"হ্যালো,, দিদি.. শুনতে পাচ্ছেন? হ্যাঁ.. হ্যাঁ শুনতে পাচ্ছি। বলুন আপনি। কাল সকাল দশটায় মেডিক্যালের তিন তলার পঁচিশ নম্বর রুমে। ডাক্তার বলেছেন, এখানেই ব্লাড কালেক্ট করবেন। আপনি কি একটু আসতে পারবেন?" বড়ই অনুরোধের বিনম্র কণ্ঠ ভেসে আসে অপর প্রান্ত থেকে।
"দিদি,, আপনি কোন চিন্তা করবেন না। অর্পণ তো আমার নিজের ছেলের মতোই। অবশ্যই টাইমলি পৌঁছে যাব আমি" বলে ফোনটা নামিয়ে রাখি আমি।
মেডিক্যালে পৌঁছে নির্ধারিত রুমের সামনে বসে আছি, আর দেখছি,আরো অনেকের মতোই অর্পণের বাবা মায়ের দৌঁড়াদৌঁড়ি! আহা! একমাত্র ছেলেকে বাঁচানোর জন্য কি কাতর আকুতি তাঁদের।
শিশু ওয়ার্ডের সামনের এই লম্বা টানা বারান্দায় বসে ভাবছি, একটু পেছনের কথা। অর্পণের দাম্ভিক স্বভাবের মায়ের কথা!
সেদিন ছিল ছেলের স্কুলের নার্সারি ক্লাসের প্রথম দিন। স্বাভাবিক যার যার ছেলে মেয়ের সাথে, সেদিন সবার বাবা- মা রাও প্রেজেন্ট ছিলেন। তো অর্পণ নিজেই একা স্লিপ মার্ট দখল করে বসে ছিল। অন্য কাউকেই সে আশপাশেও ঘেঁষতে দিচ্ছিলো না। লিয়া নামের মেয়েটা একটু ত্যাঁদরামি করতেই, এমন জোরে ওর মাথার চুল টেনে দিয়েছিল যে, সেদিন বেচারির চিল চিৎকার, সব আওয়াজ ছাপিয়ে স্কুল প্রিন্সিপালের কান পর্যন্ত গেছিলো! এই স্কুল এন্ড কলেজটা আসলে শহরের নামী বেসরকারি স্কুলের একটি। এখানে যারা পড়তে আসে, সবাই সচ্ছল পরিবারের ছেলে - মেয়ে! সুতরাং লিয়ার প্যারেন্টস রাই বা ছেড়ে কথা বলবেন কেনো??
প্রথম দিনের সেই ঘটনার পর থেকে অর্পণের দুষ্টুমি যেনো ক্রমাগত বেড়েই চলেছে! ক্লাসের অন্যান্য বাচ্চাদের অকারণ পেটানো থেকে শুরু করে টিফিন চুরি, পেন্সিল চুরি, বই চুরি ইত্যাদি নানা রকম অপকর্ম ওর লেগেই থাকতো। কিন্তু কোন ঘটনার জন্য অর্পণের মায়ের কারো কাছে দুঃখ প্রকাশ করা তো দূরে থাক, এমন সব দাম্ভিকতা দেখিয়ে বেড়াতো যে, কেউ উনার সাথে কথা বলতো না। সময় গড়ানোর সাথে সাথে অর্পণের বাঁদরামির সাথে সাথে ওর মায়ের দাম্ভিকতাও যেন সবাই এক প্রকার মেনে নিয়েছিলাম। কেউ পারত পক্ষে কোন কমপ্লেন করতে যেতো না।
এমনিতে দুষ্ট হলে কি হবে, অর্পণ দেখতে খুবই রোগা! বাড়িতে ওর মা নাকি ওকে কিছুই খাওয়াতে পারতো না। এ রকমই একদিন, খেলতে গিয়ে, হঠাৎ মাথা ঘুরে পড়ে যায় অর্পণ! সবাই ভেবেছিল হয়তো রোগা বলে শরীর দুর্বল।তাই পড়ে গেছে!
এর পর আরো সপ্তাহ দুই পর! স্কুলের নোটিশ বোর্ডে, বড়ো করে অর্পণের ছবি সহ আবেদন করা হয়েছে জরুরী রক্ত দিয়ে সাহায্য করার জন্য! অর্পণ থ্যালাসেমিয়া রোগে আক্রান্ত!
এ নিয়ে যে আমার কয়বার হলো গত ছয় বছরে, তার হিসেব নেই! নিয়ম করে আমার রক্ত অর্পণকে ডোনেট করি প্রতি তিনমাস অন্তর অন্তর! আমার নিজের এনিমিয়া থাকা সত্ত্বেও এই কাজটা করে খুব আনন্দ পাই আমি। শুরুর দিকে তো তিন মাস পেরোনোর আগেই ব্লাড দিতে হতো আমাকে। "ও" গ্রুপের রক্ত পাওয়া খুব ঝামেলা! অথচ এই মহিলার বাজে স্বভাবের জন্য আমি কখনো কথা বলতাম না স্কুলের সেই প্রথম দিন থেকেই! উনার সাথে যে আমার কোন ব্যক্তিগত বিরোধ ছিলো তা নয়। কিন্তু মানুষের ব্যবহার হচ্ছে সবচেয়ে বড়ো পরিচয়।অন্তত আমার কাছে!!
সবশেষে, এটাই বলতে চাই, আপনার ভালবাসা কিংবা স্নেহের বিনিময়ে কি পেলেন, আর কি পেলেন না, তা নিয়ে বসে থাকলে তো জীবন চলে না। যাকে মনপ্রাণ উজাড় করে ভালবাসলেন!! সে যদি তা বুঝতে না পারে বা সেই ভালবাসা কিংবা স্নেহের উপযুক্ত না হয়, তবে কি ভালবাসা কিংবা স্নেহ করা ছেড়ে দেবেন ?! সম্পর্কের দাঁড়িপাল্লায় বোধহয় সব কিছুই পরিমাপ করা যায়। শুধু স্নেহ আর ভালবাসা ছাড়া! সে কারণেই আমরা পরিবারে থাকি। একের পর এক নতুন নতুন সম্পর্কে জড়ায়। স্নেহ ও ভাল বাসাতো উজাড় করে দেয়ার জন্য ই সৃষ্ট! একে কি আর মাপ জোখ করে দেয়া যায়?! জানি, আঘাতে মন ভেঙে যায়! প্রত্যাখ্যাত হয়ে মরে যেতে ইচ্ছে করে! তারপরও আমি, এই স্নেহ ও ভালবাসা বিলানোর পক্ষে!!
||সমাপ্ত||
Copyright©️ All rights reserved for Pallabi Barua

অসাধারণ লিখেছ ।খুবভালো লাগল ।👌👌👌👌👏👏👏👏
উত্তরমুছুনঅপূর্ব মানবতা। খুবই ভালো👌👌👌👌
উত্তরমুছুনতোমার মানসিকতাকে কুর্নিশ।
উত্তরমুছুনঅসাধারণ ম্যাসেজ! খুব ভাল লাগল। 👌👌👍👍❤❤
উত্তরমুছুন