয়েছিল । ।তখন আমার মুখের অনেকটা অংশ পুড়ে যায় । সেই দাগ যে আজও আমার সারা মুখে আছে । তাই প্রথমেই তুমি আমাকে রিজেক্ট করে দিয়েছিলে । কিন্তু ছেলের জেদাজেদিতে শেষ পর্যন্ত রাজি হয়েছিলে । তোমার ছেলে যে আমাকে ভালো বেসেছিল ।
কিন্তু ভালো বাসলেই তো হলো না । সেই সম্পর্কটাকে তো টিকিয়ে রাখতে হবে । ঝোঁকের মাথায় মুখপোড়া মেয়েকে ভালো বেসেছিল । সমাজে একটা দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে চেয়েছিল হয়তো । তাই বিয়ে করেছিল । তারপর আস্তে আস্তে মোহ কেটে যায় । নিত্য অশান্তি আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অঙ্গ হয়ে ওঠে। তুমি সবই বুঝতে পারতে । সেদিন আমি লুকিয়ে শুনেছিলাম তুমি ছেলেকে শাসন করছিলে । বকাঝকা করছিলে আমার সাথে খারাপ ব্যাবহার করেছে বলে । কিন্তু সেকথা আমাকে বুঝতে দাওনি । আমিও মা ছেলের মধ্যে ঢুকিনি ।
কিন্তু অত্যাচারের মাত্রা দিন দিন বেড়েই চলেছিল । শুনেছিলাম অফিসের একটি মেয়ের সাথে সৌম্য সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছে। । সে ছিল বসের মেয়ে । তাকে হাত করতে পারলে অনেক উচু পোস্টে ওঠা যাবে ।তাই হয়তো সৌম্যর এই পরিবর্তন । আসলে ঝোঁকের মাথায় বিয়ে করেছিল তো । পরে মুখ পোড়া মেয়েকে আর ভালো লাগতো না হয়তো । সেখানে বসের মেয়ে খুব সুন্দরী ছিল । তুমিও ওর এই অধঃপতন মেনে নিতে পারছিলে না । তাই তোমার সাথেও ওর ঝামেলা লেগে যাচ্ছিল ।
কিন্তু মা আমরা তো ভালো বেসে বিয়ে করেছিলাম । তোমার ছেলে কেন এতো তাড়াতাড়ি সব কিছু ভুলে গেল ? আমি তো আজও ওকেই ভালোবাসি । তোমার মনে আছে সেদিন প্রথম বার ও ড্রিংক করে বাড়িতে ফিরেছিল ? তুমি যাতে বুঝতে না পারো তাই তাড়াতাড়ি ওকে টেনে ঘরে নিয়ে গিয়েছিলাম । নীচে আর নামতে দেইনি । উপরেই খাবার নিয়ে গিয়েছিলাম । তুমি হয়তো বুঝতে পেরেছিলে । কিন্তু আমার সামনে কিছু বলোনি । শত হলেও ও তো তোমার সন্তান । কিন্তু বেশীদিন লুকিয়ে রাখা গেল না । এরকম সে প্রায় ই করতে লাগলো । তুমিও এক প্রকার অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলে সৌম্যর ব্যাবহারে । আর ওর চোখে তখন রঙিন দুনিয়ার হাত ছানি ।
সৌম্যর সাথে রাগারাগি হলে , আমি না খেয়ে থাকতাম । আমার মনে আছে , তুমি এসে ধমকের সুরে বলতে " না খেয়ে থাকলে লড়াই করবে কি করে ?. ঐতো চেহারা ! গায়ে একটুও মাংস নেই ।। তারপর মুখটাও পোড়া ।" আমি জানতাম আমার মুখে পোড়া দাগ আছে বলে তুমি তোমার ছেলের বৌ হিসাবে কখনোই আমাকে মানতে পারনি মন থেকে । কখনো ভালো করে কথাও বলতে না ।
কিন্তু মনে মনে এতোটা ভালো বাসতে সেটা কখনোই বুঝতে দাওনি । আজ আমি বুঝতে পারি । আসলে তুমিও তো মেয়ে । তাই একজন মেয়েকে অত্যাচারিত হতে দেখে তোমার মন কাঁদতো । কিন্তু কিছু বলতে পারতে না । কারণ যে অত্যাচার করছে সে তোমার বড় স্নেহের ধন । তোমার অন্ধের জষ্ঠি যে সে ।
অনেক চেষ্টা করেও সৌম্যকে শোধরানো গেলনা । এর পর থেকে সৌম্য প্রায় প্রতিদিনই ড্রিংক করে ঘরে ফিরতে লাগলো । সেদিনের কথা তোমার হয়তো মনে আছে মা । সৌম্য প্রথমবার আমার গায়ে হাত তুলেছিল । শরীরে যতটা না ব্যাথা লেগেছিল তার চেয়ে বেশী ব্যাথা লেগেছিল মনে । এই মানুষটাকে আমি ভালো বেসেছিলাম !! যে আমার জন্য পাগল ছিল । তোমাদের সবার বিরুদ্ধে গিয়ে আমাকে বিয়ে করেছিল । আমার বাবা অবশ্য বলেছিল লেখা পড়া শেষ করে আগে নিজের পায়ে দাঁড়াতে । তারপর বিয়ে করতে । সেদিন আমিও অবশ্য বাবার কথা শুনিনি । তাহলে আজ হয়তো আমাকে এই দিনটি দেখতে হতো না ।
তোমার ছেলের এই ব্যাবহার তোমাকেও খুব কষ্ট দিয়েছিল । তাই তুমি আমার উপর রাগ দেখিয়ে আমাকে বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে বলেছিলে ।তোমার আসল উদ্দেশ্য ছিল আমাকে সাহায্য করা । তুমি বুঝতে পেরেছিলে যে তোমার ছেলে খারাপ সঙ্গে পড়েছে । ওখানে থাকলে তুমি আমাকে বাঁচাতে পারবে না । সৌম্য তোমার সাথেও খারাপ ব্যাবহার করতো । কিন্তু তোমার তো ছেড়ে যাওয়ার কোন জায়গা ছিল না । তাই তুমি আমাকে বাঁচাতে চেয়েছিলে । তুমি বুঝে গিয়েছিলে সৌম্য আর আমার সাথে থাকতে চায় না । কারণ এরকম অশান্তি ও মাঝে মাঝেই করতো । আর এটা সে ডিভোর্স এর জন্যই করতো । ওর ইচ্ছা ছিল বসের মেয়েকে বিয়ে করা । তুমি তাতে বাধা দিচ্ছিলে বলে ও তোমাকেও ছাড়তো না । সেদিন তোমাদের যখন কথা কাটাকাটি হচ্ছিল তখন আমি শুনেছিলাম আড়াল থেকে । তুমি ভেবেছিলে আমি হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছি । কিন্তু না আমি লুকিয়ে দেখেছিলাম । হঠাৎ তুমি উত্তেজিত হয়ে সপাটে এক চড় কষিয়ে দিয়েছিলে সৌম্যর গালে । সৌম্য ও উল্টে তোমার হাত শক্ত করে ধরেছিল । তোমার খুব লাগছিল । কিন্তু ভয়ে আমি সামনে যেতে পারিনি । ও তখন মানুষ ছিল না । তুমি খুব কষ্ট পেয়েছিলে সেদিন । এই ছেলের জন্যই তো তুমি সারা জীবন এতো কষ্ট করেছো । শশুর মহাশয় মারা যাওয়ার পর একা হাতে সৌম্যকে মানুষ করেছো ।আমি ওর কাছেই শুনেছি । কখনোই তুমি ওকে কষ্ট পেতে দাওনি । কিন্তু আজ কেন সে এরকম হয়ে গেল ??
আমার আজও মনে আছে সেদিন তুমি আমার সাথেও খুব অশান্তি করেছিলে । বেরিয়ে যেতে বলেছিলে বাড়ি থেকে । আসলে তুমি চেয়েছিলে ঐ পরিবেশে থেকে , আমি যেন আমার জীবনটাকে নষ্ট না করি । ছেলেকে ফেরানোর আর কোন রাস্তা না পেয়ে তুমি অন্তত আমাকে বাঁচাতে চেয়েছিলে । আমার জীবনটাকে নষ্ট হতে দিতে চাওনি তুমি । আমাকে তাড়িয়ে দিয়েছিলে । কারণ তুমি জানতে তাড়িয়ে না দিলে আমি যাবো না । তুমি গোপনে আমার বাবাকে ফোন করে সব জানিয়ে ছিলে । নিজের ছেলের সমস্ত অপকর্মের কথা স্বিকার করে বাবাকে আমার পাশে দাঁড়ানোর অনুরোধ করেছিলে । ভালোবেসে বিয়ে করেছিলাম বলে আমিও কখনো বাবা মাকে এসব কথা বলতে পারতাম না । এখানে অনেকেই হয়তো বলবে এমন আবার হয় নাকি ? ছেলের থেকে ছেলের বৌ আপন বেশী ? কিন্তু এটা কেউ বুঝবে না যে তুমি একটা মেয়েকে অত্যাচারের হাত থেকে বাঁচাতে চেয়েছিলে ।
তারপর কেটে গেছে আরো সাত সাতটা বছর । তোমাদের বাড়ি থেকে চলে আসার পর তোমার ছেলে ডিভোর্সের ফাইল করে । এক বছরের মধ্যে আমাদের ডিভোর্স হয়ে যায় । আমি আবার নতুন করে পড়াশোনা শুরু করি । আমার বাবার তেমন আর্থিক সামর্থ ছিল না । আমাকে চাকরির প্রশিক্ষন দেওয়ার মতো । তুমি গোপনে বাবাকে টাকা পাঠাতে । এখন আমি সব জানি । আসলে তোমার ছেলের অপরাধ তুমি কিছুটা কমাতে চেয়েছিলে । আর নিজের অজান্তে আমাকে ভালো বেসে ফেলেছিলে ।
আজ আমি চাকরি করি মা । তোমার ছেলের থেকেও অনেক উঁচু পোস্টে । আমাকে কোন বস ধরতে হয়নি । নিজের চেষ্টায় আর তোমাদের সহযোগিতায় আমি এই চাকরি পেয়েছি । এখন কি তুমি আমার কাছে এসে থাকতে পারোনা মা ?? শুনেছি তোমার ছেলে বসের মেয়েকে বিয়ে করেছে । কিন্তু ওরা তোমার সাথে একটুও ভালো ব্যাবহার করে না । তাই বলছি তুমি আমার কাছে চলে এসো মা । আমি তো একাই থাকি । বাকি জীবনটা না হয় মা মেয়েতে এক সাথে কাটিয়ে দেব । তুমি আসবে তো মা ?? তোমার উত্তরের প্রতিক্ষায় রইলাম । ভালো থেক মা ।
ইতি ------
তোমার মেয়ে সাথীলেখা ।
( প্রাক্তন পুত্রবধূ )
( পৃথিবীর সব শাশুড়ি বৌমার সম্পর্ক গুলো যেন এমনই হয় , এই প্রার্থনা করি ।)
বাহ! অপূর্ব! দারুণ লাগল। 👌👌👍👍❤❤💅💅💅
উত্তরমুছুনঅসাধারণ👏✊👍
উত্তরমুছুনঅপূর্ব লাগল এবং তোমার মত আমিও বলতে চাই গল্পে নয় বাস্তবে যেন শাশুড়ী-বৌমার সম্পর্ক এমন হয়।
উত্তরমুছুন