সোমবার, ৪ জানুয়ারি, ২০২১

বিষয় : অনুগল্প # নাম : তোমার দেশ আমার দেশ লেখায় : শর্মিষ্ঠা ভট্ট

 বিষয় # অনুগল্প

(বদলে যাওয়া দিন, বদলে যাওয়া সময় ) 

নাম# তোমার দেশ আমার দেশ

লেখায়# শর্মিষ্ঠা ভট্ট




দলপ্রীত রিটায়ার্ড করল এবার। বৌ ছেলে নিয়ে ঘুরেছে এ রাজ্য থেকে ও রাজ্যে এবার থিতু হতে চায়।  নিজের ঘর লুধিয়ানায় ফিরেছে সে। মনে অনেক আশা অনেক আবেগ ভরে আছে তার। সেই কোন বিশ বছর বয়সে ঘর ছেড়েছিল। তখন কত খেলার সাথী কত প্রিয় জিনিস কত প্রিয় লোক ছেড়ে গেছে। 


পয়সার জন্য চাকরি। সেনাবাহিনীর চাকরি পেল সে। গর্বিত বাবা মা আত্মীয়, মহল্লা। আর সে নিজে ধীরে ধীরে গর্বিত হতে শিখলো ঠিক তখন, যখন সে দেশকে ভালবেসে ফেলল। ভালবেসে ফেলল ওই বর্দিটাকে। ভালোবাসল নিজের কাজটাকে। দেশের সেনা সে গর্বিত, মুখে জয় হিন্দ। 


অনেক অভ্যাস বদলে যাচ্ছিল। সেই গ্রামের সাধারণ ছেলে অনুভব করছিল তার মধ্যে এক আগুন আছে। পুরো দেশ যখন উৎসবে ব্যস্ত, সে সতন্ত্র প্রহরী, তার ছুটি নেই,কর্তব্য করে চলে। কোন বিরক্তি নয় ।উপর মহলের  কোন চাপ সে প্রকাশ করবে না , তার চওড়া বুকে বেঁধে দেবে আবেগ। এমন তাদের শেখানো হয়েছে। তরুণ দলপ্রীত কত কত দিন বৌ ছেড়ে দূরে থেকেছে। গ্রামে পাঠিয়েছে , ছেলে সমেত। কত দিন অভুক্ত মনকে বুঝিয়েছে। সামান্য পয়সায় দিন চালিয়েছে, পরিবারকে পয়সা পঠিয়েছে। সন্তানের দেখা শোনা তাও সে করতে পারেনি ঠিক মতো। আজ সিয়াচেন কাল রাজস্থান মরু। তার ব্যাটেলিয়ন এর সাথে সে ছুটেছে। কত কত গুলি কাশ্মীর সামলে এসেছে। বৌ বলে " দেওয়ালী, আসবে না? ঘর যে অন্ধকার থাকবে" ।এক দিন সেও বুঝে গেছে এ কর্তব্য, একটা ঘর নয় হাজার ঘরে আলো জ্বালতে হবে দলপ্রীতকে। সেও একদিন বলা ছেড়ে দিয়েছে। যেমন দলপ্রীতকে ওর মা অনেক দিন হল বলে না "বেটা এক মাস হয়ে গেল, তোর মুখ দেখি না । " যেমন ওর বনেরা বলা ছেড়ে দিয়েছে ক 'বে... " ভাইয়া রাখিতে আসবি না? " এমন করে একদিন ওর প্রথম প্রেম বলা ছেড়ে অন্যের ঘরে চলে গেল... " প্রীত, চিঠিতে আর যে চলে না। "


সময় - দেশ - কাজ এগিয়ে চলে। গ্রামে আসে ছুটি ছাটায় অনেক আদর পেয়ে ফিরে যায়, সংসারের অনেক মার প্যাচ সে বোঝে না। হাত ভরে জিনিস দেয়, মন ভরে ফিরে যায়। রেশন ক্যান্টিন কার্ডের জন্য পরিবার আত্মীয় বন্ধুরা এসে দাঁড়ায় তার সামনে। মন খুলে খুশি করেছে তাদের। মা বাবা হসপিটাল কার্ড পেতে পেতে এমন অভ্যাস হয়েছে, ঠিক সময় তা হলে বার বার ফোন এসে যায়। দলপ্রীত হয়ত একটা সরকারি স্ট্যাম্প কার্ড ছাড়া আর কিছু নয়। ফেলে আসা সেই কুড়ি বছর থেকে আবার শুরু করতে চাইলে ফিরবে না বহমান দিন। বালির মতো তার হাত থেকে গড়িয়ে চলে গেছে। দলপ্রীত বোঝে না। জীবন ট্রেন স্টেশন ছেড়ে চলে গেছে দলপ্রীত দৌড়ে  ধরতে পারবে না। তবু দলপ্রীত ছোটে.......... 


অতি সামান্য পয়সায় কি ভাবে আনন্দে থাকতে হয় সেনা জানে। বাইরে দুনিয়া তাদের কাছে ধূসর পাণ্ডুলিপি। যেখানে অজস্র পরিচিত নাম লেখা হয়ে থাকে। দলপ্রীত অসংখ্যর মাঝে এক। সম্মান দেখায় দেশবাসী সেনাবাহিনী বলে। আর সেনা দলপ্রীত লাইনে দাঁড়ায় সামান্য কটা পয়সা বাঁচাতে রেশন ক্যান্টিন হসপিটালের লাইনে। একক দলপ্রীত সিয়াচেন থেকে ফিরেও ট্রেনে রিজার্ভ সিটি না পেলে মাটিতে শুয়ে ঘরে ফেরে। দামের এদিক ওদিক সামাজিক অন্যায়ে চেঁচামেচি করলে লোক বলে "সেনার বুদ্ধি তো ঘুটনো (হাঁটু) মে। " হ্যাঁ হয়ত তাই.... তাই দলপ্রীত চীনি সেনাটার নাকে ঘুঁশি মেরেছিল।কিন্তু ঘাড় নীচু করেনি।এ লড়াইটা কিন্তু নিজের জন্য ছিল না। তবু' মাথা গরমে' বলে সিভিল লাইফে তার পরিচয় আছে। সেনাবাহিনীর জীবন কাটিয়ে এসে দলপ্রীত অনুভব করে বড়ো বেমানান সে। 


দুবছর আগে ঘরে ফেরার কথা বলতে কালো হয়ে গেল ভাইয়েদের মুখ। জমিজমা বাড়ির অংশ দিতে হবে!! প্রায় নাকোচ করে দিয়েই ছিল। মাও বলে "এত বাচ্ছা কাচ্ছা নিয়ে এরাই বা কি করে... সরকার তোকে বাড়িঘর দেবে না!? " সত্যি সে তো সরকারের কাজ করেছে, দেওয়া তো তাদের উচিত। কিন্তু দলপ্রীত সরকারের মাথা হাত পা কিছু দেখেনি, চিনবে কি করে।চাইবে কার কাছে? বৌ ছেলে তেড়ে মেড়ে  একটু জমি উদ্ধার করেছে। ছোট্ট একটা ঘর তুলতে জমানো পয়সা ঢেলেছে দলপ্রীত।বৌ ছেলে তবু ওখানে জমে বসেছে। কিন্তু সে?? আজ সে ফিরে এসেছে, তার এতদিনের শেখা ফৌজি চলন বলনে বৌ ছেলেই হেসে ফেলে। সকালে ওঠা, হাঁটা ছোটা। তাড়াতাড়ি শোয়া এদের কাছে অদ্ভুত, জোরে কথা বলা, দিল খুলে ব্যবহার করা অবাক হয় ওরা। সমাজের অন্যায়ে ঝাঁপাতে ছেলেই বিরক্ত হয়ে বলে " আঃ বাবা একটু শান্ত হয়ে বসো তো, পঞ্চায়েতের সাথে ঝামেলায় জড়িয়ে বিপদ ডেকো না। দেশ দেশ করে কিছু সুরাহা তো করো নি, অন্ততঃ চুপ করে আমার একটা উপকার করো। " দলপ্রীত এখন কেবল রিটায়ার্ড এর পয়সা তোলে, হাসপাতালে যায়। কিন্তু নিজস্ব পরিচয়হীন। ওর জীবন যেন অন্যের নিয়ন্ত্রণ। সেই উষ্ণতা আর কেন উপলব্ধি করতে পারে না।মাত্র পঞ্চাশ পেরিয়েছে সে। তারুণ্যের জোস এখনও বুকে। 


দলপ্রীত একা পথ চলে, হাঁটতে হাঁটতে সে অনেক পথ চলে এসেছে। শুধু একটা দিন একা ঘরের বাইরে লালচে পথে চলতে চলতে নিজেকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে থাকে । খিদে পেলে পথের পাশে বসে খাচ্ছে আর হাঁটছে। দূর দূর চলা তার অভ্যাস আছে। বেরিয়ে পড়েছে তাই। দু দিকের আঁখ আর সর্ষের ক্ষেত । চোখ ভরে দেশ কে দেখছে । শ্বাস নিচ্ছে জোরে..... তাদের তৈরি ভারতের মাটির গন্ধ বড়ো মায়া ভরা। সন্ধ্যা হয়ে এলো পাখিগুলো নিচু হয়ে উড়ছে, পশ্চিম আবীর রাঙা...... ঘর ফেরা দলপ্রীত গান ধরেছে....." মেরা দেশ কা মিট্টি "......🇮🇳🇮🇳🇮🇳🇮🇳🇮🇳🇮🇳বদলে যায় দিন, বদলে যায় সময়, দলপ্রীত বোঝে। মনে একটাই ছবি  । গান জোর হয়, খোলা পথ দুভাগ হয়ে সর্ষে ক্ষেতে...

©copyright reserved for Sharmistha Bhatt

৩টি মন্তব্য:

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল✍️ ডা: অরুণিমা দাস

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল ✍️ ডা: অরুণিমা দাস বর্তমানে অতিরিক্ত কর্মব্যস্ততার কারণে একটু বেশি সময় কাজে দেওয়ার জন্য হয়তো একের প্রতি অন্য...